গল্প-ছেলে আর দয়ালু কুমির অপর্ণা গাঙ্গুলী শীত ২০১৬

golpodoyalukumirএক কুমীর ছিল। তার মনটা খুব দয়ালু কিন্তু সেই মনটা দুঃখে বড়োই টালুমালু করত। তার কারণ, তার একটিও বন্ধু ছিল না। সে ছিল ভারী বিশ্রী দেখতে। না না, একথা তাকে কেউ কানে ধরে বলেনি। এ তার মনের কথা। সে নিজেকে বহুবার জলের আয়নায় দেখেছে কিনা! ইয়া গুল্লি গুল্লি দুটি চোখ আর দাঁত ছেরকুটে। যখন পড়ে থাকে চরে তখন মনে হয় ভারী বিশ্রী হাসি হাসছে। রাগে দুঃখে কুমিরের কান্না পায়। কেন যে ভগবান তাকে এত কুশ্রী করে বানালেন! তবে এই কুমীরের মনটা ভারী ভালো। সে ফলমূল ছাড়া কিচ্ছুটি খায় না। কেউ জলে নামলে তার পাও ধরতে যায় না। অন্য জন্তুদের সে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। খরগোশ, বক, কাছিম, মানুষ এদের সবাইকে কী সুন্দর দেখতে লাগে! তাই দেখেই সে প্রাণ জুড়োয়।

কুমীরের ঘর বিরাট নদীটার গা ঘেঁষেই আর ওর ঘরের কাছেই একটি ছোটো ছেলে ও তার মা থাকেন। ছোটো ছেলেটি মাঝে মাঝে এদিকটায় খেলতে আসে আর কুমীর তার সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে চেষ্টা করে। কিন্তু অল্প পরেই ছেলেটির মা হাঁক পাড়েন, “এই ছেলে, আবার গেছিস ওই দিকে! বলেছি না ওখানে এক বিশ্রী কুমীর থাকে, পালিয়ে আয়। কোনোদিন তোকে কপ করে গিলে ফেলবে।”

কুমীর এইসব শোনে আর মনে মনে ভারী কষ্ট পায়। তার চোখ  দিয়ে সত্যি সত্যি জল পড়ে। অনেকে ভাববে, কুমীরের কান্না বুঝি মিছে, কিন্তু আমি বলতে পারি এ কান্না খুব সত্যি। একটুও মিছে নয়। হায়, কেউ এই পৃথিবীতে তার বন্ধু হবে না কি?

এমনি করে দিন যায়। একদিন ছোটো ছেলেটির মা শহরে গেছে সওদা করতে। ফিরতে দেরী হচ্ছে, আর ছেলেটি খিদে সামলাতে না পেয়ে খুব কান্নাকাটি করছে চরে বসে বসে। কুমীরের ঘরে ফলমূল থাকেই। সে তো খুব দয়ালু কুমীর। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে একটা কলা আর একটা ফুটি এনে ছেলেটিকে দিয়ে বলে, “ও গো ছেলে, তুমি কেঁদো না গো। ততক্ষণ এই ফল খাও, তোমার মা এসেই তোমাকে খেতে দেবেন।”

ছেলেটি খুব অবাক হয়ে ফল নিয়ে খেতে থাকে। তারপর খাওয়া হয়ে গেলে কুমীরের গলা জড়িয়ে কুমীরকে একখানি চুমো দিল আর বলল, “মা যাই বলুক, দয়ালু কুমীর, আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু হলে, কেমন?”

কুমীর হেসে কেঁদে একসা হয়। আর ঠিক তখনি ছেলের মা বাড়ি ফিরে ছেলেকে ডাকাডাকি করতে লাগলেন।

তারপর থেকে ছেলে আর কুমীর খেলাধুলা করে। ছেলে গরমের দিনে একটি ছোটো প্যান্টুলুন পরে থাকে। কুমীরের খুব ইচ্ছে ও অমন একটা প্যান্টুলুন পায় তো পরে। ছেলের মা সেলাই করে রোজগার করেন কিনা, আর শহরের হাটে সেইসব বেচে আসেন। টুকরো-টাকরা কাপড় দিয়ে ছেলের জামাকাপড় সেলাই করে দেন। মাও সেদিনের পর কুমীরের উপর একটু সদয় হয়েছেন। আজকাল আর বকাঝকা করেন না কুমীরের সাথে মিশলে। তাই ছেলে বলতেই উনি দয়ালু কুমীরের মাপে একটি হাফ প্যান্টুলুন বানিয়ে দিয়েছেন। কুমীর ভারী খুশি হয়েছে। জলের আয়নায় নিজেকে কতবার ঘুরে ফিরে দেখছে তার ঠিক নেই। দুই বন্ধুতে এখন গপ্প করে চরে বসে। কখনও জলে ঝাঁপিয়ে সাঁতার কাটে। কখনও বা মাছ ধরে একঝুড়ি। অনেকদূর দিয়ে পাল তোলা নৌকো যায় আর ছেলে ও কুমীর বলাবলি করে, একদিন তারা অমন পাল তোলা নৌকায় চেপে দেশ বিদেশ দেখতে যাবে। মহাখুশিতেই থাকে তারা – ছেলে আর দয়ালু কুমীর।

তবে সেবার হল কী, ভারী বন্যা হল আর প্রবল সে জলের তোড়। চারদিকে সব বাড়িঘর ভেসে যায়। কুমীর বলল, “ছেলেবন্ধু, ভয় নেই, আমি আছি। মা আর তুমি এই আমার পিঠের উপর বসে পড়ো। আমি ভেসে থাকব ঠিক আর তোমরাও ডুববে না দেখো। দুই তিনদিন ওরা অল্প খাবার দাবার নিয়ে কুমীরের পিঠে তাকে চরের মতো ভেবে বসে কাটাল আর কুমীর ভেসে রইল যেভাবে পারে। জল নেমে গেলে মা ও ছেলে কত যে চুমো খেল সেই দয়ালু কুমীরকে তা বলার নয়। আবার তারা ঘর গড়ল। থাকতে লাগল পাশাপাশি। মা বললেন, “এতদিনে বুঝলুম, আমাদের আশেপাশের পশুপক্ষীদের গাছপালাদের ভালবাসতে হবে, যত্ন করতে হবে, বন্ধু হতে হবে। তবে না তারা আমাদের ভালোবাসবে! ওরা কেউ আমাদের শত্রু নয়। আমরা ওদের ক্ষতি না করলে ওরাই বা আমাদের ক্ষতি করবে কেন ? এই বলে তাঁর নিজের হাতে সেলাই করা দুটি নতুন প্যান্টুলুন আর দুটি টুপি উপহার দিলেন ছেলেকে আর দয়ালু কুমীরকে। আর দয়ালু কুমীরের চক্ষু দিয়ে দুটি খুশির অশ্রু উপচে পড়ল। ছেলে দেখল, কুমীরকে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে সূর্যের আলোয়। সে দয়ালু কুমীরের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি শুধু দয়ালুই নয় গো, তুমি সত্যি খুব সুন্দর।

ছবিঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের গল্প ঘর

Leave a Reply