শিশির বিশ্বাস-এর সমস্ত গল্প

আজ যে বিশ্বকর্মা পুজো, ছেলে সন্তুর ছুটি—একেবারেই খেয়াল ছিল না সুলতার। বরাবরই কিছু নরম গোছের মানুষ। সেই ছেলেবেলায় বাবা, তারপর বিয়ের পর সন্তুর বাবার কাছে পড়ে সেটা আরও বেড়েছে। বাবা বেজায় মেজাজি মানুষ ছিলেন। মাও সমীহ করে চলতেন। ব্যাপারটা সুলতার ভিতরেও সংক্রমিত হতে দেরি হয়নি। সেই বাবা বছরে অন্তত একটা দিন খুব কাছের মানুষ হয়ে যেতেন। সেটা এই বিশ্বকর্মা পুজো মানে ভো-কাট্টার দিনে। বাবা নিজেই বলতেন। আসলে ঘুড়ি ওড়াতে বেজায় ভালোবাসতেন উনি। বড়ো চাকরি, অফিসে কাজের ঝামেলায় সারাবছর ইচ্ছেটা ঝিমিয়ে থাকলেও মাথাচাড়া দিত এই দিনে। অফিসে ছুটি করতেন। সারাদিন নাওয়া-খাওয়ার হুঁশ থাকত না। দিনভর ঘুড়ির লাটাই হাতে ছাদে। কোন বছর কত ঘুড়ি কেটেছেন, নিজের কয়টা ঘুড়ি কাটা গেছে—লিখে রাখতেন দামি চামড়ায় বাঁধানো এক সুদৃশ্য খাতায়। সারাবছর টেবিলে রাখা থাকত।
রাশভারী বাবা সেদিন একেবারেই অন্য মানুষ। শুধু পুজোর দিন নয়, পুজোর আগের দিন অফিসে বেরোবার আগে ভারি নরম গলায় বলতেন, “সুলু, মনে আছে তো আগামীকাল ভো-কাট্টার দিন? আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরব। তুই কিছু কাচের গুঁড়ো তৈরি করে রাখিস তো মা। বিকেলে মাঞ্জা তৈরি করতে হবে।”
মনে নেই আবার! সেই সকাল থেকে ক্লাসের পড়া তৈরির ফাঁকে বাবার মুখে এই কথাটা শোনার জন্য তো মুখিয়ে থাকত তখন। মেজাজি মানুষ বাবা এই দিনে খুব কাছের মানুষ হয়ে যেতেন যে।
স্কুল থেকে ফিরেই বাবার ছেলেবেলার মাঞ্জা তৈরির হামানদিস্তা নিয়ে পড়ত। তার আগে জোগাড় করে রাখতে হত ভাঙা কাচের টুকরো। একবার তো কিছুতেই আর ভাঙা কাচ জোগাড় হচ্ছিল না। এদিকে বাবার ফেরার সময় হয়ে যাচ্ছে। অগত্যা মায়ের সাধের শরবত সেটের দুটো গ্লাস হাতসাফাই করতে হয়েছিল। দিন কয়েক পরে টের পেয়েছিলেন মা। শখের শরবত সেটের দুটো গ্লাস কোথায় গেল বলে দিনভর গজগজ। সুলতাকে কিছু বলেননি অবশ্য। তবু ওর তখন হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাবার অবস্থা। কিন্তু ব্যাপারটা বেশি দূর গড়াতে পারেনি। বাবা অফিস থেকে ফিরতে বলতে যাচ্ছিলেন ব্যাপারটা, কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারেননি। মাঝপথেই বাবা তাঁকে থামিয়ে দিয়েছিলেন।—”খুঁজে পাচ্ছ না তো কী হয়েছে? কালই নতুন এক সেট এনে দেব।”
শুধু কথার কথা নয়। বাবা পরের দিনই নতুন এক শরবত সেট এনে দিয়েছিলেন। আরও দামি।
সারাবছর এই দিনটার জন্য সুলতা তখন হাঁ করে থাকত। কী যে দারুণ ছিল এই দিন! অথচ মনেই থাকে না এখন। তবু যে খেয়াল হল, তা অন্য কারণে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে চান করা অভ্যাস। মায়ের কাছেই শেখা। চান সেরে রান্নাঘরের কাজ। আজও ব্যতিক্রম হয়নি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে প্রতিদিনের মতো ছাতে কাপড় মেলতে উঠেছিল। ছাতে পা রাখতেই দারুণ ময়ূরপঙ্খী ঘুড়িটা নজরে পড়ল। গতকাল কার কাটা ঘুড়ি ছাতে এসে পড়েছে। সন্ধের আগে সুলতাই ছাতের গেট বন্ধ করে। গতকালও করেছে। তখন নজরে পড়েনি। সন্দেহ নেই, ঘুড়িটা ছাতে পড়েছে তার পরেই।
এমন ময়ূরপঙ্খী ঘুড়ি বাবারও বেজায় পছন্দের ছিল। এই দিনে বাবা শুধু ময়ূরপঙ্খী ঘুড়িই ওড়াতেন। দেখে সবাই টের পেত কোন বাড়ির ঘুড়ি।
কোনোমতে কাপড় মেলে সুলতা প্রায় ছুটে গিয়ে তুলে নিল ঘুড়িটা। তারপর সুতোয় হাত বুলিয়েই টের পেল, কাটা পড়লেও মাঞ্জাটা মন্দ নয়। বেশ ধারালো সুতো। অথচ চমৎকার পালিশ! বাবাই বলতেন—সুতোয় পালিশ ঠিক না হলে ভালো মাঞ্জাও ফেল হয়ে যায়। মাঞ্জা দেবার সময় কাজটা খুব হুঁশিয়ার হয়ে করতে হত। হাতে মলমল কাপড় নিয়ে প্রথমবার পালিশ করার কাজ সুলতাকেই করতে হত। বাবা হাতে কাচের গুঁড়ো মেশানো চটচটে আঠা নিয়ে মাঞ্জা লাগাতেন।
কী ধৈর্য নিয়েই না বাবা মাঞ্জা তৈরির কাজটা করতেন। রাশভারী বাবা তখন নিতান্তই ছেলেমানুষ। খুব কাছের মানুষ মনে হত সেই সময়। অ্যারারুটের সঙ্গে কখনও সাবু, নয়তো গোবিন্দভোগ চাল জ্বাল দিয়ে তৈরি হত মাঞ্জার আঠা। ফট-ফট করে ফুটতে শুরু করলে রঙ আর কাচের গুঁড়ো দিয়ে ভালো করে ঘুঁটে নামিয়ে ফেলতেন। ওই মাঞ্জা তৈরি করতে করতে কতদিন পাড়ার ডাকসাইটে ঘুড়িবাজ ঘণ্টাদার গল্প শোনাতেন। দারুণ মাঞ্জা তৈরি করতে পারত ঘণ্টাদা। কোকাকোলা রঙের সেই মাঞ্জার নামই হয়ে গিয়েছিল কোকাকোলা মাঞ্জা। একেবারে সার্থক নাম। আসলে অনেক চেষ্টা করেও ঘণ্টাদার মাঞ্জার হদিস কেউ করতে পারেনি। কোকাকোলার মতোই ঘণ্টাদা সেই ফরমুলা গোপন রেখে দিয়েছিলেন। অনেক চেষ্টা করে বাবাও তার হদিস করতে পারেননি। অগত্যা পাড়ার ঘুড়িবাজদের কাছে ঘণ্টাদা ছিল প্রায় আতঙ্ক। ঘণ্টাদার চাঁদিয়াল আকাশে উড়তে দেখলেই অন্যরা পটাপট নামিয়ে ফেলত নিজেদের ঘুড়ি। উপায়ও ছিল না। কতক্ষণ আর ঘনঘন নতুন ঘুড়ির জোগান দেওয়া যায়। ঘণ্টাদা পরের দিকে তাই ঘুড়ি ওড়ানো প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। হাঁফ ছেড়েছিল সবাই।
ঘণ্টাদা ঘুড়ি ওড়ানো ছেড়ে দেবার পর বাবা অনেক তোয়াজ করেছিলেন তাকে। তবু শেখায়নি। একদিন শুধু খয়েরের কথা বলেছিল। বাবা ভেবেছিলেন, হয়তো তাতেই কেল্লাফতে করতে পারবেন। কারণ, মাঞ্জার রং যখন কোকাকোলার মতো, খয়ের থাকাই সম্ভব। বাবা তারপর খয়ের কিনে মাঞ্জা তৈরির চেষ্টা কম করেননি। কিন্তু হয়নি শেষ পর্যন্ত।
গল্পটা বাবা যখন বলতেন, মুখটা বেজায় করুণ দেখাত। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে সুলতার রাগ হত খুব। কেন রে বাপু, ঘুড়ি ওড়ানো যখন ছেড়েই দিয়েছ, মাঞ্জাটা শিখিয়ে দিলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত!
পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতে হাতের সুতো টানতে শুরু করেছিল সুলতা। আর তারপরেই হুঁশ হল, ঘুড়ির সুতো একটু আধটু নয়, অনেক। মিনিট দুয়েক টানার পরেও সুতোর থই পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ ছাতের অনেকটা ভরে গেছে সুতোয়। ঘুড়ির ব্যাপারে সুলতার অভিজ্ঞতা কম নয়। সন্দেহ হল, ঘুড়িটা হয়তো প্যাঁচে কাটেনি। গতকাল সন্ধের বাতাসে অনেক উঁচুতে উঠে গিয়েছিল ঘুড়িটা। সমানে সুতো টানছিল। ঘুড়িওয়ালার হুঁশ ছিল না লাটাইয়ের সুতো ফুরিয়ে আসছে ক্রমশ। তারপরেই ফুড়ুৎ। বাবার নিজেরই একবার এমন হয়েছিল। সেই গল্পও শুনেছে। নতুন মাঞ্জা দেওয়া সুতো লাটাইতে গোটাবার সময় তাড়াহুড়োয় ভালো করে গিঁট দেওয়া হয়নি। আচমকা লাটাইয়ের সুতো শেষ হয়ে যেতেই গিঁট খুলে এক লাটাই সুতো সমেত উড়ে গিয়েছিল ঘুড়ি।
ব্যাপারটা খেয়াল হতেই সুলতা দেরি করল না। ছেলে সন্তু বছর দুয়েক আগেও ঘুড়ি বলতে পাগল ছিল। প্রশ্রয় ছিল সুলতারও। মায়ের কাছে ঘুড়ি বা সুতো কেনার টাকা চাইলে কখনও নিরাশ হতে হয়নি। তবু বেশিদিন সন্তুর ঘুড়ির দিকে টান থাকেনি। ইদানীং শুধু ভিডিও গেম। সময় পেলেই হাতে মোবাইল নিয়ে বসে পড়ে। ফাঁকা লাটাই ক’দিন আগেও আলমারির তলায় গড়াচ্ছিল। চোখে পড়তে যত্ন করে তুলে রেখেছে। সে-কথা মনে পড়তে সুলতা এক মুহূর্ত দেরি করল না। ছুটে গিয়ে যথাস্থান থেকে লাটাই এনে দ্রুত হাতে গুটিয়ে ফেলল সুতোটা।
লাটাইয়ে গোটানো সুতোর পরিমাণ দেখে সুলতার বুঝতে অসুবিধা হল না, এত সুতো কাটা ঘুড়ির হতে পারে না। বরং যা অনুমান করা হয়েছিল, হয়তো সেটাই সঠিক। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবার মতো সময় তখন হাতে নেই। রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের জল চাপাবার সময় হয়ে গেছে। এরপর ঠিক আটটার মধ্যে স্বামীর অফিসের ভাত। সন্তুর সকালের জলখাবার। লাটাই সুতো সেলফের এক কোণে রেখে সুলতা রান্নাঘরে কাজে লেগে পড়ল। দম ফেলার সময় নেই এখন।
দুপুরে খাওয়ার পর সামান্য গড়িয়ে নেওয়া অভ্যাস সুলতার। বাড়িতে টিভি দেখার তেমন রেওয়াজ ছিল না। বিয়ের পরেও ব্যতিক্রম হয়নি। দুপুরে এখনও বই পড়ার অভ্যাস। সকালে কাগজ দেবার ছেলেটাকে বলাই থাকে; এই পুজোর আগে শারদ সংখ্যা বের হতে শুরু হলেই দিয়ে যায়। এর মধ্যে দিয়েও গেছে একটা। ক’দিন দুপুর তাই নিয়েই কেটেছে। প্রায় শেষ। তবু সেটাই হাতে নিয়ে পাতা ওলটাচ্ছিল। বাইরে ওই সময় সমানে চিৎকার চেঁচামেচি—ভো কাট্টা-আ-আ-আ!
সন্দেহ নেই, কারও ঘুড়ি কাটা পড়েছে। অন্যদের তাই আনন্দের চিৎকার। অল্প পরে এক ঝাঁক কচিকাঁচা গলায় চিৎকার—নাই ঢক্কু, বাড়ে নাক্কু, পেটকাট্টিক্কু—
হাতের বই নামিয়ে উঠে বসল সুলতা। মোবাইল হাতে ভিডিও গেম নিয়ে ব্যস্ত আজকের ছেলেদের অনেকেই এসব কথার অর্থ বুঝবে না হয়তো। ভিতরে সাড়াও জাগাবে না। কিন্তু সুলতার কাছে অতি পরিচিত এসব শব্দ। ছেলেবেলার সেই দিনে কী যে দারুণ লাগত! বাবা কারও ঘুড়ি কাটলে পিছনে লাটাই হাতে ও নিজেই কতদিন এভাবে চিৎকার করে উঠেছে। ওর ছেলেবেলায় এই দিনে ঘুড়ির লড়াই জমে উঠত সকাল থেকেই। এখন দুপুরের আগে তেমন সাড়া মেলে না। প্রতি বাড়ির ছাদে তাই জমে উঠতে শুরু করেছে ঘুড়িবাজদের লড়াই। গতবছরও এই দিন দুপুরে সন্তুর সঙ্গে ছাদে কাটিয়েছে কিছু সময়। সন্তুর তখনও ঘুড়ির প্রতি কিছু আকর্ষণ ছিল। এ-বছর একেবারেই নেই। মায়ের কাছে ঘুড়ি-সুতোর জন্য বায়নাও করেনি।
একা বসে সুলতা ছেলেবেলার সেইসব কথাই ভাবছিল। সন্তু ঘরে ঢুকে ব্যস্ত হয়ে বলল, “বল্টুদা আজ একধার থেকে ঘুড়ি কাটছে মা! বরেলি থেকে নাকি স্পেশাল পান্ডা ফাইভ মাঞ্জা আনিয়েছে। কেউ পারছে না। বল্টুদা আজ হিরো! সামনের বছর আমিও ওই মাঞ্জা আনাব।”
সন্তু যে ছাতে ঘুড়ির প্যাঁচ দেখতে উঠেছিল, সুলতা টের পায়নি আগে। ভেবেছিল পাশের ঘরে আছে হয়তো। ছাদে যাবার আগে মাকেও বলেনি। তাহলে সুলতাও সঙ্গে যেত। ভুরু কুঁচকে বলল, “বল্টু কে রে?”
“তুমি চিনবে নাকি!” মায়ের কথায় সন্তু হাসল।—”পাশের পাড়ায় থাকে। আর ক’দিনই-বা তুমি বাড়ি থেকে বের হও?”
তা ঠিক। বাড়ি থেকে তেমন বের হয় না সুলতা। সপ্তাহে দুটো দিন দুপুরে লাইব্রেরিতে বই আনতে যাওয়া ছাড়া। ইদানীং সেটাও অনেকদিন সন্তুকে দিয়ে আনায়।
মা চুপ করে আছে দেখে সন্তুই বলল, “চলো না মা, দেখবে চলো। তোমাকে ডাকতেই তো এলাম। কত ঘুড়ি উড়ছে আকাশে!”
সন্তু বরাবরই মা-অন্ত প্রাণ। সেই মার যে ঘুড়ির প্রতি টান রয়েছে, জানে ও। মাকে ডাকতে ছুটে এসেছে সেই কারণেই। অগত্যা ছেলের সঙ্গে ছাতে পৌঁছতে দেরি হয়নি।
সন্তু বাড়িয়ে বলেনি। আকাশে আজ প্রায় ঘুড়ির মেলা। গতবারের থেকেও অনেক বেশি যেন। রঙবেরঙের ঘুড়িতে ঝকঝকে আকাশ ছয়লাপ। সেদিকে তাকিয়ে পুরোনো সেই দিনগুলোর কথা ভাবছিল সুলতা। বাবা ঘুড়ি ওড়াতেন। পিছনে লাইটাই ধরা কাজ ছিল ওর। প্যাঁচ খেলার আগে বাবা দারুণ এক গোঁত্তায় প্রতিদ্বন্দ্বীর ঘুড়ির তলায় নামিয়ে আনতেন নিজের ময়ূরপঙ্খী। তারপরেই হাঁকতেন—”সুলু খতরা দেব এবার। লাটাই ঠিক রাখিস।”
বাবা কী চাইছেন, বুঝতে ভুল হত না সুলতার। লাটাই এবার শক্ত করে ধরা চলবে না। দরকারে সহজেই যেন সুতো নিতে পারেন। এরপরেই হাতের কারসাজিতে তাঁর ময়ূরপঙ্খী মাথা উঁচিয়ে ফরফর করে ছুটত উপরে প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে। তারপর চরম মুহূর্ত এলেই দুই হাতে হ্যাঁচকা টান মারতেন সুতোয়। এমন আরও কত কায়দায় যে বাবা প্যাঁচ খেলতে পারতেন!
তা যে প্যাঁচই হোক, ওই সময় লাটাই হাতে পিছনে প্রায় রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করত ও। প্রতিদ্বন্দ্বীর ঘুড়ি কেটে গেলেই চেঁচিয়ে উঠত—ভো কাট্টা-আ-আ-আ! বাবাও তৃপ্তিতে দম ছাড়তেন। উলটোরকম হলে কারও মুখেই কথা ফুটত না। অন্যপক্ষের উল্লাস শেলের মতো এসে বিঁধত। নিঃশব্দে বাবা ওর হাত থেকে লাটাই নিয়ে দ্রুত গোটাতে থাকতেন।
ঘুড়ির মেলা বসা আকাশের দিকে নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে ছিল সুলতা। সেই ঘুড়ির মাঝে পতপত করে উড়তে থাকা একটা চাঁদিয়ালের দিকে আঙুল তুলে সন্তু বলল, “ওই যে চাঁদিয়ালটা, বল্টুদার ঘুড়ি। কাছেই সবুজ ঘুড়ির দিকে এগোচ্ছে। এবার বারোটা বাজবে ওটার।”
সত্যিই তাই। চাঁদিয়ালের সঙ্গে প্যাঁচ শুরু হতেই নিমেষে কেটে গেল সবুজ ঘুড়িটা। বাঁধন-ছেঁড়া কাটা ঘুড়ি টাল খেতে খেতে উড়ে চলল আকাশে। আশেপাশের বাড়ির ছাদে চিৎকার উঠল—ভো কাট্টা-আ-আ-আ!
চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল সন্তুও। সুলতা বলল, “সকালের ঘুড়ি আর লাটাইটা নিয়ে আয় তো সন্তু।”
ভিডিও গেমের পাল্লায় পড়ে এবার ঘুড়ির কথা মনেই আসেনি। সকালে মা যে ছাতে একটা ঘুড়ি আর সুতো পেয়েছে মনেও ছিল না। মায়ের কথায় লাফিয়ে উঠে সিঁড়ির দিকে ছুটল।
দুদ্দাড় করে সিঁড়ি ভেঙে সন্তু যখন ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে ফিরে এলো, দেখে মা ততক্ষণে শাড়ির আঁচল গাছকোমর করে জড়িয়ে নিয়েছে। ছেলে কাছে আসতেই সুতো বাঁধা ঘুড়িটা হাতে নিয়ে বলল, “সন্তু, লাটাই ধর তো।”
মা নিতান্তই নিরীহ মানুষ, হরদম বাবার ধমক খায়। উঁচু গলায় কখনও কথা বলতে শোনেনি। সেই মায়ের এই রূপ সন্তু দেখেনি কখনও। ঘুড়ির ব্যাপারে মায়ের কিছু আগ্রহ আছে জানত। দু-একটা গল্পও শুনেছে। কিন্তু এতটা ভাবেনি। গোড়ায় তাই কিছু কৌতূহল ছিল। বিনাবাক্যে মায়ের পিছনে লাটাই হাতে দাঁড়িয়েছিল। মা কিন্তু অতি সহজে একা হাতেই আকাশে উড়িয়ে ফেলল ঘুড়িটা। তারপর বাতাস পেতেই সুতো ছাড়তে থাকল। দেখতে দেখতে উঁচুতে উঠে গেল ময়ূরপঙ্খী।
মা এমন চমৎকার ঘুড়ি ওড়াতে পারে জানা ছিল না সন্তুর। হাঁ করে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ দেখল মা দুই হাতে সুতোর টানে ঘুড়িটাকে বল্টুদার চাঁদিয়ালের দিকে নিতে শুরু করেছে। মায়ের মতলব বুঝে ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “মা, বললাম না, চাঁদিয়াল ঘুড়ি বল্টুদার!”
সুলতা কান দিল না ছেলের কথায়। দারুণ হাতের কায়দায় খানিক উঁচু থেকে বল্টুদার চাঁদিয়ালের উপর গোঁত্তা খাওয়াল। তারপর দুই ঘুড়ি কাছাকাছি আসতেই ভারী গলায় বলল, “সন্তু, লাটাই ঢিল রাখিস কিন্তু। হঠাৎ করে সুতো টানতে হতে পারে।”
মার এই রূপ সন্তু আগে দেখেনি। আঁচল আগেই গাছকোমর করে জড়িয়ে নিয়েছিল। সন্তু দেখল মায়ের কপালে সদ্য জমে ওঠা ঘামের বিন্দুগুলোর সঙ্গে নাকের পাটায় নাকছাবি সমানে ঝিলিক দিয়ে উঠছে। লাটাই হাতে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ও। ঘুড়ি নয়, মাকে নতুন করে দেখছিল। তারই ভিতর হঠাৎ বাজ পড়ল যেন!
ভো কাট্টা-আ-আ-আ!
চমকে উঠে আকাশের দিকে তাকাল ও। সন্দেহ নেই মায়ের ঘুড়িই কাটা পড়েছে। হাজার হোক বল্টুদার ঘুড়ি আজ আকাশের হিরো। তারপর নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। মার ময়ূরপঙ্খী নয়, কাটা পড়েছে বল্টুদার চাঁদিয়াল! অমন বাজ-পড়া চিৎকার কি অমনি! ঘুড়িবাজ বল্টুদার ঘুড়ি শেষ পর্যন্ত কাটা পড়বে, কেউ কাটতে পারবে ভাবতেও পারা যায়নি।
বিস্ময়ের রেশ তখনও কাটেনি। পাড়া কাঁপিয়ে তখনও চিৎকার চলছে। সন্তু মায়ের দিকে তাকাল। মিটিমিটি হাসছে মা। তৃপ্তির হাসি। ও বিস্মিত গলায় বলল, “মা! তুমি এত ভালো প্যাঁচ খেলতে জানো! আগে ঘুড়ি ওড়াতে বুঝি?”
“না রে পাগল।” তৃপ্তিভরা গলায় সুলতার উত্তর—”বাবা এই দিনে ওড়াতেন। আমি শুধু লাটাই ধরতাম। প্যাঁচ দিয়ে বাবা কখন কীভাবে সুতোয় টান দিতেন, দেখেছি তো। কতদিন ইচ্ছে হয়েছে বলি, বাবা, সুতোটা আমার হাতে দাও। একবার প্যাঁচ খেলি। সাহস হয়নি। তোদের বাড়িতে এসে তবু তো হল!”
ছবি-জয়ন্ত বিশ্বাস
It’s very engaging 🤍💌