
এই নিয়ে তিনবার হল। দুবারের বেলায় তো আর একটু হলেই শেষ হয়ে গিয়েছিল আর কি। সবে পিছনের পায়ে ভর দিয়ে লাফ দিয়েছে কি দেয়নি, একটা খালি ট্রাক এমন পাগলার মত এসে পড়ল যে সে যদি ঠিক সময়ে উল্টোদিকে পাঁই করে ঘুরতে না পারত তাহলেই হয়ে যেত দফারফা। যেমনটা তার সেই ভাইটা, যাকে সবাই কেলো বলে ডাকত, তার হয়েছিল। বেচারা মুখ দিয়ে একটু আওয়াজ করার সময়ও পায়নি। আর কেলোর কথা না হয় ছেড়ে দেওয়া গেল, তার নিজেরও তো সেই যে গেল বছর বিষ্টির সময় কি কান্ডটাই না হয়েছিল। একটা ট্রেকার না কী যেন বলে, তাতে বাইরে অনেক লোক ঝুলছিল, তাদেরই একজনের হাঁটুটা এসে তার মাথায় এমন ঠোকা দিল যে সাত-আটদিন মাথার ঝনঝনানি যায়নি। আর ডানচোখটা ফুলে যা পিঁচুটি গড়াচ্ছিল- অনেকদিন ভাল করে দেখতেই পেত না। তারপর থেকে ও খুব সাবধান হয়ে গেছে। ভাল করে দুটো দিক দেখে বুঝে তারপর সট করে ওপারে। অবশ্য দরকার পড়লে তবেই ওপারে যায়। নইলে ওপারে আর কী কাজ! থাকে তো এপারেই।
সবদিন না হলেও প্রায়দিনই এটা- সেটা জুটেও যায়। রবিবার হলে তো কথাই নেই। এদিকটায় যে কটা বাড়ি আছে তারা বড়লোক নয়। খাবার ফেলে না। তবে ঝড়তিপড়তি কিছু ফেলতেই হয়। একটা বাড়ি অবশ্য আছে, সে বাড়ির মেয়েটা দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরে চুক চুক করে ডাক দেয়। খেয়াল করে দেখেছে ফি রবিবার সে একটা আস্ত মাংসের টুকরো তার জন্য নিয়ে আসবেই। কিন্তু ও বাড়িতে যেতে তার ভয় করে। একটা গাঁট্টাগোঁট্টা ছেলে- ওই মেয়েটার ভাই-ই বোধহয়, তাকে দেখলেই একটা লাঠি নিয়ে এমন তাড়া করে যে একেকদিন পাঁইপাঁই করে পালিয়ে আসতে হয়।
আজ দুপুরে একটা রুটি আর খানিকটা টক টক গন্ধের খিচুড়ি পেয়েছিল একটা বাড়ির পিছনে দিকটায়। তারপর খানিকক্ষন এদিকে ওদিকে ঘোরাঘুরি করে একটা গাছের ছায়ায় তোফা ঘুম দিয়ে কিছুক্ষণ আগে এসে বসেছিল রাস্তার ধারে। এইটা তার একটা বিশেষ শখ। রোজ রাস্তার ধারে একবার না বসলে মনে হয় দিনটাই বেকার গেল। সাঁইসাঁই করে গাড়িগুলো পেরোয় আর তার মনে হয় সে যদি ওইরকম ছুটতে পারত তা হলে ওই যে বেশ খানিক দূরে রাতের বেলায় আলো ঝলমল করে কী একটা জায়গায়, ওখানটাতে রোজ একবার ঘুরে আসতে পারত। ওখানে বোধহয় সবাই বড়লোক। আর বড়লোকরা তো খুব খাবার নষ্ট করে। তাহলে একবার চক্কর দিয়ে এলেই সারাদিনের মত আর ঝামেলা থাকে না। আবার মাঝেমাঝে মনে হয় এই বেশ আছি। চেনা জায়গা, মানুষগুলোও মুখচেনা। ওই গাঁট্টাগোঁট্টা ছেলেটা ছাড়া আর কেউ তাকে হ্যাটাও করে না। পেটভরে না হলেও একটু পরিশ্রম করলে মোটামুটি বেঁচে থাকার মত জুটে যায়।
আজকেও এসে বসেছিল তেমনভাবে যেভাবে বসলে নিজেকে একটা কেউকেটা মনে হয়। পিছনের পায়ের উপর বসে, সামনের ঠ্যাংদুটো সোজা খাড়া করে বসলে চারদিকটা বেশ ভাল দেখাও যায়। তাছড়া ওইভাবে বসে মুখটা আকাশের দিকে তুলে দিলে, মানে কেলোও ওভাবে বসে উ-উ-উ করে যখন ডাক ছাড়ত তখন দেখেছে তাই বুঝতে পারে যে তখন সামনের থেকে দেখলে বেশ একটা মন্দির মন্দির লাগে। পা দুটো যেন মন্দিরের সামনের দিককার দুটো থাম আর নাকটা তখন মন্দিরের চূড়ো হয়ে যায়। কানদুটো নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিলে যেন পদ্মফুলের পাপড়ি মনে হয়।
হুশ করে একটা গাড়ি পেরিয়ে গেল। আর তাকে যখন গাড়িটা পার করেছ তখন ধপ করে একটা শব্দ। মুখটা নামাতেই দেখতে পেয়েছে। ওই তো একটা কাগজের বাক্স। গায়ে হলুদ তেল তেল ছোপ। আর দেখা যাচ্ছে না। হুশ হাশ করে একটার পর একটা গাড়ি। তারই মাঝে নাকটা সামনের দিকে এগিয়ে জোরে শ্বাস নিতেই…ওহ,সেই গন্ধটা। সেই যে কীসব মশলা দেওয়া আর ঘি মাখানো সরু চালের ভাত আর তার সঙ্গে মাংসের বড় টুকরো, একবার কাদের বাড়িতে যেন বিয়েতে আস্তাকুড় ঘেঁটে খেয়েছিল। হ্যাঁ,সেই গন্ধটাই। ব্যাস, সে প্রস্তুত। শব্দেই বোঝা গেছে যে বাক্সটা খালি নয়। এখন রাস্তাটা পার হতে পারলেই…
প্রথমবার পেরোনোর জন্য শরীরটা একটু টানটান করে আপেক্ষা করল বাঁদিক থেকে আসা ট্রাকটার জন্য। ট্রাকটা পেরোতেই সে এগিয়েছে কি এগোয়নি হঠাৎ পিলে চমকানো একটা আওয়াজ। ওদিকে থেকে একটা বাস মাতালের মত টলতে টলতে খানিক্টা এগিয়ে থেমে গেল। টায়ার না কী বলে সেটা ফেটে গেছে। ও তো আঁতকে উঠে এক ঝটকায় কয়েকহাত পিছিয়ে এল। তারপর আবার আপেক্ষা। গাড়ি যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, শেষ আর হয়না। আবার একটু ফাঁকা পেয়ে রাস্তায় প্রায় উঠে পড়েছে, তখনই গেল গেল করে একটা প্রচন্ড গোলমাল। কীসের গোলমাল বুঝতে না বুঝতেই বাঁদিক থেকে আসা খালি ট্রাকটা বেসামাল হয়ে রাস্তা ছেড়ে নেমে পড়ে তার দিকে তীরের গতিতে এগিয়ে এল। ঠিক সময়ে উল্টো দিকে ভল্ট না মারতে পারলে…উঃ, খুব জোর বেঁচে গেল। বুকের ধড়ফড়ানি সামলে বসে রইল কখন রাস্তা আবার একটু ফাঁকা হয়। একবার মনে হোল কাজ নেই ওপারে গিয়ে। কিন্তু পেটে খিদে তো আছেই, তাছাড়া সেই দারুন গন্ধওয়ালা খাবারের প্যাকেটটা পড়ে আছে বেওয়ারিশ। কেউ যদি সন্ধান পেয়ে যায় তাহলেই তার বুক ফাটবে ওই টায়ারের মতন। পরেরবারে সে খুব সাবধানে চারদিক লক্ষ রাখছে। ওই যে গাড়িটা তার পিছনে একটা বাস। আবার দুটো গাড়ি তারপর একটা ট্রাক। আর ডানদিকে একটা সেই ট্রেকার, তারপর একটা বাস, আর আনেকটা পিছনে একটা গাড়ি আসছে। সে বুঝতে পারছে বাঁদিকের সবকটা পেরোতে পেরোতে ডানদিকের ট্রেকার আর বাসটা পেরিয়ে যাবে। পিছনের গাড়িটা বেশ দূরে। ওটা আসার আগেই সে ওপারে যেতে পারবে।
ও ডানদিকে মুখ ফিরিয়ে গাড়িটার দিকে লক্ষ্য স্থির রেখেছে। বাসটা পেরোতেই- গাড়িটা তখনও খানিকটা দূরে- একলাফ দিয়েছে। উল্টোদিক থেকে কখন যে একটা মোটর সাইকেল তীরের গতিতে আসছিল, ও খেয়ালই করেনি। লেজের ডগা ছুঁয়ে মোটর সাইকেলটা বেরিয়ে গেল। ভয় সামলাতে একটু সময় বয়ে গেল। তারপরেই ও ছুট লাগালো সেই বাক্সটার দিকে। কিন্তু একি! কোথা থেকে একটা ময়লা ছেঁড়া ফ্রক পরা মেয়ে বাক্সটার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। ও লাফ দিতে গিয়েও যেন একটু থমকে গেল। ততক্ষণে মেয়েটাও ওকে দেখেছে। কী করবে বুঝতে না পেরে ও মেয়েটার দিকে মুখ ঘুরিয়ে একটা আলতো ঘেউ করল। ভয় পেয়ে মেয়েটা দু পা পিছিয়ে এল ওর চোখে চোখ রেখে। এখন বাক্সটার দিকে কারও নজর নেই। দুজনে দুজনকে দেখেছে সন্দেহের চছোখে। খানিক পড়ে ও চোখ নামিয়ে মাটির গন্ধ শুঁকে একচক্কর কেটে বাক্সটার ওইপারে চলে গেল। এখন বাক্সটার দিকে দুজনের চোখ। মেয়েটা এক পা এগোতেই ও আবার সেই আলতো ঘেউ করল। মেয়েটা তখন কাঁধ থেকে ঝোলাটা নামিয়ে এদিক ওদিক চাইছে। বোধহয় একটা লাঠি বা ঢিলের খোঁজ করেছে যার কিছুই সে দেখতে পাচ্ছে না। আবার কিছুক্ষন দুজনের দিকে। ও কী ভাবল, সামনের পা দুটো এগিয়ে সমস্ত শরীর টানটান করে আকাশের দিকে মুখ তুলে কুঁ-ই-ই করে একটা ডাক ছাড়ল। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই পিছনের পা গুটিয়ে বসে পড়ল। আরও কিছুক্ষন সময় লাগল মেয়েটার। তারপর সে-ও হাঁটু মুড়ে বসে বাক্সটা কাছে টেনে নিল। নিজের ঝোলা থেকে একটা কাগজের টুকরো বার করে সেই বাক্সে যা ছিল তার অর্ধেক কাগজে ঢেলে ওর দিকে এগিয়ে ডাকল, আয়! ও উঠে আস্তে আস্তে এগিয়ে মেয়েটার পাশে বসে লেজ নাড়াতে লাগল। মেয়েটা ওর দিকে খাবারটা এগিয়ে দিয়ে বলল, নে খা। ওর মুখটা খুশিতে ভরে গেল। দুজনের খাওয়া শেষ হলে মেয়েটা কাঁধের ঝোলাটা তুলে যেদিক থেকে এসেছিল সেইদিকে হাঁটতে লাগল। ও কিছুক্ষন তার পিছন পিছন গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর অনেক চেষ্টায় আবার ফিরে এল এইপারে।
সেইদিন থেকে দেখা যায় ও রোজ নিজের জীবন বাজি রেখে রাস্তার ওইপারে যায়। খানিকক্ষন এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে আকাশের দিকে মুখটা তুলে কুঁ-ই-ই-ই-ই করে ডাক ছাড়ে। তারপর সেদিন মেয়েটার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাকিয়েই থাকে। তখন তার দু’টি চোখ মনকেমন-করা মায়ায় জড়িয়ে যায়। একসময় আবারও অনেক চেষ্টার পর ধীর পায়ে ফিরে যায় তার ঠিকানাবিহীন ঘরের দিকে।
ছবিঃ দীপংকর