
১৯৮০-র দশকের একেবারে গোড়ার দিকের কথা। ভাগবতপুর কুমির প্রকল্পে তখন আমার পোস্টিং হয়েছে। হায়দরাবাদের সেন্ট্রাল ক্রোকোডাইল ব্রিডিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট থেকে ‘কুমির প্রজনন, পালন ও বন্যপ্রাণ পরিচালনা’ বিষয়ে ডিপ্লোমা করে আসার পর আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হল সারা সুন্দরবন ঘুরে কুমিরের ডিম জোগাড় করে তাকে কৃত্রিম পদ্ধতিতে তা দিয়ে সেখান থেকে কুমির-প্রজনন করা।
সেই সময়ে প্রাকৃতিকভাবে কুমিরের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছিল। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় খাদ্য শৃঙ্খলে কুমিরের উপস্থিতির গুরুত্বের কথা চিন্তা করে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারদের সহযোগিতায় বিভিন্ন রাজ্যে চালু করেন কুমির প্রজনন প্রকল্প। জঙ্গল থেকে কুমিরের ডিম সংগ্রহ করে এনে কৃত্রিম পদ্ধতিতে সেগুলোকে তা দিয়ে ছানা বের করা এবং সেইসব ছানাদের পালন করে আকারে চার ফুট মাপের করে (সুন্দরবনের পূর্ণবয়স্ক কুমিরের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ফুট হয়) প্রকৃতির কোলে ফিরিয়ে দেওয়া ছিল এই প্রকল্পগুলোর প্রধান কাজ।
সুন্দরবনের ভাগবতপুরে এই ধরণের একটি প্রকল্প চালু ছিল ১৯৭৮ সাল থেকে। সাধারণত বর্ষা নামলে জুনের শেষদিকে বা জুলাই মাসে আমাদের নোনা জলের কুমির ডিম পাড়ে। কিন্তু প্রায় সাড়ে চার হাজার বর্গ কিলোমিটারের এই সুন্দরবনের জঙ্গলে কোথায় যে কুমির ডিম দেয় তা কেউ জানে না। কোনোরকম তথ্যের সাহায্যও কেউ দেয় না।
আমরা প্রথমে লঞ্চ নিয়ে বেরিয়েছিলাম। এরকম একটা ভাবনা ছিল সবার মনে যে ও কোনো ব্যাপার নয়। গেলেই বোধহয় কুমির আর কুমিরের ডিম পাওয়া যাবে। জেলে নৌকাগুলোর কাছে খবর নিতে গেলে কেউ একজন বলেছিল ধনচি বিটের চুলকাটির জঙ্গলে বাবুখালের কাছে কোনো এক জায়গাতে কুমিরকে ওঠানামা করতে দেখা গিয়েছে। ব্যস্, যেই শোনা সেই কাজ। সঙ্গে সঙ্গে আমরা লঞ্চ নিয়ে চললাম চুলকাটির বাবুখালের দিকে। কিন্তু কোথায় যে কুমির ওঠানামা করছে কেউ জানে না। আমাদের বলা হল ‘তোমরাই বাপু খুঁজে দেখো।’
তখন বয়েস অনেক কম ছিল। কিছুদিন আগে কলেজের পাঠ শেষ করলেও মাথায় বুদ্ধিও কম ছিল। তাই সাতপাঁচ না ভেবে আমার বয়সি চার-পাঁচ জন ছেলেকে নিয়ে সুন্দরবনের জঙ্গলে নেমে পড়লাম। ধানিঘাস, নল, ফ্রাগমাইটেশ কারকা গাছের মতো লম্বা সরু গাছে ভর্তি ঠিক খালের পাশের জায়গাটি। আমার হাত খালি। ওদের হাতে খাটো লাঠি। বাবুখালের পাশের চর জমি এবং জঙ্গলের কিনারায় কুমিরের ওঠানামার দাগ ধরে কুমিরের বাসা খুঁজে বের করতে ঐ আমাদের সম্বল।
কয়েক বছর পরে আবার যখন বিভাগীয় বনাধিকারিক হিসেবে ঐ এলাকাতেই কাজ করতে আসি তখন ভাবি যে ভাগ্যিস ভগবান ছিলেন…তাই ওই বুদ্ধুর মতো জোশ দেখিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমার অপরিণামদর্শিতার মূল্য আমাদের কাউকে দিতে হয়নি।
বহুদিন পরে প্রাক্তন প্রধান মুখ্য বনপাল শ্রী কার্তিক চন্দ্র গায়েন সাহেবের কাছে শুনেছিলাম যে ওই এলাকায় যারা জঙ্গলে নামে তাদের অনেকেই আর নাকি বাড়ি ফেরে না। তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে তার বাড়ির লোকদের মাথা কামিয়ে ফেলতে হয়, তাই জায়গাটি লোকমুখে চুলকাঠি নামে কুখ্যাত। তার পাশের ফরেস্ট ব্লকটির নাম ডুলিভাসানী। নদীটির নামও তাই। বহুকাল আগে কোনো এক সদ্যবিবাহিতা কন্যার ডুলি নদীতে ভেসে বা ডুবে যাওয়ার কারণে নদীটির বা ব্লকটির ওই রকম নাম। অনেকে অবশ্য ধুলিভাসানী নামেও ডেকে থাকেন। সুন্দরবনের অনেক জায়গা বা নদীর এরকম নাম দেখা যায়।
সে যাই হোক, জঙ্গলে নেমে কলেজে শেখানো গ্রিড লাইন টেনে সবাইকে বললাম লাইন ধরে এগিয়ে যেতে হবে। জলের ধারে কুমির ওঠানামার চিহ্ন বা উঁচু ঢিপি দেখলে যেন ইশারায় তারা আমায় ডাকে। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে তাই তাড়াতাড়ি করে আমরা কাজে নেমে পড়লাম। আমার পাশের লাইনে চক্রধর দাস। যাই হোক, সবাই যে যার কাজের লাইনে চলে গেল।
ঝির ঝির বাতাসে লম্বা সরু সরু গাছগুলো দুলছে আর সেগুলো দুহাত দিয়ে সরিয়ে আমি আর চক্রধর এগোচ্ছি। সুন্দরবনের কাদায় নেমে যারা হাঁটেননি তাদেরকে ঠিক বলে বোঝানো যাবে না এই এগিয়ে যাওয়াটা কত কষ্টের। কাদায় এক পা ডুবিয়ে অন্য পা’টিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে আবার সেই আগের পা’কে কাদার মধ্যে থেকে টেনে তুলে এগিয়ে যেতে হবে। এইভাবে এগোতে গেলে শক্তি, সাহস এবং অফুরন্ত উদ্যমের প্রয়োজন। এই দিকে চুলকাঠি ব্লকই হল বনভূমির শেষ। তারপর মাতলা নদী ও খানিক দূরে বঙ্গোপসাগর।
দিন আস্তে আস্তে বুড়ো হচ্ছিল। দুপুর গড়িয়ে এগিয়ে আসছিল বিকেল। চারিদিকে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শব্দ নেই। হঠাৎ মনে হল অনেক দূর থেকে কেউ যেন ডাকছে। কে ডাকছে? স্পষ্ট শুনছি কেউ যেন কাউকে ডাকছে। বহু দূর থেকে ভেসে আসা আর্তনাদের মতন সেই করুণ বিলাপের সুর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে মিশে যেতে যেতে যেন ছুঁয়ে গেল আমাকে। কী করুণ কেউ ডাক! আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। নাহ্, কোথাও তো কিছু নেই। সব তো চুপ। নির্জন নিস্তব্ধ এই অপরাহ্নে ঘাস আর ওপারের বড়ো বড়ো গাছপালার ফাঁকে সূর্যের আলো মাঝেমাঝেই বেরিয়ে এসে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। নিঝুম নিস্পন্দ বনভূমির মাঝে না দাঁড়িয়ে আবার চলতে চলতেই ডাকটা শুনতে চেষ্টা করলাম।
আবার একবার হঠাৎ করেই ভেসে এল সেই ডাক। চক্রধরের দিকে তাকাতে দেখলাম এক অজানা আশংকায় কালো হয়ে গেছে তার মুখ। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে দৌড়াতে লাগল নদীর দিকে। আর আমাকে ইশারায় দৌড়াতে বলল। ওর দৌড়োনো আর সেই হঠাৎ করে ভেসে আসা করুণ ডাক দুটোই আমাকে কী এক অজানা আশঙ্কায় বিভ্রান্ত করে তুলেছিল। দিকবিদিক ভুলে আমিও ওর পিছু নিলাম। সেই কাদার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া খুব কষ্টের। হাঁচোর পাঁচোর করে এগোনোর চেষ্টা করতে লাগলাম। সেই চেষ্টা করতে করতেই ভাবছিলাম, এখানে তো কোনো শব্দই নেই। তবে আমাদের মনের ভুল ছিল?
ইতিমধ্যেই যারা অন্যদিকে দূরে দূরে ছিল তাদের এদিকে ধেয়ে আসতে দেখলাম। জনা তিন-চারেক কাছে এসে পড়লে মনে মনে একটু শক্তি পেলাম। এবারে দলবেঁধে একসঙ্গে নদীর দিকে ফিরে চললাম সকলে।
খানিকক্ষণ এভাবে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেলে আরো লোকজনের গলা পাওয়া গেল। চক্রধরকে আরো জনা দু’তিনেকের সঙ্গে বড়ো মোটা লাঠি, নৌকার হাল ইত্যাদি নিয়ে এদিকেই আসতে দেখা গেল। কাছে এসে চক্রধর বলল, “স্যার একটু আসুন। এইদিকে একবার এসে দেখে যান!”
যেদিকে সে নির্দেশ করল সেখানে সবাই মিলে গিয়ে দেখে প্রাণ উড়ে যাবার জোগাড়! দেখি জঙ্গলে ঢোকার সময়কার আমাদের পায়ের ছাপের ওপর থাবা ফেলে ফেলে আমাদের অনুসরণ করে গেছেন স্বয়ং দক্ষিণরায়! ভয়ে পাথর হয়ে গেলাম। মনে হল হঠাৎ শরীর থেকে সব শক্তি যেন কেউ শুষে নিয়েছে। এক অজানা শক্তির কাছে হেরে গিয়ে তার কাছে আত্মসমর্পণ করছিলাম যেন।
এমন সময় মনে হল আমি বা আমরা একা নয়, বনের ভেতর থেকে কার অদৃশ্য দৃষ্টি যেন নিঃশব্দে নিরীক্ষণ করে যাচ্ছে আমাদের। জঙ্গলে চুপ করে থাকতে হয়। ইশারায় কথা বলতে হয়। কিন্তু তাৎক্ষণিক আতঙ্ক আমার চিন্তাশক্তিকে তখন অচেতন করে দিয়েছিল। এত কাছে বাঘের উপস্থিতি আমাকে শুধু নয়, আমাদের সকলকে এত ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছিল যে আমরা জঙ্গলের সব নিয়ম ভুলে সবাই মিলে গলা ছেড়ে চেঁচাতে থাকলাম। যেন অন্য কাউকে ভয় দেখাচ্ছি এইভাবে চিৎকার চিৎকার করতে করতে আমরা নদীর ধারে বোটের কাছে পৌঁছে গেলাম।
বোটগুলো দেখে আমাদের সম্বিৎ ফিরে এল। তবুও বনশ্রমিক মন্টু নায়েক, সুবল মণ্ডল তখনো না দেখতে পাওয়া অদৃশ্য বাঘের উদ্দেশ্যে তীব্র ও তীক্ষ্ণ মন্তব্যে তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে থাকল।
কোনোমতে বোটে উঠে পায়ের কাদা ধুতে গেলাম। এবারে তাড়াতাড়ি সরে যেতে হবে এখন থেকে। বোটের গলুইতে বসে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে মনে হল অদৃশ্য অসংখ্য নীরব চোখে কারা যেন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। জানি না কেন যে আমার এই রকম অনুভূতি হচ্ছিল তা আমি আজও ভুলিনি। ওদের ছায়া ছায়া দৃষ্টি যেন আমায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল। কোনো অজানা রহস্যের গোপন দ্বারে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত শিহরণে আমি ক্ষয়ে যাচ্ছিলাম।
চক্রধর বলল, “ডাক শুনে পেছনে তাকাতে নেই। আপনি আরো একটু হলেই পেছনদিকে ঘুরে যেতেন।”
আমি বললাম, “ ঘুরলে কী হত?”
চক্রধর আবার বলল, “উফফ। আপনি শোনেননি স্যার? বেগো ভূত ডাকছিল। ওরা তো দলে লোক চায়।”
“বেগো ভুত? কি সেটা?”জানতে চাই আমি চক্রধরের কাছে। আমার অজ্ঞতায় সে হাসে। বলে, “জঙ্গলে নামার পর যাদের বাঘে নিয়ে গেছে, তাদের তো আর সৎকার হয়নি। তারাই তো এখন বেগো ভুত হয়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। দলে লোক পেতে জ্যান্ত মানুষকে ডাকে। মা বনবিবি আমাদের আজ বাঁচিয়ে দিয়েছেন স্যার…”
দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে মা বনবিবিকে প্রণাম করে সে ফের বলে, ‘নয়তো আজ আমাদের কেউ হয়তো পড়ে যেত। বড়োমিঁয়া এত কাছে ছিল স্যার…আমার নাকে তো গন্ধ আসছিল।”
কতক্ষণ বিমূঢ় হয়ে বসেছিলাম জানি না, হঠাৎ দূরে বনরানি লঞ্চের আসার আওয়াজে আমরা ত্রস্ত হয়ে উঠলাম। আমাদের কাজ দেখতে ও পর্যালোচনা করতে স্বয়ং বিভাগীয় বন আধিকারিক মশাই নিজেই আসছেন। পরিষ্কার হয়ে তখন ওঁর সামনে যাওয়ার সুযোগ নেই। বনরানি সুন্দরবনের সব থেকে বড়ো বিভাগীয় জলযান। ডি এফ ও সাহেব ডেকের ওপর থেকে আমাদের দেখতে পেয়েছেন। লঞ্চ ড্রাইভার তলার ডেকে বেরিয়ে এসে আমায় বললেন, “যান, সাহেব আপনাকে ডাকছেন।”
এখনো পর্যন্ত কুমিরের ডিম খোঁজার যে দায়িত্ব আমাদের দেওয়া হয়েছিল, তাতে কোনো সাফল্য আসেনি। তাই আজকের দুপুরের ঘটনাটি সবিস্তারে ডি এফ ও সাহেবকে জানালাম। তিনি পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। তবুও আমার বর্ণনা তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর ঘটাতে পারল না। তিনি পূর্ববঙ্গীয় ভাষায় কথা বলতেন। আমার বৃত্তান্ত শুনে তিনি বিন্দুমাত্র উদ্বেগ না প্রকাশ করে বললেন, “হ্যার, কী যে কও তোমরা? এত ভয় পাও ক্যান? ঐডা বুইড়া বাঘ আছিল। কিছুই করত না।”
বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে