গল্প-শূন্যান্তর-মল্লিকা ধর-শীত২০২৪

মল্লিকা ধরের আগের লেখা- তৃণার স্বপ্নপৃথিবী(উপন্যাস)আশ্চর্য নীল আয়না

golpo9101

নীলচে রোদ্দুরের ভিতর দিয়ে উৎসাহী পায়ে হাঁটছিল সুবর্ণাক্ষী। পাশে পাশেই আসছে ইয়ান। দলের অন্যরা আসছে ওদের পরেই। ওরা রওনা হয়েছে ক্যাম্প থেকে, যাচ্ছে সমুদ্রতীরে।

ইয়ান বলল, “কী রে বর্ণা, তোর দেখি খুব উৎসাহ আজকে?”

সুবর্ণাক্ষী হাসল, বলল, “হবে না? সমুদ্রের তলায় শহর, সেখানে আমাদের নেমন্তন্ন, ভাবতে পারিস? যেন রূপকথা!”

ইয়ানও হেসে ফেলল, বলল, “কে বলবে তুই মহাশূন্য অভিযাত্রী? ঘুরে বেড়াস এক নক্ষত্রের গ্রহ থেকে আরেক নক্ষত্রের গ্রহে? এখনও রূপকথা ভালোবাসিস, যেন শিশু।”

সুবর্ণাক্ষী হি হি করে হেসে ফেলল, বলল, “এমন রূপকথার মতন অভিজ্ঞতা পেলে শিশু হতে আপত্তি নেই আমার।”

আকাশ আজকে পরিষ্কার, ঝকঝক করছে নীল নক্ষত্র ঈশম। দূর দিগন্তের কাছে শুধু একফালি মেঘ দেখা যায়।

গ্রহটার নাম সোফিয়া। যে নক্ষত্রকে ঘিরে সোফিয়া ঘুরছে, তার নাম ঈশম। প্রথম আবিষ্কর্তাদের সম্মানে এই নামগুলো দেওয়া হয়েছে। আমাদের সৌরজগৎ থেকে  তিন হাজার আলোকবর্ষ দূরে এই ঈশমের গ্রহজগৎ। সূর্যের মতন নয় ঈশম, সূর্যের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চ তাপমাত্রার নক্ষত্র। নীলচে আভার নক্ষত্র। তাই রোদ্দুরের রঙ নীলচে, পৃথিবীতে দেখা স্বর্ণাভ রোদ্দুর নয়।

পৃথিবীর কক্ষপথের তুলনায় সোফিয়া অনেক বড়ো কক্ষপথে ঘুরছে ঈশম ঘিরে। তাই অত উচ্চ তাপমাত্রা ক্ষতি করতে পারে না, বরং ঠিকঠাক জীবনদায়ী আলো আর তাপ হয়েই পড়ে গ্রহের উপরিতলে।  

তিন হাজার আলোকবর্ষ মানে আলোর গতিতে ছুটে এলেও তিন হাজার বছর লাগত পৃথিবী থেকে এখানে আসতে।  কিন্তু ওদের লেগেছে মাত্র কয়েকদিন। কী করে? ওরা এসেছে স্থানকালের সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে, তাই দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়নি ওদের। ওই স্থানকাল সুড়ঙ্গ হাইপারস্পেসের মধ্য দিয়ে জুড়ে রেখেছে পৃথিবী আর এই সোফিয়াকে। এইভাবেই দূর দূরান্তের গ্রহজগতে পাড়ি দেয় মানুষ আজকাল, এভাবে ছাড়া তো মহাশূন্যের বিপুল দূরত্ব অতিক্রম করা মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভবই, অতি উচ্চগতির মহাকাশযানেও হাজার হাজার বছর লেগে যাবে। তাই বড়ো বড়ো অভিযানগুলো সবই আজকাল চলে হাইপারড্রাইভের দ্বারা। স্থানকালের সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে চলার প্রযুক্তিকে বলা হয় হাইপারড্রাইভ।

গ্রহে জলভাগের প্রাধান্য। জলের জগৎ বলা যায় গ্রহটিকে। বড়ো মহাদেশ নেই, গ্রহটার প্রায় গোটা পৃষ্ঠতলই বিশাল এক মহাসমুদ্রে ঘেরা। নীল রোদ্দুরের নিচে বিশাল মহাসাগর ধারণ করে আছে গোলাপী আকাশের ছায়া। স্থলভাগ বলতে গোটা কয়েক বড়ো ও মাঝারি দ্বীপ। আর কয়েক ঝাঁক ছোটো ছোটো দ্বীপ। সবচেয়ে বড়ো যে দ্বীপটি, সেটি আমাদের পৃথিবীর মাদাগাস্কার দ্বীপের চেয়ে বেশি বড়ো না। অন্য দ্বীপগুলো নিউজিল্যান্ডের মতন বা আরও ছোটো।

এর সভ্যতা সমুদ্রের গভীরে, সেখানে গড়ে উঠেছে শহর, নগর, গ্রাম। ক্ষুদ্র ডলফিনদের মতন দেখতে প্রাণীরা এই সভ্যতা গড়ে তুলেছেন। এঁরা নিজেদের বলেন সেনোজ। গ্রহের মহাসমুদ্রকে এই সেনোজরা বলেন আবাগাথ। তার অর্থ হল অখন্ড জলরাশি। নিজেদের গ্রহকে এঁরা বলেন আবারুহা, তার অর্থ হল অখন্ড গৃহ। এই নাম জানার পর থেকে সোফিয়াকে এই নামেই উল্লেখ করতে শুরু করেছেন পৃথিবীর লোকেরাও অনেকেই। কেন্দ্রীয় নক্ষত্র ঈশমকে সেনোজরা  বলেন আবাশিমা, যাঁর অর্থ অখন্ড উজ্জ্বলতা। এই নামটিও পৃথিবীর লোকেরা অনেকে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।   

সমুদ্রগভীরের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো আর নামকরা শহরটির নাম শিমুরাহা। সেই শহরেই গ্রহের শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রটি স্থাপিত। আমন্ত্রণ পেয়ে সুবর্ণাক্ষীরা আজ যাচ্ছে সেখানে। আমন্ত্রিত দলে আছেন দশজন, ছ’জন মহিলা ও চারজন পুরুষ। এই দশজনই বয়সে তরুণ।

পৃথিবী থেকে যে অভিযাত্রীরা এসেছেন তাঁরা ক্যাম্পে থাকেন। সুবর্ণাক্ষী এই দলের সঙ্গেই আছে শুরু থেকে। পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ অবশ্য আছে হাইপারস্পেসের বিশেষ কমুনিকেশন ব্যবস্থার দ্বারা।

ক্যাম্প এখন অনেক বড়ো। ক্যাম্পে আছেন মোট পঞ্চাশজন। দশজনের দলটিকে বিদায় দিতে সমুদ্রতীরে যাচ্ছেন ক্যাম্পের ত্রিশজন। শিমুরাহা থেকে যে প্রতিনিধিরা অভ্যর্থনা করে নিয়ে যেতে এসেছেন, তাঁরা তো আছেনই। সংখ্যায় তাঁরা পাঁচজন। ডাঙার উপরে তাঁরা চলতে সচ্ছন্দ নন। বিশেষ ধরণের পোশাক ও যন্ত্রের সহায়তায় কিছুক্ষণের জন্য থাকতে পারেন।

সুবর্ণাক্ষীরা অবশ্য জলের তলার শহরে থাকবে বেশ কিছুদিন, সেইরকম উপযুক্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এই সেনোজরা। 

গোটা দলটি সমুদ্রতীরে পৌঁছে গিয়েছিল। সমুদ্রের দিকে চেয়ে সুবর্ণাক্ষী ভাবছিল, কেমন সেই জীবন? জলের তলায়? লিটল মারমেডের রূপকথা তো নয়, এ যে সত্যি! 

তার ভাবনার সূত্র ছিঁড়ে গেল বন্ধু ইয়ানের কন্ঠস্বরে। সে বলছিল, “বর্ণা, কী রে, তুই যে ভাবনায় ডুবে আছিস? আয়, সাবমেরিন রেডি।”

শিমুরাহা থেকেই এসেছিল সাবমেরিন। এই পার্থিব অতিথিদের জন্যই। সেনোজরাও অবশ্য ব্যবহার করেন দূরযাত্রার সময়। উপকূল থেকে ডুবে সাবমেরিনকে বহু মাইল যেতে হবে। তারপরে শিমুরাহা পৌঁছবে জলযান।

গন্তব্যে পৌঁছনোর অনেক আগে থেকেই জলের তলার অপরূপ জগতের দৃশ্য দেখে অতিথিরা তো একেবারে স্তম্ভিত।  ভিনগ্রহের সমুদ্রের অপরূপ জীবজগৎ সবাইকে অভিভূত করে ফেলল। অসংখ্য নানা রঙের প্রাণী ও উদ্ভিদ, বর্ণনাতীত সৌন্দর্যে ঝলমল করছে সব। দূষণহীন সভ্যতা এই গ্রহে, তাই এখানকার জীবজগতের কোনো ক্ষতি হয়নি।

জলজগতের রূপ দেখতে দেখতে সুবর্ণাক্ষীর মনে পড়ছিল এই গ্রহে সে প্রথম যখন এসেছিল, সেই দিনগুলোর কথা। সঙ্গে অরিত্র আর তুন্দ্রা ছিলেন। সময়ের দিক থেকে দেখতে গেলে পার্থিব বছর ছয়েক আগের কথা। এই গ্রহের হিসেবে অবশ্য বছর শেষ হতে অনেক দেরি। এই গ্রহের এক বছর পার্থিব কয়েকশো বছরের সমান। 

সেই প্রথম দিনগুলোর পরে আস্তে আস্তে আরও অনেকে এলেন পৃথিবী থেকে। কেউ কেউ ফিরেও গেলেন কিছুদিন বাস করার পর। প্রথম যে দলটি ফিরে গেলেন, তাদের মধ্যে অরিত্র আর তুন্দ্রাও ছিলেন।

তুন্দ্রা সুবর্ণাক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, বলেছিলেন কন্যা হিসেবে দত্তক নেবেন। ফিরে গেলে সে পেত একটি পরিবার, স্নেহময়ী মা, কত আত্মীয়স্বজন! কিন্তু তা হয়নি। সুবর্ণাক্ষী ফিরে যেতে পারেনি। কেমন করে যেন সে বুঝতে পেরেছিল তার জীবনের স্রোত বয়ে যাবে পৃথিবী থেকে অনেক দূরে।

সেনোজরা সভ্যতার যে স্তরে আছেন তাতে হাইপারস্পেস প্রযুক্তির ব্যাপারটা তাঁদের কাছে অচিন্ত্যনীয়। এর নেপথ্যের বিজ্ঞান এখনও এঁদের কাছে ধরা দিতে বহু বছর দেরি। কিন্তু পৃথিবীর মানুষদের কাছ থেকে সহজেই এই প্রযুক্তি এঁরা এখন গ্রহণ করতে পারেন, শিখে নিতে পারেন। বস্তুত সেইজন্যেই ওই ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষিতরা ওঁদের শহরে আমন্ত্রিত।

ইয়ানের সঙ্গে সুবর্ণাক্ষীর একদিন তর্ক হচ্ছিল এই ব্যাপারটা ভালো না মন্দ, তাই নিয়ে। ইয়ানের মতে নিঃসন্দেহে ভালো। কারণ পারস্পরিক আদানপ্রদানের দ্বারাই উভয় প্রজাতি উপকৃত হবে। সুবর্ণাক্ষী অতটা নিঃসন্দেহ নয়। অপ্রস্তুত একটি সভ্যতার উপরে প্রযুক্তি যেন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ সেনোজরাই উৎসাহী বেশি। মহাশূন্যের বিপুল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে তাঁরাও নক্ষত্রে নক্ষত্রে অভিযান করতে চান যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

শিমুরাহা পৌঁছে অতিথি দলটিকে বিশেষভাবে প্রস্তুত পোশাক পরিয়ে দেওয়া হল। তাতে তাঁদের জলের নিচে চলাফেরা ও অন্যান্য কাজের কিছু সুবিধে হবে। তাঁদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে বিশেষ অতিথিভবনে, সেখানে সাবমেরিনের মতন ব্যবস্থা। ডাঙায় থাকার মতই থাকতে পারবেন।

প্রথমদিনটা শুধু ঘুরে দেখা আর বিশ্রাম। পরদিন থেকে ট্রেনিং শুরু, সেনোজরা ভালোভাবে বাছাই করে পাঁচজন কিশোর ও পাঁচজন কিশোরীকে তৈরি রেখেছেন। তাদের নিয়ে এলেন ট্রেনিং এর জন্য। এদের বয়স অল্প হলেও এরা গণিত ও বিজ্ঞানে খুব তুখোড়।  

ট্রেনিং শুরুর পরে তিনদিন ভালোই কাটল। চতুর্থদিনে ঘটল অপ্রত্যাশিত কান্ড। ভূমিকম্প। ভূমিকম্প শুরু হল একেবারে হঠাৎ। উপরের ক্যাম্পে যাঁরা ছিলেন তাঁরা ভূমিকম্পের তীব্রতায় হতবাক হয়ে গেলেন।

সাগরের গভীরে শিমুরাহা শহরে সুবর্ণাক্ষীদের যা অভিজ্ঞতা হল সে অকল্পনীয়। সমুদ্রের তলার শিলাস্তর মারাত্মক কাঁপছিল আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জলরাশি ফুঁসে উঠছিল ঘূর্ণির রূপ ধরে। যেন মহাপ্রলয় উপস্থিত।

উপরের ক্যাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ তখনও অটুট ছিল। কিন্তু তারপরেই ক্যাম্প হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে শুরু করল। বলা বাহুল্য যে যোগাযোগও বন্ধ হল। থেমে থেমে ভূমিকম্প চলল বেশ কয়েকঘণ্টা। সকলেরই মনে হচ্ছিল বুঝি সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু একসময় ভূমিকম্প থামল।

যোগাযোগ পুনরুদ্ধার হবার পরে ক্যাম্পের ডিরেক্টর সুবর্ণাক্ষীদের জানালেন, ক্যাম্পের কিছু অংশ তৈরি করা হচ্ছে নতুন করে। নির্দেশ দিলেন, ওরা শিমুরাহা থেকে যেন পরদিনই ফিরে আসে। জরুরি।

শিমুরাহা থেকে ফেরার পরে ক্যাম্পের যে অংশটি সদ্য নতুন করে গড়া হয়েছে, সেইখানে সুবর্ণাক্ষীদের ডাক পড়ল।

ক্যাম্পের ডিরেক্টর ডঃ জ্যানেট ইভান্স বললেন, “ঈশম থেকে রহস্যময় একটি তরঙ্গ সনাক্ত করা হয়েছে খুব সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে। যদিও নিশ্চিত না, তবু বহু এক্সপার্টের মতে সেই তরঙ্গ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ঈশম পৌঁছেছে বিস্ফোরণের পূর্বক্ষণে। পার্থিব সময়ের হিসেবে কয়েক মাস পরেই ভীষণ বিস্ফোরণ ঘটবে। উচ্চশক্তির রশ্মিস্রোত আর কণিকাস্রোত ধেয়ে আসবে সোফিয়া গ্রহের দিকে, তাতে সম্ভবত সমস্ত জীবজগৎ ধ্বংস হবে। এখন আমাদের ক্যাম্প গুটিয়ে যত দ্রুত সম্ভব পৃথিবীতে বা অন্য কোনো গ্রহের উপনিবেশে ফিরে যেতে হবে।”

“আর সেনোজরা? তাদের কী হবে?” সুবর্ণাক্ষীর গলা থেকে আশঙ্কা-থরথর এই প্রশ্নটা যখন ছিটকে বেরিয়ে এল, তখন সে নিজেও সচেতন ছিল না কী বলছে। অথচ না বলে তার উপায় ছিল না।

ডক্টর ইভান্স তাঁর শান্ত চোখ দু’টি তুলে সুবর্ণাক্ষীর দিকে চেয়ে বললেন, “নির্বাচিত কয়েকশো সেনোজকে হয়তো আমরা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু সেটা কি উচিত হবে? সব বাদ দিয়ে মাত্র কিছু জীবকে রক্ষা করা? গোটা গ্রহের জীবজগৎ রক্ষা করার মতন প্রযুক্তি বা রিসোর্স আমাদের আছে কি?”

সুবর্ণাক্ষী চুপ করে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপরে আস্তে আস্তে বলল, “না, নেই।”

ক্যাম্পে তার যে ঘরটি ছিল, সেটি ভূমিকম্পে ধ্বসে গিয়েছিল। আরও অনেকের ঘরেরই সেই অবস্থা। খুব তাড়াতাড়িই ফেরার গোছগাছ শুরু হবে। নতুন করে ঘর গড়ার আর কী প্রয়োজন? তাই তারা আর যে ক’টাদিন আছে, তাঁবুতেই থাকবে।

রাত্রে তাঁবুতে শুয়ে ঘুম আসছিল না সুবর্ণাক্ষীর। এতদিন পরে আবার মনে পড়ছিল সেই পাহাড়ি শহরটার কথা, প্রথম এই গ্রহে আসার পর যেখানে গিয়েছিল সে, অরিত্র আর তুন্দ্রার সঙ্গে। সেই শহর জলের নীচে নয়, ডাঙার উপরে। সুবর্ণাক্ষীদের যন্ত্রপাতির হিসেব অনুযায়ী বহু হাজার বছরের পুরোনো সে শহর। রহস্যময় শহর। জনপ্রাণী নেই, সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। অথচ বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ইত্যাদি সবই ঝকঝক করছে, শুধু কেউ কোথাও নেই।

সেখানে সুবর্ণাক্ষীরা রহস্যময় সত্তাদের উপস্থিতি টের পেয়েছিল। তাঁরা পৃথিবীর প্রতিনিধি হিসেবে সুবর্ণাক্ষীর পরীক্ষা নিয়েছিলেন। সেই কঠিন পরীক্ষার কথা কিছু মনে নেই ওর। হয়তো ওঁরা স্মৃতি থেকে মুছে দিয়েছিলেন। তুন্দ্রা আর অরিত্র পরে ওকে বলেছিলেন সেই পরীক্ষায় নাকি সে উত্তীর্ণ হয়েছিল।

জনহীন শহরের সেই রহস্যময়রা… তাঁরা এখন কী করছেন? তাঁরা কি জানেন না এই গ্রহের ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের কথা?   

ভাবতে ভাবতে আর শুয়ে থাকতে পারল না সুবর্ণাক্ষী। যেমন ছিল সেই অবস্থাতেই চুপিসারে বেরিয়ে পড়ল। পার্কিং এরিয়া থেকে ছোট্টো একটি উড়ানযান নিয়ে নিঃশব্দে উড়ে চলল জনহীন শৈলশহরটির দিকে।

তার অজান্তে আর একটি উড়ানযান নিয়ে তাকে অনুসরণ করে উড়ে চলল ইয়ান। 

পাহাড়ের প্রায় চূড়ার কাছে যে পাথরের প্রাসাদটিতে রহস্যময় কিছু জীবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল সুবর্ণাক্ষীর, সেই প্রাসাদের চত্বরে এসে উড়নযান নামালো সে। তারপরে কেমন যেন আচ্ছন্নের মত কেন্দ্রীয় ঘরটিতে ঢুকে মেঝেতে বসে পড়ল।

কেন সে এখানে এসেছে? সে কি আশা করছে ওই জীবেরা আবার দেখা দেবেন? কিন্তু তারও তো কোনো ভিত্তি নেই! ওঁরা হয়তো মোটেই এখানে থাকেন না, মাঝে মধ্যে এসে ঘুরে যান।

ভাবতে ভাবতে মাথার ভিতরে কেমন যেন ধাক্কার মতন লাগতে থাকল ওর। আর বসে থাকতে না পেরে শুয়ে পড়ল মেঝেতে। ইয়ান ওকে শুয়ে পড়তে দেখেই ঘরে ঢুকল। শিয়রের কাছে এসে বসল। সুবর্ণাক্ষী তখন ঘুমে অচেতন, কিছুই বুঝল না।

শেষরাত্রে জাগল সুবর্ণাক্ষী। বাইরে তখন জ্যোৎস্না।

উপরের চোখ-আকৃতির জানালা দিয়ে মেঝেতে এসে পড়েছে জ্যোৎস্নার টুকরো। এ গ্রহের দু’টি চাঁদ, কাছেরটি বেশ বড়ো, তারই অমন নীলচে সাদা জ্যোৎস্না।

উঠে বসে ইয়ানকে দেখে চমকে উঠল সুবর্ণাক্ষী। “তুই এখানে?”

ইয়ান ম্লান হেসে বলল, “তোকে ফলো করে এসেছি। কেন এখানে এসেছিস তুই?”

সুবর্ণাক্ষী অন্যমনস্কভাবে মেঝেতে পড়া জ্যোৎস্নার টুকরোর দিকে চেয়ে বলল, “ইয়ান, আমি ফিরে যাব না। এইখানে থেকে যাব। জানি এ গ্রহ বাঁচবে না, সেনোজদের কারুকেই হয়তো বাঁচাতে পারব না, কিন্তু ওদের সঙ্গে মরতে তো পারব।”

“বর্ণা ! পাগলের মত কথা বলিস না।”

“ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাব। সেনোজদের দশজনকেও যদি বাঁচাতে পারি, তাও অনেক।”

 ইয়ান বলল, “তাহলে আমিও তোর সঙ্গে যাব। আমাদের হাতে যতটুকু যা টেকনোলজি আর রিসোর্স আছে, তাতে হয়তো কয়েকশো সেনোজকে আমরা নিয়ে যেতে পারব এখান থেকে সাড়ে তিনশো আলোকবর্ষ দূরের টিমোরিথ গ্রহের উপনিবেশে। সেখানে সমুদ্র না থাকলেও বড়ো বড়ো হ্রদ আছে।” 

এতক্ষণে সুবর্ণাক্ষীর চোখেমুখে উজ্জ্বলতা ফুটল। সে ইয়ানের হাতে হাত মিলিয়ে বলল, “তবে আজ থেকেই গোপনে কাজ শুরু করতে হবে একসঙ্গে। ফেরৎ যাবার প্রথম দল রওনা হবে সপ্তাহখানেক পরেই। শেষ দলটি যাবে দেড়মাস পরে। আমরা ওই শেষের দলে নাম লিখিয়ে রাখলে হাতে কিছুটা সময় পাওয়া যাবে।”  

ওরা দু’জনে হাত ধরাধরি করে চলল উড়ানযান দু’টির দিকে, এখন ফিরে যাবে ক্যাম্পে। ওদের সামনে অনেক কাজ। সফল হবার স্থিরতা কিছু নেই, কিন্তু দু’জনেই দৃঢ়সংকল্প। এই কঠিন বিপদের মুখে সেইটিই হয়তো একমাত্র শক্তির উৎস।

ওরা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে তখন পিছনের জ্যোৎস্নাময় আলোছায়া থেকে তাদের দিকে চেয়ে রয়েছিল কয়েকজন, যাঁদের নির্দিষ্ট অবয়ব নেই।

দিন শুরু হতে দেরি ছিল না বেশি। উদয়দিগন্তে নীল নক্ষত্রটির আভা দেখা দিয়েছিল। আর মাত্র কিছুদিন অটুট থাকবে সেনোজদের এই আবাশিমা, অখন্ড উজ্জ্বলতা। তারপরেই বিস্ফোরিত হবে, কিছুকালের জন্য হয়ে উঠবে গ্যালাক্সির সমস্ত নক্ষত্রদের মধ্যে উজ্জ্বলতম।

সেইদিকে চেয়ে সুবর্ণাক্ষী ভাবছিল তারা কি পারবে এখান থেকে অন্তত কিছুসংখ্যক সেনোজকে নিরাপদ টিমোরিথে সরিয়ে নিতে? পারতেই হবে তাদের।

ক্যাম্পে আজ একটু অন্যরকম ব্যস্ততা। আজ ফেরৎ যাবার প্রথম দলটি রওনা হচ্ছে পৃথিবীর দিকে। এই দলে আছেন মোট দশজন, দশজনই প্রবীণ।

হাইপারস্পেসে প্রবেশের সুড়ঙ্গমুখ গ্রহ থেকে বেশ খানিকটা দূরে, গ্রহের দু’টি চাঁদ ছাড়িয়ে আরো কিছুটা দূরে। সেই পর্যন্ত সাধারণ শূন্যযাত্রা। তারপরে শাটল ঢুকবে সুড়ঙ্গে। আর তাকে দেখা যাবে না। কিছুক্ষণ পরে রিসিভিং এন্ড থেকে খবর এলে বোঝা যাবে তারা পৌঁছে গিয়েছে।

শাটল শূন্যে উঠবে এখানকার অস্থায়ী স্পেসপোর্ট থেকে। সেই পর্যন্ত যাচ্ছে ক্যাম্পের জনা পনেরো, বিদায় জানাতে। সুবর্ণাক্ষী আর ইয়ানও আছে তাদের সঙ্গে। তারা নিজেরা শেষ দলে নাম লিখিয়েছে, তাদের যাত্রা আরো কয়েক সপ্তাহ পরে।

ইতিমধ্যে তারা গোপনে নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে। আরো পাঁচজন বন্ধুকে ওরা পেয়েছে নিজেদের দিকে। সেই বন্ধুরাও কাজ করছে ওদের সঙ্গে।

শিমুরাহাতে যে ট্রেনিংটি চলছিল, তা যদিও বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তবু ডক্টর জ্যানেট ইভান্সের অনুমতি নিয়ে সুবর্ণাক্ষী একাই গিয়েছিল আবার জলের তলার সেই সেনোজদের শহরে। সেখানে ট্রেনিংএর সেই দশজন সেনোজ ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে সে আবার দেখা করেছিল।

ভূমিকম্প ও তার বিশাল ক্ষয়ক্ষতি সেনোজদের খুবই বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। কিন্তু ওই ছাত্রছাত্রীরা অল্পবয়সী, ওরা দ্রুত অবসাদ কাটিয়ে উঠেছে। সুবর্ণাক্ষী তাদের বলেছে, “তোমরা মনখারাপ কোরো না। এখন আমাদের ট্রেনিং বন্ধ হয়ে গেলেও একদিন আবার শুরু হবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমরা মনে সাহস রাখো।”   

সেনোজ ছাত্রছাত্রীদের দলে জিনোফিরা বলে একটি মেয়ে আছে। সে অসাধারণ বুদ্ধিমতী ও চটপটে। ট্রেনিং এর সময় সে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি শিখছিল। যা শেখানো হচ্ছিল সেটাই আশ্চর্যরকম দ্রুত শিখে নিয়ে করে দেখাতে পারছিল।

সুবর্ণাক্ষী ওদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ শেষ করে যখন শিমুরাহা থেকে বিদায় নেবার উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন জিনোফিরা একা এসে ওর সঙ্গে আলাদা করে একটু কথা বলার অনুমতি চাইল।

সুবর্ণাক্ষী একটু অবাক হয়েছিল। সে সম্মতি জানিয়ে বলল “বলো জিনোফিরা, কী বলতে চাও বলো।”

জিনোফিরা বলল, “আমার একটা অনুরোধ আছে। তুমি রাখবে? আমার মন বলছে বিরাট এক বিপর্যয় হয়তো আসছে আমাদের গ্রহে, হয়তো সব ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু তোমরা শূন্যের ভিতরে সুড়ঙ্গ কেটে চলতে জানো, তোমরা সেই পথে পালাতে পারবে।  তোমরা আমাদের কাছ থেকে কয়েকটা শিশুকে নিয়ে যাবে? রক্ষা করবে তাদের? তারা বেঁচে থাকলে তবু আমাদের গ্রহের স্মৃতি রক্ষা পাবে।” এইটুকু বলে মেয়েটা হাতডানার মধ্যে মুখ গুঁজে দেয়, ওর সারা শরীর কেমন কাঁপছে। জলের মধ্যে সূক্ষ্ম তরঙ্গ উঠছে। 

সুবর্ণাক্ষীর মনটা অপ্রত্যাশিত বিস্ময়ে থ হয়ে রইল খানিকক্ষণ। এই মেয়ে এসব কী বলছে? এই অত্যন্ত গোপন ব্যাপার তো এর জানার কথা নয়!

জিনোফিরার কাঁধের কাছে হাত ছুঁইয়ে সুবর্ণাক্ষী বলল, “এসব কী বলছ তুমি ? কে বলেছে বিপর্যয় আসবে?”

মুখ না তুলেই জিনোফিরা বলে, “আমার মন বলছে। আমি মাঝে মাঝে ভবিষ্যৎ অনুভব করতে পারি। আমার দিদিমার মা, তাঁর নাম আনোহিমা, এখনও তিনি বেঁচে আছেন, অত্যন্ত শক্তিশালী ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। শহরের বাইরে এক আশ্রমে থাকেন। তাঁর কাছ থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে  আমি কিছুটা পেয়েছি সেই ক্ষমতা। ভূমিকম্পের পরেই আমি তাঁর কাছে গিয়েছিলাম।  তিনিও আমায় একই কথা বললেন, যদিও এই কথা সম্পূর্ণ গোপন রাখতে বলেছেন।”

একটু থেমে থেমে কোনোক্রমে সুবর্ণাক্ষী বলল, “তাহলে আমাকে বলছ কেন?”

জিনোফিরা বলল, “তোমার কাছে গোপন করে কী হবে? তুমি তো আমাদের গ্রহের নও। তুমি যে তারার জগৎ থেকে এসেছ মহাশূন্য পাড়ি দিয়ে। তুমি আমাদের কয়েকটি শিশুকে রক্ষা করবে না?”

সুবর্ণাক্ষী বলল, “আমাদের সাধ্য অতি অল্প। তবু কয়েকশো সেনোজকে আমরা নিয়ে যেতে পারি টিমোরিথ গ্রহে। গ্রহটির বায়ুমন্ডল তোমাদের এই গ্রহের মতই। তবে সেখানে সমুদ্র নেই, বিশাল বিশাল হ্রদ আছে। যে সেনোজরা আমাদের সঙ্গে যাবেন, তাঁদের ওই হ্রদেই থাকা মানিয়ে নিতে হবে। জিনোফিরা, তুমি তোমাদের নেতা ও নেত্রীদের সঙ্গে গোপনে আলোচনা করতে পারবে এই নিয়ে? আমি দিন সাতেক পরেই আবার আসবো।”  

জিনোফিরা জানিয়েছিল সে চেষ্টা করবে। আনোহিমা সেনোজদের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালিনী নেত্রী ছিলেন। যদিও বহুদিন তিনি সক্রিয় নেতৃত্ব থেকে দূরে, তবু এখনও তাঁর কিছু প্রভাব আছে। তিনি সহায়তা করলে সে অবশ্যই বহু নেতা-নেত্রীকে একত্রিত করতে পারবে। তারপরে সে তাদের ব্যাপারটা বোঝাতে চেষ্টা করবে।

সুবর্ণাক্ষী বলেছিল, “তার আগে অবশ্যই আনোহিমার কাছ থেকে পরামর্শ চেয়ো কীভাবে ও কতটা প্রকাশ করবে এই গোপন ব্যাপার। প্যানিক সৃষ্টি হলে তো কোনো লাভ হবে না, বরং ক্ষতি। সবদিক বজায় রেখে কয়েকশো নির্বাচিত সেনোজ শিশুকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে।”

নীরবে সম্মতি জানিয়েছিল জিনোফিরা। অল্প বয়স হলেও সে খুবই পরিণতমনস্ক।এই পর্যন্ত কথা হয়েছিল সেইদিন।

তারপরেই শিমুরাহা থেকে বিদায় নিয়ে ক্যাম্পে ফিরে আসে সুবর্ণাক্ষী।   

ইয়ানের কন্ঠস্বরে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরল সুবর্ণাক্ষী। ইয়ান বলছিল, “বর্ণা, শাটল উঠতে দেরি আছে। চল, একটু কফি খেয়ে আসি। যাবি?”

“হ্যাঁ, চল।”

দু’জনে হাঁটা দিল অস্থায়ী কফিশপ তাঁবুর দিকে। আজকে ঝলমলে নীল রোদ্দুর, মেঘ নেই আকাশে। ঝকমক করছে নীল নক্ষত্র ঈশম, সেনোজদের আবাশিমা, অখন্ড উজ্জ্বলতা।   

তাঁবুর বাইরে ছোটো ছোটো ফোল্ডিং চেয়ারে বসার ব্যবস্থা। তাঁবু থেকে কফি নিয়ে সেইখানে এল ওরা। সুবর্ণাক্ষীর মনে হচ্ছিল ইয়ান কিছু বলতে চায়, সেটা ভিড়ের মধ্যে নয়, একটু নির্জনে। কফি-শপের এখানে তারা দু’জন ছাড়া অন্য কেউ এখন নেই। বসল দু’জনে দু’টো চেয়ারে।  

কফি খেতে খেতে ইয়ান বলল, “জানিস, আমান্দা আর সত্রাজিৎ বলছিল যে ডক্টর ইভান্স ওদের জেরা করছিলেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তোর সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করছিলেন। আমার সম্পর্কেও।”

কফিতে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল সুবর্ণাক্ষী। কিছু বলল না।

ইয়ান গলা নামিয়ে খুব মৃদুস্বরে বলল, “আমার ভয় হচ্ছে যে হয়তো উনি আমাদের গোপন কার্যকলাপ কিছু জেনে ফেলেছেন। নতুন নতুন লোককে দলে টানতে গিয়ে অনেক কথাই তো আমাদের ফাঁস করতে হয়েছে। তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ হয়তো…” কথাটা না শেষ করেই থামল ইয়ান।

সুবর্ণাক্ষী বলে, “যদি উনি আমাদের সন্দেহ করেন বা রীতিমতন সাক্ষ্যপ্রমাণসহ ধরেও ফেলেন, তাতেই বা কী? এই ইমার্জেন্সির মধ্যে আমাদের আটকানো বা শাস্তির ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করা মানে তো রিসোর্সের অপচয়। উনি বা ওঁর সহকর্মীরা নিশ্চয় সেসব করতে গিয়ে সময় ও শক্তি অপচয় করবেন না।”

ইয়ান ধূসর মুখে মাথা নাড়ে, বলে, “ব্যাপারটা অত সহজ না রে। হয়তো আমাদের জোর করে পরবর্তী দলে ঢুকিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিলেন। তার পরবর্তী দলের সঙ্গে পাঠালেন আমাদের অপরাধের সাক্ষ্যপ্রমাণ। তখন?”

সুবর্ণাক্ষী ম্লান হেসে বলল, “তখন আমাদের বিচার হবে। বিচারে অপরাধী প্রমাণিত হলে কারাফিও গ্রহে পাঠানো হবে সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করতে। শুনেছি সেখানে কঠিন শ্রম, গভীর ভূগর্ভ খনিতে অমানুষিক পরিবেশে  কাজ করতে হয়। দন্ডিত অপরাধীরা কেউই আর ফেরে না। কয়েক মাসের মধ্যেই মারা যায়।”

ইয়ান বলল, “কারাফিওতে মারাত্মক অপরাধীদের পাঠানো হয়। আমাদের জন্য হয়তো অন্য ব্যবস্থা হবে। কিন্তু শাস্তি আমাদের যাই হোক বা না হোক কাজটা তো আটকে যাবে? “

সুবর্ণাক্ষী একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল, “সেই নিয়ে ভেবে লাভ কী বল? যা হবার হবে। এখন চল, শাটল উঠবে, গিয়ে দেখি।” 

শাটল চলে যাবার পর সবাই ক্যাম্পমুখো হল। কিন্তু ক্যাম্পে ফিরে যা শুনল তার জন্য একেবারেই তৈরি ছিল না কেউই।

ডক্টর জ্যানেট ইভান্স নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছেন। একটি রেকর্ডেড স্টেটমেন্ট রেখে গিয়েছেন পদমর্যাদায় তাঁর ঠিক পরবর্তী ডক্টর শ্রীনিবাস মধুসূদনের জন্য।

সেই স্টেটমেন্টে ইভান্স জানিয়েছেন তাঁর অনুপস্থিতিতে যেন শ্রীনিবাস দায়িত্বগ্রহণ করেন। তিনি স্বেচ্ছায় কাজ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, যেন তাঁকে খোঁজা না হয়। একটি গোটা জগৎকে ধংসের মুখে ফেলে নিজে পালাতে তিনি পারবেন না, তাই সেই জগতের সঙ্গে তিনি মিশে যেতে চান। ক্যাম্পের সকলের কাছে তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন।

অপ্রত্যাশিত এই কান্ডে সবাই হতবাক, স্তম্ভিত। তার মধ্যেও মনকে সামলে নিয়ে কাজকর্ম চালানো শুরু হল। নষ্ট করার মতন সময় তো একেবারেই নেই।

ডক্টর শ্রীনিবাস মধুসূদন খুব ঠান্ডা মাথার মানুষ। দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি একের পর এক কাজগুলো করে যেতে লাগলেন। প্রথম দলের গন্তব্যে পৌঁছে যাবার খবর এসে গিয়েছে। তিনি দ্বিতীয় দলের যাত্রীদের খবর নিয়ে নিয়ে কনফার্ম করতে শুরু করলেন। তাদের যাত্রার সময় এগিয়ে আনা হল, দু’দিন পরেই তারা রওনা হবে। সময় অত্যন্ত কম, দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারার উপরেই হয়ত নির্ভর করছে জীবনমৃত্যু।

সেই রাতে চুপি চুপি সুবর্ণাক্ষী আবার গেল সেই জনহীন শৈলশহরে। সেই তার একমাত্র তীর্থ। যখনই তার মানসিক অস্থিরতা অসহ্য হয়, তখনই সে ছুটে যায় সেই শৈলশহরে, পাহাড়ের মাথায় সেই পরিত্যক্ত প্রাসাদে। বিশাল হলঘরের কালো পাথরের মেঝেতে গিয়ে পড়ে থাকে। 

এবারে ইয়ান কিছু জানতে পারেনি, জানলে অনুসরণ করত। সুর্বণাক্ষী একা পাহাড়ের চূড়ার কাছে সেই পাথরের প্রাসাদটিতে গিয়ে ঢুকল। ঢুকেই চমকে উঠল।

মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছেন ডক্টর জ্যানেট ইভান্স। তাঁর পোশাক ছিন্নভিন্ন, সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত, যেন ঘন কাঁটাবনের ভিতর দিয়ে এসেছেন। কপালে ক্ষত, রক্ত শুকিয়ে আছে। পাথরের উপরে পড়ে গিয়েছিলেন মনে হয়। সুবর্ণাক্ষী তাঁকে একটু স্পর্শ করেই বুঝতে পারল জ্বরে সারা গা পুড়ে যাচ্ছে ওঁর।

জ্যানেট কিন্তু অচেতন ছিলেন না, জ্বরের ঘোরে গোঙাচ্ছিলেন খুব আস্তে আস্তে। সুবর্ণাক্ষীর কাছে ওষুধপত্র কিছুই ছিল না। সঙ্গের ব্যাগে শুধু কয়েক বোতল জল আর সামান্য কিছু খাবার ছিল।

জ্যানেটের মাথাটা নিজের কোলের উপরে তুলে নিয়ে চুপ করে সুবর্ণাক্ষী বসে রইল পাথরের মেঝেতে, পাথরের থামে হেলান দিয়ে। কী করবে বুঝতে পারছিল না। এত জ্বরের উপশম হবে কী করে? এত ক্ষতবিক্ষত অবস্থারই বা কী চিকিৎসা করতে পারে সে? কিছুই তো নেই হাতের কাছে।  এমন অবস্থা এঁর হলই বা কেমন করে? 

কিছুই আর ভাবতে পারল না সুবর্ণাক্ষী, হঠাৎ গভীর ক্লান্তি তাকে ঘুমের মধ্যে ডুবিয়ে দিল। থামে হেলান দেওয়া অবস্থাতেই সে ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘুমের মধ্যে আশ্চর্য এক স্বপ্ন। একটা বিশাল সবুজ সুড়ঙ্গ, সেটা কোমল আলোয় ভরা। সুড়ঙ্গের আস্বচ্ছ দেওয়ালের ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে কাদের যেন ছায়া-ছায়া অবয়ব। কিন্তু তারা কাছে নয়, অনেক দূরে। সুড়ঙ্গের ভিতরের শূন্যতা চিকমিকে বিদ্যুতে ভরা, তার মধ্য দিয়ে ভেসে চলেছে একটা গোলক।

গোলকটা স্পেস থেকে দেখা সোফিয়ার মতন। জলের আবরণ জড়ানো এক প্রাণময়ী গ্রহ। এই গ্রহ। দু’টি চাঁদ নিয়ে যে পরিক্রমা করছে নীল নক্ষত্রকে ঘিরে। ওই নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয়ে যাবে আর মাত্র কয়েকমাস পরেই। সোফিয়ার চিহ্নমাত্র আর থাকবে না। কিন্তু এখন সেই সোফিয়াকে ওইভাবে দেখছে কেন সে? এটা কি শুধুই স্বপ্ন? নাকি অন্য কিছু?

শেষ রাত্রে সে জেগে উঠল। ভীষণ একটা আলোড়নে যেন সব কাঁপছে, কিন্তু ভূমিকম্প নয়, মেঝে স্থির। জানালা দিয়ে যে আলো আসছে তাকে চাঁদের আলো বলে মনে হচ্ছে না, ঈশমের আলোও নয়, স্পন্দিত ঢেউয়ের মত রক্তাভ-বেগুনি আলো, এমন আলো কোনোদিন দেখে নি সুবর্ণাক্ষী।

তার মনে পড়ছিল একটা সুপ্রাচীন কবিতা, সেখানে কবি কল্পনা করেছেন এক আশ্চর্য জগৎ যেখানে আমাদের পরিচিত কোনো আলো নেই, কিন্তু অন্যরকম আলো আছে। আমাদের নশ্বর মনুষ্য-চোখে সেই আলো দেখা যায় না, তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ ধরার যন্ত্রপাতি দিয়েও তার হদিশ পাওয়া যায় না। সেই অন্যরকম আলোর তুলনায় আমাদের চেনা সব আলো, সূর্যের আলো নক্ষত্রের আলো আগুনের আলো আতশবাজির আলো এমনকি তীব্রদীপ্তি লেজার আলো ইত্যাদি প্রভৃতি সবই অনুভামাত্র।  

জ্যানেট জ্বরের ঘোরে একবার কেঁদে উঠলেন, বললেন, “না, না, আমি ফিরে যাব না। পালিয়ে যেতে চাই না আমি। ওহ, এত কাঁটা কেন, এত কাঁটা কেন?”

সুবর্ণাক্ষী তাঁর চুলের উপরে আলতো হাত বুলিয়ে বলল, “জল খাবেন? জল আছে।”

“জল? হ্যাঁ, জল খাবো। আহ, জল দাও।”

সুবর্ণাক্ষী বোতল বের করে সাবধানে জল খাওয়াল। তখন জ্যানেট পুরোপুরি চোখ মেললেন। উঠতে চেষ্টা করলেন, পারলেন না, আবার শুয়ে পড়লেন।

বাইরের স্পন্দিত বেগুনি আলো তখন বদলে গিয়েছে, সেই আশ্চর্য কাঁপুনিও থেমে গিয়েছে। জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে এসে পড়ল সোনালি আলো।

কেন যেন সুবর্ণাক্ষীর মনে হচ্ছিল অভাবিত, অকল্পনীয় কিছু একটা ঘটে গিয়েছে। গত রাত্রের স্বপ্নের মধ্যে তার আভাস সে পেয়েছিল। 

তাই হয়েছিল। গোটা সোফিয়া গ্রহটাই হাইপারস্পেসের ভিতর দিয়ে চলে এসেছিল দশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের মাঝবয়সী এক সোনালি নক্ষত্রের দেশে। পরিক্রমা করতে শুরু করেছিল এমন এক উপযুক্ত কক্ষপথে যেখান থেকে সেই নক্ষত্রের আলো ও তাপ এমন পরিমাণ পাওয়া যায় যা জীবনসহায়ক। সোফিয়া, সেনোজরা যাকে বলেন আবারুহা, অখন্ড গৃহ, সেই আবারুহা তার জীবজগৎসমেত রক্ষা পেয়ে গেল।

সুবর্ণাক্ষী জ্যানেটকে নিয়ে যখন ক্যাম্পে ফিরে এল তখন সেখানে রীতিমতন উৎসব চলছে। যদিও কীভাবে কী হল কিছুই বোঝা যায় নি, কিন্তু গ্রহ যে রক্ষা পেয়েছে সেই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে।

তারা দু’জনে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেল। ডঃ জ্যানেট ইভান্সকে অবশ্য দ্রুত ক্যাম্পের ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হল, তাঁর তখনও জ্বর ছিল, উপযুক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply