বৈজ্ঞানিকের দপ্তর রান্নাবান্না অরূপ ব্যানার্জি শীত ২০১৬

bigganrannabannaআমাদের সবারই খেতে খুব ভাল লাগে, একথা নতুন করে বলে দিতে হবে না। আর মায়ের হাতের রান্না? আহা, ভাবতেই জিভে জল এসে যায়। প্রতি রবিবার বা ছুটির দিনে মনে হয়, আঃ আজ যদি বাবা বাজার থেকে একটু মাংস কিনে আনে! তারপর মাংস রান্নার সুবাস বাড়ি ময় দৌড়াদৌড়ি করে আমাদের খিদে আরও চাগিয়ে দেয়।

কিন্তু এই সুস্বাদু রান্নার পিছনে কিন্তু আছে বিজ্ঞান। আচ্ছা, তোমাদের মধ্যে অনেকেই আছে যাদের রসায়ন, মানে কেমিস্ট্রি পড়তে ভাল লাগে না। সত্যি বলতে কি, আমারও ভাল লাগত না। কী সব জটিল সমীকরণ, আর কমপাউন্ডগুলোর নাম মনে রাখা যেন বিভীষিকা। রসায়নের বিজ্ঞানীরা এসব শুনলে রাগ করবে কিন্তু! তাদের আবার বলে দিও না। তার চাইতে আমরা বরং রান্নার পিছনে লুকিয়ে থাকা রসায়নের কেরামতিটা একটু বোঝার চেষ্টা করে দেখি। পড়াশুনো, লেখাপড়া আর ইন্টারনেটের পর সময় বাঁচিয়ে রান্নাঘরে একটু উঁকি দিয়ে দেখলে অনেক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা হবে।

আলু সিদ্ধ হতে যত সময় লাগে, মাংস সিদ্ধ হতে তার চাইতে অনেক বেশি সময় লাগে। মুরগির মাংস রান্না হয়ে যায় তাড়াতাড়ি, কিন্তু পাঁঠার মাংস রান্না করতে প্রেশার কুকার লাগে, নইলে রান্না হতে বিকেল গড়িয়ে যাবে। আসলে সব রান্নাই এক একটি আলাদা আলাদা রাসায়নিক বিক্রিয়া। তাই রান্নার জন্য চাই উপযুক্ত তাপ, সময় ও অনুঘটক। প্রত্যেক রাসায়নিক বিক্রিয়া যেহেতু উপাদানের উপস্থিতির উপর নির্ভরশীল, তাই তাপ এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাপ বেশি হলে যে বিক্রিয়া আমরা চাইছি, মানে যে রান্নাটা করতে চাইছি, সেটা না হয়ে, পুড়ে যাবার সম্ভাবনাও থাকে। আর পোড়া রান্না কারই বা কবে খেতে ভাল লাগে! পাঁঠার মাংস রাঁধতে প্রেশার কুকার লাগে কেন, এটাও নিশ্চই অনেক সময় তোমরা ভেবেছ? প্রেশার কুকারে কিছুটা জল বাষ্প হয়ে যায়, এই বাষ্প কুকারের ভিতরে চাপ বাড়ায়। এটা অনেকেরই জানা আছে, একটি জায়গায় বদ্ধ অবস্থায়, মানে যখন তার আয়তন বাড়ে না, তখন চাপ বাড়ালে তাপমাত্রাও বেড়ে যায়। তাই খোলা পাত্রে জল ফুটলে যেমন ১০০ ডিগ্রির বেশি তাপ বাড়ানো যায় না, সেখানে প্রেশার কুকারে তাপমাত্রা প্রায় ৩০০-৩৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রার সৃষ্টি হয়। তাপ বাড়লে রাসায়নিক বিক্রিয়া হতে সময় কম লাগে। কাজেই কুকারের মাংস রান্না হতে দেরী হয় না।

তোমাদের যদি জিজ্ঞেস করি, রান্নার সময় মশলা দেওয়া হয় কেন? উত্তর দেবে, খেতে ভাল লাগে। আসলে রান্নায় মশলা অনুঘটকের কাজ করে। ক্যাটালিস্টকে বাংলায় অনুঘটক বলে জান বোধহয়! অনুঘটকের কাজ হচ্ছে, রাসায়নিক বিক্রিয়াকে ঘটতে সাহায্য করা। ফলে রান্না তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। রান্নায় মায়েরা যখন নুন দিতে ভুলে যান, তখন দেখবে রান্না হতে সময় লাগে। নুন যেমন আমাদের স্বাদ বাড়ায়, তেমনি আবার অনুঘটকের কাজ করে। মশলায় আছে অনেক জৈবিক পদার্থ, মানে অরগানিক কমপাউন্ড। রান্নার তেলের সাথে মশলা ফেলে সাঁতলালে জৈবিক পদার্থ গুলো বাইরে বেরিয়ে এসে বিক্রিয়া ঘটাতে থাকে। এই মশলাতে আছে আবার বিভিন্ন এস্টার, যা খাবারে স্বাদ আর গন্ধ এনে দেয়।

আজ এটুকুই থাক। বেশি রাসায়ন একসাথে শিখে ফেললে আবার আমাদের মাথায় বিক্রিয়া শুরু হয়ে যেতে পারে। শুধু মনে রেখ, মায়েরা ও বাবারাও কেউ কেউ, বিজ্ঞান না জেনেও কি সব অসাধারণ রান্না করেন! সময় হলে আজ থেকেই আর দে্রি না করে মায়ের পাশে একটু রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে দেখই না, কমপিউটার গেমের থেকে কম আশ্চর্যজনক নয়!

 বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

 

 

Leave a Reply