গল্প-ঠাকুমা-কল্যাণ সেনগুপ্ত-বর্ষা২০২৩

কল্যাণ সেনগুপ্তের আগের গল্প বংশীধরের বিপদ, শুধু কথা, পাসওয়ার্ড 

golpothakuma

নেহাত ক্লাস সেভেন চলাকালীন ধরাধাম থেকে বিদায় নিয়েছিলেন, না-হলে আজ পরিচিত নামকরা চোর-ডাকাতদের ঘরে ঘরে আমার ফোটো ঝুলত—এটা দিব্যি করে বলতে পারি। মাফিয়া নেত্রীর একমাত্র নাতি হলে যা হয়, আমার অবস্থা তাই ছিল। সাতখুন মাপ।

পাঁচ মেয়ে, তিন ছেলে। বড়ো করা, বিয়ে দেওয়া, নাতি-নাতনিদের খোঁজখবর দেখাশুনা করা একটা সময় অবধি নিজেই করেছেন। দেশভাগের পর দুই মেয়ে, দুই ছেলের বিয়ে বাকি ছিল। বাবা, কাকা, ছোটো পিসি, অবিবাহিত সেজো পিসি, আর জ্যাঠামশাইয়ের দুই ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে ঠাকুমা এ-দেশে চলে আসেন। ঠাকুরদা তখন নেই। নিজে একা সম্বন্ধ করে বাবা, কাকা আর ছোটো পিসির বিয়ে দিয়েছেন। ছোটোখাটো শ্যামল রঙের মহিলা কর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। মৃত্যুর আগে অবধি রাত্রি ছাড়া বিছানায় গা লাগাতেন না। কম খেতেন, প্রচুর পরিশ্রম করতেন। জ্বর-সর্দিও কাছে আসতে পারত না। কোনও ছেলেমেয়েকে জোরে কোনোদিন কথা বলতেন না। কিন্তু যা বলতেন সেটা প্রত্যেকেই শুনতে বাধ্য থাকত। ওঁদের মায়ের এত পরিশ্রম না করলেও চলত, কিন্তু উনি করতেন। বাড়িতে বকাবকি, মারামারি, হইচই একদম পছন্দ করতেন না। ঠাকুরদা অনেক বছর আগে মারা যাওয়ার পর এক হাতে ছেলেমেয়েদের সামলেছেন। বিয়ে দিয়েছেন। শুধু বাড়িতে আমি সবার ছোটো আর অনেকটা সময় ওঁর সঙ্গেই কাটাতে কাটাতে একটা প্রবল অপত্যস্নেহ জন্মেছিল। পাঠ্য জীবনের দুর্বিপাকে, স্কুলে, পাড়ায় নানান দুষ্টুমিতে, পড়াশুনায়, স্কুলের নানান ঘূর্ণিতে ঠাকুমা ছিলেন এক চিনের প্রাচীর। কতবার যে নির্ঘাত বাবার হাতে মারা পড়তে পড়তে বেঁচে গেছি সেটা একমাত্র আমি আর ঠাকুমাই জানি।

হাফ ইয়ারলিতে অঙ্কের খাতা দিয়েছে। কঠিন কোয়েশ্চন হয়েছে বলে দশ নম্বর গ্রেস দিয়ে একুশ এসেছে খাতায়। বাঁধিয়ে রাখার মতো খাতা। প্রতি পাতায় মুক্তো ছড়ানো। প্রতিটি অঙ্কের শেষে এক বিশাল লাল গোল্লা। নিয়ে ফেলে রেখেছি বইপত্রের তলায়। দেখতে দেখতে দিন এসে গেল। এবার বাবার সই নিয়ে ফেরত দিতে হবে। মাকে বললাম, মা হাত তুলে নিল—‘তোকে নিজেই যেতে হবে। সাহস করে যা। এই পড়ে পরীক্ষা দিলি আর খাতা দেখাবি না?’ দিদি বুদ্ধি দিল—‘ঠাকুমা আছে, ঠাকুমাকে খুলে বল।’

ঠাকুমা শুনে পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, “এরকম করলে দাদুভাই চলবে না কিন্তু। তোমাকে তো অনেক বড়ো হতে হবে, কী বলো?” তারপর যখন শুনলে কালকেই জমা দিতে হবে, তখন খাতা নিয়ে বললেন, “আয় আমার সাথে।” গটগট করে গিয়ে দাঁড়ালেন বাবার সামনে।—“শোন, একখান কাজ আছে।”

বাবা দাড়ি কামাতে কামাতে বললে, “কী কাজ? তোমাকে বড়দির বাড়ি নিয়ে যাওয়া?”

“না।” বলে বেমালুম খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এটাতে একটা সই করে দে।”

বাবা প্রথম সইয়ের কথা শুনে ঘাবড়ে গিয়ে বললে, “না দেখেশুনে সই করে দেব? কী এটা? কোথা থেকে পেলে?”

ঠাকুমা এক দমে হুড়মুড় করে বলে গেল, “চিত্তর অঙ্কের খাতা। ও একুশ পেয়েছে। সামনের বার বেশি পাবে আমাকে কথা দিয়েছে। সই করে দে।”

এইবার বাবার বোধগম্য হল। অর্ধেক কামানো গালে সাবান লেগে, সামনে জল, আয়না, তোয়ালে সামনে। বাবা একবার গলা তোলার উদ্যোগ নিচ্ছিল। ঠাকুমা ততোধিক গম্ভীর হয়ে বললেন, “ওর স্কুলে দেরি হয়ে যাবে। পরে তোর সঙ্গে কথা বলব। সই কর।”

বাবা মৃদু আপত্তি তুললে—“মা, ও গোল্লায় যাচ্ছে। তুমি এগুলো প্রশ্রয় দিচ্ছ?”

ঠাকুমা বললেন, “বলেছি পড়ে কথা বলব, আমার ঠাকুরঘরে অনেক কাজ। সই কর।”

বাবা যাই বলে, ঠাকুমা বলেন—‘সই কর।’

বাবা সই করলে। সঙ্গে এটাও বললে, “ও কিছুই পড়াশুনা করছে না মা। এটা তো বোঝো। ইহকাল পরকাল একদম ঝরঝরে হবে।”

ঠাকুমা বললেন, “সেটা আমি বুঝে নেব।” তারপর মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ—“তোরা পাসনি? আমার তো মনে হয় তুই বা  দিলু একবার এর থেকেও… মনে নেই? বলব এখানে?”

বাবা চুপ। একবার আমাকে দেখে, একবার নিজের মাকে দেখে নিজের মনে বিড়বিড় করতে লাগল।

ঠাকুমা বললেন, “এই যাকে দেখছিস সে কিন্তু স্কুল পেরিয়ে গেলে অন্য মানুষ হয়ে যাবে। মানুষ এক থেকে দু-বার খোলস ছাড়ে। এই চিত্ত আর বড়ো হয়ে যাবার পরের চিত্ত কিন্তু এক মানুষ থাকবে না। কোথায় শুরু করছি বড়ো কথা নয়, কোথায় শেষ করছি সেটাই আসল। তুই দেখে নিস ও একদিন বিরাট বড়ো মানুষ হবে।”

ঠাকুমার এই উদাত্ত ভাষণে বাবা পুরো চমৎকৃত। প্রায় গলে গোবর। পেন ঠাকুমার হাতেই ছিল। একবার আমার দিকে তাকিয়ে কী ভাবল, তারপর সই করে দিল।

প্রায় যুদ্ধ বিনাই রাজ্য জিতে ঠাকুমা খাতা হাতে দিয়ে বললেন, “জমা দিয়ে দিস।”

আমি প্রায় পায়ে পড়ে যাই আর কি।

বাবার দুপুরের টাস্ক—রোজ দশটা করে অঙ্ক করে রাখা। প্রশ্নমালার প্রথমে দশমিকের দু-লাইনে যোগ-বিয়োগ থাকে। সেগুলো করে রাখি প্রথম প্রথম। তারপর দেখলাম, রোজ তো বাবা চেক করে না, তাই ডেট না দিয়ে করলে অনেক লাভ। কোনও সময় বিপদ হলে পিছনের অঙ্কও কাজে লাগবে।

গরমের ছুটির মাঝামাঝি হঠাৎ পিচ-গলা দুপুরে বাবা এসে হাজির। তখন আমি আর দিদি গলিতে এক্কা-দোক্কা খেলায় মত্ত। মা, বাবা, কাকা, পিসি, দাদারা কেউ বাড়ি নেই। মে মাসের দুপুর। খালি গায়ে হাফ প্যান্ট পরা আমি মনে হয় দশ কি বারো আর দিদি ফ্রক পরা ষোলো। বাবা বাড়ির গলি দিয়ে ঢুকেছে, আমরা দুজন যেন ভূত দেখছি। বাবা নিজেকে খুব কন্ট্রোল করে গম্ভীরভাবে একটু দাঁড়িয়ে থেকে প্রথম দিদিকে তারপর আমাকে বললে, “হোম টাস্ক হয়ে গেছে?”

সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে অক্লেশে বললাম, “কখন হয়ে গেছে।”

বাবা এসে পড়ায় সব গুলিয়ে গেছে। আমি আর দিদি হজমি খেতে যাব ভাবছিলাম আর এই সময় বাবা। হঠাৎ আমার হাতটা খপাত করে ধরে দিদিকে বললে, “চল ওপরে। আজ দেখি তুই কেমন সব করে খেলতে নেমেছিস।”

দিদি আর আমার যথারীতি মাথা নীচু। সব যদি ঠিকমতো হোম টাস্ক করাই থাকে তাহলে আর ভয় কী? ফ্ল্যাট বাড়ি। আমরা থাকতাম দোতলায়। আমি দিদি সামনে, বাবা পিছনে। মনে মনে জপছি, ঠাকুমা যেন থাকে ঘরে। না-হলে আজ এসপার কি ওসপার হবে। মুখ থমথম করেছে। কোনোদিন বাবা এই দুপুরে চলে আসে না। দুপুরটা আর বিকেলটা আমরা মুক্ত।

বাবা ঘামে ভেজা জামা-গেঞ্জি ছাড়তে ছাড়তে হুংকার দিল—“বার কর কী করেছিস।”

আজ নির্ঘাত সেই বাঘ আর ছাগলের গল্প হবে। যেনতেন প্রকারেণ আজ বাবা একটা কিছুভাবে ভরদুপুরে নীচে এক্কা-দোক্কা খেলার জন্যে কিছু একটা শোধ নেবেই। দেখলাম, ধরেছে যখন জবাই তো করবেই। বললাম, “এই দেখো, অঙ্ক করে রেখেছি।”

বাবা বললে, “কোনগুলো?”

শেষ থেকে দশটা ছোটো ছোটো দশমিকের যোগ-বিয়োগ দেখিয়ে দিলাম। মনে মনে ভাবছি, দেখ এবার কী করবে?

বাবা দু-বার বললে, “এই দশমিকের যোগ-বিয়োগ? এগুলো কেউ করে? এগুলো তো আসবে না পরীক্ষায়। আর তারিখ নেই কেন?”

আমি বেপরোয়া—“তারিখ কেন দেব? রোজ তো করেই যাচ্ছি পরপর।”

বাবার কী সন্দেহ হল, বললে, “কতদিন তোর ছুটি চলছে?”

দিদি পাশে দাঁড়িয়ে একটু কমিয়ে বললে, “দিন দশেক হবে।”

বাবা দিদিকে এক ধমক দিলে—“মিনু তুই ওদিকে যা।”

অর্থাৎ, বধ্যভূমিতে শুধু আমাকেই একা রাখতে চায় বাবা।

কিছুতেই যখন ধরতে পারছে না, কিছুটা গুলিয়ে গিয়ে বাবা পিছনের পাতার সব অঙ্ক গুনতে লাগল। পনেরো দিন গেছে মানে দেড়শো অঙ্ক হওয়া উচিত; হয়েছে খুব জোর সত্তর-আশিটা। ব্যস, জালিয়াতি প্রমাণিত। পিসি পুরী গিয়ে রঙচঙ করা বেত এনেছিল আমাদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার জন্যে। এদিক ওদিক দেখে ওটাই দেয়াল থেকে বাবা নামিয়ে নিলে। উফ্‌! চোখ রাগে কটকট করছে। আগুন জ্বলছে মুখে-চোখে, যেন চোর ধরেছে।—“তবে রে!” বলে ক্ষুধার্ত বাঘের মতন লাফিয়ে পড়ল আমার খালি পিঠের ওপর। এরপর মুখে পুষ্পবৃষ্টি—“আমাকে বোকা বানানো? অনেকদিন ধরে দেখছি আমি। আজ তোর একদিন কি…” বলেই সপাসপ কয়েক  ঘা পড়লে। এরপর দুটো মুখের নানারকম অভিব্যক্তি। আর মারবার জায়গা খোঁজা।

বাবার দিক থেকে অনর্গল—“সাপের পাঁচ পা দেখেছ? বাবাকে বোকা বানানো? কিছু বলি না বলে এতদূর?”

আমি প্রথম ‘বাবা গো মেরে ফেললে গো’ বলতে গিয়ে থেমে অভিমানভরা গলায় আর্ত চিৎকার করতে লাগলাম—‘মা, মারে, ঠাকুমা গো, মেরে ফেললে গো!’ চলল। কেউ আসছে না দেখে গলা আরও ওপরে উঠছে। এরপর শুধু উফ্‌, আফ্‌, উরি—ঘামে ভেজা পিঠ আর হাত বেতের উপর্যুপরি সপাসপ আঘাতে লাল লাল হয়ে যেতে লাগল। দিদি একবার এগোতে গেছিল, তারপর বাবার বেত হাতে রুদ্র ভৈরব মূর্তি দেখে দৌড়ে নীচে ঠাকুমাকে খুঁজতে চলে গেল। এরপর বাড়িতে শুধু আমি বাবা আর বেত। এরকম কোনোদিন হয় না। শুধু ভাবছি—ঠাকুমা, তুমি তাড়াতাড়ি এসো।

বেশ কিছুক্ষণ চলার পর বাবা বোধহয় এই গরমে প্রবল পরিশ্রমে হাঁফিয়ে গেল। আর বেতের মারটাও তেমন লাগছে না পিঠে। অবশ হয়ে গেল নাকি? বেতটা খাটের ওপর ছুড়ে ফেলে বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। প্রবল জ্বালার মধ্যেও খাটে হাতড়ে দেখি বেতটা তিন ফালি। ও, সেই জন্যে তেমন জোরে আর লাগছিল না। পরের দিন নীচে হারুর সঙ্গে সোর্ড ফাইট। এতক্ষণ চোখে জল আসেনি, কিন্তু এবার চলে এল। বেত না থাকলে তো খেলতেই পারব না। আর ও এমনিতেই জিতে  যাবে।

এমন সময় সিঁড়িতে ধুপধাপ শব্দ। রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ পরিত্রাতার। ঠাকুমার দৌড়াতে দৌড়াতে ঢুকলেন। আমাকে দেখে চোখ বড়ো বড়ো করে দরজায় দাঁড়িয়েই বললেন, “বলু কই?” বলেই অন্য ঘর দেখতে চলে গেলেন। এত জ্বালা-যন্ত্রণার মধ্যেও ওই বড়ো বড়ো চোখ ফুঁড়ে বেরোনো রাগই অনেকটা শান্তির প্রলেপ লাগালে। এরপর শুনতে পাচ্ছি বসার ঘরে বাবাকে রীতিমতো ধমকের স্বরে আমার সহমর্মী সত্তরোর্ধ্ব মহিলার গর্জন। মহিলাকে এত রেগে যেতে কখনও দেখিনি। কঠিন স্বর ভেসে এল—“আমি একটু সময় ঘরে নেই, তার মধ্যে এইসব করছিস। তুই চাস আমিও হাতটা তুলি আবার?”

বাবার গলা একদম নীচে কুইকুই করছে—“আরে, মা শোনো, তোমার নাতি কোনও পড়াশুনাই করছে না।”

গম্ভীর গলা ঠাকুমার—“তাই বলে এই? বোঝাও, ভালোভাবে বুঝিয়ে বললে ঠিক শুনবে।” একটু থেমে বললেন, “আরেকদিন যদি আমি শুনেছি তুই ওর গায়ে হাত তুলেছিস তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।” ব্যস, ভেটো দিয়ে দিয়েছে।

বাবা একদম কেঁচো। বাবাকে ঠাকুমা বকছেন। কী যে স্বর্গীয় আনন্দ হচ্ছিল, কী বলব। অত জ্বালার মধ্যেও আনন্দে চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। এত বছরের জীবনে এই একজন মানুষ যে শুধু আমার জন্যে বুক চিতিয়ে শত্রুপক্ষের সামনে দাঁড়িয়েছেন। আমার হয়ে লড়েছেন। আর কাউকে দেখিনি এমন লড়াই লড়তে।

ঠাকুমা একবার এ-ঘরে আমাকে দেখে গায়ে হাত বুলিয়ে আবার বসার ঘরে গিয়ে বললেন, “এই যে, তুই মানুষ, না বনমানুষ? বেতটা ভেঙেছিস ওর পিঠে! তোর সাহস কী করে হল ওটা ভাঙার? ওটা আমার পিঠ চুলকানির বেত। দু-দিনের মধ্যে জোগাড় করে আনবি ওটা। আর খবরদার, আমার নাতির গায়ে হাত তোলার আগে আমাকে জিজ্ঞাসা করবি।”

বাবা একদম চুপ। খুব কষ্ট করে উঁকি মেরে দেখি, বাবা পাশের ঘরে মাথা নীচু। শত্রুপক্ষের প্রবল পরাজয়। একে একে কাকা, পিসি সবাই সন্ধেবেলা বেলা বাড়ি ফিরলে। ঠাকুমা সবাইকেই আজকের ঘটনাটা এমন চোখ বড়ো বড়ো করে দুলে দুলে বললেন যে মনে হচ্ছিল দুপুরে বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল। ঠাকুমা অনেক কষ্টে ছিনিয়ে এনেছেন ওদের থেকে। এরপর বাবা আর কাকাকে সাবধান করলেন। এরপর অনেকদিন বাবা অঙ্কের খাতা দেখে, হাফ ইয়ারলি, অ্যানুয়াল রেজাল্ট দেখে খুব রেগে উঠেও হাত নামিয়ে নিয়েছে। রেগে নিজের হাত ঝাঁকুনি দিয়েও মুঠো করে নামিয়ে রাগ দেখিয়েছে, কিন্তু আমার পিঠে? উঁহু, একদম না। ঠাকুমা রেগে বলেছেন মানে ওটাই শেষ কথা। এই যে বাবার প্রবল মার তারপর ঠাকুমার বকা, এটা এত আনন্দদায়ক যে মুখে বা লিখে প্রকাশ করা যায় না। সেই বয়সে মনে হয়েছিল কেউ তো আছে যার পিছনে আড়াল হওয়া যায়। যে চোখ বুজে আমাকেই সমর্থন করবে। যখন ঠাকুমা বাবাকে বকা দিচ্ছিলেন, তখন খালি মনে হচ্ছিল—বেশ হয়েছে। বেশ হয়েছে। দেখো মজা। আর করবে?

তিনদিন বাদে বাবা কোথা থেকে আরেকটা পুরীর বেত এনে ঠাকুমাকে দিল। ঠাকুমা সেটা নিয়ে মুখটা চিপে আস্তে করে বাবা হাতে মারার ভঙ্গি করে স্পর্শ করলে। সঙ্গে হেসে বললে, “কী, কেমন লাগে? যা রেখে দে জায়গায়।”

এমন কতবার হয়েছে, লুডো খেলতে খেলতে হাতে স্কুলের টিচারের মারা বেতের লাল দাগ দেখে প্রথম আঁতকে উঠে, ‘দেখেছ!’ বলে তারপর সন্ধেবেলায় বাবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। পুরো ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’।—“দেখ কী করেছিস! তোরা মানুষ, না অন্য কিছু?”

বাবা অবাক। কিছুতেই মনে করতে পারছে না কখন মেরেছে। বলেই ফেললে, “আমি কখন…”

বলতে বলতে আর-একপ্রস্থ বকা—“আপসোস, তোদের মানুষ করতে পারলাম না। তোর বাবার কাছে এর কী উত্তর দেব?”

বাবা পুরো হতভম্ব। আমি ততক্ষণে ফুড়ুত করে অন্য ঘরে।

ঠাকুমা যা যা সারাজীবনের জন্য নষ্ট করে দিয়ে গেছেন তার একটা লিস্ট হলে প্রথমেই আসবে রান্না। নিজের রান্না নিজেই করতেন। উলটে নিরামিষ তরকারি নিজের জন্যে করে আমাদের জন্যে, বিশেষ করে আমার জন্যে রেখে দিতেন। কিছুই নেই—সাদা আলু-পটল তরকারি—কালো জিরা দেওয়া, পুই ডাঁটার তরকারি আলু-কুমড়ো দিয়ে। উফ্‌! আর কারোটা তেমন জিভে লাগল না। তালের কতরকম রান্না, দুধের কতরকম রান্না। এইসব রান্না এখন কেউ দিলে খুব কৃত্রিমভাবে বলি, ভালোই হয়েছে। আর ভাবি, ঠাকুমা তুমি অনন্য। সারাদুপুর ঘুমোতেন না। হয় রান্না, না-হয় সংসারের হিসেব লেখা, না-হয় আমার সঙ্গে লুডো। আমার তখন মর্নিং স্কুল। সারাদুপুর আমি আর ঠাকুমা বাইরের ঘরে ঠাকুমার খাটে। রাত্রে মেঝেতে টানা বিছানা হত। দিদি, দাদা, আমি, ঠাকুমা একসঙ্গে শুতাম। সবাই খুব মজা করে পেয়াঁজ খেত। আমি খেতে পারতাম না। পেয়াঁজ খেলে ঠাকুমা পাশে শুতে দেবে না। এত বছর বয়সেও কাঁচা পেঁয়াজ তাই সহ্য হয় না। কোথাও গেলে পিঠে-পায়েস, তালের পদ রান্না দিলে ঠিক ভালোবেসে খেতে পারি না। কারণ সেই স্বাদ আর পাই না। ঠাকুমা যেমন ভালোবেসে সারাদিন ধরে নারকোল ছিঁড়ে গঙ্গাজলি তৈরি করত তেমন কিছু মিষ্টি ধীরে ধীরে কালের অতলে তলিয়ে গেছে। যা পাওয়া যায় দোকানে বা বাড়িতে তাকে কোনো তুলনাই করা যায় না ঠাকুমার সঙ্গে। এখন তো আর দেখিও না।

শেষ অবধি ঠাকুমার চলে যাওয়াটাও একটা গভীর দাগ কেটে গেল। জীবনভর ভুলতে পারিনি।

ওঁকে রাত্রি ছাড়া সারাদিনে কখনও শুতে দেখিনি। তখন আমার বয়স বারো। একবার পুজোর পরে ঠাকুমা অসুস্থ হলেন। সেই প্রথম বিছানায় শোয়া দেখলাম। এবার কে লুডো খেলবে? কে আমার কান্টামি সহ্য করবে? কে গল্প পড়ে শোনাবে মহাভারত, শুকতারা আর সন্দেশ থেকে? তাও কিছুদিন ওই শুয়ে-শুয়েই চলল বই পড়ে শোনানো। সে-বই পড়ারও অনেক কায়দা। ঠাকুমার এক হাতের ওপর মাথা রেখে আমি শুয়ে। অন্য হাত দিয়ে পত্রিকা ধরে পড়ে শোনানো। শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া। এ তো রোজকার ঘটনা। শেষে সেটা বন্ধ হল। ঠাকুমার পেটে ব্যথা। কত ডাক্তার এল গেল। বাবা, কাকা, পিসিরা আলোচনা করে ডাক্তার পালটায়, কিন্তু পেট ব্যথা কমে না। ব্যথার ওষুধ খেয়ে খেয়ে চলে। ঠাকুমার খাওয়া কমে গেল। পিসিরা যারা বাইরে ডুয়ার্স-এ থাকে তারাও এসে দেখে গেল। এরপর ডাক্তার পি. ব্যানার্জীর হোমিওপ্যাথ ওষুধে কিছুটা কমল। বাবারা একটু নিশ্চিন্ত হল। খাওয়া বাড়ল। ঠাকুমা উঠে দাঁড়ালেন, কিন্তু খুব দুর্বল। সেই প্রথম ওই প্রতাপশালী বাবা, কাকা, জ্যাঠাদের কেমন অসহায় ছন্নছাড়া মনে হল। কিছুদিনের মধ্যেই সেই পেট ব্যথা ফিরে এল আবার প্রবল উদ্যমে। এবার আর কাজ হচ্ছে না সেই ওষুধে। এবার কলকাতার তাবড় বড়ো ডাক্তার বাবারা অনুনয় বিনয় করে আনলেন। ডাক্তার যোগেশ ব্যানার্জী এলেন। ওষুধ দিলেন, কিন্তু সামান্য কমেই আবার বাড়ল। ধীরে ধীরে শরীরে শক্তি কমে যেতে লাগল। শরীর খাটের সঙ্গে মিশে যেতে লাগল।

আস্তে আস্তে সেই অমোঘ দিন এগিয়ে এল।

বাড়িভর্তি লোকজন। অনেকেই আসা-যাওয়া করছে। ঠাকুমা স্থির। আধা জ্ঞান আছে। কিছুটা ঘোরের মতো। পিসি, মা, কাকিমারা রাত জাগছে। আয়াও মাথার কাছে বারে বারে জিজ্ঞাসা করছে, ‘কিছু কি বলবে?’ ‘কিছু কি চাই?’ ঠাকুমা কিছুই বলেন না। সেই প্রথম বাইরের ঘরটা আমার আর ঠাকুমার হাত থেকে সবার হাতে চলে গেল। এমন মানুষ অসুস্থও হয়? সেই প্রথম মৃত্যু পথযাত্রীকে দেখা। যিনি চোখের সামনে আস্তে আস্তে সেই করাল ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছেন। সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে যাচ্ছেন। চারদিকে কত তাঁর ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনি ঘিরে আছে। কিন্তু তিনি যন্ত্রণায় কাতর; তিনি তাদের উপস্থিতি উপভোগ করতে পারছেন না।

এমন করতে করতে খাওয়া বন্ধ হল। শুধু জল, শুধু একটু দুধ। রাত্রিবেলা মাটিতে বিছানা হত। আমি ঘুমাতাম, বাকি সবাই বসে থাকত। বুঝতে পারছিলাম, ঠাকুমার সাংঘাতিক কিছু হয়েছে।

শেষ অবধি বাড়ির চেনা ডাক্তার বললে, “খুব জোর আজ না-হয় কাল অবধি।” আর কিছু বললেন না।—“কিছু দরকার হলে ডাকবেন, আমি আছি।”

সেদিনটা টালমাটাল কাটল। পেট ফুলে শক্ত। জ্ঞান নেই প্রায়। একটা হাঁপানির টানের শব্দ। রাত কাটল বসে-দাঁড়িয়ে সবার। আমাকে অন্য ঘরে শুতে বলা হল। সকালে উঠে দৌড়ে ঠাকুমার কাছে গিয়ে দেখলাম সেই একরকম। টানটা বেড়েছে। ছোটো পিসি বললে, “চিত্ত, তুই একবার ডাক দেখি।”

বাবাও এগিয়ে এসে বললে, “তুই ডাকলে যদি সাড়া দেয়। আমরা ডাকলে তো কিছুই সাড়া দিচ্ছে না।”

আমি মুখের কাছে গিয়ে ‘ঠাকুমা ঠাকুমা’ করে বার কয়েক ডাকলাম। কোনও সাড়া নেই। মুখ সরিয়ে নেব, দেখলাম খুব আস্তে আস্তে চোখটা একটু খুললেন। ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি। আমি শুয়ে থাকা চশমা ছাড়া ঠাকুমাকে চিনতে পারছি না। এক চোখের কোল বেয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে এল। আমি আর সামনে বসে থাকতে পারলাম না। খুব বোধহয় কষ্ট হচ্ছে সব ছেড়ে যেতে।

ছোটো পিসি বললে, “এই তো মা চোখ মেলেছে। এই তো এবার ভালো হয়ে যাবে। আমি পাগলা বাবার ওখান থেকে মাটি এনে কপালে ছুঁয়েছি। হতেই হবে।”

আমি এই অচেনা ঠাকুমাকে ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। মুহূর্তে মনে হয়েছিল ঠাকুমা আমাকে চিনতে পারছেন। কিন্তু আবার আস্তে আস্তে চোখ বুঝে এল। সেই চোখ আর খোলেননি। নীচের মেসোমশাইকে ডাকা হল। উনি মাথার কাছে বসে গীতা পড়তে লাগলেন। পিসিরা মাটিতে বসে পড়ে শাড়ির খুঁট দিয়ে চোখ মুছতে লাগল। শুধু ছোটো পিসি শক্ত ছিল। শেষ আট মাস শ্যামবাজার থেকে কালীঘাট সকাল দশটার মধ্যে এসে রাত্রি নয়টায় পিসেমশাইর সঙ্গে ফিরত। ছোটো পিসি ঠাকুমার পা ধরে মুখের দিকে তাকিয়ে। ঠাকুরমার কোনও সাড়া নেই। বড়দা মাঝে মাঝে পালস দেখছে। আর বলছে, “খুব ক্ষীণ।”

সময় যেন থমকে আছে। বাবা, কাকা দুই বারান্দায়। দিদি আমি এদিক ওদিক করছি। রান্না বসেনি। উনুনও জ্বলেনি। এর মধ্যে নীচের মাসিমা এক কেটলি চা করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। শেষ মুহূর্তের অপেক্ষায়। শেষে মা কিছু বলে কি না। চোখ খুলে তাকে চেনে কি না। কাউকে দেখতে চায় কি না।

এরকম চলতে চলতে দাদা ডাক্তারবাবুকে ডাকতে গেল। উনি এলেন। সবাই ডাক্তারবাবু আর ঠাকুমাকে ঘিরে দাঁড়ালে। উনি পালস ধরলেন—প্রথম হাতে, তারপর গলার কাছে। অনেকভাবে দেখলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। মাথা নীচু করে বললেন, “উনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।”

সবাই প্রথমে অবাক, তারপর একে একে কান্নায় ভেঙে পড়লে। মেসোমশাই তখনও জোরে জোরে গীতা পাঠ করছেন। সেজো পিসি বিয়ে করেননি। শুধু বলতে লাগলেন, “আমি কার কাছে থাকব বলে গেলে না।” সেই মর্মভেদী বুক বিদীর্ণ চিৎকার আজও কান পাতলে শুনতে পাই। বাবা দেয়ালের দিকে মুখ করে। কাকা বারান্দায়। প্রত্যেকেই চল্লিশ-ঊর্ধ্ব বয়েস, কিন্তু শিশুর মতো কাঁদছে। আজ ঠাকুমা কাঁদিয়েছে।

কাজ হয়ে গেল। দুপুর হলে সবাই বাইরে, আমি সেই বাইরের ঘরে আর থাকতে পারি না। একা একা বহুদিন ওই ঘরে থাকিনি। চোখ বুজে দৌড়ে ওই ঘর পেরিয়ে বারান্দায় গেছি। খাটের দিকে তাকাতে পারিনি। খালি মনে হয় ঠাকুমা শুয়ে আছেন। এমনকি অনেক দিন পরেও উলটোদিকে মাথা দিয়ে শুতে পারিনি। যদি ঠাকুমার গায়ে লেগে যায়! ওই প্রথম কাছ থেকে মৃত্যুকে দেখা। ওই প্রথম সত্যের মুখোমুখি। মনের মধ্যে অজস্র প্রশ্ন—মানুষটা এই আছে এই নেই। বিশ্ব চরাচরে কোথাও তিন নেই। এত কথা, লুডো খেলা, গল্প বলা সব নিমেষে হারিয়ে গেল। একটা নিষ্প্রাণ দেহ, অচেনা উপস্থিতি পড়ে আছে। সেই প্রথম অন্য কোনও জগতের সন্ধান। এ এক নতুন অনুভূতি চোখের সামনে দেখা। বারো বছর বয়সে হঠাৎ ঠাকুমা এক হ্যাঁচকা টানে পথে দাঁড় করিয়ে চলে গেলেন। ঠাকুমার সঙ্গের জীবন আর পরবর্তী জীবন সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেল। সেই চিনের প্রাচীর আর নেই। প্রতিমুহূর্তে ঘাত-প্রতিঘাতে চূর্ণ হচ্ছি। আর এগোচ্ছি অন্তিম লক্ষ্যের দিকে।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে

Leave a Reply