অনুষ্টুপ শেঠ-এর আরো গল্পঃ… ওলটপালট, মেডেল, দোকান, যাত্রা, বিশ্বসেরা, নতুন কাজ, সময়সম্ভব
ওদিকের পাহাড়টার পিছনে আকাশ ঘোর লাল হয়ে এসেছিল। এদিকের গাছে ছাওয়া রাস্তায় এর মধ্যেই সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। বাইকের হেডলাইট জ্বালিয়ে নিয়েছে তমাল।
একটু গোঁয়ার্তুমির কাজই হয়েছে এটা, ভালোই টের পাচ্ছে সে এখন। দিব্যি ছিল পানশেটের রিসোর্টে, বন্ধুদের সঙ্গে হইহল্লা করতে করতে জমিয়ে লং উইক -এন্ড কাটাচ্ছিল। মাটি করে দিল তাদের কলেজ লাইফের বাহাদুরির গল্প, আর সাহসিকতার তুলনামূলক বিচার। রাজীব গুপ্তা, দেবাঞ্জন কুমার, টি এন প্রসাদ, অমিত শ্রীবাস্তব আর তমাল দত্ত—ওরা সবাই পুনের একটা আই টি কোম্পানিতে কাজ করে, সেইসূত্রে প্রবাসী, অবিবাহিত, মোটামুটি কাছাকাছিই বয়স। একটু ছুটিছাটা পেলেই প্ল্যান করে এরকম পুনের ধারেকাছে বেড়াতে চলে যায়।
এবার দুম করে কেমন তাল কেটে গেল।
আসলে রাজীব আর তমালের মধ্যে আসন্ন প্রোমোশন নিয়ে একটা চাপা রেষারেষি চলছিলই গত কয়েক মাস ধরে। হয়তো সেটার জেরেই, গতকাল সান্ধ্য আড্ডায় কার বেশি সাহস তা নিয়ে তর্কটা আর বন্ধুত্বপূর্ণ রইল না। অমিত গণ্ডগোল দেখলেই সাত হাত দূরে পালায়— কিন্তু প্রসাদ মাঝে পড়ে দুজনকেই থামাতে চেষ্টা করেছিল, দেবাঞ্জনও অনেক কাকুতিমিনতি করেছিল; কিন্তু কাউকে পাত্তা না দিয়ে রাজীব চ্যালেঞ্জটা করেই বসল, আর তমালও সেটা লুফে নিল।
আন্ধিগাঁওয়ের বদনামটা ওরা সকালেই শুনেছিল হোটেলের এক ওয়েটারের মুখে। পিছনের সানসেট পয়েন্টে গেলে ডানদিকে দূরে কালো কালো দেখা যায় জায়গাটা। জিজ্ঞাসা করে জেনেছিল যে ও জায়গাটা পরিত্যক্ত পড়ে আছে, কেউ যায় না। বয়স্ক ওয়েটার ঝুলো গোঁফের আড়ালে যথোচিত গাম্ভীর্য ফোটানো গলায় বলেছিল, “ওদিকে দেখো ভি মৎ! খারাপ জায়গা। অভিশপ্ত জায়গা—বহু সাল আগে সব মরে হেজে গেছে। কেউ বেঁচে ফেরে না ওখানে গেলে!”
তো সন্ধ্যায় রাজীব কথার পিঠে সেটাই বলে বসল, “বড়ো এসেছে সাহস দিখানেওয়ালা! যা, ঐ আন্ধিগাঁওতে রাত্রিবাস করে আয়, তো বুঝি!”
“আরে যা যা! তাই করব! কাল রাত্রেই একা গিয়ে ওখানে থাকব! তোর বাইকটা নিয়ে যাব। যদি পারি তো নেক্সট ট্রিপে আমার সব খরচা তোর।“
হাঁউমাউ করতে থাকা প্রসাদকে ঠেলে সরিয়ে দুজনে হাত মিলিয়েছিল, ‘ডিল!”
তারপর থেকে সবাই-ই বারবার তমালকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল, এরকম পাগলামি না করতে।
“আরে ভাই, ভূতপ্রেত ছেড়ে দিলাম। পোড়ো জায়গা, সাপখোপও তো থাকতে পারে!”
“শীতকালে সাপ বেরোয় না।“
“আচ্ছা না বেরোল। জন্তুজানোয়ারও তো হতে পারে? শিয়াল আছে এদিকে। এই রাজীব, তুই এটা ঠিক করলি না!”, রেগে গেছিল দেবাঞ্জন।
“আরে আমি কি ফোর্স করছি! তমাল না গেলে না যাবে। কোঈ বাত নেহি।“, রাজীবের ঠোঁটের কোণের মুচকি হাসিটা দেখেই আবার পিত্তি জ্বলে গেছিল তমালের।
“আমি যাব। ব্যস। এ নিয়ে আর কথা বাড়াস না তো!”
সেইমতো, খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম করে, বিকেল বিকেল রাজীবের বাইকটা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল তমাল। রাগের চোটে ওদের বলেও আসেনি আসার সময়ে। বলা তো আছেই, আবার কী!
রাস্তাটা মহারাষ্ট্রের বাকি জায়গার মতোই, মসৃণ আর সুন্দর। কিন্তু বাইকটা কিছুতেই স্পিড তুলছিল না বেশি। হয়তো সার্ভিসিং-এর সময় হয়ে এসেছে। তবে, তাতেও এতক্ষণে পৌঁছে যাবার কথা ছিল ওর। হয়নি যে, সেও ওর দোষ। প্রথমে রাস্তা খুঁজে বার করতে সময় গেল, তারপর চা তেষ্টা পেয়ে যাওয়ায় রাস্তার পাশের দোকানে দাঁড়াল একটা, তখনই ফোন এল বাড়ি থেকে। বকবক করতে করতে ভুলেই গেছিল যে তাকে এখনও বেশ অনেকটা রাস্তা যেতে হবে। উঠে, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে পরের চৌমাথায় ভুল মোড় নিয়ে ফেলল, যদিও চা-ওলা তাকে বেশ ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছিল কোনদিকে যেতে হবে। অনেকটা যাবার পর, ভুল বুঝে ফিরে এসে আবার ঠিক রাস্তা ধরা…এসবেই সূর্য ঢলে গেছিল।
আর বেশি দূর নেই। নিচের ঢালে গাঁওটার হেলে পড়া বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে। তবে বাকি রাস্তাটা ওকে হেডলাইটের ভরসাতেই যেতে হবে। ঝুপসি গাছে ঘেরা পথ। আর সুন্দর হাইওয়ে নয়, এবড়োখেবড়ো পাথর ফেলা রাস্তা—কোনও স্ট্রিট লাইট চোখে পড়ল না। এ রাস্তাতেই বা কদ্দূর যাওয়া যাবে কে জানে। পরিত্যক্ত হলে তো এদিকে আর গাড়িঘোড়া আসবে না যে রাস্তা পরিষ্কার থাকবে!
কিন্তু দেখা গেল এই শেষ কথাটা ভুল। পুরোটা না হোক, বেশ কাছাকাছি অবধি তমাল বাইক নিয়েই চলে আসতে পারল। বাজে রাস্তা, ঝাঁকুনি খেতে খেতে এল—কিন্তু যেমন ভেবেছিল অতটা খারাপ দশাও নয়।
হয়তো অতদিন আগেও পরিত্যক্ত নয়। এসব গল্প তো লোকের মুখে মুখে একখানা থেকে সাতখানা হয়ে ওঠে!
রাস্তা যেখানে শেষ হল, সেখান থেকে আর একটুখানি দূরেই প্রথম বাড়িটা দেখা যাচ্ছিল। বাইক স্ট্যান্ড করিয়ে নেমে পড়ল তমাল। ব্যাকপ্যাকটা পিঠে চাপানোর আগে, টর্চটা বের করে হাতে নিয়ে নিল।
টর্চটা জ্বালতে গিয়ে আরেকটু হলে হাত থেকে ফেলে দিচ্ছিল সে। অদ্ভুত কর্কশ একটা শব্দে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠেছে।
ওঃ! প্যাঁচা একটা। প্রায় চোখের সামনেই গাছের ডাল থেকে উড়ে গেল পাখিটা।
সে ডাক মিলিয়ে যাবার পরে তমাল হঠাৎ টের পেল, ও নিজের বুকের ধুকপুক শুনতে পাচ্ছে।
কী নিঃশব্দ রাত্রি!
তেমনি অন্ধকার।
অস্থির হাতে টর্চ জ্বেলে ঘরটার দিকে পা বাড়াল ও।
প্রায় একই সময়ে, গাঁওয়ের পিছন দিকের একটা ঘরে একটা পিদিমের আলো জ্বলে উঠল। কিন্তু সামনের বাড়িগুলোর আড়াল পড়ে যাওয়ায় সেটা তমাল দেখতে পেল না। একদিক ভাঙা, অন্যদিকের দেওয়াল জুড়ে আগাছা গজানো বাড়িটার দাওয়ায় উঠে সে তখন মন দিয়ে ভিতরে কী আছে দেখার চেষ্টা করছিল।
পর পর বাড়িগুলোয় উঁকি দিয়ে দেখতে দেখতে পিছন দিকে যাচ্ছিল তমাল। নাঃ! একটা বাড়িও ঠিক ঢুকে বসে রাত কাটানোর উপযুক্ত নয়। তাছাড়া, এবার দেবাঞ্জনের বলা শিয়াল-টিয়ালের কথা খুব বেশি করেই মনে পড়ছে তার। ভয় না পাওয়া এক জিনিস, আর খ্যাপা শিয়ালের কামড় খেয়ে জলাতঙ্কের ইঞ্জেকশন নেওয়া আরেক জিনিস!
অর্ধেকটা গাঁও পেরিয়ে আসার পর পিদিমের আলোটা চোখে পড়ল তমালের। কাঁপছে, মাটিতে গোল হয়ে পড়েছে আলোর দাগ।
থমকে থেমে গেল ও।
এখানে…আলো? মানুষ থাকে নাকি এখানে?
বাড়িটার অবস্থা তুলনায় ভালো। বাকি সব কটারই যেমন দেওয়াল ভাঙা, হেলে পড়া, ছাত ধ্বসে পড়া…এটা তেমন নয়, মোটের উপর আস্তই বলা যায়। যদিও ভিতরটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না, তবু মনে হচ্ছে যেন রাত কাটানো যায় এখানে।
অবশ্যই, তার আগে দেখতে হবে কে বা কারা আছে এখানে।
প্রদীপটা এখন দেখতে পাচ্ছে তমাল। দরজার পাশেই একটা আড়াল মতো করা, তার পিছনে মাটিতে বসানো। নেহাত সাদামাটা ব্যাপার।
দাওয়ায় উঠতে গিয়ে আবার আঁতকে উঠে ব্যালান্স হারিয়ে পড়েই যাচ্ছিল সে। হতচ্ছাড়া প্যাঁচাটা তার পিছু পিছু এসে হাজির হয়েছে নাকি!
ডাকটা কেমন যেন কান্নার মতো শোনাল।
অসহ্য!
গলাখাঁকারি দিয়ে হাঁক ছেড়েই ফেলল তমাল।
“কোঈ হ্যায়?”
কী অদ্ভুত কৌশলে বাড়িগুলো বানানো কে জানে! ওর ডাকটা ঘরগুলোয় ধাক্কা খেয়ে খেয়ে বাজতে লাগল। আসলে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। আনাড়ি লোক ভেবে বসত যে চারদিক থেকেই যেন লোকে সাড়া দিচ্ছে।
“হ্যায়!”
“হ্যায়!”
“হ্যায়!”
সাড়া না পেয়ে দাওয়ায় উঠে পড়েছিল তমাল। ঘরের ঝাপসা অন্ধকারে মুখ বাড়িয়ে ভাবছিল আবার গলা ছাড়বে কিনা। তার আগেই ওর পিছন থেকে মৃদু গলাটা ভেসে এল, “কে?”
হড়বড় করে ঘুরতে গিয়ে নিচু দরজায় মাথা ঠুকে গেল তমালের।
মারাঠি মহিলা একজন। মাঝবয়সী। কাছা দিয়ে কাপড় পরা, নাকে নথ।
“আপনি… এখানে থাকেন?”
মহিলা হাসলেন, দাঁত ঝিকিয়ে উঠল চাঁদের আলোয়।
তাই তো! কখন যেন এত বড়ো চাঁদ উঠে পড়েছে আকাশে! খেয়ালই করেনি তমাল এতক্ষণ। এই তো, পুরো চত্বর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখন।
“থাকি বইকি। নিজের ঘর গাঁও ছেড়ে যে যায় যাক, রুক্মিণী যায় না।“
“তবে যে লোকে বলে, এটা পরিত্যক্ত গ্রাম? কেউ নেই মানুষজন?”
“লোকে আর কতটুকু জানে, বাবুজি? চোখে কাউকে দেখে না, তো ভাবে কেউ নেই! আমিও তো বাইরে যাই না, দেখতে পায় না।“
“তো…আপনার চলে কী করে এখানে? খাওয়াদাওয়া…?”
মহিলা আবার এক ঝলক হেসে উঠে বলেন, “চলে যায়। চারদিক জঙ্গল দেখছেন তো? জানবেন, জঙ্গল এক আজিব জায়গা। যারা তার হদিশ জানে, তারা জানে।“
সহাস্য গলা আরেক ধাপ নামিয়ে জুড়ে দেন,
“খাওয়াদাওয়া… জুটে যায় ঠিক।“
তা বটে। আদিবাসীরা জঙ্গলের কত কিছু যে খোঁজ রাখে, পড়েছে ও বইতে। তবু, এক মহিলা এমন একা একা থাকে… ভয়ডর নেই সত্যিই। রাজীবকে এর ছবি দেখাতে হবে, সাহস নিয়ে কথা বলা ঘুচে যাবে ওর।
আর বেশি না ভেবে দাওয়াতেই বসে পড়ে তমাল।
“আজ রাতটা এখানে একটু থাকব, মৌসি? আসলে হয়েছে কী…”
চ্যালেঞ্জের ব্যাপারটা খুলেই বলে সে। মানুষের মুখ দেখে অবধি মাথার মধ্যে চাপ বেঁধে থাকা টেনশনটা কেটে গেছে একেবারে।
“থাকবেন? থাকুন। তবে খাবার দিতে পারব না…”
“না না লাগবে না। আছে আমার কাছে। আপনিও নিন, অনেক আছে!” বিস্কুটের প্যাকেট খুলে এগিয়ে ধরে তমাল।
মুখে আঁচল চাপা দিয়ে মাথা নাড়েন মহিলা। নেবেন না।
“আজ আমার ব্রত আছে। একেবারে পারণ করব সময় হলে।“
ওর খাওয়া শেষ হওয়া অবধি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন মহিলা। তারপর প্রদীপটা হাতে তুলে নিয়ে বললেন, “আমি তাহলে ভিতরে যাচ্ছি। আপনি এখানেই শুয়ে পড়ুন।“
“হ্যাঁ, ঠিক আছে… ওহো এক মিনিট! আপনার সঙ্গে একটা ফোটো নিতে পারি? বন্ধুদের প্রমাণ দেব যে রাত্রে ছিলাম এখানে…?”
অনুমতি পাবে না-ই ভেবেছিল তমাল, কিন্তু কী আশ্চর্য, রাজি হয়ে গেলেন মহিলা।
ফোটো তুলতে গিয়েও কী ভেবে ভিডিও তুলল সে। চট করে সে কোথায়, রুক্মিণীবাঈ কেমন একা একা এই খন্ডহরে থাকেন সেগুলো বলতে বলতে তিনশো ষাট ডিগ্রি ভিউ নিয়ে নিল জায়গাটার। শেষ করল রুক্মিণীর মুখের উপর ফোকাস করে, মহিলার সাহসের কথা বলে। এক্ষুণি ফেসবুকে আপলোড করে দিলে হত, কিন্তু এই প্রান্তরে নেট নেই। বাবা রে, ব্যাটারিও কত কম! থাক। কাল হবে। রাজীবের মুখখানা যা হবে না এটা দেখার পর!
শুয়ে চোখ বুজতেই রাজ্যের ঘুম নেমে এল তমালের চোখে।
***
একটা আওয়াজ। গোঁ গোঁ করছে কে যেন! না! ঝড়! এটা ঝড়ের শোঁ শোঁ আওয়াজ।
ধড়মড় করে উঠে বসল তমাল। এই মরেছে।
চাঁদটাই বা কোথায় গেল? মেঘ করেছে নাকি? এরকম নিকষ অন্ধকার হয়ে গেল কী করে চারদিক?
টর্চটা…উফ দরকারের সময় একটা কিছু যদি পাওয়া যায়! খাবার বার করতে গিয়ে ব্যাকপ্যাক পুরো ওলটপালট হয়ে গেছে… সরু পেনসিলের মতো টর্চ আর হাতে ঠেকছে না। দূর হোক! মোবাইলটাতেও তো টর্চ আছে… মাথা কাজ করে না ঘুম থেকে এমন আঁতকে উঠে পড়লে!
একী! মোবাইলটাই বা কই গেল! পার্স? সেটাও তো নেই পকেটে!
এতক্ষণে তমালের প্রাণে ভয় ধরল। চোর ডাকাতের খপ্পরে পড়ল না তো সে? ঐ মহিলা হয়তো তাদের দলেরই?
অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে উঠে দাঁড়াল সে।
ঝড় কি মারাত্মক হয়ে উঠেছে? ওই তো সবকটা গাছের ডাল ভয়ানক বেগে ঝাঁকুনি খাচ্ছে। যেন কেউ চুলের মুঠি ধরে নেড়ে দিচ্ছে।
কিন্তু…
তাই যদি হয়…
তো ওর গায়ে একটুও বাতাস লাগছে না কেন? বরং দম বন্ধ হয়ে আসার মতো গুমোট, প্যাচপ্যাচে গরম একটা ভাব…
এরকম মাটি থেকে দশ ফুট উঁচু দিয়ে ঝোড়ো বাতাস বইবে, আর মাটিতে একটুও রেশ থাকবে না তার—এমন আবার হয় নাকি?
ব্যাগটা পিঠে চাপিয়ে মাটিতে নামে তমাল। ডানদিক দিয়ে এসেছিল তো? নাকি এইদিকটা দিয়ে সোজা চলে যাবে? তাড়াতাড়ি হবে মনে হয়।
এক পা বাড়াতেই পচ্ করে গর্তে পড়ে। কাদাজলের মতো কিছু ছিটকোয়।
জল এল কোথা থেকে? বৃষ্টি তো হয়নি? নাকি ও যখন ঘুমোচ্ছিল তখন হয়ে গেছে এক পশলা?
এঃ…
পরের পা-টাও জলে পড়ল। বিশ্রি লাগছিল তমালের। একটা বদ পচা গন্ধও লাগছিল নাকে… কতকালের নোংরা জলে ভিজে গন্ধ ছাড়ছে কে জানে।
পরক্ষণেই তমাল টের পেল ঝড় থেমে গেছে, আর সেই শোঁ শোঁ করে আওয়াজটা নেই। ইন ফ্যাক্ট, কোনও আওয়াজই নেই।
নিজের বুকের ধুকপুকটা শুনতে পেলেও একটু মনে বল পেত সে এখন। নাঃ, সেটাও শুনতে পাচ্ছে না।
চোখ তুলে আবার চারদিকে তাকাতেই তার নিঃশ্বাস আরও দ্রুত হয়ে উঠল। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, ঝড় আসলে থামেনি। গাছগুলো এখনো পাগলের মতো দুলেই চলেছে। কিন্তু সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তার কান বধির হয়ে গেছে!
সত্যিই? এভাবে কালা হয়ে গেল সে?
না, নিশ্চয় সাময়িক কিছু। হয়তো শক। হয়তো…
ধ্যুৎ! ডাক্তার দেখালেই হবে পরে। আগে এই জায়গা থেকে বেরোনো যাক। বড্ড চাপ পড়ছে মনে, ভুল্ভাল ভাবছে। নিজেকেই বলে সে, “কাম অন তমাল, এত ভয় পাওয়ার কিছু হয়নি। চলো, আস্তে আস্তে এগোও।”
পা বাড়াল তমাল। আবারও জলে পা পড়ল। শিউরে থেমে যেতে বাধ্য হল সে।
এ জল বরফের চেয়েও ঠান্ডা।
শুধু জল নয়।
একটুও হাওয়া না চলা, নিঃশব্দ অন্ধকার জুড়ে এখন সে একটাই অনুভূতি টের পাচ্ছে।
ঠান্ডা।
সব যেন বরফ হয়ে গেছে আচমকা। তার পাশের বাতাসটুকুও।
প্রাণপণে চেঁচিয়ে ওঠার জন্য বুকে একটুও জোর পাচ্ছিল না সে। ফ্যাঁসফেঁসে গলায় যেটুকু শক্তি ছিল সব দিয়ে সে বলে উঠতে চাইল, “বাঁচাও!”
শোনা গেল শুধু সেই প্যাঁচাটার কান্নার মতো চীৎকার।
তমাল এলোপাথাড়ি দৌড়োতে চেষ্টা করল। ওর পা একটুও নড়ল না, কিন্তু শরীর ছুটে এগোনোর মতো হয়ে দুমড়ে পড়ে গেল মাটিতে। এবারেও, ওর আর্তনাদ চাপা পড়ে গেল প্যাঁচার মুহুর্মুহু ডাকে।
তমাল টের পেল, কানের মতো ওর চোখও যেন এবার জবাব দিচ্ছে। আকাশের কালচে নীল আভা, আশপাশের বাড়িঘরের দেওয়ালগুলো, এখনও উদ্দাম দুলতে থাকা গাছপালা সব যেন কেউ ইরেজার দিয়ে মুছে দিচ্ছে ওর চোখের সামনে থেকে।
এক অনন্ত নৈঃশব্দ্য, এক সর্বগ্রাসী অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার আগে তমাল শুধু টের পেয়েছিল এক ঝলক বেলিফুলের গন্ধ আর একটা মেয়েলি গলার হাসি।
আর সর্বাঙ্গে ছুঁচ ফোটানোর মতো তীব্র যন্ত্রণা।
***
সকাল হতেই ওরা চারজনে বেরিয়ে পড়েছিল তমালের খোঁজে। তাই এবার আন্ধিগাঁওয়ে পড়ে থাকা মৃতদেহটা টাটকা টাটকাই পাওয়া গেল, আগের দুবারের মতো পচেগলে যাওয়া অবস্থায় নয়।
পুলিশের ডাক্তার এসে বলার আগেই তমালের কাগজের মতো সাদা শরীরটা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, একফোঁটাও রক্ত নেই ঐ দেহে।
তমালের ব্যাকপ্যাক, পার্স, ফোন—সবই কুড়িয়ে পেয়েছিল ওরা ঘরগুলোর মধ্যে ছড়ানো ছিটোনো অবস্থায়। ফোনের অ্যালবাম ঘেঁটে দেখেছিল ওরা—গত রাতে কী হয়েছিল বুঝতে। ভাঙাচোরা ঘরবাড়ির বিভিন্ন দিক থেকে ছবি—এই তো ব্যস!
তবে কাল রাত্রে তোলা একমাত্র ভিডিওটা বার বার দেখেও ধন্দ কাটছিল না দেবাঞ্জন, প্রসাদ, অমিত আর রাজীবের। সেটার শেষদিকে তমালের পরিচিত গলা বলছিল,
“সাহস কাকে বলে দেখুন একবার, এই আমার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রুক্মিণীজিকে দেখুন। এই অ্যাবানডনড গ্রামে একা একা দিব্যি থাকেন— এত সাহস তো আমারও হবে না!”
অথচ, ভিডিওতে দেখাচ্ছিল একটা বাড়ি শুধু—খালি বাড়ি।
সামনে কেউ ছিল না।
অলঙ্করণ-রাহুল মজুমদার