সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২৩ – ৫ম স্থান

সকাল সকাল হাতের কাজগুলো তাড়াতাড়ি করে সেরে নেন সুমিতা। আজ তাঁর আনন্দের দিন। বিকেলের মধ্যেই বাড়িতে চলে আসবে আয়ুষ আর পৃথা, তাঁদের সন্তানরা। প্রায় দু-বছর তাদের সঙ্গে দেখা হয়নি। একটু পরেই অনলাইনে স্কুলের ক্লাসে বসতে হবে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। আগামীকাল থেকে দু-দিন অবশ্য ছুটি নিয়েছেন তিনি। পৃথার বাবাকেও বলেছেন ছুটি নিতে। দেখতে দেখতে তো দুটো দিন কেটে যাবে ওদের নিয়ে। পৃথাদের ঠাকুমাকে একটু আগেই জলখাবার খাইয়ে সোফায় বসিয়ে রেখে এসেছেন সুমিতা। তাঁরও আনন্দ কম নয়, এতদিন পর নাতি-নাতনিরা বাড়ি আসবে, ওদের সঙ্গে কত গল্প করবেন; অনেক কিছু চিন্তা করে রেখেছেন তিনি। ওরা তো জানেই না আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে কেমন ছিল এই পৃথিবী, কেমন ছিল মানুষের জীবনযাত্রা। সবকিছু গল্প করে জানাতে হবে ওদের। তাঁর নিজের বয়স তো কম হল না—আশি পেরিয়ে গেছে। সেই বুঝি ২০৪০ সাল হবে। সেই বছরে জন্ম হয়েছিল তাঁর এই কলকাতায়। বাবা-মায়ের কাছে শুনেছেন কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল সে-সময়। চারদিকে বিশাল বিশাল অট্টালিকা ভেঙে ধূলিসাৎ, মাটি ফেটে চৌচির। আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে সে-ঘটনার কথা গল্প শুনে ছবির মতো ভেসে ওঠে তাঁর মনে।
আজ থেকে চব্বিশ বছর আগে আয়ুষের যখন জন্ম হল, তখন ওর ঠাকুরদা বেঁচে ছিলেন। বাড়িতে আনন্দের উৎসব লেগে গেল যেন। তার তিন বছর পর পৃথার জন্ম। চোখের সামনে দ্রুত গতিতে পালটে যেতে লাগল পৃথিবীর সমস্ত কিছু। পরিবেশ, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে সবকিছুই অচেনা লাগছিল পৃথার ঠাকুরমার। নিজের চোখে তিনি দেখেছেন বিগত সত্তর-আশি বছরে পৃথিবী তথা এই মহাবিশ্বের পালটে যাওয়ার ছবি।
এই যে আয়ুষ মাত্র তেইশ বছর বয়সে গবেষণার জন্য পাড়ি দিয়েছে ‘ক্রেটা’ বলে একটা উপগ্রহে, এটা আসলে মঙ্গলের কাছাকাছি একটা স্পেস স্টেশন যেখানে ওর মতো বিভিন্ন দেশের ছাত্ররা গবেষণা করছে। মঙ্গলের আবহাওয়াকে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করে তাকে মানুষের বসবাসের যোগ্য করে তোলাই প্রধান কাজ তাদের। এই কাজে তাকে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে বিভিন্ন স্পেস স্টেশনে বা অন্য দেশে। হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে মহাজাগতিক সংকেতে কথা বলে সে। বাবা-মা বা অন্য কারও সঙ্গে। আজ থেকে সত্তর-আশি বছর আগে যা কল্পনাও করা যেত না। আসলে এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল সেই ২০৪০ সালের বিশ্বব্যাপী মহাপ্রলয়ের মধ্যে দিয়ে। আয়ুষও বাইরে গেছে স্কলারশিপ নিয়ে, এই কাজে ভারত সরকারের সঙ্গে সহযোগিতায় রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
আর পৃথা—তার কথাও বলা দরকার। কুড়ি বছরের মেয়ে এরই মধ্যে তিন-তিনটে স্কলারশিপ নিয়ে গবেষণা করছে। উত্তাল প্রশান্ত মহাসাগরের এক ওশান স্টেশনে তাদের কাজ। একটা ছোটোখাটো শহরের মতো সেই ওশান স্টেশন—নাম তার ‘বিটা-এক্স’। সমুদ্রের গভীরে আদি জীবাশ্ম খুঁজে তার অভিব্যক্তির ধারা আবিষ্কার করাই প্রধান উদ্দেশ্য তাদের। কানাডা এবং ভারত সরকারের যৌথ উদ্যোগে এই গবেষণার কাজ চলছে।
ওদের দুজনকেই অনেক জরুরি কাজ ফেলে চলে আসতে হচ্ছে ওদের ঠাকুরমার নির্দেশে। দু-বছর পর দেখা হবে সকলের সঙ্গে, সেজন্য ক’দিন ধরেই চলছে সাজো সাজো রব। ঠাকুরমার খুব শখ ওদের বাবা-মায়ের বিয়ের পঁচিশতম বার্ষিক দিনটা সকলে মিলে হইচই করে কাটানো। এছাড়াও তাঁর তো বয়স হচ্ছে, কোনদিন কী অঘটন ঘটে—নাতিনাতনিদের একবার চাক্ষুষ দেখা।
সকাল সকাল সব কাজ সেরে পৃথার বাবা সুকান্ত বসে গেছেন ল্যাপটপের সামনে স্কুলের ক্লাসে। অবাক হলেও এটাই সত্য যে এখন আর রোজ দিন নিয়ম করে স্কুলে যেতে হয় না। সমস্ত ক্লাসই হয় অনলাইনে, শুধু বছরে দু-বার স্কুলে গিয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয় ও প্র্যাকটিস ক্লাস করতে হয়। কীভাবে সম্ভব সকলের প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া? এক এক ছাত্রছাত্রীর বাড়ি স্কুল থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে। লোকসংখ্যাও তো অনেকটা কমে গেছে সেই মহাপ্রলয়ের পর। বছরে দু-বার স্কুলে গিয়ে লাগোয়া হোস্টেলে থেকে প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস ও মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয়। এখন পৃথিবীর বেশিরভাগ বাড়িই অনেকটা জমি নিয়ে একতলা বা দোতলা। সেই বাড়িতে ছোটো মাঠ, পুকুর আর অজস্র গাছপালা—বেশিরভাগই প্রয়োজনীয় গাছপালা। আরও একটা বিষয়—সবই সরকারি সম্পত্তি, কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে কিছু নেই। এমনকি সন্তানরা কী পড়বে, কোথায় পড়বে তাও হবে সরকারের পরিকল্পনামাফিক। সেখানে বাবা-মার মতামতটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পৃথা এবং আয়ুষ দুজনের ক্ষেত্রেই এমনটাই হয়েছে। খাদ্যাভ্যাসে এসেছে দারুণ পরিবর্তন। প্রত্যেকের বাড়িতেই উৎপাদিত ফসল-শস্য দিয়ে তাদের খাদ্য তৈরি হয়। এছাড়াও রয়েছে প্যাকেটের তৈরি খাবার; সেসব খুব সুস্বাদু না হলেও প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ। সবচেয়ে অভাব রয়েছে পানীয় জলের ক্ষেত্রে। অনেক টাকা দিয়ে কিনতে হয়; এক ফোঁটাও অপচয় করবার ক্ষমতা নেই কারও। যদি কেউ জল বা খাবার অপচয় করে, তাহলে অনেক টাকা জরিমানা ধার্য হয়।
অসম্ভব অগ্রগতি হয়েছে পরিবহণ ব্যবস্থায়। এক জায়গা থেকে অন্য কোথাও যেতে হলে পারমাণবিক শক্তির বিভিন্নধরনের বাহন রয়েছে। যা অতি দ্রুতগতিসম্পন্ন—ঘণ্টায় দু-তিন হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেওয়া কোনও ব্যাপারই নয়। এই তো ক’দিন আগেই সুকান্ত সকালবেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটা ট্রেনিংয়ের জন্য গিয়ে আবার রাতেই ফিরে এলেন বাসায়। বিদ্যুতের ব্যবহার খুব বেড়ে যাওয়ায় মূল উৎস হিসেবে সৌরালোক এবং পারমাণবিক শক্তিকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
পৃথা-আয়ুষের বাবা-মা দুজনেই কিন্তু শিক্ষকতা করেন স্কুলে, যার জন্য দিনের বেলাটা সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকেন অনলাইন ক্লাসে। দুজনে দুটো ঘরে ল্যাপটপ, প্রজেক্টর ও স্ক্রিন দিয়ে সেই ক্লাস নেন। সন্ধেবেলা প্রায়ই ওঁরা তিনজন ঘুরতে বার হন, ওঁদের গাড়ি নিয়ে। সে-গাড়ি শুধু রাস্তা দিয়ে চলে না, প্রয়োজনে এরোপ্লেনের মতো উড়ে যেতে পারে। আর শুক্রবার হলে তো কথাই নেই—শনি-রবি বন্ধ থাকায় এক-একটা দেশ দু-দিনে চষে ফেলেন। ও হ্যাঁ, একটা কথা জানাতে ভুলে গেছি, এখন কিন্তু মান্ধাতা আমলের পাসপোর্ট ভিসার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। শুধু নিজের একটা আই কার্ড থাকলেই হল, তা দিয়েই গোটা বিশ্ব ঘুরে আসা যায়।
॥ দুই॥
সন্ধে হতে এখনও খানিকটা সময় রয়েছে। হঠাৎ শোঁ শোঁ একটা শব্দে পৃথার মা ঘর থেকে বেরিয়ে বাগানের পাশে মাঠের কাছে এলেন। একটা গোল চাকতির মতো বাহন থেকে পৃথা বাইরে এসে এক ছুটে মাকে জড়িয়ে ধরে। একটু পরেই চলে এল আয়ুষ তার হাইড্রোজেন চালিত গাড়ি নিয়ে। বাড়িতে শুরু হয়ে গেল হইহই আর আনন্দ। একটু পরেই ওদের বাড়িতে চলে এল পিলু আর মান্তা—ওদের মাসতুতো ভাইবোন। সন্ধেবেলার জমজমাটি আসরে মধ্যমণি হয়ে রইলেন ওদের ঠাকুরমা। মা কিছুক্ষণ পরপর ঘরে তৈরি একের পর এক খাবার নিয়ে হাজির ওদের সামনে।
“মা, সুপার হয়েছে এটার টেস্ট। কিন্তু কী খাচ্ছি বুঝতে পারছি না।” পৃথা খাবারটা মুখে দিতে দিতে প্রশ্ন করে।
“আরে এটা হচ্ছে চিকেন স্যাটে। তুই কি আগে কখনও খাসনি?” মায়ের আগেই উত্তর দিয়ে দেয় মান্তা।
“খাব কী, নামই তো শুনিনি কখনও।” আয়ুষ বলে ওঠে।
ওর মা এগিয়ে আসেন ওদের কাছে।—“তোরা তো তাও ছেলেবেলার কিছুটা সময় বাড়িতে আছিস, ওরা তো চার বছর হতে না হতেই বাড়ির বাইরে। কোত্থেকে পাবে এসব খাবার?”
এমন সময় প্লেটে করে কয়েকরকম খাবার নিয়ে এলেন ঠাকুরমা।
“ঠাম্মা! এতসব খাবার কি তুমি বানিয়েছ? কী কী নাম বলে দাও প্লিজ।” পৃথা আনন্দে বলে ওঠে।
“এটা হল পাটিসাপটা, আর এটা গোকুল পিঠে। আর এই প্লেটে রয়েছে মালপো আর মুগ পুলি।”
“ওরে বাবা, এসব নাম তো কস্মিনকালেও শুনিনি।” পিলু বলে ওঠে।
“শুনবে কী করে, আমিও পারি না বানাতে এসব। ওদের ঠাম্মা ছিল বলেই না এমন সুস্বাদু খাওয়ার তৈরি হয়েছে। তোর মাকে জিজ্ঞেস করলে নামগুলো অন্ততপক্ষে বলতে পারবে বলে মনে হয়।” কথাগুলো বলে মা এসে বসেন ওদের মাঝে।
সবাই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে আছে কখন আয়ুষ আর পৃথার কাছে গল্প শুনবে। পিলু আর মান্তা পড়াশোনা করে জার্মানির একটা স্কুলে, ও-দেশের একটা হোস্টেলে থাকে। তবে অনলাইন ক্লাস হওয়ায় মাঝে-মধ্যেই বাড়ি চলে আসতে পারে। এখনকার নিয়মে সব শিশুরা চার বছর বয়স হলেই পছন্দমাফিক যে-কোনো দেশে লেখাপড়া করতে পারে। তবে শর্ত একটাই, তাদের সে-দেশের হোস্টেলে থাকতে হবে আর পরীক্ষার সময় স্কুলে যেতে হবে। ওরাও অপেক্ষা করছে কখন গল্প শুনবে দাদা-দিদির কাছে। ওদেরও তো অনেক কথা জমে রয়েছে স্কুলজীবনের, সেসব বলতে না পারলে তো পেটের খাবার হজম হবে না।
“পৃথাদিদি, বলো না তোমার অভিজ্ঞতার গল্প।” মান্তার সরাসরি প্রশ্ন।
এবার মুখ খুলতে হয় পৃথাকে।—“আমি যে জায়গাটাতে থাকি সেটা তো সকলে জানো, প্রশান্ত মহাসাগরে ভেলভেট দ্বীপের কাছে একটা সামুদ্রিক স্টেশন যার নাম ‘বিটা-এক্স’। সেটা কিন্তু একটা ছোটোখাটো শহরের মতো। কী নেই সেখানে? তবে আমাদের কলকাতার মতো এত বড়ো শহর নয়। সর্বসাকুল্যে আমরা হাজার দশেকমতো ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক আর বিভিন্ন কাজের মানুষজন। তোমরা শুনলে আশ্চর্য হয়ে যাবে, এধরনের এক-একটা ওশান স্টেশনে বড়ো শহরগুলোর মতো সবকিছুর সুবিধা রয়েছে। আমাদের কাজ মাঝে-মাঝেই সাবমেরিন করে সমুদ্রের নীচে গিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা। প্রবল জলের চাপ সহ্য করে সমুদ্রের নীচে গিয়ে কাজ করা কিন্তু বেশ কষ্টকর। প্রথম প্রথম তো আমাদের মধ্যে অনেকেই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে সবকিছু অভ্যাস হয়ে যায়।”
“তোমাদের জলে নামার জন্য আলাদা পোশাক রয়েছে না?” পিলু প্রশ্ন করে কৌতূহলে।
“সে তো আছেই। আলাদা অক্সিজেন সিলিন্ডার—সবকিছু। আর সবচাইতে বড়ো কথা, সব ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া থাকে আমাদের। সাবমেরিনের ভেতর কম্পিউটার স্ক্রিনে সর্বদা চার-পাঁচজন বিজ্ঞানীরা সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেন।” পৃথার জবাব।
“আর তোরা বুঝি সমুদ্রের নীচে প্রবাল বা অন্য পাথর তুলে নিয়ে আসিস উপরে পরীক্ষার জন্য?” মায়ের প্রশ্ন।
“না মা, প্রবাল বা পাথর শুধু নয়, আরও অনেক কিছু। এই ধরো, আজ থেকে প্রায় চারশো কোটি বছর আগে যেসব অবায়ুজীবী প্রাণীর সৃষ্টি সাগর জলে, তাদের থেকেই পরে বায়ুজীবী বহুকোষী উদ্ভিদ বা প্রাণীর সৃষ্টি। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা তারা আজও বেঁচে আছে কোন মন্ত্রে? কেউ তার জবাব দিতে পারে না। আমরা গবেষণা করছি তার উপরে—সাগরের প্রচণ্ড চাপ, তাপ, ঠান্ডায় তারা বেঁচে আছে আজও কোন সে রহস্যে। ইতিমধ্যেই এমন সংগ্রহের পরিমাণ কয়েক লক্ষ। সেসব তুলে আনার পর সাবমেরিনের অত্যাধুনিক যন্ত্রে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা হচ্ছে, আর সেসব লিখে রাখা হচ্ছে।”
“এর মধ্যে কিছু কি আবিষ্কার হয়েছে যা তোদের ভাবনাকে উজ্জীবিত করতে পারে?” এতক্ষণে বাবার কথায় সকলে আগ্রহী দৃষ্টিতে পৃথার দিকে তাকিয়ে থাকে।
“বাবা, এটা আমাদের স্কলারশিপের প্রথম শর্ত, গবেষণার ফলাফল নিয়ে বাইরে কোনও আলোচনা করা যাবে না। তাছাড়া এক এক টেবিলে এক-একধরনের ফলাফল নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, কেউ পুরোটা বলতে পারবে না। এসব টপ সিক্রেট বাবা।” বলেই হেসে ওঠে পৃথা।
“আর দাদা, তোমার কাজের বিষয় নিয়ে কিছু বলো।” প্রশ্ন করে পিলু।
“আমি কোথায় কাজ করছি তা নিশ্চয়ই তোমরা সকলেই ভালো করে জানো।”
“হ্যাঁ। মহাশূন্যে মঙ্গলের কাছে একটা স্পেস স্টেশনে—নামটা হল ‘ক্রেটা’। ঠিক তো দাদা?” আয়ুষের কথায় সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয় মান্তা।
“হ্যাঁ। একদম ঠিক কথা। আর সবাই তো জানো এই কাজে আমাদের দেশের সঙ্গে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার। মূলত মঙ্গলকে কী করে বসবাসযোগ্য করে তোলা যায় তারই প্রচেষ্টা চলছে। এমন আরও অনেক স্পেস স্টেশন রয়েছে মঙ্গলের আশপাশ জুড়ে।”
“আচ্ছা দাদা, তোমরা স্টেশন থেকে যে মঙ্গলে যাও, কীসে করে যাও?”
পিলুর প্রশ্নে সপ্রতিভ জবাব দেয় আয়ুষ, “ছোটো ছোটো হাইড্রোজেন চালিত যানে করে মঙ্গলে যেতে হয়। অনেক যন্ত্রপাতি—সেসব নামিয়ে পরীক্ষার কাজে লেগে যেতে হয়।”
“ওখানে চলাফেরার সমস্যা হয় না?” পৃথা এবার প্রশ্ন করে।
“হ্যাঁ, তা তো হবেই। মঙ্গলের ভর পৃথিবীর ভরের দশ ভাগ। অর্থাৎ, পৃথিবীতে যে দু-ফুট লাফ দেবে মঙ্গলে সে কুড়ি ফুট লাফাতে পারবে। আর সকলেরই জানা ভর কম হলে অভিকর্ষ বল কম হয়। মঙ্গলের অভিকর্ষ বল পৃথিবীর তুলনায় আটত্রিশ শতাংশ। তার মানে হল কারও ওজন যদি পৃথিবীতে একশো কেজি হয় মঙ্গলে তার ওজন হবে মাত্র আটত্রিশ কেজি।”
“খুব মজার ব্যাপার তো! তার মানে তোমাদের যন্ত্রপাতি নিয়ে চলাফেরা করতে অসুবিধে হয় না।” মান্তার গলায় বিস্ময়ের সুর।—“মঙ্গল সম্পর্কে আরও কিছু বলো না দাদা।”
“শোনো তাহলে বলছি। এসব কিন্তু আমাদের আবিষ্কার নয়, অনেক আগে থেকেই মঙ্গলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেসব অভিযান চালিয়েছিল তারই নির্যাস। মঙ্গলের মাটিতে আয়রন অক্সাইডের পরিমাণ বেশি আছে বলে দেখতে লাল। এজন্যই মঙ্গলের নামকরণ হয়েছে ‘লাল গ্রহ’। আমাদের যেমন চাঁদ, মঙ্গলের দুটো উপগ্রহের নাম ‘ফোবস’ এবং ‘ডেইমোস’। কিছুদিন আগেই আমরা ‘ডেইমোস’ অভিযানে গিয়েছিলাম। তবে সেই অভিজ্ঞতা বলতে পারব না। বারণ আছে।” বলেই হেসে দেয় আয়ুষ।
“তারপর আর কী আছে বলো না দাদা।”
মান্তার আগ্রহ দেখে আয়ুষ মঙ্গল সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য সকলকে জানায়।—“গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের মধ্যে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থাকলেও তা কার্বন-ডাই-অক্সাইডে পরিপূর্ণ। সেখানে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। নানাধরনের গাছপালাকে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয়েছে। গবেষণা সফল হলেই সেখানে অক্সিজেনের পরিমাণ বাতাসে বাড়বে। আর কার্বন তো প্রাণ সৃষ্টির অন্যতম উপাদান। এছাড়াও ওখানকার আগ্নেয়গিরিগুলো অবিরাম তাপ ও লাভা উদ্গিরণ করে চলেছে। এখন সবচাইতে বেশি চেষ্টা হচ্ছে সেখানে জল সৃষ্টির জন্য। আশা করা যায় খুব তাড়াতাড়ি সেই প্রচেষ্টা সফল হবে।”
“অনেক রাত হল। এখন সকলে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ো, কালকে বাকিটা শোনা যাবে।” মায়ের কথায় সকলে চলে আসে ডাইনিং রুমে।
খেতে বসে সে এক কাণ্ড হল। আয়ুষ ও পৃথা দীর্ঘদিন ধরে বাড়ির খাবারে অভ্যস্ত নয়, ফলে কোনটা কী এবং কীভাবে খেতে হবে তা নিয়ে বিস্তর মজা হল খাওয়ার টেবিলে।
“এটা ডাল, এটা দিয়ে আগে খেতে হবে। তারপর ওই ফুলকপির তরকারি। তারপর মাছ আর শেষে মাংস। কিন্তু তোরা চামচ দিয়ে খাচ্ছিস—মাছের কাঁটা বেছে খেতে কষ্ট হবে তো।”
মায়ের কথায় ওরা মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেয়, কোনও সমস্যা হবে না।
॥ তিন॥
পরদিন সকাল সকাল উঠে নানাধরনের কাজে সময়টা যে কীভাবে কেটে গেল ওরা বলতে পারবে না। আর আজকে ছিল বাবা-মায়ের বিয়ের পঁচিশ বছরের পূর্তি দিবস যার জন্য ওদের চলে আসা। খুব আনন্দ করল সকলে মিলে। বাড়িতে লোকজনও এল অনেক। সকলের নানারকম প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আয়ুষ ও পৃথার নাজেহাল অবস্থা। বিকেলের দিকে সকলে মিলে চলল বিখ্যাত ডেলটা পার্কে। শুনেছে, একসময় এখানে ছিল বিজ্ঞাননগরী। কিন্তু সেই মহাপ্রলয়ের পর সবকিছু পালটে গেছে কলকাতার, অন্য জায়গাগুলোর একই দশা। মায়ের কাছে গল্প শুনেছে পৃথারা, সে-সময় সারা পৃথিবীর জনসংখ্যা নাকি ছিল প্রায় এক হাজার কোটি। ভারতবর্ষেই তো ছিল প্রায় দেড়শো কোটির বেশি জনসংখ্যা। ভাবতে অবাক লাগে একদিনের মহাপ্রলয়ের ফলে পৃথিবীর লোক সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র একশো কোটিতে। আর ভারতে মাত্র দশ কোটি মানুষ বেঁচে ছিল। কিন্তু যারা বেঁচে থাকল, তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। কারণ, গোটা বিশ্বই যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। নতুন করে সবকিছু গড়ে তুলতে হয়েছিল। অবশ্য বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্যে মানুষ পৌঁছে গেছে সভ্যতার এক অকল্পনীয় শিখরে। যার সুফল পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষ উপভোগ করতে পারছে। দেশে দেশে বৈরিতার বদলে তৈরি হয়েছে মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ববোধ। সকল দেশ একে অপরকে সাহায্য করছে, বিনিময়ে লাভ করছে প্রতিবেশীদের সহযোগিতা। ভূগর্ভের জ্বালানি যেমন পেট্রোল, ডিজেল সব বাতিল—শুধুমাত্র সৌর বিদ্যুৎ ও পারমাণবিক শক্তি বর্তমানে মূল জ্বালানি। একটা ছোট্ট হাতঘড়ির মধ্যে পুরোনো দিনের মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারে যাবতীয় তথ্য ঠাসা থাকে। যে-কোনো প্রান্তে যে-কোনো সময়ে আলোর গতিবেগে সিগনাল চলে যায়। পুরোনো দিনের যানবাহনও এখন নেই। একদম অন্যরকম গাড়ির ব্যবস্থা। এই তো ওরা রেডি হয়ে একটা বড়ো ডালির মতো বাহনে বসে সুইচ দেওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ডেল্টা পার্কে চলে এল। এর চাইতে অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন যানবাহন সারা বিশ্বে ব্যবহার হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক অগ্রগতি ঘটেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে। হাতে কিছুই তো লিখতে হয় না, চিন্তা করে আইপ্যাড বা ল্যাপটপে আঙুল ছোঁয়ালেই চিন্তাশক্তির সমস্তটাই লেখা হয়ে যায়। পৃথা ও আয়ুষের খুব জানতে ইচ্ছে করে পুরোনো দিনের গল্প। বিশেষ করে মহাপ্রলয়ের আগের পৃথিবীটা কেমন ছিল সেসব কথা। সেই সময়ের জীবিত একমাত্র মানুষ রয়েছেন তাদের ঠাম্মা; তাঁর কাছেই শুনবে সেইসব গল্প।
॥ চার॥
ডেল্টা পার্ক ঘুরতে প্রায় সারাদিন লাগে, কিন্তু ওরা ঘণ্টা দুয়েকের বেশি থাকতে পারেনি। পুরোনো দিনের সেই আদিগঙ্গা কিন্তু এখন বিশাল নদীতে পরিণত হয়েছে। তার চারপাশে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। টলটলে জলে রাতের আকাশের প্রতিবিম্বের অপূর্ব দৃশ্য দেখতে দেখতে সবাই যেন হারিয়ে গিয়েছিল কোন এক স্বপ্নপুরে। হঠাৎ করে শতবর্ষ আগের কোনও মানুষ যদি এখন কলকাতায় এসে উপস্থিত হন, তিনি অপার বিস্ময়ে হারিয়ে যেতে পারেন কল্পলোকে। এখন না আছে দূষণ, না আছে জঞ্জাল। আর চারদিকের সেই কংক্রিট, সব যেন উধাও হয়ে গেছে কোন মন্ত্রবলে। এমন শহরই শতবর্ষ আগে সকলের কাম্য ছিল দূষণমুক্ত পরিবেশ আর শৃঙ্খলাবদ্ধ শহর।
ওরা অনেকটা সময় কাটিয়ে সকলে ফিরে আসে ঘরে। দেখতে দেখতে কেটে গেল দুটো দিন। কত কথা বলার ছিল, শোনার ছিল সকলের কাছে। একসময় ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দেয় সবাই।
হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যায় আয়ুষের। ওর পাশে শুয়ে ঘুমোচ্ছে পিলু। কিন্তু কীসের শব্দ হল ঘরে, নাকি বাইরে? ঘরে তো কিছু নেই। বাইরে থেকেই শব্দটা আসছে মনে হল। দরজা খুলে ধীরে ধীরে বাইরে আসে আয়ুষ। শব্দের উৎস খোঁজার চেষ্টা করে। ঘরের পিছন দিয়ে ছোট্ট একটা মাঠ, তার চারপাশে ফুলের বাগান। বসবার চেয়ারও রয়েছে। সেখানে আসতেই আয়ুষের চোখ ছানাবড়া—এ কী! এ তো ‘ক্যাম্প ফাইভ’ মনে হচ্ছে। সর্বনাশ! কী করে এল এখানে? এগিয়ে যায় আয়ুষ তার দিকে। নিজের হাতঘড়িকে কমান্ড করে, এমন সময় ‘ক্যাম্প ফাইভ’ নামক রোবটটি এগিয়ে আসে ওর কাছে। দুজনে করমর্দন সেরে নেয়।
“তুমি এখানে কেন এলে ক্যাম্প, এত রাত্তিরে?” আয়ুষ সরাসরি প্রশ্ন করে।
“আজ সন্ধেবেলা তুমি আমার কথা চিন্তা করছিলে। তখনই আমার মনে হল তোমার সঙ্গে দেখা করা দরকার, তাই চলে এলাম।” উত্তর দেয় রোবট।
“কিন্তু আমি তো কালই চলে যাব, কালই তো দেখা হত আমাদের। তাছাড়া এই হিমেল রাতে তুমি বাইরে থাকলে সমস্যা দেখা দেবে।”
“কোনও ব্যাপার নয় আয়ুষ, আমি তোমাদের ওই বারান্দায় বসে থাকব রাতটা। যদি তোমাদের অসুবিধা না হয়। আসলে তোমার কথা আমারও তো মনে হচ্ছিল।”
“সে তো বুঝতেই পারছি ক্যাম্প। আসলে তোমার দেহের মধ্যেই আমার যাবতীয় গবেষণার ফলাফল রয়েছে। পৃথিবীর আবহাওয়ায় যদি তার মধ্যে সমস্যা তৈরি হয় তাহলে তো সর্বনাশ।” আয়ুষ আশঙ্কা প্রকাশ করে।
“হ্যাঁ, তাই তো। এটা তো ভেবে দেখিনি। তাহলে ফিরে যাই এখন আমাদের ক্রেটাতে।”
“না না, তা হয় না। এসেই যখন পড়েছ, থেকে যাও একটা রাত। কাল আমরা একসঙ্গেই ফিরব।” বলে আয়ুষ ওকে বারান্দায় বসিয়ে নিজের ঘরে চলে আসে।
ক্যাম্প ফাইভ হল আয়ুষের কাজের প্রধান ও বিশ্বস্ত সাথী, একটা রোবট। ওর যাবতীয় কাজের সমস্ত তথ্য ওর ভেতরে রয়েছে। মঙ্গলে সে যতবার গেছে সঙ্গে ওকে নিয়ে। এটা ঠিক আজ বিকেলে ওর কথা বলে মনে পড়ছিল তার—কেমন আছে, আয়ুষকে ছাড়া। আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে ওর চিন্তা ইথারে ক্যাম্প ফাইভকে সঞ্চারিত করেছে। কিন্তু সে তো কাউকে বলেনি ওর কথা। তাছাড়া ওর কোনও ক্ষতি হলে তো সর্বনাশ। ওর স্কলারশিপ বাতিল পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। আগামীকাল কী বলবে সে বাড়ির সকলকে? আর স্যারদেরই-বা কী কৈফিয়ত দেবে? এসব সাতপাঁচ ভাবতে-ভাবতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়ে সে।
ঘুম ভাঙে মায়ের ডাকে। তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে বাইরে মাঠের কাছে গিয়ে সে অবাক। কোথায় ক্যাম্প ফাইভ? কোনও চিহ্ন নেই তো! তবে কি ফিরে গেছে সে রাতেই? আসলে রাতে অনেক আশঙ্কার কথা সে ভাবছিল, সেই চিন্তা হয়তো ক্যাম্পের মস্তিষ্কে সঞ্চারিত হয়েছে। এখন তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে ক্রেটাতে দুপুরের মধ্যেই।
ঘরে এসেই শুনল পৃথার জন্য সিগন্যাল এসেছে, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে সে। মার কাছে যাবার কথা বলতেই চোখ ছলছল করে উঠল মায়ের। ঠাকুরমা দুই ভাইবোনকে জড়িয়ে আদর করলেন। একরাশ নাড়ু-মোয়া নিজের হাতে তৈরি করে ভরে দিলেন ওদের ব্যাগে। হঠাৎ পিলু হাতে করে একটা ছোটো বোতামের মতো কী যেন এনে সকলকে দেখাল। সে নাকি বাগানের রাস্তায় পেয়েছে। সর্বনাশ, এ তো ক্যাম্প ফাইভের একটা সুইচ!
“এটা মনে হয় হিরে, তাই না মেসো?” বোতামটা সুকান্তের হাতে দেয় পিলু।
“না পিলু, এটা আমার খুবই দরকারি জিনিস।” বাবার হাত থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে নেয় আয়ুষ।
“মা, এবারে আসি।” প্রণাম করে দুই ভাইবোন।
ওরা বাগানে রাখা ওদের বাহনে উঠে বসে। পৃথার যানই আগে উড়ে গেল শোঁ শোঁ শব্দে। সবাই হাত নাড়ছিল।
আয়ুষ তার বাহন স্টার্ট করে, সবাই বাগানে ওদের বিদায় জানাচ্ছে। মুহূর্তে সে উঠে গেল অনেক ওপরে। নীচের সবকিছু দৃশ্য মিলিয়ে যায় একসময়। মনে অনেক আশঙ্কা নিয়ে আয়ুষ পাড়ি দিল ক্রেটাতে। অনেক স্বপ্ন রয়েছে তার আগামী দিনের জন্য, এখন শুধু কাজ আর কাজ।
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস