সেই মেয়েরা-রানি গৈডিনলিউ উমা ভট্টাচার্য শীত ২০১৬

সেই মেয়েরা সব পর্ব একত্রে

seimeyera01ভারতের স্বাধীনতার জন্য যেমন অগণিত নারীপুরুষ প্রাণ আহুতি দিয়েছেন তেমনি অগণিত নারীপুরুষ জীবনের অনেকটাই কাটিয়েছেন কারাগারের অন্তরালে।তবু তাঁদের অভীষ্ট সাধনে লড়াই করে যাওয়া থেকে কেউ নিবৃত্ত করতে পারেনি। ভারতের পার্বত্য অঞ্চলের মেয়েরাও যে স্বাধীন ভারতেও শাসক বিরোধী নানা নৈতিক লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই তার প্রমাণ যেমন এই সময়ের  উত্তর-পুর্ব ভারতের মেয়ে ইলম শর্মিলা চানু তেমনই ছিলেন পরাধীন ভারতে এক নাগা পর্বতকন্যা রানি গৈডিনলিউ। সতের বছর বয়স থেকে তিনি প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু করেছিলেন নাগা উপজাতির ধর্ম ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রকে আগ্রাসী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের সমর্থনপুষ্ট খ্রিস্টান মিশনারিদের হাত থেকে বাঁচাতে। সেই আন্দোলন এক সময় পরিণত হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আন্দোলনে।স্বাধীন ভারতেও তিনি স্বধর্মে  বিশ্বাসী নাগাদের স্বার্থরক্ষার আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন প্রায় তাঁর পঁচাত্তর বছর বয়স পর্যন্ত।

ইন্দো-মঙ্গোলয়েড গোষ্ঠীর বিশাল নাগা উপজাতির মধ্যে ছিল অনেক শাখা-উপশাখা। আও, সেমা, আঙ্গামি, জেলিয়ান, রেংমা প্রভৃতি নানা উপশাখার প্রত্যেকেই কিছু বিষয়ে স্বতন্ত্র,তাদের অনেকের ভাষাও ছিল স্বতন্ত্র। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মধ্যে বিরোধও ছিল নানারকম। এই জাতিবিরোধকে কাজে লাগিয়েছিলেন পরাধীন ভারতের খ্রিস্টান মিশনারিরা। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলে তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে নাগা উপজাতির বিভিন্ন শাখার অগণিত মানুষকে তাঁরা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে লাগলেন। ক্রমে নাগা উপজাতির বিভিন্ন শাখাকে ঐক্যবদ্ধ করে খ্রিস্টান মিশনারীদের ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে  যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল মনিপুরে তার নাম ছিল ‘হেরাকা’আন্দোলন।

নাগাদের মাতৃভূমিতে সেই আন্দোলনের উদ্যোক্তা ছিলেন গৈডিনলিউয়ের এক জ্ঞাতিদাদা হাইপো যাদোনাঙ। বাড়ি ছিল ব্রিটিশ ভারতের মনিপুরের কামবিরোন পাহাড় অঞ্চলের পুইনান গ্রামে। খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মূর্ত প্রতিবাদ ছিলেন তিনি। প্রাচীন ‘হেরাকা’ধর্ম, যার আক্ষরিক অর্থ ‘পবিত্র’, তাকে বাঁচানোর জন্য অসংখ্য উপশাখায় বিভক্ত নাগাদের মধ্যে ঐক্য আনতে চেষ্টা করেছিলেন যাদোদঙ। সমমানসিকতার জেমি, রোংমি আর লিয়াংমি উপশাখার নাগাদের সংঘবদ্ধ করে এক শক্তিশালী নাগাসংঘ গঠন করে নাম দিয়েছিলেন ‘জেলিয়ানগ্রঙ’। জেলিয়ানগ্রঙদের নিয়েই শুরু করেছিলেন ইংরেজ মিশনারী আর  তাঁদের মদতদাতা অত্যাচারী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে হেরাকা বা জেলিয়ানগ্রঙ আন্দোলন। ১৯২৭ সালে শুরু এই আন্দোলনের তীব্রতায় নাস্তানাবুদ হয়ে যাচ্ছিল মিশনারি আর ব্রিটিশ শাসকেরা।

গরীব ঘরের মেয়ে গৈডিনলিউ,পড়াশুনা বিশেষ না করতে পারলেও এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে বিদেশীরা তাঁদের স্বাধীন দেশ দখল করেছে আবার তাদের ধর্মাচরণেরর ক্ষেত্রেও অনুপ্রবেশ করছে। তাই দশ বছর বয়স থেকেই তিনি আত্মীয় দাদা যাদোদঙের শুরু করা ‘হেরাকা’নামক ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন।

ব্রিটিশ পুলিশের হাতে বন্দি হবার পর দাদা যাদোদঙের ফাঁসি হয় ১৯৩১ সালে। এবারে  সেই আন্দোলনের হাল ধরলেন সতের বছরের মেয়ে গৈডিনলিউ। নাগা ধর্মীয় ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা পরবর্তীকালে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছিল। গৈডিনলিউয়ের নেতৃত্বে এই আন্দোলন এত তীব্র হয়ে ওঠে যে ব্রিটিশরাজ এই আন্দোলনের নাম দিয়েছিলেন ‘নাগা-রাজ আন্দোলন’।

মিশনারিদের হাত থেকে নাগাদের আচরিত সশস্ত্র রাজশক্তির সঙ্গে পাল্লা দেবার জন্য চাই সমতুল্য অস্ত্রশস্ত্র। অন্যায় পথেই আসাম, কাছাড় প্রভৃতি অঞ্চল থেকে শতাধিক বন্দুক সংগ্রহ করে তুলে দেওয়া হল আন্দোলনকারীদের হাতে। প্রথম আওয়াজ উঠেছিল ব্রিটিশ শাসকদের চাপানো নানা অন্যায় করব্যবস্থা, জুলুমবাজি, বেগার খাটানোর বিরুদ্ধে। আদিম জনজাতির এই স্বাধীন মানুষরা অত্যাচারিত হতে হতে এবার মারমুখী হয়ে উঠল। মনিপুরের পশ্চিম অঞ্চল ছাড়িয়ে ক্রমে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল সারা নাগা পাহাড় থেকে আসামের কাছাড় অঞ্চলের শোষিত মানুষের মধ্যেও। যাদোদঙের ফাঁসির পর আন্দোলনের রাশ তুলে নিয়ে গৈডিনলিউ পরিবার ছাড়লেন। জঙ্গল আর পাহাড়ের গুহা হল তাঁর আস্তানা। কোথাও বেশিদিন থাকতেন না। গোপন আস্তানা থেকে নির্দেশ দিয়ে আন্দোলনকে তীব্রতর করতেন। আন্দোলনকারী নাগারা ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বারবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। ১৯৩২ সালের  ১৬ই ফেব্রুয়ারিতে নর্থ কাছাড় হিলের সংঘর্ষ, আর ১৮ই মার্চের হানগ্রাম গ্রামের সংঘর্ষ অন্যতম।

 তাঁর, জ়েদ, সাহস আর কৌশল দেখে অ-খ্রিস্টান নাগারা, যারা তাঁর সমর্থক ছিল তারা তাঁকে তাদের আরাধ্যা দেবীর অবতার  ভাবতে শুরু করল। তাঁর দলের সদস্যরা প্রাণ দিয়ে তাঁকে সংগোপনে রক্ষা করত। বাঘা বাঘা ব্রিটিশ সামরিক অফিসাররা তাঁর চোরাগোপ্তা আক্রমণে নাস্তানাবুদ হতে লাগলেন। তাঁর আক্রমণের কৌশল  সর্বত্র এক ছিল না। তাঁকে ধরবার সমস্ত কৌশল ব্যর্থ করে তিনি বিভিন্ন অবস্থান থেকে বিদ্রোহ পরিচালনা করতে লাগলেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করার সামরিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়াতে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মৃত অথবা জীবিত ধরে দেবার জন্য আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করলেন। আরও ঘোষণা করা হয়েছিল যে গ্রাম তাঁর গতিবিধির খবর জানাতে পারবে সেই  গ্রামকে দশ বছরের জন্য খাজনা মকুব করে দেওয়া হবে।

এদিকে নেত্রীকে তাঁর অনুগামীরা তখন মাঝেমাঝেই এক ডেরা থেকে আর এক ডেরায় নিরাপদে সরিয়ে দিচ্ছে। তবু শেষরক্ষা হল না। অক্টোবর  মাসে গৈডিনলিউ এলেন পুলোমি গ্রামে। এইসময় গোপন সূত্রে তাঁর অবস্থানের খবর পাওয়া গেল। গোয়েন্দা খবরের ভিত্তিতে, বর্তমান নাগাল্যান্ডের পইলমা বা পুলোমি গ্রামের ঘন অরণ্যের মধ্যে নির্মীয়মাণ এক কাঠের দুর্গবাড়ি থেকে, ১৯৩২ সালের ১৭ই অক্টোবর তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল ব্রিটিশ পুলিশ। শাসকদল এতটাই ভয় পেত তাঁকে যে দুর্ধর্ষ এই নাগাকন্যাকে গ্রেপ্তার করার জন্য আসামের তৎকালীন রাজ্যপাল আসাম রাইফেলস-এর  তৃতীয় ও চতুর্থ ব্যাটেলিয়ানের সেনাদের নিয়োগ করেছিলেন। বাহিনীর  দায়িত্বে ছিলেন নাগা  হিলের ডেপুটি কমিশনার জে পি মিল।

নিরস্ত্র অবস্থায় গ্রেপ্তার হবার সময় তিনি পুলিশ অফিসার ক্যাপ্টেন  ম্যাকডোনাল্ডের হাত কামড়ে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছিলেন, যা নিয়ে তাঁকে অনেকদিন ভুগতে হয়েছিল বলে জানা গেছে। তাঁর এই নৃশংস  আচরণের জন্য তাঁকে যথেচ্ছ অত্যাচার করা হয়েছিল। অপমান করার জন্য আর  বিদ্রোহীদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য নেত্রীকে হাতকড়া পরিয়ে, শেকল দিয়ে বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘোরানো হয়েছিল। কোহিমার রাজপথে তাঁর অনুগামীদের মধ্যে যারা ধরা পড়েছিল তাদের সঙ্গে নেত্রীকেও প্রকাশ্যে অত্যাচার করতে করতে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ।

বিদ্রোহীদের ওপর সেদিন যে নৃশংস অত্যাচার করেছিল পুলিশ  তাঁর স্মৃতি আজও অনেক নাগা পরিবারের মনে দগ্‌দগে ক্ষতের মত জেগে আছে। ব্রিটিশ সরকারের চোখে তিনি এতটাই ভয়ঙ্কর ছিলেন যে,তাঁকে বেশিদিন এক জেলে রাখবার ঝুঁকি  নিতেন না তাঁরা। মহিলা বলে তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়নি, দীর্ঘ দশ মাসের বিচারের পর তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল।

১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ বছরের কারাজীবনে তাঁকে রাখা হয়েছিল গুয়াহাটি, তুরা, আইজল, শিলং প্রভৃতি  বিভিন্ন জেলে। আন্দোলন কিন্তু স্তব্ধ হয়নি। তাঁর গ্রেপ্তারের পরই ডিসেম্বর মাসে  লেং গ্রাম আর বপুঙইয়েমি গ্রামবাসী তাঁর অনুগামীরা ইংরেজের গোপন সংবাদদাতা সন্দেহে(নেত্রীর গ্রেপ্তারের কারণ)নাগা হিলস্‌-এর  ‘লেক্‌মা পরিদর্শক বাংলোর’ কুকি চৌকিদারকে হত্যা করেছিল। বিদ্রোহীরা বিদেশী সরকারকে কর দেয়া বন্ধ করেছিল। যদিও ১৯৩৩ সালে, তাঁর দুই শক্তিশালী অনুগামী ‘দিকেও’ এবং ‘রামজো’ গ্রেপ্তার হওয়াতে আন্দোলন খানিকটা স্তিমিত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু বন্ধ হয়নি।

গৈডিনলিউ-এর অনুগামী বিদ্রোহী, আন্দোলনকারী নাগাদের দাবিয়ে রাখার জন্য  ‘ডিভাইড এণ্ড রুল’ নীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন ব্রিটিশ সরকার। শাসক তোষণকারী, সুবিধাবাদী কিছু মানুষ সব সময় সব দেশেই থাকে। সেখানেও ছিল। মিশনারীদের মাধ্যমে সুবিধাপ্রাপ্ত, ধর্মান্তরিত ব্যাপটিস্ট খ্রিস্টান নাগাদের নিয়ে, ব্রিটিশ কূটনীতিজ্ঞ শাসকদের প্রচ্ছন্ন মদতে ধীরে ধীরে নাগাদের মাতৃভুমিতে তৈরি হয়েছিল ‘নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল’। দুই দলের মধ্যে নিত্য সংঘর্ষ ক্রমে জাতিবৈরী গৃহযুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ভারত স্বাধীন হবার আগে ভারতে ১৯৪৬ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর পণ্ডিত নেহেরুর  নির্দেশে তুরা জেল থেকে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল ১৯৪৭ সালে।  

এই অগ্নিকন্যার কথা আগেই শুনেছিলেন নেহেরু। তিনি ১৯৩৭ সালে যখন অসম সফরে গিয়েছিলেন তখন শিলং জেলে গৈডিনলিউ-এর সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তাঁর  মুক্তির জন্য চেষ্টা করবেন বলে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। দিল্লী ফিরে সে চেষ্টাও করেছিলেন বিলেতে দরবার করে,কিন্তু ভীত শাসকদল ভয়ঙ্করী এই মানবীকে মুক্তি দিতে অপারগ তা নেহেরুজিকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের মতে নাগা বিদ্রোহ তখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, এ অবস্থায় জঙ্গী নেত্রীকে ছাড়া হলে আবার অশান্তির সৃষ্টি হবে। পণ্ডিত নেহেরু সাহসী, নির্লোভ, অদম্য মনোভাবের এই জেদি নেত্রীর চারিত্রিক আভিজাত্য, সংকল্পের দৃঢ়তা আর নেতৃত্বের ক্ষমতা দেখে তাঁকে পাহাড়ের ‘রানি’ আখ্যায় ভূষিত  করেন। নেহেরুজি তাঁকে ঝাঁসির রানির তুল্য সাহসী আর দেশপ্রেমীই মনে করতেন। এই খবরটি গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছিল হিন্দুস্থান টাইমস্‌ পত্রিকায়। সেই থেকেই তাঁর পরিচিতি হয়েছিল ‘রানি গৈডিনলিউ’ বলে।

স্বাধীন ভারতে তিনি মুক্ত হলেও মনিপুরের তামেলং জেলায় নিজের গ্রাম  লোংকাও-য়ে ফিরে যাওয়ার অনুমতি পাননি। তখন সেখানে গেলে তিনি হয়ত তিনি আর স্থির থাকতে পারতেন না। কারণ সে সময় ভ্রাতৃঘাতী গৃহযুদ্ধ চলছিল অবিভক্ত আসাম, নাগাল্যান্ড, মনিপুর জুড়ে। সে যুদ্ধ স্বাধীন ভারতেও অনেকদিন চলেছিল। সরকারী মদতপুষ্ট ‘নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল’এর সদস্যদের হাতে ‘হেরাকা’ আন্দোলনের পক্ষের জেলিয়াঙগ্রঙ গোষ্ঠীর নাগারা চরম অত্যাচারিত হচ্ছিল। তারা চরম কষ্ট,দুর্দশা আর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল।

গ্রামে ফিরতে না পেরে প্রায় নির্বাসিত অবস্থায় দূরে নাগা পাহাড়ের  মোক্‌কচুং এলাকায় রানি দীর্ঘ তেরটি বছর কাটালেন রাজনীতি থেকে দূরে প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায়। ১৯৫৩ সালে নিজের গ্রামে ফেরার অনুমতি পেলেন। মিলিত হলেন বৃদ্ধ বাবা লোথোনাঙ পেমেই, মা কাখাক্লেনলিউ আর চার ভাইবোনের সঙ্গে। ততদিনে পরিবারের পঞ্চম সন্তান গৈডিনলিউ হয়ে গেছেন রানি গৈডিনলিউ। নাগাদের প্রকৃতিপূজার ঐতিহ্য রক্ষার জন্য হেরাকা ধর্ম আন্দোলনের নেত্রী কখন হয়ে গেছেন নাগাদের আঞ্চলিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও অংশীদার। নিজ জাতির মানুষের উন্নয়নের আর স্বাধীনতার সঙ্গে মুক্ত ভারতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। ব্রিটিশ ভারতের ‘মনিপুরের প্রথম মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী’  হয়ে গেছেন তিনি। দেশকে বাদ দিয়ে জাতির অস্তিত্ব হয় না জানতেন তাই শেষ দিকে তাঁর সংগ্রাম হয়ে উঠেছিল এক অখন্ড মুক্ত ভারতের জন্য সংগ্রাম।।  

 গ্রামে ফেরার পর নিজের জাতির সব মানুষদের উন্নয়নের জন্য কাজ শুরু   করলেন। এবার তাঁর আন্দোলন ছিল প্রধানত খ্রিস্টান মিশনারি প্রভাবিত খ্রিস্টান নাগা কমিউনিটির সদস্যদের আক্রমণের হাত থেকে হেরাকা গোষ্ঠী্র মানুষদের রক্ষা করার প্রতিরোধ আন্দোলন। দুই নাগাগোষ্ঠীর বিবাদ আবার চরমে উঠলো ১৯৬০ সালে। নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিলের নাগাল থেকে তাঁকে রক্ষা করার জন্য রানির অনুগামীরা তাঁকে গোপন স্থানে সরিয়ে দিল। বরাক নদীর  ধারে এক পাহাড়ে মগুলং  নামে এক গুহায় অন্তরীণ থেকে তিনি আন্দোলন পরিচালনা করতে লাগলেন। এই সময়  তৈরি করলেন নিজস্ব সেনাদল ‘খমপই’ বাহিনী। নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিলের মোকাবিলা করার জন্য সুশিক্ষিত এই বাহিনীর চারশ সদস্যের হাতে তুলে দিলেন বন্দুক। গৃহযুদ্ধে উভয়পক্ষেই বহু মানুষ ও অসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। অবশেষে  কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যস্থতায় ১৯৬৬ সালে এই দীর্ঘ  যুদ্ধের বিরতি হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর রানি প্রকাশ্যে আসেন।

রানি চেয়েছিলেন ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে, ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসাবে ভারতের মধ্যে থেকেই, সরকারের সমর্থন ও সাহায্যপুষ্ট হয়েই স্বজাতির জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক আর সামাজিক উন্নয়ন। সারা ভারতবাসীর মত তাঁরও প্রধান শত্রু ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ ও তাঁদের নীতি। তাই স্বাধীন ভারত তাঁকে দিয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা, ১৯৭২ সালে দিয়েছে তাম্রফলক, ১৯৮১ সালে দিয়েছে পদ্মভূষণ সম্মান ১৯৮৩ সালে দিয়েছে বিবেকানন্দ সেবা পুরস্কার।

আমৃত্যু সংগ্রামী পর্বতকন্যা গৈডিনলিউ পরিচিত হয়ে গেছেন রানি গৈডিনলিউ অভিধায়। স্বজাতির মধ্যে তিনি রানিমা নামে পরিচিত। মৃত্যুর পরেও তিনি নাগাজাতির(বিচ্ছিন্নতাবাদী নাগাদের মধ্যে নয়) মানুষদের কাছে তিনি দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর চেষ্টা ছিল ‘নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল’ প্রচারিত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন যে নাগাদের জাতীয় আন্দোলন নয় একথা ভারতবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়া। নাগা কাউন্সিলের বুলি ‘নাগাল্যাণ্ড ফর ক্রাইস্ট’, সব নাগাদের কথা নয়। নাগারা অশিক্ষিত,বর্বর, তারা  বিচ্ছিন্নতাবাদী, ভারত বিদ্বেষী–বিতর্কিত এইসব অপপ্রচার থেকে নাগা জনজাতিকে মুক্ত করতে,আর নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিলের অপপ্রচার থেকে নাগাল্যান্ডকে মুক্ত রাখতে আমৃত্যু চেষ্টা করে গেছেন তিনি।

পন্ডিত নেহেরুর দেওয়া রানি অভিধা এজন্যই সার্থক। জেলিয়াগ্রাঙ জনগোষ্ঠীর নাগাদের উন্নয়নের দাবিতে ১৯৮৯ সালে প্রায় পঁচাত্তর বছর বয়সে তিনি দিল্লীতে গিয়ে ধর্নায় বসেছিলেন। ১৯৯৩ সালে ১৭ই ফেব্রুয়ারি ৭৯ বছর বয়সে এই আজীবন সংগ্রামী সমাজকর্মী রানির মৃত্যু হয়।   

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s