বই পড়া

নতুন বই

boi01boi02দাদু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বসে গল্প শুনতেন মোহনলাল- শোভনলাল ছোট্ট দুই ভাই। শুনতে শুনতে তাঁরা নিজেরাও লিখতে শুরু করলেন, আর তাঁদের লেখা সেই গল্পগুলি প্রকাশিত হয়ে চলল তখনকার একমাত্র ছোটদের পত্রিকা ‘সন্দেশ’-এ। তখন দুই ভাইয়ের বয়স সবে নয়-দশ। শোভনলালের নিজের কথায় – ‘সন্ধ্যা হলে রোজ দাদামশায় দিদিমার ঘরে একটা ইজিচেয়ারে গল্পের বই খুলে বসতেন, আমরা নীচে আসনপিঁড়ি হয়ে ঢালা বিছানায় বসতুম। কতরকম গল্পই যে দাদামশায় মুখে মুখে অনুবাদ করে বলতেন! কত দেশ-বিদেশের ভ্রমণকাহিনী, রূপকথা, কত দেশের কত উপকথা। দাদামশায়ের মুখে শোনা আসাম দেশের একটা উপকথা শুনেই আমি প্রথম গল্প লিখি ‘কাক ও ব্যাঙ’। আগের মাসের ‘সন্দেশ’-এ দাদার একটি গল্প বার হয়েছিল। এবার আমার নামে একটি গল্প বার হল।’ শোভনলালের সেই প্রথম গল্পটির ছবি এঁকেছিলেন সুকুমার রায় স্বয়ং। ক্রমে ‘মৌচাক’ পত্রিকাতেও বার হতে থাকল দুই ভাইয়ের গল্প। ‘পার্বণী’ ও ‘রংমশাল’ নামে দুটি বার্ষিকীতেও বেরোল। তারপর দুই ভাইয়ের এসব গল্পের গুচ্ছ বেঁধে দুটি বই প্রকাশিত হল – ‘সোনার ঝরনা’ (১৩২৭) ও ‘পুঁতির মালা’ (১৩২৮)।

সেই দুই বই থেকে ছোট ভাই শোভনলালের ১৭টি গল্প ও ১টি নাটিকা বেছে নিয়ে সংকলিত হয়েছে ‘শোভনলালের গল্প’। উপরি পাওনা শোভনলালের আত্মস্মৃতির একাংশ আর শ্রী পুলিনবিহারী সেনের ভূমিকা; শিল্পী শৈল চক্রবর্তীর আঁকা দারুণ সব ছবির সাথে সুন্দর ত্রুটিহীন ছাপা; সুন্দর প্রচ্ছদ ও বাঁধাই।

এবারে গল্পের কথায় আসি। প্রথমেই ‘নিদুলি-মন্ত্র’ গল্পের একটি সংলাপ তুলে দিচ্ছি – ‘বাপু হে, এই তিন যুগ ধরে ক্রমাগতই শুনে আসছি -চাঁদের আলো, দখনে বাতাস, ফুলের গন্ধ আর কোকিল পক্ষীর ডাক – শুনে শুনে আমাদেরই কান ঝালাপালা হয়ে গেল। এতে কি আর ছেলে ভোলে রে বাপু!’ ছেলে যে কীসে ভোলে তা শোভনলাল বিলক্ষণ জানতেন! তাঁর গল্পে ছেলে তো ভোলেই, আমার মতো ধেড়ে খোকারাও দিব্যি ভোলে। দুর্দান্ত সব গল্প এই বইয়ে। প্রথম অংশের গল্পগুলিতে রয়েছে বিচিত্র সব চরিত্র আর বিদঘুটে সব ঘটনার ঘনঘটা। সরস অনায়াস লেখনীতে গল্প তরতরিয়ে এগিয়ে চলে। আছে এক তর্কচূড়ামণির নাকাল হওয়ার গল্প, বাদশা হারুন-অল-রশিদের বাদশাহি খেয়ালের গল্প, বীরবলের বুদ্ধিবলের গল্প। আমার নিজের সবথেকে ভালো লেগেছে ‘নিদুলি-মন্ত্র’, ‘বোগদাদি চটি’ আর ‘আলেকজান্ডারের চীন অভিযান’। ‘সংযোজন’ অংশের ছ’টি গল্প তো আরও মজার। এগুলিতে যত রাজ্যের কাক, ব্যাঙ, ইঁদুর, বাঁদর, গাধা, শেয়াল, ভাল্লুকের কাণ্ডকারখানা।

উপেন্দ্র-অবনীন্দ্র-সুকুমার ঘরানার এসব গল্প ৯৫ বছর পর আজও সমান সুস্বাদু, সমান মুচমুচে; একেবারে টাটকা যেন। এ জিনিস যে চিরকালের! শোভনলালের নিজের ভাষাতেই বলতে হয়, তাঁর বাঁশিতে বাজে ‘ভারি নূতন অথচ ভারি পুরোনো’ সেই চিরন্তন সুর। এ বই একবার হাতে নিলে আর শেষ না করে রেহাই নেই।

বই:শোভনলালের গল্প , লেখক:শোভনলাল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রচ্ছদ ও অলংকরণ:শৈল চক্রবর্তী, প্রকাশক:লালমাটি প্রকাশন,  ৫/১ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০৭৩, পৃষ্ঠাসংখ্যা:১৩৫; দাম:১০০ টাকা

তাপস মৌলিক

পুরোনো বই

boi03পুরোনো বইপত্র গোছাতে বসে হাতে এসে গেল আশ্চর্য একখানা বই যাক ছুঁলেই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে। আসল মলাট তো হারিয়েছে। তবু কী ভাগ্যি ৯৬ পাতার সবক’টিই অক্ষত।

প্রথমেই নজর কাড়ল বইয়ের নাম। ‘কালোর বই’ কথাটা মোটা হরফে লেখা, তার তলায় ছোটো করে একটা মজার কথা/লাইন- “কিন্তু ছড়াগুলো মামার।”

সঙ্গেসঙ্গেই মনের মধ্যে কৌতুহল দপ করে জ্বলে উঠল। কালোই বা কে আর মামাই বা কে? বইখানির লেখক শ্রী সুনীলচন্দ্র সরকার। প্রকাশকাল ১৩৫৭ (মাঘ)। প্রকাশক অজিত দত্ত। দিগন্ত পাবলিশার্স, ২০২ রাসবিহারী অ্যাভেন্যু, কলি ২০। দাম দেড় টাকা।

সুনীলচন্দ্র সরকার ছেলেদের জন্য এই কালোর বইখানির লেখক। নানান পশুপক্ষী, দুটি ছেলে এবং তাদের পিসি,বাবা এবং মামাকে নিয়ে এই মনোরম গল্পটি সুনীলবাবুর হাতে বেশ ফুটেছে। এ ধরণের বই ছেলেমেয়েদের জন্য বেশি নেই—-পরের ভূমিকার পাতাটিতে গিয়েই তাজ্জব। ভূমিকা লিখেছেন শ্রী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর লেখাটি তুলে ধরলে বইটির আকর্ষণের কারণ সংক্ষেপে বোঝা যাবে-

——মানুষের সঙ্গে পশুপাখিরা একঠাঁই বাস করছে, অচেনাভাবে ওদের কথা গল্প ছড়ার মধ্য দিয়ে এল পাঠকের কাছে, বইখানির এটুকুই মূল্য।

শুরুতে রয়েছে এক ছেলেমানুষী প্রণাম, ছড়ার মাধ্যমে মা-কে। বড়ো হয়ে যাবার পর মানুষকে বাধ্য হয়ে নানারকম মুখোশ পরতে হয়। তবু মাকে বলা যায়-

আমি যাদের মধ্যে ঘুরিফিরি / থাকি তাদের সমান / তবু ছেলেমানুষ আছি যে মা/একলা তুমিই প্রমাণ

এমন চমৎকার ছন্দমিলের ছড়া অনেককাল পড়িনি। তবে মনে রাখতে হবে ছড়াগুলো মামার। সে এক আজব মামা যার “বয়স সাতাশ আটাশের বেশি নয়, মুখে মুখে ছড়া বানানোর ক্ষমতা আছে—” “কী সব ভারী ভারী বই পড়ে, কী বলে, কখন কী মেজাজে থাকে কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই।”

তিনি মা হারা দুই ভাই কালো আর ধলোকে শেখালেন,

“গুণী ছুটি পায় কদাচিৎ /ধনী বিছানায় সদা চিৎ”  অথবা  “ভগবান যদি দেন খাদ্য / কোনোদিন হব না অবাধ্য।”

লেখক এখানে কালোধলোর শুভানুধ্যায়ী পাড়াতুতো কাকা। ঠাকুমার কাছে রূপকথা শুনে শুনে ছেলেগুলো অবাস্তব জগতে বিচরণ করছে দেখে তিনি ওদের জগদানন্দ রায়ের প্রাণীর বই কিনে দিয়ে প্রাণী পর্যবেক্ষক বানাতে চান। পিতা উমেশচন্দ্র কাইজারি গোঁফ ঝুলিয়ে কাজের ধান্দায় ঘুরে বেড়ান মুলুক থেকে মুলুকে। ইতিমধ্যে এসে জুড়ে বসেন মামা আর ছেলেদের বখিয়ে দেন হ য ব র ল-র মতো বই দিয়ে। যার ফলে “পশুপাখি মাছের নাম ওলটপালট করে এমন সব অদ্ভুত নাম ওদের শেখানো হল যে কোনকালেই ওরা সেই গন্ডগোল শুধরে উঠতে পারবে তা মনে হয় না। পাতিপাঁটা, বলগা কুকুর, গলদা ফড়িং, ডেঁয়ো মশা।”

এহেন কালোর পিছুপিছু একদিন রাস্তার এক নেড়ি চলে এল বাড়িতে। কালোর ভাষায়—চাকরি নিল কায়দা করে। গল্প জমে উঠল যখন বাঘা (চাকরি পাওয়া নেড়ি) গিয়ে পড়ল সেই কাহারপাড় বনে বুনোদের পাল্লায়। জ্যোৎস্নারাতে কালো চলল মামার সঙ্গে বাঘা ফিরিয়ে আনতে। আর তারপর এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। করালীর মুদির দোকানে আগুন লাগানো, পোড়া ছাগলের মাংসের বখরা নিয়ে শেয়ালদের ঝগড়া—শেয়ালরা বলছে তারাই দোকানে ঢুকে তুলোর বস্তার ওপরে লম্ফ উল্টিয়ে ফেলে আগুন লাগিয়েছে—মাংস তাদের পাওনা।

এই ঝগড়ায় আবার ঢুকে পড়ে বাঘা। তর্ক শুরু হয়, পোষা কুকুর, বেড়াল, গরু আর বুনো, স্বাধীন জন্তুদের মধ্যে। এই পর্বের নামকরণও মজার—মানুষঘেঁষাদের মনের কথা।

বুনোরা পোষাদের তাচ্ছিল্য করে নাম দিয়েছে “মানুষঘেঁষা”।

“খেঁকি বিশ্রি দাঁত বের করে বললে, ওরা আবার কুকুর! মানুষের পোষা ভেড়া সব। ভুল জায়গায় শোঁকে, ভুল চালে দৌড়োয়। না বোঝে পাখপাখালির চিহ্ন, না জানে আওয়াজের মানে। কাকশালিখের আওয়াজে আমি বুঝি কোথায় খাবার পড়েছে। ইঁদুরের আওয়াজে বুঝি মানুষ ঘুমিয়েছে, তখন লাফিয়ে ঢুকি রান্নাঘরে।”

“পোষাকুকুর রেগে উঠে বললে, ‘ভারী কম্মই করো। চুরির অন্নে শরীরের যা দশা হয়েছে তা দেখতেই পাচ্ছি।’

“পোষা বললে, মানুষের জিনিস আমরা পাবো এই নিয়ম। আমরা মানুষের আপনার লোক।’ শেয়াল জবাব দিলে, ‘ওরে মানুষঘেঁষার দল, ওরে অপশু, লজ্জা করে না বলতে? আপনার লোক তোরা, না ভিখিরি।’

ঝগড়া বাড়ে। পোষারা মানুষের পক্ষে সওয়াল করে—বিড়ালের উৎপাতের উপমা দেয়, কথায় কথা বাড়ে। শেয়াল গম্ভীর হয়ে গরুর উপমা দেয়, “গরু তো নিরীহ পশু? মানুষের উপকারই করে-“তবু তো মানুষ তাকে মারছে। পরশু এই জঙ্গলে গরু কাটা হয়েছে।”

সব পশুপাখিদের জোটের মাঝে শেয়াল গলা উঁচিয়ে বলে, “এই বনে এক মাসের মধ্যে আড়াইশো পাখি, সতেরোটা খরগোশ আর একটা শিয়াল মারা পড়েছে শিকারীর বন্দুকে।” সকলের ক্ষোভ ঘনীভূত হয়। কুকুরগুলো উত্তর দিতে পারে না। সুযোগ বুঝে শেয়াল সর্দার হাঁক দিলে, “চলে আয় সব বনে, চলে আয়। ছেড়ে আয় মানুষকে। পশু তোরা, পশুর মতন বাঁচ।”

কাহিনী এগোয় উপসংহারের দিকে। কিন্তু মনকে ভাবিয়ে তোলে আমরা যারা পশুদের ভালোবাসি, তাদের পুষি, তারা সত্যিই কি পশুদের ভালো করছি? স্বাধীনভাবে তারা যেমন বাঁচত, আমরা কি তেমন আরাম দিতে পারি তাদের? মানুষের চোখে না তাকিয়ে একবার যদি পশুদের চোখে তাকাই?

বইটা আবার ছাপা হলে খুব ভালো হয় তাই না?

পুনশ্চঃ

পরিশেষে আমার কৃতজ্ঞতা আমার বন্ধু তিতির রায়কে যিনি তাঁর বাবা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বইটি খুঁজে এনে দিয়েছেন।

সম্পাদকীয় সংযোজনঃ

কালোর বইয়ের কিছু ছড়া

সোন সোন ছোকরা সোন / চাস কি তুই সাসতি কোন? / সনিবার তায় বৈশাখে / (তুই) মেরেছিস আমার সেজদাকে! / সারা সিত্কাল উপুসি ভাই / সালিক বাসায় সেঁধুলো তাই / মানুসের কিছু করেনি দোস, / হিংসুলি তবু, এত সাহস! / কাঁদিস কি হাত জোড় করিস / সেখাই আজকে সাপের বিস–

*********

চিকি চিকি চাকা চিড়িক

বেধেছে বেধেছে হিড়িক

খবর ছড়াই, চড়াই! চড়াই!

চ চ চ চঃ   

চ চ চ চঃ

সভা! সভা!

চিররপ

চিয়ার আপ!

*******

কিরিকিচিকিচি চিকারা চিকারা চুয়াঃ

একজন প্রশ্ন করে

“বলো কি হয়েছে? কি কেড়ে নিয়েছে?

ঠুকরেছে নাকি? কি গাল দিয়েছে?”

তার উত্তর-

“বলেছে ফাজিল, বলেছে মুখ্যু,

তাতেও তেমন করি না দুখ্যু,

কিন্তু ভাইরে কথাটা শুনছ

চড়াই জাতকে বলেছে উঞ্ছ!”

পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়

Leave a Reply