গল্প-সাদায় কালোয়-শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য-জয়ঢাক৪৯-বর্ষা ২০১৫

শিবশংকর ভট্টাচার্যর সমস্ত গল্প

sadakalopictitle

রান্নাঘরের পাশে কলতলা। আট’পা-দশ পা বাঁধানো চাতাল, তারপর পুকুরঘাট। এটা একটা দেশ। এ দেশের রাজা কারিয়া। পা দিক এখানে আর কেউ, রেহাই নেই তার। চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করবে। সবসময় যে হাজির আছে তা নয়। তবে কান খাড়া আছে, চোখ খোলা আছে, বকুলগাছের একটা পাতা খসে পড়লেও বনবাদার ভেঙে কারিয়া তদন্তে হাজির, রান্নাঘরের বাসন নড়বার শব্দ হলে তো বটেই।

বিষ্টির দিনে কাদায় গড়াগড়ি দেবার অভ্যাস আছে। গরমকালে ধুলোয়। আম্মা বলেন, “ভূত একটা। এ কারণেই নাম পড়েছে কারিয়া পিরেত। পরশুরামদাদার কাছ থেকে ধার করে।

জন্মেছে মাস আষ্টেক। এর মধ্যেই ডাগরডোগর। সামনের দু পা তুলে দাঁড়ালে আপ্পুর কোমর ছুঁতে পারবে। সুযোগ পেলেই চেটে দেবার বদ অভ্যেস আছে। সেদিন বাবুনের গোড়ালি চেটে দিয়েছিল। বাবুনের চোখে খুশি, মুখে বিরক্তি, ধোয়াধুয়ির হ্যাঙ্গাম।

গোল বাধলো পুনু আসায়। পুনু চীনে পিকিনিজ। কুতকুতে টিপ বোতাম চোখ, নাক মাথা গোল, ঝোলা কান, খুরখুরে চলন। সাদা রেশম সুতোর তোড়ার মত লেজ। রেলগাড়ি চড়ে এসেছে পুনু। চামড়ার বকলেশ, রূপোলী চেন। পুনু যথেষ্ট গম্ভীর।

সাদা পুনু ঘরের ভেতর, কালো কারিয়া বাইরে। যেন দিন আর রাত। তেজি পুনুর ভুরু কুঁচকেই থাকে। কথায় কথায় রাগ। আর আদরের ভাগীদার দেখে দুষ্টু কারিয়া হঠাৎ শান্ত। আপ্পু গাল্লুকে দেখলেই লেজ নাড়ে বটে। লাফিয়ে গায়ে ওঠা নেই। চিৎ হয়ে গড়াগড়ি, বাগানময় অকারণ দৌড়, বেড়াল তাড়া করে গাছের মগডালে তোলা বন্ধ।

আপ্পু মন খারাপ করে বলল, “কারিয়ার আফ্রিকায় সাহেব এসেছে।”

মুখোমুখি দেখা হলে পুনু হাঁকডাকে বাড়ি মাথায় করে। কারিয়া বেচারা শান্ত মনোযোগী নজরে এক পলক দেখে চলে যায়। যেন বলতে চায়, “কী দরকার ছিল বকুনি দেবার।”

গাল্লু বড় হচ্ছে। শ্বাস ছেড়ে বলল, “অ্যাপার্টহেইট!”

গুব্বার লুঙ্গীতে থাবা তুলে মার খায় কারিয়া। পুনু আম্মাকে কামড় বসাবার পরেও বড়জোর ধমক।

“কারিয়ার এঁড়ে লেগেছে, বেটি হিংসুটি!” লক্ষ্মীপিসি বলে রাঁধতে রাঁধতে।

ছুটির শেষে সাহেব পুনু রেলগাড়ি চেপে ফিরে গেল তার নিজেদের ঘরে। আম্মা বললেন, “বাঁচা গেল বাপু। সাদায় কালোয় মিল হয়? কী অশান্তি কী অশান্তি!” চাতালের কোণে এঁটোকাঁটা ঢেলে দিয়ে কারিয়ার দুরন্ত লেজে চড় মেরে লক্ষ্মীপিসি বলল,”হিংসুটিটার শান্তি!”

দিন যায় মাস যায়। হঠাৎ চুপ করে যাওয়া কারিয়া আর বদলায় না। আপ্পু চুপি চুপি জানতে চায়, “কী হয়েছে রে কারিয়া? বড় হয়ে গেছিস বুঝি?” কারিয়া চেয়ে থাকে, অল্প লেজ নাড়ে। বাদলা দিনে সন্ধেবেলা ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে অদ্ভুত ডাকে কারিয়া। যেন শাঁখের শব্দ। গাল্লু বই গোছাতে গোছাতে আনমনে শুনতে পায়। ডায়রির পাতায় লিখে রাখে, “কারিয়া কাঁদছে আজও।”

পুজো আসছে। বড়পিসি বাপের বাড়ি আসছেন। চ্চিঠির খবর, আবার আসছে পুনু। আম্মা-গুব্বা-মা-বাবা সবাই একসাথে বললেন, “বেচারা কারিয়া।”

একদিন সোনালী রোদের সকালে হই হই পড়ে গেল বাড়িতে। হলদে ট্যাক্সি থেকে সব শেষে নাবলেন বড়পিসি আর রুপালী চেন বাঁধা পুনু।  শোনা গেল এ বাড়ি ছাড়বার পর থেকে পুনুও যেন গম্ভীর। চেঁচামেচি কম। খাওয়াদাওয়ায় মন নেই।

বাড়ি ঢোকার মুখে হঠাৎ হ্যাঁচকা টানে হাত থেকে চেন ছাড়িয়ে ছুটল পুনু বাগানের দিকে। হবে এবার একটা কান্ড। কোথায় ছিল ঝোপের আড়ালে, ছুটে এসেছে কারিয়াও! সাদায় কালোয় মুখোমুখি।

অবাক কান্ড। হাঁক-ডাক নেই, কামড়া-কামড়ি নেই। কারিয়া চেটে দিচ্ছে পুনুকে, পুনু কারিয়াকে। লেজ নড়ছে দুটোরই।

sadakalopic01

শুরু হল দুরন্তপনা। গড়াগড়ি,ছুটোছুটি, ফুলের ঝাড় তছনছ করে। যেন দুটো জীবন্ত ফুল। সাদায় কালোয় আঁকা চলন্ত ছবি একটা।

আপ্পু, মুনিয়া ছুটল মাঠে।  বড়রা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে গেলেন। গাল্লু আনমনে বলল, “কী ছিল বিধাতার মনে!”

ছবিঃ শিবশংকর ভট্টাচার্য

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে

Leave a Reply