গল্প-ফাইটার ফড়িং-উদয়ারুণ রায় শরৎ ২০২১

উদয়ারুণ রায়ের আগের গল্প- রতনলাল কবিরাজ, জহর, ফুল ও পরীর গল্প

golpofighter (1)

ফড়িংয়ের কোনও বাড়ি নেই। ফড়িং পথ-শিশু। পথ-শিশু মানে যে শিশুরা রাস্তায় থাকে। ফড়িং অবশ্য রাস্তায় থাকে না। সে ও তার মা একটা পুরোনো আধ-ভাঙা বাড়ির সামনের দালানে থাকে। বাড়িটার দালানের পর রাস্তার ফুটপাথ। তারপর চল্লিশ ফুটের লম্বা পিচ বাঁধানো রাস্তা। সে রাস্তা দিয়ে সকাল চারটে থেকে মাঝরাত পর্যন্ত হুসহাস করে গাড়ি যায়। চার চাকা, ছয় চাকা, দশ চাকার সব ছোটোবড়ো গাড়ি। সারা দিনরাত ব্যস্ত সেই রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে নানানরকমের দোকান, ব্যাঙ্ক, উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি একদম ঝাঁ-চকচকে। কেবল ফড়িংদের ভাঙাচোরা বাড়িটাই ওই রাস্তার সুন্দর শরীরে একমাত্র ক্ষতচিহ্ন।

জায়গাটা কলকাতা শহর লাগোয়া। এককথায় গ্রেটার কলকাতা। এইসব জায়গা এখন নতুন করে সেজে উঠছে। পুরোনো বাড়ি ভেঙে উঠছে আকাশছোঁয়া আবাসন। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সাজানো-গোছানো দোকান। রাস্তার দু-ধারের নালা বাঁধিয়ে ঢেকে দিয়ে সেখানে তৈরি হচ্ছে রঙিন ফুটপাথ। স্ট্রিট লাইটে লাগছে উজ্জ্বল আলো। আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। রাস্তার চার মাথার মোড়ে লাগছে লম্বা ল্যাম্প পোস্ট চার কিংবা ছয় বাতির আলো। আর এরই মধ্যে হঠাৎ ফড়িংদের বাড়িটা নিষ্প্রাণ আলোহীন অন্ধকার একটা জায়গা। এই ভাঙাচোরা বাড়িটাতে প্রায় কুড়িটা পরিবারের বাস। যাদের আলো নেই, টয়লেট নেই, পানীয় জল নেই। এমনকি বাড়িটার এমন অবস্থা যে, সেই বাড়ি যে কখন তাসের ঘরের মতন ভেঙে পড়বে টা কেউ বলতে পারে না।

কিন্তু তার মধ্যেই ফড়িংরা দিব্য আছে। তারা কেরোসিন ল্যাম্প জ্বালিয়ে বা মোমবাতি জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করে। রাস্তার পুরসভার কলে লাইন দিয়ে জল নিয়ে নিজেদের প্রতিদিনের কাজকর্ম সারে। সামনের সুলভ কমপ্লেক্সে সারে টয়লেট আর স্নান। এত অসুবিধের মধ্যেও ফড়িংরা বেশ ভালোই আছে। আনন্দে না থাকলেও তারা দুঃখে নেই। কারণ, আনন্দ, দুঃখ বা কষ্ট তারা আলাদা করে প্রভেদ করতে পারে না। তাদের কাছে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ অথবা শীত সব একইরকম। বিশেষ দুয়েকটা দিন বাদে।

ফড়িং তার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে নিজের বাবাকে দেখেনি। একমাত্র মা-ই তার সব। তার বাবাও মা, মাও মা। সে তার মায়ের কাছে শুনেছে, তার বাবা ছিল রাজমিস্ত্রি। এই যে বড়ো বড়ো বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে তার চোখের সামনে, সেরকম বড়ো বড়ো বানাত তার বাবা। একবার অমন এক বাড়ির কাজ করতে গিয়ে পাঁচতলা থেকে নীচে পরে যায়। কোমর ভেঙে গিয়েছিল তার। অনেকদিন হাসপাতালে ছিল। তারপর একদিন আকাশে চলে গেল সে। সে সময় ফড়িংয়ের বয়স মাত্র দু-বছর। বাবা যখন বেঁচে ছিল তখন ওরা খুব ভালোভাবে থাকত। একটা ছোটো ছিমছাম বাড়িতে ভাড়া ছিল তারা। সেই বাড়িতে দুটো ঘর ছিল তাদের। রান্না করার আলাদা জায়গা ছিল। ছিল সুন্দর পরিষ্কার টয়লেট। টয়লেটের জন্য এখনকার মতো সুলভে গিয়ে লাইন লাগিয়ে কাজ সারতে হত না। পানীয় জলও ছিল বাড়ির ভিতরে। এই সবই তার মার কাছ থেকে গল্প শুনেছে ফড়িং। একদম শিশু বয়সে তার ভালোভাবে বেঁচে থাকার গল্প সে তার মার কাছ থেকে বুক ভরে শুনেছে। প্রাণ ভরে শুনেছে। আর না বোঝা, না জানা দিনগুলোর আনন্দে মন ভরিয়েছে। বাবা আকাশে চলে যাওয়ার পর ফড়িংদের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়েছে। বাবার চিকিৎসার জন্য ওদের যা টাকা জমানো ছিল তা খরচ হয়ে গেল। বাড়িভাড়া দিতে না পারায় ভাড়াবাড়ি ছাড়তে হল। ফড়িংয়ের বাবা ছিল মুর্শিদাবাদের মানুষ। কাজের জন্য ওর মা বাবার সঙ্গে কলকাতায় এসেছিল। বাবা না থাকাতে ওর মা ওকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু সেখানে ওদের ঠাঁই হল না। ওর মা ফড়িংকে নিয়ে চলল নিজের বাপের বাড়ি। অর্থাৎ ফড়িংয়ের মামার বাড়ি। মামার বাড়ির অবস্থাও ভালো ছিল না। তাদের নিজেদেরই পেট চলে না। তাই তারাও রাখল না ওদের। গরিব মানুষরা একবার মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিলে আর তাদের ফিরিয়ে নেয় না। ফড়িংয়ের মা আবার ফিরে এল কলকাতায়। গ্রামে থাকলে খাবার জুটবে না। কলকাতায় তবু এদিক সেদিক করে খেতে পাবে। ফড়িংয়ের বাবার এক বন্ধু তার পরিবার নিয়ে থাকে এই ভাঙা বাড়িতে। তাকে ধরে তারা এসে উঠল এই ভাঙা বাড়ির রাস্তার দিকের দালানে। দালানটারই একটা অংশ ছেঁড়াখোঁড়া কাপড় প্লাস্টিক টাঙিয়ে ঘিরে নিল ওরা। ওদের ঘর তৈরি হল। মাথার ওপর এই ভাঙা বাড়ির দোতলার ঝুল বারান্দার ছাদ। চাপড়া খসা, কিন্তু পোক্ত। ফড়িং হয়ে গেল পথ-শিশু। ফড়িংয়ের মা ঘরহীন মহিলা। এই দালানেই রোদে পুড়ে, জলে ভিজে, শীতে কেঁপে ফড়িং বড়ো হয়ে উঠতে লাগল। ফড়িংয়ের বাবা যখন ওদের ছেড়ে আকাশে চলে গেল, তখনকার পরিস্থিতি বোঝার মতো বয়স ছিল না ওর। সে এইসব গল্প ওর মার কাছেই শুনেছে। মা ওকে অতীতের গল্প বলত আর কাঁদত। মার সঙ্গে সঙ্গে ফড়িংও কাঁদত। মা এখন দুই বাড়িতে বাসন মাজে, ঘর মোছে। এক বাড়িতে বাসন মাজা, ঘর মোছার সঙ্গে সঙ্গে রান্নাও করে।

এখন ফড়িংয়ের বয়স দশ। সে খুব রোগা, কিন্তু খুব শক্ত। সে রোদে পুড়ে, জলে ভিজে, শীতে কেঁপে এই দশ বছরে একদম সিজনড হয়ে গেছে। সে কোনোদিন একবেলা খায়, আবার কোনোদিন দু-বেলা খায়। মা যেদিন দুপুরে কাজ সেরে রান্নার বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসে, সেদিন সে দু-বেলা খায়। আর যেদিন সে খাবার আনতে পারে না, সেদিন মা দুপুর তিনটে নাগাদ ফিরে রান্না করে। বিকেল চারটে-পাঁচটায় তারা খায়। কখনও শাক-ভাত, কখনও ডাল-ভাত-তরকারি। আবার কখনও মাছ বা মাংস-ভাত। সকালে কাজে যাওয়ার আগে মা তাঁকে দু’ থেকে পাঁচ টাকা দেয়। তাই দিয়ে সে মুড়ি কিনে খায়। পাঁচ টাকা পেলে মুড়ির সঙ্গে বাদাম বা চপ জোটে, কিন্তু দু-টাকা পেলে শুধুই মুড়ি। আগে সে যখন ছোটো ছিল, তখন সে মায়ের আঁচল ধরে তার সঙ্গে কাজের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরত। এখন বড়ো হয়ে যাওয়ায় সে মায়ের সঙ্গে আর যায় না। একাই ওদের প্লাস্টিক ঘেরা দালানে থাকে।

ফড়িং ক্লাস থ্রিতে পড়ে। ওদের স্কুল বসে সন্ধে পাঁচটায়। ওটা পথ-শিশুদের স্কুল। ফড়িংদের বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা প্রাইমারি স্কুলে ওদের ক্লাস হয়। ওদের স্কুলে তিনজন দিদিমণি ও একজন মাস্টারমশাই আছে। ওই চারজন ওদের খুব ভালোবাসে। স্কুল শুরু হওয়ার আগে ওরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ‘জনগণ-মন-অধিনায়ক’ গায়। দিদিমণিরা বলেছে ওটা জাতীয় সংগীত। ও জানে, এই দেশের নাম ভারতবর্ষ। ও যেখানে থাকে সে রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ এবং ও যে শহরে থাকে অর্থাৎ ওদের প্লাস্টিক ঘেরা ভাঙা বাড়ির দালানটা যে শহরে, তার নাম কলকাতা। ফড়িং এও জানে, ও একজন কলকাতা শহরের পথ-শিশু।

পথ-শিশু কথাটা ফড়িং প্রথম শোনে পনেরোই আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের দিনে। ওর সে-সময় সাত বছর বয়স। তখন ইনফ্যান্টে পড়ে সে। সেদিন ওদের লাইন দিয়ে স্কুলের মাঠে দাঁড় করানো হয়েছিল। প্রত্যেককে একটা নতুন জামা, একটা নতুন হাফ প্যান্ট দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল এক প্যাকেট বিস্কুট আর এক প্যাকেট লজেন্স। সকাল থেকেই স্কুলের মাঠে তিনরঙা একটা পতাকা উড়ছিল। পতাকা তোলবার সময় পতাকার ভিতর থেকে ফুল ঝরে পড়েছিল।

“ওটা কী?” এক দিদিমণিকে জিজ্ঞাসা করেছিল ফড়িং।

ওই দিদিমণি একগাল হেসে বলেছিল, “ওটা জাতীয় পতাকা। ভারতবর্ষ হল আমাদের দেশ। ভারতবর্ষ যে স্বাধীন, ওই পতাকা হল তার প্রমাণ।”

“স্বাধীনতা কী, দিদিমণি?” অবুঝের মতো প্রশ্ন করেছিল ফড়িং।

“বড়ো হও, বুঝতে পারবে স্বাধীনতা কাকে বলে।” ফড়িংয়ের দুই গাল টিপে দিয়ে হেসে বলেছিল ওই সুন্দরী দিদিমণি।

সেদিনই ‘পথ-শিশু’ কথাটা প্রথম শুনেছিল ফড়িং। ইয়া বড়ো একটা ঝকঝকে গাড়ি চেপে একটা চকচকে লোক এসেছিল সেদিন। সে লোকটাই ওদের হাতে জামা, প্যান্ট, বিস্কুট, লজেন্স তুলে দিয়েছিল। সেই লোকটাই মাইকে বলেছিল, “এই পথ-শিশুদের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। ওরা যাতে ঠিকমতো লেখাপড়া শেখে সেইদিকে আমাদের সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। ওরাই দেশের ভবিষ্যৎ…”

সবাই বলছিল লোকটা মন্ত্রী, দেশের নেতা। ফড়িং তখন অল্পস্বল্প পড়তে জানে। ওর মা ওর রান্নার বাড়ি থেকে পুরোনো একটা ছবি ভরা রূপকথার বই এনে দিয়েছিল। সেখানে রাজা, রানি, রাজপুত্র, রাজকন্যা, মন্ত্রী, কোটাল সেনাপতি এসবের গল্প ছিল। ও অল্প অল্প পড়তে পারত আর মন ভরে ছবি দেখত। মা ওকে রাতের বেলায় ওই বই থেকে গল্প পড়ে শোনাত। কেরোসিন কুপির আধো অন্ধকার আলোতে ও মার মুখে রূপকথার গল্প শুনত। সেই আঁধার মেশানো আলোতে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে ওর নিজের মাকে মনে হত কোনও অজানা দেশের রানি। আর নিজেকে মনে হত সেই দেশের রাজপুত্র। কিন্তু যে মন্ত্রীকে ও সেদিন দেখল তার সঙ্গে রূপকথার বইয়ের মন্ত্রীর ছবির কোনও মিলই নেই। এই মন্ত্রীর মাথায় পাগড়ি নেই। গলায় মালা নেই। কোমরে তরোয়াল নেই। মুখে ইয়া গোঁফ নেই। একটা রোগাপটকা লোক। এ আবার মন্ত্রী নাকি! ফড়িংয়ের পছন্দ হল না এই মন্ত্রীকে।

সেদিন বাড়ি ফিরে ওর পাওয়া বিস্কুটের প্যাকেট থেকে একটা বিস্কুট মাকে দিল আর একটা নিজে খেতে খেতে সে মাকে প্রশ্ন করল, “হ্যাঁ মা, পথ-শিশু মানে কী?”

ওর মা তখন ইটের উনুনে কাঠ-পাতা দিয়ে রান্না চাপিয়েছে। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে তার। সে বিরক্ত হয়ে বলল, “কে শোনাল তোকে এই শব্দটা?”

ফড়িং বিস্কুট খেতে-খেতেই বলল, “ওই রোগাপটকা মন্ত্রীটা মাইকে বলছিল। মন্ত্রীটা একদম বাজে। আমার রূপকথা বইয়ের মতো একটুও নয়। বলো না মা, পচা লোকটা যে বলল পথ-শিশুর মানে কী?”

ফড়িংয়ের মা রান্না ফেলে ওর দিকে তাকাল। তারপর স্পষ্ট গলায় বলল, “পথ-শিশু মানে তোদের মতো বাচ্চারা। যাদের নিজেদের বাড়ি নেই। যারা রাস্তাতেই বড়ো হয়।”

ফড়িং ফট করে উত্তর দিল, “ও, বুঝেছি। আচ্ছা মা, আমাদের যদি পথ-শিশু বলে, তবে তোমাদের কী বলে? পথ-মা?”

এবার হেসে ফেলল ফড়িংয়ের মা। রান্না ফেলে উঠে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, “দূর বোকা ছেলে! মা কি পথের হয়? মা মা-ই হয়। মায়ের কোনও জাত হয় না। মায়ের একটাই জাত, সে মা।”

ফড়িং মায়ের আদরে তলিয়ে যেতে যেতে বলল, “তাহলে এটাই হল যে, তুমি আমার মা, আর আমি তোমার পথ-শিশু। তাই তো!”

মা হেসে ওর কপালে ওর কপালে চুমু খেয়ে বলল, “আমার পাগল ছেলেটা।”

ফড়িং এখন আর মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে না। সে সকালে মায়ের দিয়ে যাওয়া টাকা দিয়ে সামনের ভুজিয়াওয়ালার দোকান থেকে মুড়ি-বাতাসা খায়। যেদিন ওর মা একটু বেশি পয়সা দিয়ে যায় সেদিন উলটো ফুটের কচুরির দোকান থেকে দুটো কচুরি খেয়ে পেট ভরে জল খেয়ে নেয়। তারপর ওদের দালানে ফিরে গিয়ে বইখাতা নিয়ে বসে পড়তে। খুব মন দিয়ে পড়ে সে। বিকেলের স্কুলে সে দিদিমণিদের কাছে সব পড়া পারে। পরীক্ষায় সে ফার্স্ট হয়ে পরের ক্লাসে ওঠে। দিদিমণি ও মাস্টারমশাইরা ওকে গুড বয় বলে। পড়াশোনা সেরে ও পাড়ার ক্লাবে যায়। ক্লাবটা ওদের বাড়ির কাছেই। ক্লাবের পাশেই ব্যাঙ্ক। ও ক্লাবে গিয়ে টিভি দেখে। মাঝে মাঝে ক্যারম বোর্ড ফাঁকা পেলে একা-একাই ক্যারম খেলে। ক্লাবের বড়োরা ওকে খুব ভালোবাসে। ক্যারম বোর্ডে হাত দিলে ওকে বকে না। টিভি বন্ধ থাকলে ও বললে টিভি চালিয়ে দেয়। ও টিভিতে চাঁদের বুড়ি, বাঁটুল দ্য গ্রেট, ছোটা ভীম, টম অ্যান্ড জেরি, বিক্রম বেতাল, গোপাল ভাঁড়, নটে ফন্টে, কেল্টুর কীর্তি এইসব কার্টুন দেখে। ওর সঙ্গে আরও তিন-চারজন সমবয়সি ছেলেমেয়ে জুটে যায়। ও ক্লাবের বড়োদের ফাইফরমাশও খেটে দেয়। বড়োদের চা নিয়ে আসে দোকান থেকে। ক্লাব ঘরটা ঝাড়ু দিয়ে ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে দেয়। বড়োরা মাঝে মাঝে ওকে বিস্কুট খেতে পয়সা দেয়। ও সেই পয়সা দিয়ে বাপুজী কেক কিনে খায়। কেক খেতে ও খুব ভালোবাসে।

ক্লাবের মাথা ঝন্টুদা ওকে একটা ব্যাট ও বল কিনে দিয়েছে। তাই নিয়ে ওরা চার-পাঁচ বন্ধু মিলে ক্রিকেট খেলে। কখনও খেলে পিত্তুক। পিত্তুকে ওর ভীষণ টিপ। এক টিপে ও সাজানো ইটের চাড়াগুলো বল দিয়ে ভেঙে দেয়। গুলিও খেলে ফড়িং। তবে আঁটের চেয়ে টোক্কায় গুলি খেলতে ও বেশি ভালোবাসে। জিততাল খেলে সে অনেক গুলি জিতেছে। প্রায় একশো। গুলির গাইপার খেলায় সে মাস্টার। গুলি খেলার জন্য সে মার হাতে মারও খায়। তবে কোনও কারণেই সে পড়াশোনা অবহেলা করে না। সে কোনোদিন স্কুল কামাই করে না। ফড়িংয়ের ছাতা নেই। তবু সে বর্ষার দিনে স্কুল কামাই করে না। প্লাস্টিক মাথায় দিয়ে একটা প্লাস্টিকের থলেতে বইখাতা ভরে সে স্কুলে চলে যায়। ওদের ক্লাসের মিস বলেছে, এ বছর ওদের পনেরোই আগস্টে জামাপ্যান্টের সঙ্গে একটা করে রেনকোট দেওয়া হবে। ফড়িং ভাবে, রেনকোট পেলে বৃষ্টিতে ভেজার মজাটাই আর থাকবে না। বর্ষা ওর খুব প্রিয়। বর্ষার সময় যেদিন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হয় সারারাত, সেদিন মায়ের কোল ঘেঁষে শুয়ে ফড়িং বর্ষার সুর শোনে। প্রচণ্ড বর্ষার একটা ভালোলাগা সুর আছে। অনেকটা নাম না জানা গানের মতন। সেই গান শুনতে শুনতে কখন যে সে ঘুমিয়ে তা তার খেয়ালে থাকে না। ওদের দুটো কষ্টের সময়। এক বর্ষাকাল, আরেক শীতকাল। শীতের থেকে বর্ষাকে পছন্দ করে সে। ক্লাবের পাশেই একটা ব্যাঙ্ক। ফড়িং জানে ব্যাঙ্কে লোকে টাকা রাখে। ব্যাঙ্ক ঠিক দশটায় খোলে, আবার বিকেলে সে যখন স্কুলে যায় তখন ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে যায়। একদিন কৌতূহলে সে ব্যাঙ্কে ঢুকে পড়েছিল। সে দেখেছে কত মানুষ ওখানে টাকা জমা দিচ্ছে আবার কেউ কেউ টাকা পকেটে পুরে বেরিয়ে যাচ্ছে। ব্যাঙ্কের লোকগুলো গম্ভীর হয়ে বসে কম্পিউটার টিপে কাজ করছে। ফড়িং কম্পিউটার চেনে। ওদের স্কুলের বইতে কম্পিউটারের ছবি আছে। স্কুলের স্যার বলেছে, ওরা ক্লাস ফাইভ পাস করলে ওদের কম্পিউটার শেখানো হবে।

যেদিন ও ব্যাঙ্কে ঢুকেছে, সেদিন রাতে ও ওর মাকে জিজ্ঞাসা করেছে, “আচ্ছা মা, কত মানুষ ব্যাঙ্কে টাকা রাখে আবার ব্যাঙ্ক থেকে টাকা নেয়। তুমি ব্যাঙ্কে টাকা রাখতে পারো না?”

ওর মা উত্তর দিয়েছে, “না বাবা, আমাদের তো নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। আমাদের জন্য ব্যাঙ্ক নয়। যাদের অনেক টাকা, তাদের জন্য ব্যাঙ্ক বাবা।”

“নুন আনতে পান্তা ফুরোনো কী মা?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করে ফড়িং।

“ও তুই বুঝবি না। বড়ো হ, তখন বুঝবি।” বিরক্ত হয়ে বলে তার মা।

ফড়িং আর প্রশ্ন করে না। সে বোঝে, ব্যাঙ্ক ওদের জন্য নয়। আরেকটা ব্যাপার সে বোঝে, সব কথা ছোটোরা বোঝে না। সব কথা বড়ো হলে বোঝা যায়। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, বড়ো হয়ে সে এমন মানুষ হবে যাতে সে ব্যাঙ্কে টাকা রাখতে আর তুলতে পারে। তখন তাদের আর নুন আনতে পান্তা ফুরোবে না। মাকে সে দেখিয়ে দেবে। সে বড়ো হয়ে ব্যাঙ্কেই কাজ করবে। কম্পিউটার চালাবে। মানুষদের থেকে টাকা নেবে, টাকা দেবে। এইসব ভাবতে ভাবতে ফড়িংয়ের মনটা ভালো হয়ে যায়।

***

সেদিন ছিল ছাব্বিশে ডিসেম্বর। বিকেল বিকেল। চব্বিশে ডিসেম্বর থেকে ফড়িংদের স্কুলে ছুটি পড়েছে। স্কুল খুলবে সেই জানুয়ারি মাসের দুই তারিখে। ওর ক্লাস থ্রির পরীক্ষা শেষ হয়েছে তেইশ তারিখে। স্কুল খুলে রেজাল্ট বেরোবে। ফড়িং জানে সে ফার্স্ট হবে। ফার্স্ট হয়ে সে ক্লাস ফোরে উঠবে। ফার্স্ট হলে স্কুল থেকে প্রাইজ দেয়। থ্রিতে ফার্স্ট হওয়ার পর সে পেয়েছে একটা নতুন স্কুল ব্যাগ আর ঠাকুরমার ঝুলির গল্পের বই। ঠাকুরমার ঝুলির গল্পগুলো খুব সুন্দর। ও পুরো বইটা পড়ে ফেলেছে। সে একদিন তার মাকে জিজ্ঞাসা করেছে, “আচ্ছা মা, ঠাকুরমা কাকে বলে?”

মা বলেছে, “বাবার মাকে ঠাকুরমা বলে।”

“আমি বাবার মার কে হই মা?”

“তুই তোর বাবার মায়ের নাতি।”

“ঠাকুরমারা নাতিদের খুব গল্প বলে, না মা?”

“বলে হয়তো!” অবহেলার সঙ্গে উত্তর দিয়েছে ফড়িংয়ের মা।

“তবে আমরা কেন ঠাকুরমার কাছে যাই না মা? আমার কি ঠাকুরমা আছে?”

ছেলের এত প্রশ্নে বিরক্ত হয়েছে ফড়িংয়ের মা। এমনিতেই হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয় তাকে। তার ওপর দালানে ফিরলে ছেলের প্রশ্নবাণ। রেগে গিয়ে বলেছে, “তোর বাপ যেখানে, তোর ঠাকুরমাও সেখানে। বাপের ভিটেয় ঠাঁই নেই আবার ঠাকুরমার বায়না।”

মায়ের কথা ফড়িংয়ের সরল মন ঠিকমতো বোঝেনি। সে নিজের মনেই বলেছে, ‘আহ্‌, যদি ঠাকুরমা থাকত মা, সে আমাকে অনেক গল্প বলত। ঠাকুরমার ঝুলির থেকেও অনেক বেশি গল্প আমি শুনতে পেতাম।’

ছাব্বিশে ডিসেম্বর দুপুরে দালানে রোদ পড়াতে রোদে শুয়ে দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিল ফড়িং। চব্বিশ তারিখ থেকে তার প্রিয় কেক খাওয়া চলছে। স্কুল থেকে চব্বিশ তারিখ সব ছাত্রছাত্রীকে কেক আর লজেন্স দিয়েছে পঁচিশে ডিসেম্বরের জন্য। পঁচিশ তারিখ অর্থাৎ গতকাল ক্লাবের ঝন্টুদা ওদের সবাইকে কেক খাইয়েছে। দু-দিন ধরে সেজন্য মন খুব ভালো ফড়িংয়ের। তাই দুপুরে মায়ের সঙ্গে লোটে মাছের ঝুরু দিয়ে পেট ভরে ভাত খেয়ে দালানের রোদে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিকেলের ঠান্ডা হাওয়াতে ঘুম ভাঙল তার। ঘুম থেকে উঠে দালানের ওপরেই চুপ করে বসে ছিল সে। ঘুমের রেশ তখনও কাটেনি। সামনে ক্লাব ঘরটা বন্ধ। এখনও ক্লাবে কেউ আসেনি। ক্লাবের পাশে ব্যাঙ্কটা তখনও খোলা। ব্যাঙ্কের দরজা দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে এল ঝন্টুদার বয়সি ছ’টা ছেলে। প্রত্যেকের মুখ টুপি দিয়ে ঢাকা। এই টুপিগুলো ও চেনে। ওর অমন একটা টুপি আছে। টুপিগুলোকে মাঙ্কি ক্যাপ বলে। এই টুপি পরলে শুধু চোখ দেখা যায়। ওদের মধ্যে তিনটে ছেলের হাতে রিভলভার। একজনের পিঠে একটা ব্যাগ। ছেলেগুলো ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে দৌড়ে ওদের দালানের দিকে চলে এল। ফড়িং খেয়াল করল, ওদের দালানের গা ঘেঁষে তিনটে মোটরবাইক রাখা। ওরা এসে পটাপট বাইকে চেপে বসল। এর মধ্যেই ব্যাঙ্কের ভিতর থেকে সোঁ সোঁ করে সাইরেন বেজে উঠল। ফড়িং বুঝতে পারল একটা কিছু বিপদ ঘটেছে। আর বিপদ ঘটিয়েছে ওই ছ’টা ছেলেই। সে চট করে উঠে দাঁড়াল। দৌড়ে গেল দালানের একপাশে মার আধভাঙা ইট দিয়ে তৈরি উনুনের দিকে। উনুন থেকে পোড়া ছাই মাখা দুটো আধলা ইট তুলে নিল সে। ডান হাতের ইটটা সে পিত্তুক খেলার টিপে সজোরে ছুঁড়ে মারল প্রথম বাইকটা লক্ষ করে। বাইক তিনটে তখন সবে স্টার্ট দিয়েছে। ইটটা সপাটে গিয়ে লাগল প্রথম বাইক চালকের হেলমেটে। আচমকা আঘাতে টাল সামলাতে না পেরে বাইক নিয়ে রাস্তায় পড়ে গেল আরোহী দুজন। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না ফড়িং। বাঁ হাতে ধরা আধলা ইটটা সে ডান হাতে নিয়ে আবার ছুঁড়ে দিল দ্বিতীয় বাইকটা টিপ করে। এবারও লক্ষ্যভেদ। তবে এই ইটটা গিয়ে পড়ল বাইক চালকের মুখে। ‘উরি বাবা’ বলে দ্বিতীয় বাইকের দুজনও চিৎপটাং। দুটো বাইককে শুয়ে পড়তে দেখে তৃতীয় বাইকের দুজন হুড়মুড় করে বাইক নিয়ে চম্পট দিল। আচমকা বাইক থেকে মুখ থুবড়ে পড়াতে যাদের হাতে রিভলভার ছিল তাদের হাত থেকে ছিটকে গেল আগ্নেয়াস্ত্রগুলো। ফড়িং ইট ছুড়তে ছুড়তে পরিত্রাহি চিৎকার করছিল ‘ডাকাত, ডাকাত’ বলে। প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষজন মুহূর্তে বুঝে গেল কী ঘটতে চলেছে। তারা সকলে ঝাঁপিয়ে পড়ল ব্যাঙ্ক ডাকাত ধরতে। সবাই মিলে ধরেও ফেলল পড়ে যাওয়া চার ডাকাতকে। চলল বেদম প্রহার। পুলিশ এল। চার ডাকাত ধরে দেওয়ায় লালবাজার থেকে ফড়িংকে দেওয়া হল সাহসী শিশুর পুরস্কার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ওদের একটা বাড়ির ব্যবস্থা করে দিলেন থাকবার জন্য। আর পাড়ার ক্লাব থেকে ঝন্টুদারা ওর নাম দিল ফাইটার। ফড়িং আর পথ-শিশু রইল না। পাড়ায় ওর নাম হল ফাইটার ফড়িং।

golpofighter (2)

অলঙ্করণ-তথাগত চট্টোপাধ্যায়

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s