গল্প-লকডাউন ও নন্দচোর-মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথ-শরৎ২০২৩

মৃত্যুঞ্জয় দেবনাথের আগের গল্প–ঝোলাগুড়ের হাঁড়ি, ঝিনুকনদীর চর , ছানাভূত  মনোজের ন্যাড়া হওয়া

Your paragraph text - 1

সেই থেকে মন্দ কাজ ছেড়েছে নন্দ। সেই যবে হারু মিত্তিরের বাড়ি চুরি করতে গিয়েও করল না নন্দ; অসুস্থ হারু মিত্তিরের সেবা করল; জল-ওষুধ খাইয়ে ওকে হাঁপের টান আর জ্বরের কাঁপুনি থেকে মুক্তি দিল; তারপর সন্তুষ্ট হয়ে হারু মিত্তির তাকে তার আজীবনের সঞ্চয় যৌতুক হিসেবে দান করল, সেই থেকে। যদিও ব্যাপারটার সঙ্গে একটি ভৌতিক ব্যাপার জড়িয়ে। সে যাক গে। কিন্তু নন্দর সেবায় তো ত্রুটি ছিল না। লোকটি হারু মিত্তির হোক বা তার ভূত, যৌতুকের ধনটি তো মিছে নয়। জলজ্যান্ত। এখনও তার একটি দুটি স্যাকরার দোকানে বেচে গড়গড়িয়ে সংসার চালায় নন্দ। আপাতত মাথায় একটি প্ল্যানই ঘুরছে তার, বাড়িতে একটি মুদি দোকান খুলে বসা যায় যদি। কমলাবতী তাই বলছে। ছেলে গোপালও। নন্দর প্ল্যান, আর ক’দিনের মধ্যেই উঠোনে একটি গুমটি বানাবে ও।

মোট কথা, আনন্দেই কাটছে এখন দিন নন্দর। কাটারই কথা। বউ কমলাবতী খুশি যদি, সেও খুশি। চুরির কাজে কোনোদিনই সায় ছিল না কিনা ওর। বরাবর মুখ করেছে ওকে। গালমন্দ করেছে। মুখ গোমড়া করে থেকেছে। কিন্তু আজ চুরিদারির কারবার নেই। সংসারটিও খুশিময়।

এখন রোজ দিনই দুপুরের খাওয়া সেরে কমলাবতীর সঙ্গে কিছুক্ষণ বিছানায় গড়ায় নন্দ। খানিক নাক ডেকে ঘুমোয়। তারপর উঠে বারান্দায় বসে মনের সুখে একটি বিড়ি ফোঁকে। কমলাবতী ততক্ষণে বিছানাপত্তর গুটিয়ে ঘরদোর গোছায়। উনুনে চা বসায়। নন্দ একটি বিস্কুট আর চা খেয়ে দিঘির পাড়ে ঘুরতে বেরোয়।

দিঘির পাড়ে ঘুরতে এলেই ভান্ডারটিকুরির কথা মনে আসে নন্দর। ওর পুরোনো বসতভিটে। সেখানেও ছিল দিঘি একটি। থুড়ি, দিঘি নয়—গঙ্গা। ভাগীরথী। রোজ দুপুরে গিয়ে ডুব মারত ওইটিতে নন্দ। আবার বিকেল হলেই গিয়ে বসত তার পাড়ে। আহা! কী শীতল হাওয়া তার। টলটলে জলস্রোত। চতুর্দিকে কত কত গাছগাছালি, পাখপাখালি। অমনি সাঁৎ করে মনে আসে বড়োবাবুর কথা। ব্যাটা ভয়ংকর দারোগা! ওর জ্বালাতেই তল্পিতল্পা গোটাতে হল তাকে। তারপর এই গুপ্তিপাড়ার কুঁতিডাঙা।

এই জায়গাটিও বেশ। ছোটো শালির পাড়া। ওরাই কম পয়সায় ব্যবস্থা করে দিয়েছিল জায়গাটির। কুঁতিডাঙার সবচাইতে আরামপ্রদ জায়গা এই দিঘির পাড়। বিকেল হলে এখানে ভিড় জমে। সার সার লোক বসে থাকে এ-পাড়ে ও-পাড়ে। আর সবার হাতে একটি করে ছিপ, বড়শি। নীলদিঘি এর নাম। হরেকরকমের মাছে ভরপুর তার বুক। কোথা থেকে আসে, কেউ জানে না। কেউ বলে বন্যার জলই এর আসল উৎস। এ-পাড়া ও-পাড়ার সব পুকুরের মাছগুলি তখন এই দিঘির বুকে এসে আশ্রয় নেয়।

সন্ধ্যায় কোনও ভিড় নেই দিঘির পাড়ে। একজন দুইজন ইতিউতি ঘোরাফেরা করে। আর বসে গল্পগুজব করে। এখানে তেমন কেউ বন্ধুবান্ধব নেই নন্দর। রোজ ও একাই এসে দিঘির পাড়ে বসে অনেকক্ষণ ধরে একটি বিড়ি খায়। তারপর তারাভরা আকাশ দেখে। দিঘির জলে চাঁদের উঁকি মারা দেখে। মাছের বুদবুদি ছাড়া দেখে। ব্যাঙেদের লাফালাফি দেখে। জোনাকি পোকার আলো জ্বালানি দেখে। তারপর খুশি মনে কাঁধের গামছাটি কোমরে বেঁধে ঘরে ফেরার উদ্যোগ করে।

আজও তাই করছিল নন্দ। আপনমনে দিঘির জল, আকাশ, জোনাক-বাতি নিরীক্ষণ করছিল। অমনি কেউ একজন যেন পাশে এসে দাঁড়াল ওর। কে, তা বোঝা যাচ্ছিল না স্পষ্ট। তবে কেউ একজন। নন্দ ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কে?”

“আমি।”

“আমি কেটা?” নন্দ আবছা আঁধারে মানুষটাকে চেনার ব্যর্থ চেষ্টা করে।

“তোমাকে যে দরকার।”

“আমাকে! আপনে কেটা? কী দরকার?”

“সে বলব’খন। আগে তো আমার সঙ্গে যাওয়া চাই।”

“কোতা?”

“যেখানে বলব।”

নন্দ থতমত খায়। একটু তোতলায়ও।—”এ কে-কেমনতর কতা? আপনে কেটা, জানি না। কোতা যাম আপনের লগে?”

“গেলেই বুঝতে পারবে।”

“যতি না যাই?”

“এক্ষুনি দিঘির জলে ডুবিয়ে মারব।”

“ক-কন কী?” বসা থেকে নন্দ লাফিয়ে ওঠে। টক করে দিঘির পাড় থেকে আরও দূরে একটু সরে আসে।

“যা বলি, তাই করি আমি।”

“কিন্তুক এ অন্যায়। আমি আপনেরে চিনি নে।”

“না চিনলেও যেতে হবে। একটা কাজ আছে।”

“কী কাজ?”

“কাজ, কাজ। তার নাড়িনক্ষত্র জানার কিছু নেই।”

“আছে বইকি।” নন্দ গোঁ ধরে।

“যেমন?”

“ভালা কাজ, মন্দ কাজ।”

“তুই নন্দ চোর। তোর আবার ভালো-মন্দের খোঁজ কীসের?”

“এঁজ্ঞে ছেলাম।”

“ছিলাম মানে?”

“ছেলাম মানে, অতীত। একন আর কোনও মন্দ কামে নাই নন্দ। চুরিদারি দূরস্থ।”

“বলিস কী! এ যে ভূতের মুখে রামনাম। কিন্তু এমন মত বদলের কারণ?”

“কারণ আচে বইকি।”

“বেশ। অত কথায় কাজ নেই। তুই চুরির পথ ছেড়েছিস, ভালো কথা। এটাও ভালো কাজ।”

“ভালা কাম?”

“যোগ্য পুরস্কারও মিলবে তার জন্য।”

নন্দ হাঁ হয়ে তাকায়।—”কন কী? পুরস্কার?”

“ইয়েস। আমি কাউকে ঠকাই না।”

“তা বেশ।” নন্দ মাথা দোলায়।

“এবারে চল।”

“সে যাচ্চি। কিন্তুক আপনে কেটা, যতি কন…”

“বলা বারণ।”

“কার বারণ?”

“হুজুরের।”

“হুজুর মানে? আপনে কি ভূত? হারু মিত্তির কেস?”

“আপাতত তাই ধরে নে। অন্ধকারে কেউই মানুষ না আমরা। ভূতপ্রেত, জন্তুজানোয়ার।”

“যাহ্‌! কী কতার কী উত্তর!”

“চোপ! অনেক কথা বলেছিস। এবার চল।”

“এককান পোশ্ন ছেল।”

“কী প্রশ্ন?”

“আবার ফিরা আম ত? ঘরে বউটি রইচে। আমার গোপালটিঅ। সবারে ফালাই কোতা যাতিচি, তাও জানি না। তাই জিগাই।”

“ফিরে আসবি।”

“ককন, শুনি? কে দে যাইব মোরে?”

“সে তোর উপর নির্ভর করছে। কাজটি তাড়াতাড়ি করিস যদি, তাড়াতাড়ি ছুটি।”

“অ।” মাথা নাড়ে নন্দ।—”কিন্তুক কী কাম? আমার কম্ম তা?”

“গেলেই দেখবি।”

লোকটি কে—এখনও দেখল না নন্দ। সে হনহনিয়ে হাঁটছে, পেছনে নন্দ। একটু আস্তে হাঁটলে গমগমিয়ে উঠছে ব্যাটা। তবে ভূত নয়, এটুকু স্পষ্ট বুঝেছে নন্দ। কেননা, ভূতেদের কথায় একটা নাকি সুর থাকে। এ-লোকের তা না। শিক্ষিত মানুষের মতো পরিচ্ছন্ন, স্পষ্ট উচ্চারণ। তবে কে ও? ওকে দিয়েই-বা কী কাজ? নন্দ শিখেছেই-বা কোন কাজটি এই হতভাগ্য জীবনে, যা এখন করে দেখাতে হবে? তার আবার পুরস্কার! ভাবতে গিয়ে কিছুই বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না যেন নন্দ। একের পর এক তার উপর সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মী ভর করছেন। এই সেদিন হারু মিত্তিরের পুরস্কারটি পেয়ে ও ফুলেফেঁপে ঢোল। এখন আবার?

একটা বাংলোবাড়ির সামনে এসে লোকটি থামল। তারপর ঢাউস গেটটি খুলে ভেতরে পা বাড়িয়ে বলল, “আয়।”

আলো ঝলমল ঘরের ভেতরে গিয়ে দাঁড়াতেই চক্ষুস্থির নন্দর। ইনি ভূত না। মানুষও না। গুপ্তিপাড়া থানার বড়ো দারোগাবাবু কুশল ভরদ্বাজ।

নন্দ প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেল। তারপর বিষম খেল। এখন হিক্কা উঠছে। তা আর থামার নামগন্ধ নেই। কুশল দারোগা যত বলেন, “ওরে ভয় নেই কিছু তোর। একদম নিশ্চিন্ত থাক। একটা দরকারি কাজের জন্যেই ডেকেছি তোকে। আমি এখন দারোগা-টারোগা কিছু নই। এটা থানাও নয়। এটা আমার বাংলো। এখানে আমি একজন সাধারণ মানুষ।” বড়োবাবুর কোনও কথাতে কান নেই নন্দর। অনেক জল-টল খেয়েও বিষম থামে না। বুকের ধুকপুকানি কমে না। দু-ঠ্যাঙের কাঁপাকাঁপি রানিং।

অবশেষে কুশল দারোগাই ওকে সোফায় বসালেন। ফুল স্পিডে সিলিং ফ্যানটি চালিয়ে দিলেন। সঙ্গে এসিটিও। তারপর মিনিট কুড়ি যেতে নন্দ স্বাভাবিক। তারপরই নতমস্তক নন্দ। সে-মাথা আর তুলতে চায় না কিছুতে। সেদিন থানায় গিয়ে সকলের ব্যাগপত্তর আলমারি সাফসুফ করে ফিরেছে ব্যাটা। এখন যদি তার হিসেব চান বড়ো দারোগাবাবু? তার কী হবে? আন্দাজ করেও তাকে হাতকড়া পরাননি ঠিকই বড়োবাবু, কিন্তু বুঝেছেন সকলই নিশ্চয়ই?

প্রথমে সে-কথাই তুললেন কুশল দারোগা। হেসে বললেন, “নন্দ, সেদিন তোর চালাকির কাছে হেরে গিয়েছি বটে। আমাদের জব্বর ফাঁকি দিয়েছিস। মোতিন মহাজনের বাড়ি চুরি করতে যাবি বলেও থানায় এসে হত্যে দিলি। তারপর আমাদের অনুপস্থিতে সাফসুফ করে দিয়ে গেলি সব। সে-রাতেই সব বুঝেছি। কিন্তু বেঁচে গেলি প্রমাণের অভাবে। আমি আবার প্রমাণ ছাড়া অত্যাচার করতে রাজি নই কারও উপর। এটা আমার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তক্কে তক্কে আছি বটে। যেদিন প্রকৃতই প্রমাণসহ ধরতে পারব তোকে, সেদিন আর রক্ষা নেই। এই কুশল দারোগা তখন সত্যিই দুষ্টের দমন করে ছাড়বে।”

নন্দ কাঁচুমাচু করে তাকায়। মিনমিন করে।—”এঁজ্ঞে, ঘাট হয়েছে। আর হবে নে।”

“আচ্ছা বেশ। শুনে ভালো লাগল। একটু আগেও বললি যদিও কথাটা। মন্দ কাজে আর নেই তুই। সত্যি?”

“মাথা দোলায় নন্দ।—”হ। তাই ঠিক করনু।”

“ভালো কথা। এবার যে তোকে আরও একটি ভালো কাজ করতে হয়, বাছা।”

“কী কাম? যা কবেন, তাই করব। আপনের কতার অমান্য করবনি। জান দিতি পারি।”

“না।” হাত তোলেন কুশল দারোগা—”জান দেওয়ার দরকার নেই। আপাতত কাজটি করে দিলেই চলবে। আয়।” বলে ঘরের কোণের আলমারিটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন কুশল দারোগা। বললেন, “এটা খুলতে হবে।”

“অ্যাঁ?” নন্দ হাঁ হয়ে তাকায়।

কুশল দারোগা মাথা নাড়েন।—”ইয়েস। এটি আমার খুব দরকারি আলমারি। এটির চাবি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ যেমন করে হোক খোলা চাই। অজস্র দরকারি কাগজপত্র এর ভেতরে। কালই অফিসে নিয়ে যেতে হবে সব। দরকারে উপর মহলেও নিয়ে ছুটতে হতে পারে। তাই তোকে তলব।”

নন্দর হাঁ বোজে না।

“কী ভাবছিস? তোকে ডাকলাম কেন?”

নন্দ হ্যাঁ-না দুটো মিশিয়ে মাথা নাড়ে।

কুশল দারোগা বলতে থাকেন।—”কারণটা পরিষ্কার। করোনা ভাইরাস। দু-মাস টোটাল লকডাউন। চাবিটি হারাতে দিশেহারা হয়ে চতুর্দিকে ফোন লাগালাম। একটাই উত্তর—আভি কই লোক মজুত নেহি হ্যায়। সব দেশ ঘরপে নিকাল গেয়া। এমনকি কম্পানিগুলিতেও তালা। তবে উপায়? তারপরই তোর কথা মনে এল। এই একটি ব্যাপারে তো তুই বিশ্বকর্মা। নিখুঁত শিল্পী। ঠিক কি না?”

“ক্যান যে লজ্জা দেন, ছার।”

“ঠিক আছে। আর লজ্জাবতী লতা সেজে কাজ নেই। কাজ শুরু কর।”

“কিন্তুক…”

“আবার কিন্তু কী?”

“যন্তর যে নাই, ছার।”

“নেই?”

“উঁহু।” নন্দ মাথা নাড়ে।—”সেইদিন দিঘির জলে ফেলি দিনু।”

“যাহ্‌! ফেললি কেন? দরকারি জিনিস?”

“ওই যে কইনু, মন্দ কাজে আর নাই নন্দ।”

“তা বেশ। তবে উপায়?”

“উপায় আচে।”

“কী?”

“এককান তার চাই মাত্র। মোটা মতন। যা খুশি—টিনের, তামার।”

তিরবেগে ঘরে ঢুকেই বেরিয়ে এলেন কুশল দারোগা।—”এই নে। এতে হবে?”

নন্দ তারটি হাতে নিয়ে আলমারির ফুটোয় গুঁজে একটু নাড়াচাড়া করতেই আলমারি চিচিংফাঁক। সেদিকে চেয়ে কুশল দারোগার ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি। নন্দর পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, “জানতাম, পারবি। কী নিবি বল? পুরস্কার?”

নন্দ মাথা নাড়ে।—”কিচু না।”

“একশোটা টাকা দিই?”

নন্দ আবারও মাথা নাড়ে। একটুখানি হাসে।—”এই যে দেলেন।”

অবাক হয়ে তাকান কুশল দারোগা।—”কী?”

ফোঁস করে বড়ো নিশ্বাস ছাড়ে একটি নন্দ। বলে, “দারকাবাবুরা কত্ত রুলের বাড়ি দেছে এই পিটে। আইজ পেত্থম হাত বুলাইলেন আপনে। পুরস্কার না তা?” নন্দর চোখ ছলছল।

ছবি-ব্রততী দাশগুপ্ত

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply