অনন্যা দাশ -এর সমস্ত লেখা একত্রে

“বুবাই তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে – এখুনি বেরোতে হবে, দারুণ হবে জরুরি ব্যাপার”, লিমা ঘরে ঢুকেই বুবাইকে বলল।
“কী ব্যাপার বলবি তো!”
“চল না যেতে যেতে বলছি – তুই তৈরি হ, আমি জেঠিমাকে বলে আসছি,” বলে লিমা সাঁ করে রান্না ঘরে চলে গেল।
লিমা গজা খেতে খেতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখল বুবাই রেডি।
“আসছি মা” আর “আসছি জেঠিমা” বলে দুজনে বেরিয়ে পড়ল। তার আগে অবশ্য বুবাইয়ের ভাই টুবাইকে আটকাতে কিছুটা সময় গেল। টুবাই ক্লাস ফোরে পড়ে – পরদিন ওর ক্লাস টেস্ট বলে জেঠিমা কিছুতেই ওকে যেতে দিলেন না।
নিচে নেমে লিমা বলল,“চল মামার গাড়িতে বসে তোকে সব বলছি। চাবিটা নিয়ে এসেছি, দেখি খুলতে পারি কিনা – মামা একটু পরেই এসে পড়বে, মার সাথে কথা বলছে।”
গাড়িতে বসে লিমা বলল, “রাধাদি, যে আমাদের বাড়িতে কাজ করে, তার বরকে আজ পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।”
“তাই নাকি? কেন?”
“রাধাদির বর বুধনদা আমার মামার অফিসের একটা গোডাউনের চৌকিদার ছিল এক সময়। পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছিল বলে ওকে চাকরি থেকে বার করে দেয় চারমাস আগে। আসলে গোডাউনের ইনচার্জ তার নিজের লোককে ঢোকাবে বলে ওর নামে কাজ ফাঁকি দেয় এই অজুহাত দিয়ে ওর পা ভাঙা অবস্থায় ওকে বার করে দেয়। যাই হোক তারপর তিনমাস ভাঙা পা নিয়ে বুধনদা বাড়িতে বসে ছিল। কিন্তু অন্য একটা কম্পানিতে কাজ পেয়ে গেছে, তবে এই কাজটা দিনের বেলার। এখন হয়েছে কি, মামাদের গুদামে চুরি হয়েছে। গারমেন্টসের চারটে বাক্সে প্রায় ২০০টা এক্সপোর্ট কোয়ালিটির মাল বোঝাই ছিল – সব হাওয়া হয়ে গেছে। নতুন দারোয়ান বলেছে যে সে নাকি কাল রাতে বুধনদাকে দেখেছে। মামা তাই পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে মার আর রাধাদির সাথে কথা বলতে এসেছিল। রাধাদি বলেছে বুধনদা কাল বাড়িতেই ছিল। কিন্তু ওর কথা কি কেউ শুনবে? মামা বলছিল এখান থেকে প্রথমে গোডাউনে যাবে তারপর পুলিশের কাছে তাই আমি ভাবলাম আমরাও না হয় দেখে আসি, কি বল?”
“হ্যাঁ, তুই বা ন্যান্সি ড্রিউ হবার চান্স ছাড়বি কেন?” বুবাই ফোড়ন কাটল।
“তোকেও তো ফেলুদা হবার সুযোগ দিচ্ছি! দেখ যদি কিছু করতে পারিস!” তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “না রে! রাধাদি খুব কান্নাকাটি করছে আর ও তো আমাদের বাড়িতে অনেক দিন কাজ করছে তাই বুধনদাকেও আমরা ভাল করেই চিনি। ও চুরি করবে বলে তো আমার মনে হয় না।”
গোডাউনটা শহর থেকে একটু দূরে ফাঁকা একটা জায়গায়। মামার গাড়িতে করে লিমা আর বুবাই যখন ওখানে গিয়ে পৌঁছল তখন বিকেল প্রায় সাড়ে পাঁচটা। অন্য লোকজন সব বাড়ি চলে গেছে। শুধু নতুন চৌকিদার রামদীন বসেছিল। মামাকে দেখেই সেলাম করে ছুটে এল।
“সিংজি কোথায় রামদীন? ওনার তো থাকবার কথা ছিল। পুলিশের কাছে যাব বলেছিলাম।”
“সিং সাব একটু বাড়ি গেছেন, বলেছেন এখুনি চলে আসবেন। পুলিশের ওখানে কত দেরি হবে জানা নেই তাই একটু চা-পানি, হেঁ হেঁ-”
“আচ্ছা ঠিক আছে। কী কী গেছে তার লিস্ট হয়েছে কিনা জানো? আমাকে যা বলা হয়েছিল তা ছাড়া আরো কিছু গেছে কিনা জানো? পুলিশ তো লিস্ট চেয়েছিল, ওদের দেওয়া হয়েছে?”
“হ্যাঁ, গুপ্তা সাব আর সিং সাব মিলে লিস্ট তৈরি করেছেন – উরা কে সাহেব আপনার সাথে?”

“ও, এই আমার ভাগ্নি লিমা আর এটা বুবাই।”
“বহুত আচ্ছা!” বলে রামদীন মাথা নাড়ল।
রামদীনের হাবভাব লিমার একটুও ভাল লাগছিল না। কেমন একটা হেঁ:, হেঁ: ভাব সব সময়, হাসিটা কিন্তু একেবারে নকল।
বুবাই হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল, “রামদীনদা, তুমি চোরকে দেখেছো?”
রামদীন তো গল্প বলার সুযোগ পেয়ে ভীষণ খুশি। বলল, “কাল রাত তখন একটা হবে, আমার একটু ঘুম চলে আসছিল বলে আমি গোসলখানায় গিয়ে চোখে মুখে একটু জল দিয়ে আসতে গেছিলাম। ফিরে এসে যেই বসেছি, অমনি কি সব ধুপধাপ শব্দ শুনলাম। কৌন হ্যায়, কে কে বলে ছুটে গিয়ে দেখি দুটো লোক বাস্কো নিয়ে পালাচ্ছে – আমি ধরতে ধরতে পালিয়ে গেল! একটা লোককে তো আমি চিনি না, কিন্তু বুধনের মুখ আমি ঠিক দেখতে পেয়েছি চাঁদের আলোয়। আমি তখন সিংজিকে ফোন করলাম, কিন্তু উনি মনে হয় ঘুমোচ্ছিলেন তাই ফোন ধরলেন না। সকালবেলা যখন সবাই এলো তখন উদেরকে বলে আমি শুতে গেলাম। এখন শুনছি চারটে বাস্কো গেছে! ওই বুধন ব্যাটাই নিয়েছে আমি জানি।”
বুবাই মামাকে অন্যদিকে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “মামা ও মিথ্যে কথা বলছে! কালকে রাতে তো অমাবস্যা ছিল – টুবাইকে ফেজেস অফ দা মুন পড়াচ্ছিল বাবা কাল। তখন মা পাঁজি দেখে বলে অমাবস্যা নাকি গতকালই ছিল – তাহলে ও চাঁদের আলোয় বুধনদাকে দেখল কী করে?”
“কাল তো অমাবস্যা ছিল তাহলে তুমি চাঁদের আলোয় বুধনকে দেখলে কী করে?” মামা রামদীনকে কথাটা বলতেই রামদীন এক লাফে চেয়ার উলটে ফেলে দৌড়ে পালাল। ওরা তিনজনেই হতবাক!
মামা তক্ষুনি পুলিশ স্টেশানে গিয়ে রামদীনের নামে কমপ্লেন লেখাল আর বুধনকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করল। থানার ও সি বুবাইয়ের বুদ্ধির প্রশংসা করে মামাকে শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করলেন, “সকালে যখন আমরা বুধনকে অ্যা্রেস্ট করলাম তখন আপনারা কোথায় ছিলেন?”
মামা বলল, “সিংজী আমাকে খবর দেওয়ার আগেই আপনাদের কাছে বুধনের নামে নালিশ করেছে। আমি সকালে একটা কাজে বাইরে গিয়েছিলাম। ফিরে তিনটে নাগাদ জানতে পেরেছি। তখনি আমি লিমা বুবাইকে তুলে গোডাউন থেকে রামদীন আর সিংজীকে নিয়ে আপনাদের কাছে আসছিলাম তদন্ত কতদূর এগোল জানতে।”
ও সি কথা দিলেন বুধনকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছেড়ে দেবেন।
***
রাত নটার সময় মামার ফোন এলো যে রামদীন আর সিংজিকে পুলিশ ধরে ফেলেছে। চোরাই মাল সব ওদের বাড়িতেই পাওয়া গেছে। চারটে বাক্স ওরা দু তিনদিন আগেই সরিয়েছিল। আজ সকালে গুপ্তাজি মান্থলি স্টক চেক করছেন দেখে ওদের মাথায় বাজ পড়ে। নিজেদের গা বাঁচাতে ওরা বুধনের নামে চুরির দোষ চাপায়। গুপ্তাজি মাল শর্ট পান এবং তখন সিংজি বুধনের নামে পুলিশে রিপোর্ট করে দেন। পুলিশ এসে বুধনকে ওর কাজের জায়গা থেকে ধরে নিয়ে যায়। সিংজি ভাবতে পারেননি যে রামদীনের রঙ চড়ানোর অভ্যাসটাই ওদের ধরিয়ে দেবে! আসলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।
লিমা বুবাইকে খবরটা দিতে বুবাইদের বাড়ি গেল। খবরটা বুবাইকে দিয়ে বলল, “জানিস মামা জিজ্ঞেস করছিল তোর কী ভাল লাগে?”
“তুই কী বললি?”
“আমি বললাম ক্রিকেট, আবার কি! মামা বলেছে এবার ইডেনে যে ওয়ান ডে ম্যাচটা আছে তার টিকিট যোগাড় করবে আমাদের জন্যে – দারুণ হবে তাই না? আমরা মাঠে গিয়ে ম্যাচ দেখব!”
পিছন থেকে টুবাই বলে উঠল,“আমাকে নিয়ে যাবে তো?”
“নিশ্চয়ই নিয়ে যাব – তোর ওই ফেজেস অফ দা মুনের জন্যেই তো আসল চোর ধরা পড়ল,” লিমা হাসতে হাসতে বলল।
ছবিঃ সংঘমিত্রা