গল্প-ফিনিক্স-পুষ্পার্ঘ্য দাস-বর্ষা২০২৩

এই লেখকের আগের গল্প- রাজবাড়িতে কে ও?

golpophoenix

সাল উনিশশো উননব্বই। তখনও কেব্‌ল্‌ টিভি আসেনি আমাদের দেশে। চ্যানেল বলতে তিনটি—ডিডি ন্যাশনাল, ডিডি মেট্রো আর ডিডি বাংলা। বেশিরভাগ মধ্যবিত্তের বাড়িতেই ছোটোখাটো প্যানোরমা কালার টিভি। নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চ্যানেল চেঞ্জ করতে হয়। সেই ‘বোকাবাক্স’তেই টেলিকাস্ট হওয়া খেলার প্রতি লোকের আকর্ষণ প্রচুর। কপিল দেবের অধিনায়কত্বে তিরাশির বিশ্বকাপ জেতার পর থেকে দেশবাসীর মনে নানারঙের স্বপ্নের আনাগোনা। ক্রিকেট খেলাটাকে নিয়ে কিছু মানুষের পাগলামি দেখার মতো। সেইসব অন্ধ ভক্তদের মধ্যে একজন হলেন প্রদীপবাবু।

অফিসের সময়টুকু বাদ দিয়ে প্রদীপবাবুর বাকি সময়টা জুড়ে শুধুই ক্রিকেট। শুধু খেলা দেখা নয়, ম্যাগাজিনে, খবরের কাগজে খেলার খবরগুলো সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া চাই তাঁর। ক্রিকেট সম্পর্কিত কোনোরকম অ্যানালিসিসও তাঁর নজর এড়াতে পারে না। তারপর অফিসে, চায়ের ঠেকে সুযোগ পেলেই যে-কোনো টপিককে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটে নিয়ে যান। তাঁর এই অবসেশন নিয়ে আড়ালে আবডালে ঠাট্টা করে লোকে। বিয়ের দশ বছর পরেও নিঃসন্তান প্রদীপবাবুর জগতের বেশিরভাগটা জুড়ে শুধুই ক্রিকেট। আর কিছুটা জুড়ে তাঁর স্ত্রী অপরূপা।

বিয়ের বারো নম্বর বছরে হঠাৎই অপরূপা সন্তানসম্ভবা হলেন। সন্তান না হওয়ার কোনও কারণ যেমন এতদিন ডাক্তাররা জানাতে পারেননি, তেমনই এতগুলো বছর পর সন্তান গর্ভে আসার খবরেও তাঁরা বেশ বিস্মিতই হলেন। আসলে কিছু মিরাকল তো কোনও নিয়মের ধার ধারে না। কখন কী ম্যাজিক হয় কে জানে। এবার প্রদীপবাবুর মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্মাল যে, এতদিন পর ঠাকুর যখন মুখ তুলে চেয়েছেন, তখন এই ছেলে গণ্যমান্য কেউ না হয়ে যায় না।

জন্মাবার পর ওঁদের ছেলে সুমনের মুখ দিয়ে প্রথম যে শব্দটি বেরিয়েছিল সেটা নাকি ‘মা’ বা ‘বাবা’ নয়, সেটা হল ‘বল’। আর ওই ‘বল’ শুনেই ক্রিকেট অন্ত প্রাণ প্রদীপবাবু লাফিয়ে উঠেছিলেন। থ্রি ইডিয়টসের বোমান ইরানির স্টাইলে বলেছিলেন, “মেরা বেটা ক্রিকেটার বনেগা।”

“বল তো অনেক খেলাতেই লাগে”। বলে অনেকেই ক্ষীণ প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেসব কথাকে স্রেফ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রদীপবাবু। বলেছিলেন, “যে-দেশে ক্রিকেট একটা ধর্ম, সেখানে বল বললে তার সঙ্গে ব্যাটই আসে, অন্য কিছু নয়। আর তাছাড়া কার ছেলে দেখতে হবে তো! নিজে তো সুযোগ পাইনি জীবনে। এ-ব্যাটাকে কিন্তু ছাড়ছি না।” সেই মুহূর্তে তাকে দেখে ‘ভিরু সহস্রবুদ্ধে’ বা ‘ভাইরাস’কেই মনে পড়ছিল বার বার।

বাস্তবে অবশ্য দেখা গেল একটু বড়ো হতেই শুধু ক্রিকেট নয়, যে-কোনো খেলা দেখলেই সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সুমন। বৃষ্টিতে মাঠে জল-কাদার মাঝে ফুটবল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, শীতের সন্ধেতে পড়াশোনা শিকেয় তুলে ছোটো ছোটো র‍্যাকেট নিয়ে মেতে উঠছে ব্যাডমিন্টনে, স্কুল থেকে ফিরতে না ফিরতেই প্রথমে সমবয়সিদের সঙ্গে ক্রিকেট, তারপর তারা বাড়ি চলে গেলে বড়োদের খেলার পাশে হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছে।

এতদিনে ক্যাবল টিভি চলে এসেছে ভারতে। খেলা-পাগল সুমনকে তার বাবা টিভিতে ক্রিকেট হলেই নিজের কাছে এনে বসান। কিন্তু সুমনের ধ্যান-জ্ঞান তো কেবল ক্রিকেট নয়। ব্রাজিলের রোনাল্ডো তার প্রিয় ফুটবলার, লন টেনিসে পিট সাম্প্রাস, হকিতে ধনরাজ পিল্লাই। এঁদের খেলা হলে তো কথাই নেই। সুমন ঠিক বসে পড়বে টিভির সামনে। পড়াশোনার দিকে খুব একটা মনোযোগ দেয় না বলে বার বার অভিযোগ করেন অপরূপা—“সারাদিন শুধু খেলা খেলা খেলা। পড়তে বসতে বললেই গায়ে জ্বর আসে বাবুর। এত খেললে, খেলা দেখলে পড়ার সময় পাবে কী করে?”

প্রদীপবাবু আশ্বস্ত করেন—“আরে অত চিন্তা কোরো না তো। আর-একটু বড়ো হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমিও এবার ওকে ক্রিকেট কোচিংয়ে ভরতি করে দেব।”

অবাক হন অপরূপা—“কোচিংয়ের খরচা চালাতে পারবে তুমি?”

“পারতে আমাকে হবেই রূপা। তার জন্য যা করার, আমি তাতেই রাজি। ছেলেটাকে আমি ক্রিকেটার বানাবই, দেখো তুমি।”

কয়েকদিন পরেই সুমনকে রমাকান্ত-স্যারের কোচিংয়ে ভরতি করে দিলেন প্রদীপবাবু। বললেন, “স্যার, ছেলেটাকে একটু দেখবেন। এমনিতে খুবই আগ্রহ রয়েছে খেলার প্রতি। আপনার গাইড পেলে আমি নিশ্চিত ও ভালো খেলবেই।”

কথাটা শুনে একটু হেসে রমাকান্ত-স্যার বললেন, “আমরা বড়োরা ওপর ওপর দেখে নিজেদের সুবিধেমতো অনেক কিছু ভেবে নিই। কিন্তু ছোটোরা নিজেদের কাছে খুব সৎ হয়। দেখা যাক, সুমনের ইন্টারেস্টটা ঠিক কোন দিকে।”

কিছুটা ওর বাবার জন্য, কিছুটা রমাকান্ত-স্যারের অনুশীলনের জন্য আর বেশিটা সচিন নামক আবেগের জন্য—ক্রিকেটের প্রতি সুমনের ভালোবাসা বাড়তে লাগল দিন দিন। এত বেশি সময় ক্রিকেট খেলতে লাগল যে অন্যান্য খেলাগুলো চলে গেল ব্যাক সিটে। টেন্ডুলকর নামটা প্রতিটি ক্রিকেটপ্রেমী ভারতীয়র সঙ্গে সঙ্গে সুমনের জীবনেও জড়িয়ে গেল ওতপ্রোতভাবে। সবাই এখন ওই লোকটার মতো হতে চায়—মাস্টার ব্লাস্টারের নাম সবার মুখে মুখে। সারাদেশে যেন সচিন নামের একটা সুনামি ঢেউ উঠেছে।

সুমনকে হাতে ধরে টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি অক্লান্তভাবে বুঝিয়ে যান রমাকান্ত-স্যার। কিন্তু সুমনের খেলা বেশিরভাগটাই সহজাত। সে যতবারই ভাবে ক্রিকেটের ব্যাকরণের বাইরে গিয়ে শট খেলবে না, ততবারই বাইশ গজে গিয়ে দাঁড়ালে সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশন চলে আসে মনের ভেতর ব্যাকরণের বই খোলার আগেই। আর যখন রমাকান্ত-স্যার জোর করে টেকনিক্যালিটিসের পাঁচন গেলানোর চেষ্টা করেন, সুমনের খেলা নিষ্প্রাণ হয়ে যায়।

বছর খানেক চেষ্টা করার পর রমাকান্ত-স্যার পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, এ ছেলেকে ওর মতো খেলতে না দিয়ে উপায় নেই। জোর করলে ভালো হওয়ার পরিবর্তে খারাপ হওয়ার চান্স অনেক বেশি। সুমন প্রস্ফুটিত হতে লাগল তার নিজের মতো করে।

এর কয়েক বছর পর জানুয়ারি মাসের এক সন্ধেয়, টিভিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুটো সচিনকে একসঙ্গে ব্যাট করতে দেখে দারুণ অবাক হল সুমন। কী ব্যাপার? সচিনের যমজ ভাই আবার কোত্থেকে এল? প্রায় একইরকম উচ্চতা, একইরকম শারীরিক গড়ন, এমনকি ব্যাটিং স্টান্সও একই। শটগুলো মারছেও যেন পুরো সচিনের কার্বন কপি। আজ সৌরভ খেলবে না জানত সুমন। কিন্তু এই ছেলেটা কে, যে ওপেন করছে?

ব্যাটসম্যানের মুখে ক্যামেরা ফোকাস করতেই দেখতে পেল সে—আরে, এ তো সেহওয়াগ! লোয়ার-মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করে। বেশ মার মার কাট কাট ব্যাটিং। এই প্রথম সচিন-সেহওয়াগ একসঙ্গে ওপেন করছে। ওদের দুজনের সিমিলারিটিজগুলোও বেশ আনক্যানি।

দুজনেরই আক্রমণাত্মক খেলার ধরন দেখে নতুন ওপেনিং জুটিটা দারুণ মনে ধরল সুমনের। যাক, একজন রিজার্ভ ওপেনার পাওয়া গেল তাহলে। উনিশ নম্বর ওভারে স্নেপকে চার মেরে হাফ সেঞ্চুরি করার ঠিক পরের বলেই আউট হয়ে গেল সেহওয়াগ। কিন্তু ততক্ষণে সচিন-সেহওয়াগের একশো সাত রানের পার্টনারশিপ ইংল্যান্ডের কোমর ভেঙে দিয়েছে। দুশো আঠারো রানের লক্ষ্য এখন মনে হচ্ছে ছেলেখেলা। সচিনের সঙ্গে সঙ্গে সচিনের যমজকেও সে ভালোবেসে ফেলল।

সেই বছরই জুলাই মাসে একদিন ভোর হতে না হতেই দেখা গেল সুমন তিরবেগে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে স্টেশনের দিকে। ওখানেই তো ভোরবেলায় খবরের কাগজের লট আসে প্রথমে। তারপর সেখান থেকে কেউ সাইকেলে নিয়ে যায় বাড়ি বাড়ি, কেউ-বা স্টেশনেই পশরা সাজিয়ে বসে। সুমনের বাড়িতেও পেপার দিয়ে আসে একটা কাকু। কিন্তু সে তো শুধু বাংলা। বাংলা-ইংরেজি নির্বিশেষে সে আজ সব পেপার দেখতে চায়। একটা বিশেষ ছবি চাই তার। যে কাগজে বড়ো করে, সবচেয়ে ভালোভাবে বেরোবে ছবিটা, সেটাই সে কিনে নেবে। কারণ, গতকাল এক বঙ্গসন্তানের নেতৃত্বে দুই তরুণ তুর্কির হাত ধরে অসাধ্য সাধন করেছে ভারতীয় ক্রিকেট দল। লর্ডসের মাঠে অর্থাৎ ইংল্যান্ডের নিজের ডেরায় ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জিতে নিয়েছে। তাও আবার যেখানে প্রতিপক্ষ পঞ্চাশ ওভারে তিনশো পঁচিশ রানের বিশাল রানের পাহাড় চাপিয়ে দিয়েছিল। যুবরাজ সিং আর মহম্মদ কাইফের এই যুগলবন্দি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে, স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায়। তার সঙ্গে আপামর ক্রিকেটপ্রেমীর বুকের মধ্যে থাকবে খেলার শেষে লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাদার টি-শার্ট ওড়ানোর ছবি। কয়েক মাস আগেই মুম্বইতে ইন্ডিয়াকে শেষ ওভারে হারিয়ে দিয়ে ফ্লিনটফ শার্ট খুলে উন্মত্ত সেলিব্রেশন করেছিল। গতকাল দাদা লর্ডসে সেটা ফিরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাকি সমস্ত প্রতিপক্ষকে একটা মেসেজও দিল যে, এই ভারত কারও সামনে মাথা নত করবে না। দাদার ওই শার্ট ওড়ানোর মুহূর্তের ছবিটাই চাই সুমনের।

সবগুলো কাগজ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে বেছে নিল সবচেয়ে ভালো ছবিওয়ালা পেপারটি। বাড়িতে এসে কাঁচি দিয়ে যত্ন করে কেটে নিল দাদার ছবি। তারপর নিজের ঘরের দরজায় লাগিয়ে দিল সেলোটেপ দিয়ে। দরজার গায়ে আরও অনেক ছবি লাগানো আছে। তাদের মধ্যে ওর আর-একটা প্রিয় ছবি হল মাথায়-চোয়ালে ব্যান্ডেজ বাঁধা অনিল কুম্বলের। দু-মাস আগের ছবি। ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলতে গিয়ে মারভিন ডিলোনের বলে চোয়ালের হাড় ভেঙে যায় কুম্বলের। কিন্তু ভাঙা চোয়ালও দমাতে পারেনি ওই ডানহাতি লেগ স্পিনারকে। ব্যান্ডেজ বেঁধে মাঠে নেমে সে রীতিমতো বোলিং করে। এমনকি ব্রায়ান লারার মতো ব্যাটসম্যানের উইকেটও নেয়। আশ্চর্য মানসিক জোর এই লোকটার। সুমন জানে, যেতে-আসতে কুম্বলের বা দাদার এই ছবিগুলো দেখতে পেলে তার চোখের সামনে ভেসে উঠবে এদের নেপথ্য কাহিনি, কোনোরকম ব্যর্থতায় যা তাকে ঘুরে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করবে।

তার পরের দিন সোমবার স্কুলে গিয়ে ক্লাস-টাস সব শিকেয় উঠল। বন্ধুদের সঙ্গে ম্যাচের চুলচেরা বিশ্লেষণে লেগে পড়ল সুমন। যুবরাজের স্টাইলিশ ব্যাটিং দেখে বেশিরভাগই ওকে আইডল মানতে শুরু করেছে। কিন্তু সুমনের বেশি মনে ধরেছে কাইফকে। আসলে কাইফকে দেখে ওর মনে হচ্ছিল, এই ছেলেটার ট্যালেন্ট য়ুবরাজের থেকে কম হলেও চেষ্টায় শতকরা একশো শতাংশ সৎ। সঙ্গে ফিল্ডিংয়েও জান-প্রাণ লড়িয়ে দেয় একেবারে। ভারতীয় দলে দারুণ ভালো ফিল্ডার বরাবরই কম। সেখানে কাইফ যেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

নিজের খেলা হিসেবে ক্রিকেটকে আঁকড়ে ধরলেও, বাকি খেলাগুলোর প্রতি আকর্ষণ এতটুকুও কমেনি সুমনের। ফুটবল খেলার সময় না পেলেও দেখতে বা খোঁজখবর রাখতে ছাড়ে না সে। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশের লিগের প্রতিও তার প্রবল উৎসাহ। এই সবে নতুন নতুন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ভারতে ব্রডকাস্ট হতে শুরু হয়েছে। বাইচুং ভুটিয়ার গোল দেখে যেমন সে লাফিয়ে ওঠে, স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের কোচিংয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খেলা তেমনই তাকে মোহিত করে। হোমওয়ার্কগুলো তাড়াতাড়ি সেরে নিয়েই টিভি খুলে বসে পড়ে। শুধু এখনকার নয়, পুরোনো যে-কোনো খেলাও মন দিয়ে দেখে সুমন। অপরূপা বলে বলে হয়রান। আসলে বাবার সাপোর্ট যে সর্বদাই ছেলের দিকে।

যদিও ক্রিকেট বাদ দিয়ে ছেলের অন্য সব খেলার প্রতি আগ্রহ মাঝে মাঝে চিন্তায় ফেলে দেয় প্রদীপবাবুকে। ছেলে আর কোনও খেলার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে না তো! সুমনকে কোচিংয়ে দিয়ে আসার বা নিয়ে আসার সময় রমাকান্ত-স্যারের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন—ছেলে কেমন খেলছে, উন্নতি হচ্ছে কি না। স্যার হেসে উত্তর দেন, “সুমন তো এখনও বেশ ছোটো। বেশি টেনশন করবেন না। ওকে নিজের মতো খেলতে দিন। ওর মধ্যে প্রতিভা দেখতে পেয়েছি। কিন্তু জোর করে মেরেপিটে খেলা তৈরি করায় বিশ্বাসী নই আমি। খুব বেশিদিন পাখিকে খাঁচায় ধরে রাখলে সে উড়তে ভুলে যায়। আর যে পাখি উড়তে ভুলে যায়, তাকে কি আর পাখি বলা যায় প্রদীপবাবু?”

স্যারের শেষ কথাগুলোর মধ্যে এমন কিছু ছিল যে তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না।

ছেলের সঙ্গে ক্রিকেট দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলেন একদিন, “আচ্ছা বাবু, তোর সবচেয়ে প্রিয় ক্রিকেটার কে?”

সুমন একগাল হেসে বলল, “ওই যে লোকটাকে নিয়ে সারাদেশ পাগল। আমারও প্রিয় সেই লোকটাই। সচিন রমেশ টেন্ডুলকর।”

“তাহলে তোকে একটা গল্প বলি শোন। সচিন যখন ছোটবেলায় শিবাজি পার্ক জিমখানা গ্রাউন্ডে ট্রেনিং করতে যেত, তখন আচরেকর-স্যার স্টাম্পের উপর একটা করে এক টাকার কয়েন রেখে দিতেন। পুরো সেশনটা খেলার পরেও শচীন যদি আউট না হত, তাহলে সেদিন ওই কয়েনটা তার হয়ে যেত। এরকম করে অনেকগুলো এক টাকার কয়েন অর্জন করেছিল সচিন। আজও সে ওই কয়েনগুলোর জন্য গর্ব বোধ করে।”

সুমনের মুখে দেখা দিল চওড়া হাসি।—“দাঁড়াও তাহলে, তোমাকে একটা জিনিস দেখাই।” বলে সুমন এক দৌড়ে ভেতরের ঘর থেকে একটা ছোটো প্লাস্টিকের কৌটো নিয়ে এল, যার প্রায় অর্ধেকটা এক টাকার কয়েনে ভরতি। কৌটোটা দেখিয়ে সুমন বলল, “প্রথম প্রথম খেলতে গিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো কয়েকটা শট নেওয়ার পরেই ভুলভাল শট খেলে আউট হয়ে যেতাম। তারপর রমাকান্ত-স্যার লোভ দেখাল। এটা তো আমার কাছে টাকা নয়, পুরস্কার। এতদিনে স্যারের কাছ থেকে আমিও কয়েকটা কয়েন জিতেছি, যেদিন যেদিন আউট হইনি। আজ তোমার কাছ থেকেই প্রথম জানতে পারলাম, সচিনও একইরকম ভাবে…”

ছেলের কথা আর তেমন শুনতে পাচ্ছেন না প্রদীপবাবু। কৌটোটার দিকে তাকিয়ে খুশির চোটে চোখের কোণ দুটো চিকচিক করে উঠল তাঁর।

রমাকান্ত-স্যার এখন সুমনকে নিয়ে দারুণ আশাবাদী। আন্ডার ফোরটিন টুর্নামেন্টে বেশ নজর কেড়েছে সুমন। খেলার মাঠে আশেপাশে ফিসফাস শুনতে পেয়েছেন কোচ-স্যার। লোকজন যখন বলছিল, ‘ছেলেটা কে বল তো? ফুটওয়ার্ক, ব্যালেন্স বেশ ভালো। আর শটগুলোও একেবারে মিডল অফ দ্য ব্যাট।’ স্যারের বুকটা গর্বে ফুলে উঠছিল। সুমনকে তো নতুন দেখছেন না। এতগুলো বছর ধরে একটু একটু করে তৈরি করেছেন। ছেলেটাও অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং সবকথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। নাহ্, এ-ছেলে নিজেকে এভাবে ধরে রাখতে পারলে অনেক দূর যাবে। প্রদীপবাবুর কাছে অবশ্য নিজের মনের কথা একটু রেখে-ঢেকেই বলেন। সুমনকে খুব ভালোবাসলেও ক্রিকেট নিয়ে একটু বেশিই অবসেসড। আর ওই অবসেশনটাকে লাগামছাড়া হতে দিতে চান না তিনি। সুমনকে বাহবা দিলেও বার বার মনে করিয়ে দেন—“দ্যাখ, এই মুহূর্তে ভালো খেলছিস বলে ওই ভাবনাটাকে একদমই মাথায় চড়তে দিস না। আশেপাশের লোকজন প্রশংসা করলে, হাসিমুখে থ্যাংকস জানিয়েই ভুলে যাবি ব্যাপারটা। আমার এত বছরের কোচিং জীবনে আমি অনেক ফুলঝুরি দেখেছি। কিছুদিন আলো দেয়, তারপর ফুস। তোকে তারা হতে হবে। নিজের আলো থাকবে তোর। তার জন্য দরকার অধ্যবসায়, কঠিন পরিশ্রম। কী রে, পারবি তো?”

চোয়াল দৃঢ় করে বলে সুমন, “পারব স্যার।”

কিন্তু তখন কী আর সে জানত…

বাইকের স্পিডো-মিটারের কাঁটা সত্তর পেরিয়ে গেছে। জনবহুল রাস্তায় লোকজনকে এদিক ওদিক কাটিয়ে ছুটে চলেছে দ্বিচক্রযান, যার সিটে প্রবল উদ্বেগে বসে রয়েছেন সুমনের বাবা-মা। গন্তব্য আর.এন টেগোর হসপিটাল। কেউ কোনও কথা বলছে না। কিন্তু হৃৎস্পন্দন পৌঁছে গেছে চূড়ান্ত পর্যায়ে।

প্রদীপবাবুর বাম চোখ দিয়ে নেমে আসছে জলের ধারা। বারে বারে একটাই কথা মনে আসছে, রোজ তো সুমনকে ট্রেনিং থেকে তিনিই বাড়ি নিয়ে আসেন। আজকে কেন তার অন্যথা করলেন? সুমন যখন বলল, “আজ অনির্বাণের বাইকে চলে যাব বাবা। তোমায় আসতে হবে না।” তখন কেন সায় দিলেন সুমনের কথায়?

কিছুক্ষণ আগের ফোন কলটা নিয়ে এসেছিল সেই দুঃসংবাদ। বাইক অ্যাক্সিডেন্ট। অনির্বাণের তেমন কিছু হয়নি, কিন্তু সুমনের পায়ের উপর দিয়ে লরির চাকা… আর.এন টেগোর হসপিটাল…

কানে যেন তালা মারা হয়ে গেছিল তাঁর। দুলে উঠেছিল ধরিত্রী। মনে হচ্ছিল যেন ভূমিকম্প হচ্ছে।—“বাবুর অ্যাক্সিডেন্ট…” এর বেশি কিছু স্ত্রীকে বলার মতো অবস্থা তাঁর ছিল না। এখন তাঁরা বাইকে করে চলেছেন হসপিটালের দিকে। আশ্চর্যের কথা, যে প্রদীপবাবুর সারাক্ষণ মাথায় ক্রিকেট ঘোরে, এই মুহূর্তে ক্রিকেট বলে কোনও শব্দ ডিকশনারিতে আছে বলে মনে হচ্ছে না তাঁর। কেবল একটাই চিন্তা—‘ছেলেটা কত কষ্ট পাচ্ছে এখন? আবার বুকে জড়িয়ে ধরতে পারব তো তাকে?’

‘ছি ছি! এসব কী ভাবছি?’—মনে মনে নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিলেন তিনি।

সেই অ্যাক্সিডেন্টের পর কেটে গেছে আরও কয়েকটা মাস। প্রদীপবাবু এখন অবশ্য ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেন। কিন্তু সুমন পারে না দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দু-হাত দিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরতে। ওলটপালট হয়ে গেছে তার জীবন। ডানপায়ের অবস্থা এমন হয়েছিল যে অপারেশন করে সেটা কেটে বাদ দিতে হয়েছে। ক্রাচ ছাড়া এখন আর হাঁটতে পারে না। বেশিরভাগ সময় খুবই চুপচাপ থাকে। ঘরের মধ্যে যে আরও একজন রয়েছে সেটাই ভুলে যান ওর বাবা-মা। প্রথম প্রথম এক-দু’বার রমাকান্ত-স্যার এসেছিলেন। কিন্তু ছাত্রের এরকম হাল চোখের সামনে দেখতে পারেননি তিনি। এখন আর আসেন না। সুমনের সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যে খেলা তার এত প্রিয় ছিল সেগুলোর দিকে ফিরেও তাকায় না আজকাল। খেতে হয় বলে খায়। পড়তে হয় বলে পড়ে। যেন একটা যান্ত্রিক জীবনযাপন করে চলেছে।

চোখের সামনে ছেলেটাকে দিন দিন এরকম মনমরা হয়ে যেতে দেখে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলেন প্রদীপবাবু আর অপরূপা। অনেক চেষ্টা করেন দুজনে। অপরূপা ছেলের পছন্দের খাবারগুলো তৈরি করেন। ছেলে সেসব না ছোঁয়ার মতো নাম-কা-ওয়াস্তে খায়। প্রদীপবাবু ছেলেকে ডাকেন একসঙ্গে খেলা দেখার জন্য। সুমন কোনও না কোনও বাহানা করে সেখান থেকে চলে যায়। বাইরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই নাকচ করে দেয় সঙ্গে সঙ্গে। সাইকোলজিস্টের কাছেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন প্রদীপবাবু। ছেলে দোর দিয়ে বসে ছিল অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিন।

এরকমই চলছিল। কিন্তু একদিন ছেলের অনুপস্থিতিতে তার বইয়ের তাক গোছাতে গিয়ে চমকে উঠলেন অপরূপা। বইয়ের পেছনে পেলেন বোতল-ভরতি ঘুমের ওষুধ।

পরেরদিন সকালেই প্রদীপবাবু ছুটলেন রমাকান্ত-স্যারের কাছে।—“আমার ছেলেটাকে বাঁচান স্যার!” সব কথা খুলে বললেন তাঁকে। কোচ-স্যার ভ্রূ কুঁচকে গালে হাত দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ভাবলেন। একসময় মুখে হাসি দেখা দিল তাঁর। যেন দেখতে পেয়েছেন আশার আলো। বললেন, “যে-খেলাকে ও দূরে সরিয়ে দিয়েছে, সেই খেলাই হবে ওর জীবনকাঠি।”

“কিন্তু… সুমন কি আর…”

“শুধু মাঠে নেমেই কি খেলা হয় প্রদীপবাবু? মাঠের বাইরেও যে একটা বিশাল খেলার দুনিয়া আছে।”

সেই দিনই বিকেলে সুমনের বাড়ি গেলেন কোচ-স্যার। ওর ঘরে ঢুকে প্রথমে দরজার ছিটকিনিটা তুলে দিলেন। তারপর চেয়ারে গিয়ে বসলেন সুমনের মুখোমুখি। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, “সুমন, তুই না নিজেকে প্লেয়ার বলিস?”

“বলতাম স্যার। পাস্ট টেন্স।” হতাশার হাসি ঠোঁটের কোনায় ঝুলিয়ে জবাব দিল সুমন।

“বেশ। বলতিস। কিন্তু এটা জানিস তো, ওয়ানস আ প্লেয়ার, অলওয়েজ আ প্লেয়ার। আর প্লেয়ার এবং ওয়ারিয়রের মধ্যে কমন কী বল তো?”

“কী?”

“দুজনের কেউই যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালায় না। সেখানে তুই এত সহজে রণে ভঙ্গ দিতে চাইছিস কেন?”

“হুহ্! যে প্লেয়ারের দু-পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকু নেই, সে আর কী করতে পারে স্যার?”

“কেন? সে তার খেলার ক্ষেত্রটা বদলে নেবে। কিন্তু পালাবে কেন?”

“মানে?” ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল সুমন।

রমাকন্ত-স্যারের এর পরের কথাগুলো শুনে সুমনের মুখে হাসি ফুটে ওঠে বহুদিন পর। ভোকাল টনিকের সঙ্গে সঙ্গে দরজার পেছনে দাদা আর কুম্বলের ছবিগুলো দেখে পুরোনো আত্মবিশ্বাস ক্রমে ফিরে আসতে লাগল তার। কোন জাদুর প্রভাবে কে জানে, প্রদীপবাবু আর অপরূপা দেখলেন, তাঁদের ছেলে আবার সব ধরনের খেলা নিয়ে মজে উঠেছে। টিভি, ম্যাগাজিন, নিউজপেপার কিছুই বাদ যাচ্ছে না। তার মুখে ফিরে এসেছে পরিচিত হাসি।

বছর খানেক পরে একদিন।

ই.এস.পি.এন চ্যানেলে শোনা যাচ্ছে সেই লোকটার গলা। যে-লোকটার গলা দেশবাসী এতদিনে খুব ভালোভাবে চিনে গেছে, ভালোও বাসে খুব।

“ওয়েলকাম টু দ্য ই.এস.পি.এন স্কুল কুইজ টু থাউজ্যান্ড ফোর। টুডে ইজ আওয়ার লাস্ট ন্যাশনাল ফাইনাল। দ্য বয়েজ ফ্রম পি.এস.বি.বি নুঙ্গমবাক্কম, চেন্নাই—কৃষ্ণা শ্রীরাম অ্যান্ড বিশাল চন্দ্রশেখর। ওয়ান ফাইনাল টাইম অভিনব বিদ্যালয় ফ্রম পুনে রিপ্রেসেন্টেড বাই রোহিত বাহুলেকর অ্যান্ড রোহিত চন্দ্রচূড়। নেক্সট আপ নেতাজি সুভাষ হাই স্কুল, কলকাতা রিপ্রেসেন্টেড বাই সুমন রে অ্যান্ড অনির্বাণ মিত্রা। অ্যান্ড হেয়ার ইজ ইওর হোস্ট হর্ষ ভোগলে।

“অ্যান্ড দিস ইজ নাউ দ্য লাস্ট কোয়েশ্চেন। উড ইউ ইমাজিন ইট আফটার আ কান্ট্রিওয়াইড সার্চ, দ্য ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ান উইল বি ডিসাইডেড অন দ্য লাস্ট কোয়েশ্চেন অফ দ্য ডে! অভিনব বিদ্যালয় পুনে ইজ অ্যাট ফিফটি টু পয়েন্টস। পি.এস.বি.বি নুঙ্গমবাক্কম হ্যাজ স্কোরড ফিফটি পয়েন্টস সো ফার। নেতাজি সুভাষ কারেন্টলি ইজ অ্যাট থার্টি ফাইভ। সুমন, ইউ হ্যাভ গট ইওর লাইফলাইন অ্যাজ ওয়েল। ইফ ইউ হিট দিস টুয়েন্টি পয়েন্টার, ইউ আর গোয়িং টু বি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন। আর ইউ রেডি?”

ডানহাতটা বুকে-মাথায় ঠেকিয়ে প্রণাম করার ভঙ্গি করে সুমন বলল, “ইয়েস।”

“সো হেয়ার উই গো।”

ফ্লোরে পিন ড্রপ সাইলেন্স। হুইল চেয়ার অফার করা হয়েছিল সুমনকে। কিন্তু সে নেয়নি, ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই খেলেছে পুরোটা। আর এখন একটা ঐতিহাসিক জয় হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে।

হর্ষ ভোগলে শুরু করলেন—“হু স্কোরড টু গোলস ইচ অ্যাগেইনস্ট ইংল্যান্ড অ্যান্ড চিলি ইন দ্য কোয়ার্টার ফাইনাল অ্যান্ড দ্য সেমি ফাইনাল অফ দ্য নাইনটিন সিক্সটি টু সকার ওয়ার্ল্ড কাপ অ্যান্ড ওয়াজ অ্যালাউড টু প্লে ইন ব্রাজিল’স থ্রি-ওয়ান উইন ওভার চেকোস্লোভাকিয়া ইন দ্য ফাইনাল ডেসপাইট হ্যাভিং বিন সেন্ট অফ ইন দ্য সেমি ফাইনাল? আই উইল রিড ইট ফর ইউ ওয়ান মোর টাইম। হু স্কোরড…”

সুমনের মাথার মধ্যে অনেকগুলো ছবি ঘুরপাক খাচ্ছে। ব্রাজিল তার প্রিয় ফুটবল টিম। কিন্তু প্রশ্নটা তো অনেক আগের… উনিশশো বাষট্টি… ব্রাজিল বললেই যার নাম মনে আসে সে হল পেলে। কিন্তু সেদিন একটা ম্যাগাজিনে পেলের কেরিয়ার সম্বন্ধে পড়তে গিয়ে জেনেছে যে, বাষট্টির বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দ্বিতীয় ম্যাচেই ইনজুরির জন্য পেলে সাইড-লাইনড হয়ে যায়, গোটা টুর্নামেন্টে আর খেলতে পারেনি। তাহলে পেলে নয়। সঙ্গে আরও একটা নাম ছিল যে ওই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জয়ের নেপথ্যে বড়ো ভূমিকা নিয়েছিল, যাকে অনেকে ‘বেস্ট ড্রিবলার’ বলে থাকে। কী যেন নাম… কী যেন নাম…

হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে—গারিঞ্চা।

হর্ষের দ্বিতীয়বার প্রশ্ন পড়া শেষ হওয়ার আগেই চিৎকার করে উঠল সুমন—“গারিঞ্চা!”

“গারিঞ্চা, দে গট ইট। গারিঞ্চা ইট ইজ!” উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন হর্ষ ভোগলে—“অ্যান্ড নেতাজি সুভাষ হাই স্কুল আর ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নস ফর দ্য ই.এস.পি.এন স্কুল কুইজ টু থাউজ্যান্ড অ্যান্ড ফোর। ওয়েল ডান বোথ অফ ইউ। লেট মি চেক ইওর পালস। হা হা… কনগ্র্যাচুলেশন্স…”

ওপর থেকে পার্টি পপারের কাগজগুলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। শেষের কথাগুলো কানে যাচ্ছে না সুমনের। তার দু-চোখ ছাপিয়ে তেড়ে আসছে প্লাবন। সে পেরেছে, পেরেছে সে। রমাকান্ত-স্যার নিশ্চয়ই এখন খুব গর্ব বোধ করবেন তার জন্য। স্যারের অনুপ্রেরণাতেই নিজের জন্য সে খুঁজে নিয়েছে অন্য খেলার মাঠ। যেখানে রয়েছে অন্য এক লড়াই, অন্যরকম চ্যালেঞ্জ আর অন্যরকম অস্ত্র—ফেলুদার ভাষায়, ‘মগজাস্ত্র’!

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply