ভি.আই.পি. চিকিৎসা

বাঘটির আচরণ হঠাৎই যেন রহস্যময় হয়ে উঠেছে। আর তার ফলে গভীর এক আশঙ্কা জেগেছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের। সুদূর সুমাত্রা থেকে ওকে আনা হয়েছিল এই চিড়িয়াখানায়। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোটো বাঘ। তাই ওর আকর্ষণও যথেষ্ট। দর্শকদের ভিড় সারাদিন ওর খাঁচার সামনে। শুধু আকারে ছোট হওয়ার জন্যই নয়, এর আকর্ষণের আরও একটি কারণ আছে। সুমাত্রার এই ভয়ঙ্কর সুন্দর প্রাণীটি বিলুপ্ত হয়ে এসেছে পৃথিবী থেকে। বাঘটিকে বাঁচিয়ে রেখে সংখ্যা বাড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন ওঁরা। কিন্তু সেই চেষ্টাতেই বাধ সাধছে বাঘটির এই রহস্যময় আচরণ।
ব্যাপারটা প্রথম লক্ষ্ করেন বাঘটির পালক বা কিপার। সকালেই ওর খাঁচায় মাংস দেওয়া হয়। ক্ষুধার্ত বাঘটি জানে কোন পথ দিয়ে ওর খাবার বয়ে আনা হবে। তাই সকাল থেকেই সে প্রতীক্ষা করে খাবারের। একদৃষ্টে পথের দিকে তাকিয়ে। অবশেষে ওর খাঁচায় দেওয়া হয় মাংস। তখন বাঘটিকে খুবই উত্তেজিত দেখায়। দু-চারবার হাঁকডাক করে। ঘুরপাক খায় ওর খাবারের চারপাশে। ঘন ঘন মাংসের ঘ্রাণ নেওয়াতে লালা গড়িয়ে পড়তে থাকে ওর মুখ দিয়ে। ক্ষুধার্ত বাঘটিকে দেখা যায় আগ্রহের সঙ্গে মাংসে মুখ দিতে। এই পর্যন্ত ওর আচরণ দিব্যি স্বাভাবিক। চিড়িয়াখানার আর দশটা বাঘের মতোই। তবে ঠিক এর পরের আচরণই ভাবাচ্ছিল ওর কিপারকে। মাংসে মুখ দিয়েই বাঘটি মুখ সরিয়ে নিচ্ছে। চেষ্টা করেও মাংস চিবোতে পারছে না। এবং বিফল হয়ে ও চলে যাচ্ছে খাঁচার এক কোণে।
অরুচিই মনে হয়েছিল প্রথমে। বাঘেরও মাংসে অরুচি হয় মাঝে মাঝে। তখন ওকে দেওয়া হয় অন্য প্রাণীর মাংস। স্বাদ বদলালেই ওদের রুচি ফিরে আসে। এই বাঘটিকেও তেমনটি করা হল। গরুর বদলে দেওয়া হল ভেড়ার নরম মাংস। দৃশ্যতই বোঝা গেল মাংস দেখে ওর খাবার আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। তবু দৃশ্যটি শেষ পর্যন্ত একই রইল। খাবারে মুখ দিয়েই বাঘটি উঠে গেল খাঁচার এক কোণে।
কিপার আর দেরি করেননি। খবর দিয়েছিলেন চিড়িয়াখানার হাসপাতালে। অভিজ্ঞ পশুচিকিৎসকের একটি দল তখনই এলেন ওর খাঁচার সামনে। ওঁদের আদেশ মতো বাঘটিকে আবার মাংস দেওয়া হল। এবার একটা গোটা মুরগি। তবু বাঘটির আচরণ রইল আগের মতোই। নিশ্চিত হলেন পশুচিকিৎসকরা। মাংস চিবোতে গেলেই বেচারি ব্যথা পাচ্ছে। কারণ জানতে বাঘটির মুখগহ্বর এক্স-রে করতে চাইলেন ওঁরা। স্কুইজ কেজে (হাতল ঘুরিয়ে ছোট-বড় করা যায় এমন একটি খাঁচা) বাঘটিকে নিয়ে এঁরা পরীক্ষা করেছিলেন প্রথমে। কিন্তু ফল না পাওয়াতে অবশেষে এক্স-রে করাই ঠিক হল। ফল পাওয়া গেল হাতেনাতে। দুটি দাঁতের ভেতর মাড়ির মাঝে ফুটেছিল একটি হাড়ের কুঁচি। ফলে অহরহ দারুণ যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছিল বাঘটি। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছিল না-খাওয়ার কষ্টও। অপারেশন করে বার করে দেওয়া হল হাড়ের কুঁচি। বাঘটিকে দেওয়া হতে থাকল পেনিসিলিন ইনজেক্শন। অল্প ক’দিনর মধ্যেই বাঘটি ফিরে পেল তার সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন।
ঘটনাটি বছর দুয়েক আগেকার। তবে আরও একশ বছর আগে এমন ঘটনা ঘটলে বাঘটির কপালে ছিল নিশ্চিত মৃত্যু। রোগ না ধরা পড়ার জন্য তো বটেই, তবে পড়লেও তখনকার দিনে ওদের এমনভাবে চিকিৎসা হত না। অসুখে ভুগেই মারা পড়তো বাঘটি। বেশিদিন ওকে ভুগতে দেওয়া হত না অবশ্য। কিছুদিনের মধ্যেই ওকে দেওয়া হত মৃত্যুদণ্ড।
তখন পৃথিবীতে মানুষ ছিল কম। প্রাচুর্য ছিল বন আর জঙ্গলের। জঙ্গলে প্রাণার সংখ্যাও ছিল অনেক। আজকের মতো এমন অমূল্য হয়ে ওঠেনি ওরা। তাই জঙ্গল থেকে প্রাণী ধরে আনা হত। রাখা হত চিড়িয়াখানার নিছক বিনোদনের জন্য। প্রাকৃতিক নিয়মেই এইসব পশুপাখি কখনও বা অসুস্থ হয়ে পড়ত। চিকিৎসা হত বটে, তবে তা ছিল সেই ‘লাগে তুক না লাগে তাক’ গোছের। ওষুধে কাজ হলে লিখে রাখা হত সে অভিজ্ঞতার কথা। ফল বিপরীত হলে, অসুস্থ প্রাণীটিকে দেওয়া হত মৃত্যুদণ্ড বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। বুলেট অথবা বিষের সাহায্যে মৃত্যু ত্বরান্বিত করা হত। শুধু অসুস্থ নয়, মারাত্মকভাবে আহত প্রাণীর বেলাতেও ছিল ঐ একই দণ্ড। পৃথিবীর চিড়িয়াখানাতে এমন ঘটনা ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক।
তবে সে সব ঘটনা এখন ধূসর অতীত। ইতিহাসের কোনো অধ্যায় নয়, বরং ফুটনোট। পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই ঘটেছে এই বদল। পালটে গেছে পরিবেশও। অনেকই অদল-বদল ঘটেছে মানুষের ধ্যানধারণার। কখনও সে ধারণা গড়ে উঠেছে অর্জিত অভিজ্ঞতায়, আবার কখনও তা গড়তে সাহায্য করেছে বিজ্ঞান।
এই যেমন চিড়িয়াখানা। নিছক মজা আর বিনোদনের জন্যই যার গোড়াপত্তন বহু হাজার বছর আগে। সে ধারণা ধীরে ধীরে বদলে গেল মানুষের। বনজঙ্গল ধ্বংস হওয়া এবং জঙ্গলের জীবজন্তু অতি দ্রুত হারে কমতে থাকায় চিড়িয়াখানাই এখন বেশ কিছু প্রাণীর নিশ্চিত আশ্রয়। জীববিজ্ঞানীদের গবেষণাগারও। দুষ্প্রাপ্য প্রাণীদের সংরক্ষণ এবং তাদের বাড়িয়ে তোলার মতো দুরূহ ব্যাপার নীরবে ঘটে চলছে পৃথিবীর অনেক চিড়িয়াখানাতেই। শুরু হয়েছে বিনোদনের মাধ্যমে প্রকৃতি-পাঠের মজা। মানুষের ভবিষ্যতের অস্তিত্ব যে জড়িয়ে আছে ওদের জীবনের সঙ্গে, সে চেতনা জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব এখন চিড়িয়াখানার।
ওরা তাই আর নেহাতই জঙ্গলের জানোয়ার নয়। বরং চিড়িয়াখানার এক একটি ভি.আই.পি। তীক্ষ্ণ নজর রাখা হয় ওদের খাওয়া-দাওয়া, স্বাস্থ্য, এমন কি হাঁটাচলার ওপরে। তবু মৃত্যু ঘটে। রোগ-বালাই কিংবা চোট-আঘাতের ফলে মারা যায় বেশ কিছু পশুপাখি। প্রকৃতির অমোঘ বিধান হলেও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করতে হয় প্রতিটি ক্ষেত্রেই। সারা পৃথিবীর চিড়িয়াখানাগুলিতে এখন বলবৎ হয়েছে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম। প্রতিটি মৃত প্রাণীর ময়না- তদন্ত করতে হবে। যাতে একইভাবে অন্য কোনো প্রাণীর আর না মৃত্যু ঘটে।
চিকিৎসার গোড়ার কথা রোগনির্ণয়। অসুখ কিংবা আঘাতের সঠিক উৎসটি জানলে সুবিধে হয় ডাক্তারদের। এ ব্যাপারেও বিজ্ঞান বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের শক্তিশালী হাত। রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি অনেক সহজ করে দিচ্ছে ডাক্তারদের কাজ। অসুখ-বিসুখ ধরা পড়ছে গোড়াতেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। সঠিক ওষুধে আরোগ্যলাভ তাই অনেকই সহজ হয়েছে আগের তুলনায়। এবং এই জন্য গড় আয়ুও বেশ খানিকটা বেড়ে গেছে মানুষের। আর ঠিক একই ব্যবস্থা কাজে লাগানো হচ্ছে চিড়িয়াখানাতেও। আমাদের দেশে ততটা না হলেও ইউরোপ এবং আমেরিকার বহু চিড়িয়াখানায় খোলা হয়েছে রীতিমতো পলিক্লিনিক। সুসজ্জিত এইসব ক্লিনিকে রয়েছে অপারেশন থিয়েটার, রোগ-নির্ণয়ের নানা জটিল এবং অত্যন্ত দামী যন্ত্রপাতি। রয়েছে রক্ত, মলমূত্র এবং আরও অনেক রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা। সম্পূর্ণ শীততাপ-নিয়ন্ত্রিত এই সব ক্লিনিকে হঠাৎ ঢুকে পড়লে মনে হয় বুঝি কোনো অভিজাতদের নার্সিংহোম। এঘর-ওঘর করতে করতে তারপর হঠাৎই চমক লাগে, রেডিওলজির ঘরে যখন দেখা যায় এক্স-রে মেশিনের তলায় নিশ্চল হয়ে শুয়ে আছে মস্ত একটি ডোরাকাটা বাঘ। কখনও কখনও আশ্চর্য রকমের কাণ্ড ঘটিয়ে খবরের কাগজের শিরোনামে চলে আসেন এখানকার ডাক্তার এবং এইসব যন্ত্রপাতির অতি দক্ষ যন্ত্রবিদরা। দেশ বিদেশের টেলিভিশনে দেখানো হয় ওঁদের আশ্চর্য সব কাণ্ডকারখানা। আর তা দেখে বিস্মিত হন সাধারণ মানুষ।
বিস্মিত হওয়ার মতো ঘটনা এখানে ঘটে চলেছে অহরহ। আর তার প্রধান কারণ এখানকার রোগীরা। মাত্রই দশ গ্রাম ওজনের হামিং বার্ড থেকে শুরু করে চার হাজার কেজির অতিকায় হাতি। শুধু চেহারাতে নয়, মেজাজ- মর্জিতেও ওদের ফারাক অনেক। নখ, দাঁত কিংবা জোরালো লাথির শিকার মাঝে-মধ্যেই হতে হয় এখানকার কর্মীদের। তবু তাঁরা আনন্দ পান এই কাজে। সে আনন্দ এক মহান অভীষ্ট পূরণের। এবং সেই সঙ্গে এক বিপদভরা বৈচিত্র্য আস্বাদনের। .
বৈচিত্র্যে ভরা অবশ্য ঐসব চিড়িয়াখানার ক্লিনিকগুলিও। বিশেষ করে যে ঘরটিতে রয়েছে ওদের এক্স-রে তোলার মেশিন। চেহারা বা কাজে মেশিনটি মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যন্ত্রের মতোই। তবে মেশিনের টেবিলটিকে এঁরা যথেষ্ট মজবুত করে নিয়েছেন। যাতে সেখানে আড়াইশো কেজি পর্যন্ত ওজনের যে কোনো প্রাণীকে শোয়ানো যেতে পারে। আর এরপরই শুরু হয় এই ঘরের সবচেয়ে কঠিনতম কাজটি। তা হল অসুস্থ প্রাণীটিকে সঠিক অবস্থানে রাখা। ওদের শরীরের গঠন এক এক ক্ষেত্রে এক এক রকম। তাই প্রাণী অনুযায়ী পাল্টে যায় অবস্থান। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছবি নেওয়া হয় প্রাণীটির Ventral-Dorsal বা পেট ওপরে, পিঠ নীচের দিকে রাখা অবস্থায়। প্রয়োজনে Lateral views অর্থাৎ পাশ থেকেও ছবি তোলা হতে পারে। কিন্তু, ‘নিঃশ্বাস বন্ধ করুন’ কিংবা ‘পাশ ফিরে থাকুন’ বলা যায় না ওদের। তাই বেশির ভাগ প্রাণীকেই অজ্ঞান করে নেওয়া হয় ওষুধের সাহায্যে।
যে প্রাণীটিকে এক্স রে করতে ওঁদের সবচেয়ে অসুবিধে হয় তা হল সাপ। বিষহীন সাপেদের ক্ষেত্রে ততটা অবশ্য নয় যতটা অসুবিধে হয় বিষাক্ত সাপেদের ক্ষেত্রে। হাতে ধরা যায় না বলেই ওদের নিশ্চল করে রাখাটা এক ঘোরতর সমস্যা। ডাক্তাররা ওষুধের সাহায্যে সাপেদের অজ্ঞান করতে চান না। কেননা জ্ঞান ফিরতে ওদের অনেক সময় লাগে। বিষয়র সাপেদের ঐজনাই ভরে নেওয়া হয় প্লেক্সিগ্লাসের একটি টিউবের মধ্যে। টিউবের এক প্রান্ত দিয়ে অতি সামান্য মাত্রায় চেতনানাশক গ্যাস ঢুকিয়ে আচ্ছন্ন করে দেওয়া হয় বিষাক্ত সাপটিকে।
খুব লম্বা সাপের ক্ষেত্রে অসুবিধে আবার অন্যরকম। এই সেদিন যেমন ঘটল একটা ঘটনা। একটি মস্ত অজগরকে আনা হয়েছে ক্লিনিকে। ডাক্তারেরা সন্দেহ করছিলেন সাপটির ফুসফুসে সংক্রমণ হয়েছে। সাপটিকে বাঁধা হল এক্স-রে টেবিলে। সম্পূর্ণ শরীর এল না অবশ্য। সামনের এবং শরীরের পিছনের বেশ খানিকটা রইল টেবিলের বাইরে। সাপের ফুসফুস এক্স-রে করার অভিজ্ঞতা ওঁদের সেই প্রথম।
একটা নয়, পরপর আটখানা ছবি নিতে হল সাপটির সম্পূর্ণ ফুসফুসের ছবি তুলতে গিয়ে। ওদের চেহারা কৌণিক বলে ফুসফুসও হয় সেই অনুপাতে লম্বা। অত লম্বা ফুসফুস এক্স-রে ক্যামেরার সামনে আঁটছিল না। তাই ওকে সরিয়ে সরিয়ে এক্স-রে করতে থাকলেন ক্লিনিকের কর্মীরা। প্রতিবারই শরীরের যেটুকু অংশের ছবি উঠছিল সেইটুকু অংশকে চিহ্নিত করে দেওয়া হচ্ছিল একটি রঙিন ফিতে বেঁধে। তবু এত রকমের প্রচেষ্টাও কখনও কখনও বিফলে যায়। ছবি আশানুরূপ ওঠে না। আর তার জন্য দায়ী ওদের শরীর। ওদের শরীরের বেশির ভাগটুকু মাংসপেশী বলেই এক্স-রে ছবি ওঠে খুব নীচুমানের।
প্রায় সমস্ত রকম সাপের ক্ষেত্রেই এক্স-রে করার সময় বাছা হয় খুব সকালে। ওরা ঠান্ডা রক্তের প্রাণী। উত্তাপ পেলে ওদের রক্ত গরম হয়। এবং ওরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। কাজেই দিনের সবচেয়ে ঠান্ডা সময়ে এক্স-রে করলে কাজটি সুবিধেজনক হয়। সরীসৃপ গোত্রীয় প্রাণীরা হামেশাই অস্থি সংক্রান্ত রোগে ভোগে। ওদের অস্থি বা হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষার জন্য প্রায়ই এক্স-রে করতে হয়। ওদের জন্য ব্যবহৃত হয় Mamography Film |
মস্ত ময়ালটির পর এক্স-রে টেবিলে নিয়ে আসা হল পরবর্তী রোগীকে। যার ওজন সাকুল্যে দশ গ্রাম। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্র পাখি এই হামিং বার্ডটির শ্বাসনালীতে সংক্রমণ আশঙ্কা করছিলেন চিকিৎসকরা। ছোট্ট পাখিটিকে আঠালো কাগজ দিয়ে আটকে দেওয়া হল একেবারে ফিল্ম ক্যাসেটের ওপর। দু’দিকে দুটি ডানা এবং পুচ্ছটিকে আটকে দিতে পাখিটি নিশ্চল হয়ে রইল। শ্বাসনালীর ছবি নেওয়া সম্ভব হল ওর। ফিল্ম ডেভেলপ করার পর দেখা গেল ডাক্তারদের আশঙ্কাই সত্যি।
আরও একটি কারণে পাখিদের এক্স-রে করা হয় প্রায়ই। এই যেমন করা হল একটি অসামান্য সুন্দর ভারতীয় পাখিকে। ইংরেজিতে পাখিটির নাম ফেয়ারি ব্লু বার্ড। বাংলায় তার নামকরণ করা হয়েছে নীলপরী। নীলপরীর সৌন্দর্যকে আরও শ্রীমণ্ডিত করেছে তার অতি মিষ্টি কণ্ঠস্বর। বর্তমানে এরা দুর্লভ হয়ে আসছে। সেই কারণেই বিদেশের চিড়িয়াখানায় চেষ্টা চলছিল নীলপরীর সংরক্ষণের। পাখিটির ডিম নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বারেবারে। তাই ডিম পাড়ার ঠিক আগে ওকে আনা হল ক্লিনিকে, এক্স-রে করে ডিমের ভেতরে থাকা বাচ্চাটির অবস্থান দেখে নিতে। ওর এক্স- রেও করা হল ঠিক ঐ হামিং বার্ডেরই মতো। পাখিদের এক্স-রে করতেও ওঁরা ব্যবহার করেন Mamography Film
কখনও ওঁদের ডাক পড়ে সরাসরি পশুদের থাকার জায়গায়। বিশেষ করে অতিকায় জানোয়ারদের ক্ষেত্রে। ওঁদের বহনযোগ্য এক্স-রে ইউনিটও তাই রাখতে হয়েছে। একটি গয়ালের (গরু জাতীয় প্রাণী) বাচ্চা অসাবধানে লাথি ছুঁড়ে চোট পেয়েছিল পায়ে। জানোয়ারটি শান্ত এবং পোষমানা বলে সরাসরি ওর থাকার জায়গাটিতে ঢুকে পড়লেন এক্স- রে ইউনিটের সবাই। ওর মুখে দুধের একটি পাত্র ধরতেই স্থির হয়ে দুধ খেতে লাগল গয়ালটি। আর সেই সুযোগে নির্বিঘ্নে ছবি নেওয়া হল ওর চোট পাওয়া পায়ের।
তবে গণ্ডারের ক্ষেত্রে ওর মুখে দুধের পাত্র ধরা একটু বাড়াবাড়ি ধরনের সাহস হয়ে যায়। তবু ওকে এক্স-রে করতে গেলে ঢুকতে হবে ওর ঘেরা জায়গাতে। দূর থেকে ডার্টগান ছুঁড়ে গণ্ডারটিকে অজ্ঞান করে দেওয়া হয় প্রথমে। তারপর যন্ত্রের সাহায্যে নির্দিষ্ট অবস্থানে এনে প্রয়োজনমতো এক্স-রে সেরে নেওয়া হয়। কাজ সারা হওয়ার পরও ওয়াকি-টকি হাতে দুজন থেকে যান গণ্ডারটির কাছে। ফিল্ম পাঠিয়ে দেওয়া হয় ক্লিনিকে। চটজলদি ডেভেলপ করিয়ে দেখে নেওয়া হয় ছবি ঠিক উঠেছে কিনা। না উঠলে ওয়াকি-টকির মাধ্যমে খবর যায়। ফের নতুনভাবে এক্স- রে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
চিড়িয়াখানার হাজার রকমের বাসিন্দাদের মধ্যে যে প্রাণীটির এক্স-রে করতে ওঁরা সবচেয়ে স্বস্তি বোধ করেন সেটি হল কচ্ছপ। মাঝে-মধ্যেই শ্বাসকষ্টে ভোগে এই প্রাণীগুলি। তখন ওদের ফুসফুসের জলীয় অংশ পরীক্ষা করতে প্রয়োজন হয় এক্স-রের। টেবিলের ওপর কচ্ছপটিকে রেখে উল্টে দিলেই প্রাণীটি স্থির হয়ে পড়ে থাকে পাথরের মতো। আর সেই অবস্থায় এক্স-রে করা হতে থাকে ধীরেসুস্থে।
নানা ধরনের প্রাণী এই ঘরটিতে আসে বলে আজকাল একটি তালিকা ঝোলানো থাকছে। তাতে উল্লেখ থাকছে নানা তথ্যের। যেমন কোন কোন প্রাণীর বেলায় কেমনভাবে রাখা হবে এক্স-রে মেশিনটি এবং কেমন হবে প্রাণীটির অবস্থান। এ ছাড়াও উল্লেখ থাকে প্রাণীদের শরীরবৃত্তান্ত।
রোগ এবং চোট-আঘাতের বেলায় এক্স-রেই অবশ্য শেষ কথা নয়। বেশ কিছু রোগ কিংবা আঘাতের ছবি ধরা পড়ে না এক্স-রের ফিল্মে। তখন ডাক্তাররা নির্ভর করেন আরও উন্নত এবং ব্যয়বহুল রোগনির্ণয় পদ্ধতির ওপর। যেমন আলট্রা-সোনোগ্রাফি কিংবা MRI Scanning । চিড়িয়াখানার জীবজন্তুদের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে এইসব অত্যাধুনিক পদ্ধতি— একটি বিরল জাতের সামুদ্রিক কাছিমের বেলায় যেমনটি ঘটেছিল একবার।
খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করতেই চিকিৎসকরা পরীক্ষা করেছিলেন কাছিমটিকে। এক্স-রে নেওয়া হয়েছিল ওর সারা শরীরের। প্রতি ক্ষেত্রেই ছবি ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তাই ওকে নিয়ে যাওয়া হল স্ক্যানিং রুমে। আলট্রা- সোনোগ্রাফিতে অবশেষে রোগ ধরা পড়ল। মনিটরের পর্দায় দেখা গেল ওর পিত্তথলিতে ছোট ছোট কয়েকটি পাথর জমে আছে।
মরতে বসেছিল একটি দু-বছর বয়সের ওরাংওটাং। ওর শারীরিক অস্বস্তি যখন কিছুতেই কমানো যাচ্ছিল না, তখন এই আলট্রা-সোনোগ্রাফির সাহায্যে দেখা গেল প্রাণীটির হৃদযন্ত্রে একটি ফুটো রয়েছে তার জন্ম থেকেই। সুদীর্ঘ সময় নিয়ে অপারেশন করেছিলেন সার্জনরা। ওরাংওটাংকে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ করে দেশবিদেশের খবর হয়েছিলেন ক্লিনিকের সার্জন এবং কর্মীরা।
আলট্রা-সোনোগ্রাফির কর্মকুশলতা বহুক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। সেক্ষেত্রে ডাক্তাররা নির্ভর করেন Magnetic Resonance Image বা MRI Scanning-এর ওপর। প্রয়োজনে গোটা শরীরের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা যায় এই যন্ত্রটির সাহায্যে। অতি মহার্ঘ এই যন্ত্রটি এখন কোনো চিড়িয়াখানার ক্লিনিকে বসেনি বটে, তবে প্রয়োজনে ওঁরা যোগাযোগ করেন সেই সব রোগনির্ণয় কেন্দ্রের সঙ্গে যেখানে মানুষের জন্য এই যন্ত্রকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা একটি কোয়ালা হঠাৎ কেমন আড়ষ্টভাবে চলাফেরা শুরু করল। ক’দিন পরে দেখা গেল খাওয়া বন্ধ করেছে সে। কোনো প্রাণী খাওয়া বন্ধ করা মানেই তার অসুস্থতা। চলাফেরায় অসুবিধে বোধ করলে ধরে নেওয়া হয় কোনো চোট বা আঘাত পেয়েছে বোধহয় প্রাণীটি। চিড়িয়াখানার প্রায় সমস্ত প্রাণীরই রোগ কিংবা আঘাত দৃশ্যত ধরা পড়ে এইভাবে। দুর্লভ জাতের এই প্রাণীটিকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হল বটে তবে সুবিধে হল না কিছুই। অবশেষে ওকে নিয়ে যাওয়া হল একটি ডিটেকশন সেন্টার বা রোগনির্ণয় কেন্দ্রে। সারা শরীরের স্ক্যানিং করলেন ডাক্তাররা। দেখা গেল কোয়ালাটির ডান চোখের ঠিক পেছনে একটি টিউমার হয়েছে। রোগ ধরা পড়ার পরই অপারেশন হল। টিউমার বার করে করা হল বায়োপ্সি। ক্যান্সার নয় জেনে নিশ্চিন্ত হলেন ডাক্তাররা এবং চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করতেই কোয়ালাটিকে ফিরিয়ে দেওয়া হল নিজস্ব জায়গায়।
এইভাবে অনবরত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন চিড়িয়াখানার ক্লিনিকের ডাক্তার, সার্জন, অ্যানাসথেসিস্ট এবং যন্ত্রপাতি পরিচালনা করার সুদক্ষ কর্মীরা। ওঁরা কাজ করেন মিলেমিশে। যেন খ্যাতনামা কোনো একটি খেলার দল। জীবজন্তুদের মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে ওঁরা লড়ে যান সমস্ত শক্তি দিয়ে, যে শক্তির উৎস জীবজন্তুর প্রতি ভালবাসা এবং গভীর মমত্ববোধ। খেলার মতোই এ লড়াইতেও আছে হারজিৎ। কখনও মৃত্যু তার পাওনা বুঝে নিয়ে চলে যায়, আবার কখনও বেঁচে ওঠে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কোনো প্রাণী। আর তাতেই অতি কঠিন এক ট্রফি জেতার আনন্দ পান ওঁরা। না-মানুষের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত রাখতে এইভাবেই শুরু হয়েছে সংগ্রাম। পথ দেখাচ্ছেন ওঁরা বিজ্ঞানের সাহায্যে। তবে দায়িত্ব বাড়ছে সাধারণ মানুষের। মুষ্টিমেয় কয়েকজনের প্রচেষ্টা সার্থক হবে, যদি পৃথিবীর মানুষ বোঝে জীবজন্তুদের বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজেদেরই আয়ু বাড়ানো। এই সরল অথচ ধ্রুব সত্যটি আর কবে ভাববে মানুষ ?