অরিন্দম দেবনাথ এর সমস্ত লেখা
সাহারা মরুভূমির মাঝে অবস্থিত একটি লেক , বছরের একটি দিন এই লেকে মাছ ধরতে উপস্থিত হন প্রচুর মানুষ। জানাচ্ছেন অরিন্দম দেবনাথ

আফ্রিকার একটা ছোট দেশ মালি। সাহারা মরুভূমির মাঝে আলজেরিয়া, গায়ানা, সেনেগাল, বুরকিনা ফাসো, নাইজার ইত্যাদি অনেকগুলো দেশ দিয়ে ঘেরা এই মালি। আমি অন্তত এসব অনেক দেশেরই নাম আগে শুনিনি। প্রায় ১২,৪০,০০০ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই দেশটা, আফ্রিকা মহাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম সোনা উত্তোলক দেশ। তবুও সাহারা মরুভূমির মাঝের এই দেশটির অর্ধেকেরও বেশি বাসিন্দা দারিদ্রসীমার অনেক নিচে বাস করে। প্রায় দেড় কোটি মানুষের বাস মালি নামক দেশটায়। সোনা ছাড়াও এই দেশটিতে পাওয়া যায় প্রচুর খনিজ নুন। তুলোও প্রচুর উৎপন্ন হয় মালিতে।
মালির রাজধানী হল বামাকো। নাইজার নদীর তীরে অবস্থিত এই রাজধানী শহরটি ২০০৬ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী পৃথিবীর দ্রুতহারে বাড়তে থাকা শহরগুলোর মধ্যে ষষ্ঠস্থানে থাকা শহর। এই শহর হল সাহারা মরু অঞ্চলে ইউরোপের ব্যবসার অন্যতম প্রবেশ দ্বার। বামাকো নামটি এসেছে বাম্বারা ভাষার একটা শব্দ থেকে। এর অর্থ কুমীর ভরা নদী। নাইজার নদী আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম নদী। সারা বছর জল থাকে এই নদীতে। কোন কোন বছর বন্যাও হয়। এই নদীর দু পাশের জমি পলিসমৃদ্ধ হওয়ায় খুব ভাল ফসল হয় এই নদী উপত্যকায়। প্রাচীনকালে এই নদীপথ ধরে ইউরোপে চালান যেত সোনা,হাতির দাঁত,কোলা নাট (বাদাম)।
মালি দেশটা ৮ টা প্রদেশে বিভক্ত। উত্তরাংশ পুরোটাই সাহারা মরুভূমির মাঝে। অধিকাংশ মানুষ বাস করে দেশের দক্ষিণাংশে। এই অঞ্চল দিয়ে বয়ে চলেছে নাইজার আর সেনেগাল নদী। মাছ ধরা আর চাষবাস এখানকার বাসিন্দাদের প্রধান জীবিকা।
মালির প্রাচীন ইতিহাস বলে একটা সময় অঙ্কশাস্ত্র,সাহিত্য,সংস্কৃতি,কলা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার আফ্রিকান পীঠস্থান ছিল মালি। ডোগোন সংস্কৃতি,তাদের উপকথা, তাদের তৈরি মুখোশ,শিল্পকলা,তাদের জীবনযাত্রা এই সব মিলিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকদের টেনে নিয়ে আসে মালিতে।
উত্তর মালির সাহারা মরুভূমির মাঝে একটা গ্রাম হল বাম্বা। বহু হাজার বছর আগে নাকি পৃথিবী থেকে প্রায় ৮.৬ আলোকবর্ষ দূর নক্ষত্র সিরিয়াস (লুব্ধক বা স্বাতী ) থেকে গ্রহান্তরের নমস নামের কিছু প্রাণী এই বাম্বাগ্রামের কাছে একটি জলাশয়ে এসে নামে এবং ডোগোনদের মহাকাশ সম্পর্কিত অনেক তথ্য জানায়।

ডোগোনরা নিজেদের নমস নামের গ্রহান্তরের প্রাণীদের উত্তরসূরি বলেই মনে করে। সিরিয়াস নক্ষত্রকে ১৯৭০ সালে প্রথম একটি মহা শক্তিশালী দুরবীণ দিয়ে দেখতে পান মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। অথচ তার অনেক আগে থেকে আফ্রিকার মরুভূমির মাঝে বসবাসকারী কিছু উপজাতীয় মানুষ জানত এই নক্ষত্রর কথা এবং এটা এদের প্রাচীন মন্দিরের গায়ে খোদিত হয়েছে বহু শত বছর আগে!
এই বাম্বা গ্রামের এক প্রান্তে আছে ছোট্ট একটি লেক। এই লেকটি ডোগোনদের কাছে অতি পবিত্র। বছর ভর সামান্য হলেও জল থাকে এই লেকটিতে।
রুক্ষ, শুষ্ক, পাহাড়ি মরু অঞ্চল বাম্বাতে জলের কষ্ট সারা বছরই থাকে। খাওয়ার জল সংগ্রহ করতে এই অঞ্চলের অধিবাসীদের অসম্ভব পরিশ্রম করতে হয়। এমন জায়গায় এই লেকটি প্রকৃতির একটি বিস্ময়।
ডোগোনরা এমনিতে জলকে প্রচণ্ড ভয় পায়। ওরা নাইজার নদী উপত্যকার আশপাশে যেতেও পছন্দ করে না। ওরা ভালবাসে পাহাড়ি শুষ্ক মরু অঞ্চল। অথচ একটা সময় নাকি এই অঞ্চলটি ছিল সবুজ বনানীতে ঢাকা! লতা, গুল্ম,গাছপালা কোন কিছুর অভাব ছিল না। বাম্বা গ্রামের এই লেকটি জলে টইটম্বুর থাকত নাকি সারা বছর। প্রচুর মাছও পাওয়া যেত এই লেকটিতে। প্রচলিত বিশ্বাস, এই লেকটিতে এসে নেমেছিল গ্রহান্তরের মহাকাশযান। পরবর্তী সময়ে জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আস্তে আস্তে এই অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হয়।
এই লেকটি ডোগোনদের কাছে এত পবিত্র যে মাছ ধরা ত দূরের কথা, লেকটিতে নামা পর্যন্ত বারণ। শুধু একটি দিন ছাড়া। ওই বিশেষ একটি দিন মালির প্রায় সমস্ত ডোগোন উপজাতির গ্রামের লোকেরা উপস্থিত হয় এই লেকটিতে মাছ ধরতে। অনুষ্ঠানটা বুড়ো থেকে বাচ্চা সমস্ত পুরুষের জন্য। মহিলারা এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন না। মহিলাদের জন্য এই লেকটি নিষিদ্ধ। বছরের এই এক দিনের পবিত্র মাছ ধরার উৎসবের নাম আন্তগো।
সাধারণত মে মাসে এই অনুষ্ঠানটি হয়। অনুষ্ঠানটির দিন নির্ধারণ করেন বাম্বা গ্রামের জ্ঞানী পুরুষদের একটি সমিতি। তারপর সেই দিনটি জানিয়ে দেওয়া হয় ডোগোন উপজাতিদের গ্রামে গ্রামে। সাধারণত বিকেলবেলায় অনুষ্ঠিত হয় এই মাছ ধরা অনুষ্ঠান আন্তগো। তাপমান এই সময় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এ ঘোরা ফেরা করে। অনুষ্ঠানের তারিখ নির্দিষ্ট হলে বিভিন্ন গ্রামের বাজারের মাঝে তিনটে করে বড় লাঠি পুঁতে দেওয়া হয়। এটা একটা ঘোষণা বা সঙ্কেত যে আন্তগোর দিন ঘনিয়ে আসছে। বাম্বা গ্রামের পবিত্র লেকের ঠিক মাঝখানে অনুরূপ তিনটে লাঠি পোঁতা থাকে,তারপর নির্দিষ্ট দিন ঘনিয়ে এলে লাঠিগুলো সরিয়ে ফেলা হয়।
এমনিতে ডোগোনরা স্বভাব জলভীরু, পাহাড়ে মরুতে থাকা ডোগোনদের কাছে জলের জীবন একটা আতঙ্কের জীবন। অথচ, এই আন্তগো এলে তাদের রূপটা পালটে যায় একেবারে। কিছুতেই মেলানো যায়না ডোগোনদের চরিত্রের এই বৈপরীত্য।
আন্তগোর দিন শয়ে শয়ে ডোগোন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে জড় হয় বাম্বা লেকের ধারে। থিক থিক করতে থাকে কালো মানুষের ভিড় লেকের আশপাশে । অনেকটা আমাদের সাগরস্নান বা কুম্ভ স্নানের মত ঘটনা। অনুষ্ঠান শুরুর আগে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীই নিজেদের শরীরে কাদা মাটির প্রলেপ দিয়ে নেয়। অনুষ্ঠান শুরুর আগে থেকেই শুরু হয় প্রার্থনা,চলে পূজাপাঠ, গানবাজনা । অবশেষে আসে বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। হাজার হাজার মানুষ একদম মৌন হয়ে যান , অপেক্ষা করেন কখন আদেশ করবেন বাম্বার জ্ঞানি ব্যক্তিটি আর সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বেন লেকের জলে।

আদেশ পেতেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে লেকের জলে , কালো মাথা আর কালো শরীর লেকের ঘোলা জলে যে ভাবে তোলপাড় করতে থাকে তা দেখে কে বলবে ডোগোনরা জলকে ভয় পায়! হাতে তৈরি ঝুড়ি আর মাছ রাখার জন্যে একটা চামড়ার থলি এই হল মাছ ধরার সরঞ্জাম।
শুরুর ঠিক আধ ঘণ্টা পরে বন্দুক দাগা হয়। অনুষ্ঠান শেষ। লেক থেকে ধরা সব মাছ জমা পড়ে বাম্বা গ্রামের মোড়লের কাছে। মোড়ল মহাশয় জমা পড়া মাছ সমান ভাবে ভাগ করেন অংশগ্রহণকারী সব গ্রামের মধ্যে। বর্তমান ডোগোনরা সব কিছু ভাগ করে নিতে জানে, এরা যে মহাকাশ থেকে আগত গ্রহান্তরের প্রাণীদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া মানুষদের বংশধর!
ছবি – ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত