সম্পাদকীয় জয়ঢাকি বোল শীত ২০১৬

bol59অনেক দিন আগে, ইশকুলের শেষ পরীক্ষাটা হত হেমন্তের শেষে। ভাইফোঁটা যেই কাটত অমনি দুঃখের আর অন্ত নেই। সব মজা, সব ফূর্তি বন্ধ। কেবল পড়া আর রিভিশান, রিভিশান আর পড়া।

তারপর অংক বাংলা ভূগোলের সব পরীক্ষার পাট যেদিন চুকত, সেদিন পরীক্ষার ঘর থেকে বের হয়ে এসে দেখতাম আকাশ টুকটুকে নীল, বাতাসে শীতের গন্ধ। তখন আমাদের রুটিন হত এইরকমঃ

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে উঠুনে বেরিয়ে এসে একটুখানি আগুন জ্বালানো। তাকে ঘিরে বসে আলু পোড়াত্তে দেয়া হবে। আলু সেদ্ধ হতেহতে রাস্তা দিয়ে একটা লোক কাঁধে দুখানা মাটির কলসি বাঁকে ঝুলিয়ে হাজির। তাতে খেজুরের রস আছে। তাকে ডেকে এনে বসানো হত উঠোনে আগুনের ধারে। তারপর আলুপোড়া আর গ্লাসে গ্লাসে হালকা লালচে রঙের খেজুরের রস। যে খায়নি সে ওর মজা কোনদিন লেখা পড়ে বুঝতেই পারবে না।

বড়িতে আবার কলসি কলসি সেই রস কিনে এনে উনুনে তাকে ঘন করে খেজুরের গুড় তৈরি করে রাখা হত। রোদ উঠলে রুটি, কিংবা চিতুই পিঠে (চালের গুঁড়ো ছাঁচে ফেলে ইডলির মতন পিঠে) দিয়ে সেই গুড় মাখিয়ে খেয়েদেয়ে রওনা হতাম মাঠে। সঙ্গে আছে ক্রিকেট ব্যাট, বল উইকেট। কখনো পেয়ারা কাঠ কেটে বানানো ডান্ডাগুলি। মাঠে খেলা চলত, মাঠের বাইরে কারো রেডিওতে চলত দেশে বা বিদেশে কোথাও চলতে থাকা টেস্ট ক্রিকেটের ধারাবিবরণী।সুনীল গাভাস্কার ছক্কা হাঁকালে, কিংবা বিষেণ বেদি বা চন্দ্রশেখরের বলে কোন লালমুখো সাহেবের উইকেট ছিটকে গেলে খেলাটেলা ফেলে আমরা সবাই সে কী হুল্লোড়!

দুপুরে বাড়িতে এসে ফুলকপি দিয়ে মাছের ঝোল, বিট গাজরর স্যালাড, টোমাটোর চাটনি খেয়ে রোদ পোহাতে বসে গল্প শোনা হত। এমনকি বেজায় রাগী মা বা কাকামনিও দারুণ সব গল্প বলে ফেলত সে সময়। তারপর যেই না সূর্য পশ্চিমে ঝুঁকল, আমরাও ফের মাঠে, ব্রতচারীর আসরে। নীল প্যান্ট আর সাদা জামার ইউনিফর্মে সেজে কতরকমের খেলা হত সে বলবার নয়। সে সব খেলা শেষ হলে তারপর খানিক যুদ্ধ যুদ্ধ , গোল্লাছুট বা কাবাডি খেলা। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে আসছে। বুধবার হলে রেডিওতে যাত্রা শুরু হয়ে যেত তখন। পাড়ার যেসব বাড়িতে চাষবাসের চল ছিল তাদের বাড়ির উঠুনে তখন ডাঁই করে এনে ফেলা হয়েছে সোনালী রঙের ধান। একপাশে ধানের শীষওয়ালা খড় আর অন্যপাশে তার ধান ছাড়িয়ে নেবার পর জমিয়ে রাখা বিচুলির স্তূপ। তাতে কী সুন্দর রোদের গন্ধ। তাদের ফাঁকে ফাঁকে লুকোচুরি খেলার ধুম লাগত। আকাশে তখন ঠান্ডা আর রুপোলি চাঁদ ভেসে চলত নিজের মনে।

তারপর, অনেক রাতে, খাওয়াদাওয়া সেরে বেজায় শীতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে লেপের তলায় ঢুকে ছোট্টো রেডিও চালিয়ে দিতেই ভেসে আসত মন ভালো করে দেয়া দারুণ দারুণ সব নাটক—নেফা সুন্দরী নেফা, রাজগৃহে রাজা নেই, চাঁদের সাম্পান, এমন কত সব বিচিত্র তাদের নাম!

সেই শুনতে শুনতে যখন আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম, তখনও খেলা থামত না আমাদের। স্বপ্নের মধ্যে ফের শুরু হত সবুজ মাঠের ক্রিকেট কিংবা ধানের স্তূপের মধ্যে লুকোচুরির পালা। সে খেলার শেষ নেই—

ভালো থেকো শীতের দিনে। তোমাদের শীতকালটা কেমন তাই লিখে পাঠিও জয়ঢাকের দপ্তরে। আমরা তা ছাপব।

ভালোবাসায় ,

তোমাদের জয়ঢাকি দাদারা

Leave a Reply