কল্যাণ সেনগুপ্তের আগের গল্প বংশীধরের বিপদ, শুধু কথা, পাসওয়ার্ড, ঠাকুমা

“আরে রাখ তোর অঙ্ক। উঠে আয়। এমন জিনিষ দেখাবো সব অঙ্ক গুলিয়ে যাবে। ”বলে সুবল মামা রন্টুর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়। মামা হলেও বেশি বড় নয়। রন্টু র থেকে চার ক্লাস উঁচু। মামা দারুন ফুটবল খেলে। স্কুলের মাঠে হিরো। দারুন ভলিবল খেলে , সাঁতার কাটে। কিন্তু পড়াশুনা করে না বলে মা, দিদা দাদু একদম পছন্দ করে না। তবে মামা ডাকলে কেমন নেশার মতন চলে রন্টু। মা উঠোনের ওপারে রান্না ঘরে। মার এক নম্বর স্পাই, দিদি ও ঘরে নেই যে দৌড়ে গিয়ে মা কে বলে দেবে। চোখ চকচক করে ওঠে। এক লাফে চটি পড়ে দৌড়ে গিয়ে সুবলমামার সাইকেলের সামনের রডে বসে পড়ে রন্টু। ” কি বল, কি দেখাবে?
সুবল মামা সাইকেলে পা রেখে বলে ” তুলকালাম কান্ড হয়েছে বকুলতলায় বাবার ডিসপেনসারিতে।
পড়াশুনোর সময় এসে টানাটানি একদম মা সহ্য করে না কিন্তু সুবল মামা রণ্টুর মার মামাতো ভাই। দুটো বাড়ি পরে থাকে। মামার বাবা বঙ্কু দাদু খুব বড় ডাক্তার। কলকাতা থেকে পাশ দিয়ে এসেছে। রন্টু র পেট খারাপ, জ্বর, পেট ব্যথা এমন কি খেলতে গিয়ে পা মচকালেও দাদু ই ভরসা। বকুলতলার মোড়ে দাদুর ডিসপেনসারি। কলু পাড়া থেকে বকুলতলা পাঁচ সাত মিনিটের সাইকেল। মোড়ে র মাথায় পৌঁছেই সাইকেল থেমে যায়। বাঁদিকের কোনায় দাদুর ডিসপেনসারির সামনে বিরাট হৈ হট্টগোল। হাই, হাই। হুস, হুস, চেঁচাচ্ছে কিছু লোক। বেশ কিছু তাড়া দিচ্ছে কাউকে। ডিসপেনসারি হাঁ করে খোলা। দুর থেকে দেখে মনেহল কেউ নেই ডিসপেনসারি তে। কাছে যেতে চক্ষু স্থির। মামা দেখায় ঐ দেখ, কি কান্ড। । ডিসপেনসারি খালি। রাস্তায় সাইকেল, সাইকেল রিক্সা, লোকে হৈ চৈ চলছে। কেউ হেসে গড়িয়ে পড়ছে, কেউ বলছে কম্পাউন্ডার। কেউ বলছে সদ্য পাশ করা ডাক্তার। বলছে নতুন ডাক্তার,। অনেক কষ্টে মাথা গলিয়ে দেখে চোখ গোল গোল হয়ে যায়। ইয়া গোদা এক মুখ পোড়া হনুমান বসে দাদুর সামনের টেবিলে বসে। এদিক ওদিক চাইছে। কম্পাউন্ডার কাকু কে ত্রিসীমানায় কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কেউ কেউ কাগজের বল করে ছুড়ে দিচ্ছে। টেবিলের ওপর দাদুর প্রেসার মাপার যন্ত্র, প্রেসক্রিপশন লেখার প্যাড, গোটাকয়েক লাল নীল পেন। খবরের কাগজ। তার কিন্তু মোটেও সেদিকে নজর নেই। বকুলতলা বেশ ব্যস্ত মোড়। লোক জমে রাস্তা ছোট হয়ে ভিড় বাড়ছে। মামা বললে “হনুমান টা এল কোথা থেকে বল তো?”
আগেও দুএকবার দলে এসেছে কিন্তু একদম ভিতরে ডিসপেনসারির মধ্যে তো ঢুকে পড়েনি। বাবা বোধহয় জানে না। রুগী দেখতে গেছে। আগে গরম কালে মাঝে মাঝে দিল বেঁধে আসত। পাশের দোকান থেকে কম্পাউন্ডার সজল কাকা ছোলা এনে বাইরে ছড়িয়ে দিলে চলে যেত। কিন্তু আজ দেখে মনে হচ্ছে এই গোদা হনুমান টা একা। সঙ্গী সাথীদের দেখা যাচ্ছে না। চারিদিকে সেই মোড়ের ট্রাফিক পুলিশ টাও নেই। নাকি অবস্থা দেখে সরে পড়েছে? রাস্তার উল্টো দিকে দুলুর পানের দোকান। ভিড়ে দুলু উঠে এসে ফস করে বলে ” আরে, এইটাই তো সকালে আমার বাড়িতে আচারের বয়াম ভেঙেছে। ভীষণ বদমাইশ এটা। ভিড়ের মধ্যে রসিক একজন বললে ” কি করে চিনলি রে দুলু? আমার বাড়িতেও আসে কিন্তু আমি তো চিনতে পারি না। ” ইঙ্গিতটা দুলু ধরতে পারে। থতমত খেয়ে বলে ” অনেকটা এমনি দেখতে ছিল। ”
“সেই বল। কেউ কেউ বললে রামচন্দ্রের জ্বর হয়েছে ,ডাক্তার ডাকতে পাঠিয়েছে। তাই বসে আছে ডাক্তার বাবু কে নিয়ে যাবে সঙ্গে করে। “
এমন সময় দাদু রিক্সা থেকে এসে নামল। রন্টু দৌড়ে গেল ” দাদু, দাদু, হনুমান তোমার টেবিলে বসে আছে। কি হবে? ডাক্তার বাবু আসাতে কম্পাউন্ডার কাকু এগিয়ে আসে। আঙ্গুল তুলে দেখায় ” কি হবে ডাক্তার বাবু? সব ওষুধ বিশুধ যদি ফেলে নষ্ট করে দেয়?”
দাদু চিন্তিত মুখে বললে “এল গট গট করে টেবিলে বসে গেল? তোমরা কোথায় ছিলে?
রন্টু দেখলে কম্পাউন্ডার কাকা কিছুটা ভয় পেয়েছে। বললে” আমি ওষুধ তৈরি করেছিলাম পিছন ঘুরে পর্দার ওপারে। রুগীর বসেছিল বেঞ্চিতে। লোক বলছে ও বেটা ডিসপেনসারি র সামনে এসে দাড়িয়ে কিছুক্ষন এদিক ওদিক চেয়ে এক লাফে টেবিলে। ওই দেখে সব রুগী “বাবারে, মারে, বাঁচাও বাঁচাও বলে দৌড়ে বাইরে। “
দাদু খুব চিন্তিত মুখে বললে ” দাড়াও, দেখতে দাও। ওকে বিরক্ত করো না। এদিকওদিক অনেক গাছপালা আছে। ওরা মাঝে মাঝেই আসে এমন তো কোনদিন হয়নি। “
কাকা বললে ” ডাক্তারবাবু আপনি একদম কাছে যাবেন না। ওরা কাছে গেলে অনেক সময় আঁচড়ে কামড়ে দেয়। “
দাদু বিরক্ত হয়ে সবাই কে বললে ” কোন জীব জন্তু নিজে থেকে মানুষ কে বিরক্ত করে না। ওরা মানুষ কে ভয় পায়। তোমরা সরে দাড়াও দেখি। ওর মনেহয় কোন অসুবিধা হয়েছে। ”সবাই জায়গা করে দিল। রন্টু দাদুর হাত চেপে ধরে কাঁদ কাঁদ গলায় বলে, “দাদু আমার ভীষণ ভয় করছে। তুমি যেও না সামনে। ”
দাদু কম্পাউন্ডার কাকা কে বললে “ভিড় টা সরাও দেখি। ও আরো ভয় পাবে মানুষ বেশি দেখলে। ” লোকজন দূরে সরে গেল। এবার কাকা আর সুবল মামা দাদু কে বোঝাতে গেল “তুমি একদম যাবে না। আমরা পুলিশে খবর দিয়েছি। ওরা এসে যা করার করবে। “
দাদু সবাইকে আশ্বস্ত করলে। “আমার কিছু হবে না। আগে দেখি কি ব্যাপার। ”বলে নর্দমার ওপর পাতা তক্তা দিয়ে দাদু দোকানে ঢুকলে। বাইরে লোকেদের দম বন্ধ। কি হয় কি হয়। হনুমান বাবাজি চুপ। দাদুর দিকে চেয়ে চোখ পিট পিট করছে। দাদু ওর দিকে চেয়ে পা টিপে টিপে ওর পাশ দিয়ে পিছনে গিয়ে দাড়ালে। সে ওই খানেই বসে মুখ ঘুরিয়ে দেখছে দাদু কে। দাদু নীচু হয়ে ড্রয়ার থেকে টর্চ বার করে ফেললে। সবাই চিৎকার করছে ” নেমে। আসুন ডাক্তার বাবু। আপনার কিছু হয়ে গেলে আমরা মুশকিল পড়ে যাব। ” দাদুর মুখে হাসি ফুটে ওঠলে। রাস্তায় দাঁড়ানো কাকুকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলে তুলো কোথায়? এরপর পিছনে ওষুধ তৈরি করার জায়গায় গিয়ে তুলোতে ওষুধ লাগিয়ে খুব সাবধানে প্রথমে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। ও এক বার চাইলে আর কিছু বললে না। ওমা! হনুমান কিছুই বলছে না। চুপ করে বসে সামনে একবার দাদু কে একবার সামনে দেখতে লাগল। কাকু এবার সাহস পেয়ে বললে ” কি হয়েছে ডাক্তার বাবু?”
দাদু দেখালেন পিঠে বড় ঘা, মাংস বেরিয়ে গেছে। দু’দুবার ওষুধ লাগানো তুলো ঘা এর জায়গায় লাগিয়ে দেবার পর একটু বসে হুপ শব্দ করে এক লাফে বাইরে এসে বসলে। সবাই হাততালি দিলে। কেউ সাহস পেয়ে বললে, “আয় আয় তু, তু। সে কোন কথা শুনলে না। তড়াক করে এক লাফে সামনের কাঁঠাল গাছে উঠে পড়ল।
এই বার সবাই উঠে এসে হামলে পড়লে। কি হল ডাক্তার বাবু আপনাকে কিছু বললে না? কামড়ালো না? হাচড়ালো না? আপনি যখন ওষুধ দিলেন ও মানুষের মত বসে নিল। ওকে আপনি চেনেন?
দাদু হেসে ফেললো ” আজ থেকে ও আমার নতুন রুগী। তারপর বললে ” আমার মনে হয় ছিল ওর কিছু একটা অসুবিধা আছে তাই এসেছে। কাকু বললে ” ডাক্তার বাবু , ও নিশ্চই দেখেছে বা খেয়াল করেছে যে আপনার কাছে রুগী আসে চিকিৎসা করতে। তাই নিজের ঘা সারাতে এসেছে। ঘা টা পিঠে,ও নিজে হাত পায় না।
পাশের দোকানের রায় কাকু বললে ” এই শুরু হল দোকানে হামলা। “
যত রুগী সারাদিন এল সবাই একবার করে জিজ্ঞাসা করে ” কি হয়েছিল ডাক্তার বাবু?ও কি করে জানলো যে আপনি ওষুধ দিতে পারেন? দাদু বললে ” আরে ওরাতো মানুষের ই আগের অবস্থা। সব বোঝে সব জানে। ও গাছে বসেই খেয়াল করেছে। ঘা টা অনেকটা গভীর হয়ে গেছে। বেচারা খুব কষ্ট পাচ্ছে। ” কেউ কেউ বললে ” হনুমান ভগবানের সমগোত্র। বাড়ি দুপুর বেলা রন্টু ভালো করে শুনলে। হনুমান টা নাকি ওষুধ লাগানোর সময় একটু কেঁপে কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু কিছুই বলেনি। বিরাট লেজ, কালো কুচকুচে মুখ। বেশ বড়সড় চেহারায়।
পরের দিন আবার ওই সময় সে আবার হাজির। তখন প্রচুর রুগী বসে ভিতরের বেঞ্চে। সামনের বেঞ্চে। দু চারজন ভয়ে উঠে দাঁড়ায়। হনুমান টা নর্দমার ওপর পাতা কাঠের তক্তা ওপর বসে। দাদু দেখে সবাইকে বললে ‘ একটু উঠে সরে দাড়াও। ওকে ছেড়ে দেই তারপর নিশ্চিন্তে বস। কেউ বাইরে এসে বারান্দায় দাড়ালে ,কেউ পিছনে কম্পাউন্ডার বাবুর ঘরে ঢুকে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। সবাই সরে গেলে দাদু ডাকলে আঙ্গুল তুলে ” আয়, আয়। কাম সিট “বলে টেবিল টা দেখালেন। সে এক লাগে এসে বসলে। বসে চারিদিকের রুগীদের দেখতে লাগল চোখ পিটপিট করে। দাদু আগের দিনের মত ঘা এর জায়গাটা পরিষ্কার করে মলম লাগিয়ে দিলে। চুপটি করে রইল যতক্ষণ দাদু মলম লাগানো শেষ না করে। দাদু আলতো করে পিঠে হাত বুলিয়ে বললে এবার যাও। আবার কাল। দাদুর মুখের দিকে সে কিছুক্ষন পিটপিট করে চেয়ে থেকে এক লাফে বেড়িয়ে গেল। লোকজন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। দুয়েকজন বললে ” ডাক্তার বাবু এই হনুমান রোজ এলে কিন্তু রোগীরা ভোট আর আসবে না। দাদু আশ্বস্ত করলে ” মনে হয় না রোজ আসবে।
পরপর তিন দিন সে এলে। তারপর দুদিন তার পাত্তা নেই। কম্পাউন্ড দার কাকুহাঁফ ছেড়ে বাঁচল। রুগীরাও নিশ্চিন্ত হল।
এর তিনচার দিনবাদে দাদু একদিন দুপুরে চেম্বার থেকে ফিরলেন হাতে একটা পেয়ারা গাছের ডাল সঙ্গে কয়েকটি পাতা আর দুটো তিনটে ছোট বড় পেয়ারা। টেবিলের ওপর রেখে দিদিমা কে বললে ” এই দেখো আমার শ্রেষ্ঠ রুগী দেখার ফিজ। ”
সন্টু , সুবল মামা ,দিদা সবাই অবাক। এটা আবার কি ? কে এমন রসিকতা করলে?
খাবার টেবিলে দাদু ভাঙলে ” আজ সেই হনুমান টা আবার এসেছিল।
“এ্যাঁ, আবার এসেছিল? তাহলে রোগীরা তো পালাবে” দিদা আঁতকে ওঠে। এত মহা বদমাইশ হনুমান।
দাদু হাসলে “যখন চেম্বার বন্ধ করছি। তখন সবাই চলে গেছে। ওর হাতে এটা ছিল। নিচেই দাড়িয়েছিল ,মুখের দিকে চেয়ে এটা টেবিলের ওপর রাখল। কিছুক্ষন আমার আর সজল দুজনে দুজনার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। আমাদের দিকে বার কয়েক তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বেড়িয়ে সামনের কাঁঠাল গাছে উঠে গেল। এমন ঘটনা আমার জীবনে প্রথম।
আমি সজল কে দিয়ে দিয়েছিলাম ডাল টা। সজল বললে ” ডাক্তার বাবু, রুগীর কাছ থেকে এমন ফিস বারে বারে আসে না। আপনি বাড়িই নিয়ে যান। দিদা ও বলল” “সত্যি? এত ভাবা যায় না। এমন টা শুনিনি আগে। ভালই করেছ এনে। আমি ঠাকুর কে দিয়ে তারপর সবাইকে দেব। ”
দাদু একটু পরে বললে ” বুঝতে পেরেছি। আমাকে অনেক গরীব রুগী রা ফিস না দিতে পেরে বাড়ির গাছের ফলমূল এনে দেয়। মনেহয় ও সেটা খেয়াল করেছে। এটাই নেহাত দাদু বলল বলে নাহলে রন্টু এরকম প্রতিদান বিশ্বাসই করত না।
রুগী ভয় পেতে পারে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে। মাঝে মাঝে আসা শুরু করলে কখনও খালি হাতে কখনও বুনো ফুল, বা পেয়ারা। একদিন রন্টুর দাদু নিয়ে এল আঁসফল। দিদা দেখে অবাক এই গাছ তো বকুলতলার কাছাকাছি নেই কোথাও। দাদু ও কিছুটা অবাক। কথা থেকে এল? শেষে উকিল পাড়ায় এক রুগী দেখতে গিয়ে সেই গাছ দেখে দাদু সেই বাড়ির মালিক কেই জিজ্ঞাসা করে ফেললে ” এই গাছ কোথা থেকে এল? উত্তরে জানা গেলে দুর কোথা থেকে এনে বাড়ির বউ লাগিয়েছে।
দিদা বললে শুনে ” দেখেছ, কত দূর থেকে মনে করে এই ফল নিয়ে এসেছে। রন্টু মামার বাড়ি গেলেই মাঝে মাঝে খাবার টেবিলের ওপর রাখা এসব দেখেছে।
মাঝে মাঝে রিক্সায় সেই হনু কে দেখা যেত। দাদুর পায়ের সামনে বসা। দাদু পছন্দ করত না বলে রুগী থাকলে চেম্বার এ আসত না। কি করে বুঝত ওই জানে। দাদু রিক্সা করে যাচ্ছে। পায়ের কাছে সেই হনু বসে আছে। দাদু মাথায় মাঝে মাঝে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে এটা অনেকেই দেখেছে। দাদুর বন্ধুরা মানা করেছে অনেক। যা হয়ে গেছে গেছে। ওদের নখের আঁচড় লাগল পেকে যায়। ওরা যখন তখন বাচ্চাদের তুলে নিয়ে গিয়ে ভয় দেখায়, ওরা ঘরে ঢুকে সব খাবার তুলে নিয়ে যায় ,ঘর তছনছ করে দেয়। দিদিমা ও বলেছে কিন্তু দাদু কিছুই শোনে নি। দাদুর সঙ্গে ওর একটা বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল। দাদু যখন ডিসপেনসারি বন্ধ করে বাড়ি ফিরত তখন মাঝে মাঝেই আসত নেমে। আরো সঙ্গী সাথী ছিল তারা নামত না গাছেই থাকত। শুধু সামনে এসে বসত। দাদু মাথায় একটি হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে যেত।
একবার দাদুর রিক্সায় হাকিম পাড়ায় গেছে। দাদু রুগী দেখে ফিরে রিক্সায় উঠতে গিয়ে দেখে প্রচুর ভিড় রিক্সা ঘিরে। হনু কে কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে না। দাদু যেতেই লোকজন ঘিরে ধরল। এমন জীব সঙ্গে নিয়ে ঘোরা নিয়ে লোকজন হৈ চই লাগিয়ে দিলে, আপত্তি তুললে। জানা গেল দাদু রুগী দেখতে চাইলে যাবার পর কিছু ছেলেপিলে হনু কে ঢিল ছোড়ে। প্রথম ও গাছে উঠে গেছিল। কিন্তু ওরা ক্রমাগত ঢিল মারাতে এসে নেমে এসে একজন কে জামা ছিঁড়ে দেয়। দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে যায়। তারপর পাড়ার লোকজন শুনে বেড়িয়ে আসে। পাড়া তে নেতা গোছের মানুষ জন আছে। বাচ্চা দের কিছু হয় নি ভাগ্য ক্রমে। দাদু অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করলে। বাচ্চারা ঢিল ছুরেছিল তাই হনু নিজেকে বাঁচাতে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিল। কেউ শুনতেই চাইল না। যদি কিছু করে দিত? তখন? তারপর বুঝলে যে এটা অনেকদিনের ক্ষোভ। দাদু ডাক্তার, তাকেও হাতে রাখতে হয় আবার হনু যদি আসে ? যদি আঁচড়ে কামড়ে দেয়? বকুলতলা র ব্যবসায়ী ও অন্য কিছু গোষ্ঠীর মানুষ এসে বোঝালে দাদুর পসার নাহোক কিন্তু ওনাদের বিক্রি বার্তা কমে যাচ্ছে। এটা চলতে পারে না। মাঝে মাঝেই ডিসপেনসারি তে শহরের নেতা স্থানীয় মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেল। কিছু না করা স্বত্বেও হনুমানের নির্বাসন দণ্ড হয়ে উঠল।
এরপর দাদুর চেম্বার এ থানা থেকে লোকজন এসে বলে ” ডাক্তার বাবু , আপনার কাছে যে হনুমান টি আসে ওকে চিড়িয়া খানা য় দিয়ে দিন। মাঝে মাঝে আপনি গিয়ে দেখে আসতে পারবেন। হয়ত আপনার খারাপ লাগবে কিন্তু অন্য ব্যবসায়ীদের কথাও তো ভাবতে হবে। শুনে খুব গম্ভীর হয়ে গেল দাদু। বললে আমি ভেবে দেখি। সুবল মামা হনুকে বন্দী করার সংবাদ রন্টু কে দিল। রন্টু র মনেহয়েছিল মানুষ ভয়ে পেয়ে আত্ম রক্ষ্যা করতে পারে আর হনুমান সামান্য প্রাণী সেটা পারে না? তার জন্যে নির্বাসন প্রাপ্য?
পড়া থাকুক, পরীক্ষা থাকুক দুদিন বাদে বাদে সুবল মামা সকালে ঠিক হানা দেবে। পড়ার অছিলায় মার হাতের লুচি আর চিনি খাবেই। রন্টু র সেদিন স্কুল ছুটি। মামা বললে এসে “শুখনার জঙ্গল যাবি? বাবা বলেছে হনু কে ওখানে ছেড়ে আসতে। ”শুনে রন্টু র মুখ শুকিয়ে গেল,”কেন ? কি হল? কি করেছে হনু?”
“শহরের মান্যগণ্য লোক পুলিশ চাইছে ওকে চিড়িয়াখানায় দিয়ে দিতে। বাবা চাইছে না। বলেছে এটা আমার দ্বারা হবে না। ওরা লোকজন এনে ধরে নিয়ে যাবে হনু কে। “
“কী করে ধরবে? ওকে ধরা কি এতই সহজ?”
রন্টু র মধ্যে একটা বিষণ্ণ বিপন্নতা হাহাকার করে উঠল। চিড়িয়া খানার বন্দী জীবন। ও কি দোষ করেছে?
মামা বললে “বাবা বলছে এটা সাংঘাতিক অমানবিক কাজ হবে। সে আমাকে ভালোবাসে আর আমি তাকে এই ভাবে নির্বাসন দেব?তাই পুরোটা যাবে না। আমি আর তুই যাবো শুকনা। ”
পরদিন দাদু, মামা রন্টু একটা গাড়ি নিল। দাদু ডিসপেনসারি র সামনে দাড়িয়ে ” আয় আয় করে ডাকলে। দুবার ডাকতেই চলে এল। দাদু আঙ্গুল দিয়ে দেখালে,সে গুটগুট করে উঠে পড়লে। রন্টু ভাবলে ওকি বিশ্বাসে যাচ্ছে? মানুষ এমন পারে নিজের স্বার্থে? দাদু কিছুটা গিয়ে শহরের শেষে আচমকা নেমে গেল। দাদু একটাও কথা বলেনি গাড়িতে।
রন্টু আর মামা সামনে। হনুটা পিছনে গ্রিলের খাঁচায়।
হনুটাও চুপচাপ। চারিদিক দেখতে দেখতে যাচ্ছে। ও জানে না ওকে শহর ছাড়িয়ে জঙ্গলে ছেড়ে আসতে যাওয়া হচ্ছে। জলপাইগুড়ি ছাড়ার পরই সুবল মামা আর রন্টুর মনেহল যদি ও যেতে না চায় তাহলে কি হবে?
শুকনা পৌঁছানোর পর ফাঁকা জায়গায় রাখা হল ভ্যান। পিছনের দরজা খুলে রন্টু আর মামা একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল।
প্রথমে সে বসেই ছিল। এরপর আস্তে ধীরে নামল। নামার পর একবারও চারিদিকে তাকাল না। খুব ধীরে চার পেয়ে হেঁটে এসে জঙ্গলের মধ্যে চলে গেল। কত কিছু ভেবে এসেছিল রন্টু কিন্তু কিছুই লাগল না। যেন জানত ওকে জঙ্গলে বিসর্জন দিতেই নিয়ে এসেছে। রন্টু ভেবেছিল একবার অন্তত পিছন ফিরে তাকাবে শেষ বারের মত। অভিমানে একবারও পিছন ফিরে তাকাল নি। কোনো কিচির মিচির ও করেনি।
মামা রন্টু পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। যদি ফিরে আসে সে। সে আসেনি। ফিরেও তাকায় নি। জঙ্গলের নিস্তব্ধতা যেন ওদের উপহাস করছে। বেশীক্ষন আর দাড়াতে পারেনি নিজের কাছে খুব ছোট লাগছিল।
জলপাইগুড়ি ফেরা অবধি একটা কথাও দুজনে বলেনি। শুধু ঘরে ঢুকবার আগে মামা বললে ” কি বলব জানিনা। ও বোধহয় বুঝেছিল কিছু। গতকাল অনেকগুলো পাকা কলা বাবার ডিসপেনসারি তে নিয়ে এসেছিল। কলা ওরা নিজেরা এত ভালবাসে। মামা আর কথাটা শেষ করতে পারলে না। গলা ধরে এল।
ফিরে আসার পর মামাবাড়িতে সজন হারানোর ব্যথায় দাদু চুপ। শুধু একবার বললে ” এই ভালো হল। মায়া বাড়ানো এই বয়সে ঠিক নয়। চিড়িয়া খানা ওর জন্যে সঠিক জায়গা নয়। আমার খুব কষ্ট হত ওকে চিড়িয়া খানায় দিতে। নাহলে ও আসতেই থাকত আমার কাছে। লোকে ভয় পেত।
দুদিন ডিসপেনসারি বন্ধ রইল। দাদু যায়নি বকুলতলা। বাড়িতেই রুগী দেখেছে। এরপর আর কখনো কোনো হনুমান চিকিৎসা করতে দাদুর ওখানে আসেনি। হয়তো ওরা আর মানুষে বিশ্বাস রাখতে পারেনি!