ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি হনুমানেরা নাকি সমাজবদ্ধ জীব, মিলেমিশে থাকে, ভাগ করে খায়। আমাদের পাড়ায় এখন খুব হনুমানের উৎপাত। চারদিকে সেরকম গাছপালা নেই। কিন্তু আমাদের বাড়ির পিছনের পেঁপে গাছটা ওদের ভারী পছন্দ। গাছটা ছোটো থাকতেই ওরা বেশ কয়েকবার খিদের জ্বালায়, পেঁপে পাতাগুলো খেয়ে, ডাল মুড়িয়ে, নেড়া করে দিয়েছিল। গাছটা তবু বড়ো হয়েছে, হয়ত ওদের কথা ভেবেই! এখন গাছে বেশ বড়ো বড়ো পেঁপে হয়। আর সেগুলো খাওয়ায় জন্য ওদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। দলের সবচেয়ে দৌড়বাজ বীর হনুমানটাই আগে পেড়ে ফেলে। দলের অন্যান্য দুর্বল সদ্স্যদের একটুকরো দেওয়ার কথা ভাবে না। কেমন যেন স্বার্থপর ঠেকে ব্যাপারখানা! তবু ওরা কেউ কিছু বলে না, হয়ত ভয়ে। বা বলতে গেলেও সেই ক্ষমতাবান হনুমানের বিশ্রী দাঁত খেঁচানো কিংবা বলপ্রয়োগ দেখে ওরা সিঁটিয়ে পড়ে। বাচ্চা হনুমানগুলো সেই প্রভাবশালী হনুমানের কাণ্ডকারখানা হাঁ করে দেখে। শেখে… পরে হয়ত বড় হয়ে ওরাও এরকম “বীর হনু সমাজ” গড়ে তুলবে!
মাঝে মাঝেই দেখি দুটো হনুমানের মধ্যে তুমুল ধস্তাধস্তি হতে। দলের অনেক হনুরাই সেটা বসে বসে দেখে, ব্যাপারটা উপভোগ করে, তবু ওদের থামায় না। এটা তো আমাদের সমাজেও ঘটে! তাই তো মধ্যপ্রদেশের ফুটপাতে জনসমক্ষে একটি মেয়ের ধর্ষণ করা হল, অথচ কেউ প্রতিবাদ করল না।
দাদুর কাছে একবার একটা ঘটনা শুনেছিলাম। একজোট হনুমানের দলের মধ্যে একটা ছেলে হনুমান জন্মায়। এর ফলে ওই দলের বীর হনুমানটা ক্ষুব্ধ, কারণ সে চায় না তার মতো ক্ষমতাবান আর কেউ হোক! ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে মা হনুমানটা বাচ্চাটাকে খুব আগলে রাখত। কিন্তু একদিন কোনো কারণে সেই বীর হনুমানটা ক্ষেপে গিয়ে, একা দেখে বাচ্চাটাকে আক্রমণ করে। মা হনুমান টা দৌড়ে এসে বীর হনুমান টাকে বাধা দিলে, মা হনুমানটার ঘাড় কামড়ে ধরে, প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিয়ে ওকে মেরে ফেলে। পরে অবশ্য বাচ্চাটারও মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এসব শুনলে আমরা দুঃখ প্রকাশ করি, কিন্তু আমাদের সমাজে এগুলো ঘটতে দেখলে চোখ বুজে, মুখে কুলুপ এঁটে সহ্য করে নিই। প্রতিবাদের স্পর্ধা দেখাতে ভুলে যাই।
আজকাল কুকুরগুলো হনুমানদের দেখে তাড়া করলে কিংবা ঘেউ ঘেউ করলে ওরা আর পালায় না, প্রতিবাদ করে না। মনুষ্য জাতির নীরবতা দেখেও ওরাও খুব উৎসাহ পায়। তাই ওরা নিজেদের লোমের ঘনত্বও বাড়িয়ে ফেলেছে কয়েকগুণ !
তাহলে মানুষ আর হনুমানের প্রভেদ কিসে? আছে বৈকি! আছে বলেই তো সেই রাতের নৃশংস, পাশবিক ঘটনার প্রতিবাদ চলছে সারা বিশ্বজুড়ে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরেই চলছে মানববন্ধনের ডাক। বিচারের জন্য মানুষ দিচ্ছে ডাক। আশা রাখছে এর কিনারা হবেই। বাঙালিরা জানে কীভাবে মেরুদণ্ড বেঁকে গেলেও সোজা করতে হয়। জানে কীভাবে বিপথে গেলেও নিজেকেও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হয়। একারণেই এখনও নিজেকে বাঙালি বলতে গর্ব হয়।