ভূতের আড্ডা- ভূতের বাড়ি-রাইটার্স বিল্ডিং-পিকলু-জয়ঢাক৪৯-বর্ষা২০১৫

জয়ঢাকের বিপুল ভূতের আড্ডা

bhuteradda4901

রাইটার্স বিল্ডিং বা মহাকরণ আমাদের কলকাতার একটি ঐতিহ্যপূর্ণ ইমারত। প্রায় তিনশ কুড়ি বছর ধরে কলকাতার বুকে বিভিন্ন সরকারের উত্থানপতনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আগেরই মতই । আজকের দিনেও বহু সরকারি চাকুরের দশটা থেকে ছটার কর্মস্থল এই রাইটার্স বিল্ডিং। উপস্থিত তার সারাইয়ের কাজ চলছে। সে উপলক্ষে মুখ্যমন্ত্রীর অফিস  বর্তমানে নবান্নে স্থানান্তরিত হলেও তা আগে এই মহাকরণেই ছিল সুতরাং স্পষ্টতই কলকাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাড়িগুলোর মধ্যে এটা একটা। তাও আবার সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকেই। 

ষোলশো নব্বই সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম এই জায়গার অধিকারে আসে তখনি সেন্ট অ্যান চার্চের নির্মাণ হয় এখানে যদিও তা এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়।  পরে সতেরোশো ছিয়াত্তর সালে ওয়ারেন হেস্টিংস গভর্নর থাকাকালীন টমাস ল্যিন নামে এক ইংরেজ সেন্ট অ্যান চার্চের  ধ্বংসস্তূপের উপর তৈরি করেন কলকাতার প্রথম তিনতলা একটি ইমারত। এখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেরানি ও চাকরদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।  রাইটার বলতে তখন সেই সকল কেরানি ও চাকরদের বোঝানো হত, (রাইটার মানে এক্ষেত্রে ছিল যিনি নথি লেখেন অর্থাৎ যিনি কেরানির কাজে নিযুক্ত।) সেখান থেকেই এর নাম হয় রাইটার্স বিল্ডিং। 

এ বাড়ির পুরানো দেয়াল অনেক ইতিহাসের ছায়াসঙ্গী। ষোলশো পঁচানব্বইতে সেন্ট অ্যান চার্চ এক ভয়াবহ ঝড়ে ধ্বংস হয়ে যায়, প্রাণ হারান বহু মানুষ।  উনিশশো তিরিশ সালে বিনয় বাদল দিনেশের রাইটার্স এ হানা ও ক্যাপ্টেন সিম্পসনের হত্যা। তারপর বাদল সায়ানাইড খেয়ে মৃত্যুবরণ করেন এখানে। বিনয় হাসপাতালে মারা যান। দীনেশের ফাঁসী হয়। প্রাণ হারান বেশ কিছু ইংরেজও। আজকের রাইটার্স বিল্ডিং নিঃশব্দে দেখেছে সবই।

ইতিহাস আর রক্তে আঁকা দেয়ালগুলো তাই হয়তো রাতে যেন জেগে ওঠে, বহুদিন ধরেই এখানে ভূতুরে নানান ঘটনার কথা শোনা যায়। অফিস টাইমের পর অনেকেরই এখানে ছায়ামূর্তি দেখার অভিজ্ঞতা আছে। বিল্ডিং এর ফিফথ  ব্লকে রাতের বেলায়  ক্যাপ্টেন সিম্পসনের ছায়া নাকি আজও ঘুরে বেড়ায়, হয়তো সেই বিপ্লবীদের অপেক্ষায়। তাই সন্ধে সাতটার পর বিল্ডিংএর ব্যস্ততম অফিসেও মানুষ দেখা যায় না। নাইটগার্ডেরাও রাত বাড়লে একা পাহারা দেন না এখানে। রাইটার্সের পাশ দিয়ে বেশ রাত করে যাতায়াতের সময় অনেকেই এখানে পায়ের শব্দ, পুরানো ইংরেজিতে কথোপকথন ও কখনো চিৎকারেরও শব্দ পেয়েছেন।

 কিছুদিন আগে “একদিন” নামে এক খবরের কাগজে এই নিয়ে একটি লেখাও বেরোয়, যেখানে একজন মন্ত্রী ভূতে অবিশ্বাসীদের সাহস থাকলে রাইটার্স বিল্ডিং-এ একরাত কাটিয়ে যেতে বলেছেন। তিনি নাকি নিজে চোখে দেখেছেন একদল ছায়া তাঁকে তাড়া করে আসতে।

উপস্থিত মহাকরণ স্থানান্তরিত হয়েছে হাওড়ার নবান্নে। রাইটার্স বিল্ডিং-এ সারাইয়ের কাজ চলছে। এবারে যখন তা ফের নতুন চেহারায় ঝকমকে হয়ে দেখা দেবে, কে জানে ভূতগুলো আর থাকতে পাবে কি না! আলো-আঁধারি নির্জন করিডোর, সিম্পসনের মৃত্যুর সেই ফিফথ ব্লক—যা যা তাদের প্রিয় সেইসবই তো বিদেয় হবে নতুনের ছোঁয়ায়। ভূতগুলো কোথায় যাবে বলো তো?

জয়ঢাকের বিপুল ভূতের আড্ডা

Leave a Reply