বৈজ্ঞানিকের দপ্তর -বিজ্ঞানের গল্প- অ্যাটমোবাবু কাবু-সৌম্যকান্তি জানা-শীত২০২১

সৌম্যকান্তি জানা-র আগের লেখা- ক্লোরোফিল চোর, বঁটিঝাঁপের মেলায়, রঙবদল, অবচেতন মনের আয়না, হাওয়া বাবা হাওয়া

bigganletturdagolpo

(এক)

ঘোষেদের পুকুরের উত্তর-পশ্চিম কোণে অশ্বত্থগাছের তলায় লেট্টুদের সেদিনের আড্ডা বসেছে বুধবার বিকেলে। রোববারের আড্ডা বুধবারে বসার কারণ বৃহস্পতিবার মহাষষ্ঠী। সোমবার দশমী পর্যন্ত আড্ডার ছুটি। লেট্টুর তেমন আগ্রহ না থাকলেও ষষ্ঠী থেকে নবমী প্রতিদিন প্রতিমা দর্শনে না গেলে বুবাই, কেতো, পুচকু, টুকুন আর মেনাল্ডোর চলবে না। তবে এই চারদিনের মধ্যে একটা দিন অবশ্যই লেট্টুর সঙ্গে যাওয়া বরাদ্দ। আর সেটা অষ্টমীর রাতে। রাত দশটা বাজলে তবেই লেট্টু বেরোয়। ভিড়-ভাট্টা লেট্টুর খুব অপছন্দ। বেশ কয়েক বছর আগে অষ্টমীর সন্ধ্যায় প্রতিমা দর্শনে গিয়ে মানি-ব্যাগসহ সত্তর টাকা খুইয়েছিল। তারপর থেকে সে সন্ধেবেলা আর বেরোয় না।

লেট্টুদের সেদিনের আড্ডার বিষয় হল আই.পি.এল। ধোনির আর খেলা উচিত নাকি অনুচিত এ নিয়ে বেশ তর্কবিতর্ক জুড়েছে পুচকুরা। পুচকু আর বুবাই একদিকে, কেতো আর টুকুন একদিকে। পুচকু আর বুবাই ধোনিকে নিয়ে ব্যঙ্গ করতেই কেতো আর টুকুন ওদের এই মারে তো সেই মারে! লেট্টু কোনোদিন এসব বিতর্কে মতামত দেয় না, রেফারির ভূমিকায় থাকে। মেনাল্ডোর আবার ক্রিকেটে তেমন আগ্রহ নেই। সে চুপচাপই ছিল। বিতর্কের উত্তেজনার মাঝে হঠাৎই লেট্টুর উদ্দেশে বলল, “লেট্টুদা, অষ্টমীতে তোমরা ঠাকুর দেখতে যেও। আমি যেতে পারব না।”

লেট্টু কিছু বলার আগেই টুকুন টেঁটিয়ে উঠল, “তুই বড্ড বেরসিক মেনাল্ডো। দেখছিস বুবাই আর পুচকু ধোনিকে কী অপমানটাই না করছে, আর তোর এখন ঠাকুর দেখার কথা মনে পড়ছে!”

“তুই থাম তো!” টুকুনকে থামিয়ে দিয়ে লেট্টু গম্ভীর গলায় বলল, “তা কারণটা কি জানতে পারি?”

“আমেরিকা থেকে আমার এক কাকু আসবে আগামীকাল। চারদিন থাকবে আমাদের বাড়ি।”

“আমেরিকায় তোর কোনও কাকু থাকে বলে তো শুনিনি কোনোদিন!” বুবাই জানতে চাইল।

“আমার নিজের কাকু না, সেজোদাদুর ছোটো ছেলে, অ্যাটমোকাকু।”

মেনাল্ডোর কথা শুনে মুখ টিপে হেসে উঠল টুকুন, কেতো আর পুচকু।

“অ্যাটমোকাকু, নাকি অ্যাটমকাকু রে?” টুকুন হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করল।

“দ্যাখ, না জেনে ইনসাল্ট করবি না।” মেনাল্ডো গম্ভীর। বেশ প্রেস্টিজে লেগেছে ওদের হাসাহাসি।

“না, মানে এমন আজব নাম তো শুনিনি, তাই।” টুকুন যথাসম্ভব হাসি চেপে বলল।

“তুই কি সবজান্তা নাকি?”

“ঝগড়া থামিয়ে আসল কথাটা কী বল।” লেট্টু গম্ভীর স্বরে মেনাল্ডোকে বলল।

এরপর মেনাল্ডো যা বলল, ব্যাপারটা এইরকম। অ্যাটমোকাকুর আসল নাম আত্মারাম। আত্মা মার্কিন দেশের জল-হাওয়ায় একটু পালটে হয়ে গেছে অ্যাটমো। তা অ্যাটমোকাকু নাকি ছাত্র হিসেবে ছিলেন বেশ মেধাবী। ফিলোজফিতে এম.এ পাশ করে গবেষণার জন্য আমেরিকায় যান। তারপর থেকে ওখানের বাসিন্দা। বিয়ে-থা করেননি। মেনাল্ডো শুনেছে, অ্যাটমোকাকু ওখানে নাকি কীসের ব্যাবসা করেন। চার-পাঁচ বছর পর পর একবার দেশে ফেরেন। এক-একবার এক-এক আত্মীয়ের বাড়িতে ওঠেন। এবারে আসছেন মেনাল্ডোদের বাড়ি। এই অ্যাটমোকাকু নাকি এক অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি নাকি বিখ্যাত মানুষদের আত্মাকে হাজির করাতে পারেন প্ল্যানচেটের মাধ্যমে।

“জানো লেট্টুদা, মা বলছিল, অ্যাটমোকাকু নাকি আমেরিকায় প্ল্যানচেট করে লিঙ্কন, মেরিলিন মনরো, মাইকেল জ্যাকসন, আরও অনেক নামি মানুষের আত্মাকে নিয়ে এসেছে। আমেরিকায় তো হইচই ফেলে দিয়েছিল অ্যাটমোকাকু।”

“তাই নাকি? তাহলে তো তোর অ্যাটমোকাকুকে দেখতেই হচ্ছে।” লেট্টু বেশ উৎসাহী হয়ে উঠল।

“সত্যি লেট্টুদা? কোনও অসুবিধে নেই। কবে আসবে বলো আমাদের বাড়ি।” মেনাল্ডোর গলায় বাড়তি উচ্ছ্বাস।

“অষ্টমীর সন্ধ্যায়। কী বলিস তোরা?” লেট্টু বুবাইদের দিকে ফিরে বলল।

“তাহলে অষ্টমীতে ঠাকুর দেখার কী হবে?” বুবাই জানতে চাইল।

“হবে না। একবছর ঠাকুর না দেখলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। অ্যাটমোকাকুকে কি আর পাওয়া যাবে? তাই আর কোনও কথা নয়।”

বুবাইরা জানে, লেট্টুর মুখ দিয়ে একবার যখন বেরিয়ে গেছে যে অষ্টমীর সন্ধ্যায় মেনাল্ডোদের বাড়ি যাওয়া হবে তখন তা নড়চড় হবার নয়।

“সো গাইজ! শুক্কুরবার রাত আটটায় মেনাল্ডোদের বাড়িতে আমরা সবাই যাচ্ছি। আলরাইট?” সাইকেলে উঠতে উঠতে কথাগুলো বলে হুস করে বেরিয়ে গেল লেট্টু।

(দুই)

লেট্টু দরজার বাইরে থেকেই শুনতে পেল ভরাট গলায় একজন বলছে, “ডু নট প্রে ফর ইজি লাইভস, প্রে ফর স্ট্রংগার মেন। দিস ইজ আ ফেমাস ডায়লগ। হু ক্যান সে? এনিবডি? কেউ পারবে?”

পর্দা সরিয়ে মুখটা দেখাতেই মেনাল্ডো চেঁচিয়ে উঠল, “এই তো লেট্টুদা এসে গেছে!”

“এসো বাবা, এসো। আমরা তো তোমার কথাই ভাবছিলুম বাবা!” মেনাল্ডোর মায়ের সস্নেহ আহ্বান।

লেট্টু দেখে তার আগেই পৌঁছে গেছে পুচকু, কেতো, টুকুন আর বুবাই। মেনাল্ডোর বাবা-মাকে লেট্টু চেনে। সোফায় সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, টুকটুকে ফর্সা, একগাল কাঁচাপাকা দাড়ি ও লম্বা কাঁচাপাকা চুলের যে মধ্যবয়সি ভদ্রলোক কথা বন্ধ করে চশমার ওপর দিয়ে লেট্টুর দিকে তাকিয়ে আছেন, তিনিই যে মেনাল্ডোর অ্যাটমোকাকু, সে ব্যাপারে লেট্টু নিশ্চিত।

“লেট্টুদা, এ হল আমার অ্যাটমোকাকু, যাঁর কথা তোমায় বলেছিলাম।” মেনাল্ডো চিনিয়ে দিল।

লেট্টু অ্যাটমোকাকুর পায়ে হাত ছোঁয়াতে নীচু হতেই দু-হাত ধরে ফেললেন–“ওহ্‌ নো মাই বয়! ওকে। স্টে ব্লেসড।”

“কাকু, এ হল লেট্টুদা। আমাদের ফ্রেন্ড, ফিলোজফার, গাইড।” খুব গর্ব করে মেনাল্ডো বলল।

“ওহ্‌, আই সি! নাইস টু মিট ইউ মাই বয়!” খুব যান্ত্রিকভাবে অ্যাটমোকাকু কথাগুলো বললেন। “হ্যাঁ, যা বলছিলাম। হুজ ডায়লগ ওয়াজ দ্যাট?”

মেনাল্ডো-পুচকুরা তখন এ-ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে।

“ডু ইউ ওয়ান্ট এনি ক্লু?” অ্যাটমোকাকুর ঠোঁটের কোণে হাসি।

“দাও, দাও।” হামলে পড়ল মেনাল্ডো।

“হি ওয়াজ থার্টি ফিফথ ইউ.এস প্রেসিডেন্ট। নাউ, হু ক্যান গেস? এনিবডি?”

সবাই ভাবতে লাগল। এমনকি মেনাল্ডোর বাবাও। তিনি অঙ্কের শিক্ষক। বেশ কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল। হঠাৎই লেট্টু নীরবতা ভেঙে বলে উঠল, “আমি বলতে পারি?”

“হোয়াই নট? বলো দেখি।” অ্যাটমোকাকুর গোঁফের ফাঁকে মুচকি হাসি।

লেট্টু বেশ গম্ভীর হয়ে বলল, “জন এফ. কেনেডি।”

“কী করে জানলে? তুমি তো পুরো প্রশ্নটা শোনোইনি!” মেনাল্ডো বলে উঠল।

“আমি ঘরে ঢোকার সময় দরজার বাইরে থেকে শুনেছি। তারপর এই ক্লু।” লেট্টুর গলায় আত্মবিশ্বাস।

“দ্যাটস রাইট! ফ্যান্টাস্টিক! ব্রেভো মাই বয়।” অ্যাটমোকাকুর চোখদুটো চশমার কাচের মধ্যে দিয়ে চকচক করে উঠল।

লেট্টু নিরুত্তাপ থাকলেও লেট্টুর গর্বে মেনাল্ডোদের মুখ খুশিতে চকচক করে উঠল।

অ্যাটমোকাকু বললেন, “হি ওয়াজ আ গ্রেট প্রেসিডেন্ট অফ ইউ.এস, আ গ্রেট পলিটিক্যাল রিফর্মার।”

মুখের কথা কেড়ে ফোড়ন কাটল লেট্টু, “মাফ করবেন কাকু, আমি তা মনে করি না।”

অ্যাটমোকাকুর ভ্রূ কুঁচকে গেল। ছেলেটা বলে কী? মেনাল্ডোর বাবা-মাও তখন লেট্টুর দিকে তাকিয়ে।

“যিনি কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন, যিনি ভিয়েতনামে কমিউনিস্টদের উৎখাত করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন, তিনি গ্রেট? তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও তো ছিল কলঙ্কজনক।” লেট্টু কথাগুলো যখন বলছিল সবাই হাঁ করে তার কথা শুনছিল। লেট্টু এত জানে? গর্বে বুক ফুলে উঠল মেনাল্ডোদের।

অ্যাটমোকাকু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। মেনাল্ডোর বাবা বুদ্ধি করে বললেন, “এসব থাক, ভালোমন্দ আপেক্ষিক ব্যাপার। আসল কথা এবার বল তো আত্মু।” মেনাল্ডোর বাবা অ্যাটমোকাকুকে আদর করে আত্মু বলে ডাকেন।

“ইয়েস ছোড়দা।” অ্যাটমোকাকু আবার শুরু করলেন। “নাইন্টিন সিক্সটি থ্রি, টোয়েন্টি সেকেন্ড নভেম্বর। প্রেসিডেন্ট কেনেডি ওয়াজ অ্যাসাসিনেটেড। ডু ইউ নো?”

সবাই মাথা দোলাল।

“অ্যান্ড আফটার হিজ অ্যাসাসিনেশন এফ.বি.আই ফেইলড টু আইডেন্টিফাই দ্য রিয়েল অ্যাসাসিনেটর। দে অ্যারেস্টেড আ রং ওয়ান। হি ওয়াজ হ্যাংড টু ডেথ ট্যু। আই কেম টু নো ফ্রম প্রেসিডেন্ট কেনেডি থ্রু প্ল্যানচেট দ্যাট দ্য রিয়েল অ্যাসাসিনেটর ইজ স্টিল অ্যালাইভ।” বেশ গর্বের সঙ্গে বললেন অ্যাটমোকাকু।

“ইন্টারেস্টিং!” লেট্টুর চোখে কৌতূহল।

“ইয়েস, ইন্টারেস্টিং ইন্ডিড। আই অ্যারেঞ্জড অ্যানাদার প্ল্যানচেট। অ্যান্ড বিলিভ মি, মিস্টার কেনেডি কেম আগেইন। হি আগেইন টোল্ড মি হু ওয়াজ হিজ অ্যাসাসিনেটর। নামটা আমার এখন মনে নেই। আমি এফ.বি.আই-কে বললাম। প্রথমে ওরা কুডন্ট বিলিভ মি। বাট, পরে বিলিভ করে। তাকে অ্যারেস্টও করে। বিচারে হি ওয়াজ অলসো হ্যাঙড টু ডেথ।”

অ্যাটমোকাকুর কথা শুনে সবাই পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।

“অবাক হচ্ছ? লাস্ট বার যখন ইন্ডিয়ায় এসেছিলাম তখন জ্যোতি বসু আর এ.পি.জে আবদুল কালামকেও প্ল্যানচেট করে হাজির করেছিলাম।”

লেট্টুর হাসি পেলেও প্রাণপণে সে হাসি চেপে বলল, “তাই নাকি? দারুণ ব্যাপার তো! এবার কাকে আনবেন কিছু ভেবেছেন কাকু?”

“এনি লেজেন্ড বাঙালি। সত্যজিৎ রে, মান্না দে, সুভাষ বোস, রবীন্দ্রনাথ টেগোর… এনিবডি।”

মেনাল্ডো লাফিয়ে উঠে বলল, “সত্যজিৎ রায়!”

“ওকে, নো প্রবলেম। ওয়েট। আমার প্ল্যানচেটের মেটেরিয়ালস আনতে একটু সময় দাও।” অ্যাটমোকাকু উঠে ভেতরের ঘরের দিকে গেলেন। সবাই কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গেছে মনে হল। সত্যিই সত্যজিৎ রায় হাজির হবেন? একমাত্র লেট্টুর মুখ ভাবলেশহীন।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটা ব্রিফকেস নিয়ে হাজির হলেন অ্যাটমোকাকু। সোফার সামনে রাখা টি-টেবিলে ব্রিফকেসটা রেখে ডালা খুললেন। তারপর বের করলেন নাইট ল্যাম্পের মতো একটা ছোটো লাইট আর দুটো স্লেট। স্লেট দুটো পরিষ্কার, কোনোকিছুই লেখা নেই।

স্লেট দুটোর দু-পাশ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবাইকে দেখিয়ে বললেন, “কিছু লেখা নেই তো? লুক কেয়ারফুলি। যিনি আসবেন তাঁকে এই স্লেটে তাঁর সিগনেচার করে যেতে রিকোয়েস্ট করব।” এই বলে অ্যাটমোকাকু একটা স্লেট আরেকটা স্লেটের উপর রাখলেন। তারপর বললেন, “এবার আলোটা নেভাতে হবে।”

“কেন ঠাকুরপো?” মেনাল্ডোর মায়ের গলা যেন কেঁপে উঠল।

“আলো নেভানোর আবার কী দরকার রে আত্মু?” মনে হয় স্ত্রী ভয় পেয়েছে বুঝে মেনাল্ডোর বাবাও আলো নেভাতে চান না।

মেনাল্ডোও বলে উঠল, “আলো থাক না কাকু। অন্ধকারে ভয় লাগে।”

“আমি থাকতে কীসের ভয়? ভালো মানুষের অশরীরী আত্মারা মানুষের কোনও ক্ষতি করে না।” আশ্বস্ত করলেন অ্যাটমোকাকু।

লেট্টু এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। এবার ফুট কাটল, “অন্ধকার না হলে আত্মারা আসে না, তাই না কাকু? আত্মারা অন্ধকার ভালোবাসে।”

“কারেক্ট। নাইস গাই।” টেবিলে সরঞ্জাম সাজাতে সাজাতে আড়চোখে লেট্টুকে দেখে নেন অ্যাটমোকাকু।

মেনাল্ডোর বাবা উঠে ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেন। টেবিলে ব্যাটারিচালিত টেবিল ল্যাম্পের নীলচে আলোয় পুরো ঘরটা যেন প্রেতপুরী মনে হতে লাগল। অ্যাটমোকাকুর নির্দেশে সবাই চুপ। যেন পিন পড়লেও তার শব্দ শোনা যাবে। অ্যাটমোকাকু সবাইকে নীল আলোর দিকে তাকিয়ে একমনে সত্যজিৎ রায়কে স্মরণ করতে বললেন।

অ্যাটমোকাকু বিড়বিড় করে কীসব বলছেন। হয়তো সত্যজিৎ রায়কে ডাকছেন। হঠাৎ তিনি শক্ত হয়ে গেলেন ও দু-চোখ বুজলেন। তারপর বললেন, “উনি এসেছেন।”

লেট্টু বাদে সবার গা ছমছম করতে লাগল। বুবাই কেতোর হাত শক্ত করে চেপে ধরল। মেনাল্ডো তো তার মাকে জড়িয়েই ধরল। অ্যাটমোকাকু যান্ত্রিকভাবে বলে চললেন, “স্যার, আপনি যে এসেছেন তার প্রুফ হিসেবে এই স্লেটে আপনার সিগনেচার করে যাবেন? প্লিজ।” তারপর কয়েক সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। এবার সুইচ অন দ্য লাইটস ছোড়দা।”

মেনাল্ডোর বাবা উঠে গিয়ে আলো জ্বালিয়ে দিতে দেখা গেল সবার চোখমুখ তখনও ভয়ে শুকনো। কেবল লেট্টুর কপালে চিন্তার ভাঁজ। কী ভেবে চলেছে লেট্টু?

অ্যাটমোকাকু বললেন, “সত্যজিৎ রায় এসেছিলেন। তিনি তাঁর প্রেজেন্সের প্রুফ রেখে গিয়েছেন সিগনেচার করে।”

সবাই অধীর হয়ে উঠল সত্যজিৎ রায়ের সই দেখার জন্য। অ্যাটমোকাকু উপরের স্লেটটা খুব সন্তর্পণে দু-হাতে তুলে সবাইকে দেখানোর উদ্দেশ্যে এদিক ওদিক ঘোরালেন।

আশ্চর্য! সত্যিই তো স্লেটের উপর সত্যজিৎ রায়ের স্পষ্ট বাংলা সই! অবিকল একইরকম।

“মিস্টার রে-র সিগনেচার তোমরা চেনো? হু নোজ?”

বুবাই, কেতো, পুচকু, মেনাল্ডো, টুকুন সবাই চেঁচিয়ে উঠল, “চিনি, চিনি! একই সই।”

লেট্টুকে ভয় বা বিস্ময় কোনোটাই ছুঁতে পারেনি। কিন্তু পুরো ঘটনায় যেন ঘাবড়ে গেছে।

“ওয়েল বয়েজ! এবার এটুকুই।”

“কাল একবার আসব কাকিমা?” লেট্টু মেনাল্ডোর মাকে জিজ্ঞাসা করল।

“তোমাদের কি বাবা আমার বাড়িতে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে? তোমাদের জন্য আমার দরজা সবসময় খোলা। যখন ইচ্ছে, যতবার ইচ্ছে আসবে।”

“তাহলে আগামীকাল একই সময়ে আমি আসব। কী রে, তোরা আসবি তো?” লেট্টু বুবাইদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চাইল।

সমস্বরে সবাই বলে উঠল, “ইয়েস, লেট্টুদা।”

(তিন)

মেনাল্ডোদের ড্রয়িং রুম সন্ধে থেকেই জমজমাট। অ্যাটমোকাকু কিন্তু বেশ বুদ্ধিমান লোক। কথাও বলেন বেশ বুদ্ধি খাটিয়ে। গতরাতে লেট্টুর হাবভাব যে তাঁর মনপসন্দ হয়নি তা পরের সন্ধেতেই বুঝিয়ে দিলেন হেঁয়ালি করে। লেট্টুর গম্ভীর মুখ দেখে বললেন, “লেট আস অলওয়েজ মিট ইচ আদার উইথ স্মাইল, ফর দ্য স্মাইল ইজ দ্য বিগিনিং অফ লাভ। কী, তাই তো?”

লেট্টু দেঁতো হাসি হেসে বলল, “সে তো বটেই কাকু।”

অ্যাটমোকাকু লেট্টুর মনের ভাব বুঝতে পারলেন কি না কে জানে। ফের বললেন, “ইফ ইউ জাজ পিপল, ইউ হ্যাভ নো টাইম টু লাভ দেম। কী গাইজ, আন্ডারস্ট্যান্ড?”

সবাই মাথা ঝাঁকাল।

অ্যাটমোকাকু বললেন, “এই যে দুটো কোটেশন বললাম, কার জানো? এনিবডি?”

সবাই এর ওর দিকে যখন তাকাচ্ছে। লেট্টু ভাবলেশহীনভাবে বলল, “মাদার টেরেসা।”

“অ্যাবসোলিউটলি কারেক্ট। ফ্যান্টাস্টিক। আজ আমি তোমাদের সামনে মাদারকেই হাজির করাব। তিনি রাজি হয়েছেন।”

রাজি হয়েছেন! বলেন কী অ্যাটমোকাকু! বিখ্যাত মানুষদের আত্মার সঙ্গে তিনি দিনরাত গল্পগুজব করেন নাকি? বুবাই-মেনাল্ডোরা ভাবতে থাকে।

একদিন লেট্টু কথায় কথায় বলেছিল, মানুষ মারা যাওয়ার পর তার দেহ ইট-কাঠ-পাথরের মতো একটা জড় পদার্থে পরিণত হয়। প্রাণ মানে দেহকোশের মধ্যে লক্ষ লক্ষ সুসংবদ্ধ রাসায়নিক বিক্রিয়া। এইসব বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি আসে শ্বাসকার্যের মাধ্যমে। শ্বাসকার্য বন্ধ হয়ে গেলে তাই বিক্রিয়াগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। পরিণতি মৃত্যু। আত্মা বলে কিছু নেই, হয়ও না। আত্মা যদি কোনও বস্তু হয় তবে তার আকার ও আয়তন কেমন? কেউ জানে না। আত্মা যদি বস্তু হয় তবে তা কিছু স্থান দখল করে থাকবে। আত্মা যদি অবিনশ্বর হয় তাহলে প্রতিদিন যে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে তাদের আত্মা থাকছে কোথায়? আত্মা কেবল মানুষের থাকে, নাকি সব জীবের?

এসব প্রশ্ন লেট্টু বুবাইদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনও কিছু বিশ্বাস করবি না।’ কিন্তু অ্যাটমোকাকু যা করছেন তা তো চোখের সামনেই। তাহলে আত্মাকে অবিশ্বাস করে কী করে? পুচকু, কেতো, টুকুন, বুবাই আর মেনাল্ডোর মনে এ নিয়ে টানাপোড়েন চলতে থাকে।

ইতোমধ্যে আগের রাতের মতোই মাদার টেরেসাকে হাজির করার ব্যবস্থা করলেন অ্যাটমোকাকু। যথারীতি মাদার এলেন, আর স্লেটে তাঁর উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে স্বাক্ষর করে গেলেন। অ্যাটমোকাকু সবাইকে স্লেটে তাঁর সই দেখিয়ে দিলেন।

“তাহলে গাইজ, তোমরা দু-দু’জন লেজেন্ডের প্রেজেন্স এনজয় করলে তো?” অ্যাটমোকাকু প্রশ্ন করলেন।

মেনাল্ডোর বাবা বললেন, “আত্মু, তুই যে এমন একটা অসাধারণ কাজ অনায়াসে করিস জানতাম না। আগে অনেক শুনেছি প্ল্যানচেটের কথা। বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখন আর অবিশ্বাসের কোনও জায়গাই নেই।”

লেট্টু দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে হঠাৎ বলে উঠল, “আমি একবার প্ল্যানচেট করার চেষ্টা করতে পারি? অনুমতি দেবেন?”

কথাগুলো মেনাল্ডোর বাবার উদ্দেশেই বলা। কিন্তু অ্যাটমোকাকু সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে বললেন, “ইউ? তুমি কী বলছ তুমি জানো? এ অনেক সাধনার ফল। তুমি এসব জানো নাকি? ভুলভাল চেষ্টা করলে বড়ো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। ইটস নট আ ম্যাটার অফ জোক!” তাঁকে ক্রুদ্ধ মনে হল।

ক্ষতির কথা শুনে মেনাল্ডোর মা বললেন, “কী দরকার লেট্টু ওসব আত্মা-টাত্মা এনে? এই তো বেশ আছি। দরকার নেই বাবা। আমার খুব ভয় করে।”

“কাকিমা, কোনও ভয় নেই। আমি প্ল্যানচেট বিদ্যা ভালো জানি। শিখেছি। একবার সুযোগ দিন। কোনও ক্ষতি হবে না।” লেট্টু অনুনয় করল।

“ঠিক আছে। তাই করো।” মেনাল্ডোর বাবা অনুমতি দিতেই হাসি ফুটল লেট্টুর মুখে।

কিন্তু অ্যাটমোকাকুর কপালে যেন ভাঁজ ফুটে উঠল। মনে মনে ভাবলেন, ছেলেটা কী করতে চাইছে?

লেট্টু ইতোমধ্যে নীল আলোর টেবিল ল্যাম্পসহ টি-টেবিলটা টেনে নিয়েছে তার সামনে। সবার চোখ লেট্টুর দিকে নিবদ্ধ। লেট্টু তার সাইড ব্যাগ খুলে বের করল দুটো স্লেট। তারপর সবার দিকে স্লেট তুলে দু-দিক ঘুরিয়ে দেখিয়ে বলল, “দেখুন, কোনোদিকে কিছুই লেখা নেই।” তারপর একটা স্লেটের উপর আরেকটা স্লেট রেখে বলল, “এসেছে শরৎ হিমের পরশ লেগেছে হাওয়ার পরে, কার লেখা কেউ বলতে পারবি?”

বুবাইরা সমস্বরে বলে উঠল, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”

“কারেক্ট। আজ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে আমি এখানে হাজির করার চেষ্টা করছি।”

লেট্টু চোখ বুজে বিড়বিড় করতে লাগল। অ্যাটমোকাকু অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে লেট্টুকে না দেখার ভান করলেও মাঝে মাঝে আড়চোখে লেট্টুর কাণ্ডকারখানা লক্ষ করছিলেন।

“এসেছেন! কবিগুরু, আপনি এসেছেন? প্রণাম গুরুদেব। এই স্লেটে আপনি একটি স্বাক্ষর করে আপনার উপস্থিতির প্রমাণ দেবেন গুরুদেব?” লেট্টু বেশ স্পষ্টভাবে কথাগুলো বলছিল।

সামান্য ক্ষণ চুপ থাকার পর লেট্টু আবারও বলে উঠল, “আপনি আমার কথা রাখলেন গুরুদেব? তাহলে যাবার আগে দু-লাইন কবিতা শুনিয়ে যান গুরুদেব।”

হঠাৎই কে যেন নাকি সুরে বলে উঠল,

‘এসেছে শরৎ হিমের পরশ লেগেছে হাওয়ার ’পরে,

সকাল বেলায় ঘাসের আগায় শিশিরের রেখা ধরে।

আমলকী-বন কাঁপে, যেন তার বুক করে দুরুদুরু,

পেয়েছে খবর পাতা-খসানোর সময় হয়েছে শুরু।’

সবাই লেট্টুর দিকে তাকাল। অ্যাটমোকাকুও। কই, লেট্টুর চোখমুখ তো বন্ধ! লেট্টুর কাণ্ড দেখে সবাই থ হয়ে গেল।

“কাকু, আলো জ্বালিয়ে দিন। কবিগুরু চলে গেছেন।” চোখ খুলল লেট্টু। আর প্রথমেই আড়চোখে দেখে নিল অ্যাটমোকাকুকে। চোখাচোখি হতেই যেন লজ্জায় পড়ে গেলেন। তড়িঘড়ি চোখ সরিয়ে নিলেন। বোঝাই যাচ্ছে, বেশ লজ্জা পেয়েছেন।

মেনাল্ডোর মা তো আনন্দে উদ্বেলিত। “লেট্টু, তুমি এত কিছু জানো! তুমি তো ঠাকুরপোর চেয়ে কোনও অংশে কম জানো না বাবা! তোমার অ্যাত্তো গুণ তো জানতাম না!”

মেনাল্ডোও বলে উঠল, “তুমি তো আগে কোনোদিন আমাদের ব্যাপারটা বলোনি!”

“বলার সময় ও সুযোগ আসেনি, তাই। এখন সময় ও সুযোগ হল। আসলে প্ল্যানচেট করে আত্মাকে হাজির করার ভণ্ডামি তো আগে দেখিনি, তাই।” লেট্টু বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দিল।

“ভণ্ডামি? তোমার সাহস তো কম নয় ছোঁড়া!” চোখ পাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন অ্যাটমোকাকু।

“বসুন কাকু, বসুন। উঠবেন না। উত্তেজিতও হবেন না। আপনি যে খেলাটা, মানে ম্যাজিক দেখিয়েছেন, আমিও সেটাই দেখিয়েছি। এতে গোঁসার কী আছে?” শ্লেষ দিয়ে কথাগুলো বলল লেট্টু।

“সবাই আর এক মিনিট বসুন, আর ম্যাজিকটা শিখে নিন।” লেট্টু এবার সই না থাকা স্লেটটা তুলে কাত করতেই দেখা গেল কাঠের ফ্রেম ছাড়া আর একটা স্লেট।

সবাই হাঁ হয়ে গেল। তিনটে স্লেট, অথচ মনে হচ্ছে দুটো।

লেট্টু বলল, “আমি একটা স্লেটে আগেই রবীন্দ্রনাথের সই নকল করে লিখে রেখেছিলাম। তারপর তার ওপরে ফ্রেম বিহীন এই স্লেটটা চেপে দিই। শুরুতে যখন সবাইকে স্লেট দেখাই তখন সইটা ঢাকা থাকায় দেখা যায়নি। তারপর এই দ্বিতীয় স্লেটের উপরে প্রথম স্লেটটা রেখে দিই। এরপর চলে লেজেন্ড আনার অভিনয়। তারপর প্রথম স্লেট তোলার সময় আলগা স্লেটটা দ্বিতীয় স্লেটের ওপরে থেকে যায়। আপনারা একটু দূরে থেকে এটা বুঝতে পারবেন না। ফলে প্রথম স্লেটে লিখে রাখা সইটা আপনাদের সহজেই দেখানো যায়।”

লেট্টুর কথা থামিয়ে দিয়ে ফুঁসে উঠলেন অ্যাটমোকাকু। তুমি ছেড়ে একেবারে তুই করে বলে উঠলেন, “তুই ভণ্ডামি করিস বলে কি সবাইকে ভণ্ড ভাবিস? ছোড়দা, এ-ছোঁড়া আজ আমাকে যেভাবে অপমান করল জীবনে কোনোদিন কেউ তা করার সাহস পায়নি। আর এরকম বদমাইশের সঙ্গে এসব কচি কচি ছেলেরা মিশলে তো বখে যাবে! ওকে এক্ষুনি চলে যেতে বলো ছোড়দা।” রাগে আর একটাও ইংরেজি আসছে না অ্যাটমোকাকুর মুখে।

“সে তো যাবই কাকু। কিন্তু আত্মা আর প্ল্যানচেটের ঢপ মেরে সরল মানুষদের যে টুপি পরাচ্ছিলেন সেটা তো আগে স্বীকার করবেন।” হাসতে লাগল লেট্টু।

মেনাল্ডোর বাবা ও মা এই পরিস্থিতির জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না। তাঁরাও কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। রাগে গজগজ করতে করতে অ্যাটমোকাকু ঘরের ভেতরে হাঁটা দিতেই মেনাল্ডো দৌড়ে এল অ্যাটমোকাকুর ব্রিফকেসের কাছে। তারপর ব্রিফকেসের ওপরে রাখা স্লেটগুলো হাতে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ব্র্যাভো লেট্টুদা, তোমার আর অ্যাটমোকাকুর টেকনিক একই। এই দেখো, ফ্রেম ছাড়া আর একটা স্লেট।” মেনাল্ডো সবাইকে তিনটে স্লেট তুলে দেখাল।

লেট্টু তার ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বলল, “এই খেলাটার জন্য কয়েকজন নামি মানুষের সই ঠিকঠাক নকল করা শিখতে হয়। বাকিটা কথার মারপ্যাঁচ।”

“আর আবৃত্তিটা?” পুচকু জিজ্ঞাসা করল।

“ওটাও প্র্যাকটিস। ঠোঁট না নাড়িয়ে, নাক দিয়ে কথা বলেছি। টকিং ডল শো দেখেছিস? একই জিনিস। ইংরেজিতে কী বলে জানিস? ভেন্ট্রিলোকুইজম।”

মেনাল্ডোর মা এগিয়ে এসে লেট্টুর মাথায় হাত রেখে বললেন, “বাব্বা, ছেলে আমার কত কী জানে!”

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s