গল্প- মন ভালো করা গন্ধ-অনন্যা দাশ-শরৎ ২০২৩

 অনন্যা দাশ -এর সমস্ত লেখা একত্রে

golpomon_bhalo_kora_gondho

মাছভাজার গন্ধ পেয়েই গঙ্গার প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। আহা, কী দারুণ গন্ধ! এই না হলে বাড়ি! মাছ-ভাত গঙ্গার সবচেয়ে প্রিয় খাবার। প্রতিদিন মায়াদিদা যখন মাছ ভাজেন তখন গঙ্গার মনটা খুশিতে ভরে যায়।

এই গন্ধের টানেই তো সে মায়াদিদার বাড়িতে এসে পৌঁছেছিল। তখন কতটুকুই-বা বয়স হবে তার। তুলোর মতন ছোটো একটুকরো শরীর ছিল তখন তার। মনে পড়ে কোন এক নোংরা সিঁড়ির তলার ছেঁড়া কাগজের ওপর শুয়ে থাকা। মাকে এক ঝলক মনে পড়ে আবার পড়েও না। মা এই ছিল আর এই মিলিয়ে গেল কোথায়। গঙ্গা একাই ওই অন্ধকার সিঁড়ির তলায় পড়ে ছিল—ভয়ে সিঁটিয়ে, ঠান্ডায় জড়োসড়ো হয়ে। এমন সময় গঙ্গার নাকে ওই গন্ধটা এসে ঢুকেছিল। সে এমন মনমাতানো গন্ধ যে গঙ্গা আর স্থির থাকতে পারেনি। বেরিয়ে পড়েছিল রাস্তায়। অজানা এক গন্ধের টানে।

রাস্তায় বেরিয়ে ভীষণ ভয় করছিল তার। এদিকে সে কোনোদিন আসেনি। হাঁটতে হাঁটতে তার নরম তুলতুলে পাগুলো ছড়ে গিয়েছিল। তাও ভাগ্য ভালো হতচ্ছড়া কুকুরগুলো ওর পিছু নেয়নি। হাঁটতে হাঁটতে সেই ছোটো একতলা বাড়িটার কাছে পৌঁছেছিল সে। সামনে একচিলতে বাগান। সেই বাগান পেরিয়ে দরজার সামনে এসে যখন পৌঁছেছিল গঙ্গা তখন তার অবস্থা বেশ খারাপ। পা দিয়ে রক্ত পড়ছে আর শরীরে নড়ার ক্ষমতাটুকু নেই। মুখ দিয়ে শুধু আস্তে আস্তে ম্যাও ম্যাও করেছিল সে। খুব আস্তে ছিল সেই ডাক, কিন্তু মায়াদিদা ঠিক শুনতে পেয়েছিলেন। দরজা খুলে ওকে দেখে বলেছিলেন, “ওমা, তুই আবার কোথা থেকে এলি? আহারে, কেষ্টর জীব। মা গঙ্গা পাঠিয়ে দিয়েছেন। আয় আয়, ভিতরে আয়।”

সেই থেকে গঙ্গা মায়াদিদার বাড়িতেই থাকে। সে আর একা নয়। আর ভয় করে না তার। এখন সে জানে যে গন্ধটা তাকে দিদার বাড়িতে টেনে এনেছিল সেটা আসলে মাছভাজার গন্ধ। দিদা ওকে দুধভাত, মাছ-ভাত খাইয়ে খাইয়ে বড়ো করেছেন। গঙ্গা এখন সারাদিন দিদার পিছন পিছন ঘোরে আর সন্ধে হলে সে দিদার কোলে বসে টিভি দেখে। টিভি তো ছাই দেখে, দিদার কোলে বসে আদর খায়।

বছর ঘুরে গেছে। ঠান্ডা হাওয়াটা আবার ফিরে এসেছে। গঙ্গা বুঝতে পারে, মায়াদিদার শরীরটা ভালো নেই। খকখক করে ক’দিন ধরে কাশছেন দিদা। সেদিন তো কাশতে কাশতে দিদার হাত থেকে একটা কাচের বাটি পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। গঙ্গার চিন্তা হয় দিদাকে নিয়ে।  রাতের বেলার ঘুম থেকে উঠে পড়েন কাশতে কাশতে। গঙ্গা কী করবে বুঝতে পারে না। দিদার গা ঘেঁষে শোবার চেষ্টা করে।

পরদিন সকালে গঙ্গা উঠে দেখে দিদা বিছানাতেই শুয়ে রয়েছেন। বিছানা ছেড়ে ওঠেননি। গঙ্গা ভয় পেয়ে গেল। কী করবে সে? দিদা তো একা। সে কাকে জানাবে?

তারপর মনে হল পাশের বাড়িটাতে গেলে কেমন হয়? সেখানে একটা বাচ্চা মেয়ে থাকে গঙ্গা জানে। মেয়েটা বাগানের বেড়ার ও-পাশ থেকে পুষি মেনি বলে ওকে ডাকতে চেষ্টা করছিল। দিদা তাই শুনতে পেয়ে বলেছিলেন, “ওর নাম পুষি মেনি নয়, ওর নাম গঙ্গা। তোমার নাম কী দিদিমণি?”

“আমার নাম রিয়ানা। আমরা এখানে নতুন এসেছি। তা গঙ্গা আমার সঙ্গে খেলা করবে?”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। তুমি এসো আমার বাড়িতে। ওর সঙ্গে খেলা করে যেও। ওকে তো বাইরে বেশি বার করি না। পাড়ার কুকুরগুলো যা দুষ্টু! এখন ফুল তুলতে বেরিয়েছি তাই ও চলে এসেছে। আয় গঙ্গা, আয়।” বলতে গঙ্গা দিদার পিছন পিছন বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল।

এখন গঙ্গা ভাবল ওই রিয়ানার বাড়িতে যেতে হবে তাকে। এছাড়া আর কেউ বুঝতে পারবে না। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোবে কীভাবে? সব দরজা-জানালা তো বন্ধ শীতের জন্যে। তারপর তার মনে পড়ল, ছোটো ঘরের একটা জানালার কাচ কিছুটা ভাঙা আছে। মায়াদিদা ঠিক করাবেন করাবেন করেও ঠিক করিয়ে উঠতে পারেননি শরীর খারাপের জন্যে। সেই জানালা দিয়ে কোনোরকমে বেরোল গঙ্গা। ভাগ্যিস তার গায়ে অত লোম, তাও গাটা কিছুটা ছড়ে গেল কাচের খোঁচা লেগে।

বাগানের বেড়ার তলা দিয়ে গলে ও-পাশে গেল গঙ্গা। খুব ভয়ও লাগছে। ওরা কী বুঝতে পারবে দিদার শরীর খারাপের কথা? সে-সব ভেবে আর কী হবে? গঙ্গা ওদের দরজায় গিয়ে আঁচড় কাটতে শুরু করল।

একটু পরেই রিয়ানা এসে দরজা খুলল।—”ও মা, গঙ্গা এসেছে, দেখে যাও!”

রিয়ানার মা ওর কথা শুনে দেখতে এলেন। গঙ্গা থাবা দিয়ে রিয়ানাকে ডাকতে লাগল। ওদের বোঝাতে হবে দিদার শরীর খারাপ।

“মা, ও বার বার থাবা মারছে কেন? আর এখানে এলই-বা কী করে? দিদা তো ওকে বাড়ি থেকে একা একা বেরোতে দেন না। বলেন পাড়ার কুকুরগুলো খুব পাজি। ওর পিছনে লাগবে।”

মা বললেন, “ও হ্যাঁ, তাই তো। দেখি মাসিমাকে ফোন করে একবার।”

রিয়ানার মা মায়াদিদাকে ফোন করতে গেলেন। গঙ্গা চুপ করে বসে রইল। কেউ ফোন তুলেছে না দেখে রিয়ানার মা বললেন, “বুঝতে পেরেছি। মাসিমার শরীর খারাপ মনে হয়, তাই গঙ্গা এসেছে আমাদের বলতে। কী বুদ্ধিমান প্রাণী!”

রিয়ানার বাবা আর মা মায়াদিদার বাড়ি যাচ্ছেন দেখে গঙ্গাও পিছন পিছন গেল। এরপর শুরু হল হইচই। প্যাঁ পোঁ করে সাদা গাড়ি এল। দিদাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেল ওরা। গঙ্গার চোখে জল এসে গেল। কী করবে সে ভাবছিল, এমন সময় তাকে কে যেন ছোঁ মেরে তুলে নিল। নিয়েই একটা ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল আশেপাশের কেউ কিছু বোঝবার আগেই। গঙ্গা বুঝতে পারল সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, তাই এটা হল।

গঙ্গাকে একটা কাঠের বাক্সের মধ্যে বন্ধ করে একটা খালি বাড়িতে ফেলে রাখল বদমাশ ছেলেটা। একটা ভাঙা প্লাস্টিকের বাটিতে একটু জল দেয় আর কখনও একটুকরো রুটি বা পাঁউরুটি। তাকে নানারকমভাবে বিরক্ত করে—কাঠি দিয়ে খোঁচায়, লেজ ধরে টানে। সেটাতেই ছেলেটার আনন্দ। গঙ্গা কখনও এইরকম বদমাশ মানুষ দেখেনি। সে ভেবেছিল সব মানুষই বুঝি ভালো হয় মায়াদিদা আর রিয়ানার মতন। ছেলেটার অত্যাচারে সে কখনও চুপ করে থাকে ভয়ে; কখনও তাকে আঁচড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। না খেতে পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছিল সে।

তারপর একদিন ছেলেটা এসে গঙ্গাকে বাক্স থেকে বার করে বাইরে নিয়ে গেল। এদিকটায় কেউ আসে না গঙ্গা বুঝল। এটা একটা পরিত্যক্ত গুদোম-ঘর মতন। বাড়ির পিছনের একটা জায়গার গর্ত খোঁড়া দেখল গঙ্গা। ও মা, ছেলেটা গঙ্গাকে নিয়ে গিয়ে সেই গর্তে ফেলল! ফেলে হুড় হুড় করে ওর গলা পর্যন্ত মাটি চাপা দিয়ে দিল। গঙ্গা একেবারে নড়তে পাচ্ছিল না। শুধু ম্যাও ম্যাও করছিল প্রবল জোরে আর তাতে ছেলেটার কী হাসি!

“অ্যাই! কী হচ্ছে ওখানে? এত শব্দ হচ্ছে কেন?”

গঙ্গা অবশ হয়ে যেতে যেতে দেখল একজন পুলিশ এসেছে সেখানে। গঙ্গা পুলিশ জানে। মায়াদিদা পুলিশের কথা বলতেন ওকে। পুলিশটা ছেলেটাকে ক্যাঁক করে চেপে ধরল।—”এটা কী করেছিস! দাঁড়া তোর এবার আচ্ছা শাস্তি হবে। ছি ছি, জীবজন্তুদের নিয়ে ওইরকম করতে হয়? এটা এখন অপরাধ জানিস না?”

মাটি খুঁড়ে গঙ্গাকে বার করে দিল পুলিশের লোকটা। গঙ্গা দুর্বল শরীর নিয়েও ছুটে ওখান থেকে পালাল। যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। পথে কয়েকটা ধেড়ে কুকুর তাকে তাড়া করল। গঙ্গা একটা বাড়ির পাঁচিলে উঠে কোনোরকমে প্রাণে বাঁচল।

কিন্তু এবার কী করবে সে? সে তো শিকার করতেও শেখেনি। চুরি করে খেতেও জানে না। ক্লান্ত শরীরে গঙ্গা ধুঁকছিল প্রায়। হঠাৎ তার মনে হল সে আবার তার সেই একটা খুব পরিচিত গন্ধ পাচ্ছে। সেই খুব ছোটোবেলায় যে-গন্ধ তাকে মায়াদিদার বাড়িতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। সেই অতিপরিচিত গন্ধ টানে আবার এগিয়ে চলল গঙ্গা। চোখের সামনে সে স্পষ্ট দেখতে পেল মায়াদিদা উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে মাছ ভাজছেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে সেই প্রিয়, মনমাতানো গন্ধ।

কাছেই, না বহুদূর কে জানে। ক্লান্ত শরীর প্রায় অবশ পা নিয়ে সে যখন গন্ধটার কাছাকাছি পৌঁছল তখন অন্ধকার প্রায় হয়ে এসেছে। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল, আরে এ তো তার ভীষণ চেনা মায়াদিদার বাড়ি! বাড়িতে আলো জ্বলছে। দিদা সেরে উঠে ফিরে এসেছেন মনে হয়।

দরজায় গিয়ে ‘ম্যাও’ বলে ডাক দিল সে। সেই ডাক খুবই ক্ষীণ, কিন্তু তাও দিদা শুনতে পেলেন। দরজা খুলে বললেন, “গঙ্গা? এসেছিস? কোথায় ছিলি এতদিন? ইস্‌, কী চেহারা হয়েছে রে তোর! খুব কষ্ট পেয়েছিস, না? ওরা তো আমাকে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস কত কী বলে হাসপাতালে রেখে দিয়েছিল। রিয়ানাও খুব চিন্তায় ছিল তোকে না দেখতে পেয়ে। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি সোনা?”

গঙ্গাকে স্নান করিয়ে মাছ-ভাত খাওয়াতে খাওয়াতে দিদা বললেন, “আমি জানতাম, যেখানেই থাকিস মাছভাজার গন্ধে তুই ঠিক চলে আসবি।”

গঙ্গা দিদার কোলে বসে আদর খেতে খেতে বলল, “ম্যাও!”

ছবি-জয়ন্ত বিশ্বাস

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply