ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা অভিযান মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক শীত ২০১৭

  এই লেখার আগের পর্বগুলো     তাপস মৌলিকের সব লেখা

কিছুক্ষণ যাবৎ তাঁবুর বাইরে শেরপাদের উত্তেজিত কথাবার্তা শুনছিলাম। ব্যাপার কী বোঝার জন্য তাঁবু থেকে মাথা বার করে দেখি এক নম্বর ক্যাম্প থেকে আজীবা এসে উপস্থিত, ওর সঙ্গে বেশ কয়েকজন কুলি। একজন বিশেষ কুলিকে ও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। চিনেম্যানের মতো দেখতে বলে আইজ্যাক তার নাম দিয়েছিল ‘চিনি’। আমরাও সেটাই জানতাম, পরে জেনেছিলাম তার আসল নাম ছিল প্যান্ডি। সে নাকি রাস্তার যাবতীয় বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও দু’নম্বর ক্যাম্প অবধি শেরপাদের মতোই একেবারে ফটাফট চলে এসেছে। তাই সবার প্রস্তাব, ওকে সাম্মানিক শেরপা হিসেবে দলে নেওয়া হোক। ওর এই পদোন্নতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আমরা ওকে একটা সুন্দর নাইলনের ওয়েস্ট কোট উপহার দিলাম। চিনি খুব গর্বের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ সেটা গায়ে চড়িয়ে নিল।

আজীবা আমায় দুটো হাতে লেখা চিঠি দিল। তাঁবুর ভেতর ঢুকে আমি সে দুটো জোরে জোরে রিডিং পড়লাম, যাতে অন্যরাও শুনতে পায় –

এক নম্বর ক্যাম্প, ২৯ মে ১৯৫০

আংথারকে বেলা বারোটা দশে পৌঁছল। বেস ক্যাম্পে আরও ২২টা বোঝা পড়ে আছে। বেস ক্যাম্প আর এক নম্বর ক্যাম্পের মধ্যে মাল ফেরি করার জন্য আংথারকে চিনি নামে একজন কুলি আর একটা কমবয়সী ছোকরাকে নিয়ে এসেছে। বেস ক্যাম্পে নোয়েল ১৫ জন কুলি সঙ্গে নিয়ে এসে পৌঁছেছে। আংথারকে ফের নিচে নেমে যাচ্ছে, চেষ্টা করে দেখবে ওই কুলিদের মধ্যে কয়েকজনকে রেখে লোড ফেরির কাজে লাগানো যায় কিনা। আজীবাকে যত শীঘ্র সম্ভব ফেরত পাঠিয়ে দাও, ওর সঙ্গে জরুরি আর কী কী প্রয়োজন তার লিস্ট পাঠিয়ে দিও। হাই অলটিচিউড টেন্ট কি লাগবে আরও?

দু’নম্বর আর তিন নম্বর ক্যাম্পের মধ্যে শেরপা দিয়ে মাল ফেরি পরিচালনা করার জন্য আমাদের কাউকে কি দু’নম্বর ক্যাম্পে দরকার হবে? যদি দরকার হয় তাহলে কখন? ইতি –

মারসেল আইজ্যাক

দারুণ খবর! নোয়েল চলে এসেছে বেস ক্যাম্পে, আমাদের যন্ত্রপাতি সাজসরঞ্জামের সরবরাহ নিয়ে কোনও চিন্তা নেই আর। ক্যাম্পে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল।

দ্বিতীয় চিঠিটা নোয়েলের লেখা পুরোনো এক চিঠি যাতে ও জানিয়েছিল সরকির হাতে পাঠানো আমার আদেশ সে পেয়েছে। চিঠিটা সে তুকুচা থেকে ২৫ মে পাঠিয়েছিল, সরকি সেখানে পৌঁছোবার পরদিন। এক নম্বর ক্যাম্প থেকে সরকির হাত দিয়ে আমার চিঠিটা আমি পাঠাই ২৩ মে। বেচারা সরকি! এক নম্বর ক্যাম্প থেকে তুকুচা – সাধারণভাবে যা চার-পাঁচ দিনের রাস্তা – দিনরাত পথ চলে সরকি তা মাত্র ছত্রিশ ঘন্টায় পেরিয়েছিল। পুরো অভিযান এ জন্য সরকির কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। আর ঠিক সময়মতো অভিযানের নেতা যে তাঁর কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলবেন না সে ব্যাপারে সরকি নিশ্চিত থাকতে পারে। একটা মোটা বকশিশ ওর প্রাপ্য।

খুশির খবরটা উদযাপন করতে ক্যাম্পে একবোতল রাম খোলা হল। কিন্তু নষ্ট করার মতো সময় নেই হাতে। আজীবাকে এক্ষুনি নেমে যেতে হবে যাতে আগামীকাল মাল ফেরি চালু থাকে। তাড়াতাড়ি একটা কাগজ টেনে নিয়ে নিচের ক্যাম্পে পাঠানোর জন্য চিঠি লিখতে বসলাম আমি।

দু’নম্বর ক্যাম্প, ২৯ মে ১৯৫০

নোয়েল, আইজ্যাক এবং অন্যরা –

এত তাড়াতাড়ি সবকিছুর ব্যবস্থা করার জন্য নোয়েলকে অনেক শুভেচ্ছা। আমরা সবাই ওর প্রতি কৃতজ্ঞ। গতকাল কাস্তে হিমবাহের উপরাংশে ২৩,৫০০ ফিট উচ্চতায় চার নম্বর শিবির স্থাপন করা হয়েছে। এই মুহূর্তে টেরে, রেবুফত এবং দু’জন শেরপা ২১,৬৫০ ফিট উচ্চতায় তিন নম্বর ক্যাম্পে আছে।  এখন আমাদের লক্ষ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা পাঁচ নম্বর শিবির স্থাপন করা এবং তারপর দু’জন দু’জন করে দল বানিয়ে একের পর এক শৃঙ্গের দিকে অভিযান চালানো।

আইজ্যাকের জন্য জরুরি বার্তাঃ আগামীকাল সকালে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফের আজীবা, সরকি, ফুথারকে এবং চিনিকে ওপরে পাঠাবে। ওদের সঙ্গে একটা বড়ো মেস টেন্ট, দু’জোড়া স্লিপিং ব্যাগ আর ম্যাট্রেস, একটা হাই অলটিচিউড ইউনিট, একটা পেট্রোল স্টোভ আর এক টিন পেট্রোল পাঠিও। সিনে ক্যামেরার জন্য আরও ফিল্ম দরকার। আমি কিছু ভিডিও তুলেছি, সেই ফিল্মগুলো আজীবার হাত দিয়ে ফেরত পাঠাচ্ছি। ওষুধপত্রও কিছু লাগবে, তার লিস্ট আলাদা করে জুড়ে দিলাম। সব প্যাকিং হয়ে গেলে চারজনের বোঝায় যা জায়গা বাঁচবে তা খাবারদাবার দিয়ে ভরে দিও – কিছু সসেজের টিন আর এক বোতল কনিয়াক পাঠিও।

নিচে ল্যাচেনালের রুকস্যাক থেকে ওর জন্য বাড়তি মোজা, ক্যাম্প শু, শার্ট প্যান্ট সব পাঠাও, বেচারার জামাকাপড় সব ভিজে একশা।

আজ সন্ধে আটটায় ওয়াকি টকি-তে কথা বলার চেষ্টা করব। আগামীকাল কোজি আর শ্যাজ সম্ভবত নিচে নেমে যাবে, ওদের কাছে বিশদ খবর পাবে।

পুনঃ – ওপরে যা যা পাঠাতে বললাম কাল খুব ভোর ভোর পাঠিও। ওগুলো এলে তবেই আমি, ল্যাচেনাল, সরকি আর ফুথারকে কাল তিন নম্বর ক্যাম্পের দিকে রওনা দিতে পারব। আবহাওয়া ভালো থাকলে শৃঙ্গজয়ের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী আমরা।

মরিস হারজগ

আজীবা আর চিনি একটা হাই অলটিচিউড ইউনিট, কিছু খাবারদাবার আর একটা ওয়াকি টকি নিয়ে এসেছে। অবশেষে আজ সন্ধে আটটা থেকে বেস ক্যাম্পের সঙ্গে ওয়াকি টকিতে সংযোগ স্থাপন করা যাবে। এতে অভিযান পরিচালনার কাজে যে প্রচুর সুবিধে হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

নোয়েলের কাজে আমি খুবই সন্তুষ্ট। ও যে কোন ধাতুতে তৈরি ধীরে ধীরে তা সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। নোয়েল না থাকলে বর্ষার আগে শৃঙ্গজয়ের কোনও সম্ভাবনাই ছিল না।

অসুস্থ দাওয়াথোন্ডুপকে যত শীঘ্র সম্ভব নিচে নামিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ভাবলাম, আজীবার সঙ্গে যদি তাকে পাঠিয়ে দিতে পারি, তাই দেখতে গেলাম সে কেমন আছে। দেখি তার অবস্থা খুবই শোচনীয়! সাদা চোখে দেখে মনে হচ্ছে যেন মৃত্যুর প্রায় দোরগোড়ায় উপস্থিত সে। তাই এই খারাপ আবহাওয়ায় তাকে নিচে নামানোর ঝুঁকি নিতে ভরসা হল না। আগামীকাল দেখা যাবে।

আজীবা একমুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। নামার সময় ওর পিঠে আর বোঝার ভার নেই। তাই লম্বা লম্বা পা ফেলে আগে আগে আজীবা, আর পেছনে ছোটো ছোটো পায়ে গুরগুর করে প্রায় দৌড়তে দৌড়তে চিনি, কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিচের কুয়াশার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আমি ওয়াকি টকি-টা নিয়ে গুছিয়ে বসলাম। নব-টব ঘুরিয়ে নানান কসরত করতে করতে উচ্চৈঃস্বরে বলে চললাম, “হ্যালো, হ্যালো, মরিস বলছি। আইজ্যাক, শুনতে পাচ্ছ?” কিন্তু টানা ক্যারক্যার ক্যারক্যার আওয়াজ ছাড়া যন্ত্রটা থেকে কিছুই বেরোল না! কিছুক্ষণ চেষ্টাচরিত্র করার পর হঠাৎ সেটটা থেকে একটা হিন্দি গান বেজে উঠল – অসাধারণ ছন্দময় প্রাণচঞ্চল সে সঙ্গীত –হিমালয়ের বুকে ওই ২০,০০০ ফিট উচ্চতায় আমার প্রায় নাচতে ইচ্ছে করছিল।

‘হ্যালো’ ‘হ্যালো’ করে আরও কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর নিরাশ হয়ে আটটা পনেরো নাগাদ রণে ভঙ্গ দিলাম আমি। অভিযানে এই বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আরও অনেক উন্নতির সুযোগ আছে। পরিকল্পনার সময় ব্যাপারটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাইনি আমরা, তাই পস্তেছি। খুবই অসুবিধেয় পড়তে হয়েছে আমাদের। বিরসবদনে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে দেখি অন্যরা ততক্ষণে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে।

পরিষ্কার ঝকঝকে একটা সকাল পরদিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ঘুম যখন ভাঙল তাঁবুর ওপর সূর্যের আলো পড়ে ভেতরটা ততক্ষণে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। রাত্রে দারুণ ঘুমের পর শরীরটা খুব ঝরঝরে লাগছিল। তাড়াতাড়ি উঠে তাঁবুর বাইরে এলাম। মাটিতে ছড়িয়ে থাকা মিছরির দানার মতো বরফের গুঁড়োগুলোয় সূর্যের আলো পড়ে শয়ে শয়ে হিরের মতো ঝকমক করছিল। রাত্রে নিশ্চয়ই ভালো ঠান্ডা পড়েছিল। আমাদের আজকের পরিকল্পনা খুব সরল – এক নম্বর ক্যাম্প থেকে মালপত্র নিয়ে শেরপারা মনে হয় একটু পরেই চলে আসবে, ওরা চলে এলেই গোছগাছ করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিন নম্বর শিবিরের দিকে রওনা দেওয়া। কোজি আর শ্যাজ এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। কোজি ঠিক করল এখানে থেকেই বিশ্রাম নেবে। শ্যাজ অবশ্য শরীর ঠিক করার জন্য আরও নিচে নেমে যাওয়ার পক্ষপাতী, সে ঠিক করল এক নম্বর শিবিরে নেমে যাবে। ভালোই হল, দাওয়াথোন্ডুপকে শ্যাজের সঙ্গে নিচে পাঠিয়ে দেব। তিনদিন হয়ে গেল, বেচারার অবস্থা সেই একইরকম আছে। ওদিকে ল্যাচেনাল আজ যেন একেবারে অন্য মানুষ! যেভাবে সে স্লিপিং ব্যাগ থেকে বেরিয়েই বাইরে এসে শেরপারা কে কী করছে তার তদারকি আরম্ভ করল আর তারপর চোখে দূরবিন লাগিয়ে ওপরে টেরেদের কোনও চিহ্ন দেখা যায় কিনা খুঁজতে শুরু করল তাতে বুঝলাম ও মানসিকভাবে ফের চাঙ্গা হয়ে গেছে। আশা করি শারীরিক সক্ষমতার দিক থেকেও খুব শিগগিরই সে তার ফর্মে ফিরে আসবে। তাই যদি হয় তাহলে চিন্তা নেই, আমরা দু’জন মিলেই তিন নম্বর শিবিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারি – টেরেদের পরে দ্বিতীয় শৃঙ্গাভিযাত্রী দল হিসেবে।

“এতক্ষণ ধরে আজীবারা করছেটা কী?” অধৈর্য হয়ে গজগজ করছিলাম আমি, “পরিষ্কার করে চিঠিতে লিখে দিলাম যে ওদের তাড়াতাড়ি পাঠিও যাতে আমরা আজ সময় থাকতে দু’নম্বর শিবির থেকে রওনা দিতে পারি!” পালা করে আমি আর ল্যাচেনাল দূরবিন চোখে হন্যে হয়ে আজীবাদের উঠে আসার চিহ্ন খুঁজতে লাগলাম।

“ল্যাচেনাল, ওই দেখ, টেরে আর রেবুফত শেরপাদের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে,” হঠাৎ ওপরে দূরবিন তাক করে দেখতে পেলাম আমি।

“হুমম, খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছে!”

“ওই জায়গাটা নরম তুষারের গভীর স্তরে ঢাকা, ঠেলে ঠেলে পথ চলতে নিশ্চয়ই অসুবিধে হচ্ছে ওদের।”

মিরিস্তি খোলার গভীর উপত্যকা থেকে হালকা নীলচে কুয়াশা ধীরে ধীরে ওপরে উঠে সূর্যের আলোয় মিলিয়ে যাচ্ছিল। এই নীল কুয়াশা খুব ভালো লক্ষণ, আবহাওয়া ভালো থাকবে আজ।

কী আর করি! ক্যামেরা বার করে চারপাশের পাহাড়পর্বতের কিছু ছবি তোলার পর আমি আর ল্যাচেনাল নিজেদেরই খানকতক ছবি তুললাম। দুপুর হতে চলল, আজীবাদের কোনও চিহ্নই নেই! রোদে পিঠ দিয়ে আরাম করে বসে আমাদের দু’জনের ম্যারাথন আড্ডা চলতে থাকল। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেল। শ্যাজ দাওয়াথোন্ডুপকে নিয়ে নিচে নেমে যাওয়ার জন্য তৈরি হল। ততক্ষণে পরিষ্কার বুঝে গেছি যে আজ আর আমাদের তিন নম্বর ক্যাম্পে যাওয়া হচ্ছে না, বড্ড দেরি হয়ে গেছে তার পক্ষে।

“সালাম, বড়া সাহিব!”

“সালাম!” বলে ঘুরে তাকিয়ে দেখি আংথারকে, ফুথারকে আর সরকি এসে উপস্থিত। তখন বিকেল ছ’টা বাজে। ওদের দেখে খুব আনন্দ হল। তিনজনেই প্রচুর মালপত্র, সাজসরঞ্জাম আর খাবারদাবার বয়ে নিয়ে এসেছে – আর সবচেয়ে খুশির ব্যাপার হল দু’নম্বর শিবিরের জন্য আরেকটা বড়ো মেস টেন্ট নিয়ে এসেছে।

আলো থাকতে থাকতে দূরবিন চোখে ওপরে চার নম্বর শিবিরের জায়গাটা ভালো করে খুঁজে দেখলাম, কিন্তু কোনও নড়াচড়া চোখে পড়ল না। টেরেরা নিশ্চয়ই তাঁবুর ভেতরে ঢুকে বিশ্রাম নিচ্ছে এতক্ষণে – এরকম ভেবে নিলে নড়াচড়ার চিহ্ন না থাকাটা ভালো লক্ষণ! আগামীকাল তাহলে ওরা পাঁচ নম্বর শিবির স্থাপন করতে যাচ্ছে!

আমাদের দেখা পেয়ে আংথারকেও খুব খুশি, মুখে হাসি আর ধরে না তার। দু’দিনের মুক্তিনাথ যাত্রাটা সে খুব উপভোগ করেছে বলল, মনে হল এখনও তার ঘোরে আছে সে। ও এসে পড়ায় আমার অনেক ঝামেলা কমে গেল। শেরপাদের সর্দার আংথারকে, অন্য শেরপা এবং কুলিদের ওপর তার কর্তৃত্ব প্রশ্নাতীত। হিমালয়ে তার বিপুল অভিজ্ঞতার সম্ভার নিয়ে সে জানে কখন কী করতে হবে না হবে, আর সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের উদ্যোগে এগিয়ে যেতেও কখনওই দ্বিধা করে না। আমার ঘাড় থেকে একটা বিশাল বোঝা যেন নেমে গেল।

পিঠের বোঝা নামিয়ে রেখে আংথারকে আমার হাতে একটা চিঠি দিল। চিঠিটা লিখেছে আইজ্যাক, নোয়েল আর অডট –

৩০.০৫.১৯৫০

১। আজ সকালেই সমস্ত মালপত্র সমেত শেরপাদের পাঠানোটা অবাস্তব ব্যাপার ছিল। গতকাল সন্ধেবেলা অনেক দেরিতে এক নম্বর শিবিরে তোমার চিঠি পেয়েছি আমরা, আর সাজসরঞ্জাম ও শেরপারা ছিল নিচের বেস ক্যাম্পে।

২। আংথারকে, সরকি আর ফুথারকে-কে পাঠালাম, তোমার তালিকা অনুযায়ী যাবতীয় মালপত্র ওরা নিয়ে যাচ্ছে।

৩। আগামীকাল দু’নম্বর শিবিরে শুধু রেশন, অর্থাৎ খাদ্যসামগ্রী বয়ে নিয়ে একদল শেরপা যাবে, আমাদের মধ্যে কেউ সম্ভবত সঙ্গে যাব।

৪। আমাদের জন্য কোনও নির্দেশ থাকলে দু’নম্বর শিবিরে রেখে গেলেই চলবে।

৫। তিন নম্বর শিবিরে রেশন ফেরি করার জন্য শেরপাদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের কারও যাওয়ার দরকার হলে জানিও।

৬। গতকাল ওয়াকি টকিতে কিছুই তো শুনতে পেলাম না! আজ সন্ধে ৫টা, ৭টা আর ৮টায় একবার করে চেষ্টা করে দেখো। আমাদের রিসিভার সেটটা তো বেশ বড়োসড়ো!

৭। আবহাওয়ার সংবাদ অনুযায়ী আমরা এখন প্রাক-বর্ষার ক্ষণস্থায়ী খামখেয়ালি পর্যায়ের মধ্যে আছি, কোনদিন কীরকম থাকবে আন্দাজ করা মুশকিল। আসল বর্ষা কলকাতা ছেড়ে এগিয়ে আসছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই এ বছর আসছে বর্ষা।

৮। জি বি রাণা বেস ক্যাম্পে নেমে গেছে। দেশে খবর পাঠাতে হলে পাঠাও, কাল সবার চিঠিপত্র নিয়ে বেস ক্যাম্প থেকে একজন রানার রওনা হবে। জি বি-ও তুকুচা ফিরে যাবে।

৯। ফেরার ব্যবস্থা ভেবেছ কিছু? কুলি জোগাড় করা এখানে সময়সাপেক্ষ, আজ বললে আটদিন পরে মাত্র কুড়িজনের একটা দল পাবে। ফেরার সময় মালপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কুলি লাগবে তো!

নোয়েল, আইজ্যাক, অডট

পুনঃ সিনে ক্যামেরায় রঙিন ভিডিও ছবি তোলার সময় স্বাভাবিক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে অ্যাপারচার F.11. অবধি রাখতে পারো। – আইজ্যাক

ওয়াকি টকির সন্ধে পাঁচটার সময় তো পেরিয়ে গেছে, সাতটায় একবার চেষ্টা করে দেখব যদি যোগাযোগ করা যায়। বর্ষার খবরটা বেশ উদ্বেগজনক। তীরে এসে শেষে তরি ডুববে নাকি? তাহলে আপশোশের আর সীমা থাকবে না। কলকাতা অঞ্চলে বর্ষা শুরু হয়ে গেছে মানে এখানে পৌঁছনো আর মাত্র কয়েকদিনের ব্যাপার।

কথামতো সাতটার সময় ওয়াকি টকিতে এক নম্বর শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে কোনও লাভ হল না, কিছুই শুনতে পেলাম না। সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্বন্ধে জানানোর জন্য ঠিক করলাম আগামীকাল ঠিক বেরোনোর আগে ওদের চিঠির উত্তর লিখব।

আজ সূর্যাস্তটা অসাধারণ ছিল। নীলগিরি আর অন্নপূর্ণার শৃঙ্গ সোনালি থেকে প্রথমে কমলা, তারপর ধীরে ধীরে হালকা বেগুনি হয়ে এল। নিখাদ পরিষ্কার আকাশ। কনকনে ঠান্ডা। সবই ভালো লক্ষণ। বর্ষা পৌঁছনোর আগে শেষ কয়েকদিনের এই ভালো আবহাওয়াই মনে হয় আমাদের শেষ সুযোগ! নীলগিরিতে ধীরে ধীরে ছায়া নেমে এল। অন্নপূর্ণার উপরাংশের বরফাবৃত অঞ্চলগুলি কেমন একটা হালকা গোলাপি রঙ ধরল। তারপর, প্রায় সম্পূর্ণ পর্বতগাত্র যখন ক্রমশ ছায়ার অন্ধকারে তলিয়ে গেছে, তখনও শৃঙ্গের সর্বোচ্চ বিন্দুটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য রোদটা ধরে রেখে সোনার মুকুটের মতো ঝলমল করতে থাকল।

রাত্রে বলার মতো তেমন কিছু ঘটেনি। তুষারধ্বস নামার শব্দ তুলনামূলকভাবে অনেক কম কানে এল। স্বাভাবিক, কেননা কাল সারাদিন কোনও তুষারপাত হয়নি। ভোর ছ’টার সময় স্লিপিং ব্যাগের আরাম ছেড়ে লাফিয়ে উঠে পড়লাম। আবহাওয়া একদম ঠিকঠাক। দেখে মনে হল ল্যাচেনাল দুর্দান্ত ফর্মে আছে। খারাপ সময়টা কাটিয়ে উঠে ও আবার নিজের মেজাজে ফিরে এসেছে।

“কী ল্যাচেনাল, নিচ থেকে তোমার বাড়তি শার্ট-প্যান্ট সব পাঠিয়েছে তো? পেয়েছ?”

রুকস্যাক গোছাতে গোছাতে একগাল হেসে মাথা নাড়ল ল্যাচেনাল, খুব খুশি। ছোট্ট ছোট্ট জিনিস যে এরকম সময় কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে!

আমরা দু’জনেই নিঃসন্দেহ ছিলাম, আজ এই যে ওপরে উঠতে যাচ্ছি, এই যাত্রাতেই চূড়ান্ত সাফল্য আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে।

শেরপারা যতক্ষণ বাঁধাছাঁদা করছিল সেই ফাঁকে চটপট এক নম্বর শিবিরের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে ফেললাম আমি।

৩১.০৫.১৯৫০

এক নম্বর শিবিরের সব সাহেবদের প্রতি –

ল্যাচেনালের সঙ্গে জুড়ি বেঁধে তিন নম্বর ক্যাম্পের দিকে রওনা দেবার ঠিক আগে তোমাদের লিখছি। আবহাওয়া সহায় থাকলে এবারে একেবারে শৃঙ্গ অবধি না পৌঁছে ফিরছি না আমরা। আমাদের পরে শ্যাজ আর কোজি তৃতীয় শৃঙ্গাভিযাত্রী দল হিসেবে ওপরে উঠবে।

আইজ্যাক, নিচের টেলিগ্রামটা অনুগ্রহ করে লুসিয়ান ডেভিসকে তার করে দিও –

‘অন্নপূর্ণা শৃঙ্গজয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করছি আমরা। রাস্তা কঠিন বরফ আর তুষারে ঢাকা, যথেষ্ট শক্ত রুট, তবে আশা করি বেশ তাড়াতাড়িই এগোনো যাবে। কিছু কিছু জায়গায় তুষারধ্বসের ভয় আছে। বেস ক্যাম্পের ওপরে এখন অবধি চারটে শিবির স্থাপন করা হয়েছে, এক নম্বর (১৬,৭৫০ফিট), দু’নম্বর (১৯,৩৫০ ফিট), তিন নম্বর (২১,৬৫০ ফিট) আর চার নম্বর (২৩,৫০০ ফিট)। শৃঙ্গজয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী। শারীরিক এবং মানসিকভাবে সবাই একেবারে ঠিকঠাক আছে।

মরিস হারজগ

রেশনঃ কিছু খরচা হয়েছে। কোজি দু’নম্বর শিবিরে রইল। তিন নম্বর ক্যাম্পে কী কী পাঠাতে হবে সে ব্যাপারে ও নির্দেশ দেবে।
ওয়াকি টকিঃ কিছুই তো শুনতে পেলাম না।শ্যাজ নিচে গেছে, ওকে সেটটা দেখতে বলো।
বর্ষাঃ সর্বশেষ খবর জানাতে থেকো।
ফেরাঃ কাউকে আগেভাগেই তুকুচা চলে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে কুলি জোগাড় করে তাদের নিয়ে ফিরবে সে।
ভিডিওঃ শৃঙ্গ অবধি সিনে ক্যামেরাটা নিয়ে যাবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব আমি।

মরিস হারজগ

এবারে যে আমরা সবাই খুব আশাবাদী তা সবার গোছগাছ আর তৈরি হওয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। লক্ষ করলাম যার যার ব্যক্তিগত ওষুধবিশুধের বাক্স গোছানোর ব্যাপারে সবাই এবার খুব সাবধানী, যার যার ক্যামেরার জন্য বাড়তি ফিল্ম নিতেও ভুল হল না কারও। শ্যাজ খুব সুন্দর ছোট্ট একটা ফ্রান্সের পতাকা তৈরি করেছিল, আমি সেটা আমার রুকস্যাকে ভরে নিলাম। শৃঙ্গে যদি উঠতে পারি সেই কথা ভেবে আমি নিজেও কিছু বিশেষ স্মারকচিহ্ন এনেছিলাম, সেগুলোও নিতে ভুললাম না। ঝটপট নিজের নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরোনোর জন্য তৈরি হয়ে গেলাম সবাই।

শিবির ছেড়ে, বড়ো ফাটলটার পাশ দিয়ে ঘুরে, সোজা সেই নালা বেয়ে তুষারধ্বস নেমে এসে তৈরি হওয়া বিশাল বরফের স্তূপটার দিকে এগিয়ে চললাম আমরা। এখনও তুষার বেশ শক্ত, পা ডুবে যাওয়ার হ্যাপা নেই। আবহাওয়া খুব ঠান্ডাও না, খুব গরমও না, একেবারে ঠিকঠাক। ফলে সবার মনেই বেজায় স্ফূর্তি।

“মরিস, এ কী ব্যাপার? ওপরে তাকিয়ে দেখ!” হঠাৎ ল্যাচেনালের কথায় চমক ভাঙল।

“সে কী!! ওরা নেমে আসছে কেন? কী হয়েছে?”

মাথা তুলে তাকিয়ে নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কিন্তু, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, দেখি চারটে ছোটো ছোটো কালো বিন্দুর মতো টেরে, রেবুফত আর তাদের দু’জন শেরপা ওপর থেকে আমাদের দিকে নেমে আসছে!

ব্যবহৃত ছবিঃ অন্নপূর্ণা অভিযান                                                                   (এরপর আগামী সংখ্যায়)

     জয়ঢাকের খেলা লাইব্রেরিতে এমন অনেক অভিযানের সংগ্রহ

2 thoughts on “ধারাবাহিক অভিযান অন্নপূর্ণা অভিযান মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক শীত ২০১৭

Leave a Reply