অরিন্দম দেবনাথ এর সমস্ত লেখা

‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতায় রবি ঠাকুর আমাদের বলে গেছেন জুতো আবিষ্কারের এক মজাদার কাল্পনিক কাহিনি। তবে সত্যি কথা বলতে কি, জুতো ঠিক কবে এবং কীভাবে আবিষ্কার হয়েছিল বলা খুব মুশকিল। সেই আদিকাল থেকে মানুষ তার পা রক্ষা করার জন্যে জুতো ব্যবহার শুরু করেছিল। পরিবেশ এর সাথে তাল মিলিয়ে জুতো তৈরি করতে শিখেছিল মানুষ। তার কোনটা পা ঢাকা বুটের মত, কোনটা চপ্পল এর মত , কোনটা আবার হাঁটু পর্যন্ত উঁচু। কিন্তু যাই তৈরি করুক না কেন সেটা ছিল একদম পেশা ও পরিবেশের উপযোগী।
অতি সম্প্রতি আর্মেনিয়ার এক গুহা থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরনো চামড়ার জুতো পাওয়া গেছে। দড়িবাঁধা এই জুতোর ভিতরে খড়ের পুরু আস্তরণ দেওয়া। ইরান দেশের সীমানাঘেঁষা এই অঞ্চলের আবহাওয়ার গুণে জুতোটি দিব্যি টিকে ছিল। মহিলাদের পায়ের চারনম্বর জুতোর মাপের এই জুতোটি তৈরি হয়েছিল গরুর চামড়া থেকে, মিশরের পিরামিড তৈরির কয়েক হাজার বছর আগে। চামড়া এত সুন্দর ভাবে ট্যান করা হয়েছিল যে কয়েক হাজার বছরের ঝড়, তুষার, বৃষ্টি ও পরিবেশের তারতম্য সহ্য করে এই জুতোটা দিব্যি টিঁকে ছিল নির্জন গুহার মাঝে।

আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক এর পুরাতাত্ত্বিক ডঃ রন পিনহাসি এই গুহা অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম এটা কয়েকশো বছরের পুরনো একটা জুতো হবে, কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গেল এটার বয়েস সাড়ে পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি! জুতোর ভেতর খড়ের আস্তরণ আছে, কিন্তু আমরা নিশ্চিন্ত নই এই খড়ের আস্তরণ পা গরম রাখার জন্যে না জুতোর আকার ঠিক রাখার জন্যে। এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচাইতে প্রাচীন জুতো এটি। গুহার অন্ধকারে ভেড়ার বিষ্ঠার নিচে দিব্যি টিঁকে ছিল এতদিন ধরে আমদেরই কোন পূর্বপুরুষের কীর্তি।”
মানোলো ব্লান্নিক নামের এক জুতোর ডিজাইনার জুতোটি দেখে মন্তব্য করেছেন, “ভাবাই যায়না! একদম অত্যাধুনিক ডিজাইনের জুতো! জোড়াবিহীন এক চামড়ায় তৈরি। সামনে পেছনে চামড়ার লেস… নিখুঁত আকার। যিনি বানিয়েছিলেন তিনি অনেক চিন্তাভাবনা করে এই জুতো বানিয়েছিলেন। এত নিখুঁতভাবে চামড়া ট্যান করা হয়েছিল যে এত হাজার বছর পরেও টিকে আছে।”
কার্বন ডেটিং বলছে জুতোটি ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের। তখন আর্মেনিয়াতে তাম্রযুগ চলছে। যে গুহাটিতে জুতোটি পাওয়া গেছিলো তার আশপাশের অঞ্চল খুব দুর্গম। কাঁটাঝোপ আর ধারালো পাথরে বোঝাই। অথচ গুহাবাসীরা যে অনেক দূর পর্যন্ত যেতেন তার প্রমানও পাওয়া গেছে ওই গুহা থেকে। এমন কিছু জিনিসের নিদর্শন ওই গুহাতে ছিল যা ওই অঞ্চল থেকে অন্তত ১৫০ কিলোমিটার দূরে সেই সময় পাওয়া যেত বলে জানিয়েছেন অভিযানকারীরা। ফলে ভালো জুতোর দরকারটা তাঁদের ছিলই।
এর আগে যে প্রাচীন জুতোটি পাওয়া গেছিল সেটিও ছিল প্রায় ৫৩০০ বছরের পুরনো। অস্ট্রিয়ান আল্পসে ১৯৯১ সালে এক অভিযানে এই জুতোটি পাওয়া গেছিল। এটি ছিল বাদামি ভালুকের চামড়ায় তৈরি।
এ তো গেল জুতোর কথা। চপ্পল কিন্তু আরো পুরোনো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরিতে আর্নল্ড রিসার্চ গুহায় এক অভিযানে পাওয়া গেছিল একটি চপ্পল যেটির কার্বন ডেটিং বলছে তা ৭০০০ বছরের বেশি পুরনো। ওদিকে আবার ৪০০০০ বছরেরও পুরনো মানুষের পায়ের হাড়ের ক্ষয় ও গঠন দেখে পুরাতাত্ত্বিকরা বলছেন ওই মানুষরা জুতো ব্যবহার করতেন। তবে তার উদাহরণস্বরূপ কোন জুতো এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

জুতো তৈরির শিল্পটি অতএব বেশ পুরনো। পাইনেসভিল হিস্টোরিক্যাল মিউজিয়ামে অনেক জুতো প্রদর্শিত আছে। প্রায় সেই আদিকাল থেকে যে জুতো মানুষ পরে আসছে সেটা হল মোকাসিন। আমেরিকান ইন্ডিয়ানরা এই জুতো পরত। খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ২০০০ বছর আগে পূর্ব ইউরোপের মানুষরাও মোকাসিন ধরনের জুতো ব্যবহার করত। নর্থ আমেরিকানরা গাঢ় রঙের কাঠে তৈরি পাথরের পুঁতি দিয়ে সাজানো জুতো পরতে ভালবাসত এবং এখনও তারা রংদার জুতো ও জামা পরতে ভালোবাসে। এই জুতোর ভেতর খুব নরম চামড়ার আস্তরণ থাকে, পরতেও আরামদায়ক হয় এবং পা ও গরম থাকে এই জুতোতে। সেইসময়েও বিভিন্ন ধরনের জুতো তৈরি হত পরিবেশের উপর নির্ভর করে। গরমের দেশে মানুষরা পরতেন চপ্পল আর শীতের দেশের মানুষরা পরতেন লোমওয়ালা চামড়ার গরম জুতো । পারসিয়ানরা হাঁটু পর্যন্ত উঁচু দড়ি বাঁধা জুতো পরতেন।
এই জুতো কারা তৈরি করতেন সেটা সঠিক ভাবে বলা খুব মুশকিল। থমাস বেয়ারদ নামে একজন ব্রিটিশ ১৬২৯ সালে লন্ডন থেকে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটে পৌঁছলেন কিছু জুতো তৈরির সরঞ্জাম নিয়ে এবং পেশাদার হিসেবে জুতো তৈরি শুরু করলেন। আমেরিকার ইতিহাসে তিনিই প্রথম নথিবদ্ধ পেশাদার ‘মুচি’। কিন্তু সব জুতো তৈরি হত হাতে। তখনকার দিনে সাধারণত মুচি বা জুতো প্রস্তুতকারকরা এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ঘুরে ঘুরে জুতো তৈরি করতেন। সাধারণত পুরো পরিবারের জন্য জুতো তৈরি করতেন এঁরা। ধনী আমেরিকানরা অনেক সময় আমদানি করা জুতো পরতেন। আমেরিকাতে সেরকম কোন নির্দিষ্ট জুতোর দোকান বা কারখানা ছিল না। মুচিরাই ছিল ভরসা। এই মুচিরাই এক শহরের খবর অন্য শহরে নিয়ে যেত। এক অর্থে এরা এক ধরনের সংবাদপ্রচারকও ছিল। বিভিন্ন দেশের চালু ফ্যাশানের খবর এরা বয়ে বেড়াত।

১৭৫০ সালে জন আদামাস নামের মার্কিন এক ব্যবসায়ী বিদেশী কিছু জুতো কিনে সে গুলোর নকল তৈরি করে ‘আমেরিকায় তৈরি জুতো’ বলে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করতে শুরু করলেন। জন আদামাস আমেরিকার প্রথম জুতো তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। তখনও কিন্তু জুতো বানাবার যন্ত্র তৈরি হয়নি। জুতো তৈরি হত হাতে। মোটামুটি ১৮১৮ সালে প্রথম জুতো তৈরি করতে যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া শুরু হয়। প্রথম প্রথম যে জুতো তৈরি হত, সেটা যে কোন পায়েই পরা যেত। কিন্তু এই জুতোগুলো অতটা আরামদায়ক ছিল না। কিম্বলে লাস্ট নামক এক ভদ্রলোক প্রথম ডান এবং বাঁ পায়ের জন্য আলাদা আলাদা আকারের জুতো বানালেন। ১৮৪৫ সালে রোলিং মেশিন আবিষ্কৃত হয় এবং জুতোর প্রধান উপাদান চামড়াকে প্রচণ্ড চাপে পাতলা ও শক্ত করতে এই যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হল। তার আগে পাথরের ওপর ফেলে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে চামড়াকে পাতলা ও শক্ত করা হত। এখনও পাড়াতে ঘুরে ঘুরে যারা জুতো সেলাই বা সারাই করে তারা ছোট ছোট চামড়ার টুকরো হাতুড়ি বা ঠুকনি দিয়ে ঠুকে পাতলা করে। ১৮৪৮ সালে এলিয়াস নামের এক ভদ্রলোক সেলাই মেশিন বানালেন। জন নিকোলাস এই মেশিনকে জুতো তৈরির কাজে লাগানোর জন্যে উঠেপড়ে লাগলেন। ইসসাক সিঙ্গার ঠিকঠাক করে সেলাই করার উপযুক্ত মেশিন বানিয়ে বাজারে আনলেন। বদলে গেল দুনিয়া। জামা কাপড় / জুতো … সেলাই মেশিন এসে এদের নির্মাণের পুরো জগতটাকে পাল্টে দিল। নতুন নতুন যন্ত্র আবিষ্কার হতে শুরু হল এরপর নতুন নতুন চিন্তাধারা থেকে। চামড়া পাতলা করা ও তার একই রকম ঘনত্ব (থিকনেস) বজায় রাখতে উদ্ভাবিত হল স্প্লিটিং মেশিন। ১৮৫৮ সালে এলো জুতোর সোল ও ওপরের অংশ এক সাথে সেলাই করার মেশিন। আর এখন তো ভাল ভাল জুতো তৈরি হয় রোবট দিয়ে। সে এক দেখবার মত কর্মকাণ্ড!
