| ঋজুর আগের লেখা–জার্নি টু দি সেন্টার অব দ্য আর্থ?! |
সেদিন বাড়ি ফিরতে রাত হয়েছিল। তাও, বাড়িতে ঢোকার আগে দরজার বাইরে পাপোশের পাশে জুতোর সংখ্যা দেখে বুঝলাম, শনিচক্র ফুল ফোর্সে তখনও উপস্থিত। ঢুকে দেখলাম ড্রইং-কাম-ডাইনিং স্পেস খালি, এবং ভেতরের ঘর থেকে কথা আর হাসির হুল্লোড় ভেসে আসছে। সংসারী মানুষ মানেই জানেন, এর অর্থ হল কোথাও বেরোনোর জন্যে বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের তরফে জাঁকালো সাজসজ্জা চলছে।
প্রমাদ গুণলাম, কারণ এর অর্থ এখন চা পাওয়া যাবে না। সৌভাগ্যক্রমে শনিচক্রের সদস্যরা তখন একটি নিমন্ত্রণ-রক্ষা করে ফিরেছিলেন, তাই চা পাওয়া গেল। তবে, চায়ের কাপটা হাতে নিয়েই দেখলাম যে আমার আশেপাশের সোফার গদিগুলো দখল করে আমার বউ, মেয়ে মেঘনা, মধুরিমা, আর তোষালি বসে পড়েছে। বুঝলাম, আজ চা খাওয়ার ফাঁকে ফেসবুক আর হোয়াটস অ্যাপ করা মাথায় উঠল।
কিন্তু, এহেন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েও মেয়ের মুখ থেকে যে প্রশ্নটা বেরিয়ে এল, সেটার জন্যে আমি একেবারেই তৈরি ছিলাম নাঃ “আচ্ছা বাবা, হিরে কীভাবে পাওয়া যায়?”
ম্যানেজার এবং বাবা, এই দুই পোস্ট যাঁরা সামলান তাঁদের কোনো অবস্থাতেই ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া চেহারা দেখাতে নেই। আমিও অক্লেশে হিরের উৎপত্তি নিয়ে ফান্ডা দিতে যাচ্ছিলাম। ঠিক সেই সময় তোষালি প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, যদি রাজা সলোমনের সেই হিরের খনি এখন খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে কি এত হিরে পাওয়া যাবে যে হিরে সস্তা হয়ে যাবে?”
হাঁ করা মুখটা বেশ চেষ্টা করে বন্ধ করতে হল। তারপর, চায়ে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে ছোটোখাটো প্রশ্ন করে বুঝলাম, যে বিশেষ নিমন্ত্রণটি রক্ষা করতে গেছিল শনিচক্রের সদস্যরা, সেখানে মেয়েদের শ্রেষ্ঠ বন্ধু বলে একদা বিজ্ঞাপিত হিরের দ্যূতি কিছু বেশি পরিমাণেই তাদের চোখ ও মন ধাঁধিয়েছে। অতঃপর রাজা সলোমনের হিরের খনি নিয়ে টানাটানি পড়েছে।
চা শেষ করে আমি হিরের কথা শুরু করলাম।
“কার্বন পরমাণু, যা কয়লা আর গ্রাফাইটেও থাকে, একটা বিশেষ ঘনকের মতো চেহারায় এলে হিরে তৈরি হয়। এর এই বিশেষ গঠনের জন্যেই এটি একইসঙ্গে পৃথিবীর কঠিনতম, এবং সুন্দরতম পদার্থগুলোর অন্যতম। কিন্তু এই বিশেষ গঠন বা ক্রিস্ট্যাল ল্যাটিস পাওয়ার জন্যে কার্বনকে যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা, এককথায়, মারাত্মক।
বায়ুমণ্ডলের চাপের প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ গুণ চাপে, আর ৯০০ থেকে ১৩০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপে হিরে তৈরি হয়। পৃথিবীতে এইরকম পরিবেশ পাওয়া যায় মূলত কন্টিনেন্টাল প্লেটের সবথেকে পুরু, স্থিতিশীল, এবং পুরোনো জায়গাগুলোর নিচে, ম্যান্টলের লিথোস্ফেরিক অংশে, যাকে ক্রেটন বলা হয়। সাধারণত ১৪০ থেকে ১৯০ কিলোমিটার গভীরতায়, ১০০ কোটি থেকে ৩৩০ কোটি বছর পুরোনো ক্রেটনের স্তরে, হিরে তৈরি হয়। সমুদ্রের তলায় পৃথিবীর গভীরে তাপমাত্রা খুব দ্রুত বাড়তে থাকে বলে ওখানে হিরে পাওয়া যায় না।
এছাড়া কোথাও উল্কাপাত হলে সেখানেও খুব ছোটো-ছোটো হিরে, যাকে মাইক্রোডায়মন্ড বা ন্যানোডায়মন্ড বলা হয়, পাওয়ার নজির আছে। তবে সেগুলো এতই কম যে তাদের নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভালো।
পৃথিবীর গভীরে তৈরি হওয়া এই হিরে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ম্যাগমা, মানে গলন্ত লাভা, পাথর, আর গ্যাসের সঙ্গে ওপরে উঠে আসে। এই ভলক্যানিক ম্যাটার উঠে আসে যে পাইপগুলো বেয়ে, তাদের মধ্যে যাতে অপেক্ষাকৃত বেশি পরিমাণে হিরে পাওয়া যায়, তাদের বলা হয় কিম্বার্লাইট পাইপ। যে পাইপে জলের প্রবাহ হয়, তাতে হিরে কম থাকে, এবং তাদের বলা হয় ল্যাম্প্রোয়াইট পাইপ।
ভলক্যানিক পাইপে কিছু-কিছু বিশেষ জিনিসের উপস্থিতি দেখে হিরের সন্ধানী বা প্রসপেক্টররা আন্দাজ করেন, কোথায় হিরে পাওয়া যাবে”।
“হ্যাঁগো”, এবার প্রশ্নটা তোলে আমার বউ, “ইতিহাস বইয়ে তো পড়েছি যে একসময় ভারতের গোলকোন্ডায় হিরে পাওয়া যেত। এখনও ওখান থেকে হিরে তোলা হয়?”
“ইতিহাসে হিরে নিয়ে সবথেকে বেশি আলোচনা ভারতীয় পুঁথিপত্রেই হয়েছে বলে অধিকাংশ মানুষই মনে করেন যে ৩০০০ বছর বা তারো বেশি আগে সম্ভবত ভারতেই প্রথম হিরে পাওয়া যায়”, আমি বলি।
“ভারত থেকেই হিরের সন্ধান পায় গ্রিকরা, যারা ‘অ্যাডামাস’ শব্দ থেকে এই বিশেষ জিনিসটির নামকরণ করে এর কাঠিন্য তথা অপরিবর্তনেয় চরিত্রের জন্যে।
মানুষ অষ্টাদশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় এসে পৌঁছনোর আগে অবধি সারা পৃথিবীর মোট হিরের প্রায় ৯০ শতাংশের জোগান দিত ভারতই, আর তার প্রধানতম খনি ছিল গোলকোন্ডা। তারপর, ১৭২৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিলে হিরে পাওয়া যায়।
তবে হিরের এবং মানবসভ্যতার ইতিহাস পালটে যায় ১৮৬০-এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার কিম্বার্লির কাছে হিরের খনি আবিষ্কৃত হলে। ১৮৬৬ সালে অরেঞ্জ নদীর তীরে প্রথম হিরে পাওয়া যায়, আর নাম রাখা হয়ঃ ইউরেকা ডায়মন্ড। এরপর ১৮৬৯ সালে কোলসবার্গ এলাকায় ডি বিয়ার্স ভাইদের মালিকানাধীন একটি পাহাড়ে একটা বেশ বড়োসড়ো হিরে পাওয়া যায়। ব্যাস! শুরু হয়ে যায় ওখানে ‘ডায়মন্ড রাশ’। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এত লোক হিরের সন্ধানে ওই পাহাড়টাকে কেটে আর খুঁড়ে ফেলে যে পাহাড়ের বদলে ওখানে
তৈরি হয় একটা বিশাল গর্ত। এই বিশাল গর্ত, যার আনুষ্ঠানিক নামই হল ‘দ্য বিগ হোল’, থেকে ১৮৭১ থেকে ১৯১৪ অবধি সময়ের মধ্যে প্রায় ২৭২২ কেজি হিরে পাওয়া যায়।
হ্যাঁ, এই গর্তটাই হল বিশ্ববিখ্যাত কিম্বার্লির হিরের খনি।
ভারতে এখনও পান্না বলে একটা জায়গায় হিরে পাওয়া যায় বটে, তবে সে শুধু ভূগোল বইয়ের জন্যে। গোলকোন্ডা সহ এদেশের সবক’টা হিরের খনিই এখন নিঃস্ব”।
“এত হিরে তোলা হয় ওখান থেকে?”, মধুরিমার চোখ প্রায় কপালে উঠেছে দেখি, “তাও হিরের এত দাম কেন?”
চায়ের তলানিটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি বলি, “হিরের বাজারটা আসলে একেবারে প্রথম থেকেই খুব কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করেছে উৎপাদক সংস্থাগুলো। আফ্রিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রসারে বিশাল ভূমিকা নিয়েছিলেন যে সিসিল রোডস, তাঁর উদ্যোগেই প্রথমে বেশির ভাগ ছোটো মাইনিং কোম্পানি একসাথে জুড়ে গিয়ে ‘ডি বিয়ার্স’ নামের কোম্পানি তৈরি হয়। তারপর ১৮৮৮ সালে তার সঙ্গে ‘দ্য কিম্বার্লি’ নামক একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি মিশে গিয়ে তৈরি করে ‘ডি বিয়ার্স কনসলিডেটেড মাইনস’। দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর বাজারে হিরের একমাত্র সরবরাহকারী ছিল এই সংস্থাই। লাগাতার মার্কেটিং ক্যাম্পেইন চালিয়ে, এবং কাটিং ও পলিশিং-এর ব্যাপারেও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এই কোম্পানি একইসঙ্গে হিরের জনপ্রিয়তা আর দাম, দুটোকেই আকাশছোঁয়া করে দেয়।
এনগেজমেন্ট রিং-এ হিরের ব্যবহারের ধারণাটা ডি বিয়ার্স-এর ১৯৩৮ সালে চালানো একটা মার্কেটিং ক্যাম্পেইনের অবদান মাত্র।
এখনও পৃথিবীতে প্রতি বছরে প্রায় ২৬ টন হিরে তোলা হয়, তবে এই কোম্পানি এখন নিজেদের উপস্থিতি ক্রমেই কমিয়ে আনছে নানা আইনি ঝামেলা এড়ানোর জন্য।
তবে হ্যাঁ, পৃথিবীর অধিকাংশ হিরের উৎপাদন এবং বাণিজ্য আমাদের হাতের বাইরে থাকলেও ৯২ শতাংশ হিরেই কিন্তু কাটা আর পালিশ করা হয় ভারতে, মূলত সুরাটে।”
“এই কাটা আর পালিশের ওপরেই কি হিরের দাম নির্ভর করে?” জানতে চায় তোষালি।
“মোট চারটে জিনিসের ওপর হিরের গুণমান নির্ভর করে”, আমি বলি।
“প্রথমেই আসে ক্যারাট, মানে ২০০ মিলিগ্রামের এককে হিরের ভর কত, সেই বিচার। বাকি সব একই রকম থাকলে ক্যারাট বাড়লে হিরের দাম বাড়বে।
এরপর আসে ক্ল্যারিটি, যার বিচার করা হয় জেমোলজিক্যাল ইন্সটিট্যুট অফ আমেরিকা এবং আরো কিছু সংস্থার বানানো স্কেল অনুযায়ী। মোট যত হিরে পাওয়া যায়, তার মাত্র ২০ শতাংশের ক্ল্যারিটি এমন যাতে তাকে জেমস্টোন, মানে মণিরত্ন হিসেবে ব্যবহার করা চলে। বাকিগুলো বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের জন্যে চলে যায়”।
“ক্ল্যারিটি মানে?” এবার জানতে চায় মধুরিমা।
“মানে, আদর্শ অবস্থায় হিরের রং হওয়া উচিত একেবারে স্বচ্ছ এবং সাদা। কিন্তু প্রায় দশগুণ বড়ো করে হিরেকে দেখা হয় তার মধ্যে কোনো ফাটল বা অশুদ্ধি আছে কি না সেটা দেখার জন্য। তার ভিত্তিতেই হিরের ক্ল্যারিটি দেখা হয়”।
“অন্য দুটো কী?” জানতে চায় তোষালি।
“ক্যারাট এবং ক্ল্যারিটির পরেই আসে কালার, বা হিরের রং। একটু আগেই বললাম, আদর্শ হিরের রং বলে কিচ্ছু থাকার কথাই নয়। কালার গ্রেডিং স্কেলে একে বলা হয় ‘ডি’। এরকম হিরে অবশ্য কমই আছে। বরং ‘ই’ গ্রেডের মূলত সাদা হিরে, যাতে কার্বনের ক্রিস্ট্যাল ল্যাটিসে যৎসামান্য নাইট্রোজেন ঢুকে গিয়ে সামান্য বাদামি বা হলুদ রঙের কলঙ্ক এনে দেয়, তারই চলন বেশি, কারণ গয়নায় বসানোর ফলে ওই কলঙ্ক ঢাকা পড়ে যায়। ক্রমে-ক্রমে ‘জেড’ গ্রেডের হিরে হয় একেবারে হলুদ বা বাদামি। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, ‘ডি’ আর ‘জেড’ এই দুই-ই বিরলতম হিরে, তাই তাদের দাম সবচেয়ে বেশি।
হিরের রঙের ক্ষেত্রে অন্য উল্লেখযোগ্য বিষয় এটাই যে গাঢ় হলুদ, গোলাপি, লাল, নীল, সবুজঃ এসব রঙের হিরেও খুব দুর্লভ, আর সেজন্য এদের দামও মারাত্মক।
“লাস্ট, বাট নট দ্য লিস্ট, হল কাট। হিরের আকারের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ১৯১৯ সালে গণিতবিদ মার্সেল তোলকোওস্কি হিরের দ্যূতি সর্বোত্তম করার জন্যে তাতে থাকা পলিশড ফেস-এর সংখ্যা, তাদের কোণের মাপ, এবং ভরের কতটা হিরের ওপরের অংশ বা ক্রাউন-এ আর কতটা নিচের অংশ বা প্যাভিলিয়ন-এ থাকা উচিতঃ এসব বলে দিয়ে যান। এর ভিত্তিতেই হিরের কাটিং ও পলিশিং-এর দক্ষতার পরিমাপ করা হয়, যাকে বলা হয় কাট।
একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। তোলকোওস্কি-র আবিষ্কৃত গঠন ‘রাউন্ড ব্রিলিয়ান্ট কাট’ মেনে আধুনিক হিরেতে থাকে মোট ৫৭টা ফেসেট, তথা পলিশড ফেস। এরে মধ্যে ৩৩টা থাকে ক্রাউন-এ, ২৪টা থাকে প্যাভিলিয়ন-এ। ওপর আর নিচের মধ্যে থাকে একটা পাতলা গার্ডল। এই গার্ডল-এর সঙ্গে প্যাভিলিয়ন-এর মূল ফেসেটগুলো থাকতে হবে ৪০.৭৫ ডিগ্রি কোণে, এবং গার্ডল-এর সঙ্গে ক্রাউন-এর মূল ফেসেটগুলো থাকতে হবে ৩৪.৫ ডিগ্রি কোণে। এসব মানলে হিরের ডেপথ পার্সেপশন বাড়ে, সঙ্গে বাড়ে ক্রাউন-এ প্রতিসৃত হওয়া আলো প্যাভিলিয়ন থেকে প্রতিফলিত হওয়ার মাত্রা, অর্থাৎ ঔজ্জ্বল্য। আর তাতেই বোঝা যায় হিরের কাট।”
সংখ্যাগুলোর ধাক্কায় আমার শ্রোতাদের চোখগুলো আউট-অফ-ফোকাস হয়ে গেছে দেখে আমি ওঠার উপক্রম করছিলাম, কিন্তু মেয়ে ছাড়ল না। এবার সে তারস্বরে প্রশ্ন করল, “কিন্তু বাবা, সলোমনের হিরের খনি কোথায় ছিল?”
আমার হেদিয়ে পড়া অবস্থা দেখে বোধহয় বাকিদের কিঞ্চিৎ মায়াদয়া জাগল, তাই খুব তাড়াতাড়ি আরো এক কাপ চা, চানাচুর, মুড়িমাখাঃ এসব সুখাদ্য পাওয়া গেল। শক্তির সঞ্চার হওয়ায় আমি এবার যে প্রশ্ন দিয়ে এত কথার শুরু সেই জায়গাতেই ফিরে গেলাম।
“বাইবেলে রাজা সলোমনকে যেমন বুদ্ধিমান, তেমনই ধনী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু সেই সময়ে সারা পৃথিবীতেই হিরে যেত ভারত থেকে। আমার নিজের ধারণা, যদি সলোমনের অন্য সম্পদের মধ্যে অনেক হিরে থেকে থাকে, তবে সেগুলো তিনি পেয়েছিলেন তাঁর রানি শেবার কাছ থেকে বিয়ের সময় উপহার হিসেবে, কারণ একাধিক সূত্র বলছে যে শেবা ভারতের, বা আরো সঠিক ভাবে বলতে গেলে মালাবার উপকূল তথা আধুনিক কেরালার রাজবংশের মেয়ে ছিলেন”।
“তাহলে ওই বইটা…” আমার বউ কথা শেষ না করলেও আমি প্রশ্নটা বুঝতে পারি। এবার আর চা ঠান্ডা হতে না দিয়ে, ডান হাতের যাবতীয় কাজ মিটিয়ে, তারপর প্রায় ছটফট করতে থাকা শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে আমি শুরু করি প্রায় ১৩০ বছর আগে লেখা, অথচ আজও সারা পৃথিবীকে মাতিয়ে রাখা এক গল্পের গল্প।
“মাত্র ১৯ বছর বয়সে অ্যাংলো-জুলু যুদ্ধ, এবং প্রথম বোয়র যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সুবাদে ডার্ক কন্টিনেন্ট হিসেবে পরিচিত আফ্রিকার গভীরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল রাইডার হ্যাগার্ডের। ঊনবিংশ শতকের একের পর এক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার হয়ে ইতিহাসের ছবিটাই পালটে যাচ্ছিল, যাদের মধ্যে প্রধানতম ছিল মিশরের ‘ভ্যালি অফ দ্য কিংস’ এবং আসিরিয়ার সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ। আফ্রিকার গভীরের তেমন কোনো আবিষ্কার তখনও সেভাবে লোকের নজরে না এলেও গ্রেট জিম্বাবোয়ে অঞ্চলে গহন অরণ্যের মধ্যে পরিত্যক্ত ও ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর হ্যাগার্ড নিজেই দেখেছিলেন। তাই, অনাবিষ্কৃত এক সভ্যতার গল্প পাঠকের কাছে তুলে ধরার পরিকল্পনাটা তাঁর ছিলই।
“এরপর, স্রেফ ঘটনাচক্রে ১৮৮৫-তে হ্যাগার্ড তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে মোটে পাঁচ শিলিং-এর একটা বাজি ধরেন, যে তিনিও রবার্ট লুই স্টিভেনসন-এর সুপারহিট কাহিনি “ট্রেজার আইল্যান্ড”-এর মতো একটা লেখা পেশ করতে পারবেন। এক স্কটিশ এক্সপ্লোরার জেমস থমসন-এর লেখা থেকে তথ্য নিয়ে, এবং বিখ্যাত ব্রিটিশ হোয়াইট হান্টার ফ্রেডরিক কোর্টনি সেলাস-এর আদলে অ্যালান কোয়াটারমেন নামের অবিস্মরণীয় একটি রক্তমাংসের চরিত্র সৃষ্টি করে ওই বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে হ্যাগার্ড বইটা লিখে ফেলেন। কিন্তু তারপরেই তাঁকে এক বিচিত্র সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেহেতু আফ্রিকার পটভূমিতে ইংরেজিতে লেখা ওটিই ছিল প্রথম অ্যাডভেঞ্চার নভেল, তাই একের পর এক প্রকাশক হ্যাগার্ডকে ফিরিয়ে দেন। শেষ অবধি, ১৮৮৫-র সেপ্টেম্বরে বইটা বেরোয়, এবং নজিরবিহীন-রকম বেস্টসেলার হয়।
শুধু অ্যাডভেঞ্চার নভেল লেখার জন্য নয়, এই উপন্যাসের মাধ্যমে হ্যাগার্ড অন্তত আরো দুটো বিষয়ে পথিকৃত হয়ে আছেন।
প্রথমত, সেই ঘোর সাম্রাজ্যবাদী এবং রীতিমতো বর্ণবিদ্বেষ-শাসিত যুগেও হ্যাগার্ড তাঁর লেখায় কালো চামড়ার মানুষদের যে পরিমাণ সম্মান দিয়েছেন, এবং যেভাবে সাদা ও কালো মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধামিশ্রিত বন্ধুত্ব এবং আত্মত্যাগ দেখিয়েছেন, তা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, ফিকশন-এর ক্ষেত্রে “লস্ট রেস/ওয়ার্ল্ড” নামক একটা জঁর তৈরি হয়েছিল এই উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পরেই। এই ঘরানায় এরপর একে-একে প্রকাশিত হয় ১৮৮৮-তে রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর ‘দ্য ম্যান হু উড বি কিং’, ১৯১২-তে আর্থার কোনান ডয়েল-এর ‘দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড’, ১৯১৮-য় এডগার রাইস বারোজ-এর ‘দ্য ল্যান্ড দ্যাট টাইম ফরগট’, এবং ১৯৩৬-এ এইচ.পি. লাভক্র্যাফট-এর ‘অ্যাট দ্য মাউন্টেইনস অফ ম্যাডনেস’।
কিন্তু, হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের সন্ধানে স্যার হেনরি, ক্যাপ্টেন গুড, অ্যালান কোয়াটারমেন-এর মরুভূমি আর পাহাড় পেরিয়ে এক অজ্ঞাত জায়গায় পৌঁছনো, সেখানে এক শয়তান রাজা ও তার বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে ন্যায়সংগত রাজার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা, বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে অতুল সম্পদ ফেলে কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসার এই কাহিনি স্রেফ গল্প। ঠিক যেমন, ‘চাঁদের পাহাড়’ স্রেফ গল্প”।
ঘরের ভেতরে আবহাওয়াটা যে থমথমে হয়ে উঠেছে, এটা আমি কথা শেষ করার পর ইলাস্টিকের মতো লম্বা হতে থাকা নৈঃশব্দ্য থেকে বুঝতে পারছিলাম। তাই, আর চা পাওয়া যাবে না একথা জেনেও, আমি নিজে থেকেই কথা শুরু করি।
“কোয়াটারমেন-এর বর্ণনা অনুযায়ী কুকুয়ানাল্যান্ড, মানে যেখানে আমাদের হিরোরা সাংঘাতিক বিপদ এবং অতুল সম্পদ, দুয়েরই সাক্ষাৎ পেয়েছিল, সেটা আজকের ডেমক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কংগো”-র একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে। ঠিক ওখানে না হলেও, এবং রাজা সলোমনের খনির কথা উল্লেখ করেও ব্যাপারটাকে অনেক বেশি মজবুত তথ্য এবং ক্রূর বাস্তবের ওপর দাঁড় করিয়ে মাইকেল ক্রিকটন ১৯৮০ সালে লেখেন এক রুদ্ধশ্বাস টেকনো-থ্রিলারঃ ‘কংগো’। কিন্তু এই উপন্যাসের মাধ্যমে ক্রিকটন, অনেক অ্যাডভেঞ্চার, অনেক তথ্যের পাশাপাশি আমাদের চোখের সামনে এমন এক জগতের ছবি তুলে ধরেন যা সলোমনের হিরের খনির চেয়েও অনেক-অনেক বেশি মূল্যবান।
“মোট জলবহনের দিক দিয়ে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান দখল করে আছে কংগো নদী। প্রায় ৩৭ লক্ষ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এর অববাহিকায় রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেইন-ফরেস্ট, যার আয়তন প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লক্ষ হেক্টর। ডেমক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কংগো, রিপাবলিক অফ কংগো, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, ক্যামেরুন, গ্যাবন, এবং ইকুয়েটরিয়াল গিনিঃ এই ছ’টা দেশের মধ্যে ছড়িয়ে এই নদীর অববাহিকা এবং এই চিরসবুজ অরণ্য।
এই জঙ্গলে আছে ১০০০-এরও বেশি রকমের উদ্ভিদ, এবং প্রায় ১০,০০০ প্রাণী প্রজাতি। তাছাড়া, প্রায় ৩৯০০ কোটি টন কার্বন নিজের গাছেদের মধ্যে ধরে রেখে এই জঙ্গল সারা পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে তো কাজ করছে।

কিন্তু এই ফুসফুস-ও কাঠ কাটার জন্যে, চোরাশিকারিদের আক্রমণে, ফসলের আওতায় আরো জমি আনার জন্যে, সর্বোপরি এই এলাকার বাসিন্দা প্রায় ৬ কোটি মানুষের চাহিদা মেটাতে গিয়ে একটু-একটু করে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তার ফলে ইতিমধ্যেই লুপ্তপ্রায় বলে ঘোষিত হয়েছে এই জঙ্গলের বেশ কিছু বাসিন্দা, যাদের বাদ দিয়ে আমরা জীবজগত-কে ভাবতেই পারিনা। এদের মধ্যে আছেঃ
রাজা সলোমনের সম্পদের কথা জেনে লোভ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ যতদিন না সলোমনের মতো বুদ্ধি আর ন্যায়বিচারের মাপকাঠিতে প্রকৃতি আর পরিবেশকে দেখবে, ততদিন বিশ্বাসঘাতক গাগুলের মতো করে আমরাই আমাদের বন্দি করে রেখে দেব সেই গুহার ভেতরে, যেখানে সম্পদ আছে অনেক, কিন্তু নেই জল, বাতাস, আর মুক্তি।
তাই, সলোমনের খনির চেয়েও বেশি সম্পদের আকর এই পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখলে সে আমাদের যা দেবে, তার দাম…”
“কোহিনুরের চেয়েও বেশি”, সমস্বরে বলে উঠল শনিচক্র!
জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর
বাহ! বেশ ! তথ্যগুলো দুর্দান্ত ভাবে মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন
অসংখ্য ধন্যবাদ।
হীরকের মতই দ্যুতিময় !
হীরকের মতই দ্যুতিময় !
‘অসাধারণ’ খুব ছোট করে বললে।