শিবশংকর ভট্টাচার্যর সমস্ত গল্প
বেড়াতে গেছি বেজায় দলটল বেঁধে কালনা। সেখানে রাতের বেলা গোটা তিরিশেক জয়ঢাকির তান্ডব চলেছে এমন সময় শিবুদা হঠাৎ বেজায় গম্ভীর মুখে চোখে চশমা এঁটে বলে, আয় গল্প বলি। অমনি সব হুপহাপ দুপদাপ ঠান্ডা। সবাই মিলে শিবুদাকে ঘিরে বসে গালে হাত, কোলে বালিশ নিয়ে তৈরি। তারপর তো শিবুদা স্বপ্নের খাতা খুলল। আর তারপর শুরু হল ভারী মজার কাণ্ডকারখানা। ছবি আঁকবার ফেস্টিভ্যাল। গুরুমশাই শিবুদা বসেছে পেনসিল হাতে, আর সব জয়ঢাকি ‘স্বপ্নের খাতা’র পাতায় ছবির পরে ছবি এঁকে চলেছে। আঁকতে আঁকতে ছবির পাহাড়। সেই সব ছবি নিয়ে বইমেলাতে আসবে স্বপ্নের খাতা গ্রাফিক বই। উপস্থিত তার কয়েকটা বাছাই ছবি সহ স্বপ্নের খাতার কয়েক পাতা রইল এইখানে।

ছোটবেলায় কত স্বপ্ন দেখতাম আমি। সবাই দেখে, আমিও দেখতাম। পুরো স্বপ্ন, আধা স্বপ্ন, সিকি স্বপ্ন, বাজে স্বপ্ন, ছুটকো স্বপ্ন, দিবাস্বপ্ন। যারা বলে পেট গরম হলে লোকে স্বপ্ন দেখে, তারা বেরসিক। আমি স্বপ্ন এমনিতেই দেখি। কোনও কারণ না থাকলেও। কোনো-কোনো স্বপ্ন পুষে রাখি পরে দেখব বলে। আজকাল যেমন সিরিয়াল দেখে সে-রকম দেখব বলে। আরও অনেকে এভাবে দেখতে ভালোবাসে। একজন নাকি তার মধ্যেও টিভির বিজ্ঞাপন দেখতে পেত। আমি এমনি স্বপ্নই দেখি, অ্যাড ছাড়াই।
আরে আরে, পালাচ্ছ কোথায়? গল্পটা পড়ার বই, পড়ার বই ঠেকছে? উঁহু, পড়ার বই আমি মোটেই ভালোবাসি না। শুধু ভালোবাসি না-পড়ার বই পড়তে। যে বই পড়তে মানা সেগুলো পড়তে।

একটা বাড়িকে আমি মাঝে-মাঝেই স্বপ্নে দেখতাম। লালরঙা পুরোনো ইটের শ্যাওলা-ধরা বটগাছ বাওয়া ভাঙামতো বাড়ি। কোথাও কোথাও আবার টুপটাপ করে জল পড়ছে। নানা রঙের ব্যাঙের ছাতারা বাড়ছে তো বাড়ছেই। ওগুলোকে বলে কুরুক। কী যে সুন্দর, কী বলব! ওটা মাঝে-মাঝে দেখতাম। বাড়িটা মাঝে-মাঝে ঠাট্টা করত আমার সঙ্গে। বদলে বদলে যেত তার চেহারা। ইস, ভারি তো চেহারা! তাও দেখতাম। ও-ও দেখত আমায়। একঘেয়ে লাগলে মগজে বোতাম টিপে তাকে নিভিয়ে দিলে আবার ফিরে আসত বহুদিন পরে। কিন্তু ওর ভেতরে যাওয়াটা বাকি থেকে গেছে।
এ অবধি শুনে আপ্পু বলল, “স্বপ্নেও একটা ভালো বাড়ি দেখতে পারো না?”
চুপ করে থাকি। স্বপ্নের ওপর হাত আছে নাকি কারো? যা দেখব তাই তো বলব! তাছাড়া আমার পছন্দটাই ওইরকম। পুরোনো বাড়িতে গল্প আছে, নতুনে গল্প কোথায়?
অবন ঠাকুর বলতেন, স্বপ্ন ধরে রাখতে হয় খাতার পাতায়। খাতা করো, টাটকা স্বপ্ন দেখে লিখে ফেলো। তাই করি আমরা।

বলতে লজ্জা করছে, ওই ভাঙা মোটা মোটা শেকড় গজানো অন্ধকার বাড়ির আস্তাবলে একটা ঘোড়াও থাকত সপরিবারে। তোমরা গুল ভাবতে পারো বলে লজ্জা। ও দেশি হলেও ওর বউ মেমসাহেব। ওরা কেউ দড়ি দিয়ে বাঁধা নয়, এমনি খোলা ঘুরে বেড়ায় এখানে ওখানে। ঘাস আর পুকুরের ধার থেকে কলমিশাক খেয়ে খুশি থাকে। খুব ফুর্তি হলে পুকুরে নেমে মুখ বদলায় পদ্ম আর শালুক ফুল ডাঁটিসুদ্ধ খেয়ে। আমার সঙ্গে ওদের আলাপ আছে। মাঝে-মাঝে ব্রাহ্মী শাক আর থানকুনি খেয়ে বুদ্ধিও খুব ওদের, চেহারা যাই হোক। নিন্দে করতে নেই। ওরা কথাও বলতে পারে। বিচ্ছিরি গলার আওয়াজ বলে ঘোড়ার ডাক মনে হয়। আমি বুঝি ওদের কথা। ওদের কথা পরে বলছি।
স্বপ্নে এর থেকে বেশি দেখিওনি; বলতেও চাই কম কম। বড্ড গোঁয়ার আর একরোখা ঘোড়াটা। বউটা অবশ্য খারাপ নয় ওর মতো। ধৈর্য বলে কিছু নেই ওর। কে যে ওর নাম কাষ্ঠশ্রবা রেখেছিল জানি না। স্বপ্নের ঘোড়া বলে গায়ের আর দাঁতের গন্ধটা টের পাওয়া যায় না। পেলে যে কী হত! ও এখন মাঠে চরুক।
সেই কোনা চিবোনো ছোটো লাল খাতাটা আর একটা লাল-নীল পেন্সিল আমাকে দেয়া হয়েছিল তিন বছরের জন্মদিনে। ছোটোদের ব্লেড ধরার আইন নেই। তাই পেন্সিল কাটাতে হয়ে গেল সাড়ে চার বছর বয়েস। সেই রাগে কোনাটা চিবিয়েছিলাম। এর মাঝে কত স্বপ্ন দেখা হল। লেখা হল না। তারপর থেকে অনেক লিখে চলেছি। পড়তে দিইনি দুপিদাকে ছাড়া কাউকে। লজ্জা করে, পাছে বানান ভুল ধরে ফেলে। তা হলেই ছোটকাকা নিল-ডাউন করে রাখবে। বড়ো লোকগুলো কেমন যেন।

দুপিদা নিজেও বানান জানে না তাই ওকে পড়তে দেয়া যায়। আগে ওকে বলতাম দুপিখুড়ো। আমি বড়ো হয়ে যাবার পর ও ছোটোমতো রয়েই গেল। বেঁটে বলতে নেই, নইলে বলতাম বামন। অনেক কসরত করেও লম্বা হতে পারল না বেচারা। এখন ওকে দাদা বলে ডাকি। ও থাকে বেলুন বাড়িতে। সে ভারি চমৎকার বাড়ি। খোঁটার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা আছে বলে উড়ে যেতে পারে না। খোঁটার সঙ্গে বাঁধা দুমবো লাটাই আছে, তাইতে ওঠানামার বন্দোবস্ত। ইচ্ছে হলে এখানে ওখানে ঘুরেও আসা যায়।

তবে ওখানে যেতে পুরজা লাগে, এমনি হয় না। স্বপ্ন লেখা লাল খাতাটাকে ও বলে পুরজা। সে আবার কী রে বাবা? তবে মানুষটা ভালো। কাকা ডাকি আর দাদা ডাকি—তাতে ওর কিচ্ছু যায় আসে না। শুধু নাম ধরেও নাকি ডাকা যেতে পারে! যখন আকাশ সার্কাসে চাকরি করত তখন খুশি হয়ে কতরকম নামে ওকে ডাকত লোকে। অবশ্য লোক বলতে সবাই তো আর মানুষ নয়, তাই অতরকম নাম-ডাক। বলেছিলাম ওকে, “তুমি অতরকম নাম মনে রাখো কী করে?”
ওর সিধে জবাব হল, “মনে আমি রাখতে যাব কেন? ওটা তো মনের কাজ, রাখারাখির ব্যাপার নেই।”
দুপিদার বেলুনে পাহাড়, বন, গুহা, ঝরনা—সব আছে। লোকজনও আছে কত! গুহায় পুরুতমশাই থাকেন।
তিনি বুড়ো মানুষ। মস্ত লম্বা গোঁফ আর দাঁড়ি—সব পাকা শনের মতো। তিনি চকোলেট খেতে ভালোবাসেন বলে একটাও দাঁত নেই। দাঁতের জায়গায় ছোটো ছোটো জিভ। মন্ত্র-টন্ত্র জানেন না। অবশ্য মন্ত্র বললেও ঠাকুর অবধি গিয়ে পৌঁছতে পারত না। এত বড়ো পাকা গোঁফদাড়ি ভেদ করে মন্ত্রের বাইরে যাবার উপায় নেই। এত বুড়ো, কিন্তু শরীরে একটুও রাগ নেই ওঁর। গুণও আছে খুব। যত গ্রহ-নক্ষত্র চলে নাকি ওঁর কথায়, কোথাও কোনও নড়চড় হবার উপায় নেই। পুরুত ঠাকুরকে সবাই ডাকে হিং টিং বাবা বলে। দুপিদা আর হিং টিং বাবা দুজনেই দুজনের অ্যাসিস্ট্যান্ট। আরও একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে ওখানে। পুরুত ঠাকুরের পাকা চুল তোলা আর উকুন বেছে দেয়া তার কাজ। ওপরে মোলায়েম আর ভেতরে বেজায় শক্ত গোদাবরীদিদি। আমি ওর নাম শুনে আপত্তি করায় কড়া গলায় জবাব দিয়েছিল—কৃষ্ণা, কাবেরী, গঙ্গা, যমুনা, কুন্তী নাম হতে পারলে গোদাবরীতে দোষ কী? নামের বেশ ওজনও আছে। ওর আর একটা কাজ আছে—পুরুতমশাই কোনও ভুল করলে দাড়ি টেনে ধরা। তা উনি ভুল-টুল করেন না বলেই জানি। কাজ না করলে আর ভুল কীসের? এখানে যা বুঝলাম, কর্তা বলে কিছু নেই – সবাই সবার অ্যাসিস্ট্যান্ট।

এসব আমার প্রথম দেখা স্বপ্নটার টুকরো। পরের বারের কথা পরে হবে। আর একবার দেখলাম আরও ওপরে, মেঘের ওপরে আলোর বাড়ি বানিয়ে থাকা দুটো দুষ্টু ছেলেকে। কী তাদের নামের বাহার! – আলাউদ্দিন আর গিয়াসউদ্দিন। ওদের কাজ ঝড়-বৃষ্টি-বরফ-রামধনু এসব ঠিকঠাক চালানো। দেখলাম ওদের আস্তানা। মোটেও খুব ভালো কিছু নয়। রামধনু রঙ করার মোটা তুলি, মেঘ তৈরির তুলো – সব ছড়িয়ে আছে যেমন-তেমন। পাশে থাকা হাওয়া কলে তেল শুকিয়ে গিয়ে বেড়াল ডাকের মতো আওয়াজ হচ্ছে। এর থেকে আমার চিলেকোঠার ঘরটা বেশি গোছানো। বললে বলে, “কী করব? সবসময় কাজে ব্যস্ত থাকলে ঘর গোছাই কখন?” হুঃ কাজ যেন আর কেউ করে না।
আমার থেকে দু-বছরের ছোটো বোন বাবলি আমার দেখা স্বপ্নগুলো বেশ পছন্দ করেছিল। ওর আবার পুরোনো বাড়িটা বেশি পছন্দ। বার বার জিজ্ঞেস করে – ঘোড়ার কী হল, ঘোড়ার কী হল? আমি বিরক্ত হয়ে যদি বলি নিজে দেখে নে না, ও ঠোঁট ফোলায়। ওর জাপানি পুতুলের মতো গাল এমনিতেই লাল আর ফোলা। এর ওপর ঠোঁটও ফুললে মোটেই ভালো দেখায় না। মুশকিল হল আমার স্বপ্ন ওকে দেখাই কী করে। তবু চেষ্টা করলাম নানারকম। মাথায় মাথা লাগিয়ে পাশাপাশি ঘুমিয়েও ওই স্বপ্ন একসঙ্গে দেখা গেল না। ওর নাকি স্বপ্নই আসে না। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে জানেটা কী যে ভালো ভালো স্বপ্ন দেখবে? শেষে একদিন বিকেলে ঘুম থেকে উঠে লাফাতে লাগল, “দেখেছি, দেখেছি! খাতা চাই আমারও। আর চাই পেনসিল।”
জিজ্ঞেস করলাম, “কী দেখলি?”
ও একগাল হেসেই কেঁদে ফেলল।
“কী হল, বলবি তো!”
“এক থালা রসগোল্লা, পাশেই হাঁড়ি ভর্তি পান্তুয়া – খাওয়া শুরু করতেই স্বপ্ন ভেঙে গেল! একটাও খেতে পারলাম না – উঁ -উঁ!”
আমারও খারাপ লাগল শুনে। মাইনেও পাই না যে ওকে রসগোল্লা কিনে খাওয়াব। ছোটোরা বড়ো গরিব হয়! ওর পিঠে হাত বুলিয়ে ঠান্ডা করবার চেষ্টা করলাম—”কাঁদে না, কাঁদে না। চুপ কর রে, তুই চুপ কর। আরিব্বাস! তোর স্বপ্ন শুরু হল রসগোল্লার থালা দিয়ে! সাবাশ! খেতে না পেলেও দেখলি তো? ক’জন দেখে? লিখে ফ্যাল, লিখে ফ্যাল। আমার খাতাতেই লিখে রাখ। টিপসই দিয়ে রাখলেই কোনটা কার বোঝা যাবে।”
বাবলির লেখার ব্যাপারে খুব ধস্তাধস্তি হয়। সবসময় উলটোপালটা লেখে, ভালো বোঝা যায় না। ওর লেখা কবিতা শোনো। মগজে টাশকি লেগে যাবে।

কাগ যে মশা তাড়ায়
খড় গোবর বন্দ্যোপাধ্যায়।
ভগবতী ঈশ্বর জ্ঞান
শিরঃপীড়ায় বাড়ি যান।
এটুকু লিখতেই মেজদির অঙ্কখাতা ছিঁড়ে, পেন্সিল ভেঙে একাক্কার। আমরা চানা চুটকিরা কেউ কবিতা লিখেছে শুনলেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। জ্যান্ত কবি দেখলে আঙুল বাড়িয়ে ছুঁয়েও দেখতে মন চায়। তাই বলে অতটুকু কবি! ছোটকা আর দাদা বলল ওসব নাকি পোস্ট মডার্ন কবিতা। এসব শুনে উৎসাহ পেয়ে লিখে ফেলল –
পতৌদির সিগারেট কেস
রাজধানী এক্সপ্রেস,
চৌকাঠে ফুলুরি
আরশোলার বাচ্চা হেঁটে যায়।
কী প্রতিভা! এদিকে এখনও একা বাথরুমে যেতে পারে না, মাকে সঙ্গে যেতে হয়। টিকটিকি দেখলে ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। দেখেশুনে মেজদি আর দাদাও জুটে গেল খাতা লেখায়। ওরা জানে বেশি, স্বপ্নও দেখে জবরদস্ত। সব ওই টিপসই দিয়ে আলাদা আলাদা পাতায়। মিশে যাবার ভয় নেই। আর দাদা বাদে আমাদের হাতের লেখাও মার্কামারা। পড়ে কার সাধ্য। মেজদির তালব্য শ তো বিখ্যাত! ওরকম আর দেখিনি।

দাদা দেখে ফেলল এক বাঁদরের স্বপ্ন। তার শরীরের মাপ আমাদের হাতের বুড়ো আঙুলের মতো। ওর মস্ত লম্বা লেজ আর মাথা-ভরতি বুদ্ধি। নাম তার তুরুক। সে ভারি ভালো। যদিও চুরির কাজ করে খায়। কাজটা করায় ওর সেয়ানা মালিক বুদ্ধু সিং পালকিওয়ালা। ছোটবেলা থেকে করে করে কাজটা ওর হ্যাবিটে প্র্যাকটিস হয়ে গেছে – চুরি করাটা খারাপ বলে জানেই না।
শুনে-টুনে আমি বললাম, “সত্যি দেখেছ তো স্বপ্নে, নাকি গুল মারছ?”
আসলে এরকম বলতে নেই বড়োদের, কেমন মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। শুনেই এমন তাড়া করল যে আমি মায়ের কাছে পালিয়ে বাঁচি। মিনিট পাঁচেক বাদে দুহাতে দুকানকান ধরে হ্যান্ড-শেক করেও নিলাম। এমন চমৎকার স্বপ্নও দেখে লোকে! শোনো তবে।
বনের মধ্যে এক বাঁদর তার পরিবার নিয়ে থাকত। তাদের ছেলের নাম তুরুক। একবার বনের মধ্যে বাঘের সামনে পড়ে তো তার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। ঘাম দিয়ে লেজ কম্প ধরে গেল। এমন সময় তার কান ধরে ওপরে টেনে তুলে প্রাণে বাঁচাল এক শিকারি। গাছের ওপর বসে যে যন্ত্রটা দিয়ে কান ধরা হল তার ছবি এঁকে দেখিয়েছিল দাদা। তারপর ওকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে চুরি বিদ্যে শিখিয়েছিল সেই শিকারি। তার দলে আর ছিল ছুঁচো, টিয়ে পাখি আর একটা শুয়োর। টিয়ে ডাকবিভাগ সামলায়, শুয়োর হল তার পিওন। খুব দৌড়তে পারে। তাদের ছবিও আঁকা হয়েছিল।

শুয়োরের লেজটা স্প্রিংয়ের মতো পাকানো আর মাথায় টুপি। ব্যস, এটুকুই স্বপ্ন প্রথমে দেখেছিল দাদা। পরে আবার টুকরো টুকরো করে বাকিটা। বলেওছিল আমাদের। সব মিলিয়ে চমৎকার।

মেজদি দেখল পিসার হেলানো মিনার আর ঘোড়ার ডাকের স্বপ্ন। সেও কম কিছু নয়। মেজ পিসেমশাই বরাবর কাজকর্মে গোলমাল করেন। তাঁরই হাতে তৈরি মিনার তো হেলবেই! যাঁর লাগানো বনসাই চিরকাল ঢ্যাং-সাই হয়ে যায়। আর দেখেছিল পাঠান শের শাহ্ একদল ঘোড়াকে ডাকতে শেখাচ্ছেন। তার আগে ওরা ডাকতে জানত না। শের শাহ্ নাকি গিটকিরি তান খুব ভালো জানতেন, তাই ঘোড়ারা অমন ডাকে। জানি না আমার ঘোড়াটার পূর্বপুরুষ তাদের দলে ছিল কি না। তাই তো এখন ও মানুষের মতো কথা বলতে শিখল। যদিও এক আমিই বুঝি শুধু ওর ভাষা। ওকে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, ও কিন্তু শের শাহ্র নামও শোনেনি। ব্যাটা বেইমান। তবে ওর একটা মস্ত বড়ো গুণ আছে। পথ চলতে খোঁড়ালে কী হয়, হাড় বার করা কাঁধের দু-পাশে লুকোনো একজোড়া ডানা বার করে দিব্যি আকাশে উড়তে পারে। ডানার পালকগুলো পোকায় খাওয়া। রোদ লাগানো বারণ বলে শুধু রাতেই ওড়ে।

আজ মাঠ থেকে খেলে এসে ব্যাকরণ বই সামনে নিয়ে ঝিমোচ্ছি, হঠাৎ চিঁহি-হি-হি ডাক শুনে দেখি পাশেই হাজির সে। ডানা তখনও গুটোয়নি। আমায় পড়তে দেখে তার কী হাসি! ওর বড়ো বড়ো দাঁত আর ঠোঁট ওলটানো হাসি দেখে বড্ড রাগ হল। কতদিন মাজা হয় না দাঁত কে জানে। তবে স্বপ্ন গন্ধহীন। তেড়েফুঁড়ে উঠলাম একেবারে। “হাসছিস যে বড়ো? আমি বলে অপিনিহিতি, বিপ্রকর্ষ আর অভিশ্রুতির চক্করে পাক খাচ্ছি, আর তোর হাসি পেয়ে গেল!”
ধমক খেয়ে হাসি সামলেও ওর ঠোঁট কাঁপছে ফুরফুর করে। আবার ফুঁসে উঠলাম আমি, “কী হয়েছে বলবি তো?”
“লজ্জায় হাসছি। কী বংশের ছেলে তুমি, কত লড়াই করে নাম কিনেছে তোমার দাদা-পরদাদা, আর তুমি তলোয়ার না ধরে ব্যাকরণ পড়ছ! শেম, শেম। শেম অন ইউ, ছিঃ!”
ওর মুখে বংশের কথাটা তোলা ভালো না খারাপ বুঝতে না পরে মুখে আঙুল দিয়ে মাথা চুলকোচ্ছি, ও আবার হইচই শুরু করে দিল—”আরে ভাবছ কী? উঠে পড়ো পিঠে তলোয়ার নিয়ে। কী ভয়ানক যুদ্ধ হচ্ছে, যাবে না সেখানে?”
“আমার যে দুপিখুড়োর কাছে যাবার ছিল রে! অসময়ে এলি জ্বালাতে?”
“ওর কাছাকাছিই তো। ফেরার পথে যেও।”
“কোথায় লড়াই বাধল আবার?”
“রাবণের সঙ্গে হনুমানের গোলমাল বেধে গেছে লঙ্কায়। চলো, চলো!”
আমার পিচবোর্ডের ঢাল আর রাংতা জড়ানো বাখারির তরোয়াল নিয়ে উঠে পড়লাম ওর পিঠে। চল পাখি লঙ্কায়। সাঁই সাঁই সাঁই সাঁই উড়ে চলল কাষ্ঠশ্রবা। টেক অফ আর ল্যান্ডিংয়ে ওর একটু সমস্যা থাকলেও ওড়ে চমৎকার। পৌঁছে গেলাম লঙ্কায়।
দেখি সমুদ্দুরের ধারে বসে রাবণ আর হনুমান চা খাচ্ছে। মন্দোদরী পোড়া লঙ্কার ঢিমে আগুনে ভুট্টা সেঁকে দিচ্ছে ওদের। এখন ওদের চা পানের অবসর। এই অবধি দেখেই আমার স্বপ্ন ভেঙে গেল। স্বপ্ন মনে হয় মেড ইন চায়না, একটুতেই ভেঙে যায়।
দাদা খাতা নিয়ে চলে গেল চিলেকোঠায়। কী যেন লিখছে তো লিখেই চলেছে। বীরেনবাবু পড়াতে আসার পর নেমে এল। দেখি লাল খাতাটা মেজদির হাতে। আমাদের পড়ে শোনাল। দাদা তারপর গেল শিখা দিদিমণির কাছে অঙ্ক শিখতে। দাদা লিখেছে—

তারপর বুদ্ধু সিং তুরুককে পকেট থেকে বার করল। এতক্ষণে শিকারিকে দেখতে পেল তুরুক। না, দেখতে আর পেল কই? নানান ধড়াচূড়ায় ওর আসল চেহারাটা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাল-ঢ্যাঙা রোগা শরীরে রোগা রোগা হাত-পা আর গা-ঢাকা অমাবস্যার মতো কালো টাইট পোশাকে। তার ওপর ছাই রঙে মাকড়শার জাল আঁকা। নেড়া মাথায় হেলমেট আর মুখে মুখোশ লাগানো। দুটো অ্যান্টেনা মাথার দু-পাশে আরশোলার মতো নড়েচড়ে। মানুষ বলে চেনে কার সাধ্য। অস্ত্র হল দু-হাতের আঙুলে লুকোনো টংটংগী হুল। নাক-চোখ-মুখের জায়গায় শুধু চারটে ফুটো। মেজদি বলল, “শিকারি মোটেই মানুষ নয়। কী ভয়ের স্বপ্ন রে বাবা!”
শিখা দিদিমণি চলে যাবার পর দাদার কাছে শুনলাম আরও খানিকটা।
ট্রেনিং শুরু হল তুরুকের। শিকারির কাছে দিনের বেলা ট্রেনিং। রাতে নাইট ডিউটিতে প্র্যাক্টিক্যাল। ওর যাতায়াত হয় গাছের ডালে ডালে, নয়তো রবারের জুতোর তৈরি স্পিড বোটে। ঢাকা নর্দমায় তার আরামে যাতায়াত। নালার মোড়ে মোড়ে ছুঁচো বন্ধুরা ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট। ঝাড়ুদার বা মেথররা নালা পরিষ্কার করতে এলে সেটাই হয়ে যায় তারে ঝোলা টিউব রেল অথবা কেবল কার। জোয়ারভাটায় উলটে যাওয়ায় রোপ-ওয়ে তৈরি হয়। সব ওই শিকারির তৈরি। শুনে তো আমাদের টাশকি লেগে গেল।
তুরুকের প্রথম চুরি একটা পোড়া দেশলাই কাঠি। তারপর এক গয়নার দোকানে ঢুকে যা হল সে আর বলবার নয়। বললও না। নাকি ওইটুকুই দেখেছে। অবশ্য ছুঁচোদের নাম বলেছিল—ছুছুন্দর আর চুকন্দর। শুয়োরের নাম ভোম্বল। ওর কাজটা তখনও শুনিনি দাদার কাছে। ছবিও এঁকেছিল আমাদের ভালো করে বোঝাবার জন্য। সেই ছোটো হেলিকপ্টারের ছবিও, যার কথা পরে হবে বলে আর হয়নি।

বাবলি আবার লাফাতে লাফাতে হাজির। চট করে দাদার হাত থেকে খাতা কেড়ে এঁকে ফেলল একটা রেল-লাইনের ওপর ছুটন্ত রেলগাড়ি। তাতে আবার কারা বসেও আছে। ধোঁয়া উড়ছে আকাশে। খুব ছুটছে পাগলা রেলগাড়ি আপন খেয়ালে। বাবলি ড্রাইভার আঁকতে ভুলে গেছে।

ও আবার স্বপ্নে কবিতা ছাড়া এসবও দেখতে পায়। ও দেখেছে পাগলা রেলের হুইসল শুনে বনের মধ্যে হাতি-বাঘ-শেয়াল-বাঁদর-শজারুর দল ছুটে পালাচ্ছে; মেঘের ওপর পাখির দল লুকিয়ে আছে—আরও কত কী! বেশ জবড়জং ব্যাপার।

ছড়াও লিখেছে একটা।—
রেলগাড়ি রেলগাড়ি
কোথা যাও হেলিদুলি
দাঁড়াও না একবার ভাই,
গার্ডের হুইসলে
হেলেদুলে যাই চলে
দাঁড়াবার উপায় তো নাই।
নবকৃষ্ণ ভট্চাযের ছোঁয়াচ লেগেছে বোঝাই যাচ্ছে বেচারার। একটাতে থামলে কথা ছিল; লিখেছে আরও একটা। কঠিন ব্যাপার।
রেলগাড়ি ঝুক ঝুক
বিড়ি খায় ফুক ফুক।
ধোঁয়া ছাড়ে সাদাকালো
আহা সুখ বাহা সুখ।
দূরে যেতে নাই দুখ
ঝুক ঝুক ঝুক ঝুক।
বিড়ি টেনে বুড়ো কাশে
খুক খুক খুক খুক।
পাঁজরের ধুকধুকি
ধুক ধুক ধুক ধুক।
রেলগাড়ি ঝুক ঝুক
আহা সুখ বাহা সুখ।
মেজদি বলল, “পাহাড়ি পথে চললে কোথা যাও নাচি-নাচিও বলা যেত। তাহলে মিল দিতে হাঁচি, কানামাছি, তোপচাঁচি, দুধের ছাঁচি কত কী লিখতে পারতি।”
বাবলি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “বানাতে যাব কেন? যাহা সত্য তাহাই লিখিব।”
ব্যাপারটা বোঝা গেল। ওকে দিদিমণি ‘মৌমাছি মৌমাছি, কোথা যাও নাচি নাচি’ নাচটা শেখাচ্ছিলেন পাঁচদিন ধরে, সেটাই রেলগাড়ি হয়ে বেরিয়ে এসেছে। তবে আমাদের তো বেরোয়নি! সাবাশ বাবলি! আর উপেনদাদুর সন্দেশে পাওয়া রেলগাড়ির গানের ছোঁয়াচ তো আছেই।
মেজদি মাঝরাতে ভূতুড়ে স্বপ্ন দেখে হাউমাউ করে চেঁচিয়ে আমায় ধরে থাপড়াতে শুরু করায় আমিও খিঁচিয়ে উঠলাম—”কী, হলটা কী? মারছিস কেন?”
“তুই ব্যাটা কারিয়া পিরেত আমার ঘাড়ে কেন চেপেছিস?”
খুব মনে লাগল। মোটেই কারও ঘাড়ে উঠিনি। তাছাড়া কালো হলেও মোটেই কারিয়া পিরেত নই। আরও পড়ো ভূষণ্ডির মাঠে!
সকালে উঠেই লিখতে বসে গেল খাতা নিয়ে। ও এবার গোটা গোটা করে লিখেছে—
রাম আর জাম্বুবান বসেছে মস্ত বড়ো বোর্ডে লুডো খেলতে। হঠাৎ নল আর কারিয়া পিরেত এসে বোর্ড উলটে ড্র করে দেয়ায় খুব গোলমাল। কী করবে, ভালোমন্দ যাই হোক যা দেখেছে তাই তো লিখবে। বানিয়ে লেখার আইন নেই।
শিবাজি আর শম্ভুজি দম খিঁচে ছোটো হয়ে ফলের ঝুড়িতে লুকিয়ে পালিয়েছিলেন—লিখেছে দাদা। ফুটবলে চার দশে চান্স পাবার জন্য যেমন দম খিঁচতে হয় বা টায়ার বাঁধতে হয়।

বড্ড স্বপ্ন দেখছে ওরা। মা নাকি ধরে ধরে চিরতার শরবত খাওয়াবে শুনলাম। সাবধানে থাকতে হবে আমাদের। চিরতা বড়ো খারাপ খেতে।
অনেকদিন পরে সেই ভাঙা বাড়িটা স্বপ্নে এল। বাইরের মাঠে কাষ্ঠশ্রবা ঘাস খাচ্ছিল। আমায় দেখে দাঁত বার করে হাসল। ওর মেম-বউ দেখি আস্তাবলে বসে আছে। পাশে পুতুলের মতো একটা বাচ্চা ঘোড়া বসে আছে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল তড়বড় করে। কী বড়ো বড়ো চোখের পাতা ছানাটার! আর বড়ো বড়ো চোখ। লেজে কে যেন চমৎকার বিনুনি বেঁধে দিয়েছে; সেটা টুকটুক করে নাড়ছে।
দুপিখুড়ো বসে ঝিমোচ্ছে বাড়িটার সদরের পাশে। ওর হাতে একগোছা বাজে কাগজ ভাঁজ করে খাতার মতো করে গুঁজে দিতেই ঢুকতে দিল ভেতরে। ঢুকে আসল খাতাটা হাতে দিয়ে হাসলাম।—”ঝিমোচ্ছ যে? বুড়ো হয়ে গেলে নাকি?”
একটু হেসে নিয়ে গেল বেলুন বাড়িতে। গুহায় বসে পুরুতমশাই আর গোদাবরীদিদি হাতের আঙুলে কড় গুনে কী যেন হিসেব করছে। আমাকে দেখেই হিসেব গোলমাল হয়ে গেল। ওপর থেকে শোনা গেল গুরগুর শব্দ। তাকিয়ে দেখি আলাউদ্দিন আর গিয়াসউদ্দিন জাঁতায় করে বরফ গুঁড়ো করছে নীচে ঢালবে বলে, আর হাওয়া কলের হাতল ঘোরাচ্ছে। এবার ঝড় উঠবে। নীচে নেমে এলাম।

এই অবধি লিখে খাতা গেল ফুরিয়ে। এবার নতুন খাতা চাই।
গল্প খুঁজছ? পাবে কোথায়! ছোটোদের স্বপ্নের বুঝি মাথামুণ্ডু থাকে? এর শুরুও নেই, শেষও নেই। তবে নতুন খাতায় স্বপ্ন জমা হলে আবার বলা যাবে। তোমরাও লেখো না!

ছবি- শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য পরিচালিত জয়ঢাকি আর্ট ওয়ার্কশপে এই গল্প নিয়ে ছবিগুলো এঁকেছেন শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য, দেবায়ন, তন্ময়, সপ্তর্ষি,অর্ণব, অগ্নিভ দেবজ্যোতি। পালক দিয়েছেন ওয়ার্কশপ দেখতে আসা জনৈক কাক। আরো অনেকে এঁকেছেন। সেগুলো স্বপ্নের খাতায় ছেপে আসবে বইমেলায়।

এমন স্বপ্ন ভরা তুলতুলে গল্প কতদিন পড়িনি!