কোরিয়ার উপকথা- ভিনদেশের ভারতীয় রানি- রাকা দাশগুপ্ত -পুরোনো জয়ঢাক৫০-শরৎ ২০১৫

golporupkatha (2)

সে অনেককাল আগের কথা। মস্ত এক রাজ্য, ধনদৌলত উপচে পড়ছে। ঘরে ঘরে সুখ সমৃদ্ধি। শুধু রাজামশাই-এর মনে সুখ নেই। রানিমার ঘুম নেই।  কারণ ভারি আদরের এক মেয়ে আছে তাঁদের, রূপে গুণে অনন্যা। কিন্তু তার যোগ্য পাত্র যে সারাদেশে চোখে পড়ে না কোথাও। কি হবে তাহলে? রাজকন্যার কি বিয়েই হবে না? নাকি ভিনদেশে দূত পাঠাতে হবে, পাত্র খোঁজার জন্য?

তারপর একদিন তাঁদের স্বপ্নে দেখা দিলেন এক দেবতা। তিনি বললেন –সমুদ্রপারের দূর দেশে সুরো নামে এক রাজা আছেন, এখনও তাঁর বিয়ে হয়নি। তিনি খুব ধার্মিক আর সৎ।  তোমাদের মেয়ের উপযুক্ত পাত্র তিনিই। তোমরা অবিলম্বে রাজকন্যাকে ওখানে পাঠিয়ে দাও।

রাজা রানি পরের দিন মেয়েকে ডেকে বললেন স্বপ্নের কথা। তারপর অগাধ সোনারূপো সঙ্গে দিয়ে, কয়েকজন সঙ্গীসাথী দাসদাসী সঙ্গে দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে রওনা করে দিলেন মেয়েকে। রাজকন্যার নৌকো ভেসে চলল মাঝদরিয়ায়।

কাহিনির এই আরম্ভটুকু যেকোনো রূপকথার গল্পের মতই। এমন কত রাজারানি রাজপুত্র রাজকন্যার গল্প আমরা পড়েছি ছোটবেলায়। এ গল্পটাও তেমনই। শুধু, এটা কিন্তু নিছক গল্প নয়। রূপকথা আর কিংবদন্তী মেশানো জলজ্যান্ত ইতিহাস।

যে দেশে রাজকন্যা এসে পৌঁছেছিলেন শেষ পর্যন্ত, সেটা বর্তমান কোরিয়া। আর যেই রাজ্য থেকে এসেছিলেন? সেটা আমাদের ভারতবর্ষ। অযোধ্যা। কিংবদন্তী অনুযায়ী, তিনি সত্যি সত্যি সাতসমুদ্র তেরোনদী পেরিয়ে এসে নেমেছিলেন কোরিয়ার উপকূলে, আর তাঁকে সাদরে নিয়ে গিয়ে রানি করেছিলেন সেদেশের রাজা।

কাজের সূত্রে গত এক বছর ধরে কোরিয়ায় আছি। তাই প্রথম যখন কোরিয়ার এই ভারতীয় রানির গল্প শুনলাম, ভারি চমৎকার লাগল। একটু খোঁজ নিয়ে যা জানলাম, রাজা সুরো আর তাঁর রানি, দুজনেই কিন্তু রীতিমত ঐতিহাসিক চরিত্র। বর্তমান দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান নগরের কাছে গিমহে বলে একটা ছোট শহরে তাঁদের দুজনেরই সমাধি আছে। ঠিক করলাম, কখনও একবার গিয়ে সেই সমাধি দুটো দেখে আসতে হবে। কিন্তু মনে হল, তার আগে একটু পড়াশোনাও তো করে নিলে হয় কোরিয়ার এই ভারতীয় রানিমাকে নিয়ে।

বইপত্র আর ইন্টারনেট ঘেঁটে  জানলাম, রাজা সুরো ছিলেন কোরিয়ায় গেউমগোয়ান গায়া নামে এক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। মোটামুটিভাবে প্রথম শতাব্দীতে(পরবর্তীকালে লিখিত রেকর্ড অনুযায়ী, ৪২ খ্রীষ্টাব্দ) তাঁর জন্ম। কিন্তু এই রাজা আর তাঁর ভারতীয় রানির গল্প লিপিবদ্ধ হয়েছে অনেককাল পরে। ত্রয়োদশ শতকে ইরিয়োন নামে এক কোরিয়ার এক বৌদ্ধ শ্রমণ প্রাচীন কোরিয়ার রাজ্যগুলোর ইতিহাস, কিংবদন্তী, উপকথা সব কিছু একসঙ্গে সংকলিত করার চেষ্টা করেন ‘সামগুক য়ুসা’ নামের একটা বইতে। তার মধ্যেই আছে রাজা সুরো আর রানি হিয়ো-হোয়াং-ওক-এর কথা।

কিন্তু হিয়ো-হোয়াং-ওক কি আসল নাম? সামগুক য়ুসাতে বলা আছে, রানির ভারতীয় নাম ছিল সুরিতানা। সন্দেহ হয়, সেটা নির্ঘাৎ সুরত্না নামটার অপভ্রংশ। এদিকে কোরিয়াতে হোয়াং-ওক মানেও কিন্তু হলুদ জেড পাথর, যেটা খুব দামী রত্ন। কাজেই হোয়াং ওক আদতে সুরত্না ছিলেন, এমনটা হতেই পারে।

রাজা সুরোকে নিয়েও বিস্তর কিংবদন্তী। আসলে সেকালে যেকোনো শক্তিশালী রাজা, বা কোনও সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়েই সাধারণ মানুষ ভয়ে-ভক্তিতে-ভালবাসায় নানা গল্প বানিয়ে ফেলত। তারপর ইতিহাস আস্তে আস্তে হারিয়ে যেত, বেঁচে থাকত ওই  মিথগুলোই। আমাদের দেশেও তো এমন কত গল্প আছে… রাজা বিক্রমাদিত্য আর বেতালের কাহিনীর মত!

ত্রয়োদশ শতকের ওই বইটাতে রাজা সুরোর গল্পটাও সবিস্তারে আছে। তখন দেশে অরাজক অবস্থা, সুশাসনের খুব প্রয়োজন। এমন সময়ে হঠাৎ একদিন গ্রামবাসীরা শুনতে পেল, আকাশ থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ আসছে। তাকিয়ে দেখে, আকাশটা ফাঁক হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে, আর সেখান থেকে নেমে আসছে একটা বেগুনি দড়ি, তার সঙ্গে একটা সোনার বাটি বাঁধা। বাটিটা যখন মাটিতে নেমে এল, দেখা গেল তাতে রয়েছে ছ খানা সোনালি ডিম। সেই ডিম ফুটে তারপর ভারি সুদর্শন ছজন রাজকুমার বেরিয়ে এলেন। তাদের মধ্যে একজনকে ‘সুরো’ নাম দিয়ে রাজসিংহাসনে বসানো হল। বাকিরাও আশেপাশের অন্য জাতিগোষ্ঠীদের নেতা হয়ে দিন কাটাতে লাগলেন।

রাজা সুরো ভারি দয়ালু, মহৎ। যত্নের সঙ্গে প্রজাপালন করেন। কিন্তু রাজ্যে শুধু রাজা থাকলে তো চলে না, রানিও চাই। রাজার সভাসদরা তাঁকে বলল – ‘আমরা দেশের সবচেয়ে রূপবতী গুণবতী মেয়েদের নিয়ে আসি এখানে, আপনি তারপর বেছে নিন কাকে আপনার পছন্দ’। কিন্তু রাজা তাতে রাজি হলেন না, বললেন দেখো, আমাকে যেমন স্বর্গের দেবতারা এখানে পাঠিয়েছেন, তেমনি আমার রানিকেও তাঁরাই পাঠিয়ে দেবেন। তোমরা বরং এক কাজ কর। দক্ষিণে যে পাহাড়ী দ্বীপ আছে, সেখানে গিয়ে অপেক্ষা কর। দেখো, কি হয়। ’

রাজার অনুচররা সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল তাঁর নির্দেশমত। হঠাৎ একদিন দেখা গেল, দিগন্তে একটা জাহাজ দেখা যাচ্ছে। তার লালরঙের পাল, একটা লাল পতাকাও পতপত করে উড়ছে। জাহাজ যখন আরও সামনে এল, দেখা গেল, তার ওপরে রয়েছেন এক পরমাসুন্দরী রাজকন্যা।

জাহাজ নোঙর করল, রাজকন্যা পা রাখলেন কোরিয়ার মাটিতে। কী করে পাড়ি দিয়েছিলেন এত বিশাল সমুদ্র? ভারত আর কোরিয়া – সে যুগের পক্ষে এ তো প্রায় অলঙ্ঘ্য দূরত্ব! উপকথা অবশ্য বলছে, রাজকন্যার সঙ্গে ছিল একটা মায়া পাথর, যা দিয়ে সমুদ্রকে শান্ত রাখা যেত, ঝড়কে ঠেকিয়ে রাখা যেত। আর খাবার হিসেবে ছিল ফলমূল, খেজুর আর পিচ। তাতেই নাকি দিব্যি কুলিয়ে গেছিল রাজকন্যা আর তাঁর সঙ্গীদের।

রাজা তাঁর ভৃত্যদের পাঠালেন – ‘যাও, ওঁকে সঙ্গে করে রাজবাড়িতে  নিয়ে এসো’।

বেঁকে বসলেন রাজকন্যা। রাজার লোকলস্করদের বললেন –‘তোমরা আমার অপরিচিত। তোমাদের সঙ্গে আমি কেন যাব, বলো! তাছাড়া, কোনও উৎসব নেই, আয়োজন নেই, এই অবস্থায় কি আমি অনাহূতর মত প্রাসাদে যেতে পারি? ও আমায় মানায় না। ’

রাজা সুরো যখন শুনলেন সে কথা, রাজকন্যার আত্মমর্যাদাজ্ঞান দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বুঝলেন, এই মেয়েই তাঁর উপযুক্ত মহিষী। প্রাসাদের বাইরে একটা মস্ত অস্থায়ী ছাউনি বানানো হল তাঁর নির্দেশে, সেখানে তিনি সাড়ম্বরে বরণ করে নিলেন তাঁর ভাবী বধূকে। রাজকন্যার সঙ্গে যারা এসেছিল, তাদেরও সমাদর করে নিয়ে যাওয়া হল রাজপুরীতে।

রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবার পর রাজকন্যা আত্মপরিচয় দিলেন। রাজাকে বললেন তাঁর বাবা মায়ের স্বপ্নের কথা, এও বললেন যে তিনি ‘আয়ুত্যা’ রাজ্যের রাজকন্যা (গল্পটার অন্য একটা ভার্শনও পেয়েছি, যেখানে রাজকন্যার বাবা মা নন, রাজকুমারী নিজেই স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন, আর তারপর বাবা মায়ের অনুমতি নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। )। দেখা গেল রাজা সুরো আর রাজকন্যা সুরত্না দুজনেই দুজনের রূপেগুণে মুগ্ধ। বিয়ের উৎসব শুরু হতে দেরি হল না আর।

কিন্তু ‘আয়ুত্যা’ই কি অযোধ্যা? দীর্ঘদিন কোরিয়াবাসীদের জানা ছিল না, কোথায় এই আয়ুত্যা। শুধু এটুকুই তাঁরা জানতেন যে তাঁদের এক রানি এসেছিলেন ভারতবর্ষ থেকে। অনেককাল পরে যখন অযোধ্যা নামটার সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ঘটে, তাঁরা আয়ুত্যার সঙ্গে অযোধ্যাকে মিলিয়ে নেন। সত্যিই কি অযোধ্যা থেকে এসেছিলেন এই মেয়েটি? পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁদের মত, প্রথমত অযোধ্যা সমুদ্র তীরবর্তী শহর নয়। তাই ওখান থেকে জলপথে পাড়ি দেওয়া অত সোজা নয়। তাছাড়া, থাইল্যান্ডেও তো আয়ুথ্যায়া নামে একটা শহর আছে। সেটা যদি আয়ুত্যা হয়, ব্যাপারটা আরেকটু সহজ হয়, কারণ থাইল্যান্ড থেলে কোরিয়ার দূরত্ব তো তুলনায় কম।

আয়ুত্যা=অযোধ্যা, এই তত্ত্বে বিশ্বাসীরাই এখনও দলে ভারি। কারণ সেই ত্রয়োদশ শতকের বইটিতেও স্পষ্টই বলা ছিল যে রাজকন্যা ছিলেন ভারতীয়। আর তার চেয়েও বড় কথা, থাইল্যান্ডের আয়ুথ্যায়া নগরটা তৈরিই হয়েছিল ত্রয়োদশ শতকে। আর রাজা সুরো আর তাঁর রানি ছিলেন প্রথম ও দ্বিতীয় শতকের কিছু অংশ জুড়ে। অর্থাৎ, রানির আয়ুত্যা নিঃসন্দেহে আয়ুথ্যায়ার চেয়ে অনেক প্রাচীন।

দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের নাম বুসান। সেখানে একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও আছে, কিন্তু সেটা মূল শহর ছাড়িয়ে অনেকটা দূরে, শহরতলিতে।  আরেকটা আলাদা শহরও বলা যায় জায়গাটাকে। নাম গিমহে। সেখান থেকে মেট্রোরেলে করে বারো-তেরোটা স্টপেজ। স্টেশনের নামই ‘রাজা সুরোর সমাধি’।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে বোঝা গেল, জায়গাটা খুব নির্জন, একটা ছোট্ট মফস্বল শহর যেমন হয়। দূরে পাহাড়, সামনে পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, একটু পর পর তীরচিহ্ন দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া আছে রাজসমাধি কোন দিকে। একদিন একটা পড়ন্ত বিকেলবেলায় সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। আশেপাশে ভিড় নেই, বোঝা গেল টুরিস্ট খুব বেশি আসে না এখানে।

রাজা সুরোর সমাধি বেশ বড় একটা চত্বর জুড়ে। কাঠের মস্ত গেট, তাতে চীন দেশীয় ‘ইন’ ও ‘ইয়াং’ চিহ্ন আঁকা, যেটা কোরিয়ার সংস্কৃতিতে, মায় কোরিয়ার জাতীয় পতাকাতেও জায়গা করে নিয়েছে। গেটের বাইরে একটা টুরিস্ট ইনফর্মেশন সেন্টার। সেখানে ঢুকতেই হাসিখুশি এক দিদিমনি কিছু কাগজপত্র লিফলেট দিয়ে দিলেন। কিন্তু শুধু তো রাজার সমাধি দেখতে আসিনি। রানির সমাধি কই? তাঁকে বলতে ম্যাপ খুলে তিনিই দেখালেন, আরও মিনিট পনেরো কুড়ির দূরত্বে আছে সুরো রাজার রানির সমাধি। আরও কিছু তথ্য জেনে নিয়ে তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে রাজামশাই-এর সমাধিতে ঢুকলাম।

প্রাচীন কোরিয়াতে রাজাদের সমাধি দেওয়া হত কৃত্রিমভাবে মাটি আর পাথর দিয়ে তৈরি উঁচু গোলাকৃতি টিলার মত জায়গায়। যেন ছোট্ট পিরামিড, শুধু মাথাটা গোল। তেমনই এক সমাধির তলায় শুয়ে আছেন রাজা সুরো। চারপাশ রেলিং দিয়ে ঘেরা।  সামনে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু সব প্রস্তরমূর্তি, তারা রাজাকে পাহারা দিচ্ছে। বেশ কিছু শিলালিপি ছড়িয়ে আছে এদিকে সেদিকে।

সেখান থেকে বেরিয়ে রওনা হলাম রানির সমাধি খুঁজতে। ম্যাপ দেখে দেখে কিছুদূর এগোচ্ছিলাম, তারপর বেশ কিছুটা হাঁটার পর দেখলাম আর বুঝতে পারছি না কোনদিকে যেতে হবে। ওদিকে সন্ধে হবার মুখে, রাস্তাঘাট আস্তে আস্তে আরও নির্জন হচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল। চালককে ম্যাপ খুলে রানির সমাধির ছবিটা দেখাতেই তিনি  মহানন্দে যেতে রাজি হয়ে গেলেন। তারপর যেখানে গিয়ে নামাচ্ছেন – দেখি এ বাবা, এ তো রাজার সমাধিতেই নিয়ে এসেছেন আবার। আসলে সমাধিদুটো দেখতে তো একই রকম, তাই বুঝতে পারেননি যে অন্যটায় যেতে চাইছি। আর এখানে টুরিস্ট আসেই খুব কম, যারা আসে, রাজা সুরোর সমাধি দেখেই ফিরে যায়, রানির সমাধি অবধি আর যায় না বোধহয় বিশেষ কেউ। ইনিও তাই ভেবেছেন রাজার সমাধিটাই খুঁজছি।

এবার  ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে রেখে আবার টুরিস্ট ইনফরমেশন কাউন্টারের মেয়েটির শরণাপন্ন হতে হল। তিনি বেরিয়ে এসে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বুঝিয়ে দিলেন, কোন দিকে যেতে হবে রানির সমাধিতে যেতে হলে। এবার আর ভুল হল না, ঠিকঠাক পৌঁছে দিলেন।

দেখলাম, জায়গাটা একেবারেই জনমানবশূন্য। গেটের বাইরে একটা বড় সাইনবোর্ডে রানি  হিও-হোয়াং-ওকের সংক্ষিপ্ত জীবনী। সেখানেও বলা আছে রানির জীবন নিয়ে কিংবদন্তীর কথা, তাঁর ভারত থেকে আসার গল্প। তারপর নকশা করা কাঠের গেট দিয়ে ঢুকে টানটান সোজা রাস্তা। রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে কয়েকটা সিঁড়ির ধাপ, তারপরেই রানির সমাধি। শান্ত, নিরাভরণ। রাজার সমাধি ঘিরে যেমন বেশ কিছু পাথরের মূর্তি ছিল, এখানে তেমন কিছু নেই।

কিন্তু একদম কিছু নেই, তাও নয়। সমাধির কাছেই একটা রঙচঙে কাঠের প্যাগোডা। তার ভেতরে আরেকটা ছোট প্যাগোডা, প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপের মত আদল,  কয়েকটা পাথর দিয়ে তৈরি। নাম ‘পাসা প্যাগোডা’। বলা হয় এই পাথরই নাকি রাজকন্যা নিয়ে এসেছিলেন সমুদ্রযাত্রার সময়ে। আজও নাকি পাথরগুলোর ম্যাজিক ফুরিয়ে যায়নি, এখনও উত্তাল সমুদ্রকে নিমেষে শান্ত করে দিতে পারে তারা। মজা হল, সত্যি সত্যিই নাকি ভূতাত্বিকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন , এটা বেশ অন্যজাতের পাথর, কোরিয়াতে এই পাথর পাওয়া যায় না!

উল্লেখ করার মত আরেকটা ব্যাপার বলে রাখি,  এর আগে রাজার সমাধিতে যে গিয়েছিলাম, সেখানেও কাঠের দরজার ওপরে  পাথরের তৈরি এই বিশেষ প্যাগোডাটি আঁকা আছে। রানির নিয়ে আসা পাথরের ছবি। তার দুপাশে দুটো মাছ আঁকা। এই মাছ নিয়েও নাকি অনেক গবেষণা হয়েছে। শেষে জানা গেছে, অযোধ্যায় একসময়ে রাজত্ব করেছেন, মিশ্র-উপাধিধারী এমন এক প্রাচীন রাজবংশের সত্যিই প্রতীক ছিল এই জোড়া মাছ।

ততক্ষণে সন্ধে নেমে গেছে। সমাধিক্ষেত্রের মধ্যেও আলো জ্বলে উঠেছে। এবার ফেরা দরকার। গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত বার বার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিলাম রানির সমাধিকে। আমার দেশেরই একটি মেয়ে… দুহাজার বছর আগে সত্যি এসেছিলেন এতদূরে, সমুদ্র উজিয়ে? আর এখানেই তিনি ঘুমিয়ে আছেন আজ?

রাজকন্যা সুরত্না বা রানি হিও হোয়াং-ওকের বাকি জীবন কেমন কেটেছিল? রূপকথায় যেমন হয়, তেমনি সুখে শান্তিতে?

খানিকটা তেমনই। রাজা রানি দুজনেই পরস্পরকে ভারি ভালবাসতেন, আর প্রজারাও ভালবাসত তাঁদের। দশজন ছেলেমেয়ে হয় তাঁদের, তাদের মধ্যে আটজন নেন বাবার উপাধি ‘কিম’, আর দুজন মায়ের নামে ‘হিও’ বা ‘হো’। এই কিম রা এখনও কোরিয়ার জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ, আর হো দের সংখ্যাও ফেলনা নয়। সেইভাবে  মোট হিসেব করলে দেখা যায় বর্তমানে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলিয়ে ষাট লাখেরও বেশি মানুষ এই রাজারানির বংশধর।  

সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে সারাজীবন রাজত্ব করার পর রানি মারা যান। উপকথা অনুযায়ী, তখন নাকি তাঁর বয়েস ছিল একশ সাতান্ন বছর! রাজা সুরো সাংঘাতিক ভেঙে পড়েন, প্রজাদেরও খুব মন খারাপ। ঘটা করে তাঁকে সমাধি দেওয়া হল। তাছাড়া যেখানে রানি সমুদ্রতীরে প্রথম পা রেখেছিলেন, যেখানে রাজার সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেই সব জায়গাগুলোকে আলাদা আলাদা নাম দিয়ে স্মরণীয় করে রাখল দেশের মানুষজন। রাজা সুরো আরও বছর দশেক বেঁচেছিলেন তারপর।

ইন্টারনেটে বিবিসি নিউজ-এর একটা পুরনো পৃষ্ঠা থেকে জানতে পারলাম, কয়েকবছর আগে কোরিয়া থেকে আসা এক প্রতিনিধিদল অযোধ্যায় এসে সরযূ নদীর ধারে তাঁদের পূর্বনারী এই রানির স্মৃতিতে একটা স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করে গেছেন। রানিমার জন্মস্থান হিসেবে অযোধ্যা তাঁদের কাছে খুবই আদরের। রানির সমাধি যেখানে আছে, সেই গিমহে শহরের ‘সিস্টার সিটি’র মর্যাদাও দেওয়া হয়েছে অযোধ্যাকে ।

এই ভারতীয় রানিকে নিয়ে কোরিয়ানদের আগ্রহ আর গবেষণা এখনও চলছে পুরোদমে। কিম বিউং মো নামে এক কোরিয়ান প্রত্নতত্ববিদ এই নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। এমন কথাও উঠে এসেছে যে রানি নাকি সরাসরি ভারত থেকে আসেননি, কুষাণ আক্রমণে তাঁর পরিবার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে চীনদেশে পালিয়ে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে তিনি আসেন কোরিয়াতে। আবার কোরিয়ায় বৌদ্ধ ধর্ম প্রথম এই রানির হাত ধরেই এসেছিল, এমন দাবিও করেছেন কেউ কেউ।

আসলে তখনকার দিনে তো কোনও কিছুরই তেমন লিখিত প্রমাণ থাকত না। পরে ইতিহাস আর উপকথা এমন ভাবে মিলেমিশে গেছে যে একটা থেকে আরেকটা আলাদা করা খুব শক্ত।

তবে অযোধ্যা থেকেই যে তাঁদের এই প্রাচীন রানি এসেছিলেন, একথা কোরিয়ানরা ভাবতে ভালবাসেন। এ ব্যাপারে অন্তত উত্তর আর দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিমত নেই। মুশকিল হল, ভারতের ইতিহাসে এই রাজকন্যার কোনই উল্লেখ নেই। তবে সেটাও হয়তো স্বাভাবিক… যে দেশ থেকে এসেছেন, তার চাইতে যে দেশে তিনি রাজত্ব করেছেন সেই দেশই তো তাঁকে বেশি মনে রাখবে! বছর দশেক আগে  একটা খবর প্রকাশিত হয় – গিমহে অঞ্চলে প্রাচীন কোরিয়ান সমাধি থেকে পাওয়া কিছু ডি এন এ স্যাম্পেলে নাকি ভারতীয় জিনগত মিল পাওয়া গেছে। কাজেই কোরিয়াতে  একজন প্রাচীন ভারতীয় রানির অস্তিত্ব হয়তো খুব আকাশকুসুম কল্পনা নয়।

ইতিহাসের পাতায় কি আর শুধুই নীরস সাল-তারিখের হিসেব থাকে? মণিমুক্তোর মত এক এক টুকরো রূপকথাও থাকে যে!

ফটোগ্রাফ – সায়ন কুমার দে

তথ্যঋণ –

১) টুরিস্ট ইনফর্মেশন সেন্টার, রয়্যাল টুম অফ কিং সুরো, গিমহে, সাউথ কোরিয়া

২) চুং সুন কিম, ‘ভয়েসেস অফ ফরেন ব্রাইডস – রুটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফ মাল্টিকালচারিসম ইন কোরিয়া’, আলতামিরা প্রেস, ইউনাইটেড কিংডম

৩) হোয়াং পাএ-গাং, কোরিয়ান মিথস অ্যান্ড ফোক লেজেন্ডস (হান-ইয়ং-হি দ্বারা ইংরেজিতে অনুদিত )  জৈন পাবলিশিং কম্পানি, ক্যালিফর্নিয়া, ইউ এস এ

৪)উইকিপিডিয়া
৫) ইন্টারনেটে প্রাপ্ত অন্যান্য নিবন্ধ ও সংবাদপত্র

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প-উপন্যাস

Leave a Reply