FUNবিজ্ঞান-নীল কার্বন বাস্তুতন্ত্র আজ বিঘ্নিত, কিন্তু আমরা নই চিন্তিত-ড. উৎপল অধিকারী-শরৎ ২০২৫

সমুদ্র এবং সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে গঠিত হওয়া বাস্তুতন্ত্রকে বলা হয় নীল কার্বন বাস্তুতন্ত্র বা ব্লু কার্বন ইকোসিস্টেম। এই বাস্তুতন্ত্রে যে কার্বনরাশি সঞ্চিত থাকে তাকে বলা হয় নীল কার্বন বা ব্লু কার্বন। ম্যানগ্রোভ অরণ্য, সামুদ্রিক ঘাস এবং সমুদ্রের বিশাল জলরাশির মধ্যে বিপুল পরিমাণ ব্লু কার্বন সঞ্চিত থাকে। কারস্টেন নেলিম্যান ২০০৯ সালে প্রথম এই ব্লু কার্বন শব্দটি উত্থাপন করেন। এই বাস্তুতন্ত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এরা বনভূমি বাস্তুতন্ত্রের থেকে প্রায় দুই থেকে চারগুণ বেশি হারে কার্বনকে সঞ্চয় করতে পারে। এছাড়াও এই বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে সামুদ্রিক মাছ, বিভিন্ন ছোটোবড়ো সামুদ্রিক প্রাণী, কোরাল বা প্রবাল, আণুবীক্ষণিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও জুপ্ল্যাঙ্কটন বসবাস করে থাকে। বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড এই বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে সঞ্চিত হয় ও জলকে পরিশ্রুতকরণে এই বাস্তুতন্ত্রের বিশাল ভূমিকা আছে। ম্যানগ্রোভ অরণ্য অনেকটা ঢালের মতো সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল এবং লোকালয়কে সামুদ্রিক ঝড়-ঝঞ্ঝা ও সুনামি থেকে বাঁচিয়ে রাখে, ভূমিক্ষয় রোধ করে থাকে। পৃথিবীতে প্রায় প্রত্যেকটি মহাদেশেই ব্লু কার্বন ইকোসিস্টেম আছে, কেবল ব্যতিক্রম আন্টার্টিকা। এক হিসাবে দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রায় ৪৯ মিলিয়ন হেক্টর জুড়ে এই বাস্তুতন্ত্র বিরাজ করছে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার যেটা তা হল, পৃথিবীতে সর্বাপেক্ষা বিপদগ্রস্ত ও বিপন্ন বাস্তুতন্ত্র এটি। তারা ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্টের থেকে প্রায় চারগুণ বেশি হারে ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। দূষণ, প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ও জলবায়ুর পরিবর্তন এই ধ্বংসকে আরও ত্বরান্বিত করছে। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো শহরের উন্নয়ন, কারখানা স্থাপন, মাছ চাষ এবং কৃষিকাজের উন্নতিসাধনের জন্য এই জঙ্গলকে সাফ করা হচ্ছে। এরা যেহেতু প্রচুর পরিমাণে কার্বন সঞ্চিত রাখে, তাই এই বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হলে প্রকৃতিতে ও বাতাসে প্রচুর পরিমাণে কার্বন মুক্ত হচ্ছে। এর ফলে পরোক্ষভাবে বিশ্বের গড় উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং নামে পরিচিত। পৃথিবীর প্রায় উনিশ শতাংশ কার্বন-ডাই-অক্সাইড এইভাবে বাতাসে মুক্ত হচ্ছে। পৃথিবীতে প্রতিবছর আমরা তিন শতাংশ হারে ম্যানগ্রোভ অরণ্য, এক থেকে দুই শতাংশ হারে লবণাক্ত জলাভূমি এবং ৭% হারে সামুদ্রিক ঘাস হারিয়ে ফেলছি।

এই বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষার জন্য সরকারিভাবে, বেসরকারিভাবে সবরকম চেষ্টা করা হচ্ছে। ইন্টার গভর্নমেন্টাল ওসেনোগ্রাফিক কমিশন, ব্লু কার্বন ইনিশিয়েটিভ, মিসটি বা দি ম্যানগ্রোভ ইনিসিয়েটিভ ফর সোরলাইন হ্যাবিট্যাট অ্যান্ড টাঙ্গিবেল ইনকামস নামের বিভিন্ন সংস্থাগুলি ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও এই ইকোসিস্টেমকে বাঁচানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ভারতের কোস্টাল রেগুলেশন জোন পলিসিকে দৃঢ় করা হয়েছে। ইকো ট্যুরিজিমের উন্নতির সাথে সাথে পরিবেশকে রক্ষা করার ব্যাপারেও নজর দেওয়া হচ্ছে। ভারতে মোট আড়াইশো বর্গকিলোমিটার অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে প্রায় ৫৪০ বর্গ কিলোমিটার অরণ্য অঞ্চল উদ্ধার। এ.আই. বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পৃথিবীব্যাপী সমীক্ষা করে একটা ডিজিটাল ম্যাপিং তৈরি করা হয়েছে। তাতে বর্তমানে পৃথিবীতে মোট কত ব্লু ইকোসিস্টেম আছে তা সুস্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে।

এইভাবে মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা অদূর ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রক্ষা করে যেতে পারবে, এই আশা করা যেতেই পারে।

জয়ঢাকের  বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

 

Leave a Reply