ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-সব লেখা একত্রে

১৬১৬ খৃষ্টাব্দের ২২ জুন পৃথিবীর ইতিহাসে ছিল এক অন্যতম বিশেষ দিন। রোম শহরের বিখ্যাত গির্জা সান্তা মারিয়া সোপরা মিনার্ভার একটি ঘরে ৫২ বছরের গ্যালিলিও গ্যালিলিকে নতজানু হতে বাধ্য করল গির্জার সাত প্রশাসক। অপরাধের ফিরিস্তি পড়ে শোনানো হল- “পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বিরুদ্ধে মিথ্যে বার্তা দিয়ে বই লিখে এবং সেই ধারণায় বিশ্বাস রেখে ধর্মদ্রোহিতার পাপ করেছ। বলেছ, সূর্য জগতের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পূব থেকে পশ্চিমে সে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে না। এই ধারণা যে পবিত্র গ্রন্থ বাইবেল বিরুদ্ধ, তা তোমাকে মনে করিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও ভ্রান্ত মতবাদ ধারণ করেছ। নিজের অপরাধ স্বীকার করে নাও। নাহলে চরম শাস্তি পেতে হবে।”
গ্যালিলিও জানতেন, বাইবেলের বিরোধিতা করার ন্যূনতম শাস্তি অন্ধকার ঘরে অনির্দিষ্টকাল কারাবাস। মাত্র দেড় দশক আগে এই রোম শহরেই জীবন্ত দ্বগ্ধ করে মারা হেয়েছে জিওর্দানো ব্রুনোকে। নতজানু হয়ে গ্যালিলিও নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়ে বললেন- “যা বলেছি, তাঁর জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। সূর্য জগতের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পূব থেকে পশ্চিমে সে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে না, এই কথা বলে আমি পাপ করেছি। আমি ভুল বলেছিলাম যে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, সে জগতের মধবিন্দুতে নেই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সর্বৈব সত্য। আমি বাইবেল ও পবিত্র ক্যাথলিক গির্জার ধারণার বাইরে গিয়ে যা যা বলেছি, তার জন্য আমি নিজেকেই নিজে ঘৃণা করছি। ভবিষ্যতে এই ধরণের কাজ থেকে আমি নিবৃত্ত থাকব এবং যদি কাউকে এমন অপরাধ করতে দেখি, গির্জার কর্তৃপক্ষকে তৎক্ষণাৎ তা জানিয়ে দেব।”
ক্লান্ত, অপমানিত গ্যালিলিও হলফনামায় নিজের সই করলেন। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন গির্জার প্রভুরা। গ্যালিলিওকে গৃহবন্দী করার আদেশ দেওয়া হল। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ছাপিয়ে বিলি করা হল ইতালিতে। গ্যালিলিওকে শাস্তি দিতে গোঁড়া ধর্মপ্রচারকরাও সেদিন ভয় পেয়েছিলেন। গ্যালিলিওকে কোনও কঠিন শাস্তি দিলে জনমত গির্জার বিরুদ্ধে যেতে পারত, কারণ ব্রুনোকে হত্যার দেড় দশকের মধ্যে ক্যাথলিক গির্জার শাসনের পরিধি গিয়েছিল ছোট হয়ে, প্রতিপত্তিও ছিল পড়তির দিকে।
প্রকৃতির আসল সত্যের রূপ মানুষের সামনে তুলে ধরতে যে অক্লান্ত পরিশ্রম গ্যালিলিও সারাজীবন করে এসেছেন, মুহূর্তে তা ধূলিসাৎ করে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। গির্জার প্রহরীরা তাঁকে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল। প্রশাশকদের নির্দেশ মতো তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল নিভৃতবাসে। গ্যালিলিওর বিচার বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করলেও, তার দাগ রয়ে গেল সুস্পষ্ট। বিজ্ঞানকে দর্শন থেকে যুক্তির হাতে তুলে দিলেন তিনি। এই বিচারের প্রহসনের কয়েক বছর আগে ইতালির ভেনিস শহরে গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণ এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল।
১৬১০ সালের মার্চ মাসে ভেনিস থেকে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ – The Starry Messenger, ইউরোপে তোলপাড় তুলে দিল। প্রবান্ধকার দাবি করলেন, আকাশের এই বিচিত্র রূপ আগে কেউ কোনোদিন তুলে ধরেনি। কী সেই রূপ? চাঁদের বুক মসৃণ নয়, এবড়োখেবড়ো। চাঁদে পাহাড় আছে, আছে গর্তে খোদাই উপত্যকা। খালি চোখে যত তারা দেখা যায় আকাশে, তার চাইতে অনেক অনেক বেশি তারারা ভিড় করে আছে সেখানে। Orion Constellation, অর্থাৎ কালপুরুষে নাকি প্রায় আশিটি নক্ষত্র দেখতে পাওয়া গিয়েছে। শুধু কী তাই? বৃহস্পতি একা নয়, তার চারদিকে পাক খাচ্ছে চার চারটে চাঁদ।
প্রবন্ধকার ছিলেন ইতালির প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ প্রফেসর গ্যালিলিও গ্যালিলেই। খালি চোখে ব্রহ্মাণ্ডের সব রূপ ধরা পড়ে না। জানা গেল, গ্যালিলিও নাকি একটা লম্বা নল আবিষ্কার করেছেন, যাতে চোখ রাখলেই আকাশের গায়ে বিচিত্র সব গ্রহ তারাদের দেখা যাবে। যন্ত্রটা কেমন ধরণের? গ্যালিলিও তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন সেই কথা। নলের দুই মুখে দুটো আতশ কাচ লাগিয়েছেন তিনি। একটা উত্তল (convex) ও অন্যাটি অবতল (concave)। চোখের সামনে রাখতে হবে অবতল কাচ, আর উত্তল কাচ তাক করে থাকবে আকাশের দিকে।

(দূরবীন দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ করাচ্ছেন গ্যালিলিও)
গ্যালিলিওর আবিষ্কারের গল্প শুনে উৎসাহিত হলেন একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী। আর এক দল তীব্র প্রতিবাদ জানাতে লাগল। প্রথম দলটি ছিল উদারনীতিক দার্শনিকদের; দ্বিতীয় দলটি ছিল ধর্মপ্রচারক, চার্চ সমর্থক। এই দ্বিতীয় দলের আদিগুরু ছিলেন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল। বিজ্ঞানের সব কথা এরিস্টটলের কথাতেই শুরু এবং তাঁর কথাতেই শেষ হত তখনও। এরিস্টটল বলেছিলেন চাঁদ একটি গোলাকার মসৃণ বলের আকৃতির মহাজাগতিক বস্তু এবং পৃথিবীর চারদিকে পাক খাওয়া একটি গ্রহ। চাঁদের উপরে অবস্থান করছে স্বর্গ, যেখানে ঈশ্বরের বাস। পাপিদের সেখানে প্রবেশের অধিকার নেই। সূর্য এবং চাঁদ সহ অন্যান্য গ্রহেরা পৃথিবীর চারদিকে গোল হয়ে ঘুরে চলেছে।
সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রবিন্দু যে সূর্য সেই দাবি জানিয়েছিলেন কোপার্নিকাস। কিন্তু গির্জার মত এই ধারণার পরিপন্থী ছিল। হাজার হাজার বছর ধরে একই মতবাদ প্রচার করে আসছিল খ্রিস্টধর্ম। গ্রিক ও রোমান দর্শনে মানুষকে বিশ্বাস করানো হত যে তারারা একই জায়গায় স্থির। ব্রহ্মাণ্ড বলতে কল্পনা করা হত শুধু সৌরমণ্ডল। এর বাইরে কিছুর অস্তিত্ব ছিল ধারণার বাইরে। গির্জা প্রচার করত, পৃথিবীতে মানুষ ও জীবজগত সৃষ্টি হয়েছে ঈশ্বরের ইচ্ছায় এবং তিনি আর কোনও বিকল্প দুনিয়ার কথা বলতেই পারেন না। মহাজাগতিক বিষয়বস্তুর ধারণায় বাইবেলের ব্যাখ্যা দিয়ে এক ভুয়ো দর্শন প্রচলিত ছিল গ্যালিলিওর সময়ে।

(পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে গ্যালিলিওর আঁকা চাঁদ)
গ্যালিলিও যে যন্ত্র দিয়ে আকাশ দেখেছিলেন, সেটি আধুনিক জগতে টেলিস্কোপ বা দূরবীন নামে প্রচলিত। অতি প্রাচীনকাল থেকেই দূরের জিনিস কাছে দেখার জন্য টেলিস্কোপ শব্দটি চালু ছিল বাজারে। ল্যাটিন ভাষায় ‘টেলি’ শব্দের অর্থ দূর। বাজারের কথাই যখন উঠল, তখন দেখা যাক গ্যালিলিওর দূরবীন তৈরির পিছনে বাজারের হাত কতখানি।
হল্যান্ডের এক চশমার কারিগর কাচ কেটে কেটে বহু মাথা খাটিয়ে একটা নলের দুই দিকে দুটো কাচ লাগিয়ে দূরের জিনিস কাছে দেখার উপায় বার করে ফেলে। সেই খবর গ্যালিলিওকে দেয় তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ভেনিসের রাস্তায় কিছু লোক আবার তেমন যন্ত্র বানিয়ে বিক্রিও করত। সেই যন্ত্র দিয়ে বড়জোর দুই বা তিনগুন বাড়িয়ে দূরের দৃশ্য দেখা যেত। কিন্তু এমন একটা যন্ত্র বানিয়ে যে আকাশ দেখা যেতে পারে, তা গ্যালিলিওর মাথাতেই আসে। কারণ তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের প্রথম পথ প্রদর্শক, যিনি পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ, এবং গণিতের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে আসতে চাইতেন। এই কারণেই তাকে জগতের প্রথম পদার্থবিজ্ঞানীও বলা হয়ে থাকে। যাই হোক, গ্যালিলিও কাচ ঘষে ঘষে নানা ধরণের প্রায় শ’খানেক দূরবীন বানিয়ে ফেলেন। যে দূরবীন দিয়ে ভেনিসের সবচাইতে উঁচু মিনারে উঠে তিনি আকাশ দেখেছিলেন, তার ছবি বর্ধিত করার ক্ষমতা ছিল প্রায় ২০ গুণ।
গ্যালিলিওর প্রবন্ধ ছাপা হতে তাবড় তাবড় গণ্যমান্য অভিজাত লোকেরা মিনারে উঠে দূরবীনে চোখ রেখে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেলেন। কেউ কেউ আবার সব দেখেশুনে বলল, “বাইবেলে এসব কথা লেখা নেই। এই দৃশ্য দেখা তো মহাপাপ! নরকের আগুনে পুড়ে ছাই হবার চাইতে বরং দূরবীন থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকাই ভালো।” অনেকে আবার এমন কথাও বলতে লাগল যে, “যত খুঁত সব আছে ওই যন্ত্রটাতে। বাইবেল বিরুদ্ধ মতবাদ চাপিয়ে দেবার জন্যই এসব গ্যালিলিওর চাল ছাড়া কিছুই নয়।”
গ্যালিলিও শুধু আকাশ দেখার জন্য দূরবীন লাগিয়ে মিনারে চড়ে বসেছিলেন, তা কিন্তু নয়! দীর্ঘ অনুধাবনের পর তিনি বিশ্বাস করতেন যে পৃথিবী এবং অন্য গ্রহেরা সূর্যের চারধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চাঁদ পৃথিবীর উপগ্রহ সেটাও তিনি জানতেন। কোপার্নিকাস অনেক আগেই টাইকো ব্রাহের মতো জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণের তথ্য ঘেঁটে ব্রহ্মাণ্ডের যে ধারণা করেছিলেন, তার সাথে নিজের পর্যবেক্ষণ মিলে যেতে দেখে যথেষ্ট উল্লসিত হয়েছিলেন গ্যালিলিও।
সৌরমণ্ডলের নতুন ধারণার জন্মদাতা নিকোলাস কোপার্নিকাসের লেখা বই পড়ে গ্যালিলিও তাঁর ভাবশিষ্য হয়ে ওঠেন। গোঁড়া মতাবলম্বী ক্যাথলিক চার্চ কোপার্নিকাসকে জীবিতকালে এবং মৃত্যুর পরও তাঁর লেখা বই ইউরোপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ইউরোপের নবজাগরণের সময় থেকে ক্যাথলিকদের সাথে প্রোটেস্ট্যান্টদের ঝগড়া তুঙ্গে ওঠে। গ্যালিলিওর সময় মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে প্রোটেস্ট্যান্টদের হাত অনেক শক্ত হওয়ায় ক্যথলিকদের দুনিয়া অবশ্য বেশ ছোট হয়ে যায়। কিন্তু ইতালিতে ক্যাথলিক শাসকেরা তখনো যথেষ্ট সক্রিয়। বাইবেলের বিরুদ্ধে কথা বলা আইনত দণ্ডনীয়। সেই দণ্ড মারাত্মক শারীরিক অত্যাচার থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারত।
গ্যালিলিওর দূরবীন ইউরোপে সাড়া ফেলে দেবার মাত্র এক দশক আগেই রোম শহরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে দার্শনিক জিওর্দানো ব্রুনোকে। কি ছিল তাঁর অপরাধ? ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে বাইবেলে বলা কথার বিরুদ্ধতা করেছিলেন তিনি। ব্রুনো বিজ্ঞান অনুসন্ধানী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর ধারণার ভিত্তি ছিল যুক্তি। শোনা কথা বা ধর্মগ্রন্থে বর্ণীত কাহিনীতে বিশ্বাস করার পাত্র ব্রুণো ছিলে না। তিনি কোপার্নিকাসের মহাকাশ দর্শনে বিশ্বাস করতেন। খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ৫০০ বছর আগে জন্ম হয় পাইথাগোরাসের। খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের বিরোধ হয় পাইথাগরাসের দর্শনের সাথে। পাইথাগরাস গণিতের মাধ্যমে দার্শনিক চিন্তাভাবনার পথ দেখান। তাঁর ধারণাতেও ছিল পৃথিবী গোলাকার এবং সে নিজের অক্ষের সাপেক্ষে পাক খায়; স্থির নয়। কিন্তু বাইবেল অনুযায়ী পৃথিবী হচ্ছে একটি স্থির সমতল ক্ষেত্র, যাকে কেন্দ্র করে জগতের সব বস্তু, যাদের খালি চোখে দেখা যায়, যেমন সূর্য, চাঁদ এবং গ্রহেরা পাক খেয়ে বেড়াচ্ছে বৃত্তাকারে। তাই খ্রিস্টানরা মনে করত, পাইথাগোরাস ঈশ্বর বিরোধী ছিলেন। পাইথাগোরাস যে গণিতজ্ঞ ছিলেন, এমন স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না, কিন্তু বাইবেল মেনে চলা টলেমি বা এরিস্টটলের মতো দার্শনিকও পাইথাগরাসের নাম নিজেদের বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করে যান। মোট কথা, ইউরোপের অনেক দেশেই বাইবেল বিশ্বাসীরা পাইথাগরাসের মতো দার্শনিককে ঘৃণার চোখে দেখত।
কী ছিল ব্রুনোর দর্শনে যা রোমান ক্যাথলিকদের এতটাই চিন্তিত করেছিল যে তারা ব্রুনোকে আট বছর কারাগারে রেখে নানা অত্যাচার করে অবশেষে প্রকাশ্যে জীবন্ত দগ্ধ করে? ব্রুনো বলতেন— পৃথিবীর আত্মা আছে। আত্মা থাকলে সে নড়াচড়াও করতে পারে। তাই পৃথিবী স্থির নয়। ব্রহ্মাণ্ড একটা নয়, বহু ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ত্ব আছে। মনে হয় মধ্যযুগে বসে ব্রুনো যেন আধুনিক যুগের বিজ্ঞানী রিচার্ড ফেইনম্যানের ‘প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের’ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন!
ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে ব্রুনোর ধারণা পৃথিবীতে প্রথম অবশ্যই নয়। তাঁর আগেও অনেক দার্শনিক বাইবেল প্রচলিত বিশ্ব ধারণার বাইরের জমিতে খেলতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন রোমান ক্যাথলিকদের হাতে। নাস্তিক অপবাদ দিয়ে অনেককেই জেলে ভরা হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
ব্রুনো বিজ্ঞানী ছিলেন না। কিন্তু গভীর ছিল তাঁর অধ্যায়ন। তিনি বহু বই লিখে যান। ব্রুনোর মত দাবানলের মত ইউরোপে ছড়িয়ে পড়লে ধর্মীয় প্রভুরা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। ব্রুনোকে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরা হয়। চলতে থাকে জিজ্ঞাসাবাদ। ব্রুনো বলেন, তিনি ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দেবার জন্য কোনও বই লেখেননি, শুধু ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে তাঁর দর্শন জানিয়েছেন মাত্র। ব্রুনোর বিরুদ্ধে সাক্ষী জোগাড় করে বিচার বসায় ধর্মযাজকেরা। বিচারে ব্রুনোর সমস্ত বই জ্বালিয়ে দেবার আদেশ দেওয়া হয়। তাঁর সমস্ত বই নিষিদ্ধ করা হয়। ব্রুনোর নাম নেওয়া পর্যন্ত নাস্তিকতা বলে দাগিয়ে দেওয়া হতে থাকে। আট বছর জেলের কাল কুঠুরিতে বাস করে শেষ বিচারের দিন ব্রুনোকে তাঁর সব ধারণা অস্বীকার করতে আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ব্রুনো তাঁর দর্শনকে নাকোচ করতে রাজী হন না। বলেন, “হয়ত শাস্তি পেতে আমি যতটা না ভয় পেয়েছি, বিচারকেরা তার চাইতেও বেশি ভয় পেয়েছেন আমাকে শাস্তি দিতে।”
আসলে ব্রুনোর ব্রহ্মাণ্ড দর্শন ধর্মীয় প্রভুদের পেতে রাখা ঈশ্বরের আসন টলিয়ে দিতে বসেছিল। ব্রুনোর জনপ্রিয়তা তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। যখন ব্রুনোকে তাঁর মতবাদ ফিরিয়ে নিতে বলা হয়, তিনি নিজের বিশ্বাসে অটল থেকে ধর্ম প্রভুদের চোখ রাঙ্গানোতে ভয় না পেয়ে বলেন, “যা বলেছি, ঠিক বুঝেই বলেছি। যে শাস্তি হবে, মাথা পেতে স্বীকার করে নেব।”
রোম শহরের চৌরাস্তায় একটি খাম্বায় বেধে ব্রুনোকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় হাজার হাজার লোকের চোখের সামনে। রোমান ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধমত পোষণ করলে শাস্তি কী হতে পারে জানিয়ে দেওয়া হয় নাগরিকদের। টিবার নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় তার পোড়া দেহের ছাই।

(ব্রুনোকে জীবন্ত অবস্থায় দগ্ধ করা হচ্ছে)
আজ পর্যন্ত গবেষকেরা যত নথি খুঁজে পেয়েছেন, তাতে জানা যায় ব্রুনোর ব্রহ্মাণ্ডের ধারণা সময়ের চাইতে অনেক আগে এগিয়ে ছিল, যার ধারণা কোপার্নিকাস, কেপলার বা গ্যালিলিওর কারো সম্পূর্ণ ভাবে ছিল না। যেমন ব্রুনো বলেছিলেন— ব্রহ্মাণ্ড অসীম, তাকে কোনও সীমারেখায় বাঁধা যায় না। ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে সূর্য আদৌ নেই, কারণ কেন্দ্রবিন্দু বলে অসীমে কিছুই থাকতে পারে না। তিনি বলেন, তারারাও আকাশে ঘুরে বেড়ায়, সূর্য এবং সব গ্রহরাই স্থির থাকতে পারে না। এই জগতে সবই চলনশীল। কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিও কিন্তু তারাদের স্থির ধরে নিয়েছিলেন। অবশ্য জীবনের শেষদিকে এসে গ্যালিলিও বুঝতে পারেন যে, তারারাও কক্ষপথে আবর্তিত হয়।
খ্রিস্ট জন্মের ৩০০ বছর আগে গ্রিসে জন্ম নিয়েছিলেন গণিতজ্ঞ ইউক্লিড। আর্চিমিদিসেরও আগে। তার গণিত ইউরোপে প্রসিদ্ধ হয়। ছেলেবেলায় গ্যালিলিওর বাবা তাকে চিকিৎসক বানাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু ছেলের মনে সুপ্ত বাসনা ছিল অঙ্ক শেখার। শেখার নাকি শেখানোর জন্য? কারণ খুব ছেলেবেলায় ইউক্লিডের জ্যামিতির সব কায়দাকানুন এবং গ্রিক গণিতের পাঠ আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন গ্যালিলিও।
গ্যালিলিও গ্যালিলেই -এর ঠাকুরদা ছিলেন ফ্লোরেন্স শহরের মস্ত এক ডাক্তার। তাদের বংশ ছিল অভিজাত শ্রেণীভুক্ত। তার নামও ছিল গ্যালিলিও গ্যালিলেই। গ্যালিলিওর বাবার অবস্থা ছিল একটু পড়তির দিকে। তিনি খুব ভালো লুট বাজাতে পারতেন। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপের জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র ছিল লুট, যা অনেকটা বেহালা বা গিটারের পূর্বপুরুষ বলা যেতে পারে। নিজের বাবার নামে ছেলের নাম রেখে ভিন্সেজিও গ্যালিলিও -২ কে একদিকে ডাক্তার, আর একদিকে লুট বাজানোর জন্য প্রশিক্ষিত করে তুলে নিজের বংশের বনেদিয়ানা আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। গ্যালিলিও যদিও লুট বাজানোর ওস্তাদ হয়ে ওঠেন, কিন্তু ডাক্তার হতে না চেয়ে বেঁকে বসেন। শুরু হল বাবা ও ছেলের বিবাদ। তখন ডাক্তারি শিক্ষার সাথে সাথে অঙ্ক, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা সব পড়তে হত। ভৌত বিজ্ঞান বলে কোনও বিষয় ছিল না আলাদা করে। দর্শনের মধ্যেই সব মিলেমিশে ছিল। পৃথিবীর সব রহস্যের সমাধানের রাস্তা ছিল দার্শনিক চিন্তাধারার মধ্যে দিয়ে বিশ্লেষণ করা, বিজ্ঞানের জায়গা প্রায় ছিল না বললেই চলে। ডাক্তারি এবং এ্যালকেমি ছিল বিজ্ঞান চর্চার যাবতীয় উদ্যোগ। ভবিষ্যৎ গণনার জন্য গ্রহ তারাদের গতিবিধির দিকে চোখ রাখা হত। অবশ্যই সেই অবস্থান থেকেই পাইথাগোরাসের মত পণ্ডিত জন্ম নেন, যিনি সংখ্যাকে ব্রহ্মাণ্ডের চাবিকাঠির মূল বলে জানিয়েছিলেন। টাইকো ব্রাহে, কোপার্নিকাস, কেপলারের মত মানুষেরাও ভিন্ন পথে অঙ্ক দিয়ে মহাজাগতিক কাণ্ডকারখানা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। গ্যালিলিও গণিতের রাস্তায় হেঁটে সমাধান করেন পদার্থবিজ্ঞানের বহু সমস্যা। অনেকটা বেশি বয়সে পৌঁছে গ্যালিলিও মহাকাশ নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে থাকেন।
পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও পড়া ছেড়ে দিলেন গ্যালিলিও। তাই বলে তিনি নিজের পড়াশুনোয় জলাঞ্জলি দিলেন না। অঙ্ক চর্চার পাশে চলল অন্যান্য পড়াশুনো। আর্চিমিডিসের ‘ইউরেকা’ বলে স্নানের চৌবাচ্চা থেকে লাফ দেবার গল্প শুনে বস্তুর আপেক্ষিক ওজন বা ঘনত্ব নির্ণয় করার জন্য গভীর অধ্যয়ন করে বানিয়ে ফেললেন একটি বিশেষ যন্ত্র, যাকে আজকের দিনে বলা হয় “হাইড্রোস্ট্যাটিক্স ব্যালেন্স”।
পকেট খরচ চালাবার জন্য পিসা শহরে অঙ্কের প্রাইভেট টিউশন নিতেন গ্যালিলিও, কিন্তু প্রতিভাশালী বিজ্ঞানীর তাতে মন ভরবে কেন? তিনি জ্যামিতি এবং যে কোনও কঠিন বস্তুর ভরকেন্দ্র বার করার গাণিতিক উপায় নিয়ে লিখে ফেললেন একটা দারুণ গবেষণাপত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের তাবড় তাবড় গণিতের অধ্যাপকদের তাক লেগে গেল তরুণ গ্যালিলিওর কাজ দেখে। উচ্চ প্রশংসিত হল গ্যালিলিওর কাজ। ডিগ্রির দরকার হল না কাজ জুটাতে।
ভেনিস থেকে মাত্র ২৫ মাইল দূরে ইতালির দুই শহর পাদুয়া এবং পিসা অ্যাড্রিয়াটিক সমুদ্রের ধারে অবস্থিত ছিল। দুটি শহরের মধ্যে পাদুয়া ছিল পড়াশুনোর মক্কা। পিসা একটু পিছিয়ে ছিল। গ্যালিলিও পিসা থেকে পাদুয়া আসেন অধ্যাপনার কাজে যোগ দিতে। মাত্র ২৮ বছর বয়সে গ্যালিলিও পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কের অধ্যাপক হয়ে যোগ দেন। জীবনের পরবর্তী ১৮ বছর গ্যালিলিও এই উচ্চমার্গের উদারনৈতিক পরিবেশে নানা বৈজ্ঞানিক কাজ করেন।
পাদুয়ার বুদ্ধিজীবীরা এই সময়ে ভেনিসকে পোপের শাসন থেকে মুক্ত করাতে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। দর্শন যাতে বাইবেলের দাসে পরিণত না হয়, সেই বিষয়ে গ্যালিলিওর বন্ধুরা অনেক লেখালেখি করতে থাকেন। কিন্তু তারা এরিস্টটলের দর্শনকে প্রাধান্য দিলেও গ্যলিলিও ছিলেন বিপরীত চিন্তার মানুষ। এই ব্যাপারে সবচাইতে সরব ছিলেন দার্শনিক সিজার ক্রেমোনিনি। তার সাথে গ্যালিলিওর অনেক মতবিরোধ থাকলেও মুক্তচিন্তা ও আলোচনায় বাধা পড়ত না। ক্রেমোনিনির বিরুদ্ধে গির্জার প্রশাসন তদন্ত করতে থাকে। গ্যালিলিও তখনো অতটা সরাসরি বাইবেল বিরোধী মন্তব্য করেননি।
পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রুগীদের রাশিফল বার করার কায়দা শিখতে হত ডাক্তারদের । গ্যালিলিও অঙ্কের ক্লাস নেবার ফাঁকে ডাক্তারদের রাশিফলের খুঁটিনাটি পড়াতেন। রাশিফল বার করতে গেলে আকাশের গ্রহ তারাদের গতিবিধি জানতে হয়। গ্যালিলিও কতখানি রাশিফলে বিশ্বাস করতেন, তা জানা যায় না, তবে তাঁকে বাধ্য হয়েই এই কাজ করতে হত। সেই সময়ে ডাক্তারদের বলা হত, যদি রাশিফল বলে রুগীর মৃত্যু আসন্ন, তবে বেশি চিকিৎসা করে লাভ নেই। আর যদি রাশি গণনা বলে রুগি বেঁচে উঠবে, তবে তার চিকিৎসা করো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফলাফল হত উল্টো। যাই হোক, গ্যালিলিওর মতো ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে কোপার্নিকাসের ধারণা যিনি বুকে রেখেছিলেন, তিনি অনেকটাই আধুনিক ছিলেন অবশ্যই, যা তার কাজের মধ্যে ফুটে উঠতে শুরু করল।
পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্যালিলিও যৎসামান্য মাইনেতে কাজ করতেন। বছর ঘুরলে মাসমাইনে খুব বেশি বাড়ত না। কাজেই গ্যালিলিও প্রাইভেট টিউশন নেওয়া শুরু করেন। ছাত্ররা অঙ্ক ছাড়াও তার কাছে জমির মাপজোক করা শিখে নিত। উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলেদের তিনি কীভাবে তাদের প্রাসাদগুলো সুরক্ষিত রাখা যায়, তার প্রশিক্ষণও দিতেন। এই সময়ে তার হাতে আবিষ্কৃত হয় কোণ মাপবার জন্য মিলিটারি কম্পাস। কম্পাস নামের যন্ত্রটা কিন্তু দিক নির্ণয়ের কাজে ব্যবহৃত হত না। সামরিক বাহিনীর কামানের কোণ মাপার জন্য এমন যন্ত্র আগেই ছিল, গ্যালিলিও সেটার সংস্কার করেন। এই যন্ত্র দিয়ে বহুভুজ আঁকা, ক্ষেত্রফল বার করা, কোনও সুসম আকৃতির বস্তুর আয়তন বার করা, কোনও সংখ্যার বর্গমূল বার করা, ইত্যাদি নানা গাণিতিক কাজকম্ম সহজে করা যেত।
অর্থকষ্ট থেকে মুক্তি পেতে গ্যালিলিও এই যন্ত্র বানিয়ে বাজারে বেচে বড়লোক হবার চেষ্টা করেন। একজন মজদুরকে মাইনে দিয়ে রেখেও লাভের মুখ দেখতে পাননি। তিনবছরে মাসে গড়ে একটা করে সেই যন্ত্র বানানো হয়েছিল, বাজারে তার চাহিদাও ছিল না। অগত্যা গ্যালিলিও বাড়িতে ছাত্র পড়িয়ে রোজগার করার কাজে ব্যস্ত থাকেন। বিভিন্ন যন্ত্র, যেমন লিভার, চেন-পুলি, স্ক্রু, ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের উপর সহজবোধ্য একটা ছোট বই লিখে গ্যালিলিও ইতালিতে বেশ খ্যাতি পান।
পতনশীল বস্তুর গতির বিষয়ে লেখা এরিস্টটলের একটি বই পড়ে গ্যালিলিওর আগ্রহ সেই দিকে ঘুরে যায়। তিনি এরিস্টটলের দর্শনকে খণ্ডন করতে বদ্ধপরিকর হয়ে গতিবিদ্যা নিয়ে শুরু করলেন অনুসন্ধান। এরিস্টটল বলেছিলেন, যে বস্তু যত ভারি, সেই বস্তু তত দ্রুত গতিতে শূন্যে পড়তে থাকে। অর্থাৎ সমান মাপের একটা লোহার বল আর একটা শোলার বল উঁচু জায়গা থেকে ফেলে দিলে লোহার বল আগে মাটি ছোঁবে। প্রথম প্রথম গ্যালিলিওর মনে হয়েছিল, বাতাসের ঊর্ধমুখী চাপ কম ওজনের বস্তুর উপর বেশি, কিন্তু কিছুদিন পর নানা পরীক্ষা করে তিনি ভুল বুঝতে পারেন। বাতাসশূন্য পরিস্থিতিতে যে দুটো বলই একসাথে মাটি ছোঁবে, তা তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে বাতাসশূন্য অবস্থা? তাই কেউ গ্যলিলিওর প্রমাণকে মানতে চাইল না। তিনি পিসার বিখ্যাত হেলানো গির্জার উপর থেকে দুটি একই আকারের ভিন্ন বস্তু ফেলে দিলেন নিচে। প্রায় একই সাথে তারা মাটি ছুঁল। কিন্তু বাতাস থাকায় হাল্কা বস্তুটি পড়ল একটু পরে। এরিস্টটলের সমর্থকেরা গ্যালিলিওর নিন্দায় সরব হলেন।
এরপর গ্যালিলিও গতির সমীকরণ আবিষ্কার করেন, যা আজকের দিনে প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে মাধ্যমিক স্তরে পড়তে হয়। কামান থেকে ছোঁড়া গোলা অধিবৃত্তাকার (parabolic) পথে চলে, তিনি প্রমাণ করে দেখান। মাটির সাথে কামানের কোণের উপর যে নির্ভর করে গোলা কতদূর যাবে, তা তিনি অঙ্ক কষে দেখিয়ে দেন।
সমাজের উচ্চশ্রেণীর অভিজাত মানুষরা গ্যালিলিওর সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও এরিস্টটলের ভাবশিষ্যরা গ্যালিলিওর শত্রু হয়ে যায়। বিপদ আঁচ করে তিনি অন্যত্র চাকরী খোঁজার তোড়জোড় শুরু করেন। ছদ্মনামে বই লেখেন এবং সেই বই উৎসর্গ করেন ফ্লোরেন্সের যুবরাজকে। যুবরাজকে তিনি কিশোর বেলায় অঙ্কের তালিম দিয়েছিলেন। রাজদরবারের অনুগ্রহ পাবার বাসনায় ফ্লোরেন্সে ফিরে যাবার চেষ্টা করতে থাকেন গ্যালিলিও।
হঠাৎ গ্যালিলিওর ভাগ্য খুলে যায়। একদিকে তিনি পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান গণিতজ্ঞ পদে চাকরি পান, আর একদিকে তিনি তাস্কেনির ডিউকের দরবারে দার্শনিক নিযুক্ত হন। কিন্তু মাসমাইনে একই থেকে যায়।
গ্যালিলিও ফ্লোরেন্সে ফিরে যান সেই বছরেই। শরীরও হটাত ভেঙে পড়ে তাঁর। বাতের ব্যাথা তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে যায়। ফ্লোরেন্স শহরে এক অভিজাত দার্শনিক বন্ধুর কাছে আশ্রয় পান তিনি। নিরাপদ নিশ্চিন্ত জীবন পেয়ে, সব শারীরিক ও সাংসারিক বাধা কাটিয়ে গ্যালিলিও আবার বিজ্ঞান চর্চা শুরু করেন।
প্রাগ শহরে বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ জোহানেস কেপলার সেই সময়ে একটা দূরবীন জোগাড় করে আকাশে নজর রাখেন। এর আগেই তিনি বেশ কিছুদিন টাইকো ব্রাহের সান্নিধ্যে এসে ব্রাহের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে অনেক অঙ্ক কষে গ্রহদের গতিপথ নিয়ে অনেক আবিষ্কার করে ফেলেছেন। দূরবীন দিয়ে তিনি গ্যালিলিওর বর্ণীত বৃহস্পতির চারটে চাঁদ দেখতে পান এবং এই বিষয়ে একটি ছোট্ট বই লিখে গ্যালিলিওর মতকে সমর্থন করেন জোরাল ভাবে। চাঁদের বুক যে মসৃণ নয়, সেকথাও তিনি জানান। কেপলার প্রায় একই সময়ে মঙ্গল গ্রহের উপবৃত্তাকার গতিপাথের আবিষ্কারের কথা জানান তাঁর বই- The New Astronomy তে। সেখানে সূর্যকে রাখেন ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে, যার চারধারে মঙ্গল গ্রহ পাক খাচ্ছে, এমন দৃশ্য তুলে ধরেন। কাজেই নিজের কাজের মাধ্যমে সরাসরি এরিস্টটলকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন কেপলার।
ইতিমধ্যে গ্যালিলিও ফ্লোরেন্স শহরে বসে শনিগ্রহের বলয় দেখতে পান এবং শুক্রগ্রহের উপর বহু তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেন। শুক্রের আকার কমা বাড়া দেখে গ্যালিলিও সিদ্ধান্ত করেন, সূর্যের চারদিকে ঘুরে চলেছে বলেই কখনো এই গ্রহ পৃথিবী থেকে দূরে বা কখনো কাছে আসার কারণেই তার ব্যাস ছোট বড় হয়ে চলেছে। বৃহস্পতির চারটি চাঁদ গ্রহটিকে পাক খেতে কত সময় নেয়, নিখুঁত ভাবে অঙ্ক কষে বার করে ফেলেন তিনি। আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও গ্যালিলিওর মাপজোক একেবারে মিলে গিয়েছে। শুধু পর্যায় নয়, চাঁদগুলোর অবস্থান এবং তাদের উজ্জ্বলতার হ্রাসবৃদ্ধি পুঙ্খানুপুঙ্খ নথিবদ্ধ করেন গ্যালিলিও। বিজ্ঞানের নোটবইতে বিভিন্ন তথ্য কীভাবে লিখে রাখা উচিত গ্যালিলিওর এই শিক্ষাকে পূর্ণ মর্যাদায় গুরুত্ব দিয়েছেন পরবর্তীকালের বিজ্ঞানীরা।
আবিষ্কারের আনন্দে, এরিস্টটলের দর্শনের তীব্র বিরোধিতা করে গ্যালিলিও আরও বেশি করে কোপার্নিকাসের সমর্থক হয়ে পড়লেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, স্বার্থান্বেষী ধর্ম প্রচারকেরা বাইবেল বিকৃত করছে এবং খৃষ্টান ধর্মের মানুষদের কাছে জাগতিক সত্য তুলে ধরা তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। গ্যালিলিও তখন প্রৌঢ়। তিনি রোমে গিয়ে পোপের দরবারে মহাকাশ অনুসন্ধান জানিয়ে দেওয়া স্থির করে দূরবীন হাতে পাড়ি দিলেন রোম শহরে।
এখানে এসে প্রথম যে বিরূপ সমালোচনার মধ্যে তিনি পড়ে গেলেন তা হল — পৃথিবী চলনশীল প্রমাণ করে দেখানো। এরিস্টটল পন্থীরা বলতে লাগল — কই, পৃথিবীর উপরে দাঁড়িয়ে তো বোঝাই যাচ্ছে না পৃথিবী ঘূর্ণমান! প্রমাণ ছাড়া সত্য টিকবে না। তারা আরও বলতে লাগল— ধরো জাহাজের মাস্তুল থেকে একটা হাতুড়ি নিচে পড়ে গেল। যদি পৃথিবী ঘুরতে থাকে, তবে মাস্তুলের ঠিক নিচে এসে হাতুড়িটা পড়ছে কী করে? গ্যালিলিও বললেন— হাতুড়িটা যখন পড়ল, তখন সামনের দিকে পৃথিবীর যা বেগ, হাতুড়িটারও তাই। অর্থাৎ পৃথিবীর সাথে সাথে হাতুড়িও এগিয়েছে। যে কোনও বস্তুকে উপর থেকে ছুঁড়ে দিলে তার দুটি বেগ থাকে, একটি সামনের দিকে, আর একটি নিচের দিকে।
সমালোচকেরা গ্যালিলিওকে হয় পাগল, নয় নাস্তিক বলে দাগিয়ে দিল। আসলে তিনি বস্তুর জড়তা বুঝতে পারলেও তা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে নিন্দুকে যাই বলুক, রোমে খুব জনপ্রিয়তা পেল গ্যালিলিওর দূরবীন এবং আকাশ দর্শন। বেশ কিছু অভিজাত শ্রেণীর মানুষ গ্যালিলিওকে সমর্থন করায় পোপ পল – ৫ গ্যালিলিওকে ডেকে পাঠালেন তাঁর সাথে দার্শনিক আলোচনা করার জন্য। গ্যালিলিওর সম্মানে এক নৈশভোজের আয়োজন করা হলে তিনি সেখানে যোগ দিয়ে, খুশিতে ডগমগ হয়ে ফিরে গেলেন ফ্লোরেন্স।
ফ্লোরেন্স শহরে এসে এক দার্শনিকের সাথে গ্যালিলিওর বেধে গেল ঝগড়া। প্রাক্তন ছাত্র কোসিমো, যে যুবরাজের নামে গ্যালিলিও তাঁর লেখা বই উৎসর্গ করেছিলেন, সে তখন ফ্লোরেন্স শহরের ডিউক। কোসিমো তাঁর বিখ্যাত মাস্টারমশাইয়ের শহরে আগমনের খবর শুনে এক আলোচনা ও ভোজসভার আয়োজন করে ডেকে পাঠালেন শহরের গণ্যমান্য এবং উচ্চবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের। আলোচনা সভায় পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দর্শনের অধ্যাপকের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন গ্যালিলিও। ব্রহ্মাণ্ডের নবলব্ধ জ্ঞান দান করার পর যেই তিনি আর্চিমিডিসের সূত্রের সত্যতার ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলেন, দার্শনিক অধ্যাপক প্রাণপণে এরিস্টটলের দর্শন যে নির্ভুল, তার প্রমাণ দিতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠলেন। বিষয়টি একটু জটিল।
দার্শনিক অধ্যাপকের মতে, যে কোনও বস্তু জলে ভাসবে কি না, তা নির্ভর করে বস্তুর আকৃতির উপর। গ্যালিলিও বললেন, বস্তুর জলে ডোবা নির্ভর করে সে কতটা জল অপসারিত করেছে তার উপর। প্রমাণ দিতে গ্যালিলিও হাতে কলমে পরীক্ষা করে বোঝাতে চাইলেন, কিন্তু ঠিকঠাক বোঝাতে না পেরে চটে লাল হলেন। দার্শনিক অধ্যাপকের সাথে মারামারির উপক্রম হওয়ায় ডিউক কোসিমো স্বয়ং দুজনকে থামাতে চেষ্টা করলেন। সেই ভোজসভায় উপস্থিত অতিথিরা এই বিতর্কে দুই দলে ভাগ হয়ে গেলেন। পাল্লা ভারি ছিল দার্শনিক অধ্যাপকের দিকে। তাদের অনেকেই গ্যালিলিওর প্রতি ডিউকের পক্ষপাত মেনে নিতে পারলেন না। ফিরে গিয়ে গ্যালিলিও নিজের বিশ্বাসের প্রমাণ দিতে আস্ত একটা বই লিখে ফেললেন ভাসন্ত এবং ডুবন্ত বস্তুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে। পাল্টা অপরপক্ষও আরেকটা বই লিখে গ্যালিলিওর দিকে নিশানা তীব্র করে দিল। মীমাংসা কিছুই হল না, যদিও গ্যালিলিওর বিশ্লেষণ ছিল একেবারেই সঠিক।
নিজের আবিষ্কৃত দূরবীন দিয়ে গ্যালিলিও সূর্যের গায়ে কলঙ্ক দেখতে পেয়েছিলেন। রোমের মানুষকে সেই সব দেখিয়েছিলেন তিনি। আবার একবার নতুন করে সূর্যের গায়ে কালো বিন্দুগুলো দেখতে শুরু করলেন মন দিয়ে। আজকের দিনে একে আমরা ‘সানস্পট’ বলে জানি। এই কালো কালো বিন্দুগুলোর চলন এবং আকারের পরিবর্তন খুঁটিয়ে দেখে সব লিখে রাখতে লাগলেন গ্যালিলিও। পর্যবেক্ষণের পর তিনি সিদ্ধান্ত করলেন, সূর্যও তার নিজের অক্ষে পাক খেয়ে চলেছে, সে স্থির নয়। তিনি অঙ্ক কষে দেখলেন, সূর্যের নিজের অক্ষে এই পাক খেতে সময় লাগে প্রায় একমাস। একেবারে সঠিক ছিল তার অনুধাবন।
সূর্য যে স্থির, এই কথা এরিস্টটল বলে যান এবং গির্জাও তাতে বিশ্বাস করত, কারণ এই কথা বাইবেলে লেখা আছে। ধীরে ধীরে যে গ্যালিলিও গির্জার বিরোধী হিসাবে নিজের নাম লেখাচ্ছেন, তা বোধহয় জানতেও পারেননি বিজ্ঞানের সাধকটি। তাই আক্রমণের মুখে পড়ে তিনি বাইবেলে যে কথা লেখা আছে, তার আলোকে নিজের অনুসন্ধানের পক্ষ নিতে গেলেন। তিনি বললেন, বাইবেল ভালো করে পড়লে এবং তার মর্মোদ্ধার করলে বোঝা যাবে, সেখানেও সূর্যকে স্থির বলা হয়নি। সূর্য ডুবে যাচ্ছে দেখে যুদ্ধ যাতে না থামে তার জন্য জশুয়া ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন সূর্যকে থামিয়ে দিতে। ঈশ্বর তাই করেন। তাহলে সূর্য যে স্থির নয়, তা ঈশ্বরও জানতেন। গ্যালিলিওর কথায় চটল গির্জার কর্তারা। বিষয়টি পোপের কানে তোলা হল।
গ্যালিলিওর শত্রুরা বলল, সূর্য যে ঘোরে তা নয়, ঘোরে একটা বিরাট গোলক, যার গায়ে আটকে আছে সূর্য চন্দ্র আর সব গ্রহ নক্ষত্র, যাকে বলা হয় প্রাইম মোবাইল। ঈশ্বরের অঙ্গুলি হিলনে সেই গোলক ঘোরে। গ্যালিলিও বললেন, সাধারণে অত প্রাইম মোবাইলের মতো গম্ভীর বিষয় বুঝবে না বলেই বাইবেলে সব সরলীকরণ করা হয়েছে। বিরোধীরা আরও সরব হল গ্যালিলিওর বিপক্ষে।
কিছু লোকের সাথে গ্যালিলিও চিঠি লিখে নিজের মত জানাতে শুরু করেন। কিছু চিঠি ক্যাথলিক গির্জার যাজকদের কাছে জমা করা হয়। তারা গ্যালিলিওর উপর তদন্ত শুরু করে। কোপার্নিকাসের সব পুঁথি যেমন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, এবার গ্যালিলিওর লেখা বইগুলোও নিষিদ্ধ করা উচিত বলে মত দিল অনেকে। পোপ গ্যালিলিওকে গির্জায় ডেকে এনে ধমকে দিতে আদেশ দিলেন। যদি নিজের মত পরিত্যাগ করো তো ভালো, নইলে কঠিন ফল ভুগতে হবে— এমন শাসানি দেওয়া হল গ্যালিলিওকে। তবে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে, বা গ্যালিলিওর খ্যাতির ফলেই পোপ নরম হলেন তাঁর প্রতি। তিনি ধৈর্য ধরে গ্যালিলিওর সব ব্যাখ্যা শুনে তাঁকে আশ্বাস দিলেন গির্জা তাঁর কোনও ক্ষতি করবে না।
রোমের ক্ষমতাশালী ক্যাথলিক গির্জায় পোপ বদল হলেন। নতুন পোপ কার্ডিনাল বারবেরিনি ছিলেন গ্যালিলিওর বন্ধু স্থানীয়। তিনি গ্যালিলিওর একজন ভক্ত ছিলেন। গ্যালিলিও সেই খবর পেয়ে রোমে গিয়ে দেখা করলেন বন্ধু পোপের সাথে। পোপ তাঁকে আর একটা নতুন বই লিখতে উৎসাহ দিলেন, আর সেই বই যে তাঁর জীবনের সব চাইতে বড় বিপদ ডেকে আনবে, কে তা জানত!
পোপের প্রশংসায় উৎসাহিত হয়ে তিনটি কল্পিত চরিত্র নিয়ে গ্যালিলিও একটি নাটক ‘Dialog’ লিখে ফেললেন— সিমপ্লিসিও, সালভিয়াতি এবং সাগ্রেদো। প্রথম চরিত্র সিমপ্লিসিওর মধ্যে গ্যালিলিও এরিস্টটলকে বসিয়ে দিলেন, সালভিয়াতি হলেন কোপার্নিকাস এবং সাগ্রেদো হলেন সাধারণ জ্ঞানের অধিকারী একজন মানুষ। গ্যালিলিওর ধারণা ছিল সমুদ্রের জলে জোয়ারভাটার কারণ হল পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং সূর্যের চারদিকে আবর্তন। জোয়ারভাটা নিয়ে বিতর্ক চলল তিন কাল্পনিক চরিত্রের মধ্যে দিয়ে। পৃথিবীর স্থিরতা নিয়ে এরিস্টটলের মতবাদকে প্রবলভাবে আক্রমণ করে কোপার্নিকাসের মডেল যে আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত, চরিত্রদের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে গ্যালিলিও তা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করলেন। যদিও আজকের বিজ্ঞান জানে, জোয়ারভাটার আসল কারণ হল চাঁদ এবং সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন বা আবর্তনের প্রভাব যৎসামান্য, কিন্তু সপ্তদশ শতকে গ্যালিলিওর এই বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করার প্রয়াস ছিল অভিনব।

(গ্যালিলিওর বই ডায়লগের প্রচ্ছদ)
গ্যালিলিওর লেখা নাটক “ডায়লগ” একদিকে যেমন জনপ্রিয় হল, তেমনি চটিয়ে দিল গির্জার প্রভুদের। পোপের কাছে নালিশ জানানো হল এই মর্মে যে, গ্যালিলিও সিমপ্লিসিও চরিত্রটি আসলে পোপের আদলে গড়ে তাঁকে ব্যঙ্গ করেছেন। ফল হল, গ্যালিলিওর উপর ভয়ানক রেগে গিয়ে পোপ তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেলেন। রোমের গির্জার কাছে গ্যালিলিও তাঁর লেখা নাটকের পাণ্ডুলিপি জমা করলেন ছাপার জন্য। কর্তৃপক্ষ কিছু সংশোধন করতে নির্দেশ দিল। নিমরাজি গ্যালিলিও পাণ্ডুলিপি ফেরত নিয়ে ফিরে গেলেন ফ্লোরেন্স শহরে। এদিকে ব্যাবনিক প্লেগে আক্রান্ত হল ইউরোপ। সব শহরের সিমান্তে আগুনের উপর রেখে নথিপত্র জীবাণুমুক্ত করতে উদ্যোগ নিল প্রশাসন। গ্যালিলিও সংশোধিত পাণ্ডুলিপি রোমে পাঠানো নিরাপদ না মনে করে ফ্লোরেন্সে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন।

(ডায়লগ বইতে আঁকা সৌরমণ্ডল, যেখানে সূর্যকে রাখা আছে কেন্দ্রে)
ফ্লোরেন্সে গ্যালিলিওর লেখা “ডায়লগ” ছাপা হতে হৈ হৈ পড়ে গেল বাজারে। সমস্ত বইয়ের কপি নিঃশেষ হয়ে গেল দোকানে আসতে না আসতেই। সমস্ত ইউরোপ জুড়ে আলোচিত হতে লাগল গ্যালিলিওর লেখা সাম্প্রতিক বই এবং আরও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক কাজ। জার্মানি গ্যালিলিওর সব বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও বক্তব্যকে সমর্থন জানাতে লাগল। সেই সময়ে রাজনীতির জল ঘোলা হতে শুরু করেছে ইউরোপ জুড়ে। পোপের মনে হল, চারদিক থেকে রোমান ক্য্যাথলিকদের বিরোধীতা করা শুরু হয়েছে এবং তাতে ইন্ধন যোগাচ্ছে গ্যালিলিওর লেখা বই। পোপ একটি বিশেষ তদন্ত সমিতি গঠন করলেন “ডায়লগ” বইটি নিষিদ্ধ করা নিয়ে। সমিতি একমাস পর তাদের রিপোর্ট জমা দিয়ে বলল, গ্যালিলিওকে ডেকে পাঠিয়ে এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য।
গ্যালিলিওকে রোমের গির্জা প্রশাসন আগেও সতর্ক করেছিল বিধর্মী মন্তব্য না করার জন্য। এবার তারা বলল, আদেশ না মানা গুরুতর অপরাধ এবং পোপকে অমান্য করা আইনত দণ্ডনীয়। গ্যালিলিওকে ফ্লোরেন্স থেকে রোমে ফিরে আসবার জন্য আদেশ গেল।
১৬৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গ্যালিলিও রোম পৌঁছলেন। দুই মাস পর চার্চ প্রশাসন তাঁকে গ্রেফতার করল। প্রথমেই তাঁকে কাল কুঠুরিতে না রেখে একটি চমৎকার বিলাসবহুল ঘরে বন্দী করে জিজ্ঞাসাবাদ চলতে লাগল। দফায় দফায় ধর্মগুরুরা তাঁকে পৃথিবী যে স্থির এই ধারণার প্রমাণ দিতে বললেন এবং বাইবেলে লেখা ধর্মীয় মতামতের বিরুদ্ধাচারন করার কারণ জানতে বললেন। গ্যালিলিও তাঁর বিশ্বাসে অটল- বাইবেল ভুল নয়, বাইবেলের ব্যাখ্যা ভুল, এরিস্টটলের শিক্ষা ভুল। কোপার্নিকাসের ব্রহ্মাণ্ড অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত, আধুনিক।
রোমান গির্জার বিচারে গ্যালিলিও দ্বিতীয় দফার দোষী সাব্যস্ত হলেন। গ্যালিলিওর অপরাধ – তিনি গির্জার নির্দেশ মানেননি এবং পৃথিবী স্থির তা অস্বীকার করেছেন।
ক্যাথলিক গির্জাতেও গ্যলিলিওর প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু বুদ্ধিজীবী ছিলেন, যারা গ্যালিলিওর পক্ষে হয়ত রায় দিয়েছিলেন বা নরম হতে বলেছিলেন প্রশাসনকে। নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের দায় স্বীকার করে গ্যালিলিও অবশেষে ছাড়া পান। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা এতটুকু ক্ষুণ্ণ হয়নি। বিভিন্ন জায়গা থেকে বক্তৃতা দেবার জন্য তাঁর ডাক আসতে থাকে। সেই সময়ে চোখের অসুখে প্রবল ভুগতে থাকেন গ্যলিলিও। একটি মাত্র চোখে খানিকটা ঝাপসা দৃষ্টি ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি আবার “ডায়লগ” এর মতো আরও একটা বই লেখা শুরু করেন। বইটির নাম দেওয়া হয়- “Two new Sciences”। বইটি ইতালিও ভাষায় লেখা হয়, তদানীন্তন প্রথা অনুযায়ী ল্যাটিনে নয়। এই বইটির বিষয়বস্তু ছিল ভিন্ন, যা আজকের Strucrural Engineering বা Civil Engineering এর গোড়ার কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু রোমান প্রশাসকদের ভয়ে গ্যালিলিও ইতালিতে এই বই প্রকাশ করতে সাহস করলেন না। তিনি একজন ডাচ প্রকাশকের হাতে তুলে দিলেন বইয়ের পাণ্ডুলিপি। ১৬৩৮ সালে বই ছাপা হল। গ্যালিলিও স্বচক্ষে বই দেখতে পেলেন না। তিনি তখন সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গিয়েছেন।
অসুস্থ হয়েও লেখাপড়া চালিয়ে যাবার জন্য গ্যালিলিও একজন তরুণকে নিযুক্ত করেন তাঁর সেক্রেটারি হিসাবে। তাঁর মারফত তিনি চিঠি লিখতেন বন্ধুদের। ক্রমশ তাঁর কিডনি এবং হার্ট জবাব দিতে শুরু করল। ১৬৪২ সালের জানুয়ারি মাসে ৭৮ বছর বয়সে গ্যালিলিও গ্যালিলেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। সাধারণের সমর্থন হারানোর ভয়ে পোপ গ্যালিলিওর মরদেহ রোমের সান্তা মারিয়া গির্জায় কবর দেবার অনুমতি দিলেন না। ফ্লোরেন্সের এক অখ্যাত গির্জায় পিছনের জমিতে সামহিত হলেন আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ গ্যালিলিও গ্যালিলেই।
প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষ আকাশের গ্রহতারাদের দেখে পৃথিবীতে এই বিপুল সৃষ্টি দেখে বিস্মিত হয়ে প্রকৃতি গড়ার কারিগর ঈশ্বরকে কল্পনা করে এসেছে। মধ্যযুগে সেই বিস্ময় জন্ম দিয়েছে দর্শন। জন্ম নিয়েছে ধর্ম এবং ধর্মপুস্তক। নিজেদের মত করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মের নানা রূপ দিয়েছে মানুষ। ইউরোপের খ্রিস্টধর্ম, মধ্য এশিয়ায় মুসিলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্ম পালিত হয়েছে, লেখা হয়েছে ধর্মপুস্তক। ধর্ম পালন করার রাস্তা দেখিয়েছে ধর্মের বই। ধর্ম থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে দার্শনিকদের লেখা ধর্মগ্রন্থ। আবার দর্শনের প্রভাব পড়েছে সাহিত্যে। দার্শনিক বা সাহিত্যিকদের অনেকেই ঈশ্বরে আস্থা রাখলেও ধর্মগ্রন্থের সব কথা হুবহু মানতে রাজী হননি। এমনি একজন কবি জন্মেছিলেন গ্যালিলিওর শহর ফ্লোরেন্সেই। তিনি হলেন মহাকবি দান্তে।
গ্যালিলিওর যখন দূরবীন আবিষ্কার করলেন, তার প্রায় ৩০০ বছর আগে দান্তে লিখেছিলেন বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ – Divine Comedy। তিনটি খণ্ডে লেখা এই মহাকাব্যে কবি স্বর্গ এবং নরকের কাল্পনিক ভ্রমণ তুলে ধরেছিলেন। প্রথম খণ্ড ছিল ইনফারনো। এরিস্টটল বর্ণীত ব্রহ্মাণ্ডে ছিল নয়টি কাঁচের গোলক, গোলকগুলোতে ছিল এক একটি গ্রহ এবং সূর্য। পৃথিবীকে কেন্দ্রে রেখে সেই গোলকগুলো ক্রমাগত ঘুরে চলেছে ঈশ্বরের নির্দেশে। পৃথিবীর মাথার উপর চাঁদ একটি গোলকে স্থির, কিন্তু সেই গোলকও নিরন্তর ঘুরে চলেছে। চাঁদের গোলকের পর থেকেই সব কিছু মসৃণ এবং কলঙ্ক বিহীন। চাঁদ আর পৃথিবীর মাঝে সব কিছুই পরিবর্তনশীল। কিন্তু চাঁদ থেকে শুরু করে আরও উপরে সব অপরিবর্তনীয়। সে হচ্ছে স্বর্গ। ব্রহ্মাণ্ড সীমারেখা দিয়ে বাঁধা।
ইনফারনোতে দান্তে দানব জেরিওনের পিঠে চড়ে এক স্বর্গীয় গোলক থেকে আর এক গোলকে পাড়ি দেন ধীর গতিতে, বৃত্তাকার পথে, সরলরেখায় নয়। তাই দান্তে বলছেন, তিনি শুধু মুখে ও চোখে হাওয়ার স্পর্শ ছাড়া আর কিছুই অনুভব করছেন না।
দান্তের ডিভাইন কমেডি ইউরোপে বিতর্কের জন্ম দেয়। মানুষ ভাবতে শুরু করে, দান্তের বর্ণীত স্বর্গ কি আসল সত্য? তাই বুঝি তিনশ বছর পর ১৫৮৮ সালে গ্যালিলিও ফ্লোরেন্সের একাদেমিতে ডাক পান বক্তৃতা দিতে। বিষয়- দান্তের ইনফারনোর আকৃতি, অবস্থান ও আকার। গ্যালিলিওর বয়স তখন ২৪ মাত্র। তখনো তিনি পিসাতে অঙ্কের অধ্যাপনার কাজ পাননি। দান্তে এরিস্টটল পন্থী হয়েও ডিভাইন কমেডিতে যা লিখেছেন, বাইবেলের সাথে মিলিয়ে দেখতে গিয়ে ধর্মপ্রচারকেরা তাতে বিভ্রান্ত হয়েছে। গ্যালিলিও ডিভাইন কমেডির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলেন। এই প্রথম দর্শনের আঙিনায় প্রবেশ করল বিজ্ঞান চেতনা। কী বললেন গ্যালিলিও? দানবের পিঠে চড়ে এক গোলক থেকে আর এক গোলকে নেমে আসতে গিয়ে দান্তে কিছু অনুভব করেননি, কারণ তিনি জাঢ্যের কাঠামোতেই (Inertial Frame) অবস্থান করছিলেন। কোনও বস্তু যদি সমবেগে চলতে থাকে বা স্থির থাকে, তাকে ইনারশিয়াল ফ্রেম বলা হয়। গ্যালিলিও যে তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন তাকে পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন – Galilean Invariance। এইটি হল আইজ্যাক নিউটন প্রবর্তিত গতিসূত্রের গোড়ার কথা। দর্শন থেকে সাহিত্য, সাহিত্য থেকে জন্ম নিল বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ হল গ্যালিলিওর মহাকাশ দর্শন। ধর্ম যা বলে তা-ই মেনে না নিয়ে, নিজের পর্যবেক্ষণ এবং বিচারবুদ্ধির মধ্যে দিয়ে সত্যকে জানার রাস্তা দেখালেন গ্যালিলিও।
সপ্তদশ শতকে ইউরোপের নবজাগরণ ধর্মপুস্তককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো শুরু করল। বাইবেলে লেখা আছে বলে সব মেনে নিতে চাইল না মানুষ। রোমান ক্যাথলিক আর প্রোটেসট্যান্ট, দুই দলের ভাগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। রাজনীতিতে ধর্মীয় মতবাদের ছাপ পড়ল। গ্যালিলিও হয়ে উঠলেন নব বিচারধারার পথিকৃৎ। রোমে তাঁর বিচারের ঠিক পরই মহাকবি মিল্টন গ্যালিলিওর সাথে দেখা করেন। মিল্টন তখন তরুণ এবং গ্যালিলিও তখন অতিবৃদ্ধ। দুজনের আলাপচারিতায় দর্শন এবং বিজ্ঞান অবশ্যই জায়গা নিয়েছিল। মিল্টন এরপর লিখে ফেললেন বিখ্যাত মহাকাব্য “প্যারাডাইস লস্ট”। সেই কাব্যে স্পষ্ট ছাপ পড়ল গ্যালিলিওর মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণ এবং বিজ্ঞান। দুই মহাপুরুষের সাক্ষাৎ হল দান্তের শহর ফ্লোরেন্সে।
মিল্টন লন্ডনে জন্মেছিলেন। ইংল্যান্ডের রাজশাসন তখন প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের ধ্বজাধারী। মিল্টন সরকারি আমলা ছিলেন এবং প্রশাসনিক সমর্থনও পেয়েছিলেন। লন্ডন থেকে তিনি ফ্লোরেন্সে আসেন। কারণটা খুব স্পষ্ট না হলেও, গ্যালিলিওর সাথে দেখা করা তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। সেই সময়ে অসুস্থ গ্যালিলিওর দেখাশুনো করতেন তাঁর পুত্র ভিসেঞ্জিও গ্যালিলেই। মিল্টন ভিন্সেঞ্জিওর মাধ্যমেই গ্যালিলিওর দেখা পান। প্যারাডাইস লস্ট গ্রন্থে গ্যালিলিওর নাম উল্লেখিত আছে, যা থেকে জানা যায়, গ্যালিলিওর দূরবীন দিয়ে কবি রাতের আকাশে চাঁদের কল্পিত জগতে বিচরণ করছেন। মিল্টন অঙ্কে আগ্রহী ছিলেন। বিজ্ঞান সচেতন ছিলেন। তাই চার্চের কথা শেষ কথা, বা বাইবেলে যা আছে সব মানতে হবে, তা অস্বীকার করেন নিজের লেখা মহাকাব্যে। তাঁর উপর গ্যালিলিওর প্রভাব ছিল প্রত্যক্ষ। ইংল্যান্ডের সাহিত্যে মিল্টন এক বিশাল জায়গা অধিকার করলেন। বিজ্ঞানের হাত ধরে সাহিত্যে আধুনিকতার প্রবেশ ঘটল।
গ্যালিলিওর মৃত্যুর ঠিক এক বছর পর ইংল্যান্ডে জন্ম নিলেন আইজ্যাক নিউটন। বিজ্ঞানের সাথে সাথে সাহিত্যেও তাঁর রুচি ছিল। মিল্টনের প্যারাডাইস লস্ট অবশ্যই তাঁকে প্রভাবিত করেছিল বলে অনুমান করা যায়। সেই সঙ্গে নিউটন ছিলেন একজন ধর্মবিশ্বাসী। তিনি ধর্মশাস্ত্র নিয়ে যত সময় ব্যবহার করেছেন, তাঁর চাইতে অনেক কম সময় দিয়েছেন বিজ্ঞান চর্চায়। তবু তিনি সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হয়ে উঠেছেন। গ্যালিলিওর মহাকাশ ভাবনার ত্রুটি সংশোধন করে গাণিতিক রূপ দিয়েছেন মাধ্যাকর্ষণের তত্ত্বে। গ্যালিলি গণিতজ্ঞ হলেও, তাঁর সমস্ত গাণিতিক বিশ্লেষণের ফলাফল ছিল সংখ্যাদের অনুপাতের জটিল হিসেব। নিউটন বা লিবনিৎজের হাত ধরে গণিত প্রবেশ করল ক্যালকুলাসে। সহজ হয়ে উঠল গাণিতিক সমাধান। নিউটনের হাতে গাণিতিকভাবে প্রমানিত হল কেপলার ও গ্যালিলিওর তত্ত্ব। বাইবেলের চাইতে বেশি প্রামাণ্য দলিল হয়ে উঠল বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আধারে গড়ে ওঠা তথ্য।
ফরাসি জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ রেনে দেকার্তস গ্যালিলিওর চাইতে বয়সে অনেক ছোট ছিলেন। তিনি মহাকাশ বিজ্ঞানের গাণিতিক সমাধানের রাস্তা খুঁজে বার করেছেন। বৃদ্ধ গ্যালিলিও লেখা বই – Dialogue ল্যাটিনে অনুবাদ হয়ে ফ্রান্সে পৌছয়। বইয়ের ৩০০ কপি বাজারে আসা মাত্র বিক্রি হয়ে যায়। ফ্রান্সের গণিতজ্ঞদের কাছে গ্যালিলিওর বইটির চাহিদা ছিল সবচাইতে বেশি। ফ্রান্সের ক্যাথলিক পুরোহিতেরাও এই বইটি কেনায় পিছিয়ে ছিলেন না। ফ্রান্সে মুক্তচিন্তার অধিকারী একজন ক্যাথলিক পুরোহিত ছিলেন, যিনি হলেন মারিন মার্সেনে। তিনি গ্যালিলিওর লেখা বইগুলোর সারাংশ লিখে কম দামে বিক্রি করে গ্যালিলিওর ভাবনা ছড়িয়ে দিতে থাকেন। কাজেই ফ্রান্সে বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল গ্যালিলিওর। রেনে দেকার্তস গ্যালিলিওর মতই এরিস্টটল-পন্থার বিরোধিতা করতেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক কাজে গ্যালিলিওর প্রভাব অবশ্যই অনস্বীকার্য।
১৬৬০ সালে পৃথিবীতে দর্শনের চেনা চৌহদ্দির বাইরে এসে বৈজ্ঞানিক আলোচনার জন্য দুটি সংস্থার সৃষ্টি হল। একটি লন্ডনে, অপরটি ফ্রান্সে। লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হল রয়্যাল সোসাইটি। ফ্রান্সে গঠিত হল একাদেমি অফ সায়েন্সেস। যদিও দুটি সংস্থার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন দুই দেশের দুই রাজা, কিন্তু এই দুটি সংস্থাই ছিল স্বাধীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি এবং রাজ দরবার ছেড়ে বিজ্ঞানীরা খোলা মনে মুক্ত আলোচনা করার স্থান পেলেন। প্রথম প্রথম ধর্মগুরুরা ভিড় জমালেও এই দুটি সংস্থার বৈজ্ঞানিক আলোচনা তাদের ক্রমশ বিচ্ছন্ন করে দিল। অর্থাৎ ইউরোপীয় বিজ্ঞানের চাকাটা যে দ্রুত ঘুরতে লাগল, যার প্রথম ধাক্কা দিয়েছিলেন গ্যালিলিও। তাঁর মৃত্যুর পর আরও বেশি করে প্রতিভাত হল তাঁর বিজ্ঞান ভাবনা।
তথ্যসূত্র
- Thus Spoke Galileo, by Andrea Frova and Mariapiera Marenzana, Oxford University Press, 1998
- Galileo Galilei, First Physicists, by James MacLachlan, Oxford University Press, 1997.
- Burned Alive, Giordano Bruno, Galilieo Galilei nd the Inquisition, by Alberto A. Martinez, Reaktion Books, UK, 2018.
- A mathemetical Physics in Hell, Galileo and the Geometry of Dante’s Inferno, Jean Marc, University of Nice Sophia Antipolis, September 2018 (https://www.researchgate.net/publication/363329043).
- Literature and Science, by John H. Cartwright and Brian Baker, ABC-CLIO Inc, California, 2005.
জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর