
এবার অয়নদার জন্মদিনে সারাদিন ধরে খুব আনন্দ করেছিল পুচন। সকালে বেলুন ফোলানো থেকে শুরু করে রঙিন কাগজ কেটে-কেটে শিকল তৈরি করেছে দুজনে। অয়নদার দাদুর সঙ্গে অয়নদা আর পুচন গিয়ে বাজার থেকে ফুল কিনে এনেছে।
কাকিমা মানে অয়নদার মা ফুলদানি এনে টেবিলে বসিয়ে দিয়ে বলেছেন, “পুচন, তুই এতে ফুল সাজিয়ে ফ্যাল তো। ”
অয়ন তক্ষুনি এক গোছা গোলাপ দিয়ে সুন্দর করে ফুলদানি সাজিয়ে দিয়েছে। দেখে কাকিমা বলেছেন, “বাঃ, খুব সুন্দর হয়েছে রে। ”
সন্ধ্যেবেলা বসার ঘরের যেখানটায় অয়নের জন্মদিন হবে, সেখানে একটা টেবিল রাখা হয়েছে। তার উপর কাকিমা সাদা নকশা করা কাপড় পেতে দিয়েছেন। সারা দুপুর ধরে অয়নদার সঙ্গে পুচন রং পেনসিল দিয়ে যত গাছপালা, ঘরবাড়ি, নদী আর নৌকোর ছবি এঁকেছিল, সব দুজনে আঠা দিয়ে কাপড়টার উপর বসিয়েছে অয়ন আর পুচন।
পুচন অয়নদাকে বলেছে, “জানো অয়নদা, এই ছবিগুলোর মাঝখানে তোমার জন্মদিনের কেকটা রাখা হবে। আর তুমি এমনি করে কেকটা কাটবে ছুরি দিয়ে। ” বলে পুচন তার ডানহাতের আঙুল দিয়ে কেক কাটার ভঙ্গি করে দেখিয়েছে। সেই দেখে অয়ন তো হেসে একপাক নেচে নিয়েছে।
পুচন সবে ক্লাস ফোরে উঠেছে। আর অয়ন সিক্স। অয়নদের বাড়িতে কিছু আনন্দ-উৎসব হলে পুচন চলে আসে। পুচন অয়নদের রান্নামাসির ছেলে। অয়নের মা যখন বলেন, রাধারানি, কাল সকাল থেকে পুচনকে নিয়ে আসবে। ও কাল সারাদিন আমাদের বাড়িতে থাকবে, তখন রাধারানি দু হাত নেড়ে বলে, “না গো বউদি, পুচনের আসার দরকার নেই। তোমাদের বাড়িতে যখন যা কিছু হয়, পুচন তো থাকেই। এবার আর এসে কাজ নেই। ”
অয়নের মা বলেন, “তোমাকে অত ওস্তাদি করতে হবে না রাধারানি। আমি যেন সকালবেলা তোমার সঙ্গে পুচনকে দেখতে পাই। ”
পুচন আসবে শুনলে সবচেয়ে খুশি হয় অয়ন। পুচন আসলে অয়নের একটা বন্ধু হয়ে উঠেছে।
এই তো সেদিন অয়নের জন্মদিনে যখন অয়নকে কাকিমা সন্ধ্যেবেলা নতুন জামা-প্যান্ট পরিয়ে সাজিয়ে দিলেন, পুচন দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল। বেশ মানিয়েছে অয়নদাকে। মনে-মনে বলছিল, আর মানাবে না-ই বা কেন? এ পাড়ায় অয়নদার মতো অমন ভালো ছেলে আর একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে কি?
অয়নকে সাজানো হয়ে গেলে কাকিমা হাতের ইশারায় পুচনকে ঘরে ডেকে তাকেও নতুন জামা-প্যান্ট পরিয়ে দিলেন।
সেই দেখে তো রান্নামাসির সে কী রাগ। বলেছে, “বউদি, এসব আবার করলে কেন? এই জন্যে বলি, পুচনকে কোন উৎসবের দিন তোমাদের বাড়ি নিয়ে আসব না। ”
তারপরে রাতে খাওয়ার শেষে পুচন যখন মা’র সাথে বাড়ি আসবে বলে রেডি, অয়ন ছুট্টে গিয়ে ওর উপহারের টেবিল থেকে একটা রঙের বাক্স এনে পুচনকে দিয়ে বলেছিল, “এটা দিয়ে ভাল ভাল ছবি আঁকবি। আমি আর তুই এবার ‘খেয়ালখুশি’ ক্লাবের বসে আঁকো থেকে পুরষ্কার জিতে আনবই, দেখিস। ”
খুশি-খুশি মুখে পুচন ঘাড় নেড়ে সায় দিয়েছিল অয়নের কথায়।
কিন্তু আজ ক’দিন হল, অয়নদার জন্যে ভীষণ মন খারাপ পুচনের। তার না স্কুল যেতে মন চাইছে, না কিছু খেতে ইচ্ছে করছে বাড়িতে। যেদিন মার মুখে শুনেছে, অয়নদার কী নাকি কঠিন অসুখ হয়েছে। অনেক রক্ত দিতে হবে।
সেদিন থেকে নাকি অয়নদার স্কুল যাওয়াও বন্ধ হয়েছে। মাঠে খেলতে যাওয়া ডাক্তারের বারণ। অনেক কিছু খাওয়াতেও নাকি নিষেধ হয়েছে অয়নদার।
মা যখন অয়নদাদের বাড়ি থেকে কাজ সেরে ফিরে আসে, পুচন অনেক আশা নিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এসেই মা হয়তো বলবে, জানিস তো পুচন, অয়নের অসুখ-টসুখ সবই নাকি ভুল খবর ছিল। ডাক্তারি পরীক্ষায় কিছুই ধরা পড়েনি।
না, মার মুখ থেকে ওরকম কোন কথাই শুনতে পায় না পুচন। সেদিন রাতে শুতে যাওয়ার সময় পুচন মাকে বলল, “মা কাল সকালে আমি তোমার সঙ্গে যাব অয়নদাকে দেখতে। ”
বাবা বলল, “তা যাস’খন। অয়ন ছেলেটা বড়ো ভাল রে! কেন যে অমন অসুখ করল?”
বাবা প্রতিদিন সকালে উঠেই দূরের ইঁট ভাটায় কাজ করতে যায়। বাসে করে যেতে হয়। ফেরে রাত আটটা-ন’টায়। বাবা সকালে কাজে বেরিয়ে যেতেই পুচন মার সঙ্গে এল অয়নদাদের বাড়ি। সত্যি, অয়নদা কী রোগা হয়ে গেছে। মুখটা কেমন শুকনো। ঘরের ভিতর অয়ন বিছানায় শুয়ে আছে। পুচন অয়নের কাছে গিয়ে ওর মাথার পাশে বসল। মাথায় হাত রাখল অয়নের। বলল, “অয়নদা, দেখো, তুমি ভাল হয়ে যাবে। তুমি একদম সেরে যাবে অয়নদা। আমি তোমাকে রক্ত দেব। ”

পুচনের কথা শুনে ক্ষীণ একটু হাসল অয়ন। ওর হাতটা বুকের উপর টেনে নিল। এমন সময় কাকিমা ঘরে এলেন। পুচন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কাকিমা, আমি অয়নদাকে রক্ত দেব। ”
কাকিমা পুচনের মাথায় হাত রেখে বললেন, “দূর পাগল! তুই ওইটুকু ছেলে। তোর রক্ত ডাক্তার নেবেই না। আর মাত্র একজন হলেই হয়ে যাবে। তোর কাকু পাড়ার ক্লাবে বলে এসেছেন। অয়নের রক্তের সঙ্গে মিলবে এমন একজনকে ওরা জোগাড় করে দেবে বলেছে। ”
বাড়ি এসে পুচন অনেক করে ভগবানকে বলল, “ঠাকুর, ভাল লোককে কেন যে অমন অসুখ দাও তুমি? তুমি আমার অয়নদাকে ভাল করে দাও। ”
রাতে যখন বাবা কাজ সেরে ফিরে এল, পুচন বাবার কাছ ঘেঁষে বসল। ওর কান্ড দেখে বাবা বলল, “কী গো পুচনবাবু, কিছু বলবে বলে মনে হচ্ছে? কী বলো না। ”
পুচন আরও বাবার কাছ ঘেঁষে সরে বসল। তারপর বলল, “কাল তোমাকে কাজে যেতে হবে না। তুমি আমার মা’র সঙ্গে কাল অয়নদার বাড়ি যাবে। ”
বাবা বলল, “কাজে না গেলে আমাদের চলবে কী করে রে?”
পুচন জেদের গলায় বলল, “তুমি অয়নদাকে রক্ত দেবে চলো বাবা। কাকিমা বলেছেন, আর একজনকে পেলেই অয়নদার অসুখ সেরে যাবে। ”
পুচনের মাও বলল, “অয়নরা কত ভালবাসে আমাদের পুচনকে। চলো, কালই যাই আমরা অয়নের বাড়ি। ”
সকালে পুচনের বাবাকে বাড়িতে আসতে দেখে অয়নের মা-বাবা দুজনের অবাক। কতবার কত উপলক্ষে বাড়িতে ডাকা হয়েছে। কিন্তু পুচনের বাবা এতই লাজুক যে, আসেনি কোনওদিন।
পুচন বলল, “কাকিমা, অয়নদাকে বাবা রক্ত দেবে। ”
পুচনের কথা শুনে অয়নের বাবা-মা তো অবাক। পুচনের মা লাজুক হেসে, “তোমরা কথা বলো বউদি! আমার কি দাঁড়িয়ে থাকলে চলে?” বলেই রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
পুচন অয়নের মার হাত ধরে বলল, “কাকিমা, তুমি হ্যাঁ বলো আগে। ”
অয়নের বাবা পুচনের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি তো কাজের লোক। কাজ কামাই হয়ে যাবে যে?”
পুচনের বাবা বলল, “তা হোক দাদা। অয়ন তো আমারও ছেলের মতো। ওর ভাল হয়ে ওঠাটা আমার একদিনের কাজের চেয়ে অনেক বড়ো। ”
অয়নের বাবা বললেন, “তা বেশ। তার আগে তো রক্ত পরীক্ষা করে দেখা দরকার। রক্তের গ্রুপ মিললে তবেই না?”
অয়নের বাবার সঙ্গে পুচনের বাবাও বেরিয়ে গেলেন রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করার জন্যে। পুচন গিয়ে বসল অয়নের পাশে। অয়নের মাথার পাশে রং পেনসিলের বাক্স আর কাগজ পড়ে আছে।
পুচন বলল, “চলো অয়নদা, আমরা একটা ছবি আঁকি। তুমি আমাকে কোথায় কী রং করব, দেখিয়ে দেবে তো?”
অয়ন ঘাড় দুলিয়ে বলল, “আগে তুই আঁক তো। তারপর তো রং। ”
পুচন একটা নদীর ছবি আঁকতে লাগল। উপুড় হয়ে শুয়ে অয়ন দেখতে লাগল তার ছবি আঁকা। একটু পরে পুচন রং পেনসিলটা অয়নের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “অয়নদা, এবার তুমি একটু আঁকো। ”
পুচনের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে অয়ন বলল, “তুই আঁক। আমার হাতে কি এখন আর অত জোর আছে রে? তুই আঁক। আমি বরং তোকে দেখিয়ে দিই। ”
পুচন অয়নের হাত থেকে রং পেনসিল নিয়ে ছবিটায় ফের রং করতে শুরু করল। দেখতে-দেখতে একটা সুন্দর নদীর ছবি ফুটে উঠল কাগজে। এবার পুচন বলল, “বলো অয়নদা, নদীর মাঝখানে একটা নৌকোর ছবি না থাকলে কি ভাল লাগে?”
সেই নদীর মাঝে নৌকো আঁকা শেষ হয়েছে, অমনি ওরা দেখল, বাড়িতে ঢুকছেন অয়নের বাবার সঙ্গে পুচনের বাবাও।
অয়নের বাবা হেসে বললেন, “জানিস অয়ন, তোর রক্তের সঙ্গে পুচনের বাবার রক্তের গ্রুপ মিলে গেছে। আর আমাদের চিন্তা নেই। ”
ওঁদের কথা শুনে রান্নাঘর থেকে অয়নের মা’র সঙ্গে ছুটে এল পুচনের মাও। অয়নের মা’র দিকে তাকিয়ে অয়নের বাবা বললেন, “শোনো, আমরা অয়নের অপারেশনের দিন ঠিক করেই এলাম। পরশু। ”
সকলের মুখে হাসির রেখা চিকচিক করে উঠল। পুচনের বাবা বলল, “দাদা, আমরা আজ চলি? পরশু আমি ঠিক নার্সিং হোমে সকাল-সকালই চলে যাব। ” বলে পুচনকে বলল, “চল রে পুচন, আর ছবি আঁকতে হবে না। এবার বাড়ি চল। ”
পুচন ছবিটা অয়নের হাতে দিয়ে বলল, “এই ছবিটা তোমাকে দিলাম অয়নদা। আজ আসি গো। তোমার অপারেশনের দিন বাবার সঙ্গে আমিও যাব। ”
পুচন আর তার বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় গিয়ে নামল। সেদিকে তাকিয়ে থাকল অয়ন। পুচনের আঁকা নৌকো-ভাসা নদীর ছবিটা তখন অয়নের হাতে।
ছবিঃ শিমুল