
এই সময়টার জন্যই অয়ন অপেক্ষা করে থাকে সারাটা বছর, কারণ এই শীতের ছুটিতেই ওরা সবাই, অর্থাৎ অয়ন আর ওর বাবা, মা বেরিয়ে পড়ে দেশভ্রমণে। এত অল্প বয়সেই অয়নের দেখা হয়ে গেছে দার্জিলিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য,অভিজ্ঞতা হয়েছে উটের পিঠে চড়ে রাজস্থানের মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ানোর,আন্দামানের সমুদ্রে গ্লাস বটম বোটে চড়ে জীবন্ত প্রবাল দেখার,মুসুরিতে রোপওয়ে থেকে রোমাঞ্চকর পাহাড়ের দৃশ্য দেখার,কন্যাকুমারীতে বিবেকানন্দ টিলা ইত্যাদি আরও অনেক কিছু দেখার। তাই এবছর ওর বাবা-মা ভেবেছেন যে আর কোন ট্যুরিস্ট প্লেস নয়,এবার নিরিবিলি কোন জায়গায় গিয়ে স্রেফ ছুটি কাটাবেন।
অয়নের ছোটপিসি গত কয়েকবছর ধরেই ওদেরকে মধুপুরের বাড়িতে যাবার জন্য বলে আসছেন,কিন্তু অয়নের বাবা এতদিন কোন আগ্রহই দেখান নি। তবে গতবার অয়নের পিসেমশাইয়ের মুখে ওদের মধুপুরের বাড়ির কিছু ভূতের গল্প শোনার পর থেকে বেশ একটা কৌতূহল জেগেছে। মধুপুরে যাবার প্রস্তাবটা প্রথমে বাবার কাছে থেকেই আসে। যদিও অয়নের এবার ইচ্ছে ছিল কোন জঙ্গলে যাবার, কিন্তু এই সুযোগটাও তো ছাড়ার মত নয়। ছোট থেকেই অয়নের ভূতের ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহ। বাবার কাছে গল্প শুনতে চাইলেই, বাবা নানারকম ভূতুড়ে গল্প বলে শোনাতেন। গল্প শুনতে শুনতে শুরু হয়ে যেত অয়নের হাজারো প্রশ্ন, ভূতটার ক’টা হাত-পা ছিল? ঘাড়ে মাথা ছিল কিনা? জামাকাপড় কি পরেছিল? হেঁটে এসেছিল না উড়ে? একসময় বাবা বিরক্ত হয়ে বলে উঠতেন, “ধুর,আমি কি আর দেখেছি নাকি,সবই তো লোকমুখে শোনা। আসলে ওসব ভূতপ্রেত বলে কিছুই নেই,সব ধাপ্পাবাজি।”
বাবা রাজি হলে কি হবে, অয়নের মা কিন্তু বেঁকে বসেছেন, কারণ মা সাংঘাতিক ভয় পান ভূতকে। নাম শুনলেই চোখ বন্ধ করে রামনাম শুরু হয়ে যায়। গত একমাস ধরে অয়ন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মা’কে রাজি করানোর,কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোন আশার আলো দেখা যায় নি। তাই আজ বাবার সাথে কথা বলে ঠিক করেছে যে দু’জনে মিলে মাকে বুঝিয়ে রাজি করাবেই।
বাবা কথাটা শুরু করেন, “শুনছো, এবছর বেড়াতে যাবার তো কিছুই ঠিক করা হল না। এরপর তো আর ট্রেনের টিকিট পাওয়া যাবে না।”
কিন্তু মা’র সেই একই কথা, “আমি বাপু মধুপুরে ওই ভূতের বাড়িতে যেতে পারবোনা। যা সব অলৌকিক গল্প শুনেছি ওই বাড়ির,ওখানে গেলে আর আমাকে বেঁচে ফিরতে হবে না। এই তো সেদিন টিভিতে ফিয়ার ফাইলসে দেখছিলাম ভূতটা বাড়ির বাচ্চা মেয়েটার ঘাড়ে চেপে সারা বাড়ির লোককে এমন ভয় দেখাল যে শেষে পালাতে গিয়ে সবাই মিলে পুকুরে ঝাঁপ দিল। না বাবা, আমি কিছুতেই যাব না ওখানে।”
মা’র কথা শুনে বাবা অট্টহাস্য জুড়ে দিয়ে বলেন, “আরে বাবা,ভূত বলে কিছু নেই। ভূত হচ্ছে আসলে মানুষের এক অদ্ভুত কল্পনা। মানুষের ঘাড়ে ভূত নয়, ভয় চাপে আর সেটাই মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়। তুমি যদি ভয়কে জয় করতে পার, তাহলেই বুঝতে পারবে যে ভূত প্রেত গল্প আসলে বুজরুকি ছাড়া আর কিছুই নয়।” অয়নও বাবার সাথে সমান তালে বুঝিয়ে চলে যে ভূত হচ্ছে আসলে গল্প কথা। এখনও পর্যন্ত ও যত দেশি ও বিদেশি ভূতের বই পড়েছে তার কিছুই তার বিশ্বাস হয় নি।
শেষ অবধি ওদের চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়েছে,বহু চেষ্টার পর মাকে রাজি করানো গেছে। ট্রেনের টিকিট,নিজেদের জন্য শীতের জামাকাপড়, পিসিদের জন্য উপহার সব কিছুই কেনা হয়েছে। শুধু সুটকেস গোছানোটা শেষ মুহূর্তের জন্য রাখা আছে। পিসেমশাই জানিয়ে দিয়েছেন উনি ছেলে লাল্টুকে নিয়ে স্টেশনে আসবেন। এখন শুধু দিন গোনা।
অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান হয়ে যাবার দিন এল। রাত্রের ট্রেনে যাত্রা। ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠে সকাল থেকেই গোছানো শুরু করে দিয়েছে নিজের জিনিস। জামা প্যান্ট জুতো ছাড়াও গত বছর জন্মদিনে বাবার দেওয়া ভালো ভিডিও ক্যামেরা, ক্যামেরা স্ট্যান্ড,একটা দূরবীন,বন্দুক,গুলতি ইত্যাদি। যদিও এখন পর্যন্ত ভূতে কোনও বিশ্বাস নেই অয়নের,তবে যদি সত্যি তেমন কোন অস্তিত্ব থাকে তবে দূরবীনটা ওকে সাহায্য করবে ভূত অনুসন্ধানে আর ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে ভূতের গতিবিধি রেকর্ড করে নেবে। এছাড়া বন্দুক,গুলতি,লাঠি ইত্যাদি আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন হতে পারে। আসলে প্রকাশ্যে এতদিন যতই সাহস দেখিয়ে থাক,এবার কিন্তু একটু একটু করে মনের মধ্যে ভয় জমা হতে শুরু করেছে।
সাতসকালে ট্রেন পৌঁছোল মধুপুর। পিসেমশাই স্টেশনে ছিলেন। বাড়ি গিয়ে স্নান-খাওয়া সেরেই সকলে বেড়িয়ে পড়ল ঘুরতে। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল যে শহর থেকে দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে গ্রামের ছবি দেখবে। তাই এবার আর গাড়ি নয়,ওরা সবাই চড়ে বসেছে বড় একটা সাইকেল ভ্যানে। শহর ছেড়ে যতই দূরে এগিয়ে চলেছে,ততই ছবিটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সরু পিচের রাস্তার দু’ধারে বিস্তীর্ণ ধানখেত, দূরে দেখা যায় চাষিরা আপন মনে চাষের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় না আছে গাড়ি, না আছে কান ফাটানো হর্ন বা ধোঁয়ার অত্যাচার। মাঝে মধ্যে দু’একটা সাইকেলের আনাগোনা অথবা খড় বোঝাই গরুর গাড়ির যাতায়াত। কোথাও ছোট্ট ঘরগুলোর সামনে বসে মেয়েদের রোদ পোয়ানো, আবার কোথাও হাফপ্যান্ট পরা বাচ্চাদের ছুটোছুটি করে খেলে বেড়ানো। দু’ধারে যতদূর চোখ যায় বিস্তীর্ণ এলাকা শুধু সবুজে ভরা,আর মাথার ওপরে ঘন নীলাকাশ। আগে কখনো দূরকে এতো কাছ থেকে দেখেনি অয়ন, আর আকাশ যে এতো সুবিশাল তাও ধারণা ছিল না ওর। মনে হচ্ছে সবুজ কার্পেটে বিছানো জমির ওপর মস্ত এক নীল সামিয়ানা। এ যেন এক অন্য জগত,যার সাথে কোন মিলই খুঁজে পায় না ওর নিজের শহর কলকাতার,যেখানে মানুষ সারাদিন ছুটে বেড়ায় ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে, আর সারাটা দিন কাটে চার দেওয়ালের মধ্যে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার সাথে সাথে উত্তুরে ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বেশ খানিক ঘোরবার পর পিসেমশাই বলে ওঠেন, “অনেক ঘোরা হল,এবার বাড়ি ফেরা দরকার। আজ মনে হচ্ছে বেশ ঠাণ্ডা পড়বে। বাড়ি গিয়ে আজ জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।”
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধে। রোদ ঝলমল সকালে সবুজ গাছে ঘেরা বাড়িটা যেমন উজ্জ্বল ও সুন্দর দেখাচ্ছিল,এখন চাঁদের আলোয় সেটা কেমন যেন ম্লান লাগছে। উঁচু উঁচু গাছের ছায়ায় একটা মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে,সাথে দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের ডাকে যেন গা ছমছম করা ভাব।
বাড়ি ঢুকে পিসেমশাই বললেন, “সকালে তো তাড়াহুড়োয় আমাদের বাড়িটা তোমাদের দেখানই হয়নি। এইটা আমাদের শোয়ার ঘর আর পাশেরটা লাল্টুর। এই ক’দিন লাল্টু আমাদের ঘরে শোবে, আর তোমরা ওই লাল্টুর ঘরে থাকবে। ওদিকের সিঁড়িটা ছাদে ওঠার, আর এটা হচ্ছে আমাদের বসার ঘর। এখানেই আমাদের বেশির ভাগ সময়টা কেটে যায়,গল্প করে,কাগজ পড়ে অথবা টিভি দেখে।”
উল্টোদিকের দালানটার দিকে চেয়ে অয়ন বলে, “ওইদিকে কী আছে?”
পিসে একটু আমতা আমতা করে বললেন, “ওইদিকে আর একটা ঘর আছে, তবে ওটা বন্ধই থাকে।”
শোনামাত্রই অয়নের কৌতূহলটা অনেকগুণ বেড়ে গেল। জিজ্ঞেস করল,
“কেন বন্ধ থাকে কেন? আমরা এখন গিয়ে দেখতে পারি?”
পিসে বললেন, “সে অনেক কথা। জমিয়ে না বসলে সেসব গল্প করা যাবে না। তবে ভয় পেলে কিন্তু বলবো না। তোর মা তো ভুতের নাম শুনলেই ভয়ে আধখানা।”
অয়ন সগর্বে জানিয়ে দেয় যে ভূতপ্রেতে ওর কোন ভয় নেই,বরং এইসব অলৌকিক ব্যাপার নিয়ে অনুসন্ধান করতেই ও ভালোবাসে। এক এক করে সবাই বসার ঘরের সোফা সেটে গোল করে ঘিরে বসেছে। ঠাণ্ডাটা ক্রমশ জেঁকে বসছে, তাই সবাই একটা করে মোটা চাদর জড়িয়ে নিয়েছে গায়ে। পিসেমশাই বললেন, “শুনছো,বেশ কড়া করে চা বানাও আর রামুকে বল ভোলার দোকান থেকে গরম গরম সিঙাড়া আর আলুর চপ নিয়ে আসতে। গরম ভাজিয়ে আনে যেন। মনে হচ্ছে আজ সবথেকে বেশি ঠাণ্ডা পড়েছে। আর এদিকে ভোল্টেজের অবস্থাটা দেখো, আলোগুলো মোমবাতির মত টিমটিম করছে।”
এসে গেছে ধূমায়িত গরম চায়ের সাথে সিঙাড়া এবং আলুর চপ। টপাটপ সিঙাড়াগুলো তুলে নেওয়া দেখলেই বোঝা যাচ্ছে যে খিদেটা বেশ ভালই জমেছে,আর গল্পের আসরটাও জমে উঠতে চলেছে।

পিসেমশাই বলতে শুরু করেন, “আজকের ঘোরাটা কিন্তু দারুণ হয়েছে। ওই যে শিব মন্দিরটা দেখলে,ওটা দেড়শ বছরের পুরনো। আর ওই ভাঙা জমিদার বাড়িটা চারশো,পাঁচশো,কিম্বা আরও বেশি পুরনো হতে পারে। আর ওই যে নদীটা দেখলে, ওটা বর্ষা কালে এমন ফুলে ফেঁপে ওঠে যে…”
অয়নের বাবা একমনে আলুর চপে কামড় দিতে দিতে বলে চলেছেন, “আহা, এতো ভালো চপ কতদিন যে খাইনি! কলকাতায় এমন পাওয়াই যায় না!” অয়নের কিন্তু মন পড়ে আছে ওই বন্ধ ঘরের রহস্যের পেছনে। আবার জিজ্ঞেস করে ওঠে, “এবার তাহলে ওই ঘরের গল্পটা শোনা যাক। আর, একবার কি ঢুকে দেখা যাবে না?”
পিসেমশাই চায়ে আরেকটা চুমুক দিয়ে বললেন, “বেশ,অতই যখন কৌতূহল, না বলে থাকি কী করে? তবে ভয় পেলেই কিন্তু আমাকে বলিস। আমাদের এই বাড়িটা কেনা হয়েছে প্রায় বছর পাঁচেক আগে। এই বাড়িটা ছিল রমাকান্ত যাদবের। আমরা ওকে রমা বলেই ডাকতাম। রমা ছিল এখানকার এক নামকরা ব্যবসাদার। চালকল, তেলের ঘানি, ইঁটভাটা, সুরকি কল ইত্যাদি নানা ধরনের ব্যবসা ছিল ওর। সারাবছরই নানা কর্মকান্ডে বাড়িটা গমগম করতো। বাদ সাধল ওর অপোগন্ড দুই ছেলে। বাবার টাকায় ফুর্তি মেরে শুধু যে সমস্ত ব্যবসা লাটে তুলে দিল তাই নয়,দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে উঠল রমা। ক্ষোভে, দুঃখে, লজ্জায় সে আস্তে আস্তে মানসিক ভারসাম্য হারাল। অবশেষে ছেলেদের অত্যাচার, মহাজনদের হেনস্থা আর প্রতিবেশীদের অবমাননার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে একদিন কাকভোরে গলায় ধুতি জড়িয়ে ঘরের ফ্যানের সাথে বেঁধে ঝুলে পড়ে রমা।
“এরপরই শুরু হয় যত গণ্ডগোল। ওই বাড়িতে টেঁকাই দুষ্কর হয়ে পড়ে সকলের। একের পর এক ঘটতে থাকে সব ভৌতিক কাণ্ডকারখানা। রাত বাড়ার সাথে সাথে কখনও রমার খড়ম পরে চলার খটমট শব্দ,কখনও বা ওর প্রিয় সামসাদ বেগমের গানের সুর ভেসে আসা,আবার কখনও পান চিবানোর খসখসে শব্দ।
“এই পর্যন্ত তাও সহ্যের মধ্যে ছিল, কিন্তু এরপর ওই দুটো দুর্ঘটনা ওদের সংসারটাকে ভেঙে ছারখার করে দিল। প্রথমটা ঘটেছিল রমার মৃত্যুর প্রায় আটমাস পর – দেওয়ালির দিন। আগেকার তুলনায় কম হলেও, সেবারও রমার ছেলেরা প্রচুর বাজি কিনেছিল এবং প্রদীপের আলোকমালায় সেজে উঠেছিল এই বাড়িটা। ছোটদের হাতের ফুলঝুরির ঝলকানি,মেয়েদের হাতে রংমশালের আলো আর তার সাথে সাথে বাজির হুংকারে বাড়িটা মনে হচ্ছিল যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কিন্তু রমার সবথেকে প্রিয় বাজি উড়ন্ত তুবড়িই ডেকে আনল ওই সাঙ্ঘাতিক দুর্ঘটনা। প্রতি বছরের মতো সেবারও সেই একই দক্ষ কারিগর দিয়ে বানানো হয়েছিল তুবড়িগুলো, অথচ প্রথম তুবড়িটা জ্বালিয়ে আকাশে ওড়ানোর আগেই এক বিকট শব্দে ঘটে যায় সাঙ্ঘাতিক বিস্ফোরণ,মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রমার বড় ছেলে। ওর ডান হাতটা পুরো ঝলসে গিয়েছিল। শোনা যায়, ওই সময়ে দূরে সাদা ধুতি পরা কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। বহুদিন চিকিৎসা চালিয়েও রমার বড় ছেলের ডান হাতটা রাখা যায়নি। এছাড়া শরীরের আরও অনেক অংশই দগ্ধে গিয়েছিল।
দ্বিতীয়টা ঘটেছিল আর এক উৎসবের দিন হোলিতে। বড়ছেলের চিকিৎসার খরচের ভারে ওদের আর্থিক অবস্থার তখন আরও অবনতি ঘটেছে,তাই সেবার হোলির অনুষ্ঠান ছিল খুবই সাদামাটা। শুধুমাত্র আবির খেলা। রমার ছোট ছেলে দালানে দাঁড়িয়ে দেখছিল বাড়ির মেয়েদের আবির খেলা। হঠাত মনে হল দূর থেকে কেউ এক মুঠো আবির ছুঁড়ে দিল ওর চোখে। মনে হল চোখ দুটো জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। নানান চিকিৎসা করেও ঠিক করা যায়নি চোখ দুটোকে, ফলে অন্ধই হয়ে যায় ছেলেটি।
“এছাড়া ছোটখাটো উপদ্রব লেগেই ছিল। কখনও রাতদুপুরে দরজা খোলা-বন্ধ হওয়ার ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ, কখনও আচমকা জানালার পাশ দিয়ে দ্রুত কারো সরে যাওয়া, কখনও বা সামনের বাগানে কারো হেঁটে চলার শব্দ এইসব। ভয়ে বাড়ির সমস্ত কাজের লোকেরাও একে একে পালাতে শুরু করে দেয়, ফলে বাড়িতে বাস করাই অসম্ভব হয়ে ওঠে ওদের।
“শেষে ওরা মনস্থির করে ফেলে যে বাড়িটা বেচেই দেবে। কিন্তু কিনবে কে? ইতিমধ্যে এলাকার সকলেই তো জেনে গেছে যে এই বাড়িতে রমার অশরীরী আত্মার বাস,তাই কেউই রাজি হয় না কিনতে। শেষপর্যন্ত কোন উপায় না দেখে,ওরা যে কোন মূল্যেই বাড়িটা বেচতে প্রস্তুত হয়ে যায়। এমন সুবর্ণ সুযোগ কি হাত ছাড়া করা যায়,বিশেষত আমি যখন ভূতপ্রেতে কোন বিশ্বাসই করতাম না। কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা টাকা ছিল তাই দিয়েই বাড়িটা কেনার প্রস্তাব দিই ওদের,আর সাথে সাথেই ওরা রাজি হয়ে গিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সেই থেকেই আমরা বসবাস করছি এই বাড়িতে, আর নানান রোমাঞ্চকর ভৌতিক ঘটনার সাক্ষী আমি। বেশির ভাগ অলৌকিক ঘটনাই ঘটে ওই ঘরটায়,আর তাই ওটা বন্ধই রাখা থাকে।”
এবার অয়নের দিকে তাকিয়ে তিনি বলে ওঠেন “কি ভায়া,ভয়টয় পেলে নাকি? তাও তো আমি আমার অভিজ্ঞতার কথা কিছুই বলিনি। শুনলে পায়ের রোম থেকে মাথার চুল পর্যন্ত খাড়া হয়ে যাবে। কি? শুনতে চাও নাকি সেসব কথা?”
সত্যিই, গল্প শুনতে শুনতে সারা শরীর যেন শিহরিত হয়ে উঠছিল অয়নের। কিন্তু ভয়ের সাথে কৌতূহলটাও বেড়ে চলেছে সমান তালে। তবে ভয় তো আর প্রকাশ করা যাবে না, তাই জোরের সাথে বলে ওঠে অয়ন, “ধুর,আমি ওইসব ভূতপ্রেতে কোন ভয় পাই না। এ ব্যাপারে প্রচুর বই পড়ে আমার অনেক জ্ঞান আছে, তাই কোন চিন্তা নেই। আজ আমি সব গল্প শুনতে চাই তোমার কাছে।”
পিসেমশাই আবার বলতে শুরু করেন, “ঘটনা তো অনেক আছে, কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি বলো তো? আচ্ছা,ভূতকে কখনও পাত পেড়ে খেতে দেখেছো? এরকমই একটা ঘটনা ঘটেছিল প্রায় বছর তিনেক আগে। আগের দিন লাল্টু মায়ের সাথে মামার বাড়ি গেছে দেওঘর। বাড়িতে আমি একা। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি অঝোর ধারায় বৃষ্টি। রাস্তাঘাট এক হাঁটু জলের তলায়।
“বাড়ি থেকে বেরোনোর কোন উপায় নেই। তাই সকাল থেকেই জানালার ধারে বসে বর্ষাকেই উপভোগ করা ছাড়া আর অন্য কোন কাজ নেই। বৃষ্টির দাপট দেখে মনে হচ্ছে আকাশটাই হয়তো ভেঙে পড়ে ভাসিয়ে দেবে গোটা দেশটাকে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সামনে বাড়ির টিনের চালে পড়ে একটা বিকট শব্দ করে চলেছে, আর সাথে মেঘের গর্জন। দমকা হাওয়া আর ঝড়ের দাপটে কুঁড়েঘর,গাছ, কারো রেহাই নেই। মনে হচ্ছিল সব কিছুই যেন ওলটপালট হয়ে যাবে। বৃষ্টির জলে রাস্তা,মাঠ,নালা, পুকুর সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রায় কোন মানুষই দেখা যায় না রাস্তায়, কেবল দূরে কয়েকটা বাচ্চা খালি গায়ে জলে ঝাঁপাঝাঁপি করে খেলছে।
“দেখতে দেখতে কখন যে বেলা হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। ইতিমধ্যে বৃষ্টি আরও বেড়েই চলেছে। তাড়াতাড়ি স্নান খাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম। বিকেলে ঘুম ভাঙতে দেখি ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেছে, আর মাঝে মধ্যে বিদ্যুতের আলোয় ঝলসে যাচ্ছে চোখ। আলোর সুইচটা টিপতে দেখি বিদ্যুৎ নেই। নিশ্চয় গাছে চাপা পড়ে তার ছিঁড়ে গেছে। অগত্যা হ্যারিকেনটাই জ্বালিয়ে নিলাম। দরজা-জানালাগুলো ভাল করে বন্ধ করে ফেলুদার একটা গল্পের বই নিয়ে বসে পড়লাম।
“বইটার মধ্যেই ডুবে ছিলাম, হঠাৎ মনে হল দরজায় খটখট আওয়াজ। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। একটু অবাকই হয়ে গেলাম। এমন সাংঘাতিক আবহাওয়ায় কে আসতে পারে? চুপ করে বসে একটু বোঝার চেষ্টা করছি, আবার সেই খটখট আওয়াজ। দরজাটা একটু ফাঁক করে দেখার চেষ্টা করলাম। বাইরে ঘন অন্ধকার। বিদ্যুতের ঝলকানিতে বোঝা গেল সাদা ধুতি পরা কেউ দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির বাইরে। জিজ্ঞেস করে জানলাম উনি সমস্তিপুর থেকে এসেছিলেন মধুপুরে মেয়ের বাড়িতে, কিন্তু ফেরার পথে বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ার জন্য স্টেশনে যেতে পারছেন না। বৃষ্টি না কমা পর্যন্ত উনি কিছুক্ষণের আশ্রয়ের অনুরোধ করাতে আমি তাঁকে ফেরাতে পারিনি।
“ঘরে বসে জুড়ে দিলেন নানা গল্প আমার সাথে, আর আমিও কথা বলার লোক পেয়ে খুব খুশি। মধুপুরের কত কথাই না জানেন উনি! কোন বাড়িতে ডাকাতি হয়েছিল, কোন অসাধু আড়তদার পুলিসে ধরা পড়েছিল,কোন স্কুলশিক্ষক পাড়ার গুণ্ডাদের হাতে বেদম মার খেয়েছিলেন ইত্যাদি। একটা ব্যাপার খুব অবাক লাগছিল, তাই বারবার ওঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে সত্যি কি চোখের মণিটা সাদা? হ্যারিকেনের আলোয় তো তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু একি, চোখের পলক তো পড়ছে না! তাছাড়া মাঝেমাঝে চোখের সাদা মণিদুটো ছোট থেকে বড় হচ্ছে আর কখনো মনে হচ্ছে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। হয়তো অল্প আলোয় দেখার ভুল,তাই কোন গুরুত্ব দিইনি।
বৃষ্টি কমার কোনও আশা নেই দেখে আমিই ওনাকে বললাম রাতটা আমার বাড়ি কাটিয়ে পরের দিন যাবার জন্য আর উনি রাজি হয়ে গেলেন সাথে সাথে। গল্প করতে করতে যে কখন রাত বেড়েছে,বুঝতেই পারিনি। খিদেটা বেশ জমেছে, ঘরে যে খাবার ছিল ভাগাভাগি করে ওনাকে বললাম খাওয়া শুরু করতে আমার সাথে। নিজে খেতে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম, যে ওঁর খাওয়ার দিকে খেয়ালই হয়নি। আমার যখন খাওয়া শেষ হল,তাকিয়ে দেখি ওঁর প্লেট ঝকঝকে পরিষ্কার। এবার মনে হল, কই ওনাকে তো হাত নেড়ে কখনো খেতে দেখলাম না,তা হলে কখন খেলেন উনি?
ওঁকে বললাম ওই ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়তে। কি আশ্চর্য ব্যাপার! ওঁর শরীরটা হাওয়ার মত ভাসতে ভাসতে এগিয়ে গেল ওই ঘরের দিকে। হেঁটে যাওয়ার কোনও প্রয়োজনই হল না। দেখে বেশ মজা পেলাম, ভাবলাম আমিও যদি পারতাম এমন ভেসে বেড়াতে, তাহলে আর আমাকে হাঁটুর ব্যথা নিয়ে ভাবতে হত না। তাকিয়ে দেখলাম ওই ঘরের দরজাটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। আর অপেক্ষা না করে শুয়ে পড়লাম আমার ঘরে, আর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া শুরু হয়ে গেল নানা চিন্তা। ভাবতে ভাবতে হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছিলাম, হঠাৎ মনে হল ভীষণ ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে আর সাথে চাপা হাসির আওয়াজ। চোখ খুলতে এবার বেশ ভয় করছে, তবুও সাহস করে চোখ খুলতেই ভয় পেয়ে গেলাম। উনি আমার খাটের ওপর কী করছেন? আর ওঁর শরীরটাই বা দেখতে পাচ্ছি না কেন? সাদা কাপড়ে মাথা ঢাকা শুধু মুখটা কীভাবে এল এই ঘরে? একজোড়া সাদা চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে গিলতে আসছে আমাকে। আমি মাথার বালিশটা ছুঁড়ে মারলাম, আর ওটা গিয়ে ধাক্কা মেরে উলটে দিল টেবিলে রাখা হ্যারিকেনটাকে। সম্পূর্ণ অন্ধকার ঘর,কেবল মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকানোর আলো এসে পড়ছে ঘরে,আর তাতেই বুঝতে পারলাম যে মুণ্ডুটার নীচে ধড় নেই। তখন বোঝার চেষ্টা করছি যে এটা স্বপ্ন না সত্যি। এবার মনে হচ্ছে খাটটা দুলছে। না,শুধু খাট নয়,সমস্ত বাড়িটাই দুলছে। দেওয়ালে টাঙানো আমার সাধের বেলজিয়াম গ্লাসের পাঁচ ফুটের আয়নাটা ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়ল,কাচের শো কেসটা নিজে থেকে খুলে গেল আর ভেতরের রকমারি বাহারি জিনিস–কাপ,ডিশ ইত্যাদি হুড়মুড় করে ঝরে পড়ল মাটিতে,মনে হল রান্নাঘরের সমস্ত বাসন কে যেন ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। আচমকা বিদ্যুতের চমকে দেখলাম মাথার ওপরের পাখাটা থেকে একটা সাদা কাপড় ঝুলছে। মুণ্ডুটা ক্রমাগত আমার চারপাশে ঘুরে চলেছে, সাথে শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত হাসি। ধীরে ধীরে অট্টহাস্যে ফেটে পড়ছে বাড়িটা। যেদিকে তাকাই, মনে হচ্ছে সব কিছুই আমার দিকে চেয়ে হাসছে। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ি,সিলিং পাখা,জলের জাগ, সবই বিকট শব্দে হেসে চলেছে। সমস্ত শরীর যেন হিম হয়ে যাচ্ছে, মুখ থেকে শুধু গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই বেরোয় না, হাত-পা নাড়ানোর কোনও ক্ষমতাই নেই। আচমকা মনে হল আমার শরীরটাকে ধরে কে ওপরের দিকে তুলে দিচ্ছে। মনে হল কোনও কাপড় আমার গলায় জড়িয়ে যাচ্ছে। তারস্বরে চিৎকার করে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপ দিলাম মাটিতে। না,আর কিছু ভাবার অবকাশ নেই। কোনোমতে বাড়ির দরজা খুলে দৌড় দিলাম রাস্তায়। এরপর আর কিছুই মনে নেই। জ্ঞান যখন ফিরে পেলাম, দেখি গোয়ালপাড়ার কয়েকজন আমাকে ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে।

“সেযাত্রা কোনমতে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম। এরপর থেকে ওই ঘরটা আমি বন্ধই রেখেছি, তবে মাঝে মাঝেই নানান অদ্ভুত শব্দ শুনতে পাওয়া যায় ওই ঘর থেকে।”
এই বলে উনি বাবার দিকে তাকিয়ে বলেন, “কি,এখনও কি আগের মত সাহস আছে?”
বাবা অয়নের দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমি আর আমার ছেলে, কেউই তোমাদের মত অতো ভীতু নই। সুতরাং তুমি যতই গল্প শোনাও, আমরা কিন্তু ভয় পাচ্ছি না।”
অবশেষে ঠিক হল অয়ন আর ওর বাবা পরদিন থেকে ওই ঘরেই শোবে। সকালে উঠে ঘর পরিষ্কার করে,বিছানায় ভাল চাদর,খাবার জল,টর্চ ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দেওয়া হল। অয়নের ভিডিও ক্যামেরা সেট করা দেখে পিসেমশাইয়ের কি হাসি! বলেন, “আরে ভূত তো একটা আত্মা, রক্ত মাংসের কোনও শরীর নয়। তার কখনো ছবি ওঠে?”
শুনে অয়ন খুব রেগে বলে ওঠে, “দেখো পিসে,এ ব্যাপারে আমার কিন্তু জ্ঞান অনেক। আমি নিজের চোখে অনেক ভূতের ভিডিও দেখেছি ইউটিউবে। আর বেশিরভাগ ভিডিওই আমার এই একই মডেলের ক্যামেরায় তোলা। এই ক্যামেরাটা অন্ধকারেও দারুণ ছবি তোলে। সুতরাং তোমার কথামতো যদি ভূতপ্রেত এই ঘরে আসে তাহলে আমার এই ক্যামেরাতে ধরা পড়বেই,আর কাল সকালেই তার ভিডিও দেখতে পাবে তোমরা।”
সারাটাদিন পিসেমশাই কেবল অয়নকে নানাভাবে খেপানোর চেষ্টা করে চলেছেন, “কি ভায়া,সব ঠিকঠাক আছে তো? ক্যামেরাটা ঠিকমতো কাজ করবে তো? ভূত যদি প্রথমেই ক্যামেরার সুইচটা বন্ধ করে দেয়? দরজার বাইরে কোনও পাহারাদার লাগবে নাকি? টর্চের ব্যাটারিগুলো পাওয়ারফুল তো?”
অয়নের বাবার সাথেও বেশ মজাই করে চলেছেন, “তুমি তো শুনেছি আরশোলা দেখলে দৌড়ে পালাও,তা ভূতের সাথে পাঞ্জা লড়বে কী করে? ছোটবেলায় চামুণ্ডা কালী দেখে এমন ভয় পেয়েছিলে যে সারাটা রাত মাকে জড়িয়ে শুয়েছিলে। তাই চিন্তা হচ্ছে ভীষণ তোমাদের নিয়ে। ব্লাড প্রেশারটা একবার চেক করিয়ে নেবে নাকি?”
কিন্তু ওরা ওই ঘরটায় শোবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাছাড়া পিসেমশাইয়ের হাসিঠাট্টা ওদের জেদকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অদ্ভুত ব্যাপার,এমন একটা সাংঘাতিক ভূতুড়ে ব্যাপার শুনেও অয়নের মায়ের মধ্যে ভয়ের কোনও লক্ষণ নেই,বরং উনি পিসেমশাইয়ের কথায় মিটিমিটি হাসছেন।
খাওয়া শেষ করে অয়ন আর ওর বাবা বীরদর্পে ঢুকে গেল ওই ঘরটায়। অয়ন ঝটপট সাজিয়ে নিল ওর সরঞ্জাম। ওদেরকে ঘরে শুইয়ে, অয়নের মা, পিসি, পিসেমশাই, লাল্টু ফিরে আসে নিজেদের ঘরে। আজ ওঁরা ঠিক করেছেন সবাই মিলে রাত্রে জমিয়ে গল্প করবেন। তাছাড়া অয়নদের ওপর একটু লক্ষ রাখা উচিৎ,যদি কোনও দরকার পড়ে।
পিসেমশাইয়ের গল্পের ভাণ্ডার অফুরন্ত। একটার পর একটা মজার গল্প বলেই চলেছেন, আর শুনে সকলে অট্টহাস্যে ফেটে পড়ছে। একবার তো হাসতে হাসতে লাল্টু খাট থেকে দড়াম করে পড়েই গেল। মাঝে মধ্যে পিসেমশাই অয়নদেরকে দেখে এসে বলছেন, “চিন্তার কিছু নেই, ওরা দুজনেই অঘোরে ঘুমোচ্ছে।”
ভোরের দিকে ঘুমে ঢলে পড়ে একে একে সবাই। হঠাৎ একটা আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল সকলের, মনে হল আওয়াজটা এসেছে অয়নদের ঘর থেকে। দৌড়ে গিয়ে সবাই দেখে সকলে পিসের বালিশটা পড়ে আছে জানালার পাশে,অয়নের লাঠিটা ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। ওদের দুজনের বিছানা অবিন্যস্ত, মনে হয় খুব ছটফট করেছে সারা রাত। ঘুম থেকে ডাকতেই ধড়ফড়িয়ে লাফিয়ে ওঠে দুজনে। চোখেমুখে সাঙ্ঘাতিক ভয়ের ছাপ। অয়ন উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “আমার বন্দুকটা কোথায় গেল? ফায়ার, ফায়ার।”
অয়নের বাবা এখনও অদ্ভুত চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন। মনে হয় কিছু খুঁজছেন।
অবস্থা একটু সামলাতে, অয়নের বাবা বলতে শুরু করেন, “সত্যি,তোমাদের বাড়িতে না এলে জীবনের এত বড় একটা অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়ে যেতাম। যে আমি ভূতের অস্তিত্বকে বিশ্বাসই করতাম না, আজ আমিই তাকে অনায়াসে বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছি। তুমি ঠিক যেমন বর্ণনা দিয়েছিলে, ঠিক তেমনই এক অশরীরী আত্মা গতকাল এসেছিল আমাদের ঘরে। পরনে সেই সাদা কাপড়, আর সঙ্গে এক অদ্ভুত হাসি। সারা রাত ধরে তাণ্ডব চালিয়েছে আমাদের ঘরে। কখনও আমার গলা চেপে ধরছে আর আমি এক ঝটকায় সরিয়ে দিচ্ছি তাকে, কখনো অয়নের দিকে তেড়ে যাচ্ছে। একবার তো অয়নকে খাট থেকে ছুঁড়ে ফেলেই দিল। হ্যাঁরে, লাগে নি তো তোর? এর সাথে সেই বীভৎস ভূতুড়ে হাসি আমার কান ঝালাপালা করে দিয়েছে। তোমরা শুনতে পাওনি কিছু? তবে, শেষমেশ ওই বালিশটাই কাজ দিয়েছে। ওটা দিয়ে সজোরে ছুঁড়ে মারতেই তো পালালো ভূতটা!”
এবার অয়ন চেঁচিয়ে বলে ওঠে, “না বাবা ওটা বালিশের ঘায়ে নয়,ভূতটা পালিয়েছে আমার এই লাঠির ঘায়ে। তবে বন্দুকটা যদি খুঁজে পেতাম,অনেক আগেই গুলি করে শেষ করে দিতাম ওকে। ভয় একটু পেয়েছিলাম ঠিকই, তবে এ যা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হল আমার – এটা আমার ভূত অনুসন্ধানে বেশ কাজে আসবে। ঠিক করেছি,এবার একটা ব্লগ বানাব,আর তাতে থাকবে আমার সব অভিজ্ঞতার কথা। আর হ্যাঁ,এই ভিডিওটাও দিয়ে দেব ইউটিউবে,যাতে দেশবিদেশের সবাই দেখতে পায় ভূতের আসল ভিডিও।”
শুনে পিসেমশাই হেসে বলেন, “আগে চালিয়ে দেখ কেমন ছবি উঠল তোর স্পেশাল ক্যামেরায়!”
অয়ন তড়িঘড়ি ভিডিও ক্যামেরাটা প্লে করতে শুরু করে অবাক হয়ে বলে, “কী ব্যাপার,এ তো শুধুমাত্র আমাদের ঘুমোনোর ছবি। না,আর কোনও ছবিই তো ওঠে নি, তা হলে ভূতের ছবিটা গেল কোথায়? তাহলে কি ভূতের ছবি ক্যামেরায় ধরা পড়ল না?”
তারপর হঠাৎ বলে ওঠে, “এইতো, বাবা ছটফট করছে বিছানায়, আর এই যে বাবা বলিশটা ছুঁড়ল। আর এই যে,আমি কিরকম ঘুসি আর লাঠি চালাচ্ছি দেখো, আর এবার লাঠিটা ছুঁড়ে মারলাম।”
পিসেমশাই ছবি দেখতে দেখতে হেসেই চলেছেন, সাথে অন্যরাও কিছু কম যায় না। শেষে পিসে বলে ওঠেন, “তা ভায়া এই ভিডিওটা ইউটিউবে দিলে তার টাইটেল কী হবে? ঘোস্ট ভিডিও না হরর ড্রিম?”
একে তো ছবি না ওঠার দুঃখ,তার ওপর পিসের কথায় রেগে অভিমানে ফেটে পড়ে অয়ন। অয়নের বাবাও এমন একটা সাংঘাতিক ঘটনার পর সকলকে এভাবে হাসতে দেখে অত্যন্ত বিরক্ত। শেষে পিসে সকলকে শান্ত করে বলেন, “শোনো ভায়া, ভূত প্রেত বলে কিছু আছে কিনা আমার অতো জ্ঞান নেই, তবে কাল রাত্রে তোমরা যে স্বপ্ন দেখেছো তা কিন্তু আমার আগের দিনের গল্পের প্রতিফলন। গল্পটা এমনই সাজিয়েছিলাম যে সেটা তোমাদের মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল এবং অবশ্যই তোমাদের এক অজানা ভয়ে সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। তাই তোমাদের ঘুমন্ত অচেতন মনে ওই গল্পটাই আবার জীবন্ত হয়ে ভেসে ওঠে।”
অত্যন্ত রেগে গিয়ে অয়নের বাবা বলে ওঠেন, “স্বপ্নই যদি হবে, তাহলে অমন অট্টহাসি এলো কোথা থেকে, আর অয়নকেই বা দড়াম করে খাট থেকে ফেলল কে?”
এবার হাসির রোল ওঠে বাড়িতে, সবাই যত হাসছে অয়নরা ততই রেগে ওঠে। শেষে পিসে বলেন, “মানুষের কান স্বপ্নের মধ্যেও পারিপার্শ্বিক কিছু শব্দ অনুভব করতে পারে। তাই, স্বপ্নের ঘোরে তোমরা আমাদের হাসিঠাট্টা,গল্পের আওয়াজ শুনে থাকবে। আর তোমাদেরকে বোকা বানানোর এই গল্পটা রসিয়ে ওদেরকে বলতে, লাল্টু এমন হাসতে শুরু করে যে খাট থেকে উলটে বিকট শব্দে একেবারে পপাতধরণীতলে।”
জীবনে কখনো এমনভাবে তাকে কেউ বোকা বানাতে পারেনি, তাই অয়নের বাবা প্রচণ্ড রেগে গিয়েছেন এবং পারলে এখনই কলকাতা ফিরে যাবেন। অয়ন ভেতর ভেতর ফুঁসছে, আর লাল্টুর দিকে চেয়ে চোখ রাঙাচ্ছে। অবশেষে পরিস্থিতি সামলাতে অয়নের ছোটপিসি এগিয়ে এসে বলেন, “প্ল্যানটা তো আমারই তৈরি। পাঁচ বছর আগে আমরা এই বাড়িটা কিনেছি। এখনও পর্যন্ত যত লোক আমাদের বাড়িতে এসেছে, প্রত্যেকে একবাক্যে স্বীকার করেছে বাড়িটা সুন্দর, আর চারপাশটা এতো অপূর্ব যে সচরাচর দেখা যায় না। তার সাথে আছে এখানকার জল-হাওয়া। অসুস্থ মানুষ পর্যন্ত এখানে এসে সুস্থ হয়ে যায়। তাই সকলেই চায় আমাদের বাড়িতে এসে ছুটি কাটানোর সাথে শরীর ভাল করতে। অথচ গত পাঁচ বছর ধরে এত অনুরোধ করা সত্ত্বেও তোমরা কিছুতেই আসতে চাওনি আমাদের বাড়িতে, যদিও ঘুরে বেরিয়েছ ভারতবর্ষের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। তাই যখন শুনলাম যে তোমাদের ভূত-প্রেতে এতো আগ্রহ, তখন আমিই মতলবটা ফাঁদি। তবে সমস্ত কৃতিত্ব লাল্টুর বাবার, কারণ ভূতের গল্পের পুরোটাই ওঁর মস্তিষ্কপ্রসূত।”
এতো রাগের মধ্যেও অয়নের বাবা হেসে ফেলে বলেন, “আমাকে তোমরা বোকা বানিয়েছ ঠিকই, তবে এটা জেনে রাখ যে আমি কিন্তু ভূতে ভয় পাই না।”
অয়ন বলে, “আমিও মোটেই ভয় পাই না, তাই তো স্বপ্নে দেখা ভূতকেও লাঠি দিয়ে কম পেটাই নি।”
ছবিঃ মৌসুমী