জয়ঢাকের বিপুল ভূতের আড্ডা

রাজারহাট থেকে প্রায় এগারো কিলোমিটার ভিতরে ছাপনার কাছে ছোট গ্রাম ভাতিন্ডা। গ্রাম ভেঙে শহর হওয়ার চল অনুসরণ করে এখানেও কাজ শুরু হয়েছে কিছুকাল ধরে। চারদিকে ফাঁকা মাঠ, দিগন্তে ছোট গ্রাম, আর বেশ ক’টা নবনির্মিত বাড়ি। বড়রাস্তার ধারে এইসব বাড়িগুলো আসলে বিভিন্ন এঞ্জিনিয়ারিং ও রিয়াল এস্টেট সংস্থার গোডাউন। দিনের বেলা কর্মচারীরা গোডাউনে কাজ করে আর রাতে বড় রাস্তার ট্রাকচালকদের বিশ্রামের ঠিকানা হয় এই গোডাউনগুলো।
এবারের ঘটনাটা এইরকমই একটা গোডাউনকে নিয়ে। গোডাউনটা একটা ইলেকট্রিকাল সংস্থার। এদের কাজ ছোট ট্রানস্ফর্মার, সুইচবোর্ড, মিটার ও বিভিন্ন ইলেকট্রিকাল যন্ত্রপাতির নির্মাণ ও সরবরাহ। এরা গোডাউনটা নিয়েছে প্রায় তিন-চার বছর হল। একটা দোতলা বাড়ি, মালিক সস্তায় বেচে পালায়। গোডাউনের কর্মচারী ও মালপত্রের দেখাশোনার জন্য আছেন একজন সশস্ত্র পাহারাদার, মালপত্র দেখাশোনার জন্য রাতেও থাকবার কথা তাঁর ওই বাড়িতে।
কদিন কাজের পরই কিন্তু পাহারাদার বেঁকে বসেন। “ইস ঘর মে ভূত হৈ” বলে চাকরি ছেড়ে পালান তিনি। কর্মচারীরা তখনও তেমন গায়ে মাখেনি ব্যাপারটা। তবে কদিনের মধ্যেই তাদের গলায়ও সেই একই সুর! বাড়িটাতে নাকি সন্ধের পর গা ছম ছম করে। পায়ের আওয়াজ আসে দোতলা থেকে, মাঝে মাঝে মনে হয় কেউ যেন ঘাড়ে শ্বাস ফেলছে।
কদিনের রাতের পাহারায় বিরতির পর আরেকজন পাহারাদার আসেন, শক্তপোক্ত চেহারা, নেশাভাঙ করেন না, ঘোর নাস্তিক আর বেশ মজার লোক। তাঁর নাম বিপ্লবদা। এ ঘটনাটা ওঁর থেকেই জানা।
কাজ চলতে থাকে, তবে কোনও কর্মচারীই সাতটার পর গোডাউনে থাকতে চায় না। দারোয়ানবাবুর রাতের সঙ্গী কিছু ট্রাকচালক। তারা বেশ রাত অবধি তাস খেলে, তারপর রান্না হয় আর খেয়ে রাতের ঘুম। ওপরের তলায় দুটো ঘর, আর নিচের তলায় একটা বড় প্যাসেজ, একটা হলঘর, একটা রান্নাঘর আর একটা ঠাকুরঘর। ড্রাইভাররা সবাই ওপরের একটা ঘরে, আর বিপ্লবদা অন্য একটা ঘরে ঘুমোন।
ইতিমধ্যেই আশপাশে খবর নিয়ে জানা গেছে এই বাড়িতে দুজন আত্মহত্যা করেছিলেন। বাড়ির মালিকের স্ত্রী আর পনেরো বছরের মেয়ে। একদিন মালিক বাড়ি এসে দেখেন রান্নাঘরে গায়ে আগুন দিয়ে তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন,আর তার মেয়ে ঠাকুরঘরে গলায় দড়ি দিয়েছে। বাড়ি বেচে মালিক কোথায় পালান কেউ জানে না।

বিপ্লবদা বলেন, তিনি নাকি রাতে প্রায়শই একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পান, একদিন রাতে জল খেতে নিচে নেমেছিলেন, দেখেন রান্নাঘরটা দাউ দাঊ করে জ্বলছে। একদিন সন্ধেবেলা এক কর্মচারীর আওয়াজ পেয়ে একতলার প্যাসেজটায় ঢুকে মনে হয়েছিল যেন রক্ত হিম হয়ে গেছে, দৌড়ে পালিয়ে বাঁচেন, কর্মচারীটি ঐখানেই অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন অনেকক্ষণ।
এর পর একদিন রাতে নিচের বাথরুমে গিয়ে ফেরার পথে বিপ্লবদার অনুভুতি হল, কেউ তাঁর হাত ধরে টানছে।। প্যাসেজটা হঠাৎ যেন ভীষণ ঠান্ডা হয়ে গেছিল তখন। বেপরোয়া হয়ে হাতের বন্দুক থেকে এলোমেলো গুলি চালালেন তিনি। সেই শব্দ পেয়ে ওপর থেকে আলো নিয়ে ড্রাইভাররা নেমে এলে সেই যাত্রায় বেঁচে যান। তারপর থেকে রাতে একা কেউ নিচে নামত না।
এক তরূণ ড্রাইভার একদিন ক্লান্ত হয়ে ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে নিচের ঠাকুরঘরে ঘুমোতে যান তাস খেলবেন না বলে। সেখান থেকে এমনিতেই নানারকম হব ভেসে আসত রোজ। ড্রাইভারটি নির্ভীক কারো কথা না শুনে নেমে গেলেন ঠাকুরঘরে শুতে। রাত বাড়লে অন্যরা নিচে নামে বেচারাকে ভয় দেখিয়ে তার ঘুম নষ্ট করতে। নিচে নামতেই শোনে ঠাকুরঘর থেকে গোঙানোর আওয়াজ আসছে। ছুটে গিয়ে ঘরে ঢুকে তারা দেখে, ছেলেটা তার দুহাত বুকের কাছে এনে হাওয়ায় তীব্র ধাক্কা মারছে, আর চোখমুখ লাল হয়ে গিয়ে গোঙাচ্ছে। বাকিরা ধাক্কা মেরে ছেলেটাকে ওঠাতে চেষ্টা করে কিন্তু অদৃশ্য কিছু ভার যেন তা করতে দিচ্ছিল না। অনেক চেষ্টার পর যখন ছেলেটাকে জাগানো গেল তখনো সে গোঙাচ্ছে। তাকে নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে। ডাক্তার রিপোর্ট দিলেন, পাঁজরের হাড় ভেঙে গেছে, ভারী কিছু অনেকক্ষণ ধরে বুকের উপর রেখে দেওয়ায় ইন্টারনাল হেমারেজও হয়েছে। ছেলেটি এখন সুস্থ। বলে “ইস ঘর মে আত্মা হৈ, হামনে দেখা । এক জ্বলতা হুয়া শির হামারে ছাতিপর খাড়া হুয়া থা। হাম উসকো রোক না পায়ে।” ড্রাইভাররা এখন এই গোডাউন এড়িয়ে চলেন।
বিপ্লবদা অন্য আরেকজন পাহারাদারের জন্য দরখাস্ত করেছিলেন তবে তা মেলেনি। অভিশপ্ত বাড়িটিতে তিনি প্রায় একলাই রয়ে গেছেন। জানা নেই আর কতদিন থাকতে পারবেন।
সম্পাদকীয় সংযোজনঃ বাড়িটা সত্যিই আছে। কোন সাহসী চাইলে আমাদের মেল করলে ঠিকানা দেব। ঝুঁকি কিন্তু তোমার নিজের। আমাদের দোষ দিও না।