মহাবিশ্বে মহাকাশে আগের সমস্ত পর্ব একসঙ্গে
চান্দ্রপথ (অশ্বিনী থেকে রেবতী) – ৩
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

রোহিণীঃ
মাঘ মাসে সন্ধ্যায় আকাশের মাঝ বরাবর তাকালে সামান্য পূর্বদিকে রোহিণী নক্ষত্রের দেখা পাওয়া যায়। এটি কৃত্রিকা নক্ষত্রের পরবর্তী নক্ষত্র। অশ্বিনী থেকে শুরু করলে এটি চান্দ্রপথের চতুর্থ নক্ষত্র। এর অবস্থান টরাস (Taurus) মণ্ডলে। ইংরেজি নাম হায়াডেস (Hyades)। ঋগ্বেদের ‘বিধাতা’ নক্ষত্রই সিদ্ধান্ত জ্যোতিষের ‘রোহিণী’।
নক্ষত্রটির নামকরণ নিয়ে একাধিক মত আছে। যেমন— রোহিণী শব্দের উৎপত্তি রুহ্ ধাতু থেকে। রুহ্ অর্থ আরোহণ। এককালে মহাবিষুব সংক্রান্তি হত কৃত্তিকা নক্ষত্রে। অর্থাৎ নক্ষত্রচক্রের শুরু বা আদি বিন্দু ছিল কৃত্তিকা। পরবর্তী নক্ষত্র রোহিণীকে অবলম্বন করে সূর্যের আরোহণ। অনেকে মনে করেন এই আরোহিণী থেকেই নক্ষত্রের নামকরণ রোহিণী। পাশাপাশি আরও একটি মত আছে। রোহিণী শব্দের অর্থ লোহিত বর্ণ। রোহিণী নক্ষত্রের বর্ণও লোহিত। মৎস্যপুরাণে রোহিত বা লোহিত অর্থে রোহিণী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এই লাল রঙ থেকেও রোহিণী নামাকরণ হতে পারে। রোহিণী প্রজাপতির কন্যা। এক সময় প্রজাপতি নিজ কন্যার প্রতি আসক্ত হয়েছিলেন। পুরাণের এই কাহিনী অনুসারে রোহিণীর দেবতা প্রজাপতি।
দূরবিন আবিষ্কার হয় নি। পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে খালি চোখে আকাশ পর্যবেক্ষণ করে প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিতেরা একটি তারকায় রোহিণী নক্ষত্রের কল্পনা করেছিলেন। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে রোহিণী নক্ষত্রের বর্ণনা করতে গিয়ে তেমনই বলা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে শ্রীপতি, লল্ল, বরাহমিহি্রের মতো গণিতজ্ঞ এবং জ্যোতির্বিদগণ রোহিণী নক্ষত্রে পাঁচটি তারার কথা বলেছেন। পাঁচটি তারার সমন্বয়ে রোহিণী নক্ষত্র একটি ত্রিকোণ শকটের রূপ ধারণ করেছে। তাই একে ‘রোহিণী শকট’ও বলা হয়। পূর্ব প্রান্তস্থিত তারাটি সর্বোজ্জ্বল হওয়ায় এটিকে যোগতারা বলা হয়। এর পাশ্চাত্য নাম অলডেবারেন (Aldebaran)।প্রাচীন ভারতে এটি ব্রহ্মহৃদয় নক্ষত্র (Capella) নামেও পরিচিত ছিল। এর ঋগ্বেদীয় নাম ‘বম্র’ বা ব্রহ্মার মানসপুত্র ৫৩ আলোকবর্ষের দূরের এই তারাটি ঔজ্জ্বল্যের বিচারে মহাকাশে চতুর্দশ তারকা। প্রথম মাত্রার তারকা এটি। রোহিণী নক্ষত্রের উত্তর প্রান্তস্থিত তারাটি এই নক্ষত্রের দ্বিতীয় উজ্জ্বল তারকা। এটি এবং বাকি তিনটি চতুর্থ মাত্রার ঔজ্জ্বল্ববিশিষ্ট তারকা। রোহিণী নক্ষত্রের পুরোটাই বৃষরাশির (Taurus) অন্তর্গত। ১৩০ আলোকবর্ষ দূরের এই নক্ষত্রটি খ-গোলের ৪০০ থেকে ৫৩০২০´ অবধি বিস্তৃত।
রোহিণী নক্ষত্র
মৃগশিরা বা মৃগশীর্ষঃ
কালপুরুষ মণ্ডলের শীর্ষে অবস্থিত তিনটি ক্ষীণপ্রভা তারার সমন্বয়ে গঠিত চান্দ্রপথের পঞ্চম নক্ষত্রের ঋগ্বেদীয় নাম যজ্ঞসোম এবং সৈদ্ধান্তিক নাম মৃগশিরা বা মৃগশীর্ষ। অতীতে এক সময় (আনুমানিক ৬২০০ বছর আগে) বৎসরের সূচনা হত এই নক্ষত্র থেকে। তাই এটি অগ্রহায়ণী নামেও পরিচিত। আবার একে রবিমার্গের শীর্ষে ধরা হত বলে মার্গশীর্ষ নামেও অভিহিত করা হয়। কালপুরুষ মণ্ডলের পশ্চিমে বৃষরাশি ও রোহিণী নক্ষত্র এবং পূর্বে মিথুনরাশি ও আর্দ্রা নক্ষত্র। মৃগশিরের আকৃতিযুক্ত হওয়ায় এর নাম মৃগশিরা বা মৃগশীর্ষ। আকাশে খুব সহজেই নক্ষত্রটিকে লক্ষ্য করা যায়। মৃগশিরা নামকরণ নিয়ে ঐতরেয় ব্রাহ্মণে একটি পৌরাণিক কাহিনি আছে। রোহিণী প্রজাপতি ব্রহ্মার কন্যা। একবার কথা না শোনায় ব্রহ্মা কন্যার প্রতি ক্রুদ্ধ হলে ভয় পেয়ে রোহিণী মৃগীরূপ ধারণ করে পলায়নে সচেষ্ট হন। তাই দেখে ব্রহ্মা মৃগরূপ ধারণ করে তার পশ্চাদ্ধাবন করেন। তখন সব দেবতা একত্রিত হয়ে নিজেদের ঘোরতম অংশ দিয়ে ভূতবানের সৃষ্টি করেন। এই ভূতবানের হাতে মৃগ নিহত হলে প্রজাপতি মৃগরূপ ধারণ করে আকাশে আশ্রয় নেন। এই মৃগের সঙ্গে মৃগশিরের সম্পর্ক থেকেই মৃগশির বা মৃগশীর্ষ নামকরণ।
কালপুরুষ
ঋগ্বেদীয় যজ্ঞসোম বা প্রাচীন মৃগশিরা আর সিদ্ধান্তোক্ত মৃগশিরা এক নয়। এ প্রসঙ্গে শ্রী অরূপরতন ভট্টাচার্য মহাশয় তাঁর প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান বইতে লিখেছেনঃ
“প্রাচীন মৃগশিরা যে কালপুরুষের নিম্নার্ধকে অবলম্বন করে কল্পিত, অমরকোষেও তার উল্লেখ আছেঃ
মৃগশীর্ষে মৃগশিরস্তস্মিন্নেবাগ্রহায়ণী।
ইল্বলাস্তচ্ছিরোদেশে তারকা নিবসন্তি যাঃ।।
অর্থাৎ মৃগশীর্ষ মৃগশিরা ও অগ্রহায়ণী মৃগশিরার পর্যায়। মৃগশিরার শিরোদেশে যে তারাগুলি আছে তাদের নাম ইল্বলা। এগুলি কালপুরুষের কটিস্থিত তারকা। হেমচন্দ্র বলেছেন, মৃগশিরার শিরস্থ পঞ্চতারকাই ‘ইল্বলাঃ’। এই মৃগশিরা কখনো সিদ্ধান্তের মৃগশিরা নয়।”
সিদ্ধান্ত গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত মৃগশিরা নক্ষত্রে তিনটি তারার কথা বলা আছে। তারা তিনটি কলপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলের মস্তকস্থিত তিনটি তারা। এগুলি এত ঘন সন্নিবেশিত যে, এদের সাহায্যে মৃগশিরের কল্পনা খুবই কঠিন কাজ। বাল গঙ্গাধর তিলকের মতেও কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলের নিম্নার্ধই প্রাচীন মৃগশিরা। দুটি পা ও কটির তারাগুলি নিয়ে মৃগের শিরের আকৃতি কল্পনা করা সম্ভব।
অগ্রহায়ণ মাসে চন্দ্র কালপুরুষ নক্ষত্রে উদয় হয়। তাই চন্দ্র বা সোমকে মৃগশিরার অধিপতি কল্পনা করা হয়। ফাল্গুন মাসে সন্ধ্যায় নক্ষত্রটিকে মধ্য আকাশে ঈষৎ দক্ষিণ চেপে খুব সহজে দেখতে পাওয়া যায়।৫৩০২০’ থেকে ৬৬০৪০’ পর্যন্ত বিস্তৃত নক্ষত্রটির অর্ধেক পড়েছে বৃষ রাশিতে এবং বাকি অর্ধেকটা পড়েছে মিথুন রাশিতে।
তথ্য সূত্রঃ
১) Hindu Astronomy, W. Brennand, London, 1896.
২) প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান, অরূপরতন ভট্টাচার্য, কলকাতা, ২০০৬।
৩) রমেশচন্দ্র দত্ত— ঋগ্বেদ-সংহিতা, কলিকাতা, ১২৯২
৪) সুকুমাররঞ্জন দাশ – হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যা, বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ, কলিকাতা, ১৩৫৩