
পুজোর আগের এই সময়টাতে আকাশটার দিকে তাকালে, কেমন যেন কান্না পায় বাবলুর। রোদ বৃষ্টি মিলে কেমন যেন একটা লুকোচুরি ভাব। বিশেষ করে ভাদ্র মাসের শেষের দিকের দুপুরে, যখন দূরের আসমান চাচা দের পালংক্ষেত কিংবা বোসেদের পুরোনো খিড়কি পেরিয়ে যে পানের বরজ, তার উপর দিয়ে গুড় গুড় ঢাকের শব্দে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসে, তখন পুজোর দিনগুলোর কথা ভেবে ভারী মন খারাপ হয় বাবলুর। বছর দুয়েক আগের এরকম এক দুগ্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিনে ওর বাবা মারা গেছেন হঠাৎ করে। সেই থেকে বাড়িতে মা-ভাই-বোনকে রেখে এ-সময়টা সে গ্রামে আসে একা, ধান ঝাড়াতে। জমার পুকুরে জাল দেওয়া হলে সে মাছ স্থানীয় আড়তে বেচে টাকা নিয়ে ফেরে।
স্টেশনে নেমে মাঠের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে ইটাচুনা, মান্দারণ, বড়ো সরসা ডিঙোতে ক্রোশ দুয়েক পথ কখন যে পেরিয়ে যায়, খেয়াল থাকে না বাবলুর। পেটের ভেতর তখন তার যেন কয়েকশ ইঁদুর ‘ওরাম কৈ’ ‘ওরাম কৈ’ করতে থাকে। সকালের খেয়ে বেরোনো পাউরুটি-ঘুগনি ততক্ষণে পুরোটাই হাওয়া হয়ে গেছে। বর্ষা পেরিয়ে এসময়টা সকালের দিকে সূর্যের তাত অত গায়ে লাগে না। ক্ষেতের দিক থেকে আসা মেঠো হাওয়া গায়ে মেখে হাঁটতে কষ্ট হয় না বাবলুর।
সামনেই বৈকুন্ঠের মাঠ। বারো বিঘের ক্যানেলের উপরের সাঁকোটা পেরিয়ে বাঁদিক নেয় ও। এই ক্যানেলের পাশ দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে, তালনা পেরিয়ে বেলতলা। এটাই বাবলুদের পূর্বপুরুষের ভিটে। বাবার মুখে শুনেছে, ওর দাদু সওদাগরী আপিসের চাকরি নিয়ে এই গ্রাম থেকে মফঃস্বলের দিকে চলে গিয়েছিলেন সেই কোনকালে। এখনো দেশের শরিকি জমি-পুকুরের কিছু ভাগ আছে ওদের নামে, সেই দিয়েই এখন ওদের দিন গুজরান হয় এক প্রকার।
ক্যানেলের পাশ দিয়ে আসার পথে একটা শ্মশান পরে। শ্মশান এর পাশে বাবলুদের কিছুটা চাষজমি আছে। পুরো মাপের থেকে কিছু ছোটো তিলের গাছগুলোয় ফুল এসেছে। পুবের হাওয়ায় দোল খেয়ে হাঁটার পথে মানুষের গায়ে সুড়সুড়ি দেয়।
আসার পথে ওদের ভাগচাষী ঝগরু আর তার ছেলে লাখাইকে দল বেঁধে কাজ করতে দেখল বাবলু। লাখাই ওকে দূর থেকে দেখে হাসল। বয়সে সে বাবলুর থেকে কিছুটা ছোটই হবে। এ বছর স্কুল ফাইনাল দেবে বাবলু। আজ বিকেলে ফুটবল মাঠে লাখাইকে নিয়ে নামবে ও। ব্যাটাচ্ছেলে বল নিয়ে ভয়ানক দৌড়ায়, বাবলু ওর সঙ্গে দৌড়ে পেরে ওঠে না।
তেনাই-এর মোড় পেরিয়ে বাঁদাঘাসের বনটাকে পাশে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল বাবলু। সামনেই বামুন পুকুর, তার পারেই ওদের বাড়ি। মোল্লার ঘাট থেকেই হাঁক পারল সে, “সেজ্ ঠাকমা ও সেজ্ ঠাকমা, কোথায় গেলে সবাই? ও সুরি পিসি? ও রমা পিসি? আমি বাবলু গো।”
বাবলুর বাবার সেজ কাকার মেয়ে রমা, বাড়ির বেড়ার গেট খুলে এগিয়ে এলেন। পরনে আটপৌরে শাড়ি, মাথায় দুদিকে বিনুনী করা। বাবলুকে দেখে এগিয়ে এসে গাল টিপে দেন তিনি। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বলেন, “কিরে বাবলা, এবারে দেরি করলি যে বড়ো! আয় ভেতরে আয়।”
ভেতর থেকে অশীতিপর এক বৃদ্ধা বেরিয়ে আসেন, হাতে অষ্টাবক্র লাঠিতে ঠক ঠক করে আওয়াজ হয় মাটিতে, চোখে ঝাপসা কাচের চশমা। “ক্যা রে? ক্যা এলি? বাবলা?”
বাবলু গিয়ে প্রণাম করে, “হ্যাঁ ঠাকমা। কেমন আছো তুমি?”
“তা এবারে এতো দেরি করলি কেন বাপ? বারোয়ারিতলায় কাঠামোয় খড় বাঁধা হয়ে গেল তো, এক মেটেও শেষ হয়ে গেল বোধহয়।”
“ইস্কুলে টেস্ট পরীক্ষা ছিল গো ঠাকমা, এবার তো ফাইনাল দেব!”
“ও তাই বল, আমি ভাবি ভাদ্দরের মাঝ হতে চলল, বাবলাটা এখনো এলুনি, হারুটাকে বললুম খবর দেতে, লক্ষ্মীপুজোয় তালবড়া করেছিলুম, ছেলেটাকে ক’টা দিতে পারলুমনি…
“তা বাছা তেতেপুড়ে এয়েচিস, মাদুরটা বিছিয়ে নিয়ে বস দিকিনি। ও সুরী একটু জল বাতাসা নিয়ে আয় না মা।”
ততক্ষণে বাড়ির ভেতর থেকে আরেক তরুণী বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। বাবলুকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন “বাবলা, একটু জিরিয়ে নিয়ে বামুন পুকুরে একটা ডুব দিয়ে আয় দিকিনি, আমি ভাত বাড়ছি।”
বিকেলের দিকে হাফপ্যান্ট আর গেল বছরের একটা জামা গায়ে দিয়ে বাবলু বেড়াতে বেরোল। ঝাঁপানতলার মাঠের দিকে যাবে একবার। কচুর লতা মাড়িয়ে, জুলু ঘাসের পথ বেয়ে এগোতে গিয়ে, প্যান্টের সেলাইয়ে একটা টান অনুভব করল বাবলু। দু’পায়ের মাঝের জোড়-এর জায়গাটা আবার সেলাই করতে হবে। সঙ্গে করে আর বেশি জামাকাপড় ও আনতে পারেনি ও। আনবেই বা কী করে? সাকুল্যে মোট দুজোড়া জামাপ্যান্ট ওর। বাবা মারা যাবার পর কাকার অন্নে যৌথ পরিবারে ঠাঁই হয়েছে। কষ্ট এখন ওদের নিত্যসঙ্গী। সংসারে আয় বলতে শুধু কাকা আর ভরসা এই দেশের ধান, আলু আর মাছ বেচার কটা টাকা। তাতেও আবার কতগুলো ভাগ!
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে যায় বাবলু, চোখ তার কখন খোলা আকাশের দিকে চলে গেছে। সেনদের বাড়ির উঠোনের কামিনী গাছটা ভরে গেছে থোকা থোকা ফুলে। একটা মন কেমন করা মিষ্টি গন্ধ আসছে সেখান থেকে।
পাশের মিত্তিরদের বাগান থেকে একটা টিয়ার ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে। বাবলুর ইচ্ছে হয় ওদের বাসাগুলো দেখবার। যখন আরেকটু ছোট ছিল, তখন রমাপিসি আর সরলাপিসির সঙ্গে একবার মিত্তিরদের বাগানের বড়ো জামগাছটাতে উঠে, টিয়া পাখির বাসায় ছোট ছোট ছানা দেখেছিল। ছানাগুলোর তখনও চোখ ফোটেনি।
ঝাঁপানতলার মাঠের দিকে যাবার পথে ঝগরুদের পাড়া। এই গাঁয়ে প্রায় দুটো আদিবাসী পাড়া বোসেদের দান করা। ঝগরুরা বেসরা, কোল সম্প্রদায়ের লোক। শীতের সময় ধান ঝাড়াতে এলে, বাবলু ওদের টুসু পরব দেখেছে। কেমন আদিবাসী মেয়ে-বউরা লাল পেড়ে শাড়ি জড়িয়ে, খোঁপায় লাল প্যারা ফুল লাগিয়ে, ক্যানেলের ধারে জমা হয়ে গান করে, নাচ করে। নতুন রোদে কালো শরীরের উপর, নতুন সাদা পোশাকগুলো ঝলমলিয়ে ওঠে।
ঝগরুর বাবা ডমরু সর্দার। গাঁয়ের লোকে ওকে এই নামেই ডাকে। দড়ির মতন চেহারার বুড়ো লোকটাকে সবাই খামোখা সর্দার বলে কেন, সেই নিয়ে বাবলুর মনে খুব কৌতূহল জাগে। সর্দার তো সাধারণত ডাকাত দলের মাথাকে বলে, বাবলু তাই জানে, তবে কি ডমরু ডাকাত? নাকি ও এই আদিবাসী বস্তির মাথা? প্রায় নব্বইয়ের কাছে বয়স, কিন্তু এখনও কি শক্ত শরীর লোকটার! লাখাই আর অন্যান্য সাঁওতাল ছেলেরা যখন মাঠে ফুটবল খেলে, ডমরুও তখন মাঠের ধারে বসে থাকে চোখ লাল করে। লোকটা মনে হয় নেশা করে। বাবলু শুনেছে নেশা করলে লোকের চোখ লাল হয়।
চৈত্রমাসে ঝাঁপানতলায় ডমরু চড়কে ওঠে, পিঠ ফুটো করে চড়কগাছ থেকে শূন্যে ঝুলে পড়ে। বাঁদনা পরবের দিনে এই ডমরুকেই সে দেখেছে সাদা ফতুয়া আর খাটো ধুতি পরে, কপালে লাল তিলক কেটে মোরগ লড়াই করাতে। তাকে ঘিরে তখন পুরুষ-মহিলা মেশানো একটা দল ঘুরে ঘুরে, মাদল বাজিয়ে নাচ গান করে। বারোয়ারিতলার পুজোতে অনেক আগে পাঁঠা বলি হত। এই ডমরুই নাকি বলি দিত। বড়ো বড়ো পাঁঠা সে একাই চ্যাংদোলা করে হাড়িকাঠে ঢোকাত, তারপর হাঁসুলীর এক কোপে ধর থেকে মাথাটা আলাদা করে দিত। সে-সময় নাকি তার চোখদুটো জ্বলত। বলির রক্ত পাঁচ আঙুলে করে কপালে মাখা, সে যেন সাক্ষ্যাৎ অসুর! এসবই বাবলু ঠাকুমাদের থেকে শুনেছে। ঝগরুদের বাড়িটার গায়ে কী সুন্দর লতাপাতা আঁকা! কী সুন্দর তার রং! দেখে, ওদের মফস্বলের বাড়ির কাছে, পোটোপাড়ার কথা মনে পড়ে বাবলুর।
বামুনপুকুরে আজ নাইতে গিয়ে বাবলুর সঙ্গে সেই কচ্ছপটার দেখা হল। এ ব্যাটা জলের অনেক নীচে থাকে, ওপরে আসে না চট করে। তবে বাবলু দেখেছে ও বামুনপুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন কোমরে গামছা জড়ায়, কচ্ছপটা ঠিক জলের অনেক তলা থেকে উঠে এসে মুখ বার করে। তারপর আস্তে আস্তে পাড়ে উঠে আসে। কচ্ছপটার এই বামুনপুকুরে অনেকদিনের বাস। এই চত্বরের জমিদার কুণ্ডুরা কোনো এক রাসপূর্ণিমার আগে ওকে এই পুকুরে ছেড়েছিল। এখনও রাসের সময় দেশে এলে, বাবলু দেখতে পায় কুন্ডুদের কুলপুরোহিত মাথায় পিছনে বিশাল টিকি দুলিয়ে, কপালে লম্বা তিলক এঁকে, বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছে আর রাজবাড়ির লোকেরা একটা বিশাল ছাতা মাথায় দিয়ে, পুকুরে চারামাছ আর কচ্ছপ ছাড়ছে। এই পুকুরে বাবলুদের, মানে বেলতলার বোসেদের একটা ভাগ আছে। কিন্তু এই পুকুরে মাছ ধরা বারণ। বাবলু কচ্ছপটার জন্য বাড়ি থেকে লুকিয়ে শসা, গাজর নিয়ে আসে। প্রথম প্রথম ও ভয় পেত। এখন কচ্ছপটা ওর বন্ধু হয়ে গেছে। বাবলু শসাগুলো ওর মুখের কাছে ধরে আর কচ্ছপটা মুখ বাড়িয়ে ওর নরম মাড়ির দাঁত দিয়ে সেগুলো চিবোয়। ওদের বন্ধুত্বের এই সমীকরণ গড়ে উঠেছে আস্তে আস্তে, লোকচক্ষুর আড়ালে। এ-পুকুরের হাঁসগুলোকেও চৈ চৈ বলে ডাকলেই বাবলুর দিকে চলে আসে সব দল বেঁধে। ডাকটা ও সুরিপিসির থেকে শিখে নিয়েছে। পুকুরে দুটো প্রমাণ সাইজের পোষা কাতলা মাছ আছে, নাকে রুপোর নথ পরানো। বছরে দু’একবার ওদের জালে ধরে, মুখে ফুঁ দিয়ে ছেড়ে দেয় কুন্ডুদের জেলে। বাবলু ওদের মাঝে মাঝে দেখতে পায়, গায়ে একরাশ শ্যাওলার মাঝে রুপোলি ঝলক তুলে মাছগুলো যেন ওর মন খারাপের দিনে এসে কথা বলে যায় ওর সঙ্গে। এই পুকুর, এই মাছ, এই কচ্ছপ-হাঁসের দল দেশে আসার অন্যতম আকর্ষণ বাবলুর কাছে।
হঠাৎ বাবলুর মনে পরে বারোয়ারিতলার কথা। আসার পথে দেখে এসেছে, কানাই কুমোর একমেটে শেষ করে এনেছে প্রায়। ক্ষেতের এঁটেল মাটির সঙ্গে ক্যানেল পাড়ের বালি মিশিয়ে, ছাঁচে দিয়ে রেখেছে। সামনের মজে যাওয়া পুকুর আর তার বুড়ো হয়ে যাওয়া শান বাঁধানো পাড়ের ওপর আঁধার আঁচল টেনে সন্ধে নামছে। গৃহস্থের বেড়া বেয়ে উপচে পড়ছে সাদা জবার দল। দেখতে দেখতে মনটা অকারণ আনন্দে নেচে ওঠে বাবলুর।
এই পথে, মাঠের শেষপ্রান্তে বুড়ো বটগাছটার প্রকান্ড শরীরের ডালপালা পেরিয়ে ধর্মরাজ মন্দির পরে। বটগাছটার শরীর বেয়ে নেমে আসা ছায়ার মত ঝুড়িগুলো বেয়ে, কয়েকটা কালো শরীর ওকে এদিকপানে আসতে দেখে, ধুপধাপ মাটিতে লাফ মারে। একটা হাফপ্যান্ট পরা ছেলে, আদুর গায়ে সাইকেলে হাফ প্যাডেল করতে করতে, বাবলুর ঠিক পেছনে এসে বেল দেয়। বাবলুর খুব রাগ হয়। বটগাছের লাগোয়া একটা প্রকান্ড অশ্বত্থ গাছের তলায়, একটা গোল মতন পাথরকে সিঁদুর পরিয়ে, লাল সুতো জড়িয়ে রাখা। সামনে অনেকগুলো মাটির ঘোড়া ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে।
ভাদ্র সংক্রান্তিতে এইখানে ঘোড়া দিয়ে মানত করতে হয়। ছোট্ ঠাকমা বলে, “ধম্ম রাজের থানে মানত করলে, রাজার মতন ছেলে হয়।” রাতভোর পুজোর পর ভোরের প্রথম আলোয় যার মানতের ঘোড়ার একটা পা ভাঙা পাওয়া যাবে, ধর্ম ঠাকুর তার ঘরে সাক্ষ্যাৎ সন্তানরূপে বিরাজ করবেন।
কথাগুলো মনে আসতে বাবলুর ভারী হাসি পায়। ধম্মঠাকুর বুঝি ছোটো ছেলে! সারা রাত ধরে মাটির ঘোড়াগুলো নিয়ে খেলা করে, একটার পা ই ভেঙে ফেলে! তবে ঠাকমার মুখে বাবলু শুনেছে, ওর বাবাও নাকি এই থানের দোর ধরা।
চড়কের দিনে, এই ধর্মরাজের থানে আলাদা গাজন বসে। ক্যানেলের ওপারে মহানাদ, এখানকার লোকে বলে ‘মানাদে’। সেখানে জাগ্রত মহাশ্মশান থেকে যত অঘোরী তান্ত্রিকরা এসে যোগ দেয় সেই গাজনে। এই গাঁয়ের যত দুলে-বাগদী-কিস্কু-ওঁরাও দলে দলে সব যোগ দেয়। হাতে মড়ার খুলি নিয়ে নৃত্য করে, দেখলে গায়ে কাঁটা দেয়।
বারোয়ারী তলায় বাবলু যখন এসে পৌঁছাল, তখন পুরোপুরি সন্ধে। একটা ৪০ ওয়াটের বালব ঝুলছে, কানাই কুমোর কাজকর্ম সেরে হাত ধুতে গেছে। অন্ধকারে দা খুড়ো সাক্ষাৎ ভুতের মত, একটা নড়বড়ে বেঞ্চিতে বসে একটা হুঁকো নিয়ে তাতে তামাক সাজছেন। খিদে খিদে পাচ্ছিল বাবলুর। রাস্তার উল্টোদিকেই ওদের একটা ধানের পরা আছে। এদিককার জমির ধান এখানেই ঝাড়া হয়। সন্ধেবেলাতে সেখানে খ্যাপাদা তেলেভাজা ভাজে। গুটিগুটি সেদিকে এগিয়ে গেল সে।
***
দু’পয়সার মুড়ি আর খান চারেক গরম গরম বেগুনি নিয়ে, খুড়োর পাশটায় এসে বসল বাবলু। দা খুড়ো বাবলুকে ছোটো থেকেই দেখছেন। খুড়োর মেয়ে সুরীপিসিদের সঙ্গে খেলতে আসত। খুড়ো নিজে আগে জমিদার বাড়িতে গোমস্তার কাজ করতেন। এখন কিছু জমি করেছেন। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কিষেন দিয়ে চাষ করান। বাবলুকে দেখে হুঁকোটা মুখ থেকে নামিয়ে বললেন, “কিরে বাবলা এত দেরি করলি কেনে? মাঠের ধান ঝাড়া সারা হয় গিলো তো!”
একমুঠো মুড়ি মুখে বাবলু জবাব দেয়, “ইস্কুলে ছুটি পড়ার পর কয়েকদিনের জন্য মামাবাড়ি গিছলাম গো! তাই দেরি হল একটু। তুমি আছ কেমন? বিলিপিসিরা?”
“তা আছে একরকম!”
গ্রামের দিকে সন্ধে নামলে ঝুপ করে আঁধার ঘনিয়ে আসে, আশেপাশের বাড়ি থেকে শাঁখের আওয়াজ ভেসে আসে। বাবলুর মনে হয় এসময় যদি খুড়োর কাছ থেকে একটা গপ্পো পাওয়া যেত, বেশ হত। খুড়ো গল্প বলেন দারুণ। সাহস করে বাবলু বলে ফেলে সে কথা, “খুড়ো, অনেক বছর আগে এ-গাঁয়ের রাজবাড়িতে একবার ডাকাত পড়েছিল না? শোনাও না গপ্পোটা!”
জবাবে, প্রথমে কোনো কথা বলে না, হাতের হুঁকোটা নিয়ে ফুঁক ফুঁক ধোয়া ছাড়তে থাকলেন খুড়ো। বাবলু বোঝে আজ আর হবে না, খুড়োর মেজাজ নেই। হাতের ঠোঙাটা শেষ করে মুড়িয়ে পেছন দিকে ফেলে দিয়ে উঠে পড়বার উপক্রম করছে বাবলু, এমন সময় পেছন থেকে দা খুড়ো বলে উঠল, “সে কয়েক যুগ পুব্বের কথা রে বাবলা। গাঁয়ে সেবার পোবল খরা, পুরা বোশেখ-জষ্ঠি জুড়ে ঝড়জল হয় নাই, মাঠকে মাঠ ফসল জ্বলি গেছে। তখন তো ক্যানেলটাও ছিলনি, এদিকে রায় নারায়ণের কড়া হুকুম, খাজনা ফাঁকি দেওয়া চলবেক নি। যদি একঘর পেজ্জাও খাজনা কম দেয় তো, লাগাও চাবুক! এই কুন্ডুদের দপদপা তখন! রাজবাড়ির সুমুখ দিয়া পায়ে জুতা দিয়া যাবার অনুমতি নাই, জুতা মাথায় করি যেতি হবে। এইরাম এক জষ্ঠির দিনে রাজ পেয়াদায় গিয়া হাজির হইলো ডমরুর বাড়ি। চাষ বাবদ কিছু কজ্জ ছিল খাজাঞ্চিতে।
“ডমরু তখন জোয়ান মুরোদ। ধনুকের ছিলার মতন লিকলিকে চেহারা। ধরি আনি পিছমোড়া করে চাবুক চালাল ডমরুর পিঠে। লাঠির ঘায়ে তার মাথা ফাটালো। তার কোঁকড়া চুল বাইয়া তখন তাজা রক্ত চুঁইয়ে পরতিসে। বৌটারেও ধরে নিয়ে গিছিল। পরদিন বৌটার লাশ ভাসি উঠল লালদীঘির চড়ায়। আর ডমরু সেই থিকে নিখোঁজ!
“তার পর সংক্রান্তির দিনে আকাশে মেঘ উঠিছে। সে ছিল অমাবস্যার রাত। হঠাৎ আদিবাসী পাড়া জাগি উঠল। কালো আকাশডাতে শুধু লাল আর লাল! মশাল হাতে রাতের আঁধার চিরে সবার আগে ডমরু। কবে যেন ফিরে আসিছে, কেউ টের পায় নাই, তলে তলে সে বস্তির সর্দার হইছে। হাতে বর্শা, বল্লম, তির-ধনুক আর টাঙ্গি নিয়ে পর পর দুটো পাড়া ঝাঁপায়ে পড়ল কুন্ডুদের ধানের গোলার উপর। ডমরুর চোখ যেন বনবিড়ালের মত জ্বলতিসে, সে চোখ শুধু রায় নারায়ণরে চায়!
“কিন্তু তার পথ আটকায়ে দাঁড়াল কালান্তক যম, ‘ভৈরব।’ রায়নারায়ণ তার আস্তাবল থিকে পোষা হাতিটারে ছাড়ি দিসেন ডমরুদের উপর। মনিবের জান বাঁচাতি ভৈরব তার বিশাল বপু নিয়ে ঝাঁপায়ে পরিছে, পায়ে করে দলতিসে ডমরুর দলের লোকেদেরকে। হঠাৎ হাতের কুড়ালটা বিজলির মতন হাতিটার মাথার ঠিক মাঝখানে বসায়ে দিল ডমরু। একটা বিকট আওয়াজ কইরে জন্তুটা মাটিতে পইরে গেল।
“পরদিন কাক ভোরে রাজবাড়ির ফটকে, রায়নারায়ণের মুণ্ডু ঝুলতি দেখা গিসলো। সেই থেকে আশপাশের গেরামে ডমরু সর্দার আর তার ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর কথা চাউর হুই গেলো, জমিদার জোতদারদের গোলা লুঠত আর গরিব দুঃখীদের মাঝে বিলায়ে দ্যাত। পেরায় ৮০ টা খুনের মামলা সিলো উহার নামে, ডমরু সর্দারের মাথায় ইনাম ছিল তখখনকার দিনে ১০০০ টাকা।
“ইদিকে ভৈরবের মাহুত হাতিডার শোকে পাগল হুইয়া গিসলো। দিনরাত বিড় বিড় করি বিলাপ করত আর ডমরুরে শাপ কাড়ত। খুব ছোটো বয়সে হাতিডারে নিয়া আসাম থেকি এই গায়ে আসিছিল তো, হাতিডারে নিজের মেয়ির মত করি আগলাত মাহুতডা। তারপর একদিন ডমরু ধরা পড়ল। দলেরই কে যেন ধরায়ে দিল। ফাঁসির হুকুম হইল। কী কইরা জানি সে সাজা মুকুবও হইয়া গেলো। যাবজ্জেবন খাটি আবার ফেরল একদিন গাঁয়ে। সে তখন অন্য ডমরু, চোখে আর সেই আগুন নাই, চেহারায় ভাঙন ধরসে। জেলে থাকতি ফাঁসুড়েদের কাছ থেকি কবচ তাবিজ শ্যাখছিল। এখন গাঁয়ের লোকেদের সেই তাবিজ দেয়, পাঁচজনায় কয় কাজও দেয় ওর তাবিজে, গাঁয়ের লোকে আজও ওরে সর্দার বলে মান্যি গন্যি করে।”
একটানা এতক্ষণ ধরে বলে খুঁড়ো এবার থামল। একটা শুকনো দমকা কাশি এসেছে। ধরা গলার একটু বিশ্রাম চাই বোধহয়।
প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মত এতক্ষণ শুনছিল বাবলু। এবার উঠে পড়ল সে। কাল কাকভোরে জেলেরা দীঘিতে জাল দেবে, ওকে হাজির থাকতে হবে সেখানে।
***
এর অনেক পর বর্গা রেকর্ডের সময়, ওদের জমিজমা সব তেভাগা হয়ে গেছিল ভাগচাষীদের ভেতর। ঝগরু, লাখাই সবাই সমান ভাগ পেয়েছিল। আজ প্রায় ৩৪ বছর পর প্রৌঢ় চোখে সে সব স্মৃতি ভেসে ওঠে পদ্মপাতায় জমা বর্ষার জলের মত। যেন এই আছে এই নেই। এত বছর পর পুজোর সময় দেশে এসে, বারোয়ারিতলার তামসী দুর্গামূর্তির প্রতি নতজানু হয়ে ধর্মতলার দিকে এগোতে থাকে বাবলু। বারো বিঘের ক্যানেলটা প্রায় শুকিয়ে গেছে। সেখানে এখন দিব্যি ধান চাষ হয়, গরু চড়ে, ছেলেপিলেরা খেলাধুলা করে। সেই বিশাল বটগাছটা আর নেই। চৈত্রের কোন এক অনিবার্য ঝড়ে পড়ে গেছে বোধহয়!
ঝগরুদের বাড়িটা একইরকম আছে। বাড়িটার চাল বেয়ে একটা চালকুমড়ো গাছ বাইছে নধর ফ্যাকরার জাল বুনে। এক মেয়ে উঠোনে গোবর নিকোতে ব্যস্ত। ঝগরু আর নেই, সে খবর বাবলু আগেই পেয়েছিল। বাড়িটার সামনে গিয়ে ধরা গলায় বাবলু ডাকে, “লাখাই, লাখাই আছিস ঘরটো?”
দু’তিনবার ডাকবার পর বাড়ির ভেতর থেকে শিরদাঁড়া নুইয়ে একটা ন্যুব্জ চেহারা, লাঠিতে ভর দিয়ে বেরিয়ে আসে, “অরে বাবলা দাদা না? কেতো বুড়া হইন গেছিস রে?”
চেহারাটা বাবলু চিনতে পারে অতীতের স্মৃতি থেকে। আজ থেকে চৌত্রিশ বছর আগে এই চেহারাটাকেই এ গাঁয়ের লোক ডমরু সর্দার বলে ডাকত।