গল্প অদৃশ্য শিবানী রায়চৌধুরী শরৎ ২০২৩

শিবানী রায়চৌধুরীর আগের গল্প খোক্কস, বাড়ি থেকে পালিয়ে(গল্প), ফুলঝাড়ু, ইচ্ছেপূরণ

golpoadrishyo

সেদিন ছিল শনিবার, ইস্কুল ছুটি। ভর দুপুরবেলা তিতলি বাগানের একেবারে শেষে ভাঙা ঘরটার ভিতর লোকটাকে দেখতে পেয়েছিল। আগের দিনই তিতলিরা পুরোনো  বাড়ি ছেড়ে পাঁচ নম্বর এঞ্জেল রোডে এসেছে। শীতকাল প্রায় শেষ হয়ে এল। নেড়া গাছগুলোতে তখনও কচি পাতা ভিড় করে নি। বাগানে তিতলি ছাড়া আর কেউ ছিল না। তিতলির বাবা, মা আর ছোটো ভাই গুন্ডু বাড়ির ভিতর জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত।

অন্ধকার ঘরে একরাশ ভাঙা কাঠের বাক্সের পেছনে নোংরা জায়গায় ধুলোর মধ্যে লোকটা শুয়েছিল। চোখদুটো আধবোঁজা। মুখটা ছাইরঙা ফ্যাকাশে। গায়ের চামড়া শুকনো আমসি। তিতলির মনে হল লোকটা বোধহয় চিরকালই এই অন্ধকার ভাঙা ঘরে শুয়ে আছে। ভাবলো লোকটা বোধহয় বেঁচে নেই। তিতলি কোন দিন মরে গেছে এমন লোক কাছ থেকে দেখেনি। দূর থেকে কাচের গাড়িতে মৃতদেহ নিয়ে যেতে দেখেছে।

বাড়ির পিছনের খোলা জায়গাটাকে বাগান বললে ভুল হবে। একটা রাবিশ ডাম্প। রাজ্যের জঞ্জালে ভর্তি। বাড়িটার একদিক বসে গেছে তাই ঘাড় কাত করে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে থেকে ভূতুড়ে বাড়ি বলে মনে হচ্ছিল। কাউন্সিল বাড়িটাকে ভেঙে ফেলার অর্ডার দিয়েছে। যাদের থাকার জায়গা নেই তারা বেশ কিছুদিন এইসব বাড়ি ঝেড়েপুঁছে থাকতে পারে। তিতলির মা অনেক দিন একটা ঘরে চারজনে ঘেঁষাঘেঁষি করে ছিলেন। আর বাড়িতে ছিল আরো পাঁচটা পরিবার। ঝগড়াঝাঁটি মন কষাকষি লেগেই ছিল। তিতলির বাবা অনেক লেখালিখি করে এ অফিস সে অফিস ঘুরে কয়েক বছরের জন্যে বাড়িটা পেয়েছেন। তিতলির মা স্বপ্নেও ভাবেননি একটা আস্ত বাগানবাড়ি হাতে পাবেন।

অক্টোবরের ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে তিতলিরা বাড়িটা দেখতে এসেছিল। কাউন্সিলের লোক মিস্টার গোল্ডস্মিথ আসতে দেরি করেছিলেন। তিতলির বাবা রাস্তার চার পাশে বড়ো বড়ো ঝকঝকে বাড়িঘর দেখে বললেন, “পাড়াটা দেখে বেশ অভিাজাত বলে মনে হচ্ছে।” মা বললেন, “বড়োলোকদের পাড়া। আমাদের এখনকার পাড়াটা গরিবদের জন্যে।”

তিতলি দেখছিল বাড়ির বাইরের দেওয়ালে কারা যেন লাল রঙে গ্রাফিতি লিখেছে ‘আন্ডার ডিমলিশন, নট ফিট ফর লিভিং। ভেঙে ফেলা হবে, বাসের অযোগ্য’। মিস্টার গোল্ডস্মিথ আধঘণ্টা দেরি করে হন্তদন্ত হয়ে এসে গজ গজ করতে লাগলেন, “লন্ডনে শহরের মধ্যে গাড়ি চালানোই দায়। গাড়ির ভিড়ের জন্যে আবার পয়সা দিতে হয়।” তারপর একগাল হেসে বললেন, “এই স্যাঁতসেঁতে মেঘলা দিনে বাড়িটা পছন্দ হলে রোদ্দুর উঠলে মনে হবে ঝলমলে রাজপ্রাসাদ হাতে পেয়েছেন।” তিতলি লক্ষ্ করল ভদ্রলোকের একটা দাঁত সোনায় বাঁধানো। তিতলির বাবা বলেছিলেন গোল্ডস্মিথের পূর্বপুরুষরা ছিল স্যকরা। সোনার কাজ করতেন। তিতলি কৌতূহল চাপতে পারল না, “স্যাকরা বলে কি সোনা দিয়ে দাঁত  বাঁধাতে হবে?” তিতলির বাবা বললেন, “সোনাবাঁধানো দাঁতের সঙ্গে গোল্ডস্মিথ পদবির কোন সম্পর্ক নেই।”

গোল্ডস্মিথ একটা মরচেপরা লোহার চাবি দিয়ে অনেক কসরত করে কাঠের ভারী দরজাটা খুললেন। দরজা মচমচ করে খুলে গেল। আর সেইসঙ্গে দেয়াল আর সিলিং থেকে প্লাস্টারের চাংড়া খসে এক রাশ ধুলো ছড়িয়ে ঘরটা ঝাপসা করে দিল। তিতলি চোখ কচলাতে কচলাতে দেখল গোল্ডস্মিথ মাকড়সার জাল সরিয়ে একটা জানলা খুলে দিলেন। তিতলি আধো অন্ধকারে ঘরটা দেখার চেষ্টা করছিল। গোল্ডস্মিথ হাসি হাসি মুখে তিতলিদের বলছিলেন, “কল্পনা করে দেখুন ঝুল ময়লা পরিষ্কার করে সারিয়ে সুরিয়ে রঙ করলে ঘরটা কেমন দেখাবে। ছাদ সারালে আর জানলা দরজা রঙ হলে আগের জৌলুষ ফিরে আসবে।”

একটার পর একটা ঘর দেখাচ্ছিলেন আর বলছিলেন কল্পনা করে দেখুন আর কল্পনা করে দেখুন। তিতলির ভদ্রলোকের সোনাবাঁধানো দাঁতের বোকা হাসিটা দেখে বিরক্ত লাগছিল। এই বাড়ি পরিষ্কার করার কথা ভেবে ও কিছুই কল্পনা করতে পারছিল না।

দোতলার সবশেষের ঘরটা তালা বন্ধ। গোল্ডস্মিথ পকেট হাতড়ে চাবি খুঁজে পেলেন না। বললেন, “এটা আগের মালিকের পড়ার ঘর ছিল। শুনেছি পন্ডিত লোক ছিলেন। অকৃতদার, নিজের বলতে কেউ ছিল না।”

গোল্ডস্মিথ বিষয়টা শেষ করলেন, “আপনারা এখনই এ-ঘরটা পাবেন না। এক সময় কাউন্সিল ঘরটা খালি করে দেবে। অনেক পুরনো বইপত্র আছে।”

তিতলির মা বললেন, “এতগুলো ঘর, একটা ঘর নাইবা পেলাম!”

গোল্ডস্মিথ এই সুযোগে নিজের কেরামতি জাহির করলেন, “আমি কাউন্সিলকে আপনাদের অবস্থা বুঝিয়ে এই বাড়ি যোগাড় করেছি। আপনার কর্তা হাঁপানিতে কষ্ট পাচ্ছেন। আপনাদের একটা খোলামেলা থাকার জায়গা দরকার। জানেনইতো আপনাদের মতো বহু পরিবার গৃহহীন।”

আবার সেই এক কথা “পড়ার ঘরটা খালি হলে একটা বড়ো ঘর পাবেন। সেই ঘরে কী করবেন কল্পনা করে দেখুন।”

তিতলির মনে কল্পনা এবার ডানা ঝটপট করে উঠল। ও একটা কাচভাঙা জানলার ফাঁক দিয়ে আবছা দেখতে পেয়েছিল ঘরে সারি সারি কাঠের বুককেস বইয়ে ঠাসা। দেয়ালে বড়ো একটা পেন্টিং। মাঝখানে টেবিল। সবুজ চামড়ায় মোড়া চেয়ার। লম্বা গ্র্যান্ডফাদার ঘড়িতে কটা বেজেছে পড়া যাচ্ছিল না। জানলার ধুলোমাখা কাচে কে যেন আঙুল বুলিয়ে লিখে রেখেছে ‘নিরুদ্দেশ, অদৃ্শ্য।’

তিতলি একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছিল। ভাবছিল বাড়িটার নিশ্চয়ই কোনো ইতিহাস আছে। গোল্ডস্মিথের চোখে লেখাটা পড়তেই মন্তব্য করলেন, “এ পাড়ার সেকেন্ডারি ইস্কুলের ছেলেদের কাজ। একদল স্কুলপালানো ভ্যান্ডালস। ধ্বংস করাই ওদের কাজ। বাগানের পাঁচিল ডিঙিয়ে বাড়ির জানলা ভেঙে ঢোকে। ইস্কুলে ডিসিপ্লিন বলে কিছু নেই।”

বাড়ির ভেতর দেখে তিতলারা বাগানে এল। বাগানে এসে তিতলি খোলা হাওয়ায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বাগান বলতে তিতলি যা ভেবেছিল এ বাগান তা নয়। বাগানে ফলফুলের গাছ থাকে। এ বাগান কাঁটাগাছের জঙ্গল। জলবিছুটি আর আগছায় ভরা। ভাঙা ইঁটপাটকেল আর পাথরের মাঝে কিছু বুনো হলুদ আর বেগুনি ফুল মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। গোল্ডস্মিথ আবার শুরু করলেন তিতলি আর গুন্ডুর দিকে তাকিয়ে “কল্পনা করে দেখো বুনো গাছপালা কেটে জঙ্গল সরিয়ে বাগান পরিষ্কার করা হয়েছে। এ পাশে একটা টেবিল দুটো বেঞ্চি ও পাশে বড়ো গাছটার নিচে একটা দোলনা। আর কী কী থাকবে কল্পনা করে দেখ। বাগানের দেয়ালও রঙ হবে। তোমরা দেয়ালে রঙতুলি দিয়ে ছবি আঁকবে। বাড়ি ফিরে একটা কাগজে প্ল্যান করে ফেল।” তিতলিকে বললেন, “কাছেই সেকেন্ডারি ইস্কুল। খুব সুনাম। তুমি তো সেকেন্ডারিতে।” তিতলির ফোরণ কাটা স্বভাব। চুপ করে থাকতে পারল না, “যে ইস্কুলের ছেলেদের কথা একটু আগে বলছিলেন?” গোল্ডস্মিথ বললেন, “এ পাড়ায় ঐ একটাই সেকেন্ডারি ইস্কুল।” গোল্ডস্মিথ তিতলির প্রশ্নের অর্থ বুঝেও বুঝতে চাইলেন না। এখানেই বাড়ি দেখা শেষ হল। 

তিতলির বাবা বাগানের শেষে ভাঙা ঘরটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ও ঘরটা কিসের দেখাবেন না?” গোল্ডস্মিথ উত্তর দিলেন, “দেখার মতো কিছু নয়। এক সময় গরমকালে ওই ঘরে বসে বাড়ির মালিক লেখাপড়া করতেন। এখন চারদিক ভেঙে পড়ছে। আবর্জনা সরিয়ে ঘরে ঢুকতে পারবেন না। ডেঞ্জারাস জায়গা, বিপদজনক! ভীষণ বিপদজনক! পয়সা দিলেও কেউ পরিষ্কার করতে চায় না।”

তিতলি জিজ্ঞেস করল, “আমরা কি কল্পনা করে দেখব?” গোল্ডস্মিথ তিতলির ঠাট্টাটা বুঝতে পেরে গম্ভীর হয়ে গেলেন। থমথমে আবহাওয়া। তিতলির মা নিস্তব্ধ অবস্থাটা ভাঙলেন, “বাগানের ঘর না হলেও চলবে। আমরা ও ঘরে যাবও না, থাকার জায়গা পাচ্ছিলাম না। আমাদের অত ভাবলে চলবে না।” 

তিতলির মা-বাবা বাড়িটা নেয়া ঠিক করলেন। 

সেই শনিবারের দুপুর বেলা তিতলি বাগানের ভাঙা ঘরটাতে ঢুকেই পড়ল। তিতলি টর্চ নিয়ে এসেছিল। টর্চের তেরচা আলোয় দেখতে পেল ঘরের কাঠের দেয়ালের তক্তা খসে পড়েছে। কোনো কোনো জায়গায় পেরেক মেরে ধরে রাখা হয়েছে। ঘরের ছাদ ঝুলে পড়ছে। সিমেন্টের বস্তা, মরচে পড়া লোহালক্কর, ভাঙা ফার্নিচার আর রাজ্যের বাতিল করা জিনিসে ঘরে পা রাখার জায়গা নেই। সবকিছুই ধুলোবালি আর মাকড়সার জালে ঢাকা।

তিতলি দেখতে পেল ঘরের পেছন দিকে একটা দরজা। সেটাও পুরো বন্ধ নয়, কব্জা থেকে খুলে আসছে। তার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে বাইরের আলো এসে পড়েছিল। তিতলি ঘরের মধ্যে কিছু নড়াচড়া আর আঁচড়ানোর শব্দ শুনে আরো এগোবে না ফিরে যাবে ভাবছিল। ওর মনে পড়ল এমন জায়গায় ধেড়ে ইঁদুররা থাকতে ভালবাসে। তা মনে পড়তেই ও বের হয়ে আসবে ভাবল।

ধুলোবালির মধ্যে তিতলি বেশিক্ষণ চুপ করে থাকতে পারেনি। হঠাৎ সে হ্যাঁচ্ছো, হ্যাঁচ্ছো করে উঠল। ঘরের পেছন দিক থেকে একটা ক্ষীণ স্বর ভেসে এল “কে এখানে? কী চাই?”

তিতলির মনে হল একজন বুড়ো মানুষের গলার নির্জীব স্বর। মনে হল লোকটা অনেকদিন কথা বলেনি। তিতলির ভয় করছিল কিন্তু লোকটার জন্যে কষ্ট হল। ও দেখবে বলে এগিয়ে গেল। ঘরটা  ভাঙা জিনিসপত্র আর জঞ্জালে এমন ভরে আছে যে এগোবে কার সাধ্য! একটা  নড়বড়ে কাঠের বাক্স সরাতেই সেটা ভেঙে পড়ল। সেই সঙ্গে বের হয়ে এল ধুলো আর রাশি রাশি উইপোকা। তিতলি সিমেন্টের বস্তা, লোহার পাইপ, এক তাল ছেঁড়া তাঁবু আর পাহাড়প্রমাণ পুরনো খবরের কাগজ পার হয়ে এল। টর্চের আলোয় দেখল কাগজগুলো পাঁচ বছর আগের। তিতলি পা টিপে টিপে চললেও আবর্জনার গাদায় নিঃশব্দে হাঁটতে পারছিল না। পায়ের শব্দ শুনে লোকটা বলে উঠল, “কে? কে এখানে? কী চাই?” কাঁপা কাঁপা স্বর।

তিতলি বলল, “ভয় পেয়ো না। আমার নাম তিতলি। আমি সেকেন্ডারি‍ ইস্কুলে পড়ি। আমরা এ বাড়িতে গতকাল এসেছি।”

আর কোন সাড়াশব্দ নেই। ও আর একটু এগিয়ে দেখতে পেল লোকটা দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে। জামাকাপড় শতছিন্ন। চোখে মোটা কাচের চশমার একটার কাচ ভাঙা। চোখের দৃষ্টি একদম ফাঁকা। ও লক্ষ করল কিছু ছেঁড়া খাবারের প্যাকেট, প্ল্যাস্টিকের জলের বোতল আর ফলের খোসা ছড়ানো। তার মধ্যে নেংটি ইঁদুর ছুটোছুটি করছে। লোকটাকে দেখতে গিয়ে তিতলি ফিরে যাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল।

“তিতলি, তিতলি, কোথায় গেলে? একটু আগে বাাগানে ছিলে?” বাবার ডাকে তিতলির খেয়াল হল। তিতলি লোকটাকে বলল, “বাবা আমাকে ডাকছে, আজ চলি।”

এবার তার ফাঁকা দৃষ্টিতে একটু হতাশার ভাব। তিতলি বলল, “আমি কাল আবার আসব।”    

তিতলি বাড়িতে ঢুকে ভাবছিল বাবাকে লোকটার কথা বলবে কি বলবে না। বাবা কোনো সুযোগ না দিয়ে বকতে শুরু করলেন, “এতক্ষণ বাগানে কী করছিলে? ভাঙা ঘরটায় উঁকিঝুঁকি মারছিলে বোধহয়। শুনলে তো ডেঞ্জারাস জায়গা।”

গুন্ডু গোল্ডস্মিথকে ভেঙিয়ে বলল, “বিপদজনক! ভীষণ বিপদজনক!” তিতলি মা’র চোখে পড়ার আগেই বাথরুম গিয়ে জামার ধুলো ঝেড়ে হাতমুখ ধুয়ে এল।

তিতলিকে দেখে মা বললেন, “দু ঘণ্টা বাগানে কাটিয়ে এলে, এখন বইপত্তর গুছিয়ে ফেল। ছোটো ঘরটা তোমাদের পড়ার ঘর। কাউন্সিল থেকে একটাই টেবিল আর খানকয়েক চেয়ার দিয়েছে। এই টেবিলেই পড়বে। পড়া হয়ে গেলে এখানে খাওয়া হবে।”

গুন্ডু এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল, আর থাকতে পারল না, “এখানেই পড়ব। পড়ার ঘরে না?” ওদের বাবা এবার বললেন, “বিদ্যাসাগর মশাই ফুটপাথে গ্যাসের আলোর নীচে পড়েছেন। তোমাদের কপাল ভালো টেবিল চেয়ারে বসে পড়ছ। আমি মাটিতে মাদুরে বসে পড়েছি।” এসব কথা ওরা অনেকবার শুনেছে।

সেদিন রাত্তিরে তিতলির কিছুতেই ঘুম আসছিল না। ভাবছিল লোকটা নিশ্চয়ই অনেকদিন ভাল করে খায়নি। কেউ হয়তো ওর কথা জানেও না। কেউ ওর খবরও রাখে না। লোকের চোখে ও অদৃশ্য।

পরের দিন রবিবার। সবার আগে তিতলি উঠে পড়ল। রান্নাঘরে গিয়ে খাবার খুঁজতে শুরু করল। ওদের অভাবের সংসার। বাবার কাজ নেই। মা দুটো দোকানে পার্ট টাইম কাজ করেন। বাড়তি খাবার থাকে না। চুরি করলেই ধরা পড়ে যাবে। ফুডব্যাঙ্ক থেকে ওরা বিনা পয়সায় খাবার নিয়ে আসে। এ পাড়ার ফুডব্যাঙ্কে কার্ড করাতে হবে। ফুডব্যাঙ্কের লম্বা লাইনের কথা ভাবতেই ওর মাথা ধরে গেল। সারা সপ্তাহ কাজের পর তিতলির মা রবিবার একটু বেলা করে ওঠেন। এই সুযোগে ও দুটো রুটি দিয়ে চিজ স্যান্ডউইচ আর এক প্যাকেট আলুভাজা লোকটাকে দিতে গেল।

তার কি আর সাত সকালে ঘুম ভাঙে! লোকটা নিঃশব্দে ঘুমাচ্ছিল। তিতলি ভাবছিল কী বলে ডাকবে। তিতলি লোকটার নাম জানে না। আপনি না তুমি বলবে সে নিয়ে ভাবতে হবে না। ইংরিজিতে সবাই তুমি।

বারদুয়েক ডাকতেই লোকটা চোখ কচলে উঠে বসল। তিতলি খাবারটা ওর হাতে দিয়ে বলল, “খেয়ে নাও, ব্রেকফাস্ট।”

লোকটা একটা তোবড়ানো প্ল্যাস্টিকের বোতল থেকে জল খেল। দুধ বা চা আনতে পারেনি বলে তিতলির খুব খারাপ লাগছিল। তিতলি লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”

কোন উত্তর দিল না। “ভাত ডাল এসব খাও তো?” বলায় লোকটা মাথা নাড়ল।

রবিবার দুপুরে তিতলির মা কমিউনিটি সেন্টারে বাংলা পড়াতে যান। তিতলি প্রাইমারি ইস্কুলে পড়তে মার সঙ্গে যেত। এখন সেকেন্ডারিতে ইস্কুলেই বাংলা পড়ার ব্যবস্থা আছে। মা তাড়াতাড়ি ভাত, ডাল, ডিমের ঝোল রান্না করে “নিজেরা নিয়ে খেয়ে নিও” বলে চলে গেলেন। তিতলি আর সময় নষ্ট না করে ভাত, ডাল, নিজের ভাগের ডিমের আধখানা নিয়ে লোকটাকে দিতে গেল। গিয়ে দেখে সে ঘুমে অচেতন। তিতলির পায়ের শব্দে কি ডাকাডাকিতে তার ঘুম ভাঙল না। মাথার কাছে খাবারটা রেখে ও চলে এল।

নতুন পাড়ায় এসে তিতলির মন খারাপ লাগছিল। চেনা রাস্তা, বাড়িঘর আর পাড়ার বন্ধুদের ফেলে এসেছে। ও বাড়ির কাছাকাছি একটু ঘুরে আসবে ঠিক করল। ওর বাবা রবিবারের খবরের কাগজে ডুবে ছিলেন। মুখ তুলে বললেন, “বেশি দূর যেও না। অচেনা পাড়া।”

তিতলি বাড়ির বাইরে পা দিয়ে দেখল রাস্তা শুনশান। একটাও লোক নেই, মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি ঝড়ের বেগে চলে যাচ্ছে। ওদের পুরনো পাড়ায় লোকে পায়ে হেঁটে কি বাসে করে যাতায়াত করে। রবিবার রাস্তা জমজমাট। ছুটির দিনে ছেলেমেয়েরা ভালো জামা পরে মা বাবার সঙ্গে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যায়। সবায়ের মুখে হাসি। রাস্তায় দেখা হলে লোক নানা ভাষায় নানা ভাবে হ্যালো বলে- আদাব, মেরহাবা, আসালামু আলাইকু‌ম, নমস্কার, কেমন আছেন দাদা, হ্যালো, হাউ আর ইউ। চেনা-অচেনা বলে কিছু নেই।   

তিতলি ফুটপাথ ধরে হাঁটছিল। খুব একা লাগছিল। মাঝে মাঝে গেটওয়ালা বড়ো বাড়ি থেকে স্মার্ট ছেলেমেয়ে বের হয়ে গাড়িতে উঠছিল। তারা ওকে দেখেও দেখছিল না। ও যেন অদৃশ্য। রাস্তা দিয়ে দু একজন ই্-স্কুটার চালিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তারা ফিরেও তাকাল না। তিতলি অদৃশ্য হয়ে গেছে। একটা ছোটো মেয়ে ব্যালেরিনা ড্রেস পরে যাচ্ছিল। একবার ওর দিকে তাকিয়ে না দেখার ভান করে চলে গেল। তিতলি খেয়াল করল ওর কোটের দুটো বোতাম নেই, কলারটাও ছেঁড়া। তিতলি আর বেশি দূর না গিয়ে বাড়ি ফিরে এল।

পরের দিন তিতলি নতুন ইস্কুলে ভর্তি হল। সকাল থেকেই হুড়োহুড়ি। সারাদিন ও বাগানের অদৃশ্য লোকটাকে দেখতে যায়নি। নতুন ইস্কুলে প্রথম দিন। ওর মতো গায়ের রঙ এমন কাউকে চোখে পড়েনি। সবাই ধবধবে ফরসা কি ফ্যাকাশে গোলাপি।

ও ক্লাশের পেছন দিকে বসেছিল। টিচারও ওর দিকে নজর দেননি। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যে বার বার হাত তুলেছিল। ওকে একবারও জিজ্ঞেস করেননি। কেউ এগিয়ে এসে ভাব করেনি। লাঞ্চের সময় একটা ছেলে ওর পাশে বসেছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমাদের দেশে রাস্তায় বাঘ দেখেছ?”

তিতলি উত্তর দিয়েছিল, “আমাদের দেশে বাঘ বনে থাকে, রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় না। আমি বনজঙ্গল থেকে আসিনি। আমাদের শহরে চিড়িয়াখানায় বাঘ দেখেছি।” ছেলেটা আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি।

ওর পুরনো ইস্কুলে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল। যেখানে ছাত্রছাত্রীরা নানান দেশ থেকে এসেছে-কেউ ফরসা, কেউ কালো, কেউ বাদামি। তিতলি প্রথম যেদিন ইস্কুলে গিয়েছিল টিচার ক্লাশে ঢুকে বলেছিলেন, “তিতলি নতুন এসেছে। তোমরা কে ওর দেখাশোনা করবে?” ক্লাশের  সবাই হাত তুলেছিল। তিতলি তখন সবে ইংল্যান্ডে এসেছে। ভালো ইংরিজি জানত না। ওর মতো আরো কয়েকজন ছিল। কখনোই নিজকে অদৃশ্য মনে হয়নি। 

তিতলি রোজই লুকিয়ে বাগানের লোকটাকে নিজের খাবার থেকে কিছু দিয়ে  আসছিল। লোকটাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে একটা তালগোল পাকানো উত্তর দিত। ও হয়তো আগের জীবনটা ভুলে গেছে। কেউ ওর খেয়াল রাখে না। ইস্কুল থেকে ফেরার পথে তিতলি দেখেছে পার্কের বেঞ্চে একটা লোক সারাদিন শুয়ে থাকে। বিড় বিড় করে কী বলে। এক এক সময় আকাশের দিকে হাত তুলে ভগবানকে শাসন করে। পাগল বলে লোকে ওর কাছে আসে না, দেখেও দেখে না। খাবারের দোকানের সামনে এক বুড়ি ভিক্ষে করে। খুব কম লোকেই ওর হাতে এক পয়সা দেয়, কেউ ফিরেও তাকায় না। তিতলির মনে হচ্ছিল এরাও সব লোকের চোখে অদৃশ্য হয়ে আছে। তিতলি একটা খাতায় যারা অদৃশ্য তাদের কথা লিখে রাখছিল। খাতার ওপরে ইংরিজিতে লিখেছিল ইনভিজিবল্, বাংলায় যারা দৃষ্টির অগোচরে।

এঞ্জেল রোডের বাড়িতে তিতলিদের এক মাস দেখতে দেখতে কেটে গেল। এক শনিবার সকালে গোল্ডস্মিথ এসে হাজির। এসেই বললেন, “সুখবর, সোমবার বাড়ি সারানোর কাজ শুরু হবে। সারানো, রঙ করা সবই এক সপ্তাহে শেষ করতে হবে। কাউন্সিল আমার ওপর দায়িত্ব দিয়েছে।”

তিতলির মা বললেন, “এত তাড়া কিসের? এইতো বাড়ি পরিষ্কার করে একটু গুছিয়ে বসলাম।”

গোল্ডস্মিথ বললেন, “কাউন্সিল তড়াহুড়ো করছে আরো দুটো পরিবারকে এখানে থাকতে দেওয়ার জন্যে। একটা পরিবার এসেছে সিরিয়া থেকে, অন্যটা ইথিওপিয়া। এরা সবাই রিফিউজি।”

শুনে তিতলির মা’র মুখ শুকিয়ে গেল। তিতলির বাবা বললেন, “আমিও ছোটোবেলায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে এসেছিলাম রিফিউজি হিসাবে। পূর্ব পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ।”

গোল্ডস্মিথ বোধহয় কিছু বুঝলেন না, শুধু বললেন, “আপনারা দুটো ঘর পাবেন।” তিতলির বাবা গোল্ডস্মিথকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাগানের ঘরটা সারাবেন তো?” গোল্ডস্মিথের সেই এক কথা, “ঘরটা বিপদজনক, ডেঞ্জারাস, ভেরি ডেঞ্জারাস।”

তিতলির বাবা আর থাকতে পারলেন না, “এই শহরে কত লোক শীতকালে বরফের মধ্যে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছে। ঘরটা সারিয়ে দিলে দু’একটা লোকের মাথার ওপর ছাদ জুটবে।”

এসব শুনে তিতলি অদৃশ্য লোকটার কী হবে ভাবছিল। ও বলেই ফেলল, “ওখানে একজন থাকে।”

শুনে গোল্ডস্মিথ অবাক হয়ে বললেন, “তুমি কী করে জানলে? আমিতো কোনোদিন দেখিনি।”

বাবা বললেন, “আপনি হয়তো কোনদিন ভালো করে দেখেননি।” তিতলিকে বললেন, “তোমাকে বারণ করা সত্ত্বেও তুমি নিশ্চয়ই ও ঘরে গিয়েছিলে?”

তিতলি একটু ঘুরিয়ে বলল, “আমি ও ঘরে যাওয়ার চেষ্টা করিনি। পেছনের ভাঙা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিলাম একজন বুড়ো মানুষ আবর্জনার  মধ্যে শুয়ে আছে।”

তিতলির আর কিছু বলার সাহস হয়নি। গোল্ডস্মিথ বললেন, “কেউ ও ঘরে থাকে বলে শুনিনি। চলো নিজের চোখে দেখে আসি। হয়তো কোন ভ্যাগাবন্ড, ভবঘুরে।”

তিতলি বাবা আর গোল্ডস্মিথকে নিয়ে অদৃশ্য লোকটাকে দেখতে গেল। সেদিন সকালে ও আর খাবার দিয়ে আসতে পারেনি। গোল্ডস্মিথ এসে সব গন্ডগোল করে দিল। গোল্ডস্মিথ পেছনের দরজাটায় একটু চাপ দিতেই খুলে গেল। লোকটা ভয়ে  জড়সড় হয়ে এক পাশে সরে বসল। গোল্ডস্মিথ অবাক হয়ে বললেন, “এ কে? কোথা থেকে এল?”

তিতলিকে দেখে লোকটা বলল, “ব্রেকফাস্ট?”

বাবা তিতলিকে বললেন, “রোজ সকালে খাবার দিতে যখন আজ কিছু আনলেই পারতে। তুমিতো জান লোকটা খেতে পায় না।”

গোল্ডস্মিথের কোন মায়াদয়া নেই। লোকটাকে দেখেই জেরা করতে লাগলেন, “তোমার নাম কী? এখানে কতদিন ধরে আছো? আগে কোথায় ছিলে? তোমার আত্মীয়স্বজন কেউ আছে?”

লোকটা কোনো উত্তর দিল না। আরো গুটিয়ে গেল। ওদের দিকে তাকিয়ে রইল।

তিতলিকে বাবা বললেন, “দৌড়ে বাড়ি থেকে চা আর কিছু খাবার নিয়ে এস।”

গোল্ডস্মিথকে বললেন, “বুড়ো মানুষ। মনে হচ্ছে ভীষণ ডিমেনশিয়া হয়েছে। সব ভুলে গেছেন।  ঠান্ডায় থেকে শরীরও হয়তো ভালো নেই। ডাক্তার দেখাতে হবে।”

গোল্ডস্মিথ বললেন, “একে এখানে ফেলে রাখা যাবে না। আমি কাউন্সিল অফিসে ফোন করছি।”

সব শুনে অফিসের বড়োকর্তা বললেন, “অ্যাম্বুলেন্স ডেকে লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাও। ওর নামধাম অনুসন্ধান করার জন্যে পুলিশে খবর দাও।”

গোল্ডস্মিথ চটপট যা করার করে ফেললেন। নিমেষের মধ্যে এ্যাম্বুলেন্স পুলিশ সব এসে হাজির।

অ্যাম্বুলেন্স দেখে লোকটা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে একটা পিচবোর্ডের বাক্স আঁকড়ে বসে রইল। কিছুতেই এ্যাম্বুলেন্সে উঠবে না। বার বার হাত নেড়ে বোঝাল না না যাব না। অ্যাম্বুলেন্সের লোকরা অনেক কষ্টে লোকটাকে ওদের গাড়িতে ওঠাল। যাবার সময় ওর চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল। লোকটা তিতলিকে কাছে ডেকে বাক্সটা ওর হাতে তুলে দিল। তিতলিরও খুব কষ্ট হচ্ছিল, কান্না চাপতে পারল না। বাবা তিতলিকে বললেন, “কেঁদো না, খুব শিগ্গিরি আমরা ওকে দেখতে যাব। ও সেরে উঠলে কাউন্সিল ওর ভালো ব্যবস্থা করবে।”

অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে চলে গেল।

তিতলি যত দূর দৃষ্টি যায় অ্যাম্বুলেন্সটা দেখছিল। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন মিলিয়ে গেলে পুলিশ অফিসার তিতলিকে বললেন, “তোমার সঙ্গে কথা আছে। তুমিই লোকটাকে প্রথম দেখেছিলে? কী করে দেখেছিলে বল।” 

তিতলি ওর ভাঙা ঘর দেখতে যাওয়ার অভিযান আর লোকটাকে সেখানে দেখতে পেয়ে খেতে দেওয়া সবই খুলে বলল। পুলিশ অফিসার শুনে বললেন, “তুমি খুব সাহসী মেয়ে। তোমার মায়া-মমতা দেখে আমি মুগ্ধ। তবে তুমি বাড়িতে লোকটার কথা লুকিয়ে রেখে ঠিক করোনি। তোমার বাবা জানলে আগেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন।”

তিতলির বাবাকে বললেন, “এখন আমাদের কাজ হচ্ছে লোকটির পরিচয় খুঁজে বের করা। টেলিভিশনে খবরে শুনেছেন বোধহয় এ দেশে ৯০০,০০০ লোক ডিমেনসিয়ায় ভুগছে। শুধু বয়স হয়েছে বলে ভুলে যাচ্ছে না, এ্যালজাইমার বলে একটা অসুখে ভুলে যাচ্ছে।” 

পুলিশ অফিসার তিতলির কাছে থেকে বাক্সটা দেখতে চাইলেন। বাক্সের মধ্যে কিছু জামাকাপড়, পুরোনো খবরের কাগজ আর খানকতক মলাটছেঁড়া মোটা বই। তিতলির বাবা বইগুলো উল্টেপাল্টে বললেন, “মনে হচ্ছে শিক্ষিত লোক।”

পুলিশ অফিসার বইগুলো দেখলেন, বাক্সের অন্য জিনিস ঘেঁটেঘুঁটে বললেন, “লোকটার নামধামের কোন হদিশ পেলাম না। কোন ডায়েরি বা চিঠিপত্র নেই। এঞ্জেল রোডে বাড়ি বাড়ি খোঁজ নিতে হবে লোকটাকে কেউ চেনে কিনা। খবরের কাগজেও ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে হবে।” তিতলিকে বাক্সটা ফেরত দিয়ে চলে গেলেন।  

পরের দিন ইস্কুলে যাবার পথে তিতলি দেখল এঞ্জেল রোডে ল্যাম্পপোস্টে, পার্কের রেলিংএ লোকটার ছবি দিয়ে বিজ্ঞপন, “এঁকে চিনতে পারেন? চিনলে অবিলম্বে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।”

তিতলিদের রাস্তায় যে দু’চারজন পায়ে হেঁটে চলাফেরা করে তারা বিজ্ঞাপনটা পড়েও দেখল না। তিতলির ক্লাশের ছেলেমেয়েরা বলল ওরা কোন বুড়োমানুষকে চেনে না। এক সপ্তাহ কেটে গেল। পুলিশ অফিসার ফোন করে জানালেন, “আপনাদের পাড়ায় প্রত্যেক বাড়িতে পুলিশের লোক খবর নিয়েছে। তারা পাশের বাড়ির লোককেই চেনে না। বিশাল বাগানঘেরা সব বাড়ি। কেউ কারো খবর রাখে না। তারা কেউ বুড়ো মানুষটার কথা জানে না।” খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনেও  কোন কাজ হয়নি। পুলিশ অফিসার বিরক্তির সঙ্গে বললেন, “শুধু একজন চিঠি লিখেছিলেন যে এই রকম দেখতে একজন লোককে তিনি চেনেন তবে তিনি থাকেন মেয়ের কাছে আয়ারল্যান্ডে। এ চিঠি লেখার কোন মানে হয়।”

বুড়ো মানুষটাকে কেউ চিনতে পারল না শুনে তিতলির মন খারাপ হয়ে গেল। তিতলি পিচবোর্ডের বাক্সটা খুলে দেখতে বসল যদি এমন কিছু খুঁজে পায় যা থেকে লোকটার বিষয়ে জানা যাবে। তিতলি বইগুলো আর ছেঁড়া খবরের কাগজ সব তন্নতন্ন করে খুঁজছিল। বইয়ের পাতায় মার্জিনে খুদে খুদে অক্ষরে পেন্সিলে লেখা ফুটনোট। ওর চোখে পড়ল একটা বইয়ের শেষ পাতায় ফুটনোটের পাশে একটা ইমেলের ঠিকানা dying@dundee.co.uk ও সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে দেখিয়ে বলল এই ইমেলের ঠিকানায় লিখে যদি কিছু জানা যায়। বাবা পুলিশ অফিসারকে তিতলির ইচ্ছেটা জানালেন। বললেন, আপনি এই ইমেলের ঠিকানায় ছবি দিয়ে লিখে দেখুন যাঁর ইমেল তিনি এই বৃদ্ধ লোকটিকে চেনেন কিনা।

ইমেল পাঠানোর একদিনের মধ্যেই স্কটল্যান্ড থেকে ডেভিড ইং বলে একজন উত্তর দিলেন: “গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে এই রকম দেখতে একজন প্রফেসরের কাছে পড়েছিলাম কুড়ি বছর আগে। তাঁর নাম ডোনাল ক্লাইড। আমি গ্লাসগোর পড়া শেষ করে আমেরিকায় পড়তে যাই। সেখানেই চাকরি করছিলাম। আমাদের দুজনের বিষয় ইতিহাস। তাই ইমেলে একটা যোগাযোগ ছিল। দু’বছর আগে ফিরে এসে আর যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি। তবে এত বছর পরে ছবি দেখে তাঁকে সঠিক চিনতে পারছি না। ছবির বৃদ্ধ লোকটির নাম কি?”

পুলিশ অফিসার বিরক্ত হয়ে আবার ইমেল দিলেন “নাম জানলে আপনাকে লিখব কেন?”

ডেভিড ইং লিখলেন, “বইয়ের ফুটনোটে আমার ইমেলের ঠিকানা পেয়েছেন। সেই ফুটনোট আপনাদের বৃদ্ধ লোকটির লেখা নাও হতে পারে। উনি হয়তো বইটা পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে কিনেছেন বা কারো কাছ থেকে ধার নিয়েছেন। আমি ডোনালের সঙ্গে ইমেলেই যোগাযোগ রাখতাম তাই কোথায় থাকতেন জানি না।”

পুলিশ অফিসার তিতলিদের বললেন, “আমরা ডোনাল ক্লাইডের ঠিকানা সহজেই খুঁজে বের করতে পারব।” সরকারি অফিসে ইলেকশনে যারা ভোট দিতে পারে তাদের একটা নাম-ঠিকানার লিস্ট আছে। উনি সেই লিস্টে দেখলেন ডোনাল ক্লাইডের ঠিকানা ছিল ৫ নম্বর এঞ্জেল রোড।

এখন সমস্যা হল এই বৃদ্ধ লোকটি কি ডোনাল ক্লাইড? পুলিশ অফিসার ডেভিড ইংকে অনুরোধ করলেন একবার লন্ডনে এসে দেখে যেতে। ডেভিড ইং পুলিশের আমন্ত্রণে লন্ডনে এসে বৃদ্ধ লোকটিকে হাসপাতালে দেখলেন। দেখে বললেন, “আমার প্রফেসর ডোনাল ক্লাইডের সঙ্গে খুব মিল আছে কিন্তু আমি নিশ্চিত হতে পারছি না।” তিতলির এ ব্যাপারে চিন্তার শেষ নেই। ও বলল, “ডোনাল ক্লাইডের ঠিকানা যদি ৫ নম্বর এঞ্জেল রোড হয় তাহলে আমাদের বাড়ির বন্ধ পড়ার ঘরটাও ডোনালের। ওখানেও কিছু পাওয়া যেতে  ।”

পুলিশ অফিসার বললেন, “তিতলি, তোমার দারুণ বুদ্ধি। এটা আমার মাথায় আসেনি।” যেমন বলা তেমনি কাজ। পড়ার ঘর খোলা হল। টেবিলের ড্রয়ারে ডোনালের পাসপোর্ট ও কিছু ফটো পাওয়া গেল। পুলিশের বিশেষজ্ঞরা ডোনালের পাসপোর্ট ও ফটো বৃদ্ধ লোকটির কিনা পরীক্ষা করে দেখেলেন। তারপর বললেন এই বৃদ্ধই যে ডোনাল ক্লাইড এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

পুলিশ অফিসার তিতলিকে সঙ্গে করে হাসপাতালে গেলেন। ডোনালের ফটোর সঙ্গে বৃদ্ধ লোকটার মুখ মিলে গেল। ভাঙা ঘরের বৃদ্ধ লোকটা যে ডোনাল ক্লাইড জেনে তিতলি আনন্দে হাতাতালি দিয়ে উঠল। হাসপাতালের ডাক্তার নার্স সবাই খুব খুশি। ওঁকে আর নিজের বাগানে ভাঙা ঘরের আবর্জনায় শুয়ে থাকতে হবে না। যে ডাক্তার ডোনালকে দেখছিলেন তিনি বললেন, “ডোনাল ক্লাইড বোধহয় অনেকদিন ধরেই ডিমেনশিয়ায় ভুগছিলেন যার কোন চিকিৎসা নেই। ডিমেনশিয়া হলে মানু্ষ ভুলে যেতে থাকে, নিজের দেখাশোনাও করতে পারে না। ডোনালের অসুখের প্রথম দিকে ধরা পড়লে হয়তো ওষুধ দিলে এতটা বাড়ত না তবে কোনদিন সেরে উঠতেন না। ডোনাল একা থাকতেন। মনে হয় ওঁর দেখাশোনা করার মতো ঘনিষ্ঠ কেউ ছিল না। উনি যে নিজের নাম ঠিকনা ভুলে যাচ্ছেন, সব তালগোল পাকিয়ে ফেলছেন সেটা কেউ বুঝে ওঁকে ডাক্তার দেখায়নি। শেষকালে হয়তো একদিন চাবি হারিয়ে ফেলে নিজের বাড়িতে ঢুকতে পারেননি। অনেক পাড়ায় প্রতিবেশীরা বৃদ্ধ কি অসহায় লোকদের ওপর নজর রাখে। মনে হয় এখানে সে রকম কোন প্রতিবেশী নেই।” তারপর তিতলিকে বললেন, “ভাগ্যিস, তুমি এ পাড়ায় এসেছিলে।”

পরের দিন সাংবাদিকরা খবরের কাগজে এক বৃদ্ধ অসহায় মানুষের প্রতি তিতলির মমতার কথা লিখলেন। সেই সঙ্গে ওর ছবিও ছাপা হল। তিতলির ইস্কুলের হেডটিচার সবাইকে বললেন “তিতলি আমাদের গর্ব”। সবায়ের নজর তখন তিতলির দিকে। ও আর ইস্কুলে অদৃশ্য হয়ে নেই।।

কাউন্সিল ৫ নম্বর এঞ্জেল রোডের বাড়িটা গৃহহীনদের জন্যে কিনে নেবে ঠিক করল। তিতলিকে লিখে জানাল বাড়ি বিক্রির টাকায় ডোনাল্ড ক্লাইডের জন্যে  সেরা বৃদ্ধাবাসে থাকার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে।

*গল্পের বিষয় ও চরিত্র সব কাল্পনিক

অলঙ্করণঃ ইন্দ্রশেখর

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

1 thought on “গল্প অদৃশ্য শিবানী রায়চৌধুরী শরৎ ২০২৩

  1. খুব ভালো লাগলো লেখাটি। এই মুহূর্তে অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি। একটি ছোট মেয়ের দৃষ্টিতে গল্পটি বলা হয়েছে বলে আরো তাৎপর্যপূর্ণ।

Leave a Reply