বিচিত্র দুনিয়া- বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রেলপথ-অরিন্দম দেবনাথ-শীত২০২৪

অরিন্দম দেবনাথ   এর সমস্ত লেখা

পরিসংখ্যান বলে ১৯৪৯ সালে তিব্বতে মাত্র এক কিলোমিটার মতো গাড়ি যাবার পাকা রাস্তা ছিল! আর আজ সেই তিব্বতে রেল পৌঁছে গেছে – যা বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলপথ। লিখেছেন – অরিন্দম দেবনাথ।

bichitraduniya91 (5)

১৯৫০ সালে চীন সরকার দেখল স্বশাসিত তিব্বতের অর্থনীতিকে যদি চাঙ্গা করে তুলতে হয় তবে সবার আগে এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। রাস্তা তৈরির পাশাপাশি শুরু হয় রেলপথ বানানোর কাজ। ঠিক হয় পশ্চিম চীনের কিংহাই (Qinghai) প্রদেশের এবং তিব্বত মালভূমির বৃহত্তম শহর রাজধানী ইংসিং (Xi’ning ) থেকে তিব্বতের রাজধানী লাসা পর্যন্ত রেলপথ পাতা হবে।

ইঞ্জিনিয়াররা তাদের কাজ শুরু করে দেন। প্রথমেই চলে জরিপের কাজ। অনেক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালিয়ে ঠিক হয় রেলপথকে দুভাগে তৈরি করা হবে। একটি ধাপে ইংসিং থেকে কুনলুন পর্বতমালার পাদদেশে কাইদাম নদীর অববাহিকা  গোলমুড (Golmud) পর্যন্ত ৮১৫ কিমি রেলপথ যাবে। আর একটি ধাপে গোলমুড থেকে লাসা পর্যন্ত ১১৪২ কিমি রেলপথ তৈরি হবে। যখন এই পরিকল্পনা হয় তখন গোলমুডে কোন বসতি ছিল না।  চীন সরকার এমনি এমনি এই জনমানবহীন অঞ্চলে রেলপথ বানাতে চাননি। এর পেছনে অবশ্যই ছিল বাণিজ্যিক স্বার্থ। জরিপের ফলে জানা গিয়েছিল এই অঞ্চলটির মাটির তলায় রয়েছে  প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল সহ পটাশ ও নানাবিধ খনিজের ভাণ্ডার।  ১৯৫৪ সালে ১০জন লোককে পাঠিয়ে শুরু হয় বসত নির্মাণের সূচনা।  এটি বর্তমানে তিব্বত মালভূমির তৃতীয় বৃহত্তম শহর। ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রায় দুলক্ষ তিরিশ হাজার মানুষ বাস করে গোলমুড শহরে।  

২০০১ সালে গোলমুড- লাসা রেলপথের কাজ শুরু হয় এবং ২০০৬ সালের ১ জুলাই দুই রেলপথকে জুড়ে এই ১৯৫৬ কিমি  লম্বা কিংহাই- টিবেট রেলপথ খুলে দেওয়া হয় সাধারনের জন্য।

পরবর্তী সময় লাসা থেকে আরও তিনটি রেলপথ তৈরির কাজ শুরু হয় তিব্বতের সীমান্ত অঞ্চলগুলো জুড়তে।

একটি হল লাসা-শিগাতসে-তিব্বত রেলওয়ে। শিগাতসে তিব্বতের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। ২৫৩ কিমি লম্বা এই পথে ট্রেন ছোটে ১২০ কিমি গতিতে।  ২০১৪ সালে চালু হয়ে যায় এই রেলপথ।

আর দুটি  রেলপথ যা তৈরির কাজ এখনও চলছে (২০২৪) তার একটি হল শিগাতসে থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু পর্যন্ত। অপরটি হল শিগাতসে – ইয়াদং রেলওয়ে যা চায়না-ইন্ডিয়া রেলওয়ে নামেও পরিচিত। শিগাতসে সিকিম-ভুটান সীমান্তের চুম্বি উপত্যকার একটি অঞ্চল। এই রেলপথ তৈরি হয়ে গেলে দক্ষিণ এশিয়ার সাথে ভারতীয় মহাসাগরের  রেল-যোগসাধন সম্ভব হবে।     

সবকিছু সামলে প্রকৃতির সেরকম ক্ষতি না করে এরকম একটা বিশাল রেলপথ তৈরির কাজ মোটেই সহজ ছিল না। শুধু অর্থই নয় প্রয়োজন ছিল সঠিক পরিকল্পনা আর চ্যালেঞ্জকে সামনে করার মানসিকতা আছে এরকম একটি দল। প্রাকৃতিক বাধায় ভরা এই রেলপথের প্রায় এক হাজার কিমি পথ গিয়েছে সমুদ্রতল থেকে গড়ে ৪৫০০ মিটার উচ্চতা দিয়ে, তাঙ্গুলা পাস দিয়ে যাবার সময় এই রেলকে পার হতে হয় ৫৭০২ মিটার উচ্চতা। যা এখনও পৃথিবীর উচ্চতম রেলপথ যোগাযোগকারী বিন্দু।

মূল মালভূমিতে প্রবেশের আগে এই  রেলপথ গিয়েছে গোবি মরুভূমি ছুঁয়ে, বিস্তীর্ণ ঘাসজমি, কুইলুন পর্বতমালা, জলাভূমি আর নুনে ভরা কিছু লেকের পাশ দিয়ে। কুমীরের দাঁতের মতো রেলপথের দুধারে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে বরফঢাকা আকাশ ছুঁয়ে থাকা পাহাড়চূড়া। যা বছরের অধিকাংশ সময়েই মেঘের চাদর মুড়ি দিয়ে থাকে।

বর্তমানে কমসংখ্যক বিদেশীদের তিব্বতে, বিশেষ করে লাসা যেতে দেওয়া হলেও একটা সময় এ ছিল নিষিদ্ধ দেশ। বিদেশীদের বিশেষ করে ইংরেজের তিব্বতকে জানার আগ্রহ ছিল সব চাইতে বেশি। ১৮১১ প্যারিসে মেডিসিন ও চাইনিজ ভাষা শেখা নরউইচের টমাস ম্যানিং লাসা যাবেন বলে ঠিক করেন। তিনি চীনের ক্যান্টন শহর থেকে থেকে জাহাজে চেপে কলকাতায় আসেন, তারপর একজন চাইনিজ সহকারীকে সঙ্গে করে ভুটান হয়ে তিব্বতের লাসায় পৌঁছন। সেসময় চীন থেকে তিব্বতে প্রবেশ নিষেধ ছিল। যতদূর জানা গেছে, টমাসই প্রথম ইংলিশম্যান যিনি তিব্বতে গিয়েছিলেন।

একটা সময় তিব্বত শুধু নিষিদ্ধই ছিল না, সেখানে পায়ে হাঁটা ছাড়া অন্য কোন পরিবহণ ছিল না। এই রেলপথ তিব্বতকে সেই অপরিবহণ কাল থেকে মুক্ত করে।

তিব্বত মালভূমিকে ‘পৃথিবীর ছাদ’ বলা হয় অতি উচ্চতায় এর সমভূমির জন্য। বলতে গেলে এটি পৃথিবীর তৃতীয় মেরু অঞ্চল। চীনদেশ দিয়ে প্রবাহিত বহু নদীর উৎপত্তি হয়েছে তিব্বত থেকে। এই মালভূমির ভঙ্গুর ও সংবেদনশীল ভৌগলিক পরিবেশ যাতে অটুট থাকে তার জন্য রেলপথ নির্মাণের সময় সবরকম যত্ন নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা করা হয়েছিল এই রেললাইন তৈরি হওয়া সত্ত্বেও যেন তিব্বতের বন্য জীবজন্তুদের চলার পথে কোনো বাধা না আসে। দেশ বিদেশের অনেক অনেক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল।

এই রেলপথ তৈরিতে যে তিনটে মূল বাধা ছিল। তারা হল – উচ্চতাজনিত সমস্যার ফলে অক্সিজেনের ঘাটতি। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ এখানে সমুদ্রতল থেকে ৩৫ থেকে ৪০% কম। বরফ হয়ে থাকা জমি আর ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র (ecosystem)। এই অঞ্চলের অনেকটা বিশেষ করে কুনলুন পার্বত্য এলাকা ভূমিকম্প প্রবন। প্রায়শই কেঁপে ওঠে এখানকার মাটি।

ইংসিং থেকে গোলমুড পর্যন্ত ৮১৫ কিমি রেলপথ ১৯৮৪ সালে চালু হয়ে গেলেও গোলমুড থেকে লাসা অংশের ১১৪২ কিমি রেলপথ পাতার কাজ ২০০১ সালের আগে শুরু করা যায়নি। চায়না শাসিত সমস্ত অঞ্চল জুড়ে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন চীনের অন্যতম আর্থিক ক্রমবিকাশের হাতিয়ার। চীন কর্তৃপক্ষ দেশের প্রতিটি অংশে আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে চেয়েছেন বিশেষ কিছু অংশকে উন্নত করার চাইতে। কারণ সব কিছুই একসময় এমন একটা স্তরে পৌঁছয় যাকে টেনে আর ওপরে তোলা যায় না। তার চাইতে সার্বিক উন্নয়ন অনেক বেশি ফলপ্রসূ।

গোলমুড থেকে লাসা পর্যন্ত রেলপথের অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়ে পারমাফ্রস্ট অঞ্চল। মাটি আর জল একসাথে জমে এখানকার ভূগর্ভ চিরহিমায়িত। শীতকালে এখানকার গড় তাপমাত্রা চলে যায় হিমাঙ্কের ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নীচে আবার গরমকালে তাপমাত্রা বেড়ে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে যায়। তখন ভূপৃষ্ঠের ওপরের অংশ গলে কাদা-কাদা হয়ে যায়।

ইঞ্জিনিয়াররা অনেক ভেবে রেলপথকে সুরক্ষিত ও সচল রাখতে এবং জন্তু জানোয়ার যাতে বিনা বাধায় চলাচল করতে পারে সে কারণে জনবসতিহীন পৃথিবীর ছাদে অসংখ্য জায়গায় থাম বসিয়ে তার ওপর দিয়ে এলিভেটেড ট্র্যাক (elevated  track) বানালেন। যাকে সহজ ভাষায় ফ্লাই-ওভার বা উড়ালপুল বলে আমরা চিনি। 

পারমাফ্রস্ট অঞ্চলে মাটির নীচে বড় বড় পাইপ ঢুকিয়ে তার ভেতর তরল নাইট্রোজেন ঠেসে সেই অঞ্চলকে চির হিমায়িত করা হয়েছে। যাতে গরমের সময় বরফ গলে রেলের লাইন বসে গিয়ে কোন দুর্ঘটনা না ঘটে। স্থাপত্যকলায় প্রয়োগ করা এ এক অসাধারণ উদ্ভাবনী শক্তি। প্রকৃতি থেকে পাওয়া নানা বাধাকে দূর করতে ইঞ্জিনিয়াররা তাদের নতুন নতুন উদ্ভাবন উজাড় করে দিয়েছেন এই রেলপথ বানাতে। 

কঠোর পরিবেশে যেখানে আবহাওয়া অনবরত বদলাতে থাকে সেখানে সংকেত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিক রাখা আরও একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ ধারাবাহিক রাখা। এই সমস্যা সমাধানে প্রথমে ন’টি সৌরশক্তি উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল,পরে আরও এরকম সাতটি কেন্দ্র তৈরি হয়। সব চাইতে উঁচুতে যে সৌরশক্তি উৎপাদন কেন্দ্রটি আছে তার উচ্চতা ৫১০০ মিটার।

তিব্বত মালভূমি শুধু অনেক নদীর উৎসই নয়, এখানে এমন অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায় যা পৃথিবীর আর অন্য কোথাও জন্মায় না। এই অন্য কোথাও না পাওয়া উদ্ভিদের প্রজাতি খুব কম নয় – প্রায় হাজার পাঁচেক জানিয়েছেন চায়ানার গুয়ানঝাউ বিশ্ববিদ্যালয় – স্কুল অফ লাইফ সাইন্সএর গবেষক হাইবিন ইউ। তিব্বতের ঘাসজমিতে জন্মানো এই সব গাছপালা তিব্বতের মালভূমিতে চড়ে বেড়ানো তিব্বতি গ্যাজেল আর বুনো ইয়াকের অন্যতম খাদ্য। এই আদিম ও অদ্ভুত বাস্তুতন্ত্র যাতে কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তাই রেলপথ তৈরি শুরু করার আগেই স্টেট এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (SEPA), ভূমি ও সম্পদ মন্ত্রক এবং রেলপথ মন্ত্রক প্রকল্পের বিশেষজ্ঞরা লাইনের দৈর্ঘ্য বরাবর বাস্তুতন্ত্রের বিশদ পর্যালোচনা করে এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য বিশদ ব্যবস্থা নিয়ে তবেই কাজ শুরু করে। নির্মাণ কাজ এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বাস্তুতন্ত্র রক্ষার জন্য প্রাথমিক ভাবে এক বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় বারশ কোটি টাকা) বরাদ্দ করা হয়েছিল। ভঙ্গুর বাস্তুত্রন্ত এবং গাছাপালা যাতে ব্যাপকভাবে ধংস্ব না হয় তা নিশ্চিত করে রেলের পথের নকশা করে হয়েছিল। এমনকি যে সব সংস্থা এই নির্মাণে কাজ করেছেন তাদের ‘পরিবেশ সুরক্ষা দায়িত্ব চুক্তি’তে সই করতে হয়েছিল।

bichitraduniya91 (4)

কিংহাই-তিব্বত রেলওয়ে দুটি রাজ্য-স্তরের প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের (nature reserve) মধ্যে দিয়ে গেছে – হোহ শিল এবং কিয়াংটাং। বন্যপ্রাণীরা যাতে রেলের লাইনের তলা দিয়ে বিনা বাধায় যাতায়াত করতে পারে সে জন্য ২৫টি মাইগ্রেশন প্যাসেজ বা উড়ালপুল করা হয়েছে। জুন ২০০৫ সালে করা এক বৈদ্যুতিন পর্যবেক্ষণ দেখা গেছিল যে অনেক তিব্বত-অ্যান্টিলোপের দল প্যাসেজের নীচ দিয়ে অবাধে পারাপার করেছে। SEPA এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা করে দেখেছেন রেলপথের আশপাশের হিমায়িত মাটি, গাছপালা, জলাভূমি, নদীর জলের গুণমান বজায় আছে এবং মালভূমির বাস্তুতন্ত্র উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়নি। রেলপথের অধিকাংশটাই গিয়েছে চার হাজার মিটার উচ্চতার ওপর দিয়ে, যেখানে অক্সিজেন কম, প্রায় সবসময় দুরন্ত গতিতে বালিঝড় বইতে থাকে, হতে থাকে তুষারপাত। এখানে অতিবেগুনী রশ্মির বিকিরণ খুব শক্তিশালী, তাই এই অঞ্চল মানব জীবনের জন্য ‘নিষিদ্ধ।’ শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা দূর করার জন্য শুধু সবার জন্য চিকিৎসা বীমার ব্যবস্থাই করা হয়নি, নির্মাণস্থলের আশপাশে মোট ১১৫টি চিকিৎসা কেন্দ্র খোলা হয়েছিল এবং ৬০০ জনের বেশি পেশাদার চিকিৎসক রাখা হয়েছিল, শ্রমিকদের চিকিৎসা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াও নির্দিষ্ট সময় পরপর তাদের কম উচ্চতায় পাঠিয়ে দেওয়া হত বিশ্রামের জন্য। কুনলুন পর্বতে কাজ করার সময় শ্রমিকদের পিঠে ৫কেজি অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে কাজ করতে হত যাতে নিশ্বাসজনিত কোন সমস্যা না হয়। জায়গাটা সমুদ্রতল থেকে ৪৬০০ মিটার উঁচুতে। এক বছরে ১,২০,০০০ অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়েছিল! চায়না রেলওয়ে শ্রমিকদের থাকার ডর্মেটারিতে পাইপলাইন দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করত। ৪৯০৫ মিটার উঁচু ফেংহাও মাউন্টেন টানেল নির্মাণের সময় রেল কর্তৃপক্ষ ১৭টি অক্সিজেন উৎপাদনকারী প্ল্যান্ট বসিয়ে নিয়েছিল যাতে সবসময় টানেলের ভেতর পর্যাপ্ত অক্সিজেন জোগান দেওয়া যায়। ফলে নির্মাণের সময় ৪৫৩০০০টি অসুস্থতার ঘটনা ঘটলেও অসুস্থতাজনিত কোনো মৃত্যু হয়নি। ৪২৭টি ঘটনা ছিল হাইড্রোসেফালাস জনিত (হাইড্রোসেফালাস হল একটি স্নায়বিক ব্যাধি যা মস্তিষ্কের গভীরে ভেন্ট্রিকলে (গহ্বর) সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডের অস্বাভাবিক গঠনের কারণে ঘটে) ও ৮৪১টি ছিল পালমোনারি এডিমা জনিত (ফুসফুসে অত্যধিক তরল দ্বারা সৃষ্ট একটি অবস্থা। এই তরল ফুসফুসের অনেকগুলি বায়ুথলিতে জমা হয়, যার ফলে শ্বাস নিতে অসুবিধা হয়।) বরফে পরিণত হওয়ার সময় মাটির আয়তন প্রসারিত হয় ও গরমের সময় বরফ গলে তা কমে যায়। এই সম্প্রাসারন ও সংকোচনের ফলে অনেক সময় জমিতে ফাটল দেখা যায়। অতি উচ্চতায় যেখানে সূর্যালোক ও ভূতাত্ত্বিক নড়াচড়া বেশি সেখানে কম উচ্চতার থেকে অনেক বেশি এই ফাটলের ঘটনা ঘটে।  আর তিব্বতের মালভূমিতে হিমায়িত ভূমির চরিত্র অতি জটিল। অন্যান্য দেশের গবেষণার তত্ত্ব ও তার প্রয়োগকে মাথায় রেখে সমস্যা এড়ানোর জন্য চীনা বিশেষজ্ঞরা হিমায়ত মাটিতে সরাসরি রেললাইন না পেতে সেখানে উড়ালপুল বানিয়েছিলেন।  এরকম প্রায় কুড়ি ধরনের জমি জনিত সমস্যা ইঞ্জিনিয়াররা সামলেছিলেন নতুন নতুন উদ্ভাবনের দ্বারা।  তারমধ্যে অন্যতম হল জমিতে পাইপে তরল নাইট্রোজেন ঠেসে তাকে চির হিমায়িত করা। রেলের লাইন এমনভাবে পাতা হয়েছিল যাতে করে অনায়াসে ঘন্টায় ১০০ কিমি গতিতে ট্রেন ছুটতে পারে। চীনা ইঞ্জিনিয়াররা বহু শতাব্দী আগেই তাঁদের উদ্ভাবনী শক্তির প্রমাণ দিয়েছেন, যার অন্যতম দৃষ্টান্ত প্রায় ২১০০০ কিমি লম্বা চীনের প্রাচীর। খ্রিষ্টের জন্মের বহু আগে দেশকে বহিরাগত আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে শুরু হয়েছিল এই প্রাচীর তৈরির কাজ, পরে একের পর এক রাজবংশ এসে এই প্রাচীরের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে যান। এই প্রাচীর গোবি মরুভূমি থেকে ঘন জঙ্গল ও বরফ ঢাকা পর্বতের মধ্যে দিয়ে গেছে। ২৫ ফুট উঁচু সেই প্রাচীরের মাথায় ১০ থেকে ১২ ফুট চওড়া হাঁটার রাস্তা আর প্রায় ৫০০ ফুট পর পর নজরদারির জন্য এক একটা ওয়াচ টাওয়ার। অতি দক্ষতার সাথে জরিপের কাজ করে নিখুঁত পরিকল্পনা করে তৈরি হয়েছিল এই চীনের প্রাচীর।

bichitraduniya91 (1)

অতি উচ্চতায় অক্সিজেন কম থাকার দরুন রেল পাতায় নিয়োজিত কর্মীদের শ্রমসাধ্য কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল, তাই বিশেষ অক্সিজেন সহায়তা দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অনেক জায়গায় পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে কাজ করেছে শ্রমিকরা। শুধু শ্রমিকদের জন্যই নয় এপথে রেল ভ্রমণের সময় যাতে অক্সিজেনের অভাবে যাত্রীদের প্রাণ সংশয় না হয় তাই ট্রেনের কামরার ভেতর প্লেনের মতো অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয় অতি উচ্চতায় অতিবেগুনী রশ্মি যাতে যাত্রীদের চোখের কোন ক্ষতি না করতে পারে সেজন্য কামরার প্রতিটি কাঁচের জানালায় ইউ-ভি ফিল্টার লাগানো হয়েছে। তবে হ্যাঁ, এই পথে রেল যাত্রা করতে হলে যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয় ও স্বাস্থ্য নিবন্ধক কাগজে সই করতে হয় এই মর্মে যে এই পথে রেল যাত্রার বিপদ সম্পর্কে তিনি জানেন, ও কোন দুর্ঘটনা ঘটলে রেল কর্তৃপক্ষ দায়ী হবে না।

সমস্ত সাবধানতা সত্ত্বেও ২০০৬ সালের আগস্টে প্রথম যাত্রী মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এই রেলপথে, এক ৭৫ বয়সী ব্যাক্তি হৃদপিণ্ডে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও জোর করে রেল ভ্রমণ করেন, রেলযাত্রাকালীন মারা যান উনি। যাই হোক, চীনের রেলপথ মন্ত্রকের সূত্র অনুসারে এই রেলপথ নির্মাণকালীন সময়ে উচ্চতা জনিত অসুস্থতায় কোন শ্রমিকের মৃত্যু না হলেও অন্যান্য দুর্ঘটনায় ৪০ জন শ্রমিক মারা গিয়েছিল। 

bichitraduniya91 (3)

এই রেলপথ তৈরির পর তিব্বতের অর্থনীতি একটু একটু করে বদলাতে শুরু করে। যেহেতু তিব্বতে শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রি বলে প্রায় কিছু নেই তাই তিব্বতকে মূলত চীন থেকে অনেক কিছুই আনতে হয়। ১৯৫০এর পর এই রেলকে ভিত্তি করে শুরু হয় পর্যটন ও অন্যান্য ব্যবসা, যা ‘পুরনো তিব্বত’ কখনও ভাবেনি বা তাদের ধারনাতেও ছিল না। প্রাকৃতিক তেল ও গ্যাস এবং রাবারকে ঘিরে গড়ে ওঠে নানা শিল্প। আমাদানির পাশাপাশি রপ্তানি শুরু হয় তিব্বত থেকে।

রেলপথ চালুর আগে চীনের কিংহাই প্রদেশ থেকে একটি রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল কিংজাং হাইওয়ে নামে, কিন্তু পিচ বাঁধানো রাস্তা হলেও সে রাস্তা অতীব ভয়ংকর। বরফের মরুর মাঝের রাস্তা অধিকাংশ সময়েই যান চলাচলের অবস্থায় থাকে না তুষারপাত, বৃষ্টি ও পাথর পড়ে বন্ধ হয়ে যাবার কারণে। ফলে এই রাস্তা দিয়ে বছরে এক মিলিয়ন টনের মতো মালপত্র আমদানি রপ্তানি হত তা ছাড়া এই দুর্গম সড়ক পথে মালপত্র আনা নেওয়ার খরচ পড়ত অনেক বেশি। রেলপথ চালু হয়ে যাবার পর ২০১০ সালে ২.৮ মিলিয়ন টন সামগ্রী আমদানি রপ্তানি হয়েছিল, যার প্রায় চার ভাগের তিনভাগ হয়েছিল রেলপথে এবং খরচ পড়েছিল অনেক কম।

২০০৭ সালের মে মাসে তিব্বতের রাজধানী লাসায় চালু হয় যাত্রীবাহী প্লেন চলাচল। দলে দলে পর্যটক ভিড় করে দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ থাকা দেশে।     

bichitraduniya91 (2) 

     ছবি – ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

 

 

Leave a Reply