
রকি বেয়ে গল্পেরা সব প্রেইরি জুড়ে নামে,
জুটিয়ে নিয়ে লিখছি চিঠি, মেপল পাতার খামে।
পর্ব ২
ঠিক যখন ভাঁজ করে তুলে রাখা হুডিগুলো ঝেড়ে টেড়ে গায়ে চাপানোর দরকার পড়ে, গাছের মাথাগুলো একটু হলদেটে হয়েছে, নাকি চোখের ভুল এমন মনে হতে শুরু করে, ঠিক এমন দিনে ম্যাকডি’র বাইরে চকচকে নীল খয়েরিতে বিজ্ঞাপন দেখা যায় – পামকিন স্পাইস ল্যাটে। ডেয়ারি কুইন এক কাঠি সরেস, তাদের আবার পামকিন স্পাইস ব্লিজার্ড, যেটা কিনা এক ধরণের আইসক্রিম আসলে। প্রথমবার দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ। কুমড়োর ছক্কা জানি, গ্রেট করে কুমড়ি জানি, এমনকি পটল কুমড়ো আলু নারকেল দিয়ে উমদা এক দেবভোগ্য বস্তুর সঙ্গেও বিলক্ষণ আলাপ আছে, কিন্তু ইটা কী বটেক? কফিতে কুমড়ো মসল্লা! আইস কিরিমেও কুমড়ো গুলে দেবে! নৈব নৈব চ’। কিন্তু ততক্ষণে শহরের মুখ পামকিন স্পাইসের বিজ্ঞাপনে বিলকুল ঢেকে গেছে। সাহস সঞ্চয় করে একদিন সে বিতর্কিত বস্তু কিনেই ফেললাম।
মন্দ লাগল না কিন্তু।
একটু এলাচ এলাচ দারচিনি দারচিনি ভাব। কুমড়ো কুমড়ো ভাব খুঁজে পেলাম না বিশেষ। এদিকে বাজার করতে গিয়ে দেখি স্টোরের বাইরে স্তূপ করে কুমড়ো রাখা।

বুঝতেই পারছ, হঠাৎ করে এমন কুমড়োপ্রীতি জন্মানোর কারণ কী। ঠিক, হ্যালোউইন অ্যারাইভেথ। এঁয়ারা সব কুমড়ো ঘাড়ে বাড়ি ফিরবেন, ছোট্ট ধারালো ছুরি দিয়ে কুরে কুরে ভয়ানক সব মুখ বানাবেন, তারপর ভিতরে লাল আলো জ্বালিয়ে বারান্দায়, সিঁড়ির ধাপে, বাগানের আবছা কোণে বসিয়ে রাখবেন।
অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে এই কীর্তি শুরু হয়ে যায়, তারপর মাসের শেষ দিনে শুরু হয় ধুন্ধুমার কাণ্ড। সে কথায় পরে আসছি, তার আগে এই মেপল পাতার দেশে এহেন ভুতুড়ে কাণ্ড শুরু কবে হয়েছিল, করেছিলই বা কারা সেটা একটু বলি।
আসলে কেলটিকরা (এক্ষেত্রে আইরিশ আর স্কটিশরা) ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি যখন দলবদ্ধভাবে কানাডায় আসতে শুরু করে, স্বাভাবিকভাবেই তখন তাদের বহুকাল ধরে পালন করা নানা আচার অনুষ্ঠান কিছু পরিবর্তিত, কিছু পরিবর্ধিত হয়ে জনজীবনে ছড়াতে থাকে। এই কেলটিকরা অক্টোবরের শেষ দিন বা নভেম্বরের পয়লা দিনে ‘সাউইন’ বলে একটা অনুষ্ঠান পালন করত। তাদের ভাষায় সাউইন মানে গ্রীষ্মশেষ। এই গ্রীষ্মশেষ শব্দটার কিন্তু একটা আলাদা তাৎপর্য আছে। যদি গ্রীষ্মকালকে বছরের আলোকিত সময় আর শীতকালকে বছরের অন্ধকার সময় বলে ধরা যায়, তাহলে অক্টোবরের এই শেষ দিনকে (মতান্তরে নভেম্বরের প্রথম দিন) আলো ও অন্ধকারের বিভাজন রেখা হিসেবে ধরা যেতেই পারে। এই এদিকও বটে ওদিকও বটে ব্যাপারটা কেলটিক বিশ্বাসে ছিল অতিপ্রাকৃতিক। সেইদিন মৃত আর জীবিত জগতের মাঝখানের বেড়া মিলিয়ে যেত ও মৃতরা ইচ্ছামত চলে আসতে পারত জীবিতদের মাঝে। এই ছিল তাদের দৃঢ় বিশ্বাস। মৃতদের আত্মার সঙ্গে দৈত্য দানো পরীরাও চলে আসতো ইহজগতে। এই সাউইনের রাতই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে হ্যালোউইনের রাত।
আয়ারল্যাণ্ডে পুকা নামে এক দুষ্টু পরীর কথা শোনা যায়। সে ভালো মন্দ দুটোই নাকি করতে পারে, কিন্তু এতই দুষ্টু যে ভালো করবে না খারাপ করবে তার কোনো স্থিরতা নেই। তাই এখনো অনেক আইরিশরা হ্যালোউইনের রাতকে বলে পুকি নাইট। ইংরিজিতে স্পুকি শব্দের জন্ম হয়েছে এই পুকি থেকেই।
কেলটিকরা সাউইনের রাতে বেশ কিছু আচার অনুষ্ঠান পালন করতো যেগুলো প্রায় একইরকম ভাবে এখন হ্যালোউইনের অংশ। একে একে বলি সেগুলো।
মৃতদের দল যাতে জীবিত জগতের শিশুদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে, তাই তাদের নানারকম ছদ্মবেশে সাজিয়ে দেওয়ার রীতি ছিল। স্বাভাবিকভাবেই সে সাজগোজ যদি ভৌতিক হয়, তবেই মৃতরা তাদের নিজেদেরই একজন ভাববে, ক্ষতি করবে না। এখন অবশ্য এখানে ছোটরা নয় শুধু, বড়রাও রীতিমতো উদ্ভট সাজগোজ করে ঘুরে বেড়ায় হ্যালোউইনের রাতে। চিরাচরিত ভ্যাম্পায়ার, রক্তঝরা দাঁতওলা প্রেতিনী প্রভৃতির কস্টিউম তো আছেই, পাশাপাশি ভৌতিক জগতের সঙ্গে সম্পর্কহীন স্পাইডারম্যান, আয়রনম্যান, ব্ল্যাক উইডোর মতো সুপারহিরো কস্টিউমও খুবই জনপ্রিয়। তাছাড়া ছোটরা স্নো হোয়াইট, সিণ্ডারেলার মতো বিবিধ ডিজনি প্রিন্সেসের কস্টিউম খুব পছন্দ করে। কিশোর কিশোরীদের পছন্দ সুপারহিরো, জলদস্যু বা ফায়ার ফাইটারদের পোশাক। কানাডায় ফায়ার ফাইটাররা সুপার হিরোর মতো সম্মান পায়।
বড়রা আবার ভীষণ অদ্ভুত সব কস্টিউম পরে। ড্রাগন থেকে ডাইনোসর, সব রকম কস্টিউমই পাওয়া যায়। আমি একবার একজনকে কুমিরের কস্টিউম পরতে দেখেছিলাম। না, তিনি বুকে হেঁটে অবশ্যই যাচ্ছিলেন না, পিছন থেকে দেখে মনে হচ্ছিল কুমিরটা পিছনের পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা উচিত নয় বলে আর ছবি তোলা হয়নি। এমনকি পিৎজা, ডোনাট, কাপকেক সাজতে চাইলেও সে ইচ্ছা পূর্ণ করার উপযুক্ত কস্টিউম কিনতে পাওয়া যায়। প্রায় প্রত্যেকটা কস্টিউমের সঙ্গে থাকে সেই “লুক”টা আনার উপযুক্ত মেক-আপ। যদিও এরকম সাজার ইচ্ছা কেন আদৌ হবে সে অন্য প্রশ্ন।
শুধু কস্টিউমই বা কেন, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই স্টোরগুলোতে হ্যালোউইন সম্পর্কিত নানারকম ভুতুড়ে দ্রব্য বিক্রী হওয়া শুরু হয়। সেসব জিনিস বারান্দায়, বাগানে লাগিয়ে নির্মল আনন্দ লাভ করে সবাই। কেউ বাড়ির সামনে দৈত্যাকার মাকড়সা লাগিয়ে ফেলে, গাছে ঝুলিয়ে দেয় মাকড়সার জাল। কেউ আবার সামনের লনটাকে কবরখানা বানিয়ে ফেলে। যেমন তেমন কবরখানা নয়, কোথাও কফিন খুলে কঙ্কাল বেরিয়ে আসছে, কোথাও বা মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে ভয়ানক দর্শন হাত। গাছ থেকে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা কঙ্কালও বিরল নয় মোটে। বেশ বিশ্বাসযোগ্য দেখতে কঙ্কাল, কফিন, কাটা হাত পা স্তূপ করে বিক্রি হয়।
ভালোই দাম জিনিসগুলোর। তবে ঘুমচোখে উঠে অন্যমনস্ক হয়ে নিজের বাগান বা বারান্দার দিকে তাকিয়ে নিজেই আঁতকে ওঠা খুব বিচিত্র নয়। গড়পড়তা কঙ্কাল ছাড়াও পাওয়া যায় হলিউডের বিখ্যাত হরর মুভির চরিত্রদের। অ্যানাবেল তো ভীষণই জনপ্রিয়। যা ছিল প্রাচীন এক রীতি, আজ তাকে ঘিরে বেড়ে উঠেছে ফলাও এক ব্যাবসা, যেমনটা প্রায় সমস্ত আচার অনুষ্ঠানকে ঘিরে হয়ে থাকে সব দেশে। কঙ্কাল মাকড়সা টাকড়সাগুলো হয়তো একাধিক বছর ধরে ব্যবহার করা চলে, কিন্তু দোকানে বিক্রি হওয়া কস্টিউমগুলোর মান খুবই খারাপ হয়। একবার পরার পর আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না। অনেকে অবশ্য এখনো হাতে বানিয়ে নেন নিজেদের কস্টিউম।
স্কুলেও হ্যালোউইন কস্টিউম পরে যেতে বাধা নেই, যদি না ক্যাথলিক স্কুল হয়। সেরা কস্টিউম প্রতিযোগিতাও হয় অনেক স্কুলে। প্রাচীন সাউইনের গাম্ভীর্য হারিয়ে গেছে বহুদিন, থেকে গেছে নিখাদ মজাটুকু।
নীচের ছবিগুলো ওয়ালমার্টের। সেপ্টেম্বর পড়তে না পড়তেই সাজোসাজো রব পড়ে যায় এরকম স্টোরগুলোতে, অক্টোবরের মাঝামাঝি চাঁছাপোঁছা করে সমস্ত বিক্রিও হয়ে যায়।

এবার আসি কুমড়োর উপাখ্যানে। ঘট ছাড়া যেমন পুজো সম্ভব নয়, কুমড়ো ছাড়া তেমন হ্যালোউইন বিকল। রাগী কুমড়ো, হাস্যমুখ কুমড়ো, বিরক্ত কুমড়ো, ভূতুড়ে কুমড়ো সঅব আছে। কিন্তু হঠাৎ কুমড়ো কেন? গল্পটা কিন্তু বেশ মজার।
এটা প্রায় তিনশো বছরের পুরানো এক আইরিশ লোককথা। স্টিঞ্জি জ্যাক নামে এক হাড়কিপটে মাতাল ছিল। সে আবার চিটিংবাজও সেই সঙ্গে, একেবারে গুণনিধি যাকে বলে আরকি। সে পটল তোলার পর, মহাকিপটে বলে স্বর্গে ঢুকতে পেলো না, আবার নরকেও ঠাঁই হলো না কারণ সে নাকি স্বয়ং শয়তানের সঙ্গেও চিটিংবাজি করেছিল। তাকে নরক থেকে একখণ্ড আংরা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, বাপু হে, অনেক জ্বালিয়েছ। এবার যাও, জীবন আর মৃত্যুর মাঝামাঝি অঞ্চলে (মানে টোয়াইলাইট জোন আরকি) ঘুরে বেড়াও। ওই আংরার আলোয় পথ দেখো’খন।
বেচারা জ্যাক আর কী করে, কোথা থেকে একটা শালগম যোগাড় করে, সেটার ভিতরটা কুঁদে নিল। তারপর সেই শালগমের ভিতর আংরাটা রেখে শুরু করলো তার অনন্ত যাত্রা। সেই থেকে তার নাম হলো জ্যাক অফ দ্য ল্যানটার্ণ। সাউইনের রাতে কেলটিকরা তাই শালগম, বীট বা আলুর ভিতর আলো জ্বালিয়ে জানলায় বা দরজার গোড়ায় রেখে দিত যাতে স্টিঞ্জি জ্যাক বা ওরকম কোনো দুষ্ট আত্মা এসে হামলা না করে।
তারপর কানাডায় এসে কেলটিকরা এই বড় বড় কুমড়ো দেখে তো মুগ্ধ। এর ভিতরটা নরম অনেক, ফলে কুঁদে ফেলাটা সহজ, আলো রাখারও মেলা জায়গা। একটু বেশি সৃষ্টিশীলতা যাদের মধ্যে ছিল, তারা আবার চোখ মুখ, বিকট হাসি এসবও কুরে কুরে বানিয়ে দিল কুমড়োর গায়ে। শুরু হয়ে গেল মজার একটা রীতি। আজকাল তো অনেক স্কুলে কে কত বিকট মুখ বানাতে পারে কুমড়ো দিয়ে তার প্রতিযোগিতা পর্যন্ত হয়। দোকানে নানা বিকট মুখশ্রীর কুমড়ো পাওয়া যায়, তবে সেগুলো সত্যিকার কুমড়ো নয়। আসল কুমড়ো কুঁদে নিজেদের ইচ্ছামত মুখ বানানোর মজাটাই আলাদা। এটাকে ঘিরেও যথারীতি বেশ একটা ব্যবসা চলে। খামারগুলোতে “পিক ইয়োর ওন পামকিন” নামে রীতিমত একটা ইভেন্ট হয়। সেখানে টিকিট কেটে ঢুকে ক্ষেত থেকে নিজেদের পছন্দমত কুমড়ো তুলে আনা যায়, অবশ্যই বাজারের থেকে অন্তত দেড়গুণ বেশি দাম দিয়ে। সবই বেশ ফিল-গুড ব্যাপার, কিন্তু এর সঙ্গে যে একটা বিশাল পরিমাণ খাদ্য অপচয় জড়িয়ে আছে, সেটা ভোলা একটু মুশকিল হয় বইকি। আগের প্রজন্ম কুরে বের করা কুমড়োর অংশ দিয়ে পাই বানাতো, আজকাল ওগুলোর জায়গা হয় জঞ্জালের বিনে। হ্যালোউইনের পর কুমড়োর বাকিটাও ওই বিনেই যায়। আদতে গরীব দেশের মানুষ তো, খাদ্য অপচয়টা গায়ে লাগে। সে যাক, দেখায় কিন্তু খাসা।
পুরানো পাড়ার কয়েকটা বাড়ির ছবি দিলাম সঙ্গে।

তবে সবাই যে নিরীহ কুমড়োতে সন্তুষ্ট হয় তা নয়, কারুর কারুর কল্পনাশক্তি কিঞ্চিৎ লাগামছাড়া হয়ে পড়ে হ্যালোউইনের আগে। যেমন এনারা। দেখে আমার হার্ট এ্যাটাক হবার উপক্রম হয়েছিল।

সাউইনের কোনো কোনো আচার অবশ্য পালন করা হয় না আর। সেটা হয়তো পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে। যেমন একসময়ে বাংলার গ্রামে নষ্টচন্দ্রের রাত পালন করা হতো। ভাদ্র মাসের শুক্ল পক্ষের চতুর্থীর চাঁদের দিকে তাকালে নাকি চাঁদের কলঙ্ক গায়ে লেগে যায় এমন ধারণা প্রচলিত ছিল। আর সেই কলঙ্ক কাটানোর উপায় ছিল সেই রাতে ছোটখাটো কুকর্ম করা, যেমন এক গোয়ালের গরু অন্য গোয়ালে বেঁধে আসা, গাছের ফল পাকুড় চুরি করা, ইত্যাদি। ঠিক এইরকম একটা কুকর্ম করার রীতি প্রাচীন হ্যালোউইনের রাতগুলোর সঙ্গে জুড়ে ছিল। লোকের ওয়াগনের চাকা, ছোট কাঠের গেট বা পিপে এরকম দরকারী অথচ ছোটখাটো জিনিস লুকিয়ে রেখে দুষ্টুমি করতো ছোটরা। তারপর যাদের বাড়ির জিনিস সরানো হয়েছে তাদের দরজায় ঘা দিয়ে খাবার দাবী করতো তারা। বড়োরাও এই দুষ্টুমিতে বিরক্ত হতো না, বরং বাচ্ছাদের হাতে লজেন্স চকোলেট তুলে দিয়ে হারানো জিনিস ফেরত পেত। কালক্রমে এটাই দাঁড়িয়ে যায় ট্রিক অর ট্রিট-এ। ছোটরা নানারকম মজাদার বা ভূতুড়ে সাজগোজ করে পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ব্যাগ ভরে পছন্দমত ক্যান্ডি নিয়ে আসে। কানাডাতে এমন ঘটনার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৯৮ সালে, ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারে।
বছর তিনেক আগেও বাচ্ছাদের সাজগোজ করে নিজেদের বাড়ির কাছাকাছি চেনা অচেনা সব বাড়িতেই নির্দ্বিধায় চলে যেতে দেখেছি। তারপর কোভিড জনিত বিধি-নিষেধ আরোপ করা হলেও একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি ট্রিক অর ট্রিট। তখন বাড়ির বাইরে মস্ত গামলায় প্রচুর ক্যান্ডি রেখে দিতে দেখেছি অনেককে।
তবে, দিনকাল পাল্টাচ্ছে বেশ। গত কয়েক বছরে ক্যালগেরি শহরকে পাল্টাতে দেখেছি ভীষণভাবে। একটা কারণ অবশ্যই প্যানডেমিক, আর একটা কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি। ২০২০-২১ নাগাদ যে রাস্তায় সারাদিনে হয়তো পঞ্চাশটা গাড়ি যেত, এখন সেখানে গাড়ির সারি। কখনো যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন থেকে, কখনো আফ্রিকা থেকে, ভিয়েতনাম থেকে, কোরিয়া থেকে মানুষ আসছে কানাডায়। ভারতীয় আর বাংলাদেশীরা তো বহুদিন ধরেই আছে এখানে।
কানাডাকে স্বচ্ছন্দে মানুষের বুলবুলভাজা বলা চলে। স্বাভাবিকভাবেই তার ভালো খারাপ দুই দিকই আছে। এই বছর তার একটা দিক ভীষণভাবে চোখে পড়ল। ঠিক হ্যালোউইনের কিছু আগে, আমরা বাড়ি শিফট করে শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল থেকে উত্তর-পশ্চিমে এসেছি। এটাও একেবারে মিশ্র সম্প্রদায়। আমাদের উল্টোদিকের বাড়িতে থাকেন এক জাপানি পরিবার, পাশে পর পর দুটো বাড়িতে ইওরোপীয়রা। কোণাকুণি বাড়িতে আফ্রিকা থেকে আগত মানুষ থাকেন। হ্যালোইনের দিন বিকেলবেলা আমার ডোরবেলের ভিডিও ক্যামেরা জানান দিল বাইরে কেউ ঘোরাঘুরি করছে। রেকর্ডিং চালিয়ে দেখলাম এক ভ্যাম্পায়ার তার দুই প্রেতিনী সঙ্গিনী নিয়ে কম্পাউন্ডে ঘুরছেন। তাঁদের বয়স ওই বছর দশ বারো হবে। আমিও কুকি ক্যান্ডি নিয়ে তৈরি। বেল বাজালেই ছুটব। ওরা কিন্তু এলো না। আমরা খুব সম্প্রতি এখানে এসেছি, ওদের অচেনা। তাই হয়তো এড়িয়ে গেল। কিন্তু যতদূর জানি, এই দিনটাতে অচেনা লোকেরও বেল বেজে ওঠে। অবিশ্বাস বড়ো ছোঁয়াচে রোগ।
আরো একটা অবিশ্বাসের সূক্ষ্ম ধারা মিশে আছে হ্যালোউইনের সঙ্গে, তবে সেটার শেকড় বেশ গভীরে। এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে আছেন ইনুইটরা, মেটিসরা আর সুমেরু অঞ্চলের দক্ষিণে থাকা ইন্ডিয়ানরা, যাঁদের ফার্স্ট নেশন বলে উল্লেখ করা হয়। ইউরোপীয়রা কানাডায় আসতে শুরু করেন পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে। আদি বাসিন্দাদের সঙ্গে শুরুতে ব্যবসায়িক সুসম্পর্ক থাকলেও কিছু বছর বাদে যখন ইউরোপীয়রা কানাডাতে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন থেকে তাঁদের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি শুরু হয়। সে এক দীর্ঘ অত্যাচার ও অবিচারের ইতিহাস, সে কাহিনি এখানে নয়, পরে কোনো সময়ে অবশ্যই বলব। আজ আর সে অবস্থার চিহ্নমাত্র নেই, বরং যে কোনও অনুষ্ঠানের সূচনার আগে, ফার্স্ট নেশন মানুষদের সম্মান জানানোই রীতি। মূলধারায় মিশে গেছে বেশির ভাগ আদি বাসিন্দারা। তাও কোথাও যেন একটা অবিশ্বাসের চোরা স্রোত আজও হঠাৎ হঠাৎ উঁকি দিয়ে যায়। ভাঙা চীনামাটির বাসন যেমন নিঁখুত ভাবে জুড়লেও দাগটা থেকেই যায়, ঠিক তেমন। হ্যালোউইনের কস্টিউমের মধ্যে অনেক সময়ে ফার্স্ট নেশনদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের নকল দেখা যায়। এইটা তাঁদের ভারি অপছন্দ। একে হ্যালোউইনকে উৎসব হিসেবে দেখা তাঁদের সংস্কৃতিবিরুদ্ধ, তার উপর ঐতিহ্যবাহী পোশাকের বিকৃত প্রতিরূপ তাঁদের অসন্তুষ্ট করে তোলে। আসলে ওই পোশাক পরার অধিকার অর্জন করতে হয়, ইচ্ছামতো পরা চলে না। তবে সাধারণত তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করেই চলে সবাই, উক্ত পোশাকের চল বিশেষ নেই।
মোটের উপর বেশ মজা করেই দিনটা কাটায় কানাডাবাসী। ক্যালগেরির হেরিটেজ পার্কের বিশাল এলাকা জুড়ে নানারকম আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা করা হয়। কোথাও কাউন্ট ড্রাকুলার কাসল, কোথাও হ্যানসেল গ্রেটেল গল্পের দুষ্টু ডাইনির কেক পুডিঙের তৈরি বাড়ি, বা কোথাও জিপসি ফরচুন টেলার হাতের রেখা পড়ে ভবিষ্যৎ বলে দিচ্ছে। ক্যাণ্ডির দোকানে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার বিষের ছোট ছোট বোতল (আসলে নানা রঙের গ্লিটারের গুঁড়ো)। বিষের নামগুলো খুব মজাদার। আমার তো জম্বি সিরামটা খুবই পছন্দ হয়েছিল। পুরোদমে নাটকের অভিনয়ও হচ্ছে একপাশে। আমরা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের শো দেখেছিলাম একবার।
সাউইন পালন করা পুরোনো পৃথিবীর কেলটিকরা কল্পনাও করতে পারেনি একদিন হ্যালোউইনকে ঘিরে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা গড়ে উঠবে। মানুষের কাছে সবই বোধহয় পণ্য। শুধু কি ক্যান্ডি, কস্টিউম বা কঙ্কালের সারি? হ্যালোইনকে ঘিরে চলচ্চিত্রও তো কম নেই।

শুধু একদিন যদি হঠাৎ সত্যি সত্যি জীবিত জগৎ আর পরলোকের মধ্যকার সীমানা সত্যি মিলিয়ে যায়, গভীর রাতে কোনো বন্ধ জানলায় আওয়াজ ওঠে খটখট, খটখট?
মন দিয়ে ভাবতে থাকো তোমরা, আমি এবারের মত আসি।
ফার্স্ট নেশন মানুষদের কথা বললাম না? তাঁদের নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে। পরের পর্বে না হয় সেই কথা বলব।
টাটা।
ছবি লেখক