মহাবিশ্বে মহাকাশে সব পর্ব একত্রে

আয়তনে ছোটো হয়েও উপগ্রহের সংখ্যায় মঙ্গলগ্রহ পৃথিবীকে টেক্কা দিয়েছে। পৃথিবীর যেখানে একটি মাত্র উপগ্রহ, মঙ্গলের সেখানে দুটো—ফোবস এবং ডিমোস। ১৬১০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার প্রথম ধারণা করেছিলেন যে মঙ্গলের দুটো উপগ্রহ থাকতে পারে। উপগ্রহ দুটি তখনও আবিষ্কৃত হয়নি; হয়েছিল প্রায় ২৬৬ বছর পরে। ১৮৭৭ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাসফ হল ওয়াশিংটনের ইউ.এস নেভাল অবজারভেটরি (US Naval Observatory) মঙ্গলগ্রহ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। হঠাৎ তিনি দুটো ক্ষীণ আলোকবিন্দু দেখতে পান। তিনি আলোকবিন্দু দুটোর উপর নজর রাখলেন। কয়েকদিন পর্যবেক্ষণের পর তিনি বুঝতে পারলেন যে আলোকবিন্দু দুটো মঙ্গলের চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। নানারকম পরীক্ষার পর তিনি নিশ্চিত হলেন যে মঙ্গলের দুটো উপগ্রহ আছে। এবারে নাম রাখার পালা। কিন্তু কী নাম রাখা যায়? বিজ্ঞানীরা এবারেও পুরাণে বর্ণিত কাহিনির সাহায্য নিলেন। রোমানদের যুদ্ধের দেবতা ‘মার্স’ এবং গ্রিকদের দেবতা ‘আরেস’। মঙ্গলগ্রহের নাম রাখার সময় বিজ্ঞানীরা রোমান নামটাই বেছে নিয়েছিলেন। আগেকারদিনে রাজাদের যেমন রথ থাকত, দেবতাদেরও তেমন ছিল, আর সেগুলো টানত ঘোড়া। মার্স বা এরিসের রথে ঘোড়া ছিল দুটি। এদের নাম—ফোবস ও ডিমোস। ফোবসের অর্থ ‘ভীতি’ (fear) এবং ডিমোসের অর্থ ‘আতঙ্ক’ (terror)। তাই মঙ্গলের উপগ্রহ দুটিরও নাম রাখা হল ফোবস আর ডিমোস।
প্রথমে আসি ফোবসের কথায়। ফোবস আকৃতিতে ডিমোসের চেয়ে বড়ো। লম্বায় ও চওড়ায় উপগ্রহটি যথাক্রমে ২৬ ও ১৮ কিলোমিটার। ফোবসের প্রতি মঙ্গলের স্নেহ যেন একটু বেশি। তাই তাকে কাছে ধরে রেখেছে, তবে ‘রোচে লিমিট’-এর যৎসামান্য বাইরে। আর একটু কাছে টেনে আনলে উপগ্রহটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। কোনও উপগ্রহকে অক্ষত থাকতে হলে তাকে গ্রহটি থেকে ন্যূনতম গ্রহটির ব্যাসার্ধের ২.৪৫ গুণ দূরত্বে থাকতে হবে। এই ন্যূনতম দূরত্বটিকে বলা হয় ‘রোচে লিমিট’। মঙ্গল থেকে ফোবসের গড় দূরত্ব ৯,৩৭৭ কিলোমিটার। মঙ্গল যেদিক বরাবর নিজের অক্ষের চারপাশে আবর্তন করে, ফোবসও ঠিক সেইদিক বরাবর পরিক্রমণ করে। মঙ্গল যেখানে নিজের অক্ষের চারপাশে একবার আবর্তন করতে সময় নেয় ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট, সেখানে ফোবস গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় মাত্র ৭ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট। অর্থাৎ, মঙ্গলের একদিন সময়কালে ফোবসকে মঙ্গলের আকাশে তিনবার উদয় হতে দেখা যায়। তবে মঙ্গলের আকাশে তারাদের পূর্বদিকে উদয় হতে দেখা গেলেও ফোবস উদয় হয় পশ্চিম দিগন্তে এবং অস্ত যায় পূর্ব দিগন্তে।
পৃথিবীর আকাশে যেমন চাঁদের কলা দেখা যায়, মঙ্গলের আকাশেও তেমন ফোবসের কলা দেখা যায়। তবে চাঁদের মতো পূর্ণিমা বা অমাবস্যা ফোবসের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ফোবস মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে বলে পূর্ণিমা থেকে অমাবস্যা পর্যন্ত কলা-চক্রের প্রায় অর্ধেকের মতো কলা পরিবর্তন প্রতিরাতে মঙ্গলের আকাশে দেখা যায়। এর ফলে ফোবসের পূর্ণ ঔজ্জ্বল্য কখনোই দেখা যায় না।
চাঁদের গা থেকে যেখানে ১১ শতাংশ আলো প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে আসে, সেখানে ফোবসের গা থেকে মাত্র ৬ শতাংশ আলো প্রতিফলিত হয়ে মঙ্গলপৃষ্ঠে পড়ে। পৃথিবী থেকে শুক্র গ্রহকে যতটা উজ্জ্বল দেখায়, মঙ্গল থেকে ফোবসকে তার চেয়ে সামান্য বেশি উজ্জ্বল দেখায়। মঙ্গলের নিরক্ষীয়তলের সমস্থানিক হওয়ার কারণে উপগ্রহটিকে মঙ্গলের দুই মেরু থেকে কখনোই দেখা যায় না; একে দেখতে হলে গ্রহটির ৬৯ ডিগ্রি অক্ষাংশের ভিতরে অবস্থান করতে হবে।
আর একটা মজার কথা হল, মঙ্গলের ১ বছরে (১ মঙ্গলবর্ষ = ৬৮৭ পৃথিবী দিন) ১৩০০ বার ফোবসের সংক্রমণ (Transit) ঘটতে দেখা যায়। সংক্রমণের সময় সূর্যের চাকতিকে অতিক্রম করতে ফোবসের সময় লাগে মাত্র ১৯ সেকেন্ড।
ফোবস কিন্তু গোলাকার নয়, এবড়োখেবড়ো অসম আকৃতির কৃষ্ণবর্ণের এক প্রস্তরখণ্ড-বিশেষ। এর পৃষ্ঠতলে রয়েছে অসংখ্য গহ্বর ও খাদ। শুধু তাই নয়, আছে পাহাড় ও সমতল ভূমিও। গহ্বরগুলি কোনোটা রিমড্ ক্রেটার, কোনোটা গোলাকার। গহ্বরগুলির মধ্যে দুটি বেশ বড়ো গহ্বর আছে—একটির ব্যাস ১০ কিলোমিটার এবং অপরটির ৬ কিলোমিটার। ছোটোটির নাম রাখা হয়েছে ‘হল’ যিনি মঙ্গলের উপগ্রহ দুটির আবিষ্কারক। আর বড়োটির নাম রাখা হয়েছে তাঁর পত্নীর নামে ‘স্টিক্নি’, যিনি মঙ্গলগ্রহের উপর পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে স্বামীকে নিয়মিত অনুপ্রেরণা জোগাতেন। তাঁর সম্মানার্থে এই নামকরণ করা হয়েছে।
মজার ব্যাপার হল, উপগ্রহটিতে অতগুলি গহ্বর বা জ্বালামুখ থাকা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত ওখানে কোনও আগ্নেয়গিরির (জীবন্ত বা মৃত) খোঁজ পাওয়া যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে এত জ্বালামুখ সৃষ্টি হল কীভাবে? বিজ্ঞানীদের ধারণা এগুলি সৃষ্টি হয়েছে উল্কার সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে। ফোবসের আর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গহ্বর হল—সার্পলেস, ডি’আরেস্ট, ভেনডেল, রোচে প্রভৃতি।
ফোবসের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এতটাই কম যে এর মুক্তিবেগ (Escape velocity) প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ১৫ মিটার। যেখানে চাঁদের মুক্তিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ২,৩৮০ মিটার। তাই এই উপগ্রহের পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে কখনোই খুব জোরে লাফানো উচিত নয়, লাফালে মঙ্গলপৃষ্ঠে ফিরে না এসে মাহাকাশে হারিয়ে যেতে পারে। আয়তনের তুলনায় উপগ্রহটির মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত কম কেন? বিজ্ঞানীদের মতে, উপগ্রহটি নিরেট পাথুরে নয়, স্পঞ্জের মতো ফাঁপা। তাই এর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত কম। উপগ্রহটিতে কোনও বায়ুমণ্ডল নেই। এখানকার পৃষ্ঠদেশের গড় তাপমাত্রা -১৭০ ডিগ্রি (মাইনাস ১৭০ ডিগ্রি) সেলসিয়াসের মতো। এর পৃষ্ঠদেশ ৩ ফুট পুরু ঘন কৃষ্ণবর্ণের ধূলিকণার আবরণে ঢাকা রয়েছে।
এবারে ফোবস সম্পর্কে একটা মজার কথা বলে লেখাটা শেষ করব। ১৯৪৫ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এ.বি সার্পলেস তাঁর পর্যবেক্ষণ তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছিলেন যে ফোবসের ‘সঞ্চারগতি’ (অরবিটাল ভেলোসিটি) ধীরে ধীরে বাড়ছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষার একে বলা হয় ‘সেকিউলার অ্যাকসেলারেশন’ বা ‘সাময়িক ত্বরণ’। এই ত্বরণের পরিমাণ বছরে ০.০০১ ডিগ্রির মতো। যা উপগ্রহদের ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। তাই সার্পলেস-এর বক্তব্যকে বিজ্ঞানীরা প্রথমে মেনে নিতে পারেননি। কারণ, কোনও উপগ্রহের উপর তেমন কোনও আকর্ষণ বল কাজ করলে তার গতিশক্তি কমে আসার কথা। সেক্ষেত্রে সেটা একসময় গ্রহটির বুকে আছড়ে পড়ার কথা। ফোবসের ক্ষেত্রেও তেমনি হওয়ার কথা। কারণ, ফোবস মঙ্গলগ্রহের খুব কাছে রয়েছে। মঙ্গলের আকর্ষণে ফোবসের গতিশক্তি ধীরে ধীরে কমে গিয়ে ৪ কোটি বছর পরে মঙ্গলের বুকে আছড়ে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে হচ্ছে উলটোটা। উপগ্রহটির সঞ্চারগতি ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। ১৯৭১-৭২ সালে মেরিনার-৯ থেকে পাওয়া তথ্যাবলি বিশ্লেশণ করে ক্যালিফোর্নিয়ার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির জ্যোতির্বিজ্ঞানী টমাস. সি. ডাকস্বিউরি ও সি. এইচ. বরন এবং দূরবীনের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে লেনিনগ্রাদের ইনস্টিটিউট ফর থিয়োরেটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমির জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভি. এ. শর সার্পলেস-এর বক্তব্যকে সমর্থন করেন।
জয়ঢাক প্রকাশন থেকে এই লেখকের লেখা মহাবিশ্বে মহাকাশে বইটি কিনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন
বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে