funবিজ্ঞান-মহাবিশ্বে মহাকাশে-গ্রহরাজ বৃহস্পতি-কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়-শীত ২০২৪

মহাবিশ্বে মহাকাশে সব পর্ব একত্রে

bigganjupiter

বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গল— সৌরজগতের এই চারটি গ্রহ কঠিন বস্তু দিয়ে তৈরি। এরপর গ্রহাণুদের বিস্তীর্ণ এলাকা পেরিয়ে গেলে প্রথম যে গ্রহটির সঙ্গে দেখা হবে সেটা বৃহস্পতি। সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ। তবে এর কঠিন কেন্দ্রীয় অংশটি তুলনায় খুবই ছোট। বাকিটা সবই গ্যাসীয়। আকারে বিশাল হলেও এর ভর খুবই কম। বৃহস্পতি ব্যতীত সৌর জগতের বাকি সাতটি গ্রহের ভর একত্র করলে বৃস্পতির ভর তা থেকে মাত্র আড়াই গুণ বেশি হবে। সূর্য থেকে দূরত্বের বিচারে এটি সৌরজগতের পঞ্চম গ্রহ। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘জুপিটার (Jupiter)’। আমাদের দেবরাজ ইন্দ্রের মতো রোমান পুরাণে দেবরাজ হলেন জুপিটার। এই নাম থেকেই গ্রহটির এমন নামকরণ। এই নামটি প্রাক-ইন্দো-ইউরোপীয় ভোকেটিভ কাঠামো থেকে এসেছে যার অর্থ হল ‘আকাশের পিতা’। বৃহস্পতির পরবর্তী তিনটি গ্রহ অর্থাৎ শনি, ইউরেনেস এবং নেপচুনও গ্যাস দানব গ্রহ। এই চারটি গ্রহকে একসঙ্গে বলা হয় ‘জোভিয়ান গ্রহ’। জুপিটার শব্দের বিশেষণ রূপ জোভিয়ান। পৃথিবীর আকাশে এটি খালি চোখে দৃশ্যমান।

ভারতীয় পুরাণ অনুযায়ী বৃহস্পতি দেবতাগণের পিতা। ঋক্‌ বেদের কোনো কোনো মন্ত্রে ইনি যজ্ঞ রক্ষাকর্তা, সর্বময় পিতা ও সর্বদেবতাস্বরূপ বিশেষণে বন্দিত হয়েছেন। পরবর্তীকালে বেদের এই দেবতা গ্রহাধিকারিরূপে বর্ণিত হয়েছেন। সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে বৃহস্পতি যেমন পঞ্চম গ্রহ তেমন সপ্তাহের পঞ্চম দিন হল বৃহস্পতিবার। গ্রহের নামানুসারে বারের এই নামকরণ করেছিলেন প্রাচীন ভারতীয় ঋষিরা। যেহেতু বৃহস্পতিকে দেবগুরু বলা হয় তাই অনেকে এই বারটিকে গুরুবার বলে থাকেন।

পৌরাণিক যুগে বৃহস্পতি ঋষিরূপে খ্যাত হন। মহর্ষি অঙ্গিরা ছিলেন তাঁর পিতা এবং মাতার নাম ছায়া।

সুমেরীয় সভ্যতায় বৃহস্পতি ‘সাগ-না-গার’ (Sag-nae-gar) এবং ‘মূল-বব্বর’ (Mul-babbar) নামে পরিচিত ছিল। ব্যাবিলনীয়রা একে ‘নিবিরু-মারডুক’ (Nibiru-Marduk) নামে ডাকত। অবশ্য সময়ে সময়ে তাঁরা একে ‘উডালটার’ও (Udaltar) বলত। এবারে আসি চৈনিকদের কথায়। তাঁরা এই গ্রহটিকে ‘মু জিং’ (Mu Xing) বলত।

অভ্যন্তরীণ গঠন- সৌরজগতে বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতি। এর বেশির ভাগটাই গ্যাসীয়— মূলত হাইড্রোজেন (প্রায় ৯৩%) ও হিলিয়াম (প্রায় ৭%) দ্বারা গঠিত। কেন্দ্র অঞ্চলটি মূলত আয়রন সিলিকেট-এর পাথুরে উপাদান দ্বারা গঠিত, যার ব্যাস ১৪,৪৯২ কিলোমিটার। আবার এই পাথুরে কেন্দ্র অঞ্চলটি আবৃত রয়েছে বরফ দ্বারা গঠিত অপর এক কেন্দ্র অঞ্চল দ্বারা।

বৃহস্পতির এই কঠিন কেন্দ্রটির ভর আমাদের পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি। স্বাভাবিকভাবেই সৌরজগতের এই পঞ্চম গ্রহটির কেন্দ্রের অভিকর্ষীয় আকর্ষণ পৃথিবীর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এই কারণেই গ্রহটির জন্মলগ্নে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং অন্যান্য উদ্‌বায়ী গ্যাস ছিল তার প্রায় সমস্তটাই আবহাওয়ামণ্ডলে বন্দি হয়ে আছে। যদিও কেন্দ্র থেকে ৩০,০০০ কিলোমিটার থেকে ৪০,০০০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা হাইড্রোজেন তরল অবস্থায় রয়েছে এবং এর ধর্ম অনেকটা ধাতুর মতো এবং এটি তড়িৎ পরিবাহী। এই তরল ধাতব হাইড্রোজেন-স্তরের উপরে রয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোট আরেকটি হাইড্রোজেনের স্তর। এটি বিদ্যুৎশক্তির সুপরিবাহী নয়। এর উপরে রয়েছে আণবিক হাইড্রোজেনের আরেকটি স্তর যা ১৪,০০০ কিলোমিটার থেকে ২০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই তরল হাইড্রোজেনের মধ্যে অনবরত চাপ হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে স্তরগুলির মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। বিজ্ঞানীদের অনুমান গ্রহটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায় ৩ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বায়ুচাপ প্রায় ৫ কোটি বায়ুমণ্ডলীয় চাপের সমান। অর্থাৎ পৃথিবীর বায়ুচাপের তুলনায় প্রায় ১০ লক্ষ গুণ বেশি।

বায়ুপ্রবাহ ও মেঘ- বৃহস্পতির কেন্দ্রীয় অঞ্চলটি ছোট হলেও এর ভর ও মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর তুলনায় অনেক গুণ বেশি। ফলে উপরের গ্যাসীয় অংশ সর্বদাই অস্থিরময়। যেন সর্বক্ষণ ঝড় বইছে। গ্রহটির কোনো ভূমিপৃষ্ঠ না থাকায়, মহাকাশযানগুলির পক্ষে এর আবহাওয়ামণ্ডলের বায়ুপ্রবাহের গতিবিধি পরিমাপ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। যদিও ‘গ্যালিলিও’ মহাকাশযানটি সেই দুরূহ কাজটি করতে সক্ষম হয়। মহাকাশযানটি গ্রহটির বায়ুপ্রবাহের যে পরিমাপ করেছিল সেটা ছিল ঘন্টায় ৫৩১ কিলোমিটার। আরও একটি তথ্য পাওয়া গেছে যে এখানকার বায়ুর প্রকৃতি ও গঠনের কারণগুলি পৃথিবীর বায়ুর প্রকৃতি ও গঠনের থেকে আলাদা।

ভয়েজার মহাকাশযানের পাঠানো ছবি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে তিন স্তরের মেঘ রয়েছে। সর্বোচ্চস্তরের মেঘ অ্যামোনিয়ার কেলাস দ্বারা গঠিত, মধ্যের স্তরটি গঠিত হয়েছে অ্যামোনিয়াম হাইড্রোসালফাইড-এর কেলাস দ্বারা, আর সর্বনিম্ন স্তরটি জল ও বরফের কেলাস দিয়ে তৈরি। এই স্তরটি অন্য দুটি স্তরের তুলনায় অনেক বেশি পুরু। অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন-এর উপস্থিতির দরুন বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডল ও মেঘরাশি অত্যন্ত দুর্গন্ধময়— এমনই ধারণা বিজ্ঞানীদের। আগেই বলেছি, বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে সর্বদাই ঝড় বইছে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে ধেয়ে চলা এই ঝড় কয়েক দশক থেকে কয়েক শতাব্দী ধরে প্রায় একই রকমভাবে বয়ে চলেছে। গ্রহটিতে কোনো পর্বতমালা না থাকায় ঝড়ের কোনো দিক পরিবর্তন হয় না।

এই অস্থিরতার দরুন গ্রহটির উপরিভাগের লক্ষণ ও চিহ্নগুলি অনবরত পাল্টাতে থাকে। তবে কিছু কিছু চিহ্ন কখনই পাল্টায় না। এরকমই একটা চিহ্ন আছে গ্রহটির দক্ষিণ গোলার্ধে। প্রকান্ড আকারের এই লাল দাগটি পৃথিবীর মানুষ একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই জায়গায় দেখে আসছে। এটা কত বড় বোঝাতে গেলে বলতে হয় এর মধ্যে তিনটে পৃথিবী সচ্ছন্দে ঢুকে যেতে পারে। এই দাগটাকে বলা হয় বৃহস্পতির লাল চোখ। এই বিরাট লাল চোখের উৎপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে বয়ে চলেছে বিপরীতমুখী এক প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণি ঝড়। কবে থামবে জানা নেই। কারণ কোনো ঝড়কে দুর্বল করে দেবার মতো ঘর্ষণ বল গ্রহটিতে নেই। বৃহস্পতির চোখের রঙ মূলত লাল হলেও মাঝে মাঝে এই রঙ পাল্টে হাল্কা গোলাপি বর্ণ ধারণ করে। এই লাল রঙের কারণ এখনও রহস্যে ঘেরা।

বৃহস্পতিকে ঘিরে থাকা মেঘরাশি- গ্রহটিকে ঘিরে থাকা মেঘরাশি সর্বত্র একই রঙের নয়— বিভিন্ন উজ্জ্বল ও কৃষ্ণ বর্ণের ডোরাকাটা দাগে বিভক্ত। এগুলি বিষুবরেখার সমান্তরালে গ্রহটির চারপাশে বিভিন্ন বেগে ঘুরে চলেছে। ঊর্ধ্বমুখী গ্যাসের দ্বারা গঠিত উজ্জ্বল রঙের দাগগুলিকে বলা হয় ‘অঞ্চল’ (Zones) আর নিম্নপ্রবাহমান গ্যাসের সাহায্যে গঠিত কৃষ্ণকায় ডোরাকাটা দাগগুলির নাম ‘বেষ্টনী’ (Belt)।

বৃহস্পতির বলয়- বৃহস্পতিকে ঘিরে আছে বিভিন্ন আকৃতির তড়িতাহত কণিকার দ্বারা সৃষ্ট বলয়। এই বলয়ের কথা আমরা জানতে পারি ১৯৭৯ সালের ৪ মার্চ ভয়েজার-১ মহাকাশযানটির তোলা ছবি থেকে। গ্রহটি থেকে প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত এই বলয় জগৎ এতটাই পাতলা এবং অনুজ্জ্বল (শনি গ্রহের বলয়গুলির তুলনায় প্রায় ১০০ কোটি গুণ কম উজ্জ্বল) যে পৃথিবী থেকে শক্তিশালী দুরবিন দিয়েও এগুলো সহজে দেখা যায় না।

বৃহস্পতির বলয়সমূহ-কে প্রধান তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়— (১) গোসামার বলয়, (২) প্রধান বলয়, (৩) হেলো।

গোসামার বলয়- বাইরের দিকের এই বলয়টি দুটি সম আকৃতির অনুজ্জ্বল বলয় দ্বারা গঠিত। বলয় দুটি একটি অপরটির সঙ্গে আবদ্ধ। দুটি বলয়েরই কেন্দ্রীয় অঞ্চলের তুলনায় উপরিভাগ ও নিম্নভাগের ঔজ্জ্বল্য বেশি।

প্রধান বলয়- বৃহস্পতির বলয় জগতের মধ্যেকার উজ্জ্বলতম বলয়টিকে বলা হয় প্রধান বলয়। এটি ৬,৪৪০ কিলোমিটার থেকে ১ লক্ষ ২৮ হাজার ৯৪০ কিলোমিটার পরিসর ব্যাপী বিস্তৃত।

হেলো- গ্রহটির বলয় জগতের সবচেয়ে ভিতরের দিকের বলয়টির নাম ‘হেলো’। খুব ছোট ছোট কণার উপাদানে গঠিত আংটি আকৃতির এই বলটি প্রধান বলয়ের ভিতরের সীমানা থেকে শুরু করে খাড়াভাবে বৃহস্পতি পর্যন্ত বিস্তৃত।

বৃহস্পতির প্রাকৃতিক উপগ্রহঃ বর্তমানে বৃহস্পতি গ্রহের ১০১টি প্রাকৃতিক উপগ্রহ আছে। তবে এক মিটার ও তার চেয়ে ছোট উপগ্রহগুলিকে বাদ দিয়ে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত হিসেব অনুযায়ী মনোনীত এবং নামকরণকৃত উপগ্রহের সংখ্যা ৯৫টি। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় চারটি উপগ্রহ হল, আইয়ো (Io), ইউরোপা (Europa), গ্যানিমেড (Ganymede) এবং ক্যালিস্টো (Callisto)। এদেরকে আবিষ্কারকের নামানুসারে বলা হয় গ্যালিলিয়ান উপগ্রহ। ১৬১০ সালে গ্যালিলিও এগুলি আবিষ্কার করেছিলেন। এই চারটি উপগ্রহের তুলনায় বাকি ৯১টি উপগ্রহ যথেষ্ট ছোট। বাকি উপগ্রহগুলির কয়েকটি হল— মেটিস (Metis), অ্যাড্রাস্টিয়া (Adrastea, অ্যামালথিয়া (Amalthea), থীবী (Thebe), থেমিস্টো (Themisto), লেডা (Leda), হিমালিয়া (Himalia), লিসিথিয়া (Lysithea), ইলারা (Elara), ডিয়া (Dia), কার্পো (Carpo), ইউপোরি (Euporiea), থেলক্সিনোই (Thelxinoe), ইউয়ান্থে (Euanthe), হেলিক (Helike), ওর্থোসাই (Orthosie), লোকাস্টা (Locaste), প্র্যাক্সিডিক Praxidike), হার্পালিক (Harpalyke) ইত্যাদি।

 

তথ্য সূত্র-

 মহাবিশ্বের বিস্ময় (দ্বিতীয় খণ্ড); অরুণাভ চক্রবর্তী, ভাষা ও সাহিত্য, কলকাতা
 মহাবিশ্বে আমরা কি নিঃসঙ্গ; শঙ্কর চক্রবর্তী, বেস্টবুক্‌স্‌, কলকাতা
 Exploration of the solar system by W. J. Kaufmann
 Wikipedia

জয়ঢাক প্রকাশন থেকে এই লেখকের লেখা মহাবিশ্বে মহাকাশে বইটি কিনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

মহাবিশ্বে মহাকাশে

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Leave a Reply