অরিন্দম দেবনাথ এর সমস্ত লেখা
উত্তর থাইল্যান্ডের পাহাড়ি জঙ্গলে বাস নানা উপজাতির। তাদেরই এক উপজাতি কায়ান (Kayan)। এই উপজাতির মহিলারা একসময় গলায় পেতলের তার জড়িয়ে রাখা শুরু করে বাঘের আক্রমণ থেকে গলাকে বাঁচাতে। সেই ঐতিহ্য কিছু মহিলা এখনও ধরে রেখেছেন। লিখেছেন অরিন্দম দেবনাথ

মাঝরাত থেকেই শুরু হয়ে যায় হাঁস, মুরগি, শুয়োর, কুকুর, বিড়ালের ডাক। কাঠের খুঁটির ওপর তক্তা বিছিয়ে তৈরি অধিকাংশ দোতলা ঘরের ছাউনি হয় টিনের না-হয় বাঁশের মাচার ওপর বিচালি ও পাতা বিছিয়ে তৈরি। রান্নার উনুনের ধোঁয়া কাঠের দেয়ালের ফাঁক দিয়ে ঘরকে ভরিয়ে দেয়। আঁধার সরিয়ে আলো ফোটার আগে থাকতেই দিনের শুরু কায়ান গ্রামে রাত থাকতেই।
কায়ান উপজাতির লোকেরা নিজেদের পাডাউংও বলে। বর্তমানে মূলত উত্তর থাইল্যান্ডের শহর চিয়াং মাই-এর কাছের জঙ্গল-পাহাড়ে এদের বাস হলেও অনুমান করা হয় প্রায় দু-হাজার বছর আগে এরা কোনও কারণে চিন দেশের ইউনান প্রদেশ থেকে বর্তমান মায়ানমারের সালউইন নদীর অববাহিকায় চলে এসে বসবাস শুরু করে। তখন এই অঞ্চল ছিল বলতে গেলে অজানা। অতি সামান্য যে লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় তা থেকে জানা যায়, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে বার্মিজরাও এই পার্বত্য অঞ্চলে এসে বসতি শুরু করে। শুধু তাই নয়, বসতি স্থাপন করে মোন, শান, থাই জনগোষ্ঠীর লোকেরাও। ১৮৮৬ সালে যখন ব্রিটিশরা বার্মাকে তাদের উপনিবেশ বানায় তখন এইসব জনগোষ্ঠীর লোকেরা ব্রিটিশ-বার্মার জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হয়।
বার্মিজরা প্রথম থেকেই কায়ানদের পছন্দ করত না, লড়াই লেগেই থাকত দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে। বার্মা ব্রিটিশ উপনিবেশ হবার পর থেকে কায়ানরা আশা করেছিল যে ব্রিটিশরা তাদের বার্মিজ অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই বার্মিজ আর কায়ান জনগোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই চরমে পৌঁছয়। কায়ানরা ব্রিটিশদের পক্ষ নেয় আর বার্মিজরা জাপানের।
১৯৪৮ সালে বার্মা ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভের পরেও কায়ানদের তাদের নিজভূমিতে অধিকার দেওয়া হয়নি, উলটে বার্মিজরা আরও প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। কায়ানদের সঙ্গে বার্মিজদের গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৬০ সালে বার্মিজ সেনাবাহিনী ‘ফোর-কাট’ নামে কায়ানদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। পুরো কায়ান সম্প্রদায় এই অঞ্চল ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। কায়ানদের গেরিলা আন্দোলনও ধ্বংস হয়ে যায়।
১৯৬২ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা হয় বার্মায়। বার্মিজ সেনাবাহিনী বিক্ষিপ্তভাবে টিকে থাকা কায়ান-সহ আরও অন্যান্য উপজাতিদের গ্রাম-সহ ক্ষেত-খামার গরমের সময় পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে শুরু করে। পুরুষদের ও মহিলাদের ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার শুরু করে। শুরু করে হত্যালীলা। প্রাণের দায়ে কায়ানরা বার্মা ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করেন থাইল্যান্ডের পাহাড়ি অঞ্চলে।
১৯৯৫ সালে মায়ানমার (বার্মা) গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে কোনোভাবে মায়ানমারের জঙ্গলে টিকে থাকা সামান্য কয়েকঘর কায়ানরাও সীমান্ত পার হয়ে আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী থাইল্যান্ডের শরণার্থী শিবিরে। কিন্তু শরণার্থী শিবিরের জীবন খুব কঠিন ও অনিশ্চিত। সরকারের ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে সেখানকার জীবনযাত্রার মান। সরকার চাইলে শরণার্থী শিবিরের জন্য তহবিল বাড়াতে বা কমাতে পারে। অথবা বন্ধ করে দিতে শিবির। শরণার্থীদের শিবিরের চত্বর ছেড়ে বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। কোনও কারণে শিবিরের বাইরে ধরা পড়লে থাই পুলিশ গ্রেপ্তার করে সোজা ঢুকিয়ে দিত জেলে। এদের অনেকেই অন্য দেশে পুনর্বাসনের জন্য আবেদন করেছিল, কিন্তু যে-কোনো দেশে পুনর্বাসন পাওয়া সহজ নয়। পুনর্বাসন পেলেও আবেদন করার পর দীর্ঘ সময় লেগে যায় এতে।
বেশ কিছু কায়ান জনগোষ্ঠীর মানুষ পুনর্বাসন পেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে। কিন্তু অন্যদেশে গিয়ে মানিয়ে নেওয়াটা ছিল ভীষণ কঠিন কাজ। প্রথমেই ভাষাজনিত সমস্যার সম্মুখীন হয়ে ছিল এরা। প্রচণ্ড ঠান্ডা আর আধুনিক জীবনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে কায়ানরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে নিজস্ব সত্ত্বা।
আমেরিকার মিনেসোটার সেন্ট পল বর্তমানে পুনর্বাসিত কায়ানদের সবচাইতে বড়ো বাসস্থান। ২০০০ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত প্রায় ১৭০০০ কায়ান সেন্ট পলে ঠাঁই পেয়েছে। কিন্তু কিছু কায়ান জনগোষ্ঠীর মানুষ এখনও টিকে আছেন নিজস্ব সত্ত্বাকে আঁকড়ে উত্তর থাইল্যান্ডের পাহাড় আর জঙ্গল-ভরা চিয়াং মাই অঞ্চলের জঙ্গলের মাঝের দু-একটি গ্রামে, (যদিও আসলে এই গ্রামগুলো শরণার্থী শিবির) যেই গ্রামের মহিলারা এখনও গলায় পেতলের কুণ্ডলী জড়িয়ে রাখে গলাকে লম্বা করার জন্য।
গলার জন্য ব্যবহৃত এই কুণ্ডলী ‘পাডাউং’ বলে। সেই কারণে গলায় তার জড়ানো কায়ান উপজাতির মানুষেরা পাডাউং বলেও পরিচিত। অতীতে মহিলাদের গলায় তার জড়িয়ে রাখা শুরু হয়েছিল বাঘের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, কায়ানরা আসলে ড্রাগনদের বংশধর, ড্রাগনদের উত্তরাধিকারকে মান্যতা দেবার জন্য এরা গলা লম্বা করার এই কৌশল বের করেছিল। যদিও শতাব্দী প্রাচীন গলা লম্বা করা বা কুণ্ডলী জড়িয়ে রাখার ঐতিহ্যের মূল কারণ জানা সম্ভব হয়নি।

শুধু গলায় নয়, কিছু মহিলা পায়েও পেতলের তার জড়িয়ে রাখতেন। কারণ, যে-জঙ্গলের মাঝে কায়ানরা বসতি গাড়ত, সে-সব জঙ্গলের অধিকাংশই ছিল বাঘ-সহ হিংস্র শ্বাপদে ভরা। বাঘ সাধারণত প্রথমেই পায়ে বা গলায় আঘাত হানে। নিঃশব্দে হানা আঘাত থেকে রক্ষা পেতেই কায়ান মহিলারা গলা ও পায়ে পেতলের তার জড়াতে শুরু করেছিল।

তার জড়িয়ে রাখার ফলে গলা অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে যেত। যার গলা যত লম্বা, কায়ান মহিলা সমাজে সে তত খাতির পেত। লম্বা গলা হয়ে উঠেছিল সৌন্দর্যের অন্যতম মাপকাঠি। যদিও কায়ান মহিলার বর্তমানে গলা ও পায়ে তার জড়িয়ে রাখে, পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে অর্থের বিনিময়ে ছবি তুলতে দিয়ে। ছবি তুলতে দেওয়া কায়ানদের জীবনধারণের একটি উপায়। যদিও এই নিয়ে অনেক মতবিরোধ আছে।
অনেকেই মনে করেন, থাইল্যান্ড সরকার কায়ানদের গলা আর পায়ে তার জড়িয়ে রাখার প্রথাকে এখানে বাঁচিয়ে রেখেছে শুধুমাত্র পর্যটকদের আকর্ষণ করার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। বর্তমান থাইল্যান্ডের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস পর্যটন। যদিও কায়ান গ্রামগুলোয় লোকসংখ্যা খুবই কম। কিন্তু এই গ্রামের মহিলাদের দেখলে কোনোভাবেই অবাক হয়ে না তাকিয়ে থাকা যায় না। গলায় আর পায়ে চকচকে সোনার মতো তার জড়ানো মহিলাদের দেখলেই মনে হবে এরা রহস্যময়ী, অথবা অন্য কোনও গ্রহ বা স্বর্গের বাসিন্দা।
জঙ্গলে বসবাসকারী কায়ান মহিলাদের মধ্যে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে যদি তারা গলা থেকে এই তারের আবরণ সরিয়ে ফেলে তবে তাদের ঘাড় ভেঙে যাবে। ঘাড় লম্বা কায়ান উপজাতির মহিলাদের ‘জিরাফ মহিলা’ বলে উপহাস শুনতে হয় অনেক, যদিও ঐতিহ্য বহন করে চলা সামান্য কয়েকজন মহিলা একে গুরুত্ব দিতে নারাজ।
ঘাড় লম্বা করাটা কিন্তু খুব একটা সহজ কাজ নয়। আসলে ঘাড় লম্বা হয়ই না, এটা একধরনের দৃষ্টিবিভ্রম। আমাদের ঘাড়ে মাত্র ৬টি সার্ভিকাল কশেরুকা আছে, তা কোনোভাবেই বাড়ানো সম্ভব নয়। যেটা হয় পিতলের কুণ্ডলী জড়িয়ে রাখার ফলে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কলারবোন থেকে ঘাড় সরু হয়ে বাড়ে, ফলে মনে হয় ঘাড় লম্বা। কায়ান উপজাতির মহিলার লম্বা গলার মানুষ নন, এঁরা শুধু ঘাড়কে সরু করে রেখেছেন কুণ্ডলী দিয়ে পাকিয়ে রেখে। গলা সরু করার চেষ্টা না করাই ভালো, কারণ পেতলের মোটা কুণ্ডলী কলারবোনকে চেপে ধরে রাখে, ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে। শুধু কায়ানরা নয়, পৃথিবীতে আরও অনেক উপজাতির মহিলা গলার সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য গলায় কুণ্ডলী জড়িয়ে রাখে। কিন্তু শুধুমাত্র কায়ান মহিলাদের একমাত্র ‘লম্বা গলার মহিলা’ বলে ধরা হয় কারণ, এখনও পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে, কায়ান মহিলারা শিশুকাল থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত কুণ্ডলী জড়িয়ে রেখে তাদের গলাকে ৪০ সেন্টিমিটার (১৫.৭৫ ইঞ্চি) পর্যন্ত লম্বা করেছে যা এখনও পর্যন্ত বিশ্ব রেকর্ড। দক্ষিণ আফ্রিকার এনদেবেলে (Ndebele) নামের এক উপজাতীর মহিলারাও গলায় কুণ্ডলী লাগিয়ে রাখে।

কায়ান মহিলারা ৫ বছর বয়স থেকে গলায় কুণ্ডলী পরা শুরু করে। প্রতি দু-বছর পরপর একটি করে কুণ্ডলী যোগ হয়। সর্বোচ্চ তিরিশটি পর্যন্ত কুণ্ডলী গলায় পরতে পারে কায়ান মহিলারা। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে ৬০ বছর সময় লাগে। কায়ান মহিলারা থাইল্যান্ডে শরণার্থী হবার দরুন থাই আইন অনুযায়ী বিদেশি বা থাইল্যান্ডের ব্যক্তিরা যেসব কাজ করেন (রাঁধুনি, ড্রাইভার, ওয়েট্রেস এবং শরণার্থীদের জন্য কাজের একটি দীর্ঘ নিষিদ্ধ তালিকা আছে) তা করতে পারেন না। এমনকি সরকারের উপযুক্ত দফতর থেকে বিশেষ অনুমতি ছাড়া শরণার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট সীমার বাইরে যেতে পারে না। ফলে চাষাবাদ বাদ দিলে এদের জীবনযাপনের জন্য অর্থ সংগ্রহ একটি কঠিন কাজ, তাই এরা পর্যটকদের এদের লম্বা গলা ও জীবনধারণের ছবি তুলতে দিয়ে অর্থ নেয়। বিক্রি করে এদের তৈরি নানা সামগ্রী। এদের ছুঁচের কাজের জুড়ি মেলা ভার। হাতে চালানো তাঁতে বোনা কাপড়ের ওপর অপূর্ব রঙের ছটা ছড়িয়ে দিতে পারদর্শী এরা। এই কাপড় দিয়ে এরা নানান ধরনের ব্যাগ, ওয়াল হ্যাঙ্গিং তৈরি করে পর্যটকদের বিক্রি করে, বিক্রি করে কাঠ দিয়ে খোদাই করা নানা মূর্তির, গলার মালা ইত্যাদি। কায়ান মহিলাদের হাতে তৈরি এইসব জিনিস ‘লং নেক চিয়াং মাই’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
মজার বিষয় হল, একদা মায়ানমার থেকে তাড়িয়ে দেওয়া কায়ানদের ফিরে পেতে চাইছে সে-দেশের সরকার। কারণ আর কিছুই নয়, মায়ানমার সরকার দেখেছে কায়ানদের জীবন আর গ্রামকে ভিত্তি করে থাই সরকার সে-দেশের পর্যটন ব্যাবসাকে অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গেছে। প্রচুর অর্থের আমদানি হচ্ছে কায়ানদের ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যাবসায়। যদিও প্রশ্ন উঠেছে কায়ানদের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে রেখে তাদের দেখিয়ে অর্থ উপার্জন ঠিক না ভুল। উত্তর মেলেনি। খিদে ঠিক না ভুল বোঝে না।
ছবি – ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত