গল্প-কন্যাকুমারীর শঙ্খ-তাপস মৌলিক-পুরোনো জয়ঢাক৫০-শরৎ ২০১৫

তাপস মৌলিকের সমস্ত লেখা

galpokanyakumari01

মানেভঞ্জন জায়গাটার একটা মজা আছে। টাউনটার বেশির ভাগই বাংলায়, অর্থাৎ ভারতে; কিছুটা আবার নেপালে। নেপালের দিকের পাড়াটার সামনে সাইনবোর্ড লাগানো আছে – “ওয়েলকাম টু নেপাল”। গেলেই হল।

একটা ভাড়া করা টাটা সুমোয় শিলিগুড়ি থেকে মিরিক, সুখিয়াপোখরি হয়ে মানেভঞ্জন যখন নামলাম তখন বিকেল পৌনে তিনটে। ঝিরঝির করে খুব হালকা বৃষ্টি পড়ছে। চারপাশের সবুজ পাহাড় কুয়াশার চাদরে ঢাকা। জিপের স্ট্যান্ডে গাড়ি থেকে নামতেই বাঁদিকের একটা দোকানের বারান্দা থেকে একজন বাংলায় বলে উঠল, “কি দাদা, বাঙালি তো? এখানে চলে আসুন। হোটেল লাগবে তো?”

তাকিয়ে দেখি একজন রোগা, লম্বা, মাঝবয়সী ভদ্রলোক, পরনে খয়েরি রঙের ফুল সোয়েটার আর আকাশী মাফলার, সারা গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছেন। “আসুন, চলে আসুন। দোতলায় রুম খালি আছে। নিচে রেস্টুরেন্ট আছে। কোনও অসুবিধে নেই। ”

সাদা চুনকাম করা বাড়িটার একতলায় দোকানঘর। দোতলার সামনে একটা বারান্দা, তার রেলিঙ থেকে সাইনবোর্ড টাঙানো আছে – “কাঞ্চনজঙ্ঘা লজ”। লোকটা মনে হয় হোটেলের দালাল-টালাল হবে। চেহারা দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু এখানে এসেও বাঙা্লি দালালি করছে? তাজ্জব! যাই হোক, দালালদের আমি দু’চক্ষে দেখতে পারি না। তারা ডানদিকে যেতে বললে আমি বাঁদিকে যাই। চুপচাপ গাড়ি থেকে রুকস্যাকটা নামিয়ে, পিঠে নিয়ে সামনের দিকে হাঁটা দিলাম। বৃষ্টি খুবই অল্প অল্প পড়ছে, তাই ছাতাটা আর বার করলাম না। লোকটা পেছন থেকে আবার বলল, “আরে দাদা, ওদিকে পাবেন না। সব বন্ধ। এটাই একমাত্র খুলেছে। ” পেছন ফিরে একটু ভদ্রতার হাসি হেসে হাত নেড়ে বললাম, “না না, ঠিক আছে। ”

পাবো না মানে? মানেভঞ্জনে কি একটা হোটেল? সান্দাকফু-ফালুটের রাস্তার ট্রেকার আর ট্যুরিস্টদের কল্যাণে মানেভঞ্জন এখন রীতিমত ব্যস্ত টাউন। বৃষ্টিভেজা সরু পিচরাস্তার দু’ধারে সারি দিয়ে দোকান। রাস্তার পাশে লাইন দিয়ে ল্যান্ডরোভার জীপ দাঁড়িয়ে আছে, গাড়ি ভাড়া করে সান্দাকফু যেতে হলে এগুলোই ভরসা।

অথচ প্রথম যখন আমি মানেভঞ্জন এসেছিলাম তখন সে একটা ছোট্ট গ্রাম। সবুজ পাহাড়ের ঢালে ছড়ানো ছেটানো কতগুলো বাড়ি, একটা লজ, গোটা তিন ঝুপড়ি মত দোকান। সে অবশ্য তেইশ বছর আগের কথা, ১৯৮৯ সালে। তখন মানেভঞ্জন অবধিই জীপ চলত, তারপরে হাঁটতে হত।

রাস্তার দু’পাশে আরও দু’তিনটে হোটেল চোখে পড়ল, তবে সেগুলো বন্ধই বটে। আরও একটু এগোতে বাজার এলাকাটা ছাড়িয়ে গেলাম। এদিকে আর দোকানপাট নেই, কিছু ঘরবাড়ি আছে। রাস্তায় লোকজনও কেউ নেই। ব্যাপারটা কী? কিছুটা পিছিয়ে এসে একটা দোকানে জিগ্যেস করে জানলাম, এদিকের কোনও হোটেল সত্যিই খোলা নেই। বলল, জীপস্ট্যান্ডেই খোলা পেতে পারেন, আর কোথাও পাবেন না।

এদিকে বৃষ্টিটা একটু জোরেই আরম্ভ হয়েছে তখন। তাড়াতাড়ি স্ট্যান্ডে ফিরে সেই “কাঞ্চনজঙ্ঘা লজ”-এর নিচে দোকানটার সামনে বারান্দাতে রুকস্যাক নামিয়ে দাঁড়ালাম। রুমাল বার করে মাথার জল মুছছি, এমন সময় সেই ভদ্রলোক ফের উদয় হলেন, “আসুন, আসুন। ওদিকের হোটেলগুলো এখনও খোলেনি। সবে সিজন শুরু হয়েছে তো। দোতলায় ভাল রুম আছে, আমার সঙ্গে আসুন। ”

আমার রুকস্যাকটা কাঁধে তুলে নিয়ে ভদ্রলোক দোকানটার পাশের একটা সরু গলি দিয়ে রওনা দিলেন। অগত্যা আমিও তাঁর পিছু পিছু চললাম। গলি দিয়ে দোকানের পেছনে গিয়ে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সামনের বারান্দার লাগোয়া একটা ঘরে রুকস্যাকটা নামিয়ে রেখে ভদ্রলোক বললেন, “এখানে ঢুকে পড়ুন। চা খাবেন তো? আমি নিয়ে আসছি। ”

খাটে বসে জুতো খুলতে খুলতে চা হাজির। ভদ্রলোককে জিগ্যেস করলাম, “বাকি হোটেল-ফোটেল সব বন্ধ কেন বলুন তো?” উনি বললেন, “সান্দাকফু-ফালুটের রাস্তা তো ১৬ই জুন থেকে ১৫ই সেপ্টেম্বর বর্ষার জন্য বন্ধ থাকে। এবারে বর্ষা তো এখনও চলছে। দেখছেন না, বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে। আজ ২২শে সেপ্টেম্বর। সবে গতকাল সান্দাকফু অবধি গাড়ির রাস্তা খুলেছে। ট্যুরিস্টদের আনাগোনা এখনও সেরকম আরম্ভ হয়নি। দু’একজন ট্রেকার যাচ্ছে। এইবারে আস্তে আস্তে সব শুরু হবে, হোটেলগুলোও খুলবে একে একে। আপনি কতদূর যাবেন? সান্দাকফু? গাড়িতে যাবেন না ট্রেক করে?”

“সান্দাকফু-ফালুট হয়ে গোর্খে দিয়ে রিম্বিক নামব। গাড়ি কি হবে? হেঁটেই যাব। ”

“গাইড লাগবে তো? পোর্টার? আমার চেনাজানা ভাল লোক আছে। খবর দিয়ে দিচ্ছি। ”

“না না, গাইড কী হবে? আমি এ রাস্তায় আগেও এসেছি। চেনা রাস্তা। ”

“গাইড ছাড়া তো এখন যেতে দেয় না। সান্দাকফু-ফালুট সিংগালিলা ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে পড়ে। টিকিট কেটে,গাইড নিয়ে তবেই যেতে দেয়। তাছাড়া আপনি একা এসেছেন,বৃষ্টিবাদলার দিন,রাস্তায় লোকও তেমন নেই,সঙ্গে একজন নিয়েই নিন। ”

“ঠিক আছে, দরকার হলে বলব আপনাকে। ”

“বেশ,আমি নিচেই আছি। একটা হাঁক দেবেন। ”

galpokanyakumari02

এ তো ভাল জ্বালা! গাইডও কি দালাল মারফৎ নিতে হবে নাকি? এ দেখি পদে পদে দালালের উপদ্রব। শুনেছি গাইডদের অ্যাসোসিয়েশন আছে,সেখান থেকে গাইড নিতে হয়। উটকো লোকের মাধ্যমে অচেনা গাইড না নিয়ে অ্যাসোসিয়েশন থেকে নেওয়াই নিরাপদ। অ্যাসোসিয়েশনের গাইডরা বেগড়বাই করে না,নালিশ করে দিলে ওদের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। ওদের অফিসটা খুঁজে বার করলেই হবে। গাইড ছাড়া যে এখন যাওয়া যায় না সেটা অবশ্য লোকটা ঠিকই বলেছে। তবে আমার দরকার একজন পোর্টার কাম গাইড,যে রাস্তাটাও চেনে,আবার আমার রুকস্যাকের কিছু মালপত্রও পিঠে নেবে। নিয়ম বাঁচবে,খরচা কমবে,হালকা হয়ে হাঁটাও যাবে।

চা খেয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সামনের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। আধঘণ্টা পরে বৃষ্টিটা বন্ধ হল। জুতো গলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম গাইড অ্যাসোসিয়েশনের অফিসটার খোঁজে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে অফিসে পৌঁছে শুনি সেটা আধঘণ্টা আগে বন্ধ হয়ে গেছে,আবার কাল দশটার পর খুলবে। ট্রেকারদের ভিড় নেই,তাই অফিসে চাপও নেই। এটা আরেকটা জ্বালা হল। ভেবেছিলাম কাল সকালে বৃষ্টি না থাকলে ভোরবেলাই বেরিয়ে যাব। এ তো দেখছি গাইড ঠিক করে বেরোতে বেরোতেই দুপুর বারোটা বেজে যাবে। তারপর কতদূর আর যাওয়া যাবে! তাছাড়া ট্রেকিং সবসময় ভোরবেলা শুরু করাই ভাল,কেননা দুপুর দু’টোর পরেই পাহাড়ে আবহাওয়া খারাপ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

লজে ফিরে আবার দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। ফের টিপ টিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঘন কুয়াশায় চারদিক ঢেকে যাচ্ছে। উইন্ডচিটারটা গায়ে দিয়ে ভাবলাম আরেক কাপ চা হলে মন্দ হয় না। নিচে ঝুঁকে দেখলাম তলার বারান্দায় সেই ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। হেঁকে বললাম,“দাদা,এক কাপ চা হবে?” ভদ্রলোক বললেন,“হ্যাঁ হ্যাঁ,অবশ্যই,নিয়ে আসছি ওপরে। ”

দশ মিনিটের মধ্যেই একটা বিশাল কাপ ভর্তি ধোঁয়াওঠা চা নিয়ে ভদ্রলোক ওপরে উঠে এলেন। নিজের জন্যও এক কাপ এনেছেন। চায়ে চুমুক দিতে দিতে জিগ্যেস করলেন,“গাইড পেলেন?”

সমস্যাটা বললাম। আমার পোর্টার-কাম-গাইডের চাহিদাটাও বললাম। শুনে উনি বললেন, “আপনি যদি কাল সকালে বেরোতে চান, বেরোতে পারেন। এখানে আমার চেনাজানা কিছু গাইড আর পোর্টার আছে। তাদের ফোন নাম্বার আছে। ফোন করলে আধঘণ্টার ভেতরই চলে আসবে। সবাই লোকাল লোক। আর সবাই অ্যাসোসিয়েশনের নথিভুক্ত গাইড বা পোর্টার। আপনি কাউকে ঠিক করলে সেই কাল ভোরবেলা অ্যাসোসিয়েশনের অফিস খুলিয়ে আপনাকে দিয়ে কন্ট্রাক্ট খাতায় সই করিয়ে নেবে। অ্যাসোসিয়েশনকে এড়িয়ে ওরা যায় না। ”

বললাম,“দেখুন তা হলে ফোন-টোন করে,কাউকে পাওয়া যায় কি না। তবে বয়স্ক গোমড়ামুখো লোক জুটিয়ে দেবেন না,বেশ ইয়াং চটপটে একটা ছেলে পেলে ভাল হয়। একা একা যাবো তো,একটু গল্পগুজব করতে করতে যাওয়া যাবে। ”

“ঠিক আছে,দেখি কাকে পাওয়া যায়”,এই বলে ভদ্রলোক নিচে নেমে গেলেন।

আধঘণ্টার ভেতরেই ভদ্রলোক একটি স্থানীয় ছেলেকে নিয়ে হাজির। বললেন ওই নাকি আমার সঙ্গে যাবে। ছেলেটির সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমার পছন্দ হয়ে গেল। নাম অজয় গুরুং, বয়েস কুড়ি, সামনের বছর সুখিয়াপোখরি হাই স্কুল থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবে,ছুটির সময় গাইডের কাজ করে। বেশ শান্ত,ভদ্র ছেলে। জিগ্যেস করে জানলাম, সান্দাকফু-ফালুট ও বহুবার গেছে, বিভিন্ন টিমের সঙ্গে। তবে আমি যখন শেষবার এই রুটে এসেছি তখন ওর জন্মই হয় নি। ওকে বলে দিলাম, কাল সকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলে ভোরবেলা চলে আসতে। যত তাড়াতাড়ি পারি বেরিয়ে যাব।

গুরুং বেরিয়ে যাওয়ার পর ভদ্রলোককে একটা ধন্যবাদ দিয়ে জিগ্যেস করলাম,“আপনি এখানে কতদিন আছেন?” উনি বললেন,“আমি তো গতকালই এসেছি। একটা ছোট্ট কাজ ছিল। আগামীকাল ভোরবেলা আমিও বেরিয়ে যাব। ”আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,“সে কী? বেরিয়ে যাবেন মানে? আপনি এখানে থাকেন না?”

“না না,আমার বাড়ি দুর্গাপুরে। এখানে আমি প্রায় প্রতিবছরই একবার করে আসি। আগে আগে বছরে দু’বারও আসতাম। ”

“বলেন কী? আমি তো ভেবেছি আপনি এই হোটেলেরই লোক। ”

“না না,আমিও আপনার মতোই একজন বোর্ডার। ট্যুরিস্ট। আপনার পাশের ঘরেই আছি। তবে এখানে এতবার এসেছি যে এরা সবাই আমার চেনাজানা হয়ে গেছে। ”

“এ রাম,ছি ছি। তবে আপনি আমার রুকস্যাক বয়ে আনলেন কেন? চা-ও নিয়ে এলেন। আমি আবার আপনাকেই হেঁকে বললাম চা হবে কি না! সরি,কিছু মনে করবেন না। আমি একদম বুঝতে পারি নি। ”

“আরে না না,তাতে কী হয়েছে? আপনি সারাদিন জার্নি করে এসেছেন,ক্লান্ত,তাই ওপরে চা দিয়ে গেলাম। আমি তো সারাদিন বসেই আছি। এখানে এলে এই লজেই বরাবর উঠি তো,তাই এখানকার তিব্বতী মালকিন আমায় খুব ভালবাসেন। আমিও টুকটাক কাজকর্ম করে দি,বসে থাকতে পারি না। ”

বোঝো কাণ্ড! আর আমি এনাকে সেই প্রথম থেকে দালাল মনে করে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছি। অবশ্য ভদ্রলোকের গায়ে পড়ে হেল্প করার চেষ্টা দেখলে সেটা মনে হওয়া খুব অস্বাভাবিক নয়।

উনি নিচে নেমে যাচ্ছিলেন। পাপস্খালনের জন্য বললাম,“আরে বসুন না,একটু গল্প করা যাক। আপনার নামটাই তো জানা হয়নি। ”

ভদ্রলোকের নাম গৌতম কোঙার। বললেন,“এখানকার বেশির ভাগ লোকই বৌদ্ধ। আমার নামটার জন্য এরা আমাকে আরও পছন্দ করে। গৌতম বুদ্ধের নেমসেক বলে কথা!”

“মানেভঞ্জন অবধি এলেন,আর সান্দাকফু-ফালুট না গিয়ে ফিরে যাচ্ছেন যে?”

“না না,আমি যাচ্ছি নেপালে। মুক্তিনাথ যাওয়ার জন্য বেরিয়েছি। কাল সকালে এখান থেকে কাঠমান্ডুর দিকে রওনা দেব,সেখান থেকে পোখরা। একটা ছোট্ট কাজের জন্য মানেভঞ্জন জাস্ট ছুঁয়ে গেলাম। সান্দাকফু ফালুট আমি আগে অনেকবার গেছি। এখন আর অত হাঁটতে পারি না,দম পাই না। বয়েস তো প্রায় পঞ্চাশ হতে চলল। তিরিশ বছর আগে পাহাড়ে আসা শুরু করেছিলাম। ১৯৮৭তে দার্জিলিং-এর হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্সও করেছিলাম। “বি” গ্রেড পেয়েছিলাম অবশ্য,তাই অ্যাডভান্স কোর্সটা আর করা হয় নি। তারপর বছর পনেরো প্রচুর ট্রেক করেছি। এখন শুধু ঘুরে বেড়াই। পাহাড় দেখি, মানুষজন দেখি। বেশি হাঁটতে পারি না বলে সাধারণত যেসব জায়গা অবধি গাড়ি যায়,সেই অবধি যাই। মাঝে মাঝে এক-দু’দিনের সোজা ট্রেক থাকলে মেরে দি। এই আর কি!”

নিচে নামার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে গৌতমবাবু বললেন,“যাই নিচে যাই। রাতের খাবার কখন খাবেন? আটটা নাগাদ নীচে রেস্টুরেন্টে নেমে আসুন,একসঙ্গে গল্প করতে করতে খাওয়া যাবে। নাকি রুমে বসেই খাবেন?”

“না না,নীচেই খাবো। আটটায় নামবো তাহলে,ঠিক আছে। ”

লজটা চালান একজন তিব্বতী মহিলা। এনাদের বয়স আন্দাজ করা খুব শক্ত,তবে মনে হয় ষাটের কাছাকাছি হবে। বেঁটেখাটো,গোলগাল,সুন্দর চেহারা। খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। লজটা এমনিতে খুব সাধারণ,কিন্তু এত পরিপাটি করে গোছানো আর পরিষ্কার যে মন ভাল হয়ে যায়। আটটা নাগাদ নিচে নেমে ডাইনিং রুমে ঢুকলাম। বাইরে তখনও টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়েই চলেছে, বেশ হাওয়াও দিচ্ছে। কাল সকালে পরিষ্কার থাকলে হয়!

ডাইনিং রুমের সঙ্গেই লাগোয়া কিচেন। সেখানে দেখি গৌতমবাবু একের পর এক রুটি বেলে চলেছেন, আর সেই তিব্বতী মালকিন রুটি সেঁকছেন। বললাম, “সে কী,আপনি তো দেখছি কিচেনেও ঢুকে পড়েছেন!”

“এই,দিদিকে একটু হেল্প করছি আর কি। কী আর করব,কোনও কাজ নেই,আমি আবার বসে থাকতে পারি না। বসে পড়ুন,গরম গরম রুটি দিয়ে আরম্ভ করুন,আমিও আসছি। ”

টেবিলে বসার পর গৌতমবাবুই সার্ভ করলেন। তারপর নিজের খাবারও নিজেই নিয়ে আমার সামনে বসে পড়লেন। রুটি, ডাল আর সবজি। গরম গরম দারুণ খাবার। বললাম, “আপনি তো এঁদের একদম ঘরের লোক হয়ে গেছেন দেখছি। এই লজেরই লোক মনে করে আমি ভুল কিছু করিনি। ”

“হাঃ হাঃ, যা বলেছেন। আসলে এঁরা এত সহজ সরল,এত ভালমানুষ,এত সহজে এঁরা মানুষকে আপন করে নেন,ভাবাই যায় না। ঠিকই বলেছেন,আমি এঁদের ঘরের লোকই হয়ে গেছি। এই দিদি তো আমায় খুবই ভালবাসেন,অনেকদিন ধরে। আমিও তাই যখনই আসি,হাতে হাতে একটু কাজকম্মো করে দি। ”

লজের মালকিন টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের খাওয়ার তদারক করছিলেন। এনারা বাংলা ভালোই বুঝতে পারেন,বহুদিন ধরে ট্যুরিস্টদের মুখে শুনছেন। আমাদের কথাবার্তা শুনে বললেন, “গৌতমদাদা মেরে আপনা ভাই হ্যায়। মুঝে কিতনা হেল্প করতে হ্যায়,খানা পকানে মে,খানা দেনে মে। কভি কভি তো বর্তন ধোনে কে লিয়ে ভি বৈঠ যাতে হ্যায়। রুকিয়ে,আপকো দিখাতি হুঁ, গৌতমদাদা নে মেরে লিয়ে ইস বার কেয়া লায়া হ্যায়। ”

এই বলে উনি একটা কাঁসার থালায় করে খুব সুন্দর একটা সাদা শঙ্খ এনে পাশের টেবিলে রাখলেন। বললেন,“ম্যায় নে একবার স্রিফ বোলি থি,ঔর গৌতমদাদা নে কন্যাকুমারী যা কর মেরে লিয়ে ইয়ে শঙ্খ্ লে কে আয়া। ম্যায় ইতনা খুশ হুয়া,ইতনা খুশ হুয়া,মেরি আঁখো মে পানি বহ্ গিয়া। বোলিয়ে না,আপনা ভাই নেহি হোনে সে ইয়ে সব কোই করতে হ্যায়?”

গৌতমবাবুকে জিগ্যেস করলাম,“এটা কি কন্যাকুমারী থেকে কিনেছেন?”

“হ্যাঁ। আর বলবেন না! দিদির অনেকদিনের শখ একটা ভাল শঙ্খের। গতবছর এই সময় এখানে এসেছিলাম একবার। কথায় কথায় দিদি বলে ফেলেছিলেন। বললাম যে কন্যাকুমারীতে খুব ভাল শঙ্খ পাওয়া যায়, আমি তোমার জন্য নিয়ে আসব। দিদি আমায় এত ভালবাসে,এখানে এলে এত যত্ন করে,কোনও দিন তো মুখ ফুটে কিছু চায় নি। এঁরা খুব অল্পে সন্তুষ্ট। আমি দিদিকে রান্নাবান্নায় একটু হেল্প করে দি,করতে ভাল লাগে,সারা বছর তো দিদি একার হাতে সব সামলায়। তা ভাবলাম,দিদির শখের কথাটা যখন জেনেই ফেলেছি,তখন চেষ্টা করে দেখি। এবার মার্চ মাসে চলে গেলাম কন্যাকুমারী। সেখান থেকে এটা কিনলাম দিদির জন্য। আসলে এটা দিতেই আমার এখানে আসা। ভেবেছিলাম আজ সকালেই বেরিয়ে যাব। সেটা আর হল কই! দিদিই আটকে দিল। ”

বাইরে থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টির আওয়াজ আসছে। ডাইনিং রুমের টিমটিমে ঘোলাটে আলোয় দেওয়ালে টাঙানো থাংকাগুলো কেমন ভুতুড়ে লাগছে। চুপচাপ খাচ্ছিলাম, আর ভাবছিলাম, আমি এ কোথায় আছি? গতকালও এই সময় আলোঝলমল কোলাহলমুখর শিয়ালদা স্টেশনে ছিলাম। আর আজ? এটা কোন সাল? ২০১২? অসম্ভব। এখন, এই ২০১২ সালে এটা কেউ বিশ্বাস করবে? কোন্ পাহাড়ি পথের এক অখ্যাত হোটেলের তিব্বতী মালকিন কথায় কথায় এক শহুরে বোর্ডারকে বলে ফেলল যে তার একটা ভাল শঙ্খের খুব শখ,আর সেই লোকটি নিজের পয়সায় গোটা ভারতবর্ষ পেরিয়ে কন্যাকুমারী গিয়ে তার জন্য শঙ্খ কিনে নিয়ে এল? কী,না,কন্যাকুমারীতে খুব ভাল শঙ্খ পাওয়া যায়! পৃথিবীতে এখনো এরকম লোক আছে?

খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে এসে টেবিল থেকে শঙ্খটা তুলে নিলাম। কী সুন্দর! অসাধারণ! গৌতমবাবু বললেন,“কানে দিয়ে শুনুন,সমুদ্রের আওয়াজ শুনতে পাবেন। দিদিকে শুনিয়েছি। দিদি তো কোনও দিন সমুদ্র দেখেনি,খুব সম্ভব দেখবেও না। তাই আওয়াজটাই একটু শুনিয়ে দিলাম। বাইরে বারান্দায় গিয়ে চোখ বন্ধ করে কানে দিন,ওখানে হাওয়া আছে,ভাল শোনা যাবে। ”

শঙ্খটা হাতে নিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম। তারপর কানে লাগালাম। চোখ বন্ধ করলাম। এক মুহূর্তে পৌঁছে গেলাম সমুদ্রের ধারে। বাতাসের শন্ শন্ শব্দ। বালির চরে ঢেউ ভেঙে পড়ার আওয়াজ। এইটুকু একটা সামান্য শঙ্খ,অথচ কী অদ্ভুত তার গুণ! কানে দিয়ে শোনো,শুনবে অতলান্ত অনন্ত মহাসমুদ্রের ঢেউ একের পর এক ভেঙে পড়ছে,বিরামহীন,ক্লান্তিহীন। মনে হল,মানুষও ঠিক এমনই। বাইরে থেকে দেখো,সাধারণ,সামান্য সব মানুষ। নিজের নিজের সুখ, দুঃখ,স্বার্থ,শখ-আহ্লাদ,হাসিকান্না,কলহ-কোলাহল নিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে চলেছে। একটু কান পেতে শোনো। শুনবে অতলান্ত,অনন্ত মানবসমুদ্রের ঢেউ যুগ যুগ ধরে পাড়ে ভেঙে পড়ছে। বিরামহীন,ক্লান্তিহীন।

ছবি- শিবশংকর ভট্টাচার্য

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply