গল্প-জন্টিবাবুর দন্তবিভ্রাট-ময়না মুখোপাধ্যায়-বর্ষা ২০২৩

এই লেখকের আগের গল্প- তাম্রপত্র

golpojantibaburdantabibhrat

জন্টিবাবু স্নান সেরে আয়েশ করে দ্বিপ্রাহরিক ভোজনে বসেছেন। সারা সপ্তাহে এই একটা দিনই তিনি একটু আয়েশ করে দুপুরের ভাতটা খান। এইদিন রান্নার বহরটাও একটু বেশি থাকে। তা তিনি সবেমাত্র একগাল ভাত মুখে দিয়েছেন কি দেননি অমনি করক্-কিরিচ্-কিটিং। কিছুক্ষণের জন্য জন্টিবাবুর শরীরের ভিতর যেন একটা তীব্র আলোড়ন বয়ে গেল। হাতের ভাত হাতে, পাতের ভাত পাতে, তিনি চোখ বুজে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। শরীরটা একটু ধাতস্থ হতে ব্যাপারটা ঠিক কী ঘটে গেল জানার জন্য জিভকে ঠেললেন ভিতরের দিকে। জিভ হল গিয়ে মুখ গহ্বরের বিশ্বস্ত গোয়েন্দা; সে গভীর তত্ত্বতালাশ করে এসে জানান দিল, ডানদিকের কষের দু-নম্বর আর তিন নম্বর দাঁতের মাঝের অংশে একটা অতর্কিত হামলা হয়েছে। যার ফলাফল দুটি দাঁতের বেশ কিছুটা অংশ আহত। জিভ দ্বিতীয়বার টহল সেরে এসে খবর করল, দুটি দাঁতের মাঝখানের বেশিটাই বেবাক ফাঁকা হয়ে একটা বিপজ্জনক খাদের সৃষ্টি করেছে আর যেটুকু অক্ষত আছে সেটা এমন অসমান আর ধারালো হয়ে উঠেছে যে বেশি কাছে গেলে জিভের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। প্রমাণস্বরূপ কিছুটা বালি-মিশ্রিত লালা টেনে এনে জিভ সর্বশেষ খবর দিয়ে গেল—হামলাকারী শত্রুটি একটি কাঁকরই বটে, তবে এই হামলায় সম্ভবত তার ভবলীলাও সাঙ্গ হয়েছে।

এতগুলো ঘটনা প্রতি-ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটে যাওয়াতে জন্টিবাবু ততক্ষণে বিষম ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তদুপরি খাওয়ারও সাড়ে সর্বনাশ ঘটে গেছে। রবিবারের দুপুর। গিন্নি মনোরমা অনেক কিছুর সঙ্গে জন্টিবাবুর অত্যন্ত পছন্দের মুড়িঘণ্ট করেছিলেন। সে প্রায় খাওয়াই হল না তাঁর। অনেক কষ্টে প্রতিটি ভাতের গরাস তন্নতন্ন করে কাঁকর খুঁজে যখন মুখে দিচ্ছিলেন তখন সেটাতে শুধু পান্তাভাতের স্বাদ পাচ্ছিলেন। অবশেষে দুত্তোর বলে তিনি খাওয়া ছেড়ে উঠেই পড়লেন।

সেদিন দুপুরে বিছানায় শুতে না শুতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন তিনি। ঘুম ভাঙল সেই বিকেল শেষে যখন মনোরমা চা আর ছোলাভাজা নিয়ে তাঁকে ডাকতে এলেন। তখন সন্ধের অন্ধকার হয়ে এসেছে। জন্টিবাবুর বহুদিনের অভ্যাস, বাড়ি থাকলে বিকেলের চায়ের সঙ্গে বালিতে ভাজা কুড়মুড়ে ছোলা খাওয়ার। আজও অভ্যাসবশত প্লেটের থেকে এক মুঠো ছোলাভাজা মুখে দিতেই একেবারে উহুহুহু—ব্যথায় তাঁর ব্রহ্মতালু অবধি সিঁটিয়ে উঠল। তিনি বেবাক ভুলে গেছিলেন দুপুরের কথাটা। তাড়াতাড়ি ছোলাভাজা ঠেলে চায়ের কাপটা হাতে নিলেন। তিনি যত চেষ্টা করছিলেন জিভকে ওদিকে না যেতে দেওয়ার ততই সে ওদিকে চলে যায় আর প্রতিবার নতুন নতুন ক্ষত নিয়ে ফিরে আসে। আজ তিনি বুঝলেন যতই মুখের ভিতর থাক আসলে জিভ একটি স্বতন্ত্র সত্তা। তাই তার চলনবলন সবই স্বশাসিত। এই জিভের কারণেই পৃথিবীতে এত ঝগড়া অশান্তি। জিভকে কন্ট্রোল করার ক্ষমতা বোধহয় কারোরই থাকে না। মনে পড়ল, তাঁর বাবা ছোটবেলায় বলতেন—আগে জিভ শাসন করো। আপ্তবাক্যই বলতেন বটে। এদিকে ততক্ষণে জিভের অবস্থা বেশ সঙ্গিন।

চা খেতে খেতে জন্টিবাবুর এবার সাংঘাতিক রাগ গিয়ে পড়ল মনোরমার ওপরে। সারাদিন বাড়িতে বসে সে করেটা কী? করে তো শুধু রান্নাবান্না। আজকাল সেটাও ঠিকভাবে করে উঠতে পারে না। এই যে চালের মধ্যে কাঁকর থেকে গেল সেটা তো বাড়ির গিন্নিরই দোষ। রান্না করলেই হল, তার একটা গোছানো ব্যাপার থাকবে না? জন্টিবাবুর মনে হল, আহা আগের দিন আর এখনকার দিনে কত তফাত। তাঁর দিব্য চোখে ভেসে উঠল পরিষ্কার বারান্দার মাঝখানে বিশ-পঁচিশ কেজি চাল টিলা করে রাখা আর তার চারপাশে মা-কাকিমা-জেঠিমারা বসে মনোযোগ দিয়ে সেই চাল সামনে টেনে টেনে তার থেকে মরা চাল, কাঁকর, ধান, কাঠি বেছে আলাদা করছেন। আহা কী স্বর্গীয় দৃশ্য, যেন জ্বলন্ত রোদের মধ্যে এক টুকরো মেঘে ঢাকা পুকুর। আর এখন দেখো, জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির বউয়ের সঙ্গে তারও পাশের বাড়ির মেয়ের নিন্দা করতে করতে চাল নেওয়া ধোওয়া সব হয়ে গেল। না দেখা, না বাছা। জন্টিবাবু ভাবেন, এইভাবে চলতে থাকলে শুধু কাঁকর কেন, একদিন হয়তো শালগ্রাম শিলাও পাওয়া যাবে ভাতে।

মনোরমা চায়ের কাপ নিতে এসে ছোলাভাজার বাটি অটুট দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হল কী? আজ ছোলাভাজা যে পড়ে রইল। বলি শরীর-টরির ঠিক আছে তো?”

উত্তরে জন্টিবাবুর জ্বলন্ত দৃষ্টি দেখে তিনি চিন্তিত মুখে আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি সরে পড়লেন।

দিনকয়েক কেটে গেছে। জন্টিবাবুর রোজকার জীবন একই ছন্দে কাটলেও জিভ আর দাঁতের অবস্থার বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়নি। তীক্ষ্ম দাঁতের টুকরোয় ক্ষতবিক্ষত জিভে কোনও খাবারেই আজকাল স্বাদ পান না। সত্যি কথা বলতে কী, খাওয়ার আগ্রহটাই চলে যাচ্ছে তাঁর। কাঁহাতক আর জিভ সামলে খাওয়া যায়। কাল অফিস থেকে ফেরার সময় এক ঠোঙা ঝাল-বড়া কিনেছিলেন। বেশ কটমটিয়ে খাবেন ভেবে যেই মুখে দিয়েছেন অমনি জিভে এমন ব্যথা পেলেন যে চোখে জল চলে এল। খেতে গিয়ে পুরুষমানুষের চোখে জল! ভাবা যায়? বাধ্য হয়ে অমন শক্ত ঝাল-বড়াগুলোকে তখন লালায় ভিজিয়ে নরম করে প্রায় চুষে খাওয়ার অবস্থা। ছ্যাঃ ছ্যাঃ। এমন খাওয়ার থেকে উপোস করে থাকা ভালো। শেষ অবধি আধ-ঠোঙা ঝাল-বড়া একটা ভিখারিকে দান করে বাঁচলেন। এতকাল নিজের গজদন্তের মতো ঝকঝকে অটুট নীরোগ দাঁত নিয়ে জন্টিবাবুর ভারি অহংকার ছিল। এ তাদের বংশের গরিমা। জন্টিবাবুর বাবা আটাত্তর বছরে মারা গেছিলেন একটি মাত্র দাঁত না খুইয়ে। ঠাকুরদাদা বিরানব্বই অবধি ব্যাটিং করেছেন অটুট দন্তে। আর তিনি কিনা চালের বিভ্রাটে পড়ে আটান্নতেই খুঁতো দাঁতের মালিক হলেন! ওই দাঁতে কি আর পাঁঠার হাড়ের জোড় ভাঙা যাবে? আখ চিবিয়ে মিহি ছিবড়ে ফেলা যাবে? জন্টিবাবুর আজকাল কোনও কাজে মন নেই, নেয়ে-খেয়ে সুখ নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা, একটু কথা বলতে ভালোবাসতেন, সেটাও প্রায় বন্ধ হবার জোগাড়। কথা বলতে গিয়েও যে জিভ কেটেছে দু-বার।

অফিসের সুশান্ত ছেলেটি বেশ চটপটে আর বুদ্ধিমান। একটু চালিয়াত, তবে খোঁজখবর রাখে বিস্তর। জন্টিবাবুকে বেশ ক’দিন মনমরা দেখে খোঁজ নিচ্ছিল। সব শুনে বলল, “শুধু শুধু বউদির দোষ দিচ্ছেন দাদা। এত টাকা দিয়ে চাল কিনি আমরা তাতে কাঁকর থাকবে কেন? এ দোষ তো দোকানদারের। যদি বেছেই খাব তাহলে এত দাম দেব কেন? যাই বলুন, আপনার উচিত ছিল চালের দোকানে গিয়ে দু-কথা শুনিয়ে আসা।”

জন্টিবাবু বুঝলেন কথাটায় যুক্তি আছে। তিনি বললেন, “ঠিকই বলেছ ভায়া। সামনের রবিবার শম্ভুকে নাহোক দু-কথা শুনিয়েই আসব। দরকার পড়লে দোকানও বদলে ফেলব। শম্ভুর দোকানের সবচেয়ে সেরা চালটি খাই আমি। কিন্তু এই দাঁত আর জিভ নিয়ে যে জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে গেল!”

সুশান্ত বলল, “দোকানের ব্যাপারটা পরে দেখবেন, আপাতত আপনার একজন ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।”

“ডেন্টিস্ট আর কী করবে, আমার তো দাঁতে ব্যথা নেই। ব্যথা জিভে, শুধু কেটে যাচ্ছে কিনা। আর ব্যথা আমার মনে ভায়া। বংশের নাম ডোবালাম আমি।”

“না দাদা, ডেন্টিস্ট অনেক কিছু করতে পারে। বার বার দাঁতে জিভ কেটে যাওয়া ভালো নয়। ডেন্টিস্ট আপনার ধারালো দাঁতকে ঘষে সমান করে দেবে। তাহলে জিভ আর কাটবে না। আর জিভ না কাটলে মনেও ব্যথা হবে না। এখন শুনুন, এই কাছেই একজন ডেন্টিস্ট আছেন আমার চেনা। অল্পবয়স, তবে বেশ নাম করেছে। আমি ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি, আপনি আজই অফিস ফেরার পথে একবার ঘুরে যান।”

এতদিনে জন্টিবাবু একটা আশার আলো দেখতে পেলেন। মনে মনে ভাবলেন, না, আজকালকার ছেলেমেয়েগুলো একটু চালিয়াত বটে, তবে জ্ঞানগম্যি আছে। মানুষের উপকার করার ইচ্ছেও আছে। জন্টিবাবু বিকেলে একটু আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে পৌঁছে গেলেন ডেন্টিস্টের চেম্বারে। একটা পুরোনো বাড়ির একতলায় পরপর অনেকগুলো দোকানঘর। ডানদিকের একেবারে কোনায় ডেন্টিস্টের চেম্বার। ঢুকতেই সেখানে গোটা দুয়েক বেঞ্চ পাতা। তাতে একটিও লোক নেই। ভিতরে আর-একটি ছোটো খুপরি, ডাক্তারের অ্যান্টি-চেম্বার। জন্টিবাবু উঁকি মেরে দেখলেন, একটা চিনে ছোকরা সামনের টেবিলে পা তুলে কোলে মোবাইল নিয়ে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা করছে।

ও হরি এ যে চিনাম্যান! মনে মনে নিজেকে সাহস দিলেন, চিনাদের দাঁতের ব্যাপারে বেশ দক্ষতা আছে। তাঁদের ছোটবেলায় দাঁতের ডাক্তার বেশিরভাগই ছিল চিনা। তাদের হাতও নাকি ছিল সাংঘাতিক। শুনেছেন দাঁত তুললে মনে হত যেন মুলো তুলল। এতটাই সফিস্টিকেটেড হাত ছিল নাকি তাদের। এ তো তাদেরই বংশধর। সুশান্তর ওপরে আর-একটু খুশি হলেন। বেড়ে ছেলে।

জন্টিবাবুর উপস্থিতি টের পেয়ে চিনে ডেন্টিস্ট এক গাল হেসে ভাঙা বাংলাতে বলল, “আসেন।”

জন্টিবাবু ভেতরের চেয়ারে বসতেই মুখ হাঁ করিয়ে ক্লিপ দিয়ে দিল আটকে। মহা জ্বালা! কথা বলবেন কীভাবে? কিছু তো শুনলই না ছোঁড়া। নানা পরীক্ষার শেষে যখন ক্লিপ খুলে দিল তখন জন্টিবাবুর বুকে আটকানো তোয়ালে ছেড়ে জামা অবধি একেবারে লালে ঝোলে মাখামাখি অবস্থা। জন্টিবাবু বুঝতে পারছেন না কী করবেন—তোয়ালেটা কি তার ধুয়ে দেওয়া উচিত? ডেন্টিস্ট অবশ্য সেসব পাত্তা না দিয়ে তোয়ালেটা একটা বালতিতে ফেলে বলল, “আপনার ভাঙা দাঁত ঘষে ঠিক করে দেব, কিন্তু আপনার শেষের দাঁতটার অবস্থা খারাপ। হয় রুট ক্যানাল করতে হবে, নয় ফেলে দিতে হবে। আপনি কী করতে চান?”

জন্টিবাবু তো দিশেহারা। পরের দাঁতে আবার কী হল! কোনও সমস্যা তো ছিল না। কী করেন এখন? লোকমুখে শুনেছেন, রুট ক্যানালের নাকি অনেক হ্যাপা। যেমন খরচ, তেমন দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসা। অনেক চিন্তাভাবনার পর জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু না করলে কি চলে না? মানে আরও কিছুদিন?”

ডেন্টিস্ট গম্ভীর হয়ে বলল, “নেভার। কিছু করতেই হবে। আপনার ভাগ্য ভালো এখনও ব্যথা শুরু হয়নি। তবে শিগগির ব্যথা শুরু হবে।”

ওরে বাবা, দাঁতের ব্যথা! সে তো শুনেছেন মারাত্মক। জন্টিবাবু ভাবলেন, এখন তার আটান্ন চলছে, একটা দাঁত কমে গেলেই-বা কী হবে? কোথায় যেন শুনেছিলেন যে সব দাঁত নিয়ে মরা ভালো নয়। পরের জন্মে নাকি দাঁত নিয়ে জন্মাতে হয়। সে ভারি বিশ্রী ব্যাপার। হাজার লোক ভিড় করে দেখতে আসবে। বলা যায় না, কাগজেও বেরিয়ে যেতে পারে। যাক গে যাক, একটা দাঁত যাক। বাপ-ঠাকুরদাদার মান রক্ষা করা গেল না এই যা দুঃখ। মনে সাহস এনে বললেন, “তবে তুলেই দিন।”

পরের দিন অফিসে গেলে সুশান্ত এসে জানতে চাইল, “গেছিলেন দাদা? কী হল? এখন আর অসুবিধা নেই তো?”

জন্টিবাবু হাসিমুখে বললেন, “না ভায়া, এখন সব ঠিক আছে। জিভে আর লাগছে না। হাজার টাকা গেছে দুঃখ নেই, তবে একটা দাঁতও গেল এই যা দুঃখ।”

“সে কি! দাঁত গেল কেন?”

জন্টিবাবুর কাছে সব শুনে সুশান্ত জিভে চুকচুক আওয়াজ করে বলল, “এহে-হে, আপনাকে একটা কথা বলতে ভুলেই গেছিলাম। এ-ছোকরার সব ভালো, তবে সুযোগ পেলেই দাঁত তুলে দিতে চায়, বিশেষত বয়স্কদের। যাক গে যাক, একটা দাঁতই তো! তুলতে লাগেনি তো?”

জন্টিবাবু স্তম্ভিত। সমস্ত শরীর তার রাগে রি রি করছে তখন। একটা দাঁত, মাত্র একটা দাঁত!

বিকালে বাড়ি ফেরার সময় শম্ভুর দোকানে গেলেন। শম্ভু তখন আটা ভাঙার মেশিনে গম ঢালছিল। জন্টিবাবুকে দেখেই বলল, “পঁচিশ কেজির বস্তা তো? আগেরটাই দেব তো? কাল সকালে ভজা গিয়ে দিয়ে আসবে।”

জন্টিবাবু মনে তুমুল রাগ এনে বললেন, “নাহ্‌, তোমার কাছ থেকে আর চাল নেওয়া যাবে না সেটাই বলতে এলাম।”

শম্ভু কর্মচারীর হাতে মেশিনের দায়িত্ব দিয়ে তড়িঘড়ি এগিয়ে এল।—“কেন দাদা, চাল খারাপ হয়েছে? তাহলে আমি পালটে দেব।”

“চাল পালটালে কি আমার একটা দাঁত আর হাজার টাকা ফিরে আসবে? না, আর নয়।”

“খুলে বলুন না দাদা কী হয়েছে!” শম্ভুর করুণ আকুতি।

জন্টিবাবু বললেন, “চাল কি খারাপ বলেছি? বলছি তোমার চালে কাঁকর—ইয়া বড়ো বড়ো। আমি সেরা দামের চাল নিই। কাঁকর মেশানো চাল নেব কেন?”

“কাঁকর? সাদা না কালো?” শম্ভু চিন্তিত মুখে জিজ্ঞাসা করল।

“তার মানে? কাঁকর তো কাঁকরই। তার আবার সাদাকালো কী?”

“রঙে অনেক কিছু দাদা। এখন বলুন তো সাদা না কালো? আমিও সেই বুঝে আড়তদার বদলাব।”

জন্টিবাবু ব্যাপারটা ঠিক বুঝলেন না। বললেন, “সাদা, সাদা কাঁকর। আমার দুটো দাঁত ভেঙেছে।”

“ও, সাদা কাঁকর! তাহলে আর কিছু করার রইল না দাদা।” শম্ভুকে বেশ আশ্বস্ত দেখাল।

জন্টিবাবু রাগত স্বরে বললেন, “তার মানে?”

“মানে আর কী বলব দাদা। আড়তদার বলে দিয়েছে, তার চালে যদি কালো কাঁকর পাওয়া যায় সব মাল ফেরত নিয়ে নেবে, কিন্তু সাদা কাঁকরের কোনও গ্যারান্টি নেই। সাদা কাঁকর ধরার কোনও উপায় তাদের কাছে নেই। তাতে চাল নিতে হলে নেব, নইলে নয়। তবে আমি দাদা অমন নই। আপনি পুরোনো কাস্টমার। আপনার চাল আমি সব বদলে দেব।”

জন্টিবাবু বিড়বিড় করতে করতে বাড়ির পথ ধরলেন—সাদা কাঁকর, একটা দাঁত, হাজার টাকা। এই দেশে আর কিছু হওয়ার নেই। ইংরেজরা দেশ ছেড়ে চলে গেছে একশো বছর হতে চলল, এখনও সাদা প্রীতি গেল না। যতসব বুরবকের দল।

পিছন থেকে শম্ভুর গলা পাওয়া গেল—“কাল সকালে নতুন চাল পাঠিয়ে পুরোনোটা নিয়ে আসব দাদা।”

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply