অরিন্দম দেবনাথ এর সমস্ত লেখা
এমন এক সাপ আছে যার লেজের ডগাটা ঠিক মাকড়সার মতো। লিখেছেন – অরিন্দম দেবনাথ

অনেক পাখি আছে যারা মাকড়সা পেলে সব কিছু ফেলে ওটার পেছনেই ছুটবে। প্রায়শই দেখা যায় ইলেকট্রিক তারে বসে থাকা মৌটুসি বা টুনটুনির মুখে খুদে মাকড়সা। ইলেকট্রিক তারে জাল বুনে পোকা ধরার আশায় বসে থাকা মাকড়সা পাখির ঠোঁটের এক ঠোক্করে নিজেই হয়ে যায় খাবার।
এমন এক সাপ আছে যার লেজের ডগাটা ঠিক মাকড়সার মতো। আর পাথরের খোঁদল থেকে এই লেজ বের করে এমন ভাবে দোলায় যে পাখি সেই লেজকে মাকড়সা মনে করে যেই না ঠোকরাতে যায় ওমনি সাপ মুহূর্তের মধ্যে কপ করে মুখের মধ্যে ধরে নেয় পাখিকে। ভাইপার গোত্রের সে সাপ এমন সুন্দরভাবে নিজেকে পাথরের গায়ে লুকিয়ে রাখে যে কারো সাধ্য নেই যতক্ষণ না সে নড়ে ততক্ষণ তাকে পাথর ছাড়া অন্য কিছু ভাবে।
১৯৭০ সালে স্টিভেন অ্যান্ডারসন নামের এক জীববিজ্ঞানী শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়ামএ মধ্যপ্রাচ্যের এক মৃত ভাইপারের নমুনা ভালো করে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেন যে সাপটার লেজের একদম ডগার মাংসপিন্ড থেকে মাকড়সার মতো কতোগুলো পা বেরিয়ে আছে। এর আগে সাপটাকে দেখে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ মনে করেছিলেন এটা পারসিয়ান শিংওয়ালা ভাইপার, যা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে দেখা যায়। যদিও খুবই বিরল। কিন্তু অ্যান্ডারসনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় এই সাপের প্রজাতি শুধু বিরল নয় অতি বিরল।
অ্যান্ডারসন জীববিজ্ঞানী হলেও তিনি মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরীসৃপ নিয়েই গবেষণা করছিলেন। তিনি কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে এই সাপের লেজের ডগার উপাঙ্গ বা পতঙ্গের পায়ের মতো অংশগুলো কি। এটা কি ওই সাপের স্বাভাবিক শরীরের অংশ না ক্যানসার বা ওই জাতীয় কোন অসুস্থতার ফলে সৃষ্ট কোনো অস্বাভাবিক বৃদ্ধি? শুধু একটা মাত্র নমুনার ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলেন না তিনি।
প্রায় সাড়ে তিন দশক অ্যান্ডারসনের মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল সাপটার কথা। হঠাৎ করেই এক অপেশাদার ইরানি প্রকৃতিবিদ, হামিদ বোস্তানচি আবার এইরকম একটা সাপের সন্ধান পেয়েছিলেন। খবরটা পৌঁছতে দেরি হয়নি অ্যান্ডারসনের কাছে। তখন তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার স্টকটনের প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এমেরিটাস অধ্যাপক৷ তিনি নমুনা পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন এই প্রজাতির সাপের অস্তিত্ব সম্পর্কে। অজানা প্রকৃতির এই সাপ খাবার ধরার জন্য তার লেজকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে। অন্য কোনো প্রাণী এই টোপকে খাবার হিসেবে ভুল করে নিজেই খাদ্যে পরিণত হয়ে যায় বিশেষ করে পতঙ্গভুক প্রাণী – যেমন পাখি।
বোস্তানচির এই নমুনাটাও ছিল মৃত ও খুব খারাপভাবে সংরক্ষিত। যদিও লেজটি চিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়ামে রাখা সাপের নমুনার অনুরূপ ছিল। ২০০৬ সালে অ্যান্ডারসন ও তার সহকর্মীরা মিলে প্রমাণ সহ একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধে এই সাপটিকে একটি বিশেষ প্রজাতির সাপ বলে দাবি করেছিলেন। সাপটির নামকরণ করেছিলেন সিউডোসেরাস্টেস উরাচিনোদেশ Pseudocerastes urarachnoides) যার অর্থ ‘নকল শিং ও মাকড়সার মতো লেজ বিশিষ্ট।’ বোস্তানচির সাপের নমুনাটার পেটে একটি আধা-হজম করা পাখি ছিল, যে দেখে অ্যান্ডারসনের মনে হয়েছিল সাপটা ওর লেজকে ব্যবহার করে মুলত পাখি ধরার জন্যই।
অনেক প্রাণী, যেমন বিশেষ প্রজাতির কিছু মাছ ও টিকটিকি জাতীয় প্রাণী তাদের লেজ নাড়িয়ে শিকারকে কাছে আসতে প্ররোচিত করে। অনেক সাপ বিশেষ করে ভাইপার প্রজাতি তাদের লেজ নাড়িয়ে শিকারকে কাছে টানে, কিন্তু সাপের মাকড়সার মতো লেজের ডগার গঠন একেবারে অদ্বিতীয় বলে মনে হয়েছিল গবেষকদের। এই বিশেষ প্রজাতির সাপটি কেমন করে তার লেজকে কাজে লাগিয়ে শিকার ধরে তা দেখার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন গবেষকরা।
গবেষকরা অনুমান করেছিলেন এই প্রজাতির সাপের বাস মূলত ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালায়। এই পর্বতমালা তুরস্ক ও কুর্দিস্তানেও বিস্তৃত। বোস্তানচি তার নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন দক্ষিণ ইরান থেকে। জিপসাম আর চুনাপাথরের মাঝে রুক্ষ চামড়া আর পাথরের মতো অসমান শরীরের এই সাপ এমনভাবে লুকিয়ে থাকে যে তার হদিশ করাই দুরূহ। যতক্ষণ না সাপ নড়ে আঘাত করে ততক্ষণ এর উপস্থিতি বোঝা প্রায় অসম্ভব। আর সেই নড়াটাও হয় কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর সব স্থির হয়ে যায়।

২০০৮ সালে একদল গবেষক দক্ষিণ ইরানের ইয়াম প্রদেশের একজোড়া এই সাপের দেখা পায়। কিন্তু সাপগুলো ধরা সহজ ছিল না। পাথরের গায়ে অজস্র ফাটল। তাতেই ঢুকে ছিল সাপের জোড়। ফাটলের ভেতর টর্চের জোরালো আলো ফেলে ফেলে একটা গর্তের ভেতর সাপের চোখের ঝলকানি মুহূর্তের জন্য নজরে আসে বিশেষজ্ঞ গবেষকদের। পাথরের খোঁদলে লম্বা আঁকশি ঢুকিয়ে সাপগুলোকে বের করে এনে বাক্সবন্দী করে পর্যবেক্ষনের জন্য পাঠানো হয় একটা আধাশুকনো খাঁচাঘেরা জায়গায় যা সাপগুলোর বসবাসের অনুকুল ছিল।
খাঁচার ভেতর কিছু পাখি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল আর রাখা হয়েছিল বেশ কয়েকটি ভিডিও ক্যামেরা। গবেষকরা দেখেছিলেন সাপগুলো ওদের লেজ খানিক ওপরে তুলে নাড়ালেই লেজের ডগার মোটা মাংসের ঢিবি থেকে বেরিয়ে আসছে মাকড়সার পায়ের মতো শুঁড়। আর সেগুলো দুলছে মাকড়সার পায়ের মতোই। পাথরের গায়ে মিশে থাকা সাপগুলোর লেজকে মাকড়সা ভেবে পাখি খেতে যেতেই লেজের পাশে গুঁজে রাখা মাথা মুহূর্তের মধ্যে সক্রিয় হয়ে পাখিকে ধরে নিচ্ছে দাঁতের ফাঁকে। প্রমাণ হয়ে যায় অ্যান্ডারসনের ও তাঁর দলের অনুমান নির্ভুল ছিল। সাপটার লেজ শিকার ধরবার ফাঁদ।
খাদ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক কার্ট শোয়েঙ্কের মতে, সাপ ও টিকটিকিজাতীয় প্রাণীর কেমোসেন্সরি প্রকৃতির এক বিস্ময়। শুধুমাত্র পরিপার্শ্বের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়িয়েই নয়, প্রকৃতির সাথে সাযুজ্য রেখে শরীরের অংশকে সাময়িক পরিবর্তিত করে শিকারকে প্রলোভন দেখিয়ে নিজের বৃত্তে টেনে আনার নজির খুব একটা জানা নেই।
লেজকে ব্যবহার করে সাপেদের শিকারকে প্রলোভিত করে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আসা নতুন কিছু নয়। অস্ট্রেলিয়ার ডেথ অ্যাডার পাতার তলায় লুকিয়ে থাকে আর তার লেজটা পাতার ওপরে নাড়াতে থাকে একটা পোকার মতো, তারপর সেই পোকা খেতে ব্যাং বা গিরগিটি জাতীয় প্রাণী এলেই স্বমূর্তি ধারণ করে ডেথ অ্যাডার। খাদ্যের সন্ধানে এসে খাদ্যে পরিণত হয় শিকারি। সাহারান স্যান্ড ভাইপার বালির মধ্যে সমস্ত শরীর ঢেকে শুধু চোখ আর নাক বাইরে করে লেজের ডগাটা বালির ওপর তুলে নাড়াতে থাকে একটা পোকার লার্ভার মতো।
শোয়েঙ্কের মতে শুধু সাপই নয় অনেক সরীসৃপই পরিবেশের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে মিলিয়ে নিতে অভ্যস্ত। শিকারকে লক্ষ্যে রেখে খুব সতর্ক থাকে সরীসৃপরা। সহজে বুঝতে দেয় না নিজেদের অস্তিত্ব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিন্তু এরা লেজটা বেঁকিয়ে মুখের কাছাকাছি নিয়ে আসে, যাতে শিকার তাদের ফাঁদে প্রলোভিত হয়ে কাছে আসলেই নিমেষে তাকে মুখে পুরে নেওয়া যায়। এটা শিকারের একটা ‘প্যাটার্ন’ বা ধাঁচ।
সবচাইতে পরিচিত লেজ নাড়িয়ে সাপ হল র্যাটেলস্নেক – ঝুমঝুমি সাপ। ডাস্কি পিগমি র্যাটেলস্নেকের ঝুমঝুমিটা আবার এতোই ছোট যে তা থেকে শব্দ প্রায় হয়ই না। তবুও এরা লেজ নাড়িয়ে আকর্ষণ করে শিকার কাছে টানার জন্য।
শোয়েঙ্ক বলেছেন জীবজগতে এমন সব লেজ নাড়ানোর ধরণ দেখা যায়, যার সব কারণ এখনও বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি। এদের কিছু ঘটনার টুকরো টুকরো বিশ্লেষণ সম্ভব হলেও বিস্তারিত পর্যালোচনা এখনও অনেক বাকি।
অচিরেই হয়তো মাকড়সা লেজের সাপ হারিয়ে যাবে। এই সাপের কথা প্রচার হতেই বিভিন্ন চিড়িয়াখানা আর ধনী ব্যক্তিগত পশু সংগ্রাহক উঠে পড়ে লেগেছে এর নমুনা সংগ্রহে। যদিও ইরান সরকার এই সাপ হস্তান্তরে কোন সমঝোতা করেনি কিন্তু চোরাশিকারিদের ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভব। এই সাপের মুখ্য গবেষক অ্যান্ডারসন জানিয়েছেন, “চোরা বাজারে অসম্ভব দাম হবে এই সাপের, অনেক মানুষ আছেন যাঁরা বাড়িতে সাপ পোষেন, কারণ তারা বিপজ্জনক ভাবে বাঁচতে পছন্দ করেন, এঁদের কাছে এই সাপের চাহিদা তুঙ্গে।”
মাকড়সা লেজ সাপ বিরল গোত্রের হলেও অনেক সাপ আছে যারা নানান ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে শিকার ধরার জন্য। যদিও এগুলোর প্রায় কিছুই এখনও পর্যন্ত রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি। ম্যানগ্রোভ সল্টমার্শ নামের এক ধরনের সাপ আছে, সে তার জিভটা এমনভাবে জলে ডুবিয়ে রাখে যেন মাছের জন্য রাখা খাবার। আবার আফ্রিকান পাফ অ্যাডার লেজ আর জিভ দুটোই ব্যবহার করে শিকারকে প্রলোভিত করতে।
দক্ষিণ আফ্রিকার উইটওয়াটারসরান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক জেভিয়ার গ্লাউডাস এবং গ্রাহাম আলেকজান্ডার প্রথম এই পাফ অ্যাডার সাপের সন্ধান পেয়েছিলেন। মারাত্মক বিষাক্ত এই সাপের শিকার পদ্ধতি জানতে দুই গবেষক ৮৬টি পাফ অ্যাডারএর শরীরে অস্ত্রোপচার করে রেডিও ট্রান্সমিটার বসিয়ে যেখান থেকে এই সাপগুলো ধরা হয়েছিল সেই ডিনোকেং গেম রিজার্ভে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
দু’বছর ধরে ফিক্সড ক্যামেরা ব্যবহার করে নানা ফুটেজ ধরা পড়েছিল ক্যামেরায়। গবেষকরা দেখেছিলেন শিকারে আয়তন বুঝে লেজ ও জিভ নাড়িয়ে টোপ ফেলে এই সাপ। মাটিতে ওঠা কম্পন বুঝে এরা অনুমান করে নিতে পারে শিকারের আয়তন ও ধরণ। এই ধরনের আচরণগত বৈচিত্র্য আগে কোন গবেষণায় ধরা পড়েনি। সাধারণ সাপের তুলনায় এই সাপের কৌশল করার ক্ষমতা অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, ব্যাং, ইঁদুর ইত্যাদি শিকার সামনে থেকে সরে গেলে এরা এদেরকে অনুসরণ করে। এগুলো প্রমাণ করে সাপ অবশ্যই বুদ্ধিমান প্রাণী। অন্তত কিছু গোত্রের সাপ তো বটেই।
