
প্রমথবাবু রাশভারী হেডস্যার হলেও যখন-তখন অন্যান্য শিক্ষক বা ছাত্রদের ওপর তিনি অহেতুক হম্বিতম্বি করেন না। ছাত্ররা তাঁকে যথেষ্ট ভয় ও শ্রদ্ধা করে এটা তিনি বেশ বুঝতে পারেন।
আনন্দময়ী ক্ষিরোদবালা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রমথ পুততুন্ডু সবে এই স্কুলে যোগ দিয়েছেন। তাঁর সহকর্মী অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও স্কুলের নন-টিচিং স্টাফ সকলেই প্রমথবাবুকে বেশ পছন্দ করেন। তিনি স্কুল চত্বর, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ ও অফিসঘরগুলি সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেখতে চান। ছেলেরা রোজ যেখানে প্রেয়ার লাইনে দাঁড়ায় সেখানে একটা কাগজের টুকরোও যাতে উড়ে না বেড়ায় সেদিকে তাঁর নজর থাকে।
প্রমথবাবু তাঁর পোশাক-আশাকের ব্যাপারেও বশ ফিটফাট। পায়ের জুতো পালিশ করা, মাথার চুল আঁচড়ানো—কোনটাতেই তাঁর খামতি থাকে না। বাড়ি থেকে তাঁর বিদ্যালয় ছয় কিলোমিটার দূরে। এতটা পথ তিনি সাইকেলে যাতায়াত করেন। সেই সাইকেলটিও থাকে ঝকঝকে তকতকে।
নবম ক্লাসের কল্লোল চৌকস ছেলে। পড়াশোনা খেলাধুলো সবেতেই সে এক নম্বর। জুলাই মাসের একটা ঘটনার পর থেকে কল্লোলকে স্কুলে প্রতিটি ছাত্র খুব ভালোভাবে চিনে গেছে। তখনও এই স্কুলে প্রমথবাবু প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে আসেননি। কিন্তু তা হলে কী হবে, স্কুলের পার্শ্ব শিক্ষক রঞ্জিতবাবুর কাছ থেকে তিনি ঘটনাটা শুনেছেন।
রঞ্জিতবাবুর বাড়ি দুরমুট গ্রামে। সেখান থেকে তিনিও সাইকেলেই স্কুলে আসেন। তাঁর গ্রাম থেকে স্কুল খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু যাওয়া আসার পথে পড়ে ছোট্ট একটা নদী। অন্যান্য সময় নদীটা শুকনোই থাকে, তবে বর্ষায় এর চেহারা পুরো পালটে যায়। তখন এটিতে মাঝে-মধ্যেই হড়কা বান দেখা যায়।
রঞ্জিতবাবু নদীর পাড়ে এসে দেখলেন প্রায় কোমর সমান জল কলকল করে বয়ে চলেছে। এখনও টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে বলে লোক পারাপার খুবই কম। দু-একজন মাথার উপর সাইকেল তুলে প্যান্ট ভিজিয়ে ও-পাড়ে চলে গেল। রঞ্জিতবাবুও এভাবে আগে কয়েকবার নদী পারাপার করেছেন। তিনি তাই ওই একই কায়দায় নদীটা পেরিয়ে যাবেন বলে সাইকেল মাথার উপরে তুলে ফেললেন। তারপর কোমর সমান জল ভেদ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললেন। ঠিক যখন নদীর মাঝামাঝি জায়গায় এসে পড়েছেন তখনই তাঁর মনে হল জলের স্রোত দ্বিগুণ হয়ে গেল। একসঙ্গে অনেকটা জল কোথা থেকে এসে তাঁকে সজোরে ধাক্কা মারল। তিনি টাল সামলাতে না পেরে সাইকেল সমেত জলে ভেসে গেলেন।
অনেকটা দেবদূতের মতো কল্লোল সেখানে হাজির হল। তারও নদী পেরিয়েই স্কুলে যাবার কথা। কিন্তু নদীর জল এতটা বেড়ে যাবে সে ভাবতেই পারেনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কল্লোল দেখল একটা লোক প্রবল জলের ধাক্কায় ভেসে চলেছে। লোকটা সাঁতারও জানে না হয়তো। তাছাড়া বানের তোড়ে সাঁতারটা তেমন কাজেও লাগবে না। কল্লোল আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর জলের ঝাপটার সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করে লোকটাকে উদ্ধার করল। ডাঙায় উঠে আসার পর দেখল তিনি তাদের স্কুলেরই বাংলা-স্যার রঞ্জিতবাবু। রঞ্জিতবাবু সে-বার প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর সাইকেলটি উদ্ধার করা যায়নি।
প্রমথবাবু এই ঘটনাটা শোনার পরই ঠিক করেছেন অ্যানুয়াল স্পোর্টসের প্রাইজ দেবার সময় তিনি কল্লোলকে একটি ‘বিশেষ সাহসিকতা’র পুরস্কার দেবেন। এতে স্কুলের ছাত্ররা আগামী দিনে অন্যের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আরও বেশি করে উৎসাহ পাবে।
প্রমথবাবুর নেতৃত্বে স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টস বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন হল। স্কুলের ব্যাক-বেঞ্চার তারাপদ গতবার দৌড় প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়েছিল। কিন্তু এবার সে কোনও ইভেন্টেই কিছু হতে পারেনি। ফলে তার দারুণ মনখারাপ। একুশে ডিসেম্বর যখন সবাই প্রধান শিক্ষকের হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে স্টেজ থেকে নেমে আসবে তখন তারাপদর কী কম কষ্ট হবে! তিনটে ইভেন্টের মধ্যে সে কোনোটাতেই কিছু হতে পারেনি, এটি কী কম দুঃখের!
***
প্রমথবাবু ফাইলপত্র গুছিয়ে আলমারি বন্ধ করে বেরোতে না বেরোতেই সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল। ডিসেম্বর মাস। এখনো কিছুটা আলো গাছগাছালির ফাঁকে দেখা যাচ্ছে। তিনি গায়ে চাদর জড়িয়ে সাইকেল নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। তাঁকে এক কিলোমিটার রাকাবের জঙ্গল পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছাতে হয়। রাকাবের জঙ্গলে আগে ঘন গাছপালা ছিল। তখন জঙ্গলে মাঝে-মধ্যে বাঘও দেখা যেত বলে তিনি শুনেছেন। তবে ছোটো ছোটো বুনো ঝোপ আর দু-একটি মহুল গাছ এখনও রাস্তার বেশ কিছুটা অঞ্চল জুড়ে রয়ে গেছে।
ছোটো ছোটো পলাশের ঝোপ শীতের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে সবে অন্ধকারে ডুব দিতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় প্রমথবাবু কালো জন্তুটিকে দেখতে পেলেন। একটা ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে চার পায়ে থপথপিয়ে সোজা রাস্তায় উঠে এল। ব্যাপারটা এতটাই দ্রুত ঘটে গেল যে প্রমথবাবু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। যখন সেটি একেবারে কাছে এসে পড়ল তখনই তিনি বুঝতে পারলেন প্রাণীটি কালো লোমে ঢাকা একটা ভল্লুক।
এই ছোট্ট জঙ্গলে ভল্লুক এল কোথা থেকে?
না, তিনি আর কোনও কিছু ভাববার সময় পেলেন না। ভল্লুকটি সামনের দু-পা উপরে তুলে তাঁকে আক্রমণ করতে এল। প্রমথবাবু সাইকেল সমেত রাস্তা থেকে নীচে গড়িয়ে পড়লেন। তাঁর বাঁ-পায়ের হাঁটু অনেকটা ছড়ে গেল। বাঁহাতের কনুইয়েও হালকা একটু ব্যথা পেলেন। ডান-পায়ের পাতাটা মচকে গেল বোধহয়।
কিন্তু ভালুকটার জারিজুরি খাটল না। প্রমথবাবু দেখলেন তাঁদের স্কুলের তারাপদ ঠিক তাঁর পেছনেই সাইকেল থামিয়ে একটা পড়ে থাকা শুকনো কাঠ হাতে তুলে নিয়েছে। তারাপদ এই রাস্তা দিয়েই স্কুল যাওয়া-আসা করে। তার গ্রাম একুঞ্জা গ্রামে। ভাগ্যিস তারাপদ এসে পড়েছিল। ভালুকটা প্রমথবাবুকে ছেড়ে দিয়ে তারাপদর উপর সবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবার। সেও কম যায় না—হাতের শুকনো লাঠিটা ফেলে দিয়ে তারাপদ ভালুকটার পিঠের লোম খামচে ধরে শুকনো পলাশ পাতার উপর গড়াগড়ি খেতে লগাল। তারপর সেইভাবেই গড়াগড়ি খেতে খেতে রাস্তা থেকে অনেকটা দূরে সরে যেতে লাগল। প্রমথবাবু তারাপদর লাঠিটা হাতে নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে তাদের অনুসরণ করতে লাগলেন। কিন্তু গেল কোথায় তারাপদ ? ভালুকটা তার কোনও ক্ষতি করল না তো? তিনি উদ্ভ্রান্ত হয়ে রাকাব জঙ্গলে ছোটাছুটি করতে লাগলেন। এই শীতের মধ্যেও তার পিঠ দিয়ে ঘাম ঝরছে।
হঠাৎ তিনি লক্ষ করলেন, একটা কুসুমগাছের পাশে ভালুকটা দু-পায়ে ভর দিয়ে তারাপদকে নতুন করে আক্রমণ করার চেষ্টা করছে। আর তারাপদ যেন ওটার সঙ্গে মুষ্টিযুদ্ধ করবে এমনভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু ভালুকটা তাকে সে সুযোগ না দিয়ে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়ল তারাপদর গায়ে। শুরু হল আবার ঝাপটাঝাপটি। ক্রমে দুজনেই প্রমথবাবুর দৃষ্টির বাইরে চলে গেল।
প্রমথবাবু এবার ভয় পেয়ে গেলেন। ছেলেটার কিছু হল না তো ? আচ্ছা ডাকাবুকো ছেলে তো! বন্যজন্তুদের সঙ্গে এভাবে কেউ পেরে ওঠে? তিনি পাগলের মতো তারাপদর খোঁজ করতে লাগলেন। জোরে জোরে ডাকতে লাগলেন তাকে।
তারপর ক্লান্ত পায়ে তারাপদ ফিরে এল। স্কুলের পোশাক চোরকাঁটা আর শুকনো ঘাস-পাতায় মাখামাখি। হাতে পায়ে নখের আঁচড়। চুল উসকোখুসকো। জামাটা ছিঁড়ে গেছে পুরোপুরি। তবে মুখে তার বিজয়ীর হাসি। তাকে দেখে হেডস্যার প্রমথবাবু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
***
স্কুলের অফিসঘরে বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত এই ভালুক-কাণ্ড আর তারাপদর সাহসিকতার গল্প চলতে লাগল। স্যাররা আজ কেউই এখনও পর্যন্ত ক্লাসরুমে যাননি।
তারাপদকে প্রমথবাবু আজ স্কুলে আসতে নিষেধ করেছেন। তার গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা রয়েছে। স্কুলের ছাত্ররা অনেকেই অফিসঘরের বাইরে থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে স্যারদের কথাবার্তা শুনছে।
চৌবেবাবু বললেন, “খুব সম্ভবত ভালুকটা দলমা পাহাড় থেকে ফরেস্টের রেঞ্জ ধরে ধরে এত দূরে চলে এসেছে। তবে ওটাকে তো আগে বনদপ্তরের হাতে তুলে দেওয়া দরকার। না হলে আরও কাকে আক্রমণ করে বসে তার তো ঠিক নেই।”
প্রমথবাবু বললেন, “বনদপ্তরকে ব্যাপারটা জানিয়ে আজকেই একটা চিঠি লিখে দিতে হবে। তবে জহরবাবু বলছিলেন ওটা নাকি সুরুলিয়া ডিয়ার পার্ক থেকে পালিয়ে আসা ভালুক। ওখান থেকে এর আগেও একটা ভালুক রাকাবের জঙ্গলে এসে পড়েছিল। তাই ভাবছি ওখানেও একবার খবর পাঠাতে হবে।”
কল্যাণবাবু এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি, শুধু শুনে যাচ্ছিলেন। এবার তিনি খবরের কাগজ থেকে মুখ সরিয়ে বললেন, “ভালুকটা যেখান থেকেই আসুক সেটা ভেবে লাভ নেই। আমাদের ভাবতে হবে তারাপদকে নিয়ে। সে এই স্কুলের গর্ব। নিজের জীবন বাজি রেখে ছেলেটা প্রমথবাবুকে বাঁচিয়েছে। শুধু প্রমথবাবুকে কেন, ও তো নিজেকেও বাঁচিয়েছে। এটা কি চাট্টিখানি কথা? বুনো জন্তুর সঙ্গে মোকাবিলা কি সহজ কাজ ? এর আগে কল্লোল রঞ্জিতবাবুকে জলের তোড়ে ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছে। এরা তো আমাদের স্কুলের গর্ব।”
কল্যাণস্যার অঙ্কের শিক্ষক। তাঁর কথা সহজে কেউ ফেলতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক কল্যাণবাবুর পরামর্শ নেন।
প্রমথবাবু বললেন, “আমি গতকাল রাত্রেই তারাপদর কথা অনেকবার ভেবেছি। ঠিক করেছি বিশেষ সাহসিকতার পুরস্কার প্রাপকের তালিকায় তাকে রাখব। এ-ব্যাপারে আপনাদের সমর্থন আশা করব।”
সকলেই প্রমথবাবুকে সমর্থন করলেন।
তারাপদ ক্লাসে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয়নি। কোনও বিষয়েই সে সর্বোচ্চ নম্বর পায়নি। স্পোর্টসের মাঠে সে কোনও ইভেন্টেই সফল হতে পারেনি। এমনকি ছাত্রদের মধ্যে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা বা বসে আঁকোতেও তার নাম উপরের তালিকায় নেই। তাই স্কুল থেকে এ-বছর সে কোনও পুরস্কারই পেত না। একান্ত বাধ্য হয়েই তারাপদ চালাকির আশ্রয় নিয়েছে। তাই আজ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সে পুরস্কার তো পেলই, উপরন্তু তার সম্বন্ধে প্রধান অতিথি ও অনুষ্ঠানের সভাপতি অনেক ভালো ভালো কথা বললেন।
প্রধান শিক্ষক প্রমথবাবু সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল সেটা আজ আরও একবার সবাইকে নতুন করে শোনালেন। কল্লোলের সাহসিকতার কথাও বললেন। ছাত্র-শিক্ষকরা তা মন দিয়ে শুনল।
পুরস্কার নেওয়ার সময় তারাপদ প্রমথবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। তারপর মাথা নীচু করে কেঁদে ফেলল। প্রমথবাবু তারাপদর চিবুকটা ধরে মাথাটা উপরে তুলে দিয়ে বললেন, “লুক এহেড মাই সন। তোমাকে দেখে সবাই অনুপ্রাণিত হোক।”
এ-কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই চারদিক থেকে চটাপট চটাপট করে হাততালি পড়ল। বন্ধুদের দিকে তারাপদ কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে নীচে নেমে এল।
***
রসিকটাঁড়ের ছৌ-নৃত্য পার্টি বেশ নাম করেছে। তাদের দলে যেসব ছেলেরা মুখোশ পরে আসর মাতিয়ে দেয় তাদের বয়স আঠারো থেকে বাইশের মধ্যে। সকলেই ছিপছিপে আর উলফাবাজিতে ভীষণভাবে পটু। আর এ কারণেই এই ছৌ-নৃত্য দলটি অনেক জায়গা থেকেই ডাক পায়।
এই দলের একটি ছেলের নাম বিশ্বনাথ। সে খুব ভালো উলফা দিতে পারে বলে তাকে বাঘ-ভালুকের মুখোশ পরে লম্ফঝম্প করতে হয়। চড়িদার নিত্যসুন্দর মাহাতো বিশুর জন্য ভালুকের এই বিশেষ মুখোশ জোগাড় করে দিয়েছে। বিশু যখন ভল্লুক সাজে তখন কেউ ভাবতেই পারবে না ওই জবড়জং পোশাক পরে ওভাবে লাফ দেওয়া সম্ভব।
তারাপদ একবার পাশের গ্রামে রসিকটাঁড় ছৌ-নৃত্য পার্টির ছৌ-নাচ দেখতে গিয়েছিল। সেখানে সারারাত ধরে ছৌ-নাচ দেখার পর সকালে বিশ্বনাথের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারাপদদের গ্রাম একুঞ্জায় বিশুর মামাবাড়ি। বিশুর মামাকে তারাপদ বেশ ভালোই চেনে। সেই বিশ্বনাথই তো সেদিন ভালুক সেজে স্যারকে ছদ্ম আক্রমণ করতে গিয়েছিল। সেও আজ এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছে।
তারাপদ যখন সাহসিকতার পুরস্কার হাতে নিয়ে নীচে নেমে এল তখনও তার বন্ধুরা তাকে সাবাশি দিচ্ছিল। তবে সে আর কোনোদিকে না তাকিয়ে একেবারে পেছনের নিমগাছটার কাছে চলে এল। বড়ো নিমগাছটার কাছে এসে তারপদ ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল।
বড়ো নিমগাছের কাছে বিশ্বনাথ তারাপদর জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। সে তারাপদর দিকে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করতে যাচ্ছিল। কিন্তু দেখল তারাপদর দু-চোখ ভেজা। সেই ভেজা চোখে তারাপদ বিহ্বলভাবে তাকিয়ে আছে। তার সম্বন্ধে এত ভালো ভালো কথা বলা হল অথচ তার চোখে মুখে কোনও আনন্দের ছাপ নেই। তারাপদর সেই সদা হাস্যময় পরিচিত মুখের বদলে এ যেন এক বিষাদমাখা মুখোশের ছবি। মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে বলে তারাপদ নিজের কাছেই ছোটো হয়ে গেছে। তাই মুখ লুকিয়ে যেন পালিয়ে বাঁচতে চাইছে।
স্টেজ থেকে তখনও কল্লোল আর তার নামে দু-একটি প্রশংসাসূচক বাক্য কানে আসছিল।
ছবি-ব্রততী দাশগুপ্ত