গল্প-আজব-অদিতি ভট্টাচার্য-পুরোনো জয়ঢাক৫০-শরৎ ২০১৫

galpoajob1

রাত দশটা বাজে। মলয়বাবু বাড়ির সামনে উদ্বিগ্ন হয়ে পায়াচারি করছেন, দরজার কাছে ওনার স্ত্রী দাঁড়িয়ে। তাঁর মুখেও চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। ব্যাপার দেখে আশেপাশের বাড়ি থেকে কয়েকজন বেরিয়ে এলেন কী হয়েছে জানতে। ঘনশ্যামবাবুও এলেন। যদিও তাঁর বাড়ি মলয়বাবুর বাড়ির খুব কাছে নয়, কিন্তু তাও কি করে যেন জানতে পেরেছেন। রাস্তা দিয়ে দু একজন চেনা পরিচিত যারা যাচ্ছিল তারাও দাঁড়িয়ে পড়েছে। এখন মোটামুটি একটা জটলাই হয়ে গেছে বাড়িটার সামনে।

ব্যাপারটা হল, মলয়বাবুর ছেলে পিকলু এখনও বাড়ি ফেরে নি। পিকলু কলকাতায় কলেজে পড়ে, বাড়ি থেকেই যাতায়াত করে। সপ্তাহে তিন দিন আবার তার কম্পিউটার ক্লাশ থাকে। আজও ছিল। সাধারণত কম্পিউটার ক্লাস করে আটটার মধ্যেই বাড়ি ঢুকে যায়। কিন্তু আজ দশটা বাজে অথচ পিকলুর পাত্তাই নেই, মোবাইলটাও বন্ধ। বাবা মার চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। দিনকাল ভালো নয়।

কী হতে পারে সবাই সেই আলোচনাই করছেন। কেউ কেউ সান্ত্বনাও দিচ্ছেন, “এত ভাবছেন কেন মশাই? কোনো কারণে দে্রি হচ্ছে, ঠিক এসে যাবে। ”

ঘনশ্যামবাবু এতক্ষণ সব চুপচাপ শুনছিলেন, এবার বললেন, “আপনার ছেলেকে তো দেখি সব সময় কানে দুখানা তার গুঁজে গান শুনতে শুনতে যাচ্ছে। আর ফেরেও তো ওই মিলের পাশের গলিটা দিয়ে, শর্টকাট হবে বলে। ও রাস্তাটা তো ভালো নয়। এ ক’দিনে ক’টা ছিনতাই হল বলুন তো? নির্ঘাত পিকলুও ওদের পাল্লায় পড়েছে। ওর টাকাপয়সা, জিনিসপত্র কেড়ে নিয়ে ওকে ওখানেই মেরে ফেলে রেখে গেছে। সবাই মিলে ওখানেই যাই চলুন। তাড়াতাড়ি গেলে হয়তো সর্বনাশটা আটকান যাবে। ”

এই পর্যন্ত শুনেই পিকলুর মা “ওরে পিকলু রে” বলে আর্তনাদ করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। সবাই ওনাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। জল নিয়ে আয়, পাখা নিয়ে আয়, হাওয়া কর – সে এক মহা হট্টগোল শুরু হল।

“আপনি তো মশাই আচ্ছা লোক! এরকম করে কেউ বলে! যা বললেন তাইই হয়েছে পিকলুর, আপনি নিশ্চিত? কিছু একটা বললেই হল?” একজন বেশ রেগে গিয়েই বললেন ঘনশ্যামবাবুকে।

কিন্তু ঘনশ্যামবাবুর কোনো হেলদোল নেই। উলটে তিনি বেশ জোরের সঙ্গে বললেন, “কেন ভুলটা কী বলেছি? আর অসম্ভব, অস্বাভাবিকও কিছুই বলি নি। এরকম তো কতই হচ্ছে! খবরের কাগজে পড়েন না রোজ? পরে যাতে কেউ আমাকে না বলে, ‘আপনার যদি মনেই হয়েছিল তবে আগে কেন বলেন নি ঘনশ্যামবাবু? তাহলে হয়তো ছেলেটাকে বাঁচান যেত। ’ তাই আগেই বলে দিলাম। সাবধান থাকাই ভালো। আর ভয়েরই যদি কিছু নেই তাহলে মলয়বাবু এত অস্থিরই বা হচ্ছেন কেন?”

সবাই বুঝল ঘনশ্যামবাবুকে কিছু বলা বৃথা। আসলে ঘনশ্যামবাবু এরকমই। কোনো কিছু না ভেবেচিন্তে দুমদাম কথা বলাটাই ওনার স্বভাব।

এর মধ্যে হঠাৎ দেখা গেল পিকলু হনহন করে হেঁটে আসছে। জটলার মধ্যে “এসে গেছে, এসে গেছে, ওই তো আসছে” এরকম একটা রব উঠল। পিকলুও বাড়ির সামনে এত লোকজন দেখে অবাক। জানা গেল আজ কম্পিউটার ক্লাস শেষ হতেই দেরি হয়েছে, তারপর রাস্তায় এত জ্যাম ছিল যে স্টেশনে পৌঁছতেই ঘাম ছুটে গেছে। আর মোবাইল ফোন অফ কেন? ব্যাটারির চার্জ নেই বলে। চার্জও এমন মোক্ষম সময়েই ফুরোয়!

 “মোবাইলটা কি গান শোনার জন্যে না দরকারের সময় ফোন করার জন্যে? আমরা এদিকে চিন্তা ভাবনায় পাগল হয়ে যাচ্ছি, পাঁচজনে পাঁচ রকম কথা বলছে আর তুমি ফোন বন্ধ করে বসে আছ!” পিকলুর বাবা প্রায় তেড়ে এলেন।

সবাই তাঁকে সামলাল।

 “ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন। হতেই পারে এরকম। গান তো আজকালকার সব ছেলেমেয়েই সব সময়েই শুনছে,” এইসব বলেটলে দুজনকে বাড়ির মধ্যে ঢোকাল।

ফেরার পথে সবাই বলাবলি করল, পিকলুটা ঠিক সময়ে ফিরে এসে বাঁচিয়েছে। নাহলে ঘনশ্যামবাবু আরো কত কী যে বলতেন, কত কী যে করতেন তার ঠিক ঠিকানা নেই। কয়েকজনকে নিয়ে হয়তো মিলের পাশের গলিতেই চলে যেতেন। এর আগেও ওঁর কথা শুনে ঝামেলায় পড়তে হয়েছে পাড়ার সকলকে।

এই তো মাস কয়েক আগের ঘটনা। সন্ধ্যের আড্ডায় অমলেশবাবু বললেন, “নিখিলবাবুর বাড়ি সকাল থেকে বন্ধ দেখছি। হঠাৎ কোথায় চলে গেলেন? কালও সকালে দেখা হল, বলেন নি তো কিছু। ”

ঘনশ্যামবাবু একটু ভেবে বললেন, “আজ কত তারিখ বলুন তো?”

 “আজ? আজ তো সাত তারিখ, এপ্রিল মাসের। ”

“ও এইবার বুঝেছি নিখিলবাবু কোথায় গেছেন,” ঘনশ্যামবাবু খুব খুশি, “প্রভাতবার্তা প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা করেছিল জানেন? নিখিলবাবু তাতে একটা লেখা পাঠিয়েছিলেন। আমাকে বললেন, ‘অনেক খেটেখুটে লিখলাম ঘনশ্যামবাবু। আশা করছি একটা প্রাইজ অন্তত পাব। ’ আজ সাত তারিখ মানে ওদের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। নিখিলবাবু নিশ্চয়ই প্রাইজ আনতে গেছেন। কলকাতায় ওনার মেয়ে থাকে, সকাল থেকেই তাই গেছেন, একেবারে অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরবেন। ”

সবাই তো অবাক। নিখিলবাবু প্রভাতবার্তার প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় পুরষ্কার পেয়েছেন? এতো দারুণ খবর! অবশ্য নিখিলবাবু নাকি এককালে লিখতেন টিখতেন।

ঘনশ্যামবাবু বলেই চলেছেন, “অথচ আমাদের হাল দেখুন। কেউ কারুর খবরই রাখি না। আমরা ভুলেই গেছি যে গুণের কদর করতে হয়, গুণীকে মান দিতে হয়। নিখিলবাবু না জানি কী ভাবছেন। ”

সবাই একমত, ঠিক খুব ভুল হয়ে গেছে। তবে এখনও দেরি হয় নি, ভুল সংশোধনের সময়ও আছে। ঠিক হল কাল সকালে সবাই মিলে নিখিলবাবুর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানাবেন।

সেই মতো সবাই মিলে ফুলের মালা, পুষ্পস্তবক ইত্যাদি নিয়ে সাত সকালেই হাজির নিখিলবাবুর বাড়িতে।

নিখিলবাবু দরজা খুলতেই, শোভনবাবু যিনি পাড়ার অনুষ্ঠানে অ্যাঙ্করিং করেন তিনি দুবার গলা খাঁকারি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে উদাত্ত গলায় বলতে শুরু করলেন, “আমাদের পাড়ার বিশিষ্ট সাহিত্যিক শ্রী নিখিলরঞ্জন সেনকে আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন। আপনার এই সাফল্য আমাদের শহরের প্রত্যেক বাসিন্দার কাছে এক বিরাট গর্বের ব্যাপার,’” বলে যেই মালাটা পরাতে গেছেন অমনি নিখিলবাবু একেবারে খিঁচিয়ে উঠলেন, “সাত সকালে ইয়ারকি মারতে এসেছেন? বলি বয়সটা কত হল? এই বয়সে এসব ফাজলামি?”

সবাই হতভম্ব। একজন ঘনশ্যামবাবুকে দেখিয়ে বললেন, “উনি যে বললেন আপনি বলেছেন প্রভাতবার্তার…………”

“কী বলেছি আমি? বলেছি ঢাকঢোল পিটিয়ে একবারও যে আমি প্রভাতবার্তার প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছি? বলেছি? কি ঘনশ্যামবাবু বলুন, বলেছি কি?”

“আহা আপনি চটছেন কেন? আমি তো ভালো ভেবেই বলেছি। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মানে তো পুরষ্কার পাওয়ারও সম্ভবনা থাকে, তাই না?” বললেন ঘনশ্যামবাবু।

“মজা পেয়েছেন, না?” নিখিলবাবু বলতে গেলে প্রায় তেড়েই এলেন।

সবাই কোনো রকম সামলালেন।

শোভনবাবু আমতা আমতা করে বললেন, “না মানে কাল আপনার বাড়িও বন্ধ ছিল। আবার কালই তো ওদের পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানও ছিল তাই আমরা ভেবেছি……….”

“তাই আপনারা ভাবলেন সাত সকালে এসে ফাজলামি করি। ননসেন্স!” নিখিলবাবু বাস্তবিক খুব রেগে গেছেন, “কাল আমার দাদার হঠাৎ শরীর খারাপের খবর পেয়ে দৌড়েছিলাম। কত রাতে বাড়ি ফিরেছি জানেন? তার মধ্যে সকালবেলাই আপনাদের এই উৎপাত! যান বলছি এখান থেকে,” মুখের ওপরই দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন নিখিলবাবু।

এরপর থেকে ঘনশ্যামবাবুর কথা শুনে কেউ আর কিছু করে না। তাতে অবশ্য ঘনশ্যামবাবুর বিশেষ কিছুই এসে যায় না। তিনি তাঁর মতোই আছেন, একটুও পালটান নি।

ঘনশ্যামবাবুর এই স্বভাব নাকি বরাবরের। তখন সবে বছর তিনেক হল ওনার বিয়ে হয়েছে। একদিন দুপুরেই তড়িঘড়ি অফিস থেকে বাড়ি চলে এলেন। এসেই স্ত্রীকে তাগাদা, “শিগগির তৈ্রি হয়ে নাও, এক্ষুণি বেরোতে হবে। ”

ওনার স্ত্রী তো অবাক। কী হল হঠাৎ! কি না, অফিসে নাকি ঘনশ্যামবাবুর কাছে ফোন করেছিলেন ওনার স্ত্রীর ছোটো বোন বুল্টি।

“ফোনটা কেটে গেল। ভালো করে কিছু বুঝতে পারলাম না, ঘ্যাসঘ্যাস করে কি একটা আওয়াজ হচ্ছিল। বুল্টির গলাটা যেন কি রকম শোনাচ্ছিল আর খালি আমাদের আসতে বলছিল। তোমার বাবা তো ক’দিন আগেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন টাইফয়েড হয়ে। আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা খারাপ খবর। যাক গে এখন ওসব ভাবার সময় নেই। তুমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। তাড়াতাড়ি গেলে তবু শেষ দেখাটা দেখতে পাবে। ”

মোবাইল ফোন তো দূরের কথা, তখন ঘরে ঘরে ল্যান্ডলাইনও ছিল না। কাজেই আর ফোন টোন কিছু করা হল না। ঘনশ্যামবাবুর স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতেই তৈরি হলেন, কাঁদতে কাঁদতেই সারা রাস্তা গেলেন। শ্বশুরবাড়ি পৌঁছবার আগে ঘনশ্যামবাবু কিছু সাদা ফুলও কিনে নিলেন যদি পরে আর সময় না পাওয়া যায় এই ভেবে।

পৌঁছে জানা গেল বুল্টি খুব ভালোভাবে বি এ পাশ করেছে এই খবরটা জানাবার জন্যে ফোন করেছিল। আসতে বলাও এই জন্যেই, ভালো রেজাল্ট করার উপলক্ষ্যে দিদি জামাইবাবুকে খাওয়ানো। জামাইবাবু কী বুঝেছেন শুনে আর দিদির অবস্থা দেখে বুল্টি কিছুক্ষণ হাঁ হয়ে রইল, তারপর হেসে গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু বুল্টির বাবা নিজের মৃতদেহের জন্যে জামাই-এর আনা ফুল দেখে বিলক্ষণ চটলেন। সেদিন আর কথাই বলেন নি তিনি ঘনশ্যামবাবুর সঙ্গে।

এই হচ্ছেন ঘনশ্যামবাবু। বরাবর এক রকম। ওনার পরিবারের লোকজনও ওনাকে বেশ এড়িয়ে চলে, চট করে ওনার কথা বিশ্বাস করে না।

নিখিলবাবুর সঙ্গে ওই বিচ্ছিরি ব্যাপারটা হয়ে যাবার পর থেকে সবাই ভেতরে ভেতরে রেগেই আছে ঘনশ্যামবাবুর ওপরে। নিখিলবাবু তো আর কারুর সঙ্গে আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কথাই বলেন না। কিরকম যেন একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। সবাই ভাবে কী করে একবার ঘনশ্যামবাবুকে জব্দ করা যায়, অন্তত একবার বোঝান দরকার যে এরকম দুমদাম কথা বললে বা কাজ করলে অন্যদের কিরকম লাগে। পাড়ার ছেলেবুড়ো এ ব্যাপারে একমত। সবাই কোনো না কোনো সময় ঘনশ্যামবাবুর এই আজব কথাবার্তা বা কাজকর্মের সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু কীভাবে?

এইসব ভাবনা চিন্তার মধ্যেই একদিন খবর পাওয়া গেল যে ঘনশ্যামবাবুকে নাকি লটারির টিকিট কিনতে দেখা গেছে। কৃপণ বলে ঘনশ্যামবাবুর অল্প বিস্তর বদনাম বরাবরই আছে। এই পুজোয় চাঁদা কম দেওয়া বা বিজয়ার পরে একটা রসগোল্লায় কাজ সারা – এই রকম আর কি। এই খবরটা পাওয়া মাত্রই সবাই উৎফুল্ল হয়ে উঠল। প্ল্যানও তৈরি হয়ে গেল।

সেদিন সন্ধ্যেয় আড্ডায় ঘনশ্যামবাবু আসা মাত্রই একজন বললেন, “কি ঘনশ্যামবাবু, শুনলাম আপনি লটারির টিকিট কিনেছেন। তা টিকিট কাটা মানে তো প্রাইজ পাওয়ারও চান্স আছে। আমাদের কিন্তু খাওয়াতে হবে। না না ওই দুটো বিস্কুট আর একটা রসগোল্লায় চলবে না। আমরা দুপুরে পাত পেড়ে খাব। ”

ঘনশ্যামবাবু তো হাঁ। ওনার লটারির টিকিট কেনার কথা এরা জানল কী করে?

শোভনবাবু বললেন, “কি টিকিট কিনেছেন, তার ড্র কবে – সবই আমরা জানি। আসছে শনিবার দুপুরে আমরা সবাই যাচ্ছি আপনার বাড়িতে। এবার আর ছাড়ছি না। লটারি পাবেন আর ভুরিভোজ হবে না তাই কখনো হয়? এই যে মেনু আর ক’জন খাবো তাও লেখা আছে। এই নিন, এটা রাখুন,” শোভনবাবু কাগজটা ঘনশ্যামবাবুর পকেটেই ঢুকিয়ে দিলেন একেবারে।

এই প্রথম ঘনশ্যামবাবু বলার মতো জুতসই কিছু পেলেন না। কিন্তু মনে মনে বেশ চটলেন। আর দাঁড়ালেন না ওখানে, হনহন করে চলে গেলেন। সবাই খুশি, ভাবল এতেই এই অবস্থা, তাহলে সামনের শনিবার যখন সবাই মিলে যাব তখন কী হবে? সবাই ঠিক করে নিয়েছেন যে ভর দুপুরে গিয়ে একেবারে উপস্থিত হব, না খেয়ে নড়ব না। সে ঘনশ্যামবাবু লটারি পান আর নাই পান!

সবাই খুব একচোট হাসলেন।

কিন্তু এত পরিকল্পনা সত্ত্বেও সেই শনিবার যে কখন পেরিয়ে গেল কারুরই খেয়াল রইল না। একে তো নিম্নচাপের জন্যে দুদিন ধরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি চলছিল, তারপর শনিবারই ভারতের মরণ বাঁচন ওয়ান ডে ম্যাচও ছিল। সে ম্যাচও এমন জমেছিল শুরু থেকেই যে কেউ টিভির সামনে থেকে নড়তেই পারছিল না।

পরেরদিন রবিবার। সবাই মোড়ের মিষ্টির দোকানের সামনে সেই খেলার আলোচনাতেই যখন ব্যস্ত, ঠিক তখনই সেখানে বীরদর্পে ঘনশ্যামবাবুর প্রবেশ। হাতে বেশ ক’টা খবরের কাগজ। একটা নির্দিষ্ট পাতা বার করে সবার হাতে হাতে ধরিয়ে বললেন, “দেখুন দেখুন আপনাদের পাড়ার, শহরের সুনাম কিভাবে বাড়ালাম। ”

সবাই তো অবাক। বলে কি এ! খবরের কাগজে নজর দিয়ে তো চক্ষুস্থির! শুধু খবরই নয়, ছবিও আছে। ঘনশ্যামবাবুর। খবরে প্রকাশ শ্রী ঘনশ্যাম দাস কবিরাজ গতকাল তাঁর মার মৃত্যুদিবস উপলক্ষ্যে নিকটবর্তী একটি আবাসিক বিদ্যালয়ের সকল ছাত্রকে এলাহি ভোজন করিয়েছেন। এই আবাসিক বিদ্যালয়টিতে মূলত অনাথ এবং দুঃস্থ ছেলেরাই পড়াশোনা করে। ঘনশ্যামবাবু সম্প্রতি একটি লটারিতে কিছু অর্থ পুরষ্কার পেয়েছেন। অন্য কিছু করার আগে তিনি এই দুঃস্থ ছাত্রদের ভুরিভোজন করিয়েছেন। ঘনশ্যামবাবুর এই দরদী মনের পরিচয় পেয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মুগ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি।

“মানে আপনি সত্যিই লটারি পেয়েছেন?” নিখিলবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

“হ্যাঁ পেয়েছি তো। একেবারে ফার্স্ট প্রাইজ পাইনি ঠিকই, কিন্তু পেয়েছি। আপনারা তো কেউ কালকে এলেনই না! আমি কিন্তু আপনাদের ফরমাশ মতোই সব ব্যবস্থা করেছিলাম। ভাবলাম একবার মুখ ফুটে খেতে চেয়েছেন, কাউকেই নিরাশ করব না, তারপর কিছু টাকাও তো পেয়ে গেলাম। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন কেউ এলেন না, তখন বুঝলাম নির্ঘাত ভুলে মেরে দিয়েছেন সবাই! কিন্তু এত খাবার তো আর ফেলে দেওয়া যায় না, তাই সব ভ্যানে চাপিয়ে নিয়ে গেলাম স্কুলে। তখন আবার বৃষ্টিও শুরু হয়েছে, তার মধ্যেই গেলাম। ওদেরও দুপুরের খাওয়া হয়ে গেছিল, কিন্তু ওরা সব রেখে দিল রাতের জন্যে। আমার ছেলের বন্ধু কাজ করে প্রভাতবার্তায়। তাকে বলে খবরটা ছাপানোরও ব্যবস্থা করে ফেললাম। ভালো করি নি?”

কে আর কী বলবে? কারুর মুখেই তখন আর কথা জোগাচ্ছে না। এরকমও হয়!

শুধু ঘনশ্যামবাবুর বহু দিনের প্রতিবেশী এক ভদ্রলোক বললেন, “কিন্তু ঘনশ্যামবাবু আপনার মা তো আগস্ট মাসে মারা যান নি। আমার খুব ভালো মনে আছে, উনি আপনার এই বাড়িতেই মারা গেছিলেন শীতকালে। খুব শীত পড়েছিল সেবার। ”

ঘনশ্যামবাবু ওনার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বললেন, “মার মৃত্যুদিন কবে সেটা বড়ো কথা নয়। মা যে মারা গেছেন সেটা তো সত্যি। আর আমার উদ্দেশ্য কত ভালো, কত মহৎ সেটা দেখুন। দিনক্ষণ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?”

এই অকাট্য যুক্তির সামনে কেউই কিছু বলতে পারল না। তাছাড়া এত দুঃখে কি আর বলা যায়! দুঃখ তো কত কারণে। এক তো নিজেদের ভুলে যাওয়ার জন্যেই এরকম একটা ভোজ মিস হয়ে গেল, দুই ঘনশ্যামবাবুকে তো জব্দ করা গেলই না, উলটে তিনিই বিখ্যাত হয়ে গেলেন!

ছবি- মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে

Leave a Reply