কল্যাণ সেনগুপ্তের আগের গল্প বংশীধরের বিপদ, শুধু কথা, পাসওয়ার্ড, ঠাকুমা, হনুমানের চিকিৎসা

দিদির গলায় বিস্ময় ঝড়ে পড়ে, “যা! কী বলছিস? পাঁচটা সাবজেক্ট-এর এভারেজ চুয়ান্ন? তুই ঠিক ইয়ার্কি মারছিস? থাপ্পর খাবি। কত হল বল।”
“তোকে আমি একটু পরে ফোন করছি। ছোট দেওর ফোন করছে।” বলে ফোনটা কাটে তপতী। কিছুই ভালো লাগছে না। আর এখনই ঢেউয়ের মত একটার পর একটা ফোন। দুপুর থেকেই তপতী ফোন ধরতে ধরতে ক্লান্ত।
ছোট মাসী, মামা, উজ্জ্বল জ্যাঠা , সেভেন ডি ফ্ল্যাটের নূপুর, ননদের ছেলে দিলুর ফোন এর মধ্যে এসে গেছে। উত্তর তো দিতেই হবে। ইচ্ছে করছে না তবু দিতেই হবে । প্রথম হেসে হেসে প্রশ্ন, ”কত হল দিশার?” তপতীকে বলতেই দেয় না, “বলেছিলাম নব্বই কোনো ব্যাপার না। আজকাল একটু পড়লেই নব্বই । কুড়ির মধ্যে আছে নাকি?”
একটা ফোন ও সন্দীপ ধরেনি। সন্দীপ ধরবেই না। সন্দীপ নামকরা ডাক্তার। পাশে একগাদা বিদেশি গালভরা এ,বি,সি,ডি ডিগ্রি। তপতী কলকাতার একটা নামকরা স্কুলের অঙ্কের ম্যাম। তার মেয়ে বলে কথা!
অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল নম্বরগুলো দেখে। বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কত পেয়েছে দিশা?
দু’একজন চুয়ান্ন শুনে বললে, “তুমি ঠাট্টা করছ তপতী। এসব নিয়ে ঠাট্টা করতে নেই। বলো পার্সেন্টেজ শেষ অবধি কত হল?”
শেষ অবধি কিছুক্ষণ তপতী চুপ করে থাকে। ভারী গলায় আবার চুয়ান্ন বলায় কেমন পরিবেশ টা থমকে গেল। কিছুক্ষণ চুপ। তারপর কেউ বললে, “এরকম আজকাল হয় নাকি? শুনেছি বসলেই ষাট অবধারিত।”
দিলু বলল, “কোনো ব্যাপার নয়। তুমি চ্যালেঞ্জ করো। নম্বর ঠিক হয়ে যাবে। আকছার হচ্ছে। কোথাও একটা ভুল হয়েছে।”
তপতী জানে কেউ কোথাও ভুল করেনি। ভুল তারাই করেছে যারা সন্দীপ আর তপতীর মেয়ে হিসেবে ভাবছে দিশাকে। দীপের মত রেজাল্ট ভাবছে। দিশা তো এমনই। আগেও অনেকবার সবাইকে বোঝাতে চেয়েছে। কেউ গায়ে মাখেনি। বলেছে, ও ছোটোবেলায় সবাই এরকম কমবেশি হয়।
সেই ছোটোবেলা থেকে প্রত্যেক ক্লাসে পেরেন্টস টিচার মিটিং-এ চোখের জল ফেলতে ফেলতে আসা। কেউ বলে তোমরা ভালো করে দেখছ না, কেউ বলে কাউন্সেলিং করাও। যে যা বলেছে খবর নিয়ে দৌড়ে গেছে মেয়ে নিয়ে। স্কুল, ফ্ল্যাট, কম্পাউন্ড সব জায়গায় মাথা নীচু। দিশার স্কুলের বন্ধুর মায়েরাও পিছিয়ে পড়া মেয়ের মতই দেখত তপতী কে।
দিশার তেমন মনখারাপ নেই। শুধুই মুখ জুড়ে উদাসীনতা। আজ নীচে যায়নি ওর পোষ্যদের খাওয়াতে। ছবি আঁকার মধ্যে, রাস্তার কুকুর বেড়ালদের মধ্যে সময় কাটানোয় ওর আনন্দ।
তপতীর চোখ ফেটে জল আসছে কিন্তু কাঁদা যাবে না। প্রথম তিন ঘণ্টা… ‘কত হল?’ ‘এখন চলছে?’ ‘কী করে এমন হল?’ ‘তুমি খাতা দেখতে চাও, কোথাও তো গন্ডগোল হয়েছে…’ ইত্যাদি। মনে ক্ষীণ আশা করেছিল স্কুলটা যখন ভালো তখন ভদ্র সভ্য কিছু একটা নম্বর শেষ অবধি পেয়ে যাবে। পরীক্ষার শেষ একমাস কিছুটা পড়েছিল দিশা। স্কুলও পিছনে পড়েছিল নিজেদের নাম বাঁচাতে। রোজ স্কুলের পর সন্ধে অবধি বার বার ঝালাই করিয়েছে পড়া। আর কত করবে স্কুল? তপতীর আলাদা করে ধরতে ইচ্ছে করেনি। ধরতে গেলেই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। যেন প্রথম শুনল এই প্রশ্ন। সবাই নাকি কিছু না পড়ে বসলেই সত্তর আশি পায়। আর একটু পড়লেই আশি, নব্বই হাতের মোয়া। সন্দীপ একবার ফোন করে নম্বর জেনে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলল, “রাখি, রুগী অপেক্ষা করছে। রুগী দেখার আগে এমন হতাশ হওয়া ঠিক নয়।”
ছেলে দীপ যেমনই ভালো পড়াশোনায় তেমনি উল্টো হল দিশা। দীপ পেয়েছিল নাইন্টি থ্রি পার্সেন্ট। আর দিশা প্রায় অন্য মেরু।
কেউ কিছু বলেনি; তবু হঠাৎ করে বসে থেকে খাতের ছত্রীটা দু’হাতে জড়িয়ে চোখ ফেটে জল এসে গেল তপতীর। কাকে বলবে? কাকে বোঝাবে দিশা দীপের মতন নয়। সবাই এক হয় না। বাড়িতে একটা টিভি অবধি চালায় না। তিনজন প্রাইভেট টিউটর রেখেছিল, তবু হল না।
দিশা র মুখ ভার। কান্নাকাটি নেই। সবার মন খারাপ বলে ওর মনও খারাপ। মাথা নীচু করে খাতায় আঁকিবুকি করছে। পিছনের ঘরের জানলা দিয়ে মাঝে মাঝে বাইরে মুখ বাড়িয়ে উঠোনে বিড়ালের ঝগড়া দেখছে। অদ্ভুত ঔদাসীন্য মুখে। ওর কি এই নম্বর পাওয়ায় কোনো দুঃখবোধও নেই? এই জন্যেই দীপ মাঝে মাঝে বলে, “দিশা অন্য জগতের কেউ, আমাদের কেউ না।”
দীপ খেলেধুলে বাড়ি এল। দিশাকে একবার পিঠে হাত বুলিয়ে বললে, “চিন্তা করিস না। লড়ে যা, সামনের বারো ক্লাসে ঠিক করে নে লড়ে যাবি।”
দিশা বাড়িতে দিকে সামনে চালা ঘরের ছাদের দিকে আঙুল তুলে বলে, “বলেছিলাম, দাদা দ্যাখ, পিকুর তিনটে বেড়ালের বাচ্চা হাঁটতে শিখেছে। লেজগুলো দেখ একদম খাড়া। ওফ! মনে হচ্ছে চটকে দিই। চালাঘরের ছাদে ওঠা যায়?”
দীপ বিরক্ত হয়, “কে পিকু? তোর নতুন বন্ধু নাকি?”
“আরে পিকু, ওই যে মাথায় হলুদ ছোপ, ল্যাজে ও হলুদ কালো দাগ। মনে নেই আমার সাথে সিঁড়ি দিয়ে এসেছিল আমাদের ফ্ল্যাটে?”
দীপ বিরক্ত হয়, “আমি কী বলছি আর তুই কী বলছিস! এরকম হলে বড়ো ক্লাস তো আর পারই হবে না!”
এবার হুঁশ ফেরে দিশার। দীপের হাত চেপে ধরে। করুণ মুখে বলে, “মা খুব কষ্ট পেয়েছে না দাদা? কী করব বল, আমার ভালোই লাগে না পড়তে।”
“ভালো লাগে না বললে হবে?”
ফিক করে হেসে ফেলে দিশা। দীপকে সান্ত্বনা দেয়, “ঠিক আছে। আমি এগারো ক্লাসে পড়ব।ভালো নম্বর পাব দেখে নিস। একটা কথা বলব দাদা?”
“বল কি বলবি?”
“কাউকে বলিস না, আমি কিন্তু যা পেয়েছি আমি কিন্তু তাতেই খুশি।”
“চুয়ান্নতেই খুশি তুই? তুই কী রে?”
“পাশ তো হয়েছে । ফেল তো করিনি।” মুখে হাত দিয়ে হাসি চাপে, “আমি তো ভেবেছিলাম গেল, এবার বাড়ি থেকে পালাতে হবে!”
“চুপ। আর এসব বাড়িতে বলিস না। এখনো বাবা ফেরেনি। এসব শুনলে মার শরীর কী হবে কে জানে।”
রান্না ঘরে এসে দীপ বললে, “মা, মন খারাপ করো না। ওর হয়তো পড়তে ভালো লাগে না। কী আর করবে? ওর তো আরো কত গুণ আছে সেগুলো দেখো।”
“কী গুণ আছে?” গুমরে ওঠে তপতী, “আমি জানি প্রতিপদে আমাদের মুখে চুনকালি লাগবেই ঠিক করেছে ও।”
দীপ বলে, “ও কত সুন্দর ছবি আঁকে, ভালো নাটক করে ,নাচতে পারে। এগুলো গুণ নয়? আর এখন স্কুলে কাউকে ফেল করায় না। দেখেছ সব ক্লাসেই তো ওর একই অবস্থা। বড়ো হয়ে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“এরকমভাবে বড়ো হতে হতে তো আমরা লজ্জায়, অপমানে পৃথিবী ছেড়েই চলে যেতে হবে!”
“এসব বোলো না তো!” দীপ রেগে যায়।
কম্পাউন্ডে পাঁচ-সাতটা বেড়াল, ফ্ল্যাটের সব পোষা কুকুরগুলো দিশাকে চেনে। নীচে নেমে একবার ডাকলেই দৌড়ে চলে আসে। প্রত্যেকের আলাদা নাম। কেউ সন্দেশ, কেউ চকমকি, কেউ তবলা। ফ্ল্যাটের লোকজন কেউ একটু খ্যাপাটে বলে, কেউ বোকা বলে দিশার তাতে কিছু এসে যায় না। সন্দীপ এর ফিরতে অনেক রাত হল। মেয়ের জন্যে আরো কিছুটা দেরি করেই ফিরেছে। তবু পার পাওয়া হল না। সেভেন ডি র মাসিমা লিফট-এর লবি তে চলে এলেন। হাসি মুখে বললেন “যাবে তো? চল একসাথে যাই।” মাসিমার দুই মেয়ে দূরে থাকে। মেসোমশাই মারা গেছেন গত বছর। মেয়েরা আসা যাওয়া করে। দিশাকে খুব ভালোবাসেন। লিফটে ঢুকে বললেন, “দিশা’মা-র মন খুব খারাপ, না?”
সন্দীপ মাথা নাড়ল।
“দেখো বেশি বকাবকি কোরো না। এসব সাময়িক। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তারপর সন্দীপ চুপ দেখে বললেন, “দেখো সন্দীপ, তোমাকে আর তপতীকে আমি ছেলেমেয়ের মতো দেখি। তাই বলছি। ওর মধ্যে খাদ নেই। আছে আমাদের মধ্যে, আছে তাই চিনতে ভুল হয়। আমি বলিনি তোমাদের। তুমি কি জানো আমার যখন কোভিড হল তখন ওই প্রথম আমাকে এসে বলেছিল, ‘দিদু কুল।’ আমি অত কষ্টের মধ্যেও হেসে ফেলেছিলাম। দেখে সে গম্ভীর হয়ে বললে, ‘তোমার যা দরকার আমাকে বলবে ইন্টারকম-এ। আমি সব এনে দেব। ডাক্তারকাকুকেও ডেকে আনব। নো চিন্তা।’ আর এনেও দিয়েছে। আমি আর সে-সব বলতে চাই না।”
সন্দীপ মুখ তুলে দেখে মাসিমার মুখটা দিশার জন্যে ব্যথায় করুন হয়ে গেছে। চোখ ছলছল। সে হেসে ফেলল, “কিন্তু মাসিমা, পড়াশোনা না করলে চলবে? মধ্যবিত্ত তো ওই ডিগ্রি বেচেই বাঁচে!”
মাসিমা হাসলেন, “সেসব তোমাদের জন্যে। ও কিন্তু একদম অন্যরকম। পড়াশুনায় কম নম্বর দিয়ে মানুষ বিচার কোরো না। পরে কথা হবে।”
সন্দীপ-এর ফ্লোরে এসে দাঁড়ায় লিফট। সন্দীপ বুঝলে মাসিমা সান্ত্বনা দিচ্ছেন যাতে বেশি বকাবকি না করে তপতী আর সন্দীপ।
ঘরে ঢুকে দেখলে বসবার ঘরে দিশা বসে। হাতে কাগজ আর পেন্সিল। এক মনে অর্ধেক মানুষের মুখ আর চোখ আঁকছে। জুতো খুলতে খুলতে দিশাই কাগজ নিয়ে এগিয়ে আসে, “দেখো বাবা, কেমন হয়েছে?”
কাগজের ওপর চারকোল পেন্সিলে আঁকা গভীর একটা চোখ, মনির ভিতরে গভীর থেকে গভীরতর আলো অন্ধকার। বিষণ্ণ সে দৃষ্টি। চোখের কোল দিয়ে মুক্তোর মত দুটি ফোঁটা জল গড়িয়ে আসছে। ব্যাথাতুর মুখে গভীর অসহায় এক ছায়া। সন্দীপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দিশার মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছুই বলতে পারলে না। ছবিটাই বলে দিচ্ছে ওর ব্যথা।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সন্দীপ বলল, “ভালো।”
মাথা নীচু করে দিশা বললে, “আমি সরি বাবা, আমি তোমাদের দুঃখ দিয়েছি। আমি পারিনি। সন্দীপ আর কী করে? পিঠে হাত রেখে ব্যাগ নিয়ে ভিতরের ঘরে চলে যায়। দিশা দাঁড়িয়েই থাকে ছলছল চোখে। ছবির ওপর হাত বোলাতে থাকে।
কমিউনিটি হলে মিটিং। আজ রবিবার প্রবল অনিচ্ছাসত্ত্বেও আসতেই হল সন্দীপকে। সবসময় ভয় থাকে দেখা হলে কেউ আবার দিশার সম্বন্ধে যদি কিছু বলে।ও গাড়ি রাখবার জায়গায় বেড়াল কুকুর নিয়ে খেলে। বাইরে রাস্তায় যে কুকুরগুলো আছে তাদের গায়ে হাত বোলায়। রাস্তা থেকে বেড়াল তুলে আনে বাড়িতে। এগুলো নতুন নয়। কিন্তু কার গাড়ির ওপর বেড়ালদের খাওয়াচ্ছে, ধুপধাপ করে দৌড়াচ্ছে, সব সময় নাচতে নাচতে সিঁড়ি দিয়ে নামছে উঠছে! কোথা থেকে এসেছে কে জানে! বাড়িতে কি সভ্যতা শেখায়নি? এসব প্রশ্ন তো রোজকার।
বাসিন্দাদের সবার মুখ চেনে কিন্তু নামে চেনে না সন্দীপ। পাশে বসে ছিলেন লম্বামতন এক বৃদ্ধ। হাতে লাঠি। পরিচয় জানা গেল মিস্টার সুব্রহ্মণিয়াম। ওঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই থাকেন টু সি তে। বয়েস হয়েছে আশির ওপর। একটা সময় সরকারি প্রধান আধিকারিক ছিলেন । ওনার বউ ও সাউথ পয়েন্ট স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। এই কম্পাউন্ড-এ ওঁকে সবাই আলাদা সম্মান দেয়। পরিচয়ের আদান-প্রদানে সন্দীপ ফাইভ বি তে থাকে শুনে বেশ অবাকই হলেন। বিস্মিত স্বরে বললেন, “আপনিই দিশার বাবা?”
তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, “আপনার সাথে মশাই আমার খুব দরকার আছে।” বলে মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন অ্যানুয়াল রিপোর্ট।
পুরো মিটিংটা সন্দীপ কাঁটা হয়ে রইল। ঘণ্টা দুই বাদে সন্দীপ আস্তে আস্তে উঠে আসছে, সুব্রহ্মণিয়াম দেখে ফেললেন। বললেন, “যাবেন? চলুন আমিও যাবো। এখন তেমন কিছু নেই।”
সন্দীপ পারলে না নিজেকে নিয়ে পালাতে।
হাঁটতে অসুবিধা। লাঠি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কমিউনিটি হল থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে বৃদ্ধ বললেন, “আপনি দিশার বাবা? আপনাকে দেখে মশাই হিংসে হচ্ছে।”
কিরকম ভাবে আক্রমণ আসছে বুঝে উঠতে পারে না সন্দীপ। চেয়ে থাকে বয়স্ক মানুষটার দিকে।
উনি বললেন “আর চিন্তা কী? আপনার মেয়ে তো মানুষ হয়েই গেছে।”
“না আসলে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। ওর বেড়াল কি কিছু করেছে আপনাদের?” শঙ্কিত হয়ে প্রশ্ন করে সন্দীপ।
মিস্টার সুব্রাহ্মণিয়ম বললেন, “আমরা মা-বাবারা ছেলেমেয়ের সামনে এমন ব্যবহার রাখি যা দেখে সে শিখতে পারে। যা নিয়ে সে সামনে এগোতে পারে। পড়াশুনা তো আছেই। কিন্তু ওটাই সব নয়। মনুষ্যত্ব না তৈরি হলে আর মানুষ কোথায় হল? তার জন্যে মা বাবাই আদর্শ।”
“আজ্ঞে…” সন্দীপ নিজের ব্যবহার কোথাও খারাপ করল কিনা খুঁজতে থাকে।
খানিক বাদে সুব্রহ্মণিয়ম বললেন, “আমি দিশার মুখটা চিনি, ও কোথায় থাকে জানতাম না। আসলে এরকম একটা মেয়ে এখানে থাকে তাই জানতাম না।
শঙ্কিত হয়ে ওঠে সন্দীপ, “একটু খুলে বলবেন।”
“আর বলবেন না। তখন আমরা কিছুদিন হল এসেছি এখানে। আমার স্ত্রী আর আমি রিকশা করে সপ্তাহের বাজার করে কম্পাউন্ডার গেটের কাছে নেমে ফ্ল্যাটে যাব বলে ব্যাগগুলো রেখে গেটের লোকের খোঁজ করছি। কেউ ছিল না সামনে। অনেকটা ওজন তিনটে ব্যাগে। কী করে নিয়ে যাব ভাবছি। হঠাৎ বাইরে থেকে হাতে একটা হারজিরজিরে বেড়াল কোলে নিয়ে একটি ছোটোখাটো মেয়ে হাজির হল। বেড়ালটাকে কীসব বলে নীচে নামিয়ে দু’হাত দিয়ে আমাদের ব্যাগগুলো প্রায় জোর করে টেনে নিলে বললে, “একি, ইউ? আংকেল? আপনি কেন নেবেন? আমি তো আছি। ছেড়ে দিন। ছেড়ে দিন। আমি আছিতো!”
ব্যাপারটা এত আকস্মিক যে আমরা খুব থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম কারণ গেটেও কেউ ছিল না জিনিসগুলো নিয়ে যাবার। আমার স্ত্রী না, না করেছিল। মেয়েটিকে আমরা চিনি না। বাইরে থেকে কম্পাউন্ডে ঢুকে এরকমভাবে ব্যাগ নিয়ে যেতে চাইছে। বুঝতেই পারছেন দিনকাল খারাপ। ভাবছিলাম টাকা পয়সা চাইবে কিনা।
তা হই হই করে ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে গিয়ে সে জিজ্ঞাসা করলে, ‘আংকেল কোন ফ্ল্যাট?’ বললাম ‘টু সি।’ দুমদুম করে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে গেল এই গরমের দুপুরে। কিছুক্ষণ বাদে ঘেমে নেয়ে নেমে এসে বললে, ‘ রেখে এসেছি, রেখে এসেছি আপনার দরজায়। বাই, আংকেল।’ বলেই দূরে বসে থাকা সেই বেড়ালটাকে কোলে নিয়ে চলে গেল। নামটাও জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। গেটের লোক ততক্ষণে ফিরে এসেছে। জিজ্ঞাসা করে জানলাম ওর নাম দিশা। ফ্ল্যাট ফাইভ বি।”
সন্দীপ স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইল। সুব্রাহ্মণিয়ম সন্দীপের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “কেমন করে দিলেন এই বয়সে এই শিক্ষা? আপনি? না আপনারা দুজনই?” তারপর কাঁধে একটু চাপ দিয়ে বললেন, “আপনারা খুব লাকি মানুষ। এ তো খাঁটি সোনা মশাই! ওর বয়েস কত? সামলে রাখবেন। খাদ যেন না মেশে।”
সন্দীপ বললে “ পনেরো তে পড়েছে।”
“চমৎকার, ব্রাদার। আমাদের বাবারা এগুলো শেখাতেন। এখন কেউ শেখায় না এই মনুষ্যধর্ম।”
সুব্রাহ্মণিয়ম চলে গেলেন হাত নেড়ে। সন্দীপ দাঁড়িয়েই থাকে। ও বলতে পারেনি এত বড়ো শিক্ষা আমরা দিইনি। দিতে পারিনি, শিখিনি। আমাদের এই শিক্ষা দিলে চলবে না। আমরা নম্বর চিনি। নাহলে বড়ো হলে নখদন্তহীন হবে, ক্ষতবিক্ষত হবে। এই মানবিকতা একান্ত ওর নিজের। আমরা কখনও শেখাইনি দিশাকে এমন করে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যেতে।
লিফট এর হাতলটা টানতে গিয়ে সতর্ক চোখে চারিদিক দেখে চোখ মুছে নিলে সন্দীপ। ভাগ্যিস কেউ দেখতে পায়নি! মেয়ের নামে পরিচয় পাওয়া আর নিজেকে চেনার আনন্দই আলাদা।