মাথে মে ট্রিকস সব পর্ব একত্রে
অংক না ম্যাজিক?

প্রফেসর ট্যানজেন্ট বললেন, “বলুন তো সাত হাজার ছ’শো একচল্লিশ থেকে এক হাজার চার শো সাতষট্টি বাদ দিলে কত হয়?”
আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম, “ইয়ে, কেন বলুন তো?”
“আরে মশাই, ছ’হাজার একশ’ চুয়াত্তর। মজাটা বুঝলেন কি? বোঝেন নি। জানতাম আপনার দ্বারা হবে না।”
প্রফেসর ট্যানজেন্ট তাচ্ছিল্য দেখাতে ‘জ’ গুলোকে ‘z’ দিয়ে বলেন। মনে মনে বেজায় রাগ হল। তাও আমতা আমতা করে বললাম, “তা কেন? বিয়োগটা খুব বুঝেছি। কিন্তু মজাটা তো ঠিক…, তা আপনিই পুরোটা বুঝিয়ে বলুন না।”
“আপনাকে বোঝাবো? তাহলেই হয়েছে। একটু পড়াশোনা করুন দাদা। আচ্ছা, একটা সূত্র দিয়ে গেলাম¾বিয়োগটাতে শুধু চারটে অঙ্কই ব্যবহার হয়েছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। এবার আপনি ভাবুন¾” তারপর চলে যেতে যেতে একটু অনুকম্পাভরে উপদেশ দিয়ে গেলেন, “একটু করে ব্রাহ্মী শাক খাওয়া শুরু করুন দেখি। আচ্ছা চলি…”
এতো অপমান সহ্য হয়? গিয়ে সত্যিই নেট খুলে বসলাম। আর পেয়েও গেলাম অনেক কিছু। যা দিয়ে এইবারের অঙ্ক নিয়ে জাদুর আসর বসানো যেতে পারে।
এক
প্রফেসর ট্যানজেন্টের অঙ্কটা ছিল এই, ৭৬৪১-১৪৬৭=৬১৭৪। সত্যিই ৬১৭৪ সংখ্যাটার অংকগুলোকে ঘুরিয়ে ফিরিয়েই বিয়োগটা তৈরি করা হয়েছে। ৬, ১, ৭, ৪ দিয়ে সবচেয়ে বড় সংখ্যা হল ৭৬৪১ আর সবচেয়ে ছোট সংখ্যা ১৪৬৭। বিয়োগ করলে পাচ্ছি ৬১৭৪। বেশ তো, কিন্তু এটা কি খুব একটা অবাক করা ব্যাপার? তাহলে এসো, আসল ম্যাজিকটা এবার দেখাই।
যে কোনও একটা চার অংকের সংখ্যা নিন। ধরুন ১১৯৩। সংখ্যাটা উভয়মুখী অর্থাৎ প্যালিন্ড্রোম না হলেই চলবে। এর অংকগুলো দিয়ে সবচেয়ে বড় আর ছোট সংখ্যা কী কী? খুব সহজ, ৯৩১১ এবং ১১৩৯। বিয়োগ করলে পাই ৮১৭২। তাতে কি হোল?
হবে হবে। এই বিয়োগফলের ওপর একই প্রক্রিয়া আবার করা যাক। এবং ক্রমান্বয়ে করেই যাওয়া যাক।
৮৭২১-১২৭৮=৭৪৪৩ Þ ৭৪৪৩-৩৪৪৭=৩৯৯৬ Þ ৬৯৯৩-৩৬৯৯=৩২৯৪ Þ ৯৪৩২-২৩৪৯=৭০৮৩ Þ ৮৭৩০-০৩৭৮=৮৩৫২ Þ ৮৫৩২-২৩৫৮=৬১৪৭
আর করে লাভ নেই, কেননা এসে গেছে সেই ৬১৪৭! অর্থাৎ, যে কোনও চারটি অনুভয়মুখী অংকের সংখ্যা দিয়েই শুরু করা হোক না কেন, শেষে ৬১৪৭ এর অনন্ত চক্রে এসে পড়বে। তাহলে হোলো না ৬১৪৭ জাদুসংখ্যা?
এতেই শেষ নয়। যে কোনও চার অংকের সংখ্যার জন্য ৬১৪৭-এ আসতে বেশির বেশী মাত্র সাতবার এই বিয়োগ প্রক্রিয়া করতে হবে, তার বেশি কখনোই নয়। অংক কষে একথা প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু সেই প্রমাণে গিয়ে আর মজাটা নষ্ট করে কাজ নেই।
আর যে কোনও সংখ্যা নিয়ে চেষ্টা করেই দেখো না!
দুই

যে কোনও চারটে পূর্ণসংখ্যা নিয়ে এই খেলাটা শুরু করা যেতে পারে। ১৭, ২৫, ৪৭, ৫৫ দিয়ে পদ্ধতিটা নীচে দেখানো হল.
চারটি সংখ্যা জোড়ায় জোড়ায় বিয়োগ করা হয়েছে, বড়টি থেকে ছোটটি। এই প্রক্রিয়া যথেষ্টসংখ্যক বার চালিয়ে গেলে অবশেষে চারটি একই সংখ্যায় এসে শেষ হবে। এখানে যেমন এসেছে ১৬। হ্যাঁ, যে কোনও চারটে সংখ্যা দিয়ে শুরু করা হোক না কেন। ব্যাপারটি প্রথম চোখে পড়ে ইতালিয়ান গণিতজ্ঞ অধ্যাপক ই ডাকির, গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে।
ভাবছ, সুবিধে মতো সংখ্যা নিয়ে দেখানো হয়েছে? হ্যাঁ, তা ঠিক। সুবিধেজনক এই হিসেবে যে চারটে ছোট ছোট সংখ্যা নিয়ে দেখানো হয়েছে। তা শুধু পরিশ্রম কম করতে। যে কোনও বড় সংখ্যা নিয়ে শুরু করলেও ফলাফল একই হবে, শুধু অনেকগুলো ধাপ কষে যেতে হবে।
বিশ্বাস না হলে কষে দেখো।
তিন
প্রাকৃতিক সংখ্যাদের মধ্যে যে কতো রকমের সম্পর্ক থাকে, বিশেষ ভাবে সাজালে তা বেশ অদ্ভুত ভাবে প্রকাশ হয়। যেমন এবারের এই সংখ্যাবিন্যাসের খেলাটা দেখা যাক। এখানে প্রাকৃতিক সংখ্যাগুলি, মানে ১, ২, ৩, ৪,… ইত্যাদিকে প্রথম সারিতে যথাযথ লিখে যাও। এইবার প্রথম থেকে প্রতি চতুর্থ সংখ্যাটি বাতিল করো। তারপর দ্বিতীয় সারিতে উপরের সংখ্যাগুলির নীচে প্রথম সারির ঐ সংখ্যা পর্যন্ত আংশিক সমষ্টিগুলি লেখো। আংশিক সমষ্টিতে বাতিল সংখ্যাগুলি উপেক্ষা করবে।
এবার দ্বিতীয় সারির প্রতি তৃতীয় সংখ্যাটি বাতিল করে একইভাবে আংশিক সমষ্টি গুলি লিখুন তৃতীয় সারিতে। একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করো তৃতীয় সারির সংখ্যাদের সাথে, এবার প্রতি দ্বিতীয় সংখ্যাগুলি বাতিল করে।
নীচের সারণীতে পুরো প্রক্রিয়ার পরে সংখ্যাগুলির স্থিতি দেখানো হল। বাতিল সংখ্যাগুলি ধূমিল করে দেওয়া হয়েছে।

চতুর্থ সারিতে যে সংখ্যাগুলো পেয়েছ সেগুলো কী বলো দেখি? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ। প্রাকৃতিক সংখ্যাগুলির চতুর্থ ঘাত, অর্থাৎ, ১৪, ২৪, ৩৪, ৪৪, ৫৪, ৬৪… ইত্যাদি!
তোমরা ভাববে, হঠাৎ চতুর্থ ঘাত এসে গেল কেন? এর কি কোনও বিশেষ তাৎপর্য আছে? তাহলে নীচে দেওয়া দুটি সারণী দেখো। প্রথমটিতে প্রতি পঞ্চম পদটি বাতিল করে শুরু করা হয়েছে এবং দ্বিতীয়টিতে, প্রতি তৃতীয় পদটি-


আশা করি এইবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক সংখ্যাগুলির যততম সংখ্যাগুলি বাতিল করে শুরু করা হবে, শেষ সারিতে প্রাকৃতিক সংখ্যাগুলির তততম ঘাত পাওয়া যাবে! হ্যাঁ, ম্যাজিকের মতো লাগলেও এটাই প্রতিপাদ্য।
এটির আবিষ্কর্তা আলফ্রেড মেসনার ছিলেন বিনোদন গণিতের একজন সুখ্যাত গবেষক। ১৯৫১ সালে নেহাতই কাকতালীয় ভাবে ওপরের ঘটনাটি তাঁর গোচরে আসে। তিনি পঞ্চম ঘাত দিয়ে প্রক্রিয়াটি প্রকাশ করেছিলেন। আশ্চর্যজনক সাধারণীকরণটি তার পরে হয়েছে। গাণিতিক ভাবে এটির প্রমাণ পেতেও দেরি হয় নি। আবিষ্কারের বছর পনেরোর মধ্যেই বিভিন্ন গণিতজ্ঞ দ্বারা নানান উপায়ে এটির সত্যতা সাব্যস্ত হয়েছে। তার মধ্যে এইন্ডহোভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কারেল পোস্ট একটি অভিনব সরল পদ্ধতিতে এটিকে প্রমাণ করেছেন। তা সেই ‘সরল’ প্রমাণটিও আসলে যথেষ্ট জটিল। এই জায়গা তার উপযুক্ত হবে না।
চার
আসর শেষ করছি এরকমই আর এক সংখ্যাবিন্যাসের খেলায়। নীচের সারণীতে প্রাকৃতিক সংখ্যাদের পর পর সাজানো হয়েছে প্রথম স্তম্ভে একটি, তারপর তিনটি, তারপর পাঁচটি, এইভাবে যেমন দেখানো আছে। আর কোনই কায়দা নেই। তাইতেই কিন্তু সারণীটাতে বেশ কিছু বিশেষত্ব এসে গেছে। এখানে প্রত্যেক স্তম্ভের মধ্যবর্তী সংখ্যাগুলি (স্থূলাকারে দেখানো) নিয়ে যে সারিটি কোণাকুণি নেমে গেছে তাঁকে সারণীর মধ্যমা বলা যাক। স্বভাবতই মাধ্যমিক সংখ্যাগুলি তাদের স্তম্ভের সংখ্যাগুলির গড়।
এইভাবে সাজানো প্রাকৃতিক সংখ্যাগুলো কী জাদু দেখায় দেখা যাক-
এগুলো সবই সহজ বীজগণিতের দ্বারা প্রমাণযোগ্য। তার মধ্যে আর যাবো না। উৎসাহী পাঠক চেষ্টা করে দেখতে পারেন। খুঁজলে সারণীতে আরও কিছু বিশেষত্ব পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু যা দেওয়া হল তাই বা কম কি?
***
আজকে এই পর্যন্ত। এখনি আমাকে যেতে হবে। প্রফেসর ট্যানজেন্টের সাথে বোঝাপড়াটা বাকি আছে যে!

