FUN-বিজ্ঞান- ভারত ও বিশ্বের বিজ্ঞানী- লাপ্লাস-অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়-শীত ২০২৩

ভারত ও বিশ্বের বৈজ্ঞানিক-সব লেখা একত্রে 

bigganbiggani87

আমাদের সৌরমণ্ডলে যে গ্রহদের আকাশে দেখতে পাওয়া যায়, তারা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের মনে বিপুল বিস্ময় সৃষ্টি করে চলেছে। অনুসন্ধিৎসু মানুষ চেষ্টা করেছে তার গতিপথের হদিস পেতে। পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে একসময়ে মানুষ মনে করত, গ্রহ-তারারা আকাশে স্থির। কিন্তু একটু একটু করে মানুষ বুঝতে পারল, মহাকাশে তারা এবং গ্রহেরা জায়গা পরিবর্তন করে। খালি চোখে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি বোঝা মুশকিল। দূরের জিনিস কাছে দেখার জন্য মানুষ যন্ত্র আবিষ্কার করল। টেলিস্কোপ আবিষ্কার হল। বোঝা গেল সূর্যের চারদিকে পাক খাওয়া গ্রহেরা স্থির নয়। সূর্যকে স্থির বিন্দু ধরে নিয়ে গ্রহদের পাক খাওয়া মনে হল বৃত্তাকার।

জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহে বেশ কিছু যন্ত্র বানিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের উপর নজর রেখে অনেক তথ্য লিখে রেখে যান। তার উত্তরসূরি জোহানেস কেপলার জানান যে সূর্যের চারদিকে গ্রহেরা বৃত্তাকার নয়, উপবৃত্তাকার পথে পাক খেয়ে চলেছে। কেপলার অবশ্য চার্চের ভয়ে পৃথিবীর চারিদিকে সূর্য ঘুরে চলেছে, এই মিথ্যে ইচ্ছে করেই প্রকাশ করে যান, সত্যি জেনেও।

টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা গেল, গ্রহদের ঘুরপাক খাওয়ার পথটা গোল নয়, ডিমের মত একটু লম্বাটে, ইংরেজিতে যাকে ইলিপ্স বলা হয়। তবে ধীরে ধীরে যত মহাকাশ পর্যবেক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার হতে লাগল, ততই গ্রহদের গতিপথের জটিলতা নজরে পড়ল। একটা বিষয় বোঝা গেল না যে, কেনই বা সৌরমণ্ডলের গ্রহেরা অনবরত পাক খেয়ে চলেছে। বিষয়টা ছেড়ে দেওয়া হল ঈশ্বরের ইচ্ছের উপর। ঈশ্বর চাইছেন, তাই গ্রহেরা অস্থির হয়ে সূর্যের চারদিকে পাক খেয়ে বেড়ায়- এই ধারনাটা বহুদিন যাবত মানুষের হৃদয়ে একটা বড় জায়গা জুড়ে ছিল। কিন্তু প্রকৃত সত্য জানবার চেষ্টা থেকে কিছু মানুষকে বিরত করা যায় না, যাদের আমরা বিজ্ঞানী বলে থাকি। তাই নানা গবেষণা আর পর্যবেক্ষণ চলতে লাগল।

নিউটনের হাতে মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কৃত হল। তিনি বললেন, এই জগতে সব বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। বস্তুর ভর যত বেশি, আকর্ষণও তত বেশি। অঙ্ক কষতে সুবিধে হবে বলে নিউটন ধরে নিলেন সূর্যের চারদিকে যে গ্রহেরা পাক খায় তা বৃত্তাকার, যদিও তিনি উপবৃত্তাকার পথের কথা জানতেন। সূর্য গ্রহদের তুলনায় অনেক অনেক গুণ ভারী। তাই সব গ্রহদের সূর্য প্রবল টান দিয়ে চলেছে, যাকে বলা যায় অভিকর্ষজ বল। তাহলে গ্রহগুলো সূর্যের ঘাড়ে পড়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেটি কেন হচ্ছে না? নিউটনের সূত্র অনুযায়ী গ্রহদের বৃত্তাকার পথে ঘোরার কারণে অভিকর্ষজ বলের উলটোদিকে কাজ করছে কেন্দ্রাতিগ বল, বা সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্স। অঙ্ক কষে সব মিলে গেল। বোঝা গেল, দুটি সমান মাপের বিপরীতমুখী বলের প্রভাবে গ্রহেরা সূর্যের চারদিকে বিশেষ বিশেষ কক্ষপথে ঘুরে চলেছে, কেউ কারো ঘাড়ে পড়ছে না।

নিউটনের সূত্র অনেকটাই দিশা দেখাল কক্ষপথের স্থিতিশীলতা নিয়ে। বিজ্ঞানী এডমণ্ড হ্যালি কোপার্নিকাস আর কেপলারের পুঁথি ঘেঁটে আর আকাশে পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন, গ্রহদের চলার পথ উপবৃত্তাকার তো বটেই, কিন্তু সেই কক্ষপথও স্থির নয়। সময়ের সঙ্গে সেই পথ বদলে যায়। গ্রহদের কক্ষপথেরা কেন বদলে যায়, নিউটনের সূত্র দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা গেল না। তাঁকে এই ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টা ঈশ্বরের উপর ছেড়ে দিলেন। তিনি বললেন, গ্রহদের কক্ষপথ বদলে গেলে ঈশ্বর হস্তক্ষেপ করে আবার সব একটু ঠিকঠাক করে দেন, গ্রহেরা যেমন চলছিল তেমনই চলতে থাকে।  অবশ্যই উপযুক্ত কারণ খুঁজে না পেয়েই আইজ্যাক নিউটন ঈশ্বরের স্মরণাপন্ন হন।

নিউটনের সমসাময়িক অঙ্কবিদ লিবনিত্‌জ ছিলেন নিউটনের কট্টর সমালোচক। গ্রহদের কক্ষপথ নিয়ে নিউটনের বিবৃতির পর তিনি রয়্যাল সোসাইটিকে চিঠি লিখে জানান, নিউটনের ভগবানের সম্পর্কে ধারণা খুবই নিকৃষ্ট, কারণ ভগবান এমন কিছু সৃষ্টি করেননি, যাতে মাঝে মাঝে এসে তার হস্তক্ষেপের প্রয়োজন আছে। যাই হোক, নিউটন – লিবনিত্‌জ বিতর্ক চলতেই থাকে।  

এরপর বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন গ্রহদের কক্ষপথ খুব ধীরে ধীরে বদল হয় এবং সেই বদলটা আবার দোদুল্যমান। আসলে গ্রহদের কক্ষপথ নিয়ে নিউটনের হিসেবে ধরে নেওয়া হয় গ্রহদের মধ্যে যে মাধ্যাকর্ষণ বল কাজ করে, সূর্যের তুলনায় তা অতি ক্ষীণ। তবে এই ক্ষীণ বলও যে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে একটু একটু করে কক্ষপথ বদলে দিতে পারে, তা নিউটনও জানতেন। এর কারণ নিয়ে প্রচুর অঙ্ক কষে সঠিক উত্তর আসে যার কাছ থেকে, তিনি হলেন ফরাসি অঙ্কবিদ, পিয়েরে সাইমন লাপ্লাস। সৌরমণ্ডলের গ্রহ এবং উপগ্রহদের ঘুরপাক খাওয়ার জটিল পথের কারণ খুঁজতে তিনি ক্যালকুলাসের সাহায্য নেন। ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস ব্যবহার করে তিনি দেখিয়ে দেন কক্ষপথের বদলে যাবার কারণ। তাঁর অঙ্ক কষার পদ্ধতিটা কিন্তু নিউটনের অসম্পূর্ণ কাজের উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে। তবে তাঁর জন্ম হয় নিউটনের জন্মের ১০৬ বছর পর। লাপ্লাসের অসাধারণ কাজ তাঁকে খ্যাতির উচ্চাসনে বসিয়ে দেয়। তাঁকে বলা হত, ফ্রান্সের নিউটন।

এই একই কাজ সেই সময়ে করে চলেছিলেন ফ্রান্সের আর এক অঙ্ক বিশারদ জোসেফ লুই ল্যাগ্রাঞ্জ। ল্যাগ্রাঞ্জের পদ্ধতি লাপ্লাসের পদ্ধতির থেকে বেশ কিছুটা আলাদা ছিল। লাপ্লাস ল্যাগ্রাঞ্জের চাইতে সাত বছরের ছোট ছিলেন। অঙ্কের ব্যাপারে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলার পাত্র ছিলেন না। তবে দুজনেই মহাকাশ গবেষণায় জ্যামিতি ছেড়ে মেকানিক্সকে সমৃদ্ধ করেছিলেন তাদের নিজের নিজের গাণিতিক বিশ্লেষণে। দুই অঙ্কবিদের ঝগড়া তুমুল হয়ে উঠলেও সৌরমণ্ডলে গ্রহ উপগ্রহরা যে নিজেদের কক্ষপথ বদল করে, এই সত্য সামনে আসে পৃথিবীর মানুষের কাছে।

পিয়েরে সাইমন লাপ্লসের জন্ম হয় খুব সাধারণ এক চাষির পরিবারে। সেই সময়ে গোটা ইউরোপ জুড়ে চার্চে ধর্মযাজক হয়ে যোগ দিলে রোজগারের পাকা রাস্তা খুলে যেত। তাই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা-মায়েরা তাদের ছেলেদের ধর্মচর্চা করতে উৎসাহ দিতেন, যাতে পরিবারে সচ্ছলতাও আসে, আবার সমাজে প্রতিপত্তিও বাড়ে। কিন্তু ছেলেবেলা থেকে বালক সাইমন অঙ্কের দিকে এতটাই ঝুঁকেছিল, যে তাকে দিয়ে ধর্মচর্চা করানো যায়নি।

কিছু ধনী ব্যক্তির সাহায্যে লাপ্লাস একটু বড় হয়ে একটি মিলিটারি স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে পড়াশুনোর পাঠ চুকিয়ে প্যারিস চলে যান লাপ্লাস। এখানে তিনি বিখ্যাত অঙ্কবিদ ডি এলাম্বার্টের সংস্পর্শে আসেন। এলাম্বার্ট লাপ্লাসের অঙ্কের অসামান্য পারদর্শিতা লক্ষ্য করেন। তিনি সাইমন লাপ্লাস কে নিজের সহকারী হিসাবে নিযুক্ত করেন। কিছুদিনের মধ্যেই একটি মিলিটারি স্কুলে লাপ্লাসকে শিক্ষকতার কাজ জুটিয়ে দেন। এবার গ্রাসাচ্ছাদনের সমস্যা না থাকায় লাপ্লাস পুরোপুরি অঙ্কের গবেষণায় ডুব দেন।

অনেক আগে থেকেই মহাকাশ পর্যবেক্ষণে যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসছিল তা হল, বৃহস্পতির কক্ষপথ ছোট হয়ে আসলেও শনির কক্ষপথ বড় হচ্ছে। লাপ্লাসের আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মহাকাশে গ্রহদের মধ্যে যে মাধ্যাকর্ষণ কাজ করছে তা এতটাই জটিল যে অঙ্কের রাস্তায় এর কোনও সমাধানের দরজা খোলা নেই। এই কারণেই খোদ নিউটন পর্যন্ত ভগবানের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সমস্যার সমাধান এল লাপ্লাসের হাত দিয়ে। তিনি প্রমাণ করে দিলেন, সৌরমণ্ডলে গ্রহদের সম্মিলিত গড় কৌণিক বেগ এক। কাজেই এক গ্রহের কক্ষপথ ছোট হলে, আর এক গ্রহের বেড়ে যাবে, কারণ গড় কৌণিক বেগকে ধ্রুবক থাকতে হবে।

সাইমন লাপ্লাসের কাজ জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন দিক খুলে দিল। জ্যামিতির জায়গায় ক্যলাকুলাস ব্যবহার করে গ্রহদের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করার রাস্তা পেলেন বিজ্ঞানীরা। কাজেই লাপ্লাস রাতারাতি বিখ্যাত অঙ্কবিদ হয়ে গেলেন। ফ্রেঞ্চ একাডেমি অফ সায়েন্স সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিজেদের সংস্থায় ‘ফেলো’ বা সভ্য করে নিল।

খুব সম্ভব কম বয়সে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাবার জন্য সাইমন লাপ্লাস তাঁর আগের যত অঙ্কবিদের কাজকে সমালোচনা করতে শুরু করলেন। এমনকি তিনি ডি এলাম্বার্টের কাজকেও ছেড়ে কথা বলেননি। এলাম্বার্ট খুবই ভদ্র ছিলেন, তাই তিনি লাপ্লাসের সঙ্গে ঝগড়ায় না নেমে, তাঁর মেধার প্রশংসা করতে লাগলেন। ল্যাগ্রাঞ্জের সঙ্গে লাপ্লাসের ঝগড়া শুরু হয় এই সময়েই। আর এক প্রথিতযশা সম্মানিত গণিতজ্ঞ অয়লার যখন ল্যাগ্রাঞ্জের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলেন যে, ল্যাগ্রাঞ্জের অঙ্কে কবিতার ছন্দ খুঁজে পাওয়া যায়, লাপ্লাস সেই কথাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বলেন, অঙ্কে কোনও কবিতা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, আসলে অঙ্ক হচ্ছে সত্যানুসন্ধানে ব্যবহার্য এক যন্ত্র। 

ক্ষুরধার মেধা এবং অনুসন্ধিৎসু মনের কারণে লাপ্লাস অঙ্ক ছেড়ে অন্য ক্ষেত্রেও কাজ করতে থাকেন পরবর্তী সময়ে। তাঁর বন্ধু ছিলেন ফরাসি পদার্থবিদ আন্তয়েন ল্যাভোসিয়ার। দুই বন্ধু একসঙ্গে কাজ করে, ক্যালরিমিটার ব্যবহার করে দেখিয়ে দেন— জীবজগতের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস আসলে একটি দহন প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এরপর গ্রহদের কক্ষপথ নিয়ে নিজের গাণিতিক গবেষণায় আবার ফিরে যান লাপ্লাস। দেখিয়ে দেন, অনেক বড় সাময়ের সাপেক্ষে গ্রহদের কক্ষপথের বিচ্যুতি কেন আবর্তনশীল, অর্থাৎ একই জায়গায় কেন বারবার বিচ্যুত কক্ষপথ ফিরে আসে। তিনি আরও দেখান, কেন কোনোদিন এই বিচ্যুতির ফলেও এক গ্রহ আর একটি গ্রহের ঘাড়ে পড়বে না।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়ে যায়। উচ্চবর্গীয় বহু মানুষ যারা ক্ষমতাবান শাসকদের সঙ্গে ওঠা বসা করতেন, তাঁরা বিপ্লবীদের তাৎক্ষণিক বিচারে গিলোটিনের নিচে গলা দিয়ে প্রাণ হারান। সাইমনের পরম বন্ধু আন্তয়েন ল্যাভসিয়ারও রেহাই পাননি। লাপ্লাস সেই সময়ে প্যারিস শহর ছেড়ে চলে যান। অজ্ঞাত কারণে লাপ্লাসকে বিপ্লবীরা গ্রেপ্তার করেনি, তাঁকে গিলোটিনেও যেতে হয়নি। অনেকে মনে করেন চাষির পরিবারে জন্ম হয়েছিল বলেই ফরাসি বিপ্লবীরা লাপ্লাসকে রেহাই দেয়।

ফরাসি বিপ্লবের পর প্যারিসে ব্যুরো অফ লঙ্গিটিউড সংস্থা খোলা হয়। ল্যাগ্রাঞ্জ ও লাপ্লাস এই সংস্থার গণিতজ্ঞ হিসাবে একসঙ্গে যোগ দেন। ততদিনে তাদের মধ্যে ঝগড়া শেষ হয়ে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। ফরাসি বিপ্লবের দিনগুলিতে নিভৃতবাসে আর একটা দারুণ গাণিতিক কাজ করেন পিয়েরে সাইমন লাপ্লাস। প্রবাবিলিটি বা রাশিবিজ্ঞানের উপর অসাধারণ একটি বই লেখেন। বইটি প্রবল জনপ্রিয় হলে সর্বসাধারণের বোধগম্য হয় এমন একটি প্রবন্ধ লিখে রাশিবিজ্ঞানের ভেলকি দিয়ে প্রকৃতির অনেক রহস্যের পর্দা কেমন করে খোলা যাবে, তার হদিস দেন লাপ্লাস।

এরপর প্যারিসের মান মন্দিরে নির্দেশক পদে যোগ দেন লাপ্লাস। কিন্তু এখানে কাজ করতে এসে বহু জ্যোতির্বিদের সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। অঙ্ক কষে গ্রহদের সন্ধান ও হালহকিকত জানার চেষ্টা করে পর্যবেক্ষণকে কম গুরুত্ব দিতেন লাপ্লাস, এমন অভিযোগও উঠতে থাকে।

জীবনের শেষদিকে লাপ্লাস প্রভূত সম্মান পান ফ্রান্সে। তিনি মারকোয়েজ বা উচ্চপদাধিকারী বলে স্বীকৃতি পান। নেপলিয়ান বোনাপার্ট-এর নেতৃত্বে ফ্রান্সে যে সরকার গঠন হয়, তাতে তিনি কিছুদিনের জন্য গৃহমন্ত্রীর পদ সামলান। নেপলিয়ান এই গণিতজ্ঞকে খুবই সম্মান করতেন এবং তাঁর সম্পর্কে বলেন যে, স্বল্প সময়কালেও সাইমন লাপ্লাস প্রশাসনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণে কীভাবে করা যায়, তার পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে লাপ্লাস পদার্থবিদ্যার অনেক দিক নিয়ে নানা তত্ত্ব লিখে যান, যার মধ্যে বেশিরভাগই ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় অনেক পদার্থবিজ্ঞানীই বলতে থাকেন, বিজ্ঞানের সব বিষয়ে মাথা না গলানোই পিয়েরে সাইমন লাপ্লাসের মত গণিতজ্ঞের উচিত ছিল। কিন্তু সমালোচনা তাঁর কাজের গতিকে রুদ্ধ করতে পারেনি। তবে লাপ্লাসের জনপ্রিয়তা এই সময়ে খানিকটা কমে যায়। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে অন্য বিজ্ঞানীদের উপেক্ষা করার যে প্রবণতা লাপ্লাসের ছিল, সেটি এর মূলে থাকতে পারে বলে মনে করেন অনেক পণ্ডিতেরা। জীবনের সায়াহ্নে এসে একমাত্র  কন্যাসন্তানকে হারিয়ে লাপ্লাস খুব ভেঙে পড়েন। ৭৮ বছর বয়সে তিনি ভগ্ন স্বাস্থের কারণে মারা যান।

লাপ্লাসের আগের সব বিজ্ঞানীরাই যেখানে গ্রহতারাদের গতিবিধির নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি ভগবানের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি জোর গলায় বলতে পেরেছিলেন— ভগবান নয়, ব্রহ্মাণ্ডের আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে প্রকৃতির সহজ নিয়মে। গণিতের বইতে তাঁর বিখ্যাত লাপ্লাস ট্রান্সফরমেশন আবিষ্কারের জন্য পিয়েরে সাইমন লাপ্লাস বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

জয়ঢাকের  বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

Leave a Reply